📄 সপ্তম দলীল: নবী–গণের বিনা মজুরিতে তাবলিগ
কুরআন মাজীদের আরও কিছু আয়াত দ্বারাও দ্বীনী কাজের মজুরিকে হারাম গণ্য করার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে রয়েছে নবীগণ-কর্তৃক নিজের কওমের প্রতি দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে বক্তব্যসমূহ। যেমন: يَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي “হে আমার কওম! আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় আমার মজুরি তাঁরই (আল্লাহ صلى الله عليه وسلم) কাছে।”২১১
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ. “আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় আমার মজুরি রব্বুল আলামিনের নিকটে।”২১২
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ. “আপনি বলে দিন, আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় এটা বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ মাত্র।” [সুরা আন‘আম: ৯০]
উক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ صلى الله عليه وسلم নবীগণ-গণকে দা‘ওয়াত ও তাবলিগের যে মিশনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে জন্য লোকদের কাছে মজুরি চাইতেন না। কেননা কাফির ও মুশরিকদেরকে দ্বীনের দা‘ওয়াত দেওয়া নবীগণের উপর ফরযে আইন ছিল। আর এ কারণেই তারা দা‘ওয়াত ও তাবলিগের বিনিময় নিতেন না।
আল্লামা আলূসি رحمه الله আয়াতটির তাফসীর লিখেছেন: واستدل بالآية على أنه يحل الأجر للتعليم وتبليغ الأحكام وفيه كلام على طوله مشهور غني عن البيان . “এই আয়াতটি থেকে দলীল নেয়া হয় যে, তা‘লিম ও তাবলিগের জন্য মজুরি নেয়া হালাল। এ বিষয়ে ফক্বীহদের দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রসিদ্ধ, যা বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।”২১৩
ড. মুহাম্মাদ লুকমান সালাফি আয়াতটির তাফসীর লিখেছেন: "قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا" আয়াতদ্বারা ফকীহগণ এই দলীল নিয়েছেন যে, তা'লিম ও তাবলিগের বিনিময়ে মজুরি নেয়া জায়েজ। সহীহ বুখারীতে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস ﷺ থেকে সাপকাটা ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এক সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে সূরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করলে তার বিষাক্ততা দূর হয়। ঘটনাটিতে এটিও উল্লেখ আছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলা হল, ঝাড়-ফুঁককারীকে ঐ গোত্র অনেকগুলো বকরি বিনিময় হিসেবে দিয়েছিল। তখন নাবী ﷺ বললেন: إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ أَفَمَسُّمُوا وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ سَهْمًا "নিশ্চয় তোমরা যে ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেক্ষেত্রে কুরআনই বেশি হকদার (উপযুক্ত)। তোমরা ঠিকই করেছ। বন্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি অংশ রাখ। এ বলে নাবী ﷺ হাসলেন।" ২৪৫
ইমাম শওকানী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, নাবী ﷺ-এর উক্তিটি ‘আম (ব্যাপকার্থক), যা কুরআন শেখানো, কুরআন পাঠ করে ঝাড়-ফুঁক করা এবং ঐ হাদিয়াও এর অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআনের ক্বারীকে প্রদান করা হয়।" ২৪৬
নাবী ﷺ-গণ কাফির-মুশরিকদের হেদায়েত ও পথ-প্রদর্শনের জন্য দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছিলেন। দা'ওয়াত ও তাবলিগ তাদের ফরয দায়িত্ব ছিল। এ কারণে দা'ওয়াত ও তাবলিগের মজুরি তাদের জন্য হারাম ছিল। একইভাবে নাবী ﷺ-গণ যাকিছু রেখে যেতেন তাতেও কেউ ওয়ারিস গণ্য হতো না। বরং ঐ মাল-সম্পদ সাদাকা করা হতো। খলিফা আবূ বাকার সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا نُورَثُ مَا تَرَكْنَاهُ صَدَقَةٌ. "আমাদের (নাবী ﷺ-গণের) কোনো ওয়ারিস নেই। আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকাহ।" ২৪৭
এই হাদীসটি সুস্পষ্ট করে যে, নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণ দুনিয়াতে মাল-সম্পদ সঞ্চয় করতেন না। এ কারণে তারা দা'ওয়াত ও তাবলিগের মজুরি চাইতেন না। আর যদি তারা মৃত্যুর সময় কিছু রেখে গিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তা সাদাকার মাল। কেননা নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের মিরাসি সম্পত্তি হয় না। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের সাথে খাস বা সুনির্দিষ্ট। আজকেও যদি কেউ কাফির ও মুশরিকদের দা'ওয়াত দেয়, সেক্ষেত্রে তার জন্য কাফির-মুশরিকদের কাছে মজুরি চাওয়া জায়েয নয়। (বরং তাদের কাছে মজুরি চাওয়াটাই অর্থহীন কাজ। – অনুবাদক) আর এটাই নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের সুন্নাতের দাবি। অবশ্য যদি কোনো ইসলামি হুকুমাত বা সমাজ দাঈ ও মুবাল্লিগ নিয়োগ দেয় ও তাদের মজুরি নির্ধারণ করে, তবে সেটা ভিন্ন বিষয়। এক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলো প্রযোজ্য নয়। বরং এক্ষেত্রে যেসব হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে কুরআনের তা'লিম বা ঝাড়-ফুঁকের বিনিময় বৈধ করার বিধানটি প্রযোজ্য। যেভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উম্মাতকে সম্বোধন করে) বলেছেন:
إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللهِ
“নিশ্চয় তোমরা যে ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেক্ষেত্রে কুরআনই বেশি হকদার (উপযুক্ত)।” ২৯৭
[সংযোজন: এই হাদীসটিতে উম্মাতকে মুহাম্মাদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের দা'ওয়াতি কাজের আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের কর্তব্যের কথা উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে উম্মাতকে জড়ানো হয়নি। সুতরাং এ পর্যায়ে উম্মাতের জন্য সম্বোধন করে যা বলা হয়েছে – সেটার প্রয়োগ সংগত কারণেই বৈধ বরং প্রাধান্যপ্রাপ্ত। – অনুবাদক]
টিকাঃ
২১১. সুরা হুদ: ৫১ আয়াত।
২১২. সুরা শু‘আরা: ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০।
২১৩. তাফসীর রূহুল মা‘আনি, সুরা আন‘আমের ৯০ নং আয়াতের তাফসীর।
২৪৫. সহীহ বুখারী ২/৮৭৭, মিশকাত (এমদাদিয়া) ৬/২৮৫৫ নং, তাহকীক মিশকাত হা/২৪৪৮; সহীহ বুখারী – ‘কিতাবুল ইজারাহ’ الْكِتَابُ الرَّعْيِ عَلَى أَخْيَاءِ الْفِتْيَةِ فِي الْأَزِمَةِ باب مَا يُنْظَرُ (অনুচ্ছেদ: কোনো আরব গোত্রে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়-ফুঁক করার বদলে কিছু নেয়া হলে) হা/২২৭৬। এখানে আবূ সাঈদ রাদিআল্লাহু আনহু ও ইবনু আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমা উভয়ের বর্ণনাকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। -অনুবাদক。
২৪৬. তাইসীর রহমান লিবায়ানিল কুরআন পৃ: ৪১৭。
২৪৭. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তাখ: মিশকাত হা/৫৪৮৬。
২৯৭. সহীহ বুখারী হা/৫৭০৭, মিশকাত (এমদাদিয়া) ৬/৯৫৫ নং, তাহকীক্ব মিশকাত হা/২০৮৫。