📄 মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ)
প্রশ্ন: সূদানে অনেকগুলি দল আছে, যেগুলির কোনো কোনো দল একজন করে দলীয় 'আমীর' নির্ধারণ করে এবং তাঁর অনুসরণ অপরিহার্য গণ্য করে। এই ইমারতের হুকুম কি? উল্লেখ্য যে, তারা এই ইমারতকে সফর অবস্থার ইমারতের উপর কিয়াস করে।
উত্তর: সফরের ইমারতের দলীল পাওয়া যায়। কিন্তু মুক্বীম অবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক মানুষের আমীর নির্বাচনের প্রমাণে কোনো দলীল পাওয়া যায় না; বরং এই ইমারত মুসলিমদের দলাদলি ও বিভক্তি অবধারিত করে দেয়। মুসলিমদের উচিৎ, সবাই এক হয়ে যাওয়া। প্রত্যেক দলের ভিন্ন ভিন্ন আমীর নিম্নোক্ত আয়াতটির পরিপন্থী:
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَتَفَرَّقُوا ﴾ [آল عمران: ১০৩]
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না' (আলে ইমরান ১০৩)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি তার আমীরের পক্ষ থেকে অপছন্দনীয় কিছু পাবে, সে ধৈর্য্য ধারণ করবে। কেননা যে ব্যক্তি জামা'আত থেকে সামান্য পরিমাণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু’। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, হাদীছে রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে মিলেঝুলে থাকলে গোটা জাতি একক জাতিতে পরিণত হতে পারবে। পক্ষান্তরে জাতি যদি রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে বিরোধ করে প্রত্যেকটি দল পৃথক পৃথক অনুসরণীয় নেতা বানিয়ে নেয়, তাহলে জাতি বিভক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং যারা একজনকে আমীর বানিয়ে তার হাতে বায়'আত করে তার অনুসরণ করে চলে, তাদের একাজ মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়। শুধু তাই নয়; বরং তাদের একাজ এক দিক বিবেচনায় যেমন বিদ'আত, তেমনি অন্যদিক বিবেচনায় তা সরকারের বিরোধিতার শামিল। তবে সফর অবস্থায় আমীর নির্বাচনের বিষয়টি ভিন্ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যখন তিনজন সফরে বের হবে, তখন তারা তাদের একজনকে আমীর বানাবে'। হাদীছটিতে ইমারত বলতে বিশেষ ইমারতের কথা বলা হয়েছে।...
আমি আবারও বলছি, মুক্বীম অবস্থায় আমীর হিসাবে কারো বায়'আত গ্রহণ করে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের মত তার অনুসরণ করা বিদ'আত।
প্রশ্ন: ইসলামে জামা'আতের গুরুত্ব কতটুকু? কোনো মুসলিমের নির্দিষ্ট কোনো জামা'আতে যোগদান করা কি শর্ত?
উত্তর: ইসলামে জামা'আত হচ্ছে দ্বীনের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জামা'আত সম্পর্কে বলেন, 'আমার উম্মতের একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী থাকবে। তাদের বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি কিয়ামত এসে যাবে, তবুও তারা ঐরূপই থাকবে'। হাদীছটিতে উল্লেখিত এই জামা'আতের সাথেই সবার থাকা উচিৎ। তবে দলাদলির জামা'আত, যে হক বা বাতিলের তোয়াক্কা না করে যে কোনো মূল্যে নিজের মতামতের বিজয় কামনা করে, সেই জামা'আতে যোগদান করা জায়েয নয়। কেননা এই ধরনের দলে যোগ দেওয়া মুসলিম জামা'আত থেকে বের হয়ে দলাদলিতে যোগ দেওয়ার শামিল। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُواْ شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ ﴾ [الانعام: ১৫৯]
'নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহ তা'আয়ালার নিকট সমর্পিত' (আল-আন'আম ১৫৯)। তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِى إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ﴾ [الشূরা: ১৩]
'তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না' (আশ-শূরা ১৩)। তিনি অন্যত্র আরো বলেন,
﴿ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُوْلَابِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [আলে ইমরান ১০৫]
'আর তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পরও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বিরোধ করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি' (আলে ইমরান ১০৫)।
একটি কথা বলা ভাল, ইসলামী দলগুলি যদি সত্যিকার অর্থে ইসলামের বিজয় চায়, তাহলে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন না হয়ে তাদের শুধুমাত্র একটি দলে সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ, যে দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের পথের দল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং একটি ছাড়া সবগুলিই জাহান্নামে যাবে। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! জান্নাতী সেই দল কোন্টি? তিনি বললেন, যে আমার এবং আমার ছাহাবার পথে থাকবে'। এই দলগুলি মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে এবং তাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছে শত্রুতা। এমনকি একজন আরেক জনকে যম শত্রু মনে করে; অথচ তারা সবাই মুসলিম এবং সবাই তার নিজের দ্বারা ইসলামের বিজয় কামনা করে। কিন্তু এত বিরোধ আর বিভক্তি নিয়ে ইসলামের বিজয় কি করে সম্ভব?! যাহোক, আমি আমার ভাইদের প্রতি হকের উপর এক হয়ে যাওয়ার এবং কুরআন ও আল্লাহ্র দিকে ফিরে যেয়ে বিরোধের সমস্ত দিক পরিহার করার আহ্বান জানাই।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলিম যুবকেরা আজ এই বিভক্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। কারণ তারা একেক জন একেক দলে যোগ দিয়ে পরস্পর পরস্পরকে গালাগালি ও নিন্দা করে, যা মুসলিম যুবকদের জাগরণে চরম বাধা। যাহোক, আমি আবারও মুসলিমদেরকে দলাদলি পরিহার করার নছীহত করছি। আমি মনে করি, গোটা মুসলিম উম্মাহকে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন না হয়ে এক হয়ে যাওয়া উচিৎ। প্রত্যেকটি দল অন্যান্য দলের বিপরীতে নতুন নাম দিয়ে আরেকটি দল গঠন করা উচিৎ নয়।
তিনি 'হিল্য়াতু ত্বলিবিল ইল্ম' পুস্তিকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে 'দলীয় ভিত্তির উপর কোনো প্রকার মিত্রতা ও শত্রুতা চলবে না' শিরোনামের মধ্যে বলেন, এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, দ্বীনী শিক্ষার প্রত্যেকটি শিক্ষানবিশকে সর্বপ্রকার দলাদলিমুক্ত থাকতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো দলের উপর ভিত্তি করে মিত্রতা বা বৈরীতা গড়ে তোলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, নিঃসন্দেহে এটি সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি বিরোধী। সালাফে ছালেহীনের নিকট কোনো প্রকার দলাদলি ছিল না, তাঁরা সবাই একটিমাত্র দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাঁরা সবাই নিম্নোক্ত আয়াতের ভাষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন,
﴿ هُوَ سَمَّنكُمُ الْمُسْلِمِينَ ﴾ [الحج: ৭৮]
'তিনিই তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছেন' (আল-হজ্জ ৭৮)। অতএব, কুরআন ও সুন্নাহ্ বক্তব্যের বাইরে অন্য কোনো কিছুর উপর ভিত্তি করে দলাদলি, মিত্রতা ও বৈরীতা চলবে না। দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি দলের সাথে জড়িত, ফলে সে ঐ দলের মূলনীতি সমর্থন করে চলে এবং তার সমর্থনের পক্ষে এমন কিছু দলীল পেশ করে, যা কখনই তার পক্ষে নয়; বরং তার বিপক্ষের দলীল হতে পারে। দলীয় কর্মপদ্ধতি ও মূলনীতি সমর্থন না করার কারণে এমনকি তার নিকটতম মানুষটিকেও পথভ্রষ্ট গণ্য করতে সে ইতস্তত বোধ করে না। সে বলে, তুমি আমার পথে না চললে তুমি আমার বিরোধী।... অতএব, ইসলামে কোনো প্রকার দলাদলি চলবে না। মুসলিমদের দলাদলির কারণে আজ বিভিন্ন পথের জন্ম হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আজ তারা পরস্পরকে পথভ্রষ্ট গণ্য করছে এবং তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করছে।
প্রশ্ন: কুরআন ও হাদীছের কোথাও কি দল সৃষ্টির প্রমাণ মিলে?
উত্তর: কুরআন ও হাদীছে দল তৈরীর প্রমাণ মিলা তো দূরের কথা; বরং এতদুভয়ে দলাদলির কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَানُواْ شِيَعًا لَّসْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّমَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا কَانُوا يَفْعَلُونَ ﴾ [الانعام: ১৫৯]
'নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহ তা'আলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি তাদেরকে তাদের আমলের হিসাব দিয়ে দিবেন' (আল-আন'আম ১৫৯)। তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ ﴾ [المؤمنون: ৫৩]
'প্রত্যেক দল নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত' (আল-মুমিনূন ৫৩)। নিঃসন্দেহে এসব দলাদলি আল্লাহ্র নির্দেশের পরিপন্থী। তিনি এরশাদ করেন,
﴿ إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ ﴾ [الانبياء: ৯২]
'তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের; এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, আমারই ইবাদত কর' (আল-আম্বিয়া ৯২)। এসব দলাদলির ফলাফলও কল্যাণকর নয়। কেননা প্রত্যেকটি দল অপর পক্ষকে নানাভাবে গালাগালি করে থাকে।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলে, কোনো দল বা সংগঠনের অধীনে না থাকলে দা'ওয়াতী কার্যক্রম শক্তিশালী হয় না। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি?
উত্তর: এ ধারণা সঠিক নয়: বরং কুরআন ও হাদীছের অধীনে থেকে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চার খলীফার নীতি অনুসরণ করে চললে দা'ওয়াতী কার্যক্রম আরো বেশী বেগবান হবে।
প্রশ্ন: বর্তমান ইসলামী বিশ্বে আমরা লক্ষ্য করছি যে, বহু দল ইসলামের পথে মানুষকে আহ্বান করছে এবং প্রত্যেকেই বলছে, আমি সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি অনুসরণ করে চলছি এবং আমার সাথেই রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ। এক্ষণে, এসব দল সম্পর্কে আমাদের ভূমিকা কি হবে? এসব দলের আমীরগণের মধ্যে যে কোনো একজনের হাতে বায়'আত করার বিধান কি?
উত্তর: যেসব দল দাবী করছে যে, তারা হকের উপরে আছে, তাদের সম্পর্কে মন্তব্য করা খুবই সহজ। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করব, হক কাকে বলে? জবাব, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত বক্তব্যই হচ্ছে হক। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে মুমিন, কুরআন ও সুন্নাহ্ দিকে প্রত্যাবর্তন করলে তার যাবতীয় দ্বন্দ্ব নিরসন হওয়া সম্ভব। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, কোনো কিছুই তার উপকারে আসবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ فَإِن تَنَٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاখِرِ ﴾ [النساء: ৫৯]
'অতঃপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক' (আন-নিসা ৫৯)।
সুতরাং এসব জামা'আতের লোকজনদের আমরা বলব, তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে যাও; প্রত্যেকেই তার প্রবৃত্তির পূজা ছেড়ে দাও এবং কুরআন-সুন্নাহ্ বক্তব্যকে আঁকড়ে ধরার পাকাপোক্ত নিয়্যত কর। ...তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা দেশের সরকার ছাড়া অন্য কারো হাতে বায়'আত করা বৈধ নয়। কেননা আমরা যদি প্রত্যেকের পৃথক পৃথক বায়'আতের কথা বলি, তাহলে মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে যাবে এবং প্রত্যেকটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শত শত আমীর সৃষ্টি হবে। মূলত: এটিই হচ্ছে বিভক্তি।
কোনো দেশে ইসলামী বিধান চালু থাকলে, সেখানে অন্য কারো হাতে বায়'আত জায়েয নেই। তবে কোনো দেশের সরকার যদি আল্লাহ্ বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা না করে, তাহলে তার কয়েকটি অবস্থা হতে পারেঃ সরকারের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড কখনো কুফরী হতে পারে, কখনো যুলম হতে পারে, আবার কখনো ফাসেক্বীও হতে পারে। কুরআন-হাদীছের আলোকে যখন স্পষ্ট প্রমাণিত হবে যে, কোনো দেশের সরকার স্পষ্ট কুফরীতে অনঢ় রয়েছে, তাহলে আমাদেরকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তবে তার মোকাবেলায় নামা যাবে না এবং শক্তি প্রয়োগ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। তার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করলে তা হবে শরী'আত ও হিকমত পরিপন্থী। আর সে কারণে মক্কায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিহাদের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কেননা সে সময় তাঁর এমন কোনো শক্তি ছিল না, যার মাধ্যমে তিনি মক্কার মুশরিকদেরকে মক্কা থেকে বের দিতে পারবেন বা তাদেরকে হত্যা করতে পারবেন। সুতরাং সরকারের অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় যাদের কোনো অস্ত্র নেই বললেই চলে এবং যাদের সংখ্যা নিতান্তই কম, তাদের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাওয়া হিকমত পরিপন্থী বৈ কিছুই নয়।
...সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার জন্য হাদীছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা বলা হয়েছে; আর তা হচ্ছে, ব্যক্তিকে নিজেই সরকারের কুফরীর বিষয়টি স্বচক্ষে দেখতে হবে, অন্যের কাছ থেকে শুনলে চলবে না। কারণ অনেক সময় মিথ্যা প্রচার করা হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, তার ভেতরে কুফরী অবশ্যই থাকতে হবে; ফাসেক্বী নয়। সে যদি বড় ধরনের ফাসেক্বীও করে বসে, তথাপিও তার বিরুদ্ধে মাঠে নামা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি সে যেনা করে বা মদ পান করে অথবা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে মাঠে নামা যাবে না। তবে সে যদি কারো রক্ত হালাল মনে করে তাকে হত্যা করে, তাহলে সেক্ষেত্রে হুকুম আলাদা হবে। হাদীছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা বলা হয়েছে; তা হচ্ছে, সরকারের কুফরী স্পষ্ট হতে হবে, যেখানে কোনো প্রকার ব্যাখ্যার অবকাশ থাকবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, সরকারের কুফরীর ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ্ স্পষ্ট দলীল থাকতে হবে, এখানে কিয়াসী দলীল চলবে না।
এই হচ্ছে চারটি শর্ত। সরকারের বিপক্ষে মাঠে নামার পঞ্চম শর্ত হচ্ছে, শক্তি ও সামর্থ্য থাকা। শেষোক্ত এই শর্তটি যে কোনো ওয়াজিবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ﴾ [البقرة: ২৮৬]
'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না' (আল-বাক্বারাহ ২৮৬)। তিনি অন্যত্র বলেন,
﴿ فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ﴾ [التغাবন: ১৬]
'অতএব, তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর' (আত-তাগাবুন ১৬)।
এক্ষণে, যেসব ভাই তাদের দৃষ্টিতে তাদের ইসলামী সরকার নেই মনে করে বিভিন্ন দল গঠন করে প্রত্যেকটি দলের একজন করে আমীর নির্ধারণ করতে চায়, আমি তাদেরকে বলব, এটি তোমাদের মারাত্মক ভুল, প্রত্যেকটি দলের আলাদা আলাদা আমীর বানিয়ে মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে দেওয়া তোমাদের জন্য আদৌ বৈধ নয়। বরং যে সরকারকে হটানোর সবগুলি শর্ত পাওয়া যায়, তাকে হটানোর জন্য তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা করতে হবে।
টিকাঃ
(২২) 'কতিপয় সূদানীদের সাথে শায়খ ইবনে বাযের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ' ক্যাসেট থেকে সংগৃহীত।
(২৩) শারহু ছহীহিল বুখারী, পৃ: ৪৮৮-৪৮৯ (আল-মাকতাবা আল-ইসলামিইয়া, প্রথম প্রিন্ট)।
(২৪) শায়খের নিজস্ব ওয়েবসাইট http://www.ibnothaimeen.com-এর নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে সংগৃহীত: http://www.ibnothaimeen.com/all/noor/article_994.shtml
(২৫) আত-তালীক্ব আছ-ছামীন আলা শারহে ইবনে উছায়মীন লিহিয়াতি ত্বলিবিল ইল্ম, পৃ: ৪০৬-৪০৮।
(২৬) 'আব্দুর রহমান আব্দুল খালেক্ব সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মন্তব্য' ক্যাসেটের দ্বিতীয় পিঠ থেকে সংগৃহীত।
(২৭) মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ আল-উছায়মীন, লিকাআতু বাবিল মাফতুহ, ২/১৪১-১৪৩, প্রশ্ন নং ৮৭৫ (দারুল বুছায়রাহ, মিশর)।
📄 ছালেহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান
মুহতারাম শায়খ বলেন, আল্লাহ্র রাস্তায় দা'ওয়াত দেওয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ﴾ [النحل: ১২৫]
'আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে দা'ওয়াত দিন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে' (আন-নাহল ১২৫)।
তবে মুসলিমদের পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং অন্যকে হক মনে না করে শুধুমাত্র নিজেকে হক মনে করা দা'ওয়াতের কোনো পদ্ধতি ও মূলনীতি হতে পারে না। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন দলের বাস্তব চিত্র তা-ই। যাহোক, যে মুসলিমের জ্ঞান ও সামর্থ্য আছে, তার উপর কর্তব্য হচ্ছে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান সহকারে মানুষকে আল্লাহ্র পথে ডাকা এবং অন্যদেরকে সহযোগিতা করা। তবে যেন এমন না হয় যে, প্রত্যেকটি জামা'আতের নিজেদের জন্য আলাদা নিয়মনীতি নির্দিষ্ট করে নেয়, যা অন্য জামা'আতের বিরোধী। বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ্র জন্য উচিত একটিমাত্র নিয়মনীতি থাকা, সবাই পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং একে অন্যের সাথে পরামর্শ করে চলা। বিভিন্ন দল এবং ভিন্ন ভিন্ন পথ ও মত সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এগুলি মুসলিম ঐক্য ধ্বংস করে এবং মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে, যেমনটি মুসলিম ও অমুসলিম দেশে বিভিন্ন দলের মধ্যে আজ এই বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুতরাং দা'ওয়াতী ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করার কোনো প্রয়োজনই নেই; বরং এক্ষেত্রে যরূরী বিষয় হচ্ছে, যার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আছে, সে একাকী হলেও মানুষকে আল্লাহ্ পথে দা'ওয়াত দিবে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে থাকলেও দাঈদের দা'ওয়াতী মূলনীতি এক এবং হকের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
টিকাঃ
(২৮) নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে ১১/১২/২০১২ তারিখ দুপুর ১৮:৪৪ টায় সংগৃহীত: http://www.ahlelhadith.com/vb/showthread.php?t=6786
📄 বকর আবু যায়েদ (রহঃ)
তিনি বায়'আত সম্পর্কে বলেন, 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' কর্তৃক মনোনীত মুসলিম সরকারের বায়'আত ছাড়া ইসলামে দ্বিতীয় কোনো বায়'আত নেই। আজ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলে যেসব বায়'আত দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন ও হাদীছে এগুলির ভিত্তি থাকা তো দূরের কথা, এমনকি কোনো ছাহাবী বা তাবে'ঈর আমল থেকেও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ মিলে না। সুতরাং এগুলির সবই বিদ'আতী বায়'আত আর প্রত্যেকটি বিদ'আতই পথভ্রষ্ট।
যেসব বায়'আতের শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই, সেগুলো ভঙ্গ করলে কোনো দোষ নেই; বরং সেসব বায়'আত সম্পন্ন হলেই পাপ হবে। কেননা এসব বায়'আতের একদিকে যেমন শর'ঈ কোনো ভিত্তি নেই, অন্যদিকে তেমনি সেগুলোর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে বিভক্তি ও দলাদলির সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। উপরন্তু একজনকে আরেক জনের উপর ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। অতএব, বায়'আত, শপথ, চুক্তি বা অন্য যে নামই দেওয়া হোক না কেন এসব বায়'আত শরী'আতের গণ্ডির বাইরে।
তিনি অন্যত্র বলেন, দল বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, একই দেশে অনেকগুলি দল পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলির অন্তরালে রয়েছে অসংখ্য বায়'আত, চুক্তি আর শপথ। প্রত্যেকটি দল অন্যদের তোয়াক্কা না করে তার নিজস্ব মতবাদের দিকে আহ্বান করছে। সে কারণে তাদের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষিত মুসলিম জামা'আতের শাশ্বত মূলনীতি 'আমি এবং আমার ছাহাবীরা যে পথে আছে' বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ আজ বিভিন্ন বায়'আতের খপ্পরে পড়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যুবকেরা আজ গোলক-ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছে যে, কোন্ দলে তারা যোগ দিবে, কোন্ সংগঠন প্রধানের হাতেইবা বায়'আত করবে?! কারণ বায়'আত এমন শপথ ও অঙ্গীকার, যা 'অলা ও বারা' অর্থাৎ শত্রুতা ও মিত্রতা পোষণ অবধারিত করে।
তিনি অন্যত্র বলেন, ইসলামে কোনো প্রকার যোজন বা বিয়োজন ঘটিয়ে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো নামে বা রসম-রেওয়াজে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে নির্দিষ্ট কোনো দলের অধীনে থেকে অন্যদেরকে বাদ দিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলাও বৈধ নয়। সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো পদ্ধতিতে 'জামা'আতুল মুসলিমীন'-এর সাথে থাকতে হবে। অতএব, আল্লাহ্ কিছু নির্দেশনা বাদ দিয়ে কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, অন্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজ দলের সমর্থকদের সাথে মিত্রতা পোষণের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, কোনো দেশের অধিবাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূলনীতি তথা আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পূর্ণ বা আংশিক বিরোধিতায় ভিন্ন কোনো নামে কোনো দল গড়ে উঠলে এগুলি হারাম বলে বিবেচিত হবে।
আল্লামা বকর আবু যায়েদ দলাদলির অনেকগুলি লক্ষণ এবং ক্ষতির দিক উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর কয়েকটি নীচে তুলে ধরা হলোঃ
- বিভিন্ন ইসলামী দলকে বাহ্যতঃ দা'ওয়াতী সুসংগঠিত মাধ্যম মনে হলেও বেশীর ক্ষেত্রে সেগুলো মুসলিম উম্মাহ্র দেহে অদ্ভুত এক আকৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সবার ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে, রয়েছে দ্বীনী কার্যক্রমের নির্দিষ্ট কেন্দ্র, যেসব কেন্দ্র অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৎওয়া জারী করছে। অন্যদিকে এসব দল কখনো কখনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা জোরদারেরও চেষ্টা করছে। এছাড়া সম্পদ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ক্ষমতার মসনদ দখলের বিষয়টিতো রয়েছেই।
- দলাদলি করলে ইসলামকে নির্দিষ্ট একটি পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দলের লোকজন শুধুমাত্র দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই ইসলামকে দেখে। আর যে কোনো দল নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট নেতৃত্ব এবং নির্দিষ্ট মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেকারণে যে কোনো দল সাধারণত নবুঅতী আলোর খুব সামান্য পরিমাণই ধারণ করে থাকে।
- যে কোনো দল নিজেকে নির্দিষ্ট কোড, সংকীর্ণ নাম ও উপনামের মধ্যে বন্দী করে ফেলে। ফলে সে নির্দিষ্ট প্রতীক নিয়ে সবার চেয়ে ব্যতিক্রম থাকতে চায়। সেকারণে সে নীচের আয়াতে কারীমায় বর্ণিত ব্যাপক অর্থ বোঝক নাম থেকে বঞ্চিত হয় (هُوَ سَمَّلَكُمُ الْمُسْلِمِينَ) [الْحج:৭৮] 'তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম' (আল-হাজ্জ ৭৮)।
- দলাদলি দলের অভিমতের প্রতি আত্মসমর্পণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত অভিমত প্রচার-প্রসারে ব্রতী হয়। পাশাপাশি দলাদলি দলের সমালোচনার পথ বন্ধ করে দেয়। এই কঠিন বাস্তবতা ইসলামী দা'ওয়াতের পরিপন্থী।
- দলাদলিতে নেতৃত্ব দলীয় চিন্তা-চেতনা, কর্মপদ্ধতি এবং মূলনীতির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে দলাদলি দলীয় লোকজনকে মূল লক্ষ্য দা'ওয়াতী কার্যক্রমের সৈনিক না বানিয়ে নেতৃত্বের সৈনিক বানায়। সেকারণে দলাদলি ব্যক্তির সেবা করে, দা'ওয়াতের নয়।
- বিভিন্ন দল আল্লাহ্র রাস্তায় দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বেড়ী পরে ফেলে। সেকারণে দ্বীনের দা'ওয়াত দিতে গিয়ে দা'ঈকে দলীয় কার্ড বহন করতে হয়। দলীয় কার্ড না থাকলে অন্ততঃ তাকে দলের সদস্য হতে হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পদ্ধতি অনুযায়ী আল্লাহ্ পথের দা'ঈ হওয়ার জন্য ইসলাম দা'ঈকে দুই কালিমার সাক্ষ্য প্রদান এবং ইসলাম প্রচারকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলাদলির গণ্ডিতে প্রবেশের কোনো শর্তই ইসলাম আরোপ করেনি; বরং সকল দলাদলির ঊর্ধ্বে থাকতে বলা হয়েছে।
- দলাদলি মুসলিম উম্মাহ্র যুবকদের অন্তরে দলীয় চিন্তাধারা এবং আল্লাহ্ পথে দা'ওয়াতের মধ্যকার সুদৃঢ় সম্পর্কের অবান্তর চিন্তার বীজ বপন করেছে। অর্থাৎ দল ছাড়া দা'ওয়াতী কার্যক্রম সম্ভব নয় মর্মে একটি বিশ্বাস তাদের অন্তরে সৃষ্টি করেছে।
এক্ষণে একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, যার কোনো জবাব নেই; প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন মুসলিম কোন্ দলে যোগ দিবে? এখানে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত তরীকায় এবং ইসলামের ব্যাপক অর্থ বোধক পদ্ধতিতে আল্লাহর পথে দা'ওয়াত দেওয়া কি বেশী ভাল নাকি দলীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে দলের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দা'ওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা বেশী উত্তম?
টিকাঃ
(২৯) শায়খ বকর আবু যায়েদ ১৩৬৫ হিজরীতে নাজদ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। রিয়াদ, মক্কা ও মদীনায় তিনি শিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে শায়খ ইবনে বায, শায়খ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি মদীনার উচ্চ বিচারালয়ের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং মসজিদে নববীর শিক্ষক, ইমাম ও খত্নীবের দায়িত্ব পান। ১৪১২ হিজরীতে সউদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ এবং ফৎওয়া বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন।
(৩০) 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' পরিভাষাটি তিন শ্রেণীর মানুষকে শামিল করেঃ উলামায়ে কেরাম, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
(৩১) আব্দুল্লাহ আত-তামীমী, মুহাযযাবু হুকমিল ইনতিমা ইলাল ফিরাক্ক ওয়াল আহযাব ওয়াল জামা'আত আল-ইসলামিইয়াহ, পৃ: ৯৭ (মূল গ্রন্থটি শায়খ বকর আবু যায়েদের)।
(৩২) প্রাগুক্ত, পৃ: ৯৬।
(৩৩) এখানে 'জামা'আতুল মুসলিমীন' বলতে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের পথের যথাযথ অনুসারীদেরকে বুঝানো হয়েছে।
(৩৪) প্রাগুক্ত, পৃ: ৪০-৪১।
(৩৫) প্রাগুক্ত, পৃ: ৮০-৮৭।
📄 মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেই (রহঃ)
প্রশ্ন: দিনে দিনে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা কর্ম পদ্ধতি, দা'ওয়াতী মূলনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরস্পরে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী। আর হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হক জামা'আত হবে একটিই। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দল ও সংগঠনের হুকুম কি?
উত্তর: এসব দল ও সংগঠনের ব্যাপারে শরীআতের হুকুম হচ্ছে, এগুলি হারাম এবং বিদ'আত। সেজন্য এগুলি থেকে দূরে থেকে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে দা'ওয়াত দেওয়া একজন মুসলিমের কর্তব্য। তবে কেউ যেন কিছুতেই ধারণা না করে যে, আমরা কোনো মুসলিমকে ইসলামের জন্য একাকী কাজ করতে বলছি; বরং আমরা একজন মুসলিমকে আরব-অনারব, সাদা-কালো সকল মুসলিমের সাথে কাজ করতে বলছি। কারণ দলবদ্ধভাবে কাজ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ﴾ [المائدة: ২]
'সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না' (আল- মায়েদাহ ২)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পারস্পরিক ভালবাসা, দয়ার্দ্রতা এবং সহানুভূতিশীলতার ক্ষেত্রে গোটা মুমিন সম্প্রদায় একটি দেহের মত। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে তার জন্য পুরো দেহ ব্যথা অনুভব করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, 'আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ' যদি তাদের দা'ওয়াতী দায়িত্ব যথারীতি পালন করে, তাহলে এতসব দলাদলি পানিতে লবণ গলে যাওয়ার মত গলে যাবে। কেননা এসব দলাদলি ধোঁকার উপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রশ্ন: দা'ওয়াতের মহান উদ্দেশ্যে মুক্বীম অবস্থায় কাউকে ‘আমীর’ বানানোর ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
উত্তর: মুক্বীম অবস্থায় মুসলিম খলীফা বা তাঁর নিযুক্ত আমীর ও গভর্ণর ছাড়া অন্য কাউকে আমীর বানানো প্রমাণিত নয়। কিন্তু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে খেলা শুরু হয়ে গেছে; ফলে তিন জনের একটি গ্রুপ থাকলে তাদেরও একজন ‘আমীরুল মুমিনীন’ সেজে বসে থাকছে। নিঃসন্দেহে এটি বিদ'আত, যা মুসলিম ঐক্যকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
প্রশ্ন: বর্তমান যুব সমাজে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে, তারা বলছে, কেউ কেউ বায়'আতকে বৈধ মনে করে, আবার কেউ কেউ বৈধ মনে করে না। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্চে, বায়'আত কি? বায়'আতের শর্ত কি? আমাদের কি কারো হাতে বায়'আত গ্রহণ যরূরী?
উত্তর: কুরাইশ বংশের কোনো ব্যক্তিকে 'আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ' নির্বাচন করলে অথবা তিনি নিজে খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার হাতে বায়'আত করা ওয়াজিব। কুরাইশ বংশের বাইরে যদি কেউ খলীফা হয়ে জনগণের কাছ থেকে বায়'আত তলব করে, তাহলে তার হাতেও বায়'আত করতে হবে। তবে যেসব দল ও সংগঠন মুসলিমদেরকে বিভক্ত করেছে, তাদের ঐক্য ও শক্তি বিনষ্ট করেছে, তাদের বায়'আত গ্রহণতো দূরের কথা, বরং তাদের এই দলাদলির বিরোধিতা করতে হবে। আমরা আগেই বলেছি, মুসলিমদেরকে দলে দলে বিভক্ত করে ফেলা বর্তমান সময়ের একটি নিকৃষ্ট বিদ'আত। সেকারণে তাদের বায়'আতও বিদ'আত।
যদি কেউ প্রশ্ন করে, নিম্নোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বায়'আতের প্রশংসা করেছেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ﴾ [الفتح: ১০]
'যারা আপনার কাছে বায়'আত করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই বায়'আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর' (আল-ফাতহ ১০), তাহলে আপনারা কিভাবে বায়'আতকে বিদ'আত বলছেন?
জবাবে বলব, উক্ত আয়াতে উল্লেখিত বায়'আত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কুরাইশ বংশের খলীফার জন্য নির্দিষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার কাঁধে বায়'আত না থাকা অবস্থায় মারা যাবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু'। উক্ত হাদীছে উল্লেখিত বায়'আতও কুরাইশ বংশের খলীফা বা ক্ষমতায় চলে আসা অন্য যে কোনো খলীফার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ অন্য বংশের কেউ ক্ষমতায় চলে আসলে যদি তার বায়'আত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে মুসলিমদের রক্তের হেফাযত সম্ভব হবে না। অতএব, যে ব্যক্তি মানুষকে এসব বায়'আতের দা'ওয়াত দেয়, তার বিরোধিতা করতে হবে; যে বায়'আত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, তার বিরোধিতা নয়।
যদি কেউ বলে, নিম্নোক্ত হাদীছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়'আতের কথা বলেছেন, 'যখন তিন জন সফরে বের হবে, তখন তারা তাদের একজনকে আমীর বানাবে'। জবাব হচ্ছে, এই বায়'আত সফর অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট। ...সেকারণে বিভিন্ন জামা'আতের আমীরদের বায়'আত বর্তমান যুগের একটি অন্যতম বিদ'আত। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে যখন প্রহার করা হয়েছিল, বিখ্যাত ছাহাবী আনাস ইবনে মালেককে যখন হাজ্জাজ অপমান করতে চেয়েছিল, ইমাম মালেককে যখন প্রহার করা হয়েছিল, ইমাম শাফেঈকে যখন লোহার বেড়ী পরিয়ে হাযির করা হয়েছিল, ইমাম বুখারীকে যখন নিশাপুর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন বায়'আত কোথায় ছিল? এভাবে আমাদের মুসলিম উম্মাহ্র স্বনামধন্য বহু আলেমে দ্বীনকে প্রহার করা হয়েছিল, তাদেরকে জেল-যুলম ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাদেরকে নানাভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এতসত্ত্বেও তারা মানুষকে বায়'আতের দা'ওয়াত দেননি। অতএব, এসব বায়'আত বর্তমান যুগের বিদ'আত ছাড়া আর কিছুই নয়।
টিকাঃ
(৩৬) শায়খ মুক্ববিল ইয়েমেনের দাম্মাজ নগরীর ওয়াদেআহ এলাকায় ১৩৫০ হিজরীর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়েমেন, নাজদ, মক্কা ও মদীনায় শিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ইয়েমেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অন্যতম।
(৩৭) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, কন্ট্রল মু'আনেদ ওয়া যারুল হাক্বেদিল হাসেদ, পৃ: ৩৫৫-৩৮৪ (দারুল হাদীছ, দাম্মাজ, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৩/১৯৯৩)।
(৩৮) প্রাগুক্ত, পৃ: ৫২৯-৫৩২।
(৩৯) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, ফাযায়েহ ওয়া নাছায়েহ্, পৃ: ৬৭-৬৯ (দারুল হারামাইন, কায়রো, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৯/১৯৯৯)।