📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 চতুর্থ দলীল: সাহাবী জাবির –এর বর্ণনা

📄 চতুর্থ দলীল: সাহাবী জাবির –এর বর্ণনা


عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ وَنَحْنُ نَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَفِيْنَا الْأَعْرَابِيُّ وَالْأَعْجَمِيُّ، فَقَالَ: «اِقْرَؤُوْا فَكُلٌّ حَسَنٌ وَسَيَجِيءُ أَقْوَامٌ يُقِيمُوْنَهُ كَمَا يُقَامُ الْقِدْحُ يَتَعَجَّلُوْنَهُ وَلَا يَتَأَجَّلُوْنَهُ».
“জাবির (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে আসলেন আর তখন আমরা কিরাআত করছিলাম। সেখানে আরব ও অনারব ছিল। তিনি (সঃ) বললেন: তোমরা কুরআন পড়, সবাই সুন্দর পড়ছে। অচিরেই এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআনকে তীরের ন্যায় ঠিক করবে। তারা তাড়াতাড়ি করবে এবং ধীরস্থিরভাবে করবে না।”³³⁸
সাহল বিন সা'দ আস-সাঈদি বর্ণিত আবু দাউদের পরবর্তী হাদীসের শেষাংশে আছে:
يَتَعَجَّلُ أَجْرَهُ وَلَا يَتَأَجَّلُهُ
“তারা কুরআনের মজুরির জন্য তাড়াতাড়ি করবে, আর (আখিরাতের ব্যাপারে) ধীরস্থির হবে না।”³³⁹
আবু দাউদের সনদটি হল:
حَدَّثَنَا وَهْبُ بْنُ بَقِيَّةَ، أَخْبَرَنَا خَالِدٌ، عَنْ حُمَيْدٍ الْأَعْرَجِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ...
মুসনাদে আহম্মাদের (৩/৩৫৭) সনদও এটাই। কিন্তু তাতে একটি ভুল সৃষ্টি হয়েছে। তাতে খালেদের পরের عن শব্দটি ইবন-এ পরিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ “ খালিদ ‘আন হুমাইদ আল-আ’রাজ” হয়েছে “খালিদ বিন হুমাইদ আল-আ’রাজ”। শাইখ আলবানী (রঃ) এর সনান্দানের দিকে ইশারা করেছেন।³⁴⁰
এই বর্ণনাটি সহীহ। এখানে হুমাইদ আল-আ'রাজ বলতে হুমাইদ আল-আ'রাজ আল-কুফী নন। কেননা সে যঈফ রাবী। বরং তিনি হলেন, হুমাইদ বিন কায়েস আল-মাক্বি আল-আ'রাজ আবু সুফিয়ান আল-ক্বারী – তিনি সিক্বাহ। তবে সাহাবী সাহল বিন সা’দ আস-সা’য়িদির বর্ণনাতো ইবনু লাহিয়াহ ও ওয়াফা বিন ওয়াইয়াহ আস-সাদাফি আছেন। ওফা মাকবুল স্তরের রাবী। মুসনাদে আহমাদ (৩/১৪৬, ১৪৫) এই বর্ণনাটি (‘মুসনাদে সাহল’-এর পরিবর্তে) ‘মুসনাদে আনাস’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাইখ আলবানী رحمه الله কাছে ইবনু লাহিয়াহ ভুলের শিকার হতেন। একারণে সেটা ‘মুসনাদে আনাসে’ সাহল বিন সা’দ আস-সা’য়িদির বর্ণনার বদল।¹⁴⁹
এই বর্ণনাটির দাবি হল, কিছু লোক কুরআন তিলাওয়াতও সহীহ-শুদ্ধ করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করবে। এমনকি তারা তীরের মতো তিলাওয়াতের পদ্ধতিকে সোজা করবে। ইলমে তাজবীদ মোতাবেক সেটা আদায় করার জন্য খুব মেহনত করবে। কিন্তু এ সমস্ত পরিশ্রমের উদ্দেশ্য হল, দুনিয়াতে নাম কামানো ও রিয়াকারীতে পরিণত হওয়া। রিয়াকে হাদীসে ছোট শিরক বলা হয়েছে। যে তিন ধরনের লোক দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে তাদের একটি ধরন হল, তারা ক্বারী আলেম, যারা নাম কামানোর জন্য কুরআন ও হাদীসের ইলম অর্জন করবে। কিন্তু এই রিয়াকারীদেরকে জাহান্নামবাসী বানানো হবে।
এই ছাড়া হাদীসটির আরও একটি দাবি হল, কুরআন পাঠকারী কুরআনের বিরোধিতা করবে, যা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা সুস্পষ্ট হয়:
...حَدَّثَنِي زَيْدُ بْنُ وَهْبٍ الْجُهَنِيُّ أَنَّهُ كَانَ فِي الْجَيْشِ الَّذِينَ كَانُوا مَعَ عَلِيٍّ ﭬ الَّذِينَ سَارُوا إِلَى الْخَوَارِجِ فَقَالَ عَلِيٌّ ﭬ أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ «يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قِرَاءَتُكُمْ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صَلَاتُكُمْ إِلَى صَلَاتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَحْسَبُونَ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الْإِسْلَامِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ».
“যায়দ বিন ওয়াহাব আল-জুহানি থেকে বর্ণিত। যে সেনাদল আলী ﭬ-এর সাথে খারেজিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল- তিনি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন। আলী ﭬ বললেন: হে লোক সকল! আমি রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: আমার উম্মাতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআন পাঠ করবে। তোমাদের কিরাআত তাদের কিরাআতের কাছে কিছুই না। তাদের সালাতের কাছে তোমাদের সালাত কিছুই না। তাদের সিয়ামের কাছে তোমাদের সিয়াম কিছুই না। কুরআন পাঠ করে তারা ধারণা করবে তাদের সওয়াব হচ্ছে। নিশ্চয় তা তাদের ক্ষতির কারণ হবে। তাদের সালাত (অন্য বর্ণনায়: কুরআন) তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা ইসলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেভাবে তীর শিকারকে (উদ্দেশ্য করে ধনুক থেকে) বের হয়ে যায়।”¹⁹⁰
অর্থাৎ প্রকৃত ইসলামের কোনো চিহ্ন তাদের মধ্যে থাকবে না। এ থেকে বুঝা যায়, কুরআন খুব সুললিত কণ্ঠে পাঠ করা বাতিল ফিরকার বৈশিষ্ট্য। এই সমস্ত জামা‘আতও কুরআনের যথাযথ অনুসরণ করা থেকে দূরে থাকে। অন্যথায় কুরআন সুন্দর কণ্ঠে ও তাজবিদের সাথে পাঠ করা নিষিদ্ধ নয়। বরং হাদীসে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিংবা হাদীসটি দ্বারা ঐসব লোককে বুঝানো হয়েছে, যারা কুরআনের বাহ্যিক (শাব্দিক) অর্থ গ্রহণ করে এবং সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করে। তা ছাড়া কুরআনের বাহ্যিক অনুসরণ জবরদস্ত দাবি করে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের আমল কুরআনের উপর থাকে না। কেননা কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীসের মাধ্যমে হয়। তারা তা গ্রহণ করবে না। এর দ্বারা খারেজিদের বুঝানো হয়েছে। আর খারেজিদের অনুসরণে সমস্ত ফিরকা যারা নিজেরাও খারেজিদের মতো তাকফিরের চেতনা রাখে। তারা নিজেদেরকে ছাড়া সমস্ত মুসলিমদেরকে কাফির গণ্য করে। ...

टিকা:
৩৩৮. আবু দাউদ হা/৮৩০, মুসনাদে আহম্মাদ ৩/৩৫৭, ৩৯৭।
৩৩৯. আবু দাউদ হা/৮৩১।
৩৪০. আস-সহীহাহ্ ১/৪৬৪।
¹⁴⁹. ৭১, আস-সহীহাহ ১/৪৮৫ (শামেলা: ১/৫২১ হা/২৫৯-এর আলোচনা)।
¹⁹⁰. সহীহ মুসলিম – কিতাবুল যাকাত بَابُ التَّحْرِيضِ عَلَى قِتَالِ الْخَوَارِجِ (শামেলা হা/২৫৩৬)。

📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 পঞ্চম দলীল: সাহাবী উসমান বিন আবীল আসের হাদীস

📄 পঞ্চম দলীল: সাহাবী উসমান বিন আবীল আসের হাদীস


عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ اجْعَلْنِي إِمَامَ قَوْمِي، قَالَ: «أَنْتَ إِمَامُهُمْ وَاقْتَدِ بِأَضْعَفِهِمْ وَاتَّخِذْ مُؤَذِّنًا لَا يَأْخُذُ عَلَى أَذَانِهِ أَجْرًا».
“উসমান বিন আবীল 'আস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমাকে আমার কওমের ইমাম নিযুক্ত করুন। তিনি ﷺ বললেন: তুমি তাদের ইমাম। দুর্বল মুক্বতাদিদের প্রতি খেয়াল রেখ। আর এমন কাউকে মুয়াযযিন নিযুক্ত করবে যে এর মজুরি নেবে না।”¹¹⁹
মিশকাতের ব্যাখ্যাকারী উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী হাদীসটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন: فيه دليل على أنه يكره أخذ الأجرة على الأذان. قال الخطابي: أخذ المؤذن الأجر على أذانه مكروه في مذاهب أكثر العلماء ، وقال مالك: لا بأس به ، ويرخص فيه ... واستدل بعضهم على التحريم بهذا الحديث ، ولا يخفى أنه لا يدل على التحريم. وقيل: يجوز أخذها على التأذين في محل مخصوص ، إذ ليست على الأذان حينئذ بل على ملازمة المكان كأجرة الرصد ، والقول الراجح عندنا ما ذهب إليه أكثر العلماء.
“এই দলীল দ্বারা আযানের মজুরি অপছন্দনীয় (মাকরূহ) হয়। খাত্তাবি বলেন: মুয়াযযিনের জন্য আযানের বিনিময় নেয়া অধিকাংশ আলেমদের মাযহাব অনুযায়ী মাকরূহ। ইমাম মালেক বলেছেন: এতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি এ মাসআলাতে রুখসাত (ছাড়) দিয়েছেন। ...কিছু আলেম এ হাদীসের আলোকে মজুরি হারামের দলীল নিয়েছেন। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, এতে হারামের দলীল নেই। বলা হয়: নির্দিষ্ট স্থানের (দায়িত্ব পালনে সময় দেয়ার কারণে) আযানের মজুরি নেয়া জায়েয। কেননা সেটা আযানের বিনিময় নেয়া নয়। বরং এটা নির্দিষ্ট স্থানের দায়িত্বপালন (অযু, পানি এবং পেশাব-পায়খানার ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ধোয়া-মোছা) যেমন – পাহারাদারীর মজুরি। আমাদের কাছে এই উক্তিটিই প্রাধান্যপ্রাপ্ত। আর অধিকাংশ আলেম ওদিকেই গিয়েছেন।”¹²⁰
ইসলামি রাষ্ট্র বাইতুল মাল থেকে মুয়াজ্জিনের ভাতা নির্ধারণ করতে পারে। কিংবা মাসজিদের পরিছন্নতাকর্মীদের বেতন নির্ধারণ করতে পারে এবং তারা এর সাথে সাথে সওয়াবের নিয়াতে আযান দিতে পারে। ইমাম বায়হাক্বী রহ. বর্ণনা করেছেন:
قَالَ الشَّافِعِيُّ: قَدْ أَرْزُقُ الْمُؤَذِّنِينَ أَمَامَ هُدًى عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ.
ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, হেদায়াতের অনুসারী ইমাম উসমান রাযি. মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।¹²³
ইমাম বায়হাক্বী রহ. এক্ষেত্রে দলিল পেশ করে বলেন: "... قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: " إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ " رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي الصَّحِيحِ، عَنْ سَيِّدَانَ بْنِ مَضَارِبٍ، عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ وَزَوْزَيْنَا فِي حَدِيثٍ أَبِي مَحْذُورَةَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ دَعَاهُ حِينَ قَضَى التَّاذِينَ فَأَعْطَاهُ صُرَّةً فِيهَا شَيْءٌ مِنْ فِضَّةٍ.
"... ইমাম বুখারী রহ. তাঁর ‘সহীহ বুখারী’-তে উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি গ্রহণ কর, সেক্ষেত্রে কুরআনের বেশি হকদার।’ তা ছাড়া সিদান বিন মুয়ারিব বর্ণনা করেছেন আবী মা’শার থেকে আমাদেরকে আবূ মাহযুরার হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, আমি আযান দেয়া শেষ করলে নবী ﷺ আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে একটি থলি দান করলেন। যাতে ছিল কিছু রৌপ্য।"¹²⁴
সর্বোপরি উম্মাতের ধারাবাহিক আমলেও আযানের মজুরিকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়নি।

টিকাঃ
¹¹⁹. আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত (তাহকীক্ব) ২/৬৬৮। হাদীসটির দাবি সম্পর্কে এই পুস্তিকার ঈমী বিনিময় জায়েয সম্পর্কীয় আলোচনার 'অষ্টম দলীল: আযানের বিনিময়'-এ উল্লেখ করা হয়েছে。
¹²⁰. মিরআতুল মাফাতীহ (খামেলা) ২/৭৭২-৭৩ পৃ: – আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা।
¹²³. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী فِي رِزْقِ الْمُؤَذِّنِينَ (باب) (শামেলা ১/৬০৫)。
¹²⁴. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী فِي رِزْقِ الْمُؤَذِّنِينَ (باب) (শামেলা ১/৬০৫, ২/২০১৯); বিস্তারিত বর্ণনা এই পুস্তিকার দীনি বিনিময় জায়েয সম্পর্কিত আলোচনার ‘অষ্টম দলিল: আযানের বিনিময়’-এ উল্লেখ করা হয়েছে。

📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 সপ্তম দলীল: নবী–গণের বিনা মজুরিতে তাবলিগ

📄 সপ্তম দলীল: নবী–গণের বিনা মজুরিতে তাবলিগ


কুরআন মাজীদের আরও কিছু আয়াত দ্বারাও দ্বীনী কাজের মজুরিকে হারাম গণ্য করার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে রয়েছে নবীগণ-কর্তৃক নিজের কওমের প্রতি দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে বক্তব্যসমূহ। যেমন: يَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي “হে আমার কওম! আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় আমার মজুরি তাঁরই (আল্লাহ صلى الله عليه وسلم) কাছে।”২১১
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ. “আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় আমার মজুরি রব্বুল আলামিনের নিকটে।”২১২
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ. “আপনি বলে দিন, আমি এই (দা‘ওয়াত ও তাবলিগের) জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। নিশ্চয় এটা বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ মাত্র।” [সুরা আন‘আম: ৯০]
উক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ صلى الله عليه وسلم নবীগণ-গণকে দা‘ওয়াত ও তাবলিগের যে মিশনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে জন্য লোকদের কাছে মজুরি চাইতেন না। কেননা কাফির ও মুশরিকদেরকে দ্বীনের দা‘ওয়াত দেওয়া নবীগণের উপর ফরযে আইন ছিল। আর এ কারণেই তারা দা‘ওয়াত ও তাবলিগের বিনিময় নিতেন না।
আল্লামা আলূসি رحمه الله আয়াতটির তাফসীর লিখেছেন: واستدل بالآية على أنه يحل الأجر للتعليم وتبليغ الأحكام وفيه كلام على طوله مشهور غني عن البيان . “এই আয়াতটি থেকে দলীল নেয়া হয় যে, তা‘লিম ও তাবলিগের জন্য মজুরি নেয়া হালাল। এ বিষয়ে ফক্বীহদের দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রসিদ্ধ, যা বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।”২১৩
ড. মুহাম্মাদ লুকমান সালাফি আয়াতটির তাফসীর লিখেছেন: "قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا" আয়াতদ্বারা ফকীহগণ এই দলীল নিয়েছেন যে, তা'লিম ও তাবলিগের বিনিময়ে মজুরি নেয়া জায়েজ। সহীহ বুখারীতে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস ﷺ থেকে সাপকাটা ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এক সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে সূরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করলে তার বিষাক্ততা দূর হয়। ঘটনাটিতে এটিও উল্লেখ আছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলা হল, ঝাড়-ফুঁককারীকে ঐ গোত্র অনেকগুলো বকরি বিনিময় হিসেবে দিয়েছিল। তখন নাবী ﷺ বললেন: إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ أَفَمَسُّمُوا وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ سَهْمًا "নিশ্চয় তোমরা যে ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেক্ষেত্রে কুরআনই বেশি হকদার (উপযুক্ত)। তোমরা ঠিকই করেছ। বন্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি অংশ রাখ। এ বলে নাবী ﷺ হাসলেন।" ২৪৫
ইমাম শওকানী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, নাবী ﷺ-এর উক্তিটি ‘আম (ব্যাপকার্থক), যা কুরআন শেখানো, কুরআন পাঠ করে ঝাড়-ফুঁক করা এবং ঐ হাদিয়াও এর অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআনের ক্বারীকে প্রদান করা হয়।" ২৪৬
নাবী ﷺ-গণ কাফির-মুশরিকদের হেদায়েত ও পথ-প্রদর্শনের জন্য দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছিলেন। দা'ওয়াত ও তাবলিগ তাদের ফরয দায়িত্ব ছিল। এ কারণে দা'ওয়াত ও তাবলিগের মজুরি তাদের জন্য হারাম ছিল। একইভাবে নাবী ﷺ-গণ যাকিছু রেখে যেতেন তাতেও কেউ ওয়ারিস গণ্য হতো না। বরং ঐ মাল-সম্পদ সাদাকা করা হতো। খলিফা আবূ বাকার সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا نُورَثُ مَا تَرَكْنَاهُ صَدَقَةٌ. "আমাদের (নাবী ﷺ-গণের) কোনো ওয়ারিস নেই। আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকাহ।" ২৪৭
এই হাদীসটি সুস্পষ্ট করে যে, নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণ দুনিয়াতে মাল-সম্পদ সঞ্চয় করতেন না। এ কারণে তারা দা'ওয়াত ও তাবলিগের মজুরি চাইতেন না। আর যদি তারা মৃত্যুর সময় কিছু রেখে গিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তা সাদাকার মাল। কেননা নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের মিরাসি সম্পত্তি হয় না। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের সাথে খাস বা সুনির্দিষ্ট। আজকেও যদি কেউ কাফির ও মুশরিকদের দা'ওয়াত দেয়, সেক্ষেত্রে তার জন্য কাফির-মুশরিকদের কাছে মজুরি চাওয়া জায়েয নয়। (বরং তাদের কাছে মজুরি চাওয়াটাই অর্থহীন কাজ। – অনুবাদক) আর এটাই নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের সুন্নাতের দাবি। অবশ্য যদি কোনো ইসলামি হুকুমাত বা সমাজ দাঈ ও মুবাল্লিগ নিয়োগ দেয় ও তাদের মজুরি নির্ধারণ করে, তবে সেটা ভিন্ন বিষয়। এক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলো প্রযোজ্য নয়। বরং এক্ষেত্রে যেসব হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে কুরআনের তা'লিম বা ঝাড়-ফুঁকের বিনিময় বৈধ করার বিধানটি প্রযোজ্য। যেভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উম্মাতকে সম্বোধন করে) বলেছেন:
إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللهِ
“নিশ্চয় তোমরা যে ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেক্ষেত্রে কুরআনই বেশি হকদার (উপযুক্ত)।” ২৯৭
[সংযোজন: এই হাদীসটিতে উম্মাতকে মুহাম্মাদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের দা'ওয়াতি কাজের আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের কর্তব্যের কথা উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে উম্মাতকে জড়ানো হয়নি। সুতরাং এ পর্যায়ে উম্মাতের জন্য সম্বোধন করে যা বলা হয়েছে – সেটার প্রয়োগ সংগত কারণেই বৈধ বরং প্রাধান্যপ্রাপ্ত। – অনুবাদক]

টিকাঃ
২১১. সুরা হুদ: ৫১ আয়াত।
২১২. সুরা শু‘আরা: ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০।
২১৩. তাফসীর রূহুল মা‘আনি, সুরা আন‘আমের ৯০ নং আয়াতের তাফসীর।
২৪৫. সহীহ বুখারী ২/৮৭৭, মিশকাত (এমদাদিয়া) ৬/২৮৫৫ নং, তাহকীক মিশকাত হা/২৪৪৮; সহীহ বুখারী – ‘কিতাবুল ইজারাহ’ الْكِتَابُ الرَّعْيِ عَلَى أَخْيَاءِ الْفِتْيَةِ فِي الْأَزِمَةِ باب مَا يُنْظَرُ (অনুচ্ছেদ: কোনো আরব গোত্রে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়-ফুঁক করার বদলে কিছু নেয়া হলে) হা/২২৭৬। এখানে আবূ সাঈদ রাদিআল্লাহু আনহু ও ইবনু আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমা উভয়ের বর্ণনাকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। -অনুবাদক。
২৪৬. তাইসীর রহমান লিবায়ানিল কুরআন পৃ: ৪১৭。
২৪৭. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তাখ: মিশকাত হা/৫৪৮৬。
২৯৭. সহীহ বুখারী হা/৫৭০৭, মিশকাত (এমদাদিয়া) ৬/৯৫৫ নং, তাহকীক্ব মিশকাত হা/২০৮৫。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00