📘 দল সংগঠন বায়াত সম্পর্কে আলেমদের অভিমত 📄 ছালেহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান

📄 ছালেহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান


মুহতারাম শায়খ বলেন, আল্লাহ্র রাস্তায় দা'ওয়াত দেওয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ﴾ [النحل: ১২৫]

'আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে দা'ওয়াত দিন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে' (আন-নাহল ১২৫)।

তবে মুসলিমদের পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং অন্যকে হক মনে না করে শুধুমাত্র নিজেকে হক মনে করা দা'ওয়াতের কোনো পদ্ধতি ও মূলনীতি হতে পারে না। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন দলের বাস্তব চিত্র তা-ই। যাহোক, যে মুসলিমের জ্ঞান ও সামর্থ্য আছে, তার উপর কর্তব্য হচ্ছে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান সহকারে মানুষকে আল্লাহ্র পথে ডাকা এবং অন্যদেরকে সহযোগিতা করা। তবে যেন এমন না হয় যে, প্রত্যেকটি জামা'আতের নিজেদের জন্য আলাদা নিয়মনীতি নির্দিষ্ট করে নেয়, যা অন্য জামা'আতের বিরোধী। বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ্র জন্য উচিত একটিমাত্র নিয়মনীতি থাকা, সবাই পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং একে অন্যের সাথে পরামর্শ করে চলা। বিভিন্ন দল এবং ভিন্ন ভিন্ন পথ ও মত সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এগুলি মুসলিম ঐক্য ধ্বংস করে এবং মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে, যেমনটি মুসলিম ও অমুসলিম দেশে বিভিন্ন দলের মধ্যে আজ এই বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুতরাং দা'ওয়াতী ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করার কোনো প্রয়োজনই নেই; বরং এক্ষেত্রে যরূরী বিষয় হচ্ছে, যার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আছে, সে একাকী হলেও মানুষকে আল্লাহ্ পথে দা'ওয়াত দিবে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে থাকলেও দাঈদের দা'ওয়াতী মূলনীতি এক এবং হকের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

টিকাঃ
(২৮) নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে ১১/১২/২০১২ তারিখ দুপুর ১৮:৪৪ টায় সংগৃহীত: http://www.ahlelhadith.com/vb/showthread.php?t=6786

📘 দল সংগঠন বায়াত সম্পর্কে আলেমদের অভিমত 📄 বকর আবু যায়েদ (রহঃ)

📄 বকর আবু যায়েদ (রহঃ)


তিনি বায়'আত সম্পর্কে বলেন, 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' কর্তৃক মনোনীত মুসলিম সরকারের বায়'আত ছাড়া ইসলামে দ্বিতীয় কোনো বায়'আত নেই। আজ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলে যেসব বায়'আত দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন ও হাদীছে এগুলির ভিত্তি থাকা তো দূরের কথা, এমনকি কোনো ছাহাবী বা তাবে'ঈর আমল থেকেও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ মিলে না। সুতরাং এগুলির সবই বিদ'আতী বায়'আত আর প্রত্যেকটি বিদ'আতই পথভ্রষ্ট।

যেসব বায়'আতের শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই, সেগুলো ভঙ্গ করলে কোনো দোষ নেই; বরং সেসব বায়'আত সম্পন্ন হলেই পাপ হবে। কেননা এসব বায়'আতের একদিকে যেমন শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই, অন্যদিকে তেমনি সেগুলোর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে বিভক্তি ও দলাদলির সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। উপরন্তু একজনকে আরেক জনের উপর ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। অতএব, বায়'আত, শপথ, চুক্তি বা অন্য যে নামই দেওয়া হোক না কেন এসব বায়'আত শরী'আতের গণ্ডির বাইরে।

তিনি অন্যত্র বলেন, দল বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, একই দেশে অনেকগুলি দল পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলির অন্তরালে রয়েছে অসংখ্য বায়'আত, চুক্তি আর শপথ। প্রত্যেকটি দল অন্যদের তোয়াক্কা না করে তার নিজস্ব মতবাদের দিকে আহ্বান করছে। সে কারণে তাদের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষিত মুসলিম জামা'আতের শাশ্বত মূলনীতি 'আমি এবং আমার ছাহাবীরা যে পথে আছে' বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ আজ বিভিন্ন বায়'আতের খপ্পরে পড়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যুবকেরা আজ গোলক-ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছে যে, কোন্ দলে তারা যোগ দিবে, কোন্ সংগঠন প্রধানের হাতেইবা বায়'আত করবে?! কারণ বায়'আত এমন শপথ ও অঙ্গীকার, যা 'অলা ও বারা' অর্থাৎ শত্রুতা ও মিত্রতা পোষণ অবধারিত করে।

তিনি অন্যত্র বলেন, ইসলামে কোনো প্রকার যোজন বা বিয়োজন ঘটিয়ে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো নামে বা রসম-রেওয়াজে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে নির্দিষ্ট কোনো দলের অধীনে থেকে অন্যদেরকে বাদ দিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলাও বৈধ নয়। সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো পদ্ধতিতে 'জামা'আতুল মুসলিমীন'-এর সাথে থাকতে হবে। অতএব, আল্লাহ্ কিছু নির্দেশনা বাদ দিয়ে কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, অন্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজ দলের সমর্থকদের সাথে মিত্রতা পোষণের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, কোনো দেশের অধিবাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূলনীতি তথা আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পূর্ণ বা আংশিক বিরোধিতায় ভিন্ন কোনো নামে কোনো দল গড়ে উঠলে এগুলি হারাম বলে বিবেচিত হবে।

আল্লামা বকর আবু যায়েদ দলাদলির অনেকগুলি লক্ষণ এবং ক্ষতির দিক উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর কয়েকটি নীচে তুলে ধরা হলোঃ

- বিভিন্ন ইসলামী দলকে বাহ্যতঃ দা'ওয়াতী সুসংগঠিত মাধ্যম মনে হলেও বেশীর ক্ষেত্রে সেগুলো মুসলিম উম্মাহ্র দেহে অদ্ভুত এক আকৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সবার ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে, রয়েছে দ্বীনী কার্যক্রমের নির্দিষ্ট কেন্দ্র, যেসব কেন্দ্র অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৎওয়া জারী করছে। অন্যদিকে এসব দল কখনো কখনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা জোরদারেরও চেষ্টা করছে। এছাড়া সম্পদ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ক্ষমতার মসনদ দখলের বিষয়টিতো রয়েছেই।
- দলাদলি করলে ইসলামকে নির্দিষ্ট একটি পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দলের লোকজন শুধুমাত্র দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই ইসলামকে দেখে। আর যে কোনো দল নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট নেতৃত্ব এবং নির্দিষ্ট মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেকারণে যে কোনো দল সাধারণত নবুঅতী আলোর খুব সামান্য পরিমাণই ধারণ করে থাকে।
- যে কোনো দল নিজেকে নির্দিষ্ট কোড, সংকীর্ণ নাম ও উপনামের মধ্যে বন্দী করে ফেলে। ফলে সে নির্দিষ্ট প্রতীক নিয়ে সবার চেয়ে ব্যতিক্রম থাকতে চায়। সেকারণে সে নীচের আয়াতে কারীমায় বর্ণিত ব্যাপক অর্থ বোঝক নাম থেকে বঞ্চিত হয় (هُوَ سَمَّلَكُمُ الْمُسْلِمِينَ) [الْحج:৭৮] 'তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম' (আল-হাজ্জ ৭৮)।
- দলাদলি দলের অভিমতের প্রতি আত্মসমর্পণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত অভিমত প্রচার-প্রসারে ব্রতী হয়। পাশাপাশি দলাদলি দলের সমালোচনার পথ বন্ধ করে দেয়। এই কঠিন বাস্তবতা ইসলামী দা'ওয়াতের পরিপন্থী।
- দলাদলিতে নেতৃত্ব দলীয় চিন্তা-চেতনা, কর্মপদ্ধতি এবং মূলনীতির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে দলাদলি দলীয় লোকজনকে মূল লক্ষ্য দা'ওয়াতী কার্যক্রমের সৈনিক না বানিয়ে নেতৃত্বের সৈনিক বানায়। সেকারণে দলাদলি ব্যক্তির সেবা করে, দা'ওয়াতের নয়।
- বিভিন্ন দল আল্লাহ্র রাস্তায় দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বেড়ী পরে ফেলে। সেকারণে দ্বীনের দা'ওয়াত দিতে গিয়ে দা'ঈকে দলীয় কার্ড বহন করতে হয়। দলীয় কার্ড না থাকলে অন্ততঃ তাকে দলের সদস্য হতে হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পদ্ধতি অনুযায়ী আল্লাহ্ পথের দা'ঈ হওয়ার জন্য ইসলাম দা'ঈকে দুই কালিমার সাক্ষ্য প্রদান এবং ইসলাম প্রচারকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলাদলির গণ্ডিতে প্রবেশের কোনো শর্তই ইসলাম আরোপ করেনি; বরং সকল দলাদলির ঊর্ধ্বে থাকতে বলা হয়েছে।
- দলাদলি মুসলিম উম্মাহ্র যুবকদের অন্তরে দলীয় চিন্তাধারা এবং আল্লাহ্ পথে দা'ওয়াতের মধ্যকার সুদৃঢ় সম্পর্কের অবান্তর চিন্তার বীজ বপন করেছে। অর্থাৎ দল ছাড়া দা'ওয়াতী কার্যক্রম সম্ভব নয় মর্মে একটি বিশ্বাস তাদের অন্তরে সৃষ্টি করেছে।

এক্ষণে একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, যার কোনো জবাব নেই; প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন মুসলিম কোন্ দলে যোগ দিবে? এখানে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত তরীকায় এবং ইসলামের ব্যাপক অর্থ বোধক পদ্ধতিতে আল্লাহর পথে দা'ওয়াত দেওয়া কি বেশী ভাল নাকি দলীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে দলের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দা'ওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা বেশী উত্তম?

টিকাঃ
(২৯) শায়খ বকর আবু যায়েদ ১৩৬৫ হিজরীতে নাজদ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। রিয়াদ, মক্কা ও মদীনায় তিনি শিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে শায়খ ইবনে বায, শায়খ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি মদীনার উচ্চ বিচারালয়ের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং মসজিদে নববীর শিক্ষক, ইমাম ও খত্নীবের দায়িত্ব পান। ১৪১২ হিজরীতে সউদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ এবং ফৎওয়া বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন।
(৩০) 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' পরিভাষাটি তিন শ্রেণীর মানুষকে শামিল করেঃ উলামায়ে কেরাম, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
(৩১) আব্দুল্লাহ আত-তামীমী, মুহাযযাবু হুকমিল ইনতিমা ইলাল ফিরাক্ক ওয়াল আহযাব ওয়াল জামা'আত আল-ইসলামিইয়াহ, পৃ: ৯৭ (মূল গ্রন্থটি শায়খ বকর আবু যায়েদের)।
(৩২) প্রাগুক্ত, পৃ: ৯৬।
(৩৩) এখানে 'জামা'আতুল মুসলিমীন' বলতে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের পথের যথাযথ অনুসারীদেরকে বুঝানো হয়েছে।
(৩৪) প্রাগুক্ত, পৃ: ৪০-৪১।
(৩৫) প্রাগুক্ত, পৃ: ৮০-৮৭।

📘 দল সংগঠন বায়াত সম্পর্কে আলেমদের অভিমত 📄 মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেই (রহঃ)

📄 মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেই (রহঃ)


প্রশ্ন: দিনে দিনে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা কর্ম পদ্ধতি, দা'ওয়াতী মূলনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরস্পরে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী। আর হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হক জামা'আত হবে একটিই। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দল ও সংগঠনের হুকুম কি?

উত্তর: এসব দল ও সংগঠনের ব্যাপারে শরীআতের হুকুম হচ্ছে, এগুলি হারাম এবং বিদ'আত। সেজন্য এগুলি থেকে দূরে থেকে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে দা'ওয়াত দেওয়া একজন মুসলিমের কর্তব্য। তবে কেউ যেন কিছুতেই ধারণা না করে যে, আমরা কোনো মুসলিমকে ইসলামের জন্য একাকী কাজ করতে বলছি; বরং আমরা একজন মুসলিমকে আরব-অনারব, সাদা-কালো সকল মুসলিমের সাথে কাজ করতে বলছি। কারণ দলবদ্ধভাবে কাজ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ﴾ [المائدة: ২]

'সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না' (আল- মায়েদাহ ২)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পারস্পরিক ভালবাসা, দয়ার্দ্রতা এবং সহানুভূতিশীলতার ক্ষেত্রে গোটা মুমিন সম্প্রদায় একটি দেহের মত। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে তার জন্য পুরো দেহ ব্যথা অনুভব করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, 'আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ' যদি তাদের দা'ওয়াতী দায়িত্ব যথারীতি পালন করে, তাহলে এতসব দলাদলি পানিতে লবণ গলে যাওয়ার মত গলে যাবে। কেননা এসব দলাদলি ধোঁকার উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রশ্ন: দা'ওয়াতের মহান উদ্দেশ্যে মুক্বীম অবস্থায় কাউকে ‘আমীর’ বানানোর ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

উত্তর: মুক্বীম অবস্থায় মুসলিম খলীফা বা তাঁর নিযুক্ত আমীর ও গভর্ণর ছাড়া অন্য কাউকে আমীর বানানো প্রমাণিত নয়। কিন্তু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে খেলা শুরু হয়ে গেছে; ফলে তিন জনের একটি গ্রুপ থাকলে তাদেরও একজন ‘আমীরুল মুমিনীন’ সেজে বসে থাকছে। নিঃসন্দেহে এটি বিদ'আত, যা মুসলিম ঐক্যকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

প্রশ্ন: বর্তমান যুব সমাজে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে, তারা বলছে, কেউ কেউ বায়'আতকে বৈধ মনে করে, আবার কেউ কেউ বৈধ মনে করে না। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্চে, বায়'আত কি? বায়'আতের শর্ত কি? আমাদের কি কারো হাতে বায়'আত গ্রহণ যরূরী?

উত্তর: কুরাইশ বংশের কোনো ব্যক্তিকে 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' নির্বাচন করলে অথবা তিনি নিজে খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার হাতে বায়'আত করা ওয়াজিব। কুরাইশ বংশের বাইরে যদি কেউ খলীফা হয়ে জনগণের কাছ থেকে বায়'আত তলব করে, তাহলে তার হাতেও বায়'আত করতে হবে। তবে যেসব দল ও সংগঠন মুসলিমদেরকে বিভক্ত করেছে, তাদের ঐক্য ও শক্তি বিনষ্ট করেছে, তাদের বায়'আত গ্রহণতো দূরের কথা, বরং তাদের এই দলাদলির বিরোধিতা করতে হবে। আমরা আগেই বলেছি, মুসলিমদেরকে দলে দলে বিভক্ত করে ফেলা বর্তমান সময়ের একটি নিকৃষ্ট বিদ'আত। সেকারণে তাদের বায়'আতও বিদ'আত।

যদি কেউ প্রশ্ন করে, নিম্নোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বায়'আতের প্রশংসা করেছেন:

﴿إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ﴾ [الفتح: ১০]

'যারা আপনার কাছে বায়'আত করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই বায়'আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর' (আল-ফাতহ ১০), তাহলে আপনারা কিভাবে বায়'আতকে বিদ'আত বলছেন?

জবাবে বলব, উক্ত আয়াতে উল্লেখিত বায়'আত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কুরাইশ বংশের খলীফার জন্য নির্দিষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার কাঁধে বায়'আত না থাকা অবস্থায় মারা যাবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু'। উক্ত হাদীছে উল্লেখিত বায়'আতও কুরাইশ বংশের খলীফা বা ক্ষমতায় চলে আসা অন্য যে কোনো খলীফার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ অন্য বংশের কেউ ক্ষমতায় চলে আসলে যদি তার বায়'আত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে মুসলিমদের রক্তের হেফাযত সম্ভব হবে না। অতএব, যে ব্যক্তি মানুষকে এসব বায়'আতের দা'ওয়াত দেয়, তার বিরোধিতা করতে হবে; যে বায়'আত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, তার বিরোধিতা নয়।

যদি কেউ বলে, নিম্নোক্ত হাদীছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়'আতের কথা বলেছেন, 'যখন তিন জন সফরে বের হবে, তখন তারা তাদের একজনকে আমীর বানাবে'। জবাব হচ্ছে, এই বায়'আত সফর অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট। ...সেকারণে বিভিন্ন জামা'আতের আমীরদের বায়'আত বর্তমান যুগের একটি অন্যতম বিদ'আত। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে যখন প্রহার করা হয়েছিল, বিখ্যাত ছাহাবী আনাস ইবনে মালেককে যখন হাজ্জাজ অপমান করতে চেয়েছিল, ইমাম মালেককে যখন প্রহার করা হয়েছিল, ইমাম শাফেঈকে যখন লোহার বেড়ী পরিয়ে হাযির করা হয়েছিল, ইমাম বুখারীকে যখন নিশাপুর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন বায়'আত কোথায় ছিল? এভাবে আমাদের মুসলিম উম্মাহ্র স্বনামধন্য বহু আলেমে দ্বীনকে প্রহার করা হয়েছিল, তাদেরকে জেল-যুলম ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাদেরকে নানাভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এতসত্ত্বেও তারা মানুষকে বায়'আতের দা'ওয়াত দেননি। অতএব, এসব বায়'আত বর্তমান যুগের বিদ'আত ছাড়া আর কিছুই নয়।

টিকাঃ
(৩৬) শায়খ মুক্ববিল ইয়েমেনের দাম্মাজ নগরীর ওয়াদেআহ এলাকায় ১৩৫০ হিজরীর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়েমেন, নাজদ, মক্কা ও মদীনায় শিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ইয়েমেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অন্যতম।
(৩৭) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, কন্ট্রল মু'আনেদ ওয়া যারুল হাক্বেদিল হাসেদ, পৃ: ৩৫৫-৩৮৪ (দারুল হাদীছ, দাম্মাজ, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৩/১৯৯৩)।
(৩৮) প্রাগুক্ত, পৃ: ৫২৯-৫৩২।
(৩৯) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, ফাযায়েহ ওয়া নাছায়েহ্, পৃ: ৬৭-৬৯ (দারুল হারামাইন, কায়রো, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৯/১৯৯৯)।

📘 দল সংগঠন বায়াত সম্পর্কে আলেমদের অভিমত 📄 আদনান ইবনে মুহাম্মাদ আল-আরঊর

📄 আদনান ইবনে মুহাম্মাদ আল-আরঊর


বৈধ ঐক্যবদ্ধতা এবং নিষিদ্ধ দলাদলির মধ্যে পার্থক্য: যেহেতু পারস্পরিক সহযোগিতা শরী'আতে বৈধ; বরং ওয়াজিব। আর পারস্পরিক এই সহযোগিতার জন্য কখনো কখনো দলবদ্ধ হওয়ার এবং দলবদ্ধ লোকগুলিকে পরিচালনার প্রয়োজন পড়ে, সেহেতু এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেছে। ফলে তারা বৈধ ঐক্যবদ্ধতা এবং নিষিদ্ধ দলাদলিকে একাকার করে ফেলেছে। তারা নিষিদ্ধ দলাদলির বৈধতা প্রমাণ করতে গিয়ে বৈধ ঐক্যবদ্ধতার পক্ষের দলীলগুলিকে পেশ করেছে। যেমন: মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ ﴾ [التوبة: ১২২]

'তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং ফিরে এসে নিজ কওমকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য কেন বের হলো না, যাতে তারা (আল্লাহর আযাব থেকে) বেঁচে থাকতে পারে' (আত-তাওবাহ ১২২)। তিনি অন্যত্র বলেন,

﴿ وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ﴾ [ال عمران: ১০৪]

'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিৎ, যারা কল্যাণের পথে মানুষকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে' (আলে ইমরান ১০৪)।

বস্তুত এসব দলীল কস্মিনকালেও দলাদলি বৈধ করে না; বরং সৎকাজ ও কল্যাণের ব্যাপারে দলবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি প্রমাণ করে। মনে রাখতে হবে, নতুন নতুন দল ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা, যেগুলির রয়েছে বিশেষ নিয়ম-শৃংখলা, বিশেষ সভা-সম্মেলন এবং নিজস্ব নানান সব সিদ্ধান্ত আর তাদের ও অন্য মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধকতার নানা দেওয়াল; সেগুলোর মধ্যে এবং সৎকাজের ব্যাপারে সংঘবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে ঢের তফাৎ। কারণ বৈধ ঐক্যবদ্ধতা বিশেষ কোনো নিয়ম-শৃংখলার মাধ্যমে অন্যান্য মুসলিম থেকে আলাদা হয়ে যায় না এবং 'জামা'আতুল মুসলিমীন' ও তাদের মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। নীচে বৈধ ঐক্যবদ্ধতা এবং নিষিদ্ধ দলাদলির মধ্যে কতিপয় পার্থক্য তুলে ধরা হলোঃ

প্রথম পার্থক্য: বৈধ ঐক্যবদ্ধতার পক্ষের লোকজনের মৌলিক বিষয় হচ্ছে দলীল, যে কোনো বিষয়ে সবকিছুর উপর দলীলটাই তাদের কাছে প্রাধান্য পায়। পক্ষান্তরে, নিষিদ্ধ দলাদলির ক্ষেত্রে দল বা দলপ্রধানের অন্ধভক্তিই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এসব দলের লোকজনদের নিকট শর'ঈ দলীল এবং দল ও দলপ্রধানের নির্দেশনা একাকার হয়ে যায়। সেজন্য দলীয় নির্দেশনা বিনষ্ট এবং দলপ্রধানের গোঁমর ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা অনেক ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্ বক্তব্য এবং সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি প্রত্যাখ্যান করে চলে।

দ্বিতীয় পার্থক্য: বৈধ ঐক্যবদ্ধতা শরী'আতের মূলনীতির নিরীখে গোটা মুমিন সম্প্রদায়ের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এই ঐক্যবদ্ধতা মুমিনদের মাঝে কোনো প্রকার বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে না। পক্ষান্তরে, অন্যান্য মুমিনদের বাদ দিয়ে দলাদলির লোকদের নিজেদের মধ্যে এক বিশেষ সম্প্রীতি গড়ে উঠে। শুধু তাই নয়; বরং তারা দলাদলিকেই আন্তরিকতা সৃষ্টি এবং শত্রুতা পোষণের মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করে। সেজন্য তাদের নিকটে মুমিনরা পরস্পরে মিত্র না হয়ে দলের লোকজন হয় পরস্পরের মিত্র।

তৃতীয় পার্থক্য: বৈধ ঐক্যবদ্ধতার কারণে তাদের মধ্যে এবং অন্যান্য মুসলিমদের মধ্যে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতার দেওয়াল রচিত হয় না; বরং এই ঐক্যবদ্ধতার মহান উদ্দেশ্যই হচ্ছে সুবিন্যস্তভাবে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পক্ষান্তরে, নিষিদ্ধ দলাদলির ক্ষেত্রে দলের লোকজনদের মধ্যে এবং অন্যান্য মুসলিমদের মধ্যে রচিত হয় পার্থক্যের দেওয়াল ও সীমারেখা। সেজন্য তাদের সাথে কাজ করতে চাইলে অনুমতি ছাড়া সম্ভব হয় না। আবার তাদের দল থেকে বের হয়ে আসতে চাইলেও অনুমতি নিতে হয়, অন্যথায় বহিষ্কৃত হয়ে চলে আসতে হয়।

চতুর্থ পার্থক্য: বৈধ ঐক্যবদ্ধতা নির্দিষ্ট যরূরী কোনো প্রয়োজনের তাকীদে হয়ে থাকে। যেমন: মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ, কূপ খনন, মুসলিমদের বিশেষ তত্ত্বাবধান ইত্যাদি। পক্ষান্তরে, নিষিদ্ধ দলাদলির ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজের দলকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মনে করে। সে আরো মনে করে, তার দল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং মুখাপেক্ষীহীন।

পঞ্চম পার্থক্য: মুসলিমদের বিশেষ কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতাস্বরূপ বৈধ ঐক্যবদ্ধতা হয়ে থাকে। সেজন্য এই ঐক্যবদ্ধ লোকগুলি পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হয়ে থাকে। তারা একে অন্যকে সাহায্য করে এবং একে অন্যের দ্বারা শক্তি সঞ্চার করে; ঠিক যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মুমিনরা নির্মিত ভবনের মত, যার একাংশ অন্য অংশের সাথে শক্তভাবে গাঁথা'। পক্ষান্তরে দলাদলির লোকেরা পরস্পর সহযোগী না হয়ে বিবদমান হয়, সহানুভূতিশীল না হয়ে হানাহানিতে মত্ত থাকে। 'এসব দল যেন পরস্পর সতীনের মত'।

ষষ্ঠ পার্থক্য: বৈধ ঐক্যবদ্ধতার লোকগুলি অন্যদের বাদ দিয়ে তাদের নিজেদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য আছে বলে মনে করে না; বরং তারা মুসলিম উম্মাহ্রই অংশ এবং মুসলিম উম্মাহ্র খেদমতেই নিয়োজিত। পক্ষান্তরে, দলীয় লোকেরা অন্যদের বাদ দিয়ে শুধু নিজেদেরকে উম্মত মনে করে। কোনো কোন দলের লোকেরা নিজেদেরকে মুসলিম উম্মাহ মনে না করে মুসলিমদের একটি জামা'আত মনে করলেও তারা নিজেদেরকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ভাবে। তবে যেসব দলের লোকেরা নিজেদেরকে মুসলিম উম্মাহ মনে করে, তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্ট এবং তাদের এহেন বিশ্বাস ভয়ানক বিপদই বটে।

সপ্তম পার্থক্য: সর্বদা বৈধ ঐক্যবদ্ধতার লোকজনদের প্রত্যাবর্তনস্থল হয় কুরআন-সুন্নাহ, সালাফে ছালেহীনের সরল পথ হয় তাদের পথ এবং শরী'আতের বিজ্ঞ আলেমগণ যেখানকারই হোক না কেন তাঁরাই হন তাদের নেতা। পক্ষান্তরে, নিষিদ্ধ দলাদলির লোকদের ক্ষেত্রে দলাদলিই হয় তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল এবং দলের নেতারাই হয় তাদের নেতা।

মোদ্দাকথা: বৈধ ঐক্যবদ্ধতা মুসলিমদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং একতা বৃদ্ধি করে। ফলে তারা মুসলিম উম্মাহ্র খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ দলাদলি মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে বিভক্তি, অন্ধভক্তি, হানাহানি, দুর্বলতা এবং ব্যর্থতা বৃদ্ধি করে। কারণ তারা মুসলিমদের কাতারে বিভিন্ন দলের জন্ম দেয়। প্রত্যেকটি দল নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান করে, নিজের যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করে।

তিনি শপথ, চুক্তি ও অঙ্গীকার সম্পর্কে বলেন, ...রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইসলামে নতুন কোনো চুক্তি নেই। জাহেলী যুগের ভাল চুক্তিগুলিকে ইসলাম আরো সুদৃঢ় করেছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৯)। উক্ত হাদীছে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কতিপয় শর্তের উপরে অন্যদেরকে বাদ দিয়ে সংঘবদ্ধ হওয়াকে চুক্তি (হিল্ল্ফ) বলা হয়েছে। এসব চুক্তি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে চুক্তিতে অংশগ্রহণকারীদের কল্যাণ বয়ে আনে। জাহেলী যুগে দেখা যেত, কিছু লোক অন্যদেরকে বাদ দিয়ে নিজেরা একত্রিত হত এবং অত্যাচারিত ও অসহায়কে সাহায্যের জন্য শপথ ও চুক্তি করত। যেমন: হিলফুল ফুযূল। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম এসব চুক্তি হারাম করে।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, ভালকাজের একটি চুক্তিকে ইসলাম কিভাবে হারাম করতে পারে?! এর জবাব হাদীছের দ্বিতীয়াংশে বলে দেওয়া হয়েছে, 'জাহেলী যুগের ভাল চুক্তিগুলিকে ইসলাম আরো সুদৃঢ় করেছে'। অর্থাৎ জাহেলী যুগে যেসব ভাল চুক্তি ছিল, ইসলাম সেগুলোর চেয়েও উত্তম জিনিস নিয়ে এসেছে। তা হচ্ছে, গোটা মুসলিম উম্মাহ যেহেতু ইসলামী ভ্রাতৃত্বের মহান চুক্তির সদস্য, সেহেতু সেখানে ডানে-বামে, গোপনে বা প্রকাশ্যে আর কোনো চুক্তির আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা অন্যান্য সব চুক্তি মুসলিম উম্মাহকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে এবং তাদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে। দ্বিতীয়তঃ যেহেতু মুমিন সম্প্রদায় সবাই ইসলামের রশি ধরে কল্যাণের পথে একটিমাত্র চুক্তিতে একটিমাত্র উম্মতে পরিণত হয়েছে, সেহেতু এখানে অন্য কোনো চুক্তির প্রয়োজন আছে কি?! অতএব, যে ব্যক্তি অন্যান্য চুক্তির আহ্বান জানাবে -যদিও তা কল্যাণের উপর হয়, সে মুসিলম উম্মাহকে বিভক্ত করে ফেলবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ * فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ زُبُراً كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ ﴾ [المؤمنون: ৫২, ৫৩]

'তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের; একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা আমাকেই ভয় কর। অতঃপর মানুষ তাদের বিষয়কে বহুধা বিভক্ত করে দিয়েছে। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত হচ্ছে'। (আল- মুমিনূন ৫২-৫৩)

টিকাঃ
(৪০) শায়খ আদনান সিরিয়ার হামা নগরীতে ১৩৬৮ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। সিরিয়ার বড় বড় আলেমগণের মধ্যে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
(৪১) নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে ১০/১২/২০১২ তারিখ সকাল ১১:১৬ টায় সংগৃহীত: http://majles.alukah.net/showthread.php?50510
(৪২) নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে ১০/১২/২০১২ তারিখ সকাল ১১:১৬ টায় সংগৃহীত: http://majles.alukah.net/showthread.php?50510

ফন্ট সাইজ
15px
17px