📄 দ্বিতীয় দলীল: সাহাবী উবাদাহ বিন সামিত –এর হাদীস
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، قَالَ: عَلَّمْتُ نَاسًا مِنْ أَهْلِ الصُّفَّةِ الْكِتَابَ، وَالْقُرْآنَ فَأَهْدَى رَجُلٌ مِنْهُمْ قَوْسًا فَقُلْتُ: لَيْسَتْ بِمَالٍ وَأَرْمِي عَنْهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، لَآتِيَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَأَسْأَلَنَّهُ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، رَجُلٌ أَهْدَى إِلَيَّ قَوْسًا مِمَّنْ كُنْتُ أُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْقُرْآنَ، وَلَيْسَتْ بِمَالٍ وَأَرْمِي عَنْهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ، قَالَ: «إِنْ كُنْتَ تُحِبُّ أَنْ تُطَوَّقَ طَوْقًا مِنْ نَارٍ فَاقْبَلْهَا»,
“উবাদাহ বিন সামিত رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আহলে সুফফার কয়েকজন ব্যক্তিকে কুরআন পড়া ও লিখা শেখাতাম। তাদের একজন আমাকে উপহার হিসেবে একটি ধনুক পাঠাল। আমি বললাম, এটা কোনো সম্পদ নয়। আমি এটা দিয়ে ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’ (আল্লাহর পথে) তীর ছুঁড়ব। কিন্তু আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর নিকট গিয়ে তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। অতঃপর আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! এক লোক আমাকে একটি ধনুক উপহার দিয়েছে। আমি লোকদের সঙ্গে তাকেও লিখা ও কুরআন শেখাতাম। ধনুকটা (মূল্যবান) সম্পদ নয়। আমি এটা দিয়ে ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’ (আল্লাহর পথে) তীর ছুঁড়ব। তিনি বললেন: তুমি যদি গলায় জাহান্নামের শিকল পরতে ভালোবাস, তা হলে তা গ্রহণ কর।”¹⁷¹
হাদীসটির সনদ নিম্নরূপ:
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، وَحُمَيْدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الرُّؤَاسِيُّ، عَنْ مُغِيرَةَ بْنِ زِيَادٍ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ نَسْيٍ، عَنِ الأَسْوَدِ بْنِ ثَعْلَبَةَ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ
এই সনদের কেন্দ্রীয় রাবী যিনি সাহাবী উবাদাহ رضي الله عنه থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হলেন: আসওয়াদ বিন সা’লাবাহ। তিনি মাজহুল।¹⁷²
ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদি رحمة الله عليه বলেন: আমার এই রাবীর এই হাদিসটি ছাড়া আর কোনো হাদিস স্মরণে নেই। আর আল্লামা ইয়াহইয়া আব্দুর রহমান বিন মাহদি رحمة الله عليه থেকে উল্লেখ করেছেন: সে গায়ের মা'রুফ (অপরিচিত)। আবূ দাউদ ও ইবনু মাজাহ তার থেকে এই একটি হাদিসই বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া সনদটির অপর রাবী মুগিরাহ বিন ফিয়াদ – যদিও সে সত্যবাদী কিন্তু ভুল করতেন। (তাকরীব)
তিনি ‘মুখতালাফ ফিহি’ বিতর্কিত রাবী। আল্লামা মুনযিরি رحمة الله عليه লিখেছেন: وَفِي إِسْنَادِهِ الْمُغِيرَةُ بْنُ زِيَادٍ أَبُو هَاشِمِ الْمَوْصِلِي وَقَدْ وَثَّقَهُ وَكِيعٌ وَيَحْيَى بْنُ مَعِينٍ وَتَكَلَّمَ فِي جَمَاعَةٍ وَقَالَ الْإِمَامُ أَحْمَدُ ضَعِيفُ الْحَدِيثِ حَدَّثَ بِأَحَادِيثَ مَنَاكِيرَ وَكُلَّ حَدِيثٍ رَفَعَهُ فَهُوَ مُنْكَرٌ وَقَالَ أَبُو زُرْعَةَ الرَّازِيُّ لَا يُحْتَجُّ بِحَدِيثِهِ.
“এই সনদে মুগিরাহ বিন ফিয়াদ আবূ হাশিম আল-মাওসুলি। ইমাম ওয়াকি ও ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন তাকে সিকাহ গণ্য করেছেন। আর মুহাদদিসগণের একটি জামা’আতও তার প্রতি আপত্তি করেছেন। ইমাম আহমাদ رحمة الله عليه বলেছেন: সে যঈফুল হাদিস এবং সে মুনকার হাদিস বর্ণনা করত। আর সমস্ত হাদিস, যা সে মারফূ‘ হিসেবে বর্ণনা করত তা মুনকার। আর আবূ যুরআহ রাযি رحمة الله عليه বলেন: তার হাদিস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না।”¹³³
এই বর্ণনাটির অপর সনদটি নিম্নরূপ:
حَدَّثَنَا أَبُو الْمُغِيرَةِ حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ يَعْنِي ابْنَ يَسَارٍ السُّلَمِيُّ قَالَ حَدَّثَنِي عُبَادَةُ بْنُ نُسَيٍّ عَنْ جُنَادَةَ بْنِ أَبِي أُمَيَّةَ عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ.
এই সনদটির একজন রাবী বিশর বিন আব্দুল্লাহ বিন ইয়াসার। সে মাকবূল স্তরের রাবী। কেননা কেবল হাফেয ইবনু হিব্বান رحمة الله عليه তাকে তাঁর ‘আস-সিকাত’ে উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের রাবীর যতক্ষণ কোনো গ্রহণযোগ্য মুতাবা‘ না থাকে - তখন তার বর্ণনাটি হাসান স্তরে পৌঁছে না। হাফেয ইবনু হাজার رحمة الله عليه তাকে সুদূক্ব বলেছেন। অথচ তাঁরই উসূল মোতাবেক এই রাবী কেবল মাকবূল স্তরে পৌঁছায়, যা থেকে বুঝা যায়, এক্ষেত্রে তার শিথিলতা ছিল। কেননা তিনি ছাড়া আর কেউই তাকে সুদূক্ব বলেননি।
আল্লামা যাহাবি তাঁর ‘আল-কাশিফ’ে বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে কোনো না কোনো হুকুম অবশ্যই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনিও এ হাদীসটির ক্ষেত্রে চুপ থেকেছেন। একই অবস্থা ‘খুলাসাতু তাহযিব’ লেখকের (পৃ: ৪১)। তা ছাড়া এই অপরিচিত রাবী ‘হাদাসানি’ বলে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছে, যা থেকে বুঝা যায়, এই হাদীসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে বিশার একাকী। অন্য কোনো মুহাদ্দিস তাহদিসের ক্ষেত্রেও তার সাথে শরিক নেই। অনেকে এই বর্ণনাটিতে ‘বাকীয়াহ’ রাবীকে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ حَدَّثَنَا بَقِيَّةُ حَدَّثَنِي بِشْرُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ يَسَارٍ
অথচ বাকীয়াহ-ও ‘মুখতালাফ ফিহি’ বা বিতর্কিত রাবী এবং চরম মুদাল্লিস। হাফেয ইবনু হাজার رَحِمَهُ اللهُ লিখেছেন: الضعفاء عن التدليس “صدوق كثير التدليس، সুদুক, হাফেযদের থেকে ব্যাপক তাদলিসকারী।” [তাক্বরিব]
আল্লামা মুনযিরি رَحِمَهُ اللهُ বলেছেন: وفي هذه الطريق بقية بن الوليد وقد تكلم فيه غير واحد.
“এই সনদে বাকীয়াহ বিন ওয়ালিদ আছে, যার প্রতি একাধিক মুহাদ্দিস আপত্তি করেছেন।”¹³⁹⁴
অবশ্য যদি বাকীয়াহ’র হাদীস শোনা সুস্পষ্ট হয়, তা হলে বর্ণনাটি হাসান হয়। আর এক্ষেত্রে সে ‘হাদাসানি’ বলে তার হাদীস শোনাটা সুস্পষ্ট করেছে। কিন্তু সেই বর্ণনাটি বিশার বিন আব্দুল্লাহ থেকে উল্লেখ করেছে, যার প্রতি মুহাদ্দিসগণের আপত্তি কিছু পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া সনদটির এত ওজন নেই যে, এটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণিত সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী ও সাহাবী ইবনু আব্বাস رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا-এর মোকাবেলা করবে। এই হাদীসে কঠোর ভাষা ব্যক্ত করা হয়েছে। অথচ সনদটি যঈফ। (তা ছাড়া হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শক্তিশালী সনদে বর্ণিত হাদীসের বিরোধী বিধায় শায – অনুবাদক)।
ইমাম বায়হাকী رَحِمَهُ اللهُ আলোচ্য হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন: هَذَا حَدِيثٌ مُخْتَلَفٌ فِيهِ عَلَى عُبَادَةَ بْنِ نَسِيٍّ كَمَا تَرَى، وَحَدِيثُ ابْنِ عَبَّاسٍ وَأَبِي سَعِيدٍ أَصَحُّ إِسْنَادًا مِنْهُ
এই হাদীসটি উবাদাহ বিন নুসাইয়া'র কারণে মুখতালাফ ফিহি বা বিতর্কিত – যেভাবে তোমরা দেখেছো। আর সনদের দিক থেকে ইবনু আব্বাস ও আবু সাঈদ খুদরী –এর বর্ণনা এর থেকে বেশি সহীহ্।²⁹⁸
তিনি অন্যত্র ইবনু আব্বাস –এর হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন: وهذا اصح من من حديث عبادة بن الصامت، وأبي الدرداء في التهديد والوعيد في اخذ القوس على تعليم القرآن لما في إسناد حديثهما من الضعف، ثم قد حملهما بعض أصحابهما على حال يجب فيه تعليمه .
“এই হাদীসটি উবাদাহ বিন সামিত ও আবু দারদা বর্ণিত হাদীসের থেকে বেশি শক্তিশালী। এ দুটিকে তা’লিমুল কুরআনের উপার্জনের ক্ষেত্রে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অথচ হাদীস দুটি যঈফ। এরপরও আমাদের সাথিদের কেউ কেউ (হাদীসটি সহীহ হওয়ার শর্তসাপেক্ষে) ওয়াজিব তা’লিমের ক্ষেত্রে এটাকে গ্রহণ করেছেন।”²⁹⁹
ইমাম খাত্তাবী (রহঃ) উবাদাহ বিন সামিতোর হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন: وتأولوا حديث عبادة على أنه أمر كان تبرع به ونوى الاحتساب فيه ولم يكن قصده وقت التعليم إلى طلب عوض ونفع فحظره النبي ﷺ إبطال أجره وتوعده عليه، وكان سبيل عبادة في هذا سبيل من رد ضالة الرجل أو استخرج له متاعاً قد عرف تبرعاً وحسبه فليس له أن يأخذ عليه عوضاً ولو أنه طلب لذلك أجرة قبل أن يفعله حسبة كان ذلك جائزاً. وأهل الصفة قوم فقراء كانوا يعيشون بصدقة الناس فأخذ الرجل المال منهم مكروه ودفعه إليهم مستحب. وقال بعض العلماء أخذ الأجرة على تعليم القرآن له حالات فإذا كان في المسلمين غيره ممن يقوم به حل له أخذ الأجرة عليه لأن فرض ذلك لا يتعين عليه. وإذا كان في حال أو موضع لا يقوم به غيره لم يحل له أخذ الأجرة وعلى هذا تأول اختلاف الأخبار فيه.
"আলেমগণ উবাদাহ -এর হাদীসটির এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে (সহীহ হওয়ার শর্তে): এটি এমন একটা কাজ ছিল, যা তিনি সওয়াবের নিয়্যাতে করেছিলেন। আর তা'লিমের সময় তার বিনিময় ও মুনাফার নিয়্যাত ছিল না। এ কারণে নবী তার মজুরিকে বাতিল করলেন ও ভীতি প্রদর্শন করলেন। উবাদাহ -এর নিয়্যাত ঐ ব্যক্তির মতো, যে কোনো হারিয়ে যাওয়া পশুর খোঁজ পেয়ে ফেরত দেয়। কিংবা ডুবে যাওয়া মাল - যা জলাশয়ে তলিয়ে গেছে, সেখান থেকে বের করে কেবল সওয়াবের নিয়্যাতে ফেরত দেয়। এক্ষেত্রে তার বিনিময় নেয়া জায়েয নয়। যদি সে এই কাজটি করার পূর্বে কেবল সওয়াবের নিয়্যাত ছাড়া (পশু বা বস্তুর মালিকের নিকট) মজুরি চায় - তবে তা জায়েয। তা ছাড়া আসহাবে সুফফাহ ফকীর ছিলেন। তারা মানুষের সাদাকার দ্বারা জীবন নির্বাহ করতেন। সুতরাং কেউ যদি তাদের মাল নেয় তবে তা মাকরুহ এবং সেটা ফেরত দেয়াটা মুস্তাহাব।
অপর কিছু আলেম বলেছেন: তা'লিমুল কুরআনের মজুরি নেয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি অবস্থা আছে। যখন মুসলিমদের মধ্যে (নির্দিষ্ট কোনো) আলেম ছাড়া আরও আলেম থাকেন, যারা তা'লিমের ব্যবস্থাপনার (ফরয দ্বীন শেখানোর কাজে) রয়েছেন। তখন ঐ (নির্দিষ্ট) আলেমের জন্য (ব্যক্তিগতভাবে শেখানো তা'লিমের) মজুরি নেয়া হালাল। কেননা এই (দ্বীন শেখানোর) কাজ তার উপর (সামাজিকভাবে ফরয হিসেবে) নির্ধারিত নয়। আর যখন এই আলেম এমন পরিচিতি বা স্থানে আছেন, যেখানে তা'লিমের কাজ সে ছাড়া আর কেউ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে তা'লিমের কারণে (সরকারি/প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার বাইরে কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত হাদিয়া হিসেবে) মজুরি নেয়া হালাল নয়। এভাবে সমস্ত হাদীসগুলোর বিরোধ নিরসনে সমন্বয় হয়।"¹¹⁸
হাফেয ইবনু কাসীর হাদীসটির ব্যাখ্যা নিম্নোক্ত বাক্যে করেছেন: فَإِنْ صَحَّ إِسْنَادُهُ فَهُوَ مَحْمُولٌ عِنْدَ كَثِيرٍ مِنَ الْعُلَمَاءِ مِنْهُمْ: أَبُو عُمَرَ بْنُ عَبْدِ الْبَرِّ، عَلَى أَنَّهُ لَمَّا عَلَّمَهُ اللَّهُ لَمْ يَجُزْ بَعْدَ هَذَا أَنْ يُفْتَاضَ عَنْ ثَوَابِ اللَّهِ بِذَلِكَ الْقَوْسِ، فَأَمَّا إِذَا كَانَ مِنْ أَوَّلِ الْأَمْرِ عَلَى التَّعْلِيمِ بِالْأُجْرَةِ فَإِنَّهُ يَصِحُّ كَمَا فِي حَدِيثِ اللَّدِيغِ وَحَدِيثٍ سَهْلٍ فِي الْمَخْطُوبَةِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ অর্থাৎ তার সনদ যদি সহীহ হয়, তবে অধিকাংশ আলেমদের নিকট এটি এমন বিষয়ের উপর প্রয়োগযোগ্য, যেমন আবু উমার ইবনে আব্দুল বার (রাহিঃ) বলেন: "যখন আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন, তখন তার জন্য উচিত নয় যে, তিনি এই ধনুকের বিনিময়ে আল্লাহর সওয়াব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। তবে যদি শুরু থেকেই বিনিময় নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার শর্ত থাকে, তবে এটি জায়েজ, যেমন সর্পদংশিত ব্যক্তির হাদিসে এবং সহজ (রা.)-এর বিবাহ প্রস্তাবের হাদিসে বর্ণিত আছে।" আল্লাহই ভালো জানেন।
“যদি এর সনদ সহীহ হয়, সেক্ষেত্রে আবূ উমার বিন আদিল বারসহ অনেক আলেম এর ভিন্নরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যদি কেউ আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে, তবে সওয়াবই তার কাম্য হবে। নগণ্য পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে অমূল্য সওয়াব নষ্ট করা তার জন্য জায়েয হবে না। পক্ষান্তরে যদি কেউ শুরুতেই মজুরির বিনিময়ে শিক্ষাদান করে, তা হলে সেটা সহীহ। যেভাবে (আবূ সাঈদ খুদরী (রা.)-এর) দশজনের হাদীস ও সাহল (বিন সা’দ সায়িদী) (রা.)-এর বিয়ের মোহরানার হাদীস রয়েছে।। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”¹⁶⁹
অনুরূপ সাহাবী আবূ দারদা (রা.) থেকেও বর্ণনা এসেছে। কিন্তু ইমাম বায়হাকী এই বর্ণনাটি সম্পর্কে লিখেছেন: لیس له اصل ‘এই বর্ণনার কোনো আসল (ভিত্তি) নেই’।¹⁷⁰
আল্লামা আলবানী (রাহ.) ‘আল-ফাওয়াদে লিআবী মুহাম্মাদ আল-মুখাল্লিদি’ (১/২৮৮) এবং ‘তারিখে দিমাশক লিইবনি আসাকির’ (২/৪২৭/২) থেকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই সনদের একজন রাবী সাঈদ বিন আব্দুল আযীয – যিনি শেষ বয়সে ইখতিলাতো’র (বর্ণনা হেরফের করার ত্রুটি) মধ্যে পতিত হয়েছিলেন। (আত্ব-তাকরিব)
এই বর্ণনাটির অপর রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম। আল্লামা আলবানী (রাহ.) লিখেছেন: أن الوليد بن مسلم وإن كان من رجال الشيخين؛ فإنه كثير التدليس والتسوية، فيخشى أن يكون أسقط رجلا بين سعيد وإسماعيل وعليه فيحتمل أن يكون المسقط ضعيفا، مثل عمرو بن واقد أو غيره، ولعل هذا هو وجه قول دحيم في هذا الحديث " ليس له أصل".
"ওয়ালিদ বিন মুসলিম যদিও শাইখাইনের রাবী, তবে নিশ্চয় সে ব্যাপক তাদলিস ও তাসবিয়াকারী।¹⁵¹ তাই আমি ভয় করি যে, সে দুইজন রাবী সাদ ও ইসমাঈলের মাঝে কোনো রাবীকে উহ্য রেখেছে। সম্ভবত তারা নিয়মানের যঈফ। যেমন – আমর বিন ওয়াকিদ কিংবা অন্যান্য। সম্ভবত এ কারণে ইমাম বুখারি হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেন: হাদীসটির কোনো আসল (ভিত্তি) নেই।”¹⁵²
ইবনু আসাকির رحمه الله হাদীসটি আমর বিন ওয়াকিদের সনদে উল্লেখ করেছেন। সে মাতরুক রাবী। এ কারণে আল্লামা আলবানী رحمه الله বলেছেন: সম্ভবত ওয়ালিদ কাউকে কোনো সনদে উহ্য করেছে।
অনুরূপ অপর একটি হাদীস উবায় ইবনু কা’ব رضي الله عنه থেকে বর্ণিত হয়েছে।¹⁵³ কিন্তু এই সনদে একজন রাবী আব্দুর রহমান বিন সাল্লাম মাজহুল। [তাক্বরীবা] তা ছাড়া আতিয়াহ আল-কালাবী ও সাহাবী উবায় ইবনু কা’বের মাঝে ইনকিতা’ (বিচ্ছিন্নতা) আছে। এ কারণে হাদীসটি খুবই যঈফ।
টিকাঃ
১৭১. আবূ দাউদ - কিতাবুল ইজারাহ الْفَيْءِ فِي كَسْبِ الْعُمَّالِ (باب) হা/৩৪১৬; ইবনু মাজাহ হা/২১৫৭; তাহযীব মিশকাত হা/২১৬০।
১৭২. দ্র: তাফরীরুত তাহযীব, তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩৩৮), খুলাসাহ তাহযীব তাহযীবুল কামাল পৃ: ৩৭।
¹³³. মুতাভাসার সুবানে আবী দাউদ লিলমুনযিরি ৫/৭৩।
¹³⁹⁴. আবূ দাউদ – কিতাবুল ইজারাহ ফিল مُغَلَّمِ (باب) হা/৩৪১৭。
¹³⁹⁵. মুয়াত্তায়ে সুনানে আবী দাউদ ৫/৭১।
²⁹⁸. সুনানুল কুবরা লিলবাইহাকী ৬/১২৫ (শামেলা সংস্করণ: ৬/২০৭ পৃ: হা/১১৯৯৩)。
²⁹⁹. সুনানে সুগরা লিল বাইহাকি মা’আ আল-মানাকুল কুবরা ৬/২৩৩-৩৫, ২৫০৩ নং। (যদি হাদীসটি সহীহ না হয় তা হলে ওয়াজিব তা’লিমের ক্ষেত্রে যঈফ হাদীস কিভাবে প্রয়োগযোগ্য হতে পারে? –অনুবাদক
¹¹⁸. মুওয়াত্তার সুনানে আবী দাউদ মা'আল মা'আলিমুস সুনান ৫/৭০-৭১ (শামেলা সংস্করণ: মা'আলিমুস সুনান ৩/৯৯-১০০) ৭:১。
¹⁶⁹. তাফসীর ইবনু কাসীর, সূরা বাক্বারাহ ৪১ নং আয়াতের তাফসীর দ্রঃ。
¹⁷⁰. সুনানুল কুবরা ৬/১২৬।
¹⁵¹. তাদলিস তাসবিয়াহ: শাইখ থেকে হাদীস রিওয়ায়াত করে পারস্পরিক সাক্ষাৎ হয়েছে এমন দু’জন ফিক্বাহ রাবীর মধ্যস্থলের একজন দুর্বল রাবীকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়াকে তাদলিসে তাসবিয়াহ বলে। [ড. মাহমুদ আত-তাহহান, হাদীসের পরিভাষা (ইফা) ৭১ পৃ:। আলোচ্য বইটির লেখক ড. আবু আব্দুল্লাহ দামানামদার সংজ্ঞাটি হলো : “এমন মুদাল্লিস যে কোনো সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো রাবীর নামের পূর্বে ‘আন শব্দ উল্লেখ করে যঈফ বা মাতরুক রাবীকে সনদের মধ্যে থেকে উহ্য করে দেয়। এ ধরনের রাবীর এমন হাদীস যঈফ হিসেবে গণ্য হয়। পক্ষান্তরে এ ধরনের রাবীর বর্ণনা তখন সহীহ গণ্য করা হয়, যে বর্ণনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শোনার সম্পূর্ণতা থাকে। [যিনি উমর পর উজরাত কা জাওয়ায পৃ: ৫৪]
¹⁵². সহীহাহ ১/১৫৯ (শামেলা সংস্করণ: ১/৫২৪-৫৮ পৃ: ২/২৬৫-৬৬ আলোচনা。
¹⁵³. সুনানে ইবনু মাজাহ্ ২/২১৫৮, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী ৫/১২৫。
📄 তৃতীয় দলীল: সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী –এর হাদীস
تَعَلَّمُوا الْقُرْآنَ وَسَلُوا اللهَ بِهِ الْجَنَّةَ قَبْلَ أَنْ يَتَعَلَّمَهُ قَوْمٌ يَسْأَلُونَ بِهِ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْقُرْآنَ يَتَعَلَّمُهُ ثَلَاثَةٌ: رَجُلٌ يُبَاهِي، وَرَجُلٌ يَسْتَأْكِلُ بِهِ، وَرَجُلٌ يَقْرَأُهُ لِلَّهِ.
“কুরআনের তা’লিম দাও, এর দ্বারা আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও – তার (এমন সময়ের) পূর্বে যখন একটি কওম কুরআনের তা’লিম দেবে এবং তা দ্বারা দুনিয়া চাইবে। নিশ্চয় কুরআন তিন ধরনের লোক তা’লিম দেয়। ১) যে ব্যক্তি এটার দ্বারা গর্ব করে, ২) ঐ ব্যক্তি যে এর দ্বারা খায় এবং ৩) ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা পাঠ করে।”¹⁵⁴
হাদীসটির সনদ হল: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، أَخْبَرَنَا ابْنُ لَهِيعَةَ، عَنْ مُوسَى بْنِ وَرْدَانَ، عَنْ أَبِي الْهَيْثَمِ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ.
সনদটির একজন রাবী ইবনু লাহিয়াহ্- ত্রুটিযুক্ত স্মৃতিশক্তির অধিকারী। এ জন্য তিনি যঈফ।
এই বর্ণনাটির সমর্থনে আল্লামা মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী <binary data, 1 bytes> সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী <binary data, 1 bytes> থেকে অপর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন¹⁵⁵
কিন্তু এই বর্ণনাটির বিষয়বস্তু উপরের বর্ণনাটিকে সমর্থন করে না। এই বর্ণনার শেষাংশে রয়েছে: ... وَيَقْرَأُ الْقُرْآنَ ثَلَاثَةٌ مُؤْمِنٌ وَمُنَافِقٌ وَفَاجِرٌ ...
“...কুরআন তিন ধরনের লোক পাঠ করে: মু’মিন, মুনাফিক্ব ও ফাজির...” এই বাক্যটি মারফূ’ হাদীসের অংশ নয়। তা ছাড়া অন্যতম বর্ণনাকারী ওয়ালিদ বিন ক্বায়েস তূজিবি কেবল মাকবূল স্তরের রাবী। আর এক্ষেত্রে তার অন্য কোনো মুতাবা’আতও নেই।
টিকাঃ
¹⁵⁴. কিয়ামূল লায়ল লিল মারফি’য়ি পৃ: ৭৪ সূত্রে: সিলসিলাহ সহীহাহ ১/২১৯ হা/২৫৮。
¹⁵⁵. দ্র: ‘ঝলকু আ‘ফআল ওয়ার ইবাদ (পৃ: ১৬), মুস্তাদরাক (৪/৫৭৪), মুসনাদে আহমাদ (৩/৩৮), সহীহ ইবনু হিব্বান (৩/৩২ হা/৭৫৬)]
📄 চতুর্থ দলীল: সাহাবী জাবির –এর বর্ণনা
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ وَنَحْنُ نَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَفِيْنَا الْأَعْرَابِيُّ وَالْأَعْجَمِيُّ، فَقَالَ: «اِقْرَؤُوْا فَكُلٌّ حَسَنٌ وَسَيَجِيءُ أَقْوَامٌ يُقِيمُوْنَهُ كَمَا يُقَامُ الْقِدْحُ يَتَعَجَّلُوْنَهُ وَلَا يَتَأَجَّلُوْنَهُ».
“জাবির (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে আসলেন আর তখন আমরা কিরাআত করছিলাম। সেখানে আরব ও অনারব ছিল। তিনি (সঃ) বললেন: তোমরা কুরআন পড়, সবাই সুন্দর পড়ছে। অচিরেই এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআনকে তীরের ন্যায় ঠিক করবে। তারা তাড়াতাড়ি করবে এবং ধীরস্থিরভাবে করবে না।”³³⁸
সাহল বিন সা'দ আস-সাঈদি বর্ণিত আবু দাউদের পরবর্তী হাদীসের শেষাংশে আছে:
يَتَعَجَّلُ أَجْرَهُ وَلَا يَتَأَجَّلُهُ
“তারা কুরআনের মজুরির জন্য তাড়াতাড়ি করবে, আর (আখিরাতের ব্যাপারে) ধীরস্থির হবে না।”³³⁹
আবু দাউদের সনদটি হল:
حَدَّثَنَا وَهْبُ بْنُ بَقِيَّةَ، أَخْبَرَنَا خَالِدٌ، عَنْ حُمَيْدٍ الْأَعْرَجِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ...
মুসনাদে আহম্মাদের (৩/৩৫৭) সনদও এটাই। কিন্তু তাতে একটি ভুল সৃষ্টি হয়েছে। তাতে খালেদের পরের عن শব্দটি ইবন-এ পরিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ “ খালিদ ‘আন হুমাইদ আল-আ’রাজ” হয়েছে “খালিদ বিন হুমাইদ আল-আ’রাজ”। শাইখ আলবানী (রঃ) এর সনান্দানের দিকে ইশারা করেছেন।³⁴⁰
এই বর্ণনাটি সহীহ। এখানে হুমাইদ আল-আ'রাজ বলতে হুমাইদ আল-আ'রাজ আল-কুফী নন। কেননা সে যঈফ রাবী। বরং তিনি হলেন, হুমাইদ বিন কায়েস আল-মাক্বি আল-আ'রাজ আবু সুফিয়ান আল-ক্বারী – তিনি সিক্বাহ। তবে সাহাবী সাহল বিন সা’দ আস-সা’য়িদির বর্ণনাতো ইবনু লাহিয়াহ ও ওয়াফা বিন ওয়াইয়াহ আস-সাদাফি আছেন। ওফা মাকবুল স্তরের রাবী। মুসনাদে আহমাদ (৩/১৪৬, ১৪৫) এই বর্ণনাটি (‘মুসনাদে সাহল’-এর পরিবর্তে) ‘মুসনাদে আনাস’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাইখ আলবানী رحمه الله কাছে ইবনু লাহিয়াহ ভুলের শিকার হতেন। একারণে সেটা ‘মুসনাদে আনাসে’ সাহল বিন সা’দ আস-সা’য়িদির বর্ণনার বদল।¹⁴⁹
এই বর্ণনাটির দাবি হল, কিছু লোক কুরআন তিলাওয়াতও সহীহ-শুদ্ধ করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করবে। এমনকি তারা তীরের মতো তিলাওয়াতের পদ্ধতিকে সোজা করবে। ইলমে তাজবীদ মোতাবেক সেটা আদায় করার জন্য খুব মেহনত করবে। কিন্তু এ সমস্ত পরিশ্রমের উদ্দেশ্য হল, দুনিয়াতে নাম কামানো ও রিয়াকারীতে পরিণত হওয়া। রিয়াকে হাদীসে ছোট শিরক বলা হয়েছে। যে তিন ধরনের লোক দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে তাদের একটি ধরন হল, তারা ক্বারী আলেম, যারা নাম কামানোর জন্য কুরআন ও হাদীসের ইলম অর্জন করবে। কিন্তু এই রিয়াকারীদেরকে জাহান্নামবাসী বানানো হবে।
এই ছাড়া হাদীসটির আরও একটি দাবি হল, কুরআন পাঠকারী কুরআনের বিরোধিতা করবে, যা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা সুস্পষ্ট হয়:
...حَدَّثَنِي زَيْدُ بْنُ وَهْبٍ الْجُهَنِيُّ أَنَّهُ كَانَ فِي الْجَيْشِ الَّذِينَ كَانُوا مَعَ عَلِيٍّ ﭬ الَّذِينَ سَارُوا إِلَى الْخَوَارِجِ فَقَالَ عَلِيٌّ ﭬ أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ «يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قِرَاءَتُكُمْ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صَلَاتُكُمْ إِلَى صَلَاتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَحْسَبُونَ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الْإِسْلَامِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ».
“যায়দ বিন ওয়াহাব আল-জুহানি থেকে বর্ণিত। যে সেনাদল আলী ﭬ-এর সাথে খারেজিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল- তিনি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন। আলী ﭬ বললেন: হে লোক সকল! আমি রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: আমার উম্মাতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআন পাঠ করবে। তোমাদের কিরাআত তাদের কিরাআতের কাছে কিছুই না। তাদের সালাতের কাছে তোমাদের সালাত কিছুই না। তাদের সিয়ামের কাছে তোমাদের সিয়াম কিছুই না। কুরআন পাঠ করে তারা ধারণা করবে তাদের সওয়াব হচ্ছে। নিশ্চয় তা তাদের ক্ষতির কারণ হবে। তাদের সালাত (অন্য বর্ণনায়: কুরআন) তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা ইসলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেভাবে তীর শিকারকে (উদ্দেশ্য করে ধনুক থেকে) বের হয়ে যায়।”¹⁹⁰
অর্থাৎ প্রকৃত ইসলামের কোনো চিহ্ন তাদের মধ্যে থাকবে না। এ থেকে বুঝা যায়, কুরআন খুব সুললিত কণ্ঠে পাঠ করা বাতিল ফিরকার বৈশিষ্ট্য। এই সমস্ত জামা‘আতও কুরআনের যথাযথ অনুসরণ করা থেকে দূরে থাকে। অন্যথায় কুরআন সুন্দর কণ্ঠে ও তাজবিদের সাথে পাঠ করা নিষিদ্ধ নয়। বরং হাদীসে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিংবা হাদীসটি দ্বারা ঐসব লোককে বুঝানো হয়েছে, যারা কুরআনের বাহ্যিক (শাব্দিক) অর্থ গ্রহণ করে এবং সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করে। তা ছাড়া কুরআনের বাহ্যিক অনুসরণ জবরদস্ত দাবি করে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের আমল কুরআনের উপর থাকে না। কেননা কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীসের মাধ্যমে হয়। তারা তা গ্রহণ করবে না। এর দ্বারা খারেজিদের বুঝানো হয়েছে। আর খারেজিদের অনুসরণে সমস্ত ফিরকা যারা নিজেরাও খারেজিদের মতো তাকফিরের চেতনা রাখে। তারা নিজেদেরকে ছাড়া সমস্ত মুসলিমদেরকে কাফির গণ্য করে। ...
टিকা:
৩৩৮. আবু দাউদ হা/৮৩০, মুসনাদে আহম্মাদ ৩/৩৫৭, ৩৯৭।
৩৩৯. আবু দাউদ হা/৮৩১।
৩৪০. আস-সহীহাহ্ ১/৪৬৪।
¹⁴⁹. ৭১, আস-সহীহাহ ১/৪৮৫ (শামেলা: ১/৫২১ হা/২৫৯-এর আলোচনা)।
¹⁹⁰. সহীহ মুসলিম – কিতাবুল যাকাত بَابُ التَّحْرِيضِ عَلَى قِتَالِ الْخَوَارِجِ (শামেলা হা/২৫৩৬)。
📄 পঞ্চম দলীল: সাহাবী উসমান বিন আবীল আসের হাদীস
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ اجْعَلْنِي إِمَامَ قَوْمِي، قَالَ: «أَنْتَ إِمَامُهُمْ وَاقْتَدِ بِأَضْعَفِهِمْ وَاتَّخِذْ مُؤَذِّنًا لَا يَأْخُذُ عَلَى أَذَانِهِ أَجْرًا».
“উসমান বিন আবীল 'আস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমাকে আমার কওমের ইমাম নিযুক্ত করুন। তিনি ﷺ বললেন: তুমি তাদের ইমাম। দুর্বল মুক্বতাদিদের প্রতি খেয়াল রেখ। আর এমন কাউকে মুয়াযযিন নিযুক্ত করবে যে এর মজুরি নেবে না।”¹¹⁹
মিশকাতের ব্যাখ্যাকারী উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী হাদীসটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন: فيه دليل على أنه يكره أخذ الأجرة على الأذان. قال الخطابي: أخذ المؤذن الأجر على أذانه مكروه في مذاهب أكثر العلماء ، وقال مالك: لا بأس به ، ويرخص فيه ... واستدل بعضهم على التحريم بهذا الحديث ، ولا يخفى أنه لا يدل على التحريم. وقيل: يجوز أخذها على التأذين في محل مخصوص ، إذ ليست على الأذان حينئذ بل على ملازمة المكان كأجرة الرصد ، والقول الراجح عندنا ما ذهب إليه أكثر العلماء.
“এই দলীল দ্বারা আযানের মজুরি অপছন্দনীয় (মাকরূহ) হয়। খাত্তাবি বলেন: মুয়াযযিনের জন্য আযানের বিনিময় নেয়া অধিকাংশ আলেমদের মাযহাব অনুযায়ী মাকরূহ। ইমাম মালেক বলেছেন: এতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি এ মাসআলাতে রুখসাত (ছাড়) দিয়েছেন। ...কিছু আলেম এ হাদীসের আলোকে মজুরি হারামের দলীল নিয়েছেন। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, এতে হারামের দলীল নেই। বলা হয়: নির্দিষ্ট স্থানের (দায়িত্ব পালনে সময় দেয়ার কারণে) আযানের মজুরি নেয়া জায়েয। কেননা সেটা আযানের বিনিময় নেয়া নয়। বরং এটা নির্দিষ্ট স্থানের দায়িত্বপালন (অযু, পানি এবং পেশাব-পায়খানার ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ধোয়া-মোছা) যেমন – পাহারাদারীর মজুরি। আমাদের কাছে এই উক্তিটিই প্রাধান্যপ্রাপ্ত। আর অধিকাংশ আলেম ওদিকেই গিয়েছেন।”¹²⁰
ইসলামি রাষ্ট্র বাইতুল মাল থেকে মুয়াজ্জিনের ভাতা নির্ধারণ করতে পারে। কিংবা মাসজিদের পরিছন্নতাকর্মীদের বেতন নির্ধারণ করতে পারে এবং তারা এর সাথে সাথে সওয়াবের নিয়াতে আযান দিতে পারে। ইমাম বায়হাক্বী রহ. বর্ণনা করেছেন:
قَالَ الشَّافِعِيُّ: قَدْ أَرْزُقُ الْمُؤَذِّنِينَ أَمَامَ هُدًى عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ.
ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, হেদায়াতের অনুসারী ইমাম উসমান রাযি. মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।¹²³
ইমাম বায়হাক্বী রহ. এক্ষেত্রে দলিল পেশ করে বলেন: "... قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: " إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ " رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي الصَّحِيحِ، عَنْ سَيِّدَانَ بْنِ مَضَارِبٍ، عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ وَزَوْزَيْنَا فِي حَدِيثٍ أَبِي مَحْذُورَةَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ دَعَاهُ حِينَ قَضَى التَّاذِينَ فَأَعْطَاهُ صُرَّةً فِيهَا شَيْءٌ مِنْ فِضَّةٍ.
"... ইমাম বুখারী রহ. তাঁর ‘সহীহ বুখারী’-তে উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি গ্রহণ কর, সেক্ষেত্রে কুরআনের বেশি হকদার।’ তা ছাড়া সিদান বিন মুয়ারিব বর্ণনা করেছেন আবী মা’শার থেকে আমাদেরকে আবূ মাহযুরার হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, আমি আযান দেয়া শেষ করলে নবী ﷺ আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে একটি থলি দান করলেন। যাতে ছিল কিছু রৌপ্য।"¹²⁴
সর্বোপরি উম্মাতের ধারাবাহিক আমলেও আযানের মজুরিকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়নি।
টিকাঃ
¹¹⁹. আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত (তাহকীক্ব) ২/৬৬৮। হাদীসটির দাবি সম্পর্কে এই পুস্তিকার ঈমী বিনিময় জায়েয সম্পর্কীয় আলোচনার 'অষ্টম দলীল: আযানের বিনিময়'-এ উল্লেখ করা হয়েছে。
¹²⁰. মিরআতুল মাফাতীহ (খামেলা) ২/৭৭২-৭৩ পৃ: – আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা।
¹²³. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী فِي رِزْقِ الْمُؤَذِّنِينَ (باب) (শামেলা ১/৬০৫)。
¹²⁴. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী فِي رِزْقِ الْمُؤَذِّنِينَ (باب) (শামেলা ১/৬০৫, ২/২০১৯); বিস্তারিত বর্ণনা এই পুস্তিকার দীনি বিনিময় জায়েয সম্পর্কিত আলোচনার ‘অষ্টম দলিল: আযানের বিনিময়’-এ উল্লেখ করা হয়েছে。