📄 জগতের মুসিবতের উপর ধৈর্য
এই ক্ষণস্থায়ী মুসাফিরখানায় কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া কেউ কখনো সফলতার উঁচু পাহাড়ে উঠতে পারেনি, আর কেউ পারবেও না। আসলে দুঃখের পরেই সুখ আসে। তবে তার এ দুঃখ ও কষ্টটা সারাজীবন তার গলাতেই ঝুলে থাকবে, এমনটা নয়; বরং কিছুদিন মালিকের পক্ষ থেকে তার বান্দার উপর পরীক্ষামূলক থাকবে এবং বান্দা পরীক্ষায় পাশ করলেই আল্লাহ আবার উঠিয়ে নিবেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ. “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।”৫৬
অর্থাৎ মানবকে কষ্ট, বালা-মুসিবতের মধ্যেই সৃষ্টি করেছি। এই জগত সংসারে তার গলায় পরতে হবে হাজারো কষ্টের মালা।
জীবনে দুঃখ আসবে। তাই সেই দুঃখের মাঝে ঘাবড়ানো যাবে না। ধৈর্যধারণ করতে হবে। আল্লাহ -র প্রতি আস্থা রাখতে হবে এই বলে যে—এগুলো হচ্ছে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আল্লাহ মুমিনদেরকে বিভিন্ন দুঃখ ও কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করার আদেশ করেন-
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ. “অবশ্যই আমি তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা ও জান এবং মালকে বিনষ্ট করার মাধ্যমে পরীক্ষা করব। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যধারণকারীদের।”৫৭
টিকাঃ
৫৬ সুরা বালাদ: ৪।
৫৭ সুরা বাকারা: ১৫৫।
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার উপর ধৈর্যধারণ
আল্লাহ প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার উপর ধৈর্যধারণ করতে আদেশ করেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয় তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।"৫৮
আব্দুর রহমান ইবনু আওফ থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, আমরা নবি -এর সাথে যে কোন বিপদে আক্রান্ত হলেই ধৈর্যধারণ করেছি। অতঃপর আমাদের সুখ-সমৃদ্ধির মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে, কিন্তু আমরা তাতে ধৈর্যধারণ করতে পারিনি (আমরা অনেকে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ফেলেছি)। ৫৯
পৃথিবীর কিছু মানুষ এমন আছে যাদেরকে জেল-হাজতে পাঠালে তারা তাতে ধৈর্যধারণ করে, কিন্তু এরপরে যখন ঐ ব্যক্তিকেই ধন-সম্পদ, সন্তানাদি, সুখ-সমৃদ্ধে ডুবিয়ে পরীক্ষা করা হয়; তখন সে আর ধৈর্যধারণ করতে পারে না; সে অধৈর্য হয়ে ব্যর্থ হয়। জগতের সব মানবই ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রে একই ধরণের। তাই তো কবি আবৃত্তি করেছেন-
বালা-মুসিবতে করতে পারে ধৈর্য যদিও কাফের ও মুমিন হয়। তবে সুখ-সমৃদ্ধিতে করে ধৈর্য এতে সিদ্দিক-ই কেবল রয়। ৬০
টিকাঃ
৫৮ সুরা মুনাফিকুন: ৯।
৫৯ সুনানু তিরমিযি: ২৪৬৪।
৬০ তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ১৮৫।
📄 প্রবৃত্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে চাইলে কয়েকটি কাজ করতে হবে
১. মনোবাসনা ও প্রবৃত্তি পূরণের জন্য নিজেকে একদম ডুবিয়ে দিবে না।
২. হৃদয়ের চাহিদাকে খুঁজে পেতে যথার্থ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করবে না। পৃথিবীর অনেক লোক আছে যারা নিজেদের চাহিদা মোতাবেক সম্পদ জোগাতে সভা, মিটিং ও বিভিন্ন কনফারেন্সে এতই ব্যস্ত থাকে যে, আল্লাহ-র বিধানটুকু পালন করার সময় খুঁজে পায় না। আবার অনেক চাকুরিজীবি আছে যারা উন্নত চাকুরি করতে গিয়ে হাজারো কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকে, তখন মালিকের কদমে দুটো সিজদা দিতেও সময় মিলে না। ধীরে-ধীরে তারা আমল থেকে দূরে থাকতে-থাকতে এক সময় একেবারেই আল্লাহবিমুখ হয়ে যায়। যেমন ব্রিটেনে ইংরেজি চাকুরিজীবিদের অবস্থা। তাদের নিয়ম হলো চাকুরিজীবিরা সপ্তাহে ছয়দিনই ব্যাংকে চাকুরি করবে এবং সপ্তাহে কেবল একদিন মন্দিরে বা মসজিদে ইবাদত করতে পারবে। (আমাদের দেশেও তেমনি সপ্তাহে কেবল শুক্রবার পুরো মসজিদ মুসল্লিদের মাধ্যমে টইটুম্বুর থাকে আর পরে এসব মুসল্লিদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতিটি বিধান সময় মতো পালন করার তাওফিক দান করুন।)
৩. আল্লাহ-র হুকুকগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা; যেমন সদকা, ফিতরা প্রভৃতি।
৪. হারাম কাজে ব্যয় না করা। তাহলেই ইনশাআল্লাহ ধৈর্যধারণ করা সহজ হয়ে যাবে।
📄 ধৈর্যধারণের আরো ক্ষেত্র
আর সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের দিকে একেবারেই নিমজ্জিত না হওয়া। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى.
"আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোকদেরকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে সব উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।”৬১
দুনিয়ার সম্পদ তোমাকে পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছে এজন্য যে, আসলেই কি তুমি এগুলোকে নিয়ামত মনে করো কিনা? নাকি অধৈর্য হয়ে সম্পদের প্রাচুর্যতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে মালিককে ভুলে যাও! আর পৃথিবিতে হাজারো কারুনের দল আছে, যারা অনেক সম্পদ অর্জন করেও তাতে ক্ষ্যান্ত থাকে না বরং আরো চাই, আরো চাই করে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ.
"অতঃপর কারুন জাঁকজমক সহকারে তার সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বলতে লাগলো, হায়! কারুন যা প্রাপ্ত হয়েছে আমাদেরকে যদি তা দেয়া হতো।"৬২
আর অনেক সাহাবায়ে কেরাম আছেন, যারা অর্জিত সম্পদকে আল্লাহ -র রাস্তায় ব্যয় করেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাদের কথা আল্লাহ ইরশাদ করেন-
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِ مِن مَّالٍ وَبَنِينَ. نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لَّا يَشْعُرُونَ.
"তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি। তাতে করে তাদেরকে দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। বরং তারা বোঝে না।"৬৩
টিকাঃ
৬১ সুরা ত্বোহা: ১৩১।
৬২ সুরা আল কাসাস: ৭৯।
৬৩ সুরা আল মুমিনুন: ৫৫-৫৬।