📄 শিঙ্গাকারীর মজুরি সম্পর্কিত হাদীসের বিরোধ নিরসন
হাজ্জামা বা শিঙ্গা লাগানোর মজুরি সম্পর্কে নাবী ﷺ বলেছেন: وَكَسْبُ الْحَجَّامِ خَبِيثٌ
“শিকারীর আয় খবিস (মাকরুহ/অপছন্দনীয়)।”²⁵⁰
পক্ষান্তরে নাবী ﷺ থেকেই শিকারীকে মজুরি দেয়া প্রমাণিত। যেমন, হুমায়িদ তাবেয়ি রাহ: বর্ণনা করেন: سُئِلَ أَنَسُ bْنُ مَالِكٍ، عَنْ كَسْبِ الْحَجَّامِ؟ فَقَالَ: احْتَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، حَجَمَهُ أَبُو طَيْبَةَ، فَأَمَرَ لَهُ بِصَاعَيْنِ مِنْ طَعَامٍ، وَكَلَّمَ أَهْلَهُ، فَوَضَعُوا عَنْهُ مِنْ خَرَاجِهِ، وَقَالَ: «إِنَّ أَفْضَلَ مَا تَدَاوَيْتُمْ بِهِ الْحِجَامَةُ»، أَوْ «هُوَ مِنْ أَمْثَلِ دَوَائِكُمْ»
“আনাস -কে শিকারীর মজুরি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ শিংগা লাগিয়েছিলেন। আবু তাইবা তাকে শিংগা লাগিয়েছিলেন এবং এর বিনিময়ে তিনি তাকে দুই সা’ খাদ্য দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তার ব্যাপারে তার মালিকের সাথে আলোচনা করলেন। তার মালিকেরা তার উপর খারাজ (ধার্যকৃত খাজনা) কমিয়ে দিল। তিনি আরও বলেছেন: শিংগা লাগানোটা তোমাদের চিকিৎসার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম। অথবা বলেছেন: শিংগা লাগানো উত্তম চিকিৎসা।”¹⁰¹
যখন একটি মুজরুকে খবিস বলা সত্ত্বেও অপর দলীল দ্বারা তার বৈধতা প্রমাণিত হয়। তখন সেটাকে আর খবিস বলা যায় না। ...
এ থেকে বুঝা যায়, যেভাবে শিংগা লাগানোর মজুরি খবিস হওয়ার অর্থ নাজায়েয বা হারাম নয়। বরং অপছন্দনীয় জায়েয। তেমনি আয়ানের মজুরি নেয়া অপছন্দনীয় জায়েয। বরং এর অপছন্দ হওয়ার বিষয়টি শিকারীর মজুরির থেকে কম অপছন্দনীয়। কেননা আয়ানের মজুরির ক্ষেত্রে (খবিস প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করে) কোনো হুকুম লাগানো হয়নি।
সংশোধন: লেখক হাদীসের বিরোধ সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। যার একটি হল:
“সহীহ সূত্রে একই হুকুমের বিপরীত হুকুম বা আমল থাকলে কঠিন হুকুমটি শিথিল হুকুম হিসেবে গণ্য হবে।” -এক্ষেত্রে লেখক বিভিন্ন ইমাম, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের সূত্রে এই নীতির আলোকে সমাধান দিয়েছেন।
আমরা যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যাধিক্য দ্বারা বিষয়টি বিবেচনা করি তা হলে এটা সুস্পষ্ট হয় যে,
ক) শিকারীর উপার্জন খবিস ও নিষেধ মর্মে হাদীসের বর্ণনাকারীরা হলেন: ১) সাহাবী রাফি’ বিন খাদিজ (তাং. বুলুগুল মারাম ২/১১০) এবং ২) আবু মাসউদ উকবাহ বিন আমর -এর হাদীস। তিনি বলেন: نَهَى رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ عَنْ كَسْبِ الْحَجَّامِ “রাসূলুল্লাহ ﷺ শিকারীর উপার্জনকে নিষেধ করেছেন।”¹⁰²
খ) পক্ষান্তরে শিকারীর উপার্জন হালাল হওয়ার সমর্থনে যে সমস্ত সাহাবীর বর্ণনা রয়েছে তাঁরা হলেন: ১) আনাস - সহীহ মুসলিম ৫/৩৮২। হাদীসটির বর্ণনা কিছু পূর্বে উল্লেখ করেছি।
২) হারাম বিন মুহাইয়্যাস رضي الله عنه তার পিতা (সাহাবী মুহাইয়্যাস বিন মাস‘উদ বিন কা‘ব رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেন: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ عَنْ كَسْبِ الْحَجَّامِ، فَنَهَاهُ عَنْهُ، فَذَكَرَ لَهُ الْحَاجَةَ، فَقَالَ: «اِعْلِفْهُ نَوَاضِحَكَ» “তিনি নাবী ﷺ-কে শিকারীর উপার্জন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি তাকে তা ভোগ করতে নিষেধ করেন। তিনি নাবী ﷺ-কে তার প্রয়োজনের কথা বললে তিনি ﷺ বললেন: তুমি তোমার উটের আহার সংগ্রহে তা খরচ কর।”¹³⁰ এই হাদীসটি উক্ত মজুরিটির সরাসরি অপছন্দনীয়-জায়েয হওয়ার দলীল।
৩) ইবনু আব্বাস رضي الله عنه-এর হাদীস। তিনি বলেন: «احْتَجَمَ النَّبِيُّ ﷺ عَبْدٌ لَبَنِي بَيَاضَةَ، فَأَعْطَاهُ النَّبِيُّ ﷺ أَجْرَهُ، وَلَوْ كَانَ سُحْتًا لَمْ يُعْطِهِ النَّبِيُّ ﷺ ضَرِيبَتَهُ، وَلَوْ كَانَ سُحْتًا لَمْ يُعْطِهِ النَّبِيُّ ﷺ» “বনী বায়িয়াদা গোত্রের এক দাস নাবী ﷺ-কে শিঙ্গা লাগান। নাবী ﷺ তাকে তার মজুরি দেন এবং তার মনিবের সাথে (খাজনা কমিয়ে দেওয়ার) কথা বললেন। অতএব সে তার দৈনিক আয়ের একটা অংশ যে হারে নিত তার পরিমাণ হ্রাস করে দেয়। যদি তা হারাম হতো, তা হলে নাবী ﷺ তাকে পারিশ্রমিক দিতেন না।”¹³⁴
৪) আলী رضي الله عنه-এর হাদীস। তিনি বলেন: «احْتَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، وَأَمَرَنِي فَأَعْطَيْتُ الْحَجَّامَ أَجْرَهُ» “রসূলুল্লাহ ﷺ শিঙ্গা লাগিয়েছেন এবং আমাকে নির্দেশ দেন হাজ্জামকে (শিঙ্গাকারীকে) মজুরি দিতে।”¹³⁵
নাবী ﷺ-এর এই নির্দেশটি সুস্পষ্ট করে হাজ্জামের উপার্জন জায়েয। হাদীসটি কৃশালি বা নির্দেশসূচক হাদীস।
এ পর্যায়ে শিকারকারীর মজুরি জায়েয হওয়ার বর্ণনাকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার ভিত্তিতে এর জায়েয হওয়াটাই প্রাধান্য পায়। অন্যভাবে বলা যায়, অল্প সংখ্যকের বর্ণনা মানসুখ কিংবা প্রায়োগিক দলীল হিসেবে তা দুর্বল। কেননা যে আমলটি সাহাবীদের মধ্যে ব্যাপক ও প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেটার বর্ণনাকারী সংগত কারণেই বেশি হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। –অনুবাদক]
টিকাঃ
২৪৯. লেখক হাফেয আবু ইয়াহইয়া নূরপুরী আরও কয়েকজন ইমাম, মুহাদ্দিস ও ফকীহর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আমরা এখানে সংক্ষিপ্ত করলাম। – অনুবাদক
২৫০. সহীহ মুসলিম – কিতাবুল মুসাক্বাহ ... بَابُ تَحْرِيمِ ثَمَنِ الْكَلْبِ ... হা/১৫৩৬; তাহক্বীক্ব বুলূগুল মারাম হা/৯১০。
¹⁰¹. সহীহ মুসলিম - কিতাবুল মুসাক্বাহ بَابُ جَازَ أَجْرُ الْحِجَامَةِ অনুচ্ছেদ: শিকারীর মজুরি হালাল, ২/১৭১ (খিলাফিয়া ৫/৩৮২)।
¹⁰². তাফ. ইবনু মাজাহ হা/২১৬৪।
¹³⁰. তাফসির ইবনু মাজাহ হা/২১৬৬, আবূ দাউদ অতিরিক্ত আছে: وَرَزَقِكَ ‘এবং তোমার দাসকে দিবে।’ (তাহক্বীক্ব আবূ দাউদ হা/৩৪২২)।
¹³⁴. সহীহ মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হা/৩৮৬৬।
¹³⁵. ইবনু মাজাহ হা/২১৬৩; শাইখ আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
📄 আযানের বিনিময় সম্পর্কিত একটি যঈফ বর্ণনা
عَنْ يَحْيَى الْبَكَّاءِ، قَالَ: كُنْتُ آخِذًا بِيَدِ ابْنِ عُمَرَ، وَهُوَ يَطُوْفُ بِالْكَعْبَةِ، فَلَقِيَهُ رَجُلٌ مِنْ مُؤَذِّنِي الْكَعْبَةِ، فَقَالَ: إِنِّيْ لَأُحِبُّكَ فِي اللهِ، فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: «وَإِنِّي لَأُبْغِضُكَ فِي اللَّهِ، إِنَّكَ تُحَسِّنُ صَوْتَكَ لِأَخْذِ الدَّرَاهِمِ»
“ইয়াহইয়া বাক্কা বলেন: আমি ইবনু উমার (রা) হাত ধরেছিলাম। তিনি কা'বা তাওয়াফ করছিলেন। তখন কা’বার এক মুয়াযযিনের সাথে তাঁর সাক্ষাত্ হলো। তিনি (মুয়াযযিন) তাঁকে বললেন: আমি আপনাকে আল্লাহর খাতিরে মুহাব্বাত করি। ইবনু উমার (রা) বললেন: আমি তো আল্লাহর খাতিরে তোমাকে ঘৃণা করি। কেননা তোমরা দিরহামের খাতিরে নিজেদের আওয়াযকে সুন্দর কর।”¹³⁶
উল্লেখ্য যে, ইমাম আবূ নাসীমের বর্ণনানুযায়ী ইয়াহইয়া বাক্কা বলেছেন যে, তিনি সাঈদ বিন জুবায়েরের হাত ধরেছিলেন। জিহার্ফ্ব মতনে ইযতিরাব বা স্ববিরোধিতা আছে, যা হাদীসটির অন্যতম একটি ত্রুটি। [-অনুবাদক]
এখানে ইয়াহইয়া বাক্কা যঈফ রাবী।¹³⁷
টিকাঃ
১৩৬. আস-সলাত লিইবনি নাসীম – باب اخذ الأجرة على الأذان ৭১: ১৫২ (মাকতাবাতুল ওরাইন আসারিয়ায, মাদীনা মুনাওয়ারা ১৪১৮), মুসনাদ ইবনু আবী শায়বাহ ২/২৩৭ (শামেলা হা/২৫৭২)。
১৩৭. আল-কাশিফ লিযযাহাবী ২/৩৭৬, তাহযীবুত তাহযীব ৫: ৪৬৭。
📄 কুরআন লিখে/ছাপিয়ে প্রকাশ করা ও তার ক্রয়-বিক্রয় [সংযোজন শেষ]
আধুনিককালে কুরআনের কপি লিখে (ছাপিয়ে) প্রকাশ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও মজুরি গ্রহণ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশকের মাধ্যমে তা সর্বসাধারণের জন্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই মজুরি ও ক্রয়-বিক্রয়ের পক্ষে পূর্বে বর্ণিত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত “কুরআন সর্বোত্তম বিনিময়ের” হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করা হয়।
প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুহাদ্দিস হাফেয আবূ সুলায়মান হাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ খাত্তাবী (৩১৬-৩৮৮ হি:) বলেন:
وفي الحديث دليل على جواز بيع المصاحف وأخذ الأجرة على كتبها، وفيه إباحة الرقية بذكر الله في أسمائه، وفيه إباحة أجر الطبيب والمعالج وذلك أن القراءة والنفث فعل من الأفعال المباحة، وقد أباح له أخذ الأجرة عليها فكذلك ما يفعله الطبيب من قول ووصف وعلاج فعل لا فرق بينهما.
“এই (ঝাড়-ফুঁকের বিনিময়ে বকরি গ্রহণের) হাদীসে এই দলীল রয়েছে যে, মাসহাফ (কুরআন) ক্রয়-বিক্রয় এবং এর কপি করার মজুরি জায়েয। এ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ ﷺর বরকতময় নাম পাঠ করে ঝাড়-ফুঁক করাও বৈধ। তা ছাড়া ডাক্তার ও হেকিমের মজুরিও মুবাহ্। তেমনি কিরাত, ঝাড়-ফুঁক ও দম করা মুবাহ্ এবং নবী ﷺ এই কাজের ভিত্তিতে মজুরিকে বৈধ করেছেন। তেমনি ডাক্তার কথা এবং প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে যে চিকিৎসার দেন সেটাও একটি কাজ। এই দুই কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” ¹⁵⁸ --- [ইয়াহইয়া নুপুরী থেকে সংযোজন শেষ হল। - অনুবাদক]
টিকাঃ
¹⁵⁸. মাআলিমুস সুনান ৩/১০১ পৃ: ১