📄 ইবরাহীম ইবনে আমের আর-রুহায়লী
প্রশ্নঃ মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে অগণিত সংগঠন ও দলের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এমনকি সেখানে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা'আতের আক্বীদা পোষণকারীদের মধ্যেও বেশ কিছু সংগঠন রয়েছে। এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সংগঠন ও তার আমীর বা সভাপতির প্রতি অন্ধভক্তি ও গোঁড়ামী করে থাকে। প্রশ্ন হলো, এসমস্ত সংগঠনে যোগদানের হুকুম কি? এবং এসব দলাদলি থেকে বাঁচার উপায় কি?
উত্তরঃ কোনো সংগঠন, দল বা প্রতিষ্ঠানে যোগদান বা তার সাথে সংশ্লিষ্টতা ও সম্পৃক্ততা দুই প্রকারঃ
এক. সাধারণ সংশ্লিষ্টতা, যেমনঃ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো একটি দেশের সাথে সংশ্লিষ্টতা। এই প্রকার সংশ্লিষ্টতা স্বাভাবিক এবং বৈধ। কারণ এর উপর ভিত্তি করে 'অলা ও বারা' (মিত্রতা ও শত্রুতা) কিংবা গোঁড়ামী সৃষ্টি হয় না। বরং মানুষের বিভিন্ন বিষয়কে সুশৃংখলিত করার জন্য এসব সংশ্লিষ্টতার প্রয়োজন রয়েছে। তেমনিভাবে কোনো দেশে যদি নিয়ম থাকে যে, কোনো সংস্থার অধীনে ছাড়া একাকী দা'ওয়াতী কাজ করা যাবে না, তাহলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কোনো একটি সংস্থার অধীনে দা'ওয়াতী কাজে বাধা নেই। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে, এর উপর ভিত্তি করে যেন 'অলা ও বারা' না হয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এ সংস্থার অধীনে থাকবে, তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি এ সংস্থার বাইরে থাকবে, তার সাথে শত্রুতা পোষণ করবে। কারণ, প্রত্যেক দা'ঈকে এ সংস্থার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে এমনটি নয়। যে ব্যক্তি এর সাথে সম্পৃক্ত হতে চাইবে, সে সম্পৃক্ত হবে। পক্ষান্তরে, যে এর সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে মসজিদে দারস দিতে চায়, সে তা পারবে, তাতে কোনো বাধা নেই।
দুই. ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এরূপ বলা যে, এটিই আহলুস-সুন্নাহ্র সংগঠন; সুতরাং যে এই সংগঠনে আসবে, সে সুন্নী। আর যে এখানে আসবে না, সে বিরোধী এবং বিদ'আতী। সংগঠনের অবস্থা এরূপ হলে তাতে যোগ দেওয়া হারাম। কোনো সংগঠনের উপর ভিত্তি করে যদি 'অলা ও বারা' প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে কারো জন্য তাতে যোগ দেওয়া আদৌ বৈধ নয়, ঐ সংগঠনের প্রধান যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন।
আর অন্ধভক্তির ব্যাপারে বলব, অন্ধভক্তি শুধুমাত্র সংগঠনের সাথে নির্দিষ্ট নয়। কিছু মানুষ মনে করে, সংগঠন বন্ধ হয়ে গেলে অন্ধভক্তি বন্ধ হয়ে যাবে। এটি ভুল ধারণা। কারণ, সংগঠনের অন্ধভক্তি ও গোঁড়ামী ছাড়াও রয়েছে নির্দিষ্ট আলেমের বিষয়ে গোঁড়ামী, বইয়ের গোঁড়ামী, বংশের গোঁড়ামী ইত্যাদি। সুতরাং গোঁড়ামীর দোহায় দিয়ে কোনো বৈধ জিনিষকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। যাহোক, সকল প্রকারের গোঁড়ামী দূরীকরণের চেষ্টা করতে হবে।
পরিশেষে বলব, সুশৃঙ্খলভাবে দা'ওয়াতী কাজ করার স্বার্থে কেবল কোনো সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে এবং তার সাথে সম্পৃক্ত হতে কোনো বাধা নেই।
টিকাঃ
(58) শায়খ ইবরাহীম আর-রুহায়লী ১৩৮৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আক্বীদা বিভাগের অধ্যাপক এবং মসজিদে নববীতে নিয়মিত দারস প্রদান করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছেঃ ১. মাওক্কিফু আহলিস-সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ মিন আহলিল আহওয়া ওয়াল বিদ'আহ ২. আত-তাকফীর ওয়া যওয়াবিতুহু। তিনি ত্রিশটিরও অধিক বইয়ের ভাষ্যকর। যেমনঃ ১. শারহুল আক্বীদাহ আল- ওয়াসেতিইয়াহ ২. শারহুল আরবা'ঈন আন-নাবাবিইয়াহ ইত্যাদি।
(59) হিজরী ২৯/০৪/১৪৩৩ তারিখে মসজিদে নববীতে দারস্ প্রদানের সময় জনৈক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের জবাবে উপরোক্ত কথাগুলি বলেন।
📄 আবু মালেক আর-রেফায়ী আল-জুহানী
প্রশ্নঃ দা'ওয়াতী ক্ষেত্রে ইমারত গঠনের ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
উত্তরঃ দা'ওয়াতী ক্ষেত্রে ইমারত গঠন দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি। বরং সঠিক পদ্ধতি হলো, সুপরিচিত বিজ্ঞ আলেমগণ তাঁদের ছাত্রদের নিয়ে দা'ওয়াতী কাজ সম্পাদন করবেন। যেমনঃ ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, আলবানী, ইবনে বায, রবী আল- মাদখালী, আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ, মুক্ববিল আল-ওয়াদে'ঈ প্রমুখ আলেমগণ তাঁদের ছাত্রদেরকে যথারীতি দ্বীনী শিক্ষা দিয়েছেন এবং কেউ কেউ এখনও দিয়ে যাচ্ছেন। আর তাঁদের ছাত্রগণ সারা দুনিয়ায় দা'ওয়াত ছড়িয়ে দিয়েছেন। মূলতঃ এটিই হচ্ছে সালাফী দা'ওয়াত। আমি আবারও বলছি, ইমারত গঠন করে দা'ওয়াতী কাজ করা সুস্পষ্ট বিদ'আত।
টিকাঃ
(60) শায়খ আবু মালেক আল-জুহানী ১৩৯০ হিজরীতে ইয়ামবু শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়মবুর ওমর জামে মসজিদের ইমাম ও খত্বীব এবং সউদী ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত প্রসিদ্ধ দা'ঈ। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে ১. আস-সীরাহ আন-নাবাবিইয়াহ ২. আল-ক্বযা ওয়াল ক্বদার আলা যওয়ে মু'তাক্বাদে আহলিস-সুন্নাহ ওয়াল-আছার উল্লেখযোগ্য।
(61) শায়খের 'মা'আলিমুদ দা'ওয়াহ' ক্যাসেট থেকে সংগৃহীত।
📄 সা‘দ ইবনে আব্দুর রহমান আল-হুছাইন (রহঃ)
কোনো জামা'আত, দল বা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা অথবা মহান আল্লাহ আমাদেরকে যে নামে বিশেষিত করেছেন, সেটি বাদ দিয়ে ভিন্ন কোনো নামে নিজেদেরকে বিশেষিত করে 'জামা'আতুল মুসলিমীন' থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া অথবা কুরআন-হাদীছ ও ছাহাবায়ে কেরামের নীতির বাইরে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা আক্বীদা পোষণের মাধ্যমে নিজেদেরকে আলাদা করে ফেলা অথবা নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বা দলীয় আমীর নিযুক্ত করে তার হাতে বায়'আত করার অনুমতি যেমন পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের কোথাও নেই; তেমনি তা ছাহাবায়ে কেরামের জীবদ্দশাতেও কখনো ঘটেনি। আজ মুসলিমদের মধ্যে এরূপ ঘটার ফলে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে। ফলে সারা বিশ্বে তাদের যে শক্তি ও দাপট ছিল, তা তারা হারিয়ে ফেলেছে। আল্লাহ্র সন্তুষ্টির দোহাই দিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ সংগঠনের কর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে এবং তাদেরকে ভালবাসে। পক্ষান্তরে অন্য সংগঠনের কর্মীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে এবং তাদেরকে ঘৃণা করে। শুধু তাই নয়, একে অন্যের উপর মিথ্যা অপবাদ, গালিগালাজ, এমনকি হত্যা করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। তারা প্রত্যেকে নিজেদেরকে সাধু এবং অন্যদেরকে ভ্রান্ত বলে দাবি করছে। নিজেদের দলের জন্য খয়রাত সংগ্রহে লিপ্ত আছে, অথচ অন্যরা যাতে কিছুই না পায়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব দলাদলি ও বিভক্তির মধ্যে কিভাবে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হবে?!
টিকাঃ
(62) সা'দ ইবনে আব্দুর রহমান আল হুছাইন ১৩৫৪ হিজরীতে সউদী আরবের শুকরায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমেরিকার দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা বিভাগে মাস্টার ডিগ্রী অর্জন করেন। সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছেঃ ১. হাকিকাতুত দা'ওয়াহ ইলাল্লাহ ২. ফিকরো সাইয়েদ কুতুব বায়না রায়ায়নে ৩. তাছহীহুত তাশায়উ।
(63) সা'দ ইবনে আব্দুর রহমান আল হুছাইনঃ হাকিকাতুত দা'ওয়াহ ইলাল্লাহ, রিয়াদঃ দারুস সালাম লাইব্রেরী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪১৩ হিজরী, পৃষ্টাঃ ৭২- ৭৩।
📄 আবু উসামাহ সালীম ইবনে ঈদ আল-হেলালী
তিনি বলেন, এখনও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আল্লাহর পথে দা'ওয়াতের নামে গড়ে উঠা সংগঠনগুলি প্রত্যেকে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আছে, অন্যদের দিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনকি কোনো কোনো সংগঠনের লোকেরা নিজেদের সংগঠনকে 'জামা'আতুল মুসলিমীন' এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাকে 'ইমামুল মুসলিমীন' বলে দাবি করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। ফলে তার হাতে বায়'আত করাকে সকল মুসলিমদের উপর অপরিহার্য বলে মনে করে। কেউ কেউ মুসলিমদের সর্ববৃহৎ অংশকে (السواد الأعظم) কাফের বলে ফৎওয়া প্রদান করে। আবার কেউ কেউ নিজেদের দলকে মূল দল বলে আখ্যায়িত করে অন্যদেরকে এর পতাকা তলে সমবেত হওয়া অপরিহার্য বলে মনে করে।
মূলতঃ যেসব দল ইসলামের জন্য আজ কাজ করছে, তারা 'জামা'আতুল মুসলিমীন' নয়; বরং তারা 'জামা'আতুল মুসলিমীন'-এর একটি অংশ মাত্র। কেননা হাদীছে বর্ণিত 'জামা'আতুল মুসলিমীন' এবং তাদের ইমাম আজ নেই। হাদীছে 'জামা'আতুল মুসলিমীন' বলতে এমন জামা'আতকে বুঝানো হয়েছে, যার অধীনে সারা দুনিয়ার সকল মুসলিম সুসংগঠিত হবে এবং তাদের একজন ইমাম বা খলীফা হবেন, যিনি আল্লাহ্ হুকুম বাস্তবায়ন করবেন। এরকম খলীফা আসলে তার হাতে বায়'আত করা এবং তার অনুসরণ করা গোটা মুসলিম উম্মাহ্র জন্য অপরিহার্য হয়ে যাবে।
আর যেসব দল রাষ্ট্রীয় খেলাফত পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে, তাদের উচিত, নিজেদের মধ্যকার সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা, নির্ভেজাল তাওহীদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা এবং নিজেদের দোষ-ত্রুটির জন্য পরস্পর পরস্পরকে নছীহত করা। অনুরূপভাবে একজন সাধারণ মুসলিমের উচিৎ, এসব দলের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া।
ইসলামের হৃত গৌরব, শক্তি আর দাপট ফিরিয়ে আনার জন্য এসব দলের এক হয়ে যাওয়া উচিৎ। তাদের উচিৎ, কর্মীদেরকে হকমুখী করা এবং তাদের মধ্যে সকল মুসলিমকে ভালোবাসার মত মানসিকতা তৈরী করা। তা হলেই মুসলিমদের বিভক্তি ও দুর্বলতা লোপ পাবে এবং তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের সকল বাধা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।
অতএব, কোনো ব্যক্তি এসমস্ত সংগঠনের বাইরে থাকলে তাকে মুসলিম জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন বলা যাবে না। কেননা 'জামা'আতুল মুসলিমীন'-এর বৈশিষ্ট্য তাদের কারোর মধ্যেই নেই এবং এসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের নিজেদেরকে 'ইমাম' বলে দাবি করার যোগ্যতাও নেই।
টিকাঃ
(64) শায়খ আবু উসামাহ আল-হেলালী ১৩৭৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ধার্মিক ও দ্বীনদার পরিবারে তিনি বড় হন। সিরিয়া, পাকিস্তান এবং সউদী আরবে পড়াশুনা করেন এই খ্যাতিমান আলেম। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে রয়েছেনঃ আলবানী, হাম্মাদ আল-আনছারী, বাদীউদ্দীন আর-রাশেদী। শায়খ আলবানী, মুক্ববিল আল-ওয়াদেঈ, রবী আল-মাদখালী তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছেঃ ১. যুবদাতুল আফহাম বিফাওয়াইদি উমদাতিল আহকাম ২. আল-বিদ'আহ ওয়া আছারুহাস সাইয়্যে ফিল উম্মাহ, ৩. মাউসূ'আতুল-মানাহি আশ-শার'ইয়্যাহ ফী ছহীহিস-সুন্নাহ আন-নাবাবিইয়াহ।
(65) আবু উসামাহ সালীম আল-হেলালী, আল-জামা'আত আল-ইসলামিইয়াহ ফি যওইল কিতাবে ওয়াস-সুন্নাহ (তৃতীয় প্রকাশ: ১৪১৭/১৯৯৭) পৃ: ৩৮৪-৩৮৫; আবু উসামাহ সালীম আল-হেলালী, লিমাযা ইত্তারতুল-মানহাজ আস-সালাফী? (দারু ইবনিল ক্বাইয়িম, দ্বিতীয় প্রকাশ: ১৪৩০/২০০৯), পৃ: ১১৪-১১৫।