📄 সার-সংক্ষেপ
দ্বীনী কাজের বিনিময়ের ব্যবহার ক্ষেত্রে জুমহুর আলেমদের অবস্থান হল, দ্বীনী বিশেষ-বিশেষ কাজ, ঝাড়-ফুঁক, তা‘লিমুল কুরআন ও হাদীস প্রভৃতির মজুরি নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও জায়েয কাজের আরও ধরন রয়েছে। যেমন – কুরআনের কপি করা, হাদীসের কিতাব লেখা, তাফসীর ও অন্যান্য দ্বীনী কিতাব প্রভৃতির ক্রয়-বিক্রয়ও জায়েয। অনুরূপ মাসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের মজুরি নেয়া। সাহাবী আমর বিন সালামাহ নিজের কওমের ইমামতি করতেন।। কওমের লোকেরা তাঁর পরিধানের কাপড় কিনে দিতেন। এ কারণে আমর বিন সালামাহ খুশী হতেন। ২৮ এ থেকে বুঝা যায়, ইমামের প্রয়োজন পূরণ করা জায়েয, তেমনি মুয়াযযিনের কাজেরও মূল্যায়ন করা যায়, যেভাবে নবী আবু মাহযূরাহ -কে আযান দেয়ার কারণে রূপা ভর্তি একটি থলি দিয়েছিলেন। অবশ্য মুয়াযযিনের জন্য আযানের মজুরি চাওয়াটা জায়েয নয়। তা ছাড়া ইমাম ও
টিকাঃ
২৯৬. বর্ণনান্তর উল্লেখযোগ্য অংশ হল, সাহাবী আমর বিন সালামাহ বর্ণনা করেন : ...فَلَمَّا كَانَتْ وَقْعَةُ أَهْلِ الْفَتْحِ بَادَرَ كُلُّ قَوْمٍ بِإِسْلَامِهِمْ وَيَتَمَزَّرُ أَبِي قَوْمِي بِإِسْلَامِهِمْ فَلَمَّا قَدِمَ قَالَ جِئْتُكُمْ وَاللَّهِ مِنْ عِنْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقًّا فَقَالَ صَلُّوا صَلَاةً كَذَا فِي حِينِ كَذَا وَصَلُّوا صَلَاةً كَذَا فِي حِينِ كَذَا فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ أَحَدُكُمْ وَلْيَؤُمُّكُمْ أَكْثَرُكُمْ قُرْآنًا فَنَظَرُوا فَلَمْ يَكُنْ أَحَدٌ أَكْثَرَ قِرَاءَةً مِنِّي لِمَا كُنْتُ أَتَلَقَّى مِنَ الرُّكْبَانِ فَقَدَّمُونِي بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَأَنَا ابْنُ سِتٍّ أَوْ سَبْعٍ سِنِينَ وَكَانَتْ عَلَيَّ بُرْدَةٌ إِذَا سَجَدْتُ تَقَلَّصَتْ عَنِّي فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ الْحَيِّ أَلَا تُغَطُّوا عَنَّا اسْتَ فَاشْتَرَوْا لِي قَمِيصًا فَمَا فَرِحْتُ بِشَيْءٍ فَرِحِي بِذَلِكَ الْقَمِيصِ
... অতঃপর যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটল। এবার সব গোত্রই তাড়াহুড়া করে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। আমাদের কওমের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আমার পিতা বেশ তাড়াহুড়া করলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ফিরে এসে বললেন : আল্লাহ্র শপথ! আমি সত্য নাবীর নিকট থেকে তোমাদের কাছে অমুক সময়ে অমুক সালাত এবং অমুক সময়ে অমুক সালাত আদায় করবে। এভাবে সালাতের সময় হলে, তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে কুরআন অধিক জানে সে সালাতের ইমামতি করবে। সবাই এ রকম একজন লোক খুঁজলেন। কিন্তু আমার চেয়ে অধিক কুরআন জানা একজনকেও পাওয়া গেল না। কেননা আমি কাফেলার লোকদের থেকে কুরআন শিখেছিলাম। কাজেই সবাই আমাকে তাদের সামনে এগিয়ে দিল। অথচ তখনো আমি ছয়-সাত বছরের বালক। আমার একটি চাদর ছিল, যখন আমি সাজদাতে যেতাম তখন চাদরটি আমার গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে উপরের দিকে উঠে যেত। তখন গোত্রের জনৈক মহিলা বলল, তোমরা আমাদের দৃষ্টি থেকে তোমাদের ক্বারীর নিতম্ব আবৃত করে দাও না কেন? তারা কাপড় খরিদ করে আমাকে একটি জামা তৈরি করে দিল। এ জামা পেয়ে আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে, আর কিছুতে এত খুশি হইনি।" [সহীহ বুখারী – কিতাবুল মাগাযী, ২/৮০০২]
📄 দ্বীনী কাজে দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতি নসিহত
দ্বীনী ইলমে ইখলাসের সাথে খেদমতরত আলেমদের মর্যাদা সর্ব-সাধারণের থেকে অনেক উর্ধ্বে। আলেমদের সম্পর্কে আল্লাহ্ ﷻ বলেন: إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ “নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই আল্লাহকে ভয় করে।” ¹²⁹ নাবী ﷺ বলেছেন: الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ “আলেমেরা নাবীদের ওয়ারিস।” ¹³⁰ আলেমেরা দ্বীনের সূক্ষ্মতা, ভীতি ও চূড়া সম্পর্কে খুব ভালভাবে অবহিত। তা ছাড়া দ্বীনের এমন কিছু দিক তাদের দৃষ্টি রয়েছে যা সর্ব-সাধারণের নেই। এ কারণে এই সুউচ্চ ও মহান স্তরের দাবি হল, আলেমেরা দ্বীনের কাজ করার সময় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। সাথে সাথে আমানতদারি, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ওয়াদাবদ্ধতা প্রভৃতি যা সর্বোন্নত মানবিক দিক– সেগুলোর অধিকারী হবেন। কেননা প্রকারান্তরে আখিরাতে এ কাজের পুরস্কার খুবই সম্মানের। আর সেখানকার শাস্তিও অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ। এ কারণে দ্বীনী দায়িত্ব পালনের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি:
১) দ্বীনী খেদমত কেবলই আল্লাহ্র রাজি-খুশির জন্য করতে হবে।
২) দ্বীনী খেদমতের মাধ্যমে যে নগণ্য বিনিময় পাওয়া যায় সেটা দ্বারা জীবন-যাপন করবে এবং বেশি পাওয়ার লোভ করবে না। মাল-সম্পদ সঞ্চয় করার নিয়তও করবে না। কেননা মাল-সম্পদ হল মোহ, আর তা সঞ্চয় আখেরাতের জন্য বিষপান তুল্য।
৩) মানুষের মধ্যে এমনকিছু লোক আছে যারা আলেমদেরকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু আলেমদের দায়িত্ব হল, এ ধরনের লোকদের এসব অবহেলা ও অপমান উচ্চমস্তকের সাথে দেখবে এবং এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনীকে সব সময় স্মরণে রাখবে।
৪) যে সব মৌলভী আল্লাহ্র ভয়-ভীতি অগ্রাহ্য করে নাজায়েয পন্থায় মাল-সম্পদ অর্জন করে এবং লোকদেরকে দ্বীনের নামে বেওকুফ (নির্বোধ) বানিয়ে রাখে। যেমন, মৃতব্যক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন সামাজিক আচার - তৃতীয়া, দশমী, চল্লিশা, বাৎসরিক অনুষ্ঠান, কুরআনখানি, কবরে গোলাপ দেয়া, গায়রুল্লাহর নামে নজর, নিয়াজ প্রভৃতির নামে অর্থকরী লুট করছে। তেমনি কুরআনখানীর রয়েছে বিভিন্ন পদ্ধতি- যার প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন ফি (Fees) রয়েছে। কিছু ব্যক্তি গদ্দীনশীন, তত্ত্বাবধায়ক, মুজাহিদ দাবি করে লোকদেরকে দ্বীনের নামে ধোঁকা দিচ্ছে এবং এ পদ্ধতিতে মাল লুট করছে। এমনকি নারীদের ইজ্জত নিয়েও খেলছে। এ ধরনের মৌলভী ও পীরদের সম্পর্কে আল্লাহ্ ﷻ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن
سَبِيلِ اللَّهِ
“হে মু'মিনগণ! (ইয়াহুদিদের) অধিকাংশ আলেম ও দরবেশ লোকজনের মাল বাতিল পন্থায় খেয়ে থাকে এবং আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখে।” [সুরা তাওবা: ৩৪ আয়াত]
ইয়াহুদি আলেম ও দরবেশদের মতো উম্মাতে মুসলিমার মৌলভী ও পীররাও নাজায়েয পন্থায় মাল খাচ্ছে এবং তাদের দ্বীন ও ঈমানকে ধ্বংস করছে। জনসাধারণের দায়িত্ব হল, এই সব মৌলভী ও পীরদের চিনে নেবে ও তাদের থেকে দূরে থাকবে। অন্যায়ায় তাদের মাল-সম্পদ তাদের কাছে চলে যাবে এবং আখিরাতও ধ্বংস হবে।
هذا ما عندي والله أعلم بالصواب
লেখক: আবু জাবির আব্দুল্লাহ দামানাদি। অনুবাদ: কামাল আহমাদ।
টিকাঃ
১২৯. সূরা ফাতির: ২৮ আয়াত。
১৩০. আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, দারেমী, মিশকাত (তাহকীক্ব) হা/২১২。