📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 দ্বিতীয় উমার– উমার বিন আব্দুল আযীযের আমল

📄 দ্বিতীয় উমার– উমার বিন আব্দুল আযীযের আমল


উমার বিন আব্দুল আযীয রَحِمَهُ اللهُ কুরআন ও হাদীসে মনোনিবেশরত ব্যক্তিদেরকে বৃত্তি দিতেন।¹⁰¹
অ এছাড়া তিনি মু'আল্লিমদের জন্য বেতন নির্ধারণ করেছিলেন। [কিতাবুল আমওয়াল পৃ: ৬৭৫]
আ দু'টি বর্ণনার বিস্তারিত নিম্নরূপ:
كَتَبَ إِلَي أَبُو مُحَمَّدِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عُثْمَانَ بْنِ الْقَاسِمِ الدِّمَشْقِيِّ، وحدثني بذلك ، مُحَمَّدُ بْنِ يُوسُفَ النَّيْسَابُورِي عَنْهُ ، قَالَ : أَخْبَرَنَا أَبُو الْمَيْمُونِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْبَجَلِيُّ ، قَالَ : أَخْبَرَنَا أَبُو زُرْعَةَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَمْرٍو النَّصْرِيِّ ، قَالَ : حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُبَارَكِ ، قَالَ : حَدَّثَنَا ابْنُ عَيَّاشٍ ، عَنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي مَرْيَمَ ، قَالَ : كَتَبَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِلَى وَالِي حِمْصٍ : مَرِ لِأَهْلِ الصَّلاحِ مِنْ بَيْتِ الْمَالِ بِمَا يُغْنِيهِمْ لِئَلَّا يَشْغَلُهُمْ شَيْءٌ، عَنْ تِلَاوَةِ الْقُرْآنِ وَمَا حَمَلُوا مِنَ الْأَحَادِيثِ
"আবু বাকার বিন আবী মারইয়‍্যাম বলেন: উমার বিন আব্দুল আযীয رَحِمَهُ اللهُ হিমসের গভর্নরের নামে এ ফরমান লেখেন যে, আহলে সলাহকে বাইতুল মাল থেকে এতটা অংশ নির্ধারিত করে দাও যেন মুখাপেক্ষী না থাকে। ফলে তেলাওয়াত কুরআন ও হাদীস অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো কিছু তাদেরকে ব্যস্ত রাখবে না।"¹⁰²
... আবু গায়লান বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ বিন আবী মালিক দামেশকি, হারিস বিন ইয়াযিদ আল-আশ‘আরীকে গ্রামে মু‘আল্লিম (শিক্ষক) হিসেবে পাঠান, যেন তারা লোকদেরকে দ্বীনের ইলম শেখায়। এ কাজের জন্য তাদেরকে তিনি বেতন দিতেন। তখন ইয়াযিদ বেতন গ্রহণ করেন আর হারিস তা নিতে অস্বীকার করেন। ফলে উমার বিন আব্দুল আযীযকে এ ঘটনা জানানো হলো। তিনি জবাব লিখলেন: ইয়াযিদ যা করেছেন তাতে কোনো দোষ মনে করি না। আর আল্লাহ্ عَزَّ وَجَلَّ আমাদের মাঝে হারিস বিন ইয়াযিদের মতো মানুষ বেশি সৃষ্টি করুন।¹⁰³
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, উমার ইবনু আব্দুল আযীয দ্বীনী কাজের বিনিময় দেওয়ার সমর্থক ছিলেন। অবশ্য যদি কোনো ব্যক্তি দ্বীনী তা'লিম আল্লাহর রাহে করে থাকে, তবে তা এতটাই সুন্দর আমল যে, তাদের প্রতি দু'আ করতে হবে; আল্লাহ্ যেন এমন মুখলেস ও সালেহ বান্দা বেশি বেশি সৃষ্টি করেন, যারা অবস্থাসম্পন্ন ও ধনী হওয়া ছাড়াও ইলমে দ্বীনের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞ।

টিকাঃ
১০১. শারহু আসহাবুল হাদীস প: ৬৮।
১০২. শারহু আসহাবুল হাদীস [باب من جعل من الخلفاء في بيت المال نصيبا لاصحاب الحديث ]. মুহাক্কিক্ব আমর আব্দুল মুনঈম সালিম বলেন: এ বর্ণনাটি যঈফ। কেননা এর সনদে আবু বকর বিন আবী মারইয়‍্যাম যঈফ রাবী। [তাহক্বীক্ব শারহু আসহাবুল হাদীস প: ১২০, নং ১২৪]– অনুবাদক।
১০৩. কিতাবুল আমওয়াল প: ২৭৫।

📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 ক্বাযীর দায়িত্বপালনের জন্য বেতন প্রদান

📄 ক্বাযীর দায়িত্বপালনের জন্য বেতন প্রদান


ইসলামী রাষ্ট্রে ক্বাযী কুরআন ও সুন্নাহর দ্বারা লোকদের মাঝে বিচার-ফায়সালা করে থাকে। আর এ কাজে তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকে। এ কারণে ক্বাযীর জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেতন নেয়া জায়েয। ইমাম বুখারী ‘সহীহ বুখারী’র- কিতাবুল আহকামে নিম্নোক্ত বাব বা অনুচ্ছেদ লিখেছেন: بَابُ رِزْقِ الْحُكَّامِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا “অনুচ্ছেদ: শাসক ও দায়িত্বশীলদের বেতন নেয়া।” ইমাম বুখারী (রহ.) উক্ত অনুচ্ছেদে লিখেছেন: وَكَانَ شُرَيْحٌ الْقَاضِي يَأْخُذُ عَلَى الْقَضَاءِ أَجْرًا وَقَالَتْ عَائِشَةُ يَأْكُلُ الْوَصِيُّ بِقَدْرِ عَمَالِهِ وَأَكَلَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ “(ক্বাযী) শুরায়হ (রহ.) বিচার কার্যের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, (ইয়াতিমের) তত্ত্বাবধানকারী সম্পদ থেকে তার পারিশ্রমিকের সমপরিমাণ খেতে পারবেন। আবূ বাক্কার (রা.) ও উমার (রা.) (রাষ্ট্রীয় ভাতা) ভোগ করেছেন।” 258 হাফেয ইবনু হাজার (রহ.) লিখেছেন: هُوَ شُرَيْحُ بْنُ الْحَارِثِ بْنِ قَيْسٍ النَّخْعِيُّ الْكُوفِيُّ قَاضِي الْكُوفَةِ وَلَاهُ عُمَرُ ثُمَّ قَضَى لِمَنْ بَعْدَهُ بِالْكُوفَةِ دَهْرًا طَوِيلًا وَلَهُ مَعَ عَلِيٍّ أَخْبَارٌ فِي ذَلِكَ وَهُوَ ثِقَةٌ مُخَضْرَمٌ أَدْرَكَ الْجَاهِلِيَّةَ وَالْإِسْلَامَ وَيُقَالُ إِنَّ لَهُ صُحْبَةٌ “(তিনি (ক্বাযী) শুরায়হ (রহ.) - যার নাম ছিল শুরায়হ বিন হারিস বিন কায়েস আল-জূ'ফি আল-কূফি। তিনি কূফার ক্বাযী ছিলেন। উমার (রা.) তাঁকে তাঁর যামাণাতে নিয়োগ করেছিলেন। উমার (রা.)-এর মৃত্যুর পরেও দীর্ঘ সময় তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এ সম্পর্কে আলী (রা.)-এর সাথে তাঁর আলোচনা কুতুবে হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে। তিনি সিকাহ্ ও মুখাযরাম (দুই যুগ) তথা জাহেলি ও ইসলামী যুগপ্রাপ্ত ছিলেন। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি সাহাবী ছিলেন।” 259
হাফেয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ আরও লিখেছেন: وَهَذَا الْأَثَرُ وَصَلَهُ عَبْدُ الرَّزَّاقِ وَسَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ مِنْ طَرِيقِ مُجَالِدٍ عَنِ الشَّعْبِيِّ بِلَفْظِ كَانَ مَسْرُوقُ لَا يَأْخُذُ عَلَى الْقَضَاءِ أَجْرًا وَكَانَ شُرَيْحٌ يَأْخُذُ. “এই আছারটি আব্দুর রাজ্জাক ও সাঈদ বিন মানসূর মুজালিদ عن আশ-শাবী থেকে উক্ত শব্দে বর্ণনা করেছেন। মাসরূক্ব কাযীর দায়িত্বের জন্য কিছু নিতেন না আর কাযী শুরাইহ নিতেন।”³⁰⁶
হাফেয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ আরও লিখেছেন: قَالَ الطَّبَرِيُّ ذَهَبَ الْجُمْهُورُ إِلَى جَوَازِ أَخْذِ الْقَاضِي الْأُجْرَةِ عَلَى الْحُكْمِ لِكَوْنِهِ يَشْغَلُهُ الْحُكْمُ عَنِ الْقِيَامِ بِمَصَالِحِهِ غَيْرِ أَنَّ طَائِفَةً مِنَ السَّلَفِ كَرِهَتْ ذَلِكَ وَلَمْ يُحَرِّمُوهُ مَعَ ذَلِكَ وَقَالَ أَبُو عَلِيٍّ الْكَرَابِيسِيُّ لَا بَأْسَ لِلْقَاضِي أَنْ يَأْخُذَ الرِّزْقَ عَلَى الْقَضَاءِ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ قَاطِبَةً مِنَ الصَّحَابَةِ وَمَنْ بَعْدَهُمْ وَهُوَ قَوْلُ فُقَهَاءِ الْأَمْصَارِ لَا أَعْلَمُ بَيْنَهُمَا اخْتِلَافًا وَقَدْ كَرِهَ ذَلِكَ قَوْمٌ مِنْهُمْ مَسْرُوقٌ وَلَا أَعْلَمُ أَحَدًا مِنْهُمْ حَرَّمَهُ. “ইমাম তাবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: জমহূরের মাযহাব হল, কাযীর জন্য বিচারের দায়িত্ব পালনের জন্য বেতন নেওয়া জায়েয। কেননা সে এই দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকায় অন্য কোনো কিছু (আয়-উপার্জন বা লেনদেন) করতে পারে না। কিন্তু সালাফদের একটি দল একে অপছন্দ করা সত্ত্বেও হারাম গণ্য করেননি। ইমাম আবূ আলা কারাবীসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আহলে ইলম সাহাবীগণ ও তাদের পরবর্তী সমস্ত আলেমের নিকট কাযীর জন্য বিচারের দায়িত্ব পালনে বেতন নেওয়াটা দোষের নয়। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো ইখতিলাফ জানা নেই। একটি পক্ষ কেবল অপছন্দ করেছে। যাদের মধ্যে মাসরূক্ব আছেন। আর আমি এটা জানি না যে, তাদের মধ্যে কেউ একে হারাম গণ্য করেছেন।”³⁰⁷
সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু কাযীদের জন্য বেতন ও ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।³⁰⁸
আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল খারাজ’ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল, ক্বাযীর মজুরি বৈধ। এর অন্যতম একটি কারণ হল, ইসলামী রাষ্ট্রসমূহে ক্বাযী বেতন পেয়ে আসছেন এবং আজ পর্যন্ত এ রেওয়াজ চালু আছে। একই অবস্থা মুফতি সাহেবদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং মুফতি সাহেবরাও বেতন পাবেন। ইমাম বুখারী ﷺ এ সম্পর্কিত অনুচ্ছেদটিতে দুটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। যার অন্যতম একটি হল, যাকাত আদায়কারীর (আমিলীনের) বেতন উল্লেখিত হয়েছে। যা আমরা চতুর্থ দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছি।
অনুবাদকের সংযোজন: মাসিক আস-সুন্নাহ (দারুত তাহক্বীক্ব ওয়া তাখসিস, জাহলাম, পাকিস্তান), ৭৯ সংখ্যা, ১০-৪৪ পৃষ্ঠার أَجْرَةُ أُمُورِ الدِّينِ: بَيْنَ الْأَجْرَةِ وَبَيْعِ الدِّينِ “দীনী কাজের বিনিময়: সর্বোত্তম উপার্জন, নাকি দীন বিক্রি” মূল: হাফেয আবূ ইয়াহইয়া নূরপুরী লিখিত প্রবন্ধের ‘আযানের বিনিময় বৈধতা’ অংশবিশেষ এখানে অষ্টম দলিল হিসেবে অনূদিত ও সংকলিত হল। – অনুবাদক
অষ্টম দলীল: আযানের বিনিময়
সাহাবী আবূ মাহযূরাহ رضي الله عنه বর্ণনা করেন: خَرَجْتُ فِي نَفَرٍ فَكُنَّا بَعْضَ طَرِيقِ حُنَيْنٍ مُقْفَلَ رَسُولِ اللهِ ﷺ مِنْ حُنَيْنٍ، فَلَقِيْنَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ فِي بَعْضِ الطَّرِيقِ، فَأَذَّنَ مُؤَذِّنٌ رَسُولِ اللهِ ﷺ بِالصَّلَاةِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَسَمِعْنَا صَوْتَ الْمُؤَذِّنِ وَنَحْنُ عَنْهُ مُنْتَكِبُوْنَ، فَظَلِلْنَا نُحَكِيْهِ وَنَهْزَأُ بِهِ، فَسَمِعَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الصَّوْتَ فَأَرْسَلَ إِلَيْنَا حَتَّى وَقَفْنَا بَيْنَ يَدَيْهِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «أَيُّكُمُ الَّذِي سَمِعْتُ صَوْتَهُ قَدِ ارْتَفَعَ؟» فَأَشَارَ الْقَوْمُ إِلَيَّ وَصَدَقُوْا، فَأَرْسَلَهُمْ كُلَّهُمْ وَحَبَسَنِي فَقَالَ: «قُمْ فَأَذِّنْ بِالصَّلَاةِ» فَفَقُمْتُ فَأَلْقَى عَلَيَّ رَسُولُ اللهِ ﷺ التَّأْذِيْنَ هُوَ بِنَفْسِهِ ... ثُمَّ دَعَانِي حِيْنَ قَضَيْتُ التَّأْذِيْنَ فَأَعْطَانِي صُرَّةً فِيْهَا شَيْءٌ مِنْ فِضَّةٍ، فَقَلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ مُرْنِي بِالتَّأْذِيْنَ بِمَكَّةَ فَقَالَ: «أَمَرْتُكَ بِهِ»، فَقَدِمْتُ عَلَى عَتَّابِ بْنِ أُسَيْدٍ عَامِلِ رَسُولِ اللهِ ﷺ بِمَكَّةَ فَأَذَّنْتُ مَعَهُ بِالصَّلَاةِ عَنْ أَمْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ
"আমি একটি কাফেলার সাথে বের হলাম। আমরা হুনাইনের কোনো একটি পথে গিয়ে উপনীত হলাম, যা ছিল রসূলুল্লাহ ﷺ-এর হুনাইন অভিযান থেকে ফেরার সময়। রাস্তায় রসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে আমাদের সাক্ষাত হল। এ সময় রসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুয়াযযিন তাঁর অদূরে আযান দিলেন। আমরা আযানের ধ্বনি শুনলাম, তখন আমরা ইসলাম থেকে বিমুখ ছিলাম। তাই আমরা আযানের অনুকরণ ও তা নিয়ে ঠাট্টা করছিলাম। রসূলুল্লাহ ﷺ সে আওয়াজ শুনে আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। অবশেষে আমরা (খুব অবস্থায়) তাঁর সামনে দাঁড়ালাম। তিনি ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন: তোমাদের মধ্যে কার আওয়াজ উঁচুস্বরে শুনেছি? লোকেরা আমার দিকে ইশারা করল আর তারা সত্য বলেছিল। তখন তিনি সবাইকে ছেড়ে দিলেন এবং আমাকে আটকে রাখলেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন: দাঁড়াও! সালাতের জন্য আযান দাও। আমি দাঁড়ালে রসূলুল্লাহ ﷺ নিজে আমাকে আযানের বাক্যগুলো শেখালেন। ...আমি আযান দেওয়া শেষ করলে তিনি আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে একটি থলি দান করলেন, যাতে ছিল কিছু রৌপ্য। তখন আমি বললাম: ইয়া রসূলুল্লাহ! আমাকে মক্কার আযান দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত করুন। উত্তরে তিনি বললেন: হ্যাঁ, তোমাকে মক্কার আযান দেওয়ার দায়িত্বে নিযুক্ত করলাম। তারপর আমি রসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক নিযুক্ত মক্কার আমিল (দায়িত্বশীল) আমীর বিন আত্বাব ইবনু আসীদ ﷺ-এর সাথে সাক্ষাত করি এবং রসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর সঙ্গে আযান দিতে থাকি।"¹³⁹
এই হাদীসটিতে রসূলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষ থেকে আযানের বিনিময়ে রৌপ্য প্রদান করার বর্ণনা রয়েছে।
ইমাম বায়হাকী র. হাদীসটি দ্বারা আযানের বিনিময় গ্রহণকে বৈধতার দলীল নিয়েছেন।¹⁴⁰
হয়তো কেউ এই দলিলের ব্যাপারে বিতর্ক করবে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রৌপ্য প্রদানে শিক্ষকদানের প্রতি অন্তরকে আকৃষ্ট করার কৌশল গণ্য করবে। অথচ আলোচ্য দলিলটি দ্বারা আযানের বিনিময়ে জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সংশয় নেই।
উল্লেখ যে, বিনিময়হীন মুয়াজ্জিন নিয়োগ সম্পর্কিত যে হাদীসটি দ্বারা কিছু লোক দীনি কাজের বিনিময়ে নাজায়েয ও হারাম হওয়ার দলিল নিয়ে থাকেন। সালাফ ও উম্মাতের ফকীহগণ তা থেকে মজুরি নেয়াটা অপছন্দ হওয়ার দলিল নিয়েছেন (অর্থাৎ মজুরি না নেয়াটা মুস্তাহাব)। তাঁরা হাদীসটি দ্বারা হারামের দলিল নেননি। কেননা তাতে হারাম হওয়া সম্পর্কিত কোনো শব্দের ইশারা নেই। এ হাদীসটি এবং তা থেকে সালাফ ও ফকীহ্দের বুঝ নিম্নরূপ:
সাহাবী উসমান বিন আবিল ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন: يَا رَسُولَ اللهِ اجْعَلْنِي إِمَامَ قَوْمِي، قَالَ: أَنْتَ إِمَامُهُمْ وَاقْتَدِ بِأَضْعَفِهِمْ وَاتَّخِذْ مُؤَذِّنًا لَّا يَأْخُذُ عَلَى أَذَانِهِ أَجْرًا.
বললেন: তুমি তাদের ইমাম। তুমি তাদের দুর্বলদের প্রতি খেয়াল রাখবে। আর এমন একজন মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করবে যে নিজের আযানের মজুরি নেয় না।”¹⁴¹
এই হাদীসটি ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ ‘হাসান’ (২/২০৯), ইমাম ইবনু খুযায়মাহ ‘সহীহ’ (২/৪২৩), ইমাম হাকিম রাহিমাহুল্লাহ ‘ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ’ (২/৭১৫, ৭২২) বলেছেন।
হাফেয ইবনু আদী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটার সনদকে ‘জাইয়্যেদ’ বলেছেন।¹⁴² ...
১) ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন:
وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ كَرِهُوا أَنْ يَأْخُذَ الْمُؤَذِّنُ عَلَى الْأَذَانِ أَجْرًا، وَاسْتَحَبُّوا لِلْمُؤَذِّنِ أَنْ يَحْتَسِبَ فِي أَذَانِهِ.
“এই হাদীসের উপর আলেমরা আমল করেছেন। আলেমরা এটা অপছন্দ করেছেন যে, মুয়াযযিন আযানের মজুরি নেবে। তারা মুয়াযযিনের জন্য এটাই মুস্তাহাব মনে করেছেন যে, সে নিজের আযানের বিনিময়ে কেবল সওয়াব আশা করবে।”[¹⁴⁰]
২) ইমাম বাগাবী (হাফেয আবূ মুহাম্মাদ হুসাইন বিন মাসউদ) (রহ.) লিখেছেন: وَالْأَخْبَارُ عِنْدَ عَامَّةِ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنْ يَكْتَسِبَ بِالْأَذَانِ، كَرِهُوا أَنْ يَأْخُذَ عَلَيْهِ أَجْرًا. “অধিকাংশ আলেমদের নিকট মুস্তাহাব হল, মুয়াযযিন আযানের দ্বারা কেবল নেকী আশা করবে। তারা আযানের মজুরি নেয়া অপছন্দ করেছেন。”[¹⁴⁴]
৩) ইমাম ইবনু কুদামা (আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনু কুদামা) মুকাদ্দিসি (রহ.) লিখেছেন: أَنَّهُ يَجُوزُ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَيْهِ. وَرُخّصَ فِيهِ مَالِكٌ، وَبَعْضُ الشَّافِعِيَّةِ؛ لِأَنَّهُ عَمَلٌ مَعْلُومٌ، يَجُوزُ أَخْذُ الرِّزْقِ عَلَيْهِ، فَجَازَ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَيْهِ، كَسَائِرِ الْأَعْمَالِ، وَلَا نَعْلَمُ خِلَافًا فِي جَوَازِ أَخْذِ الرِّزْقِ عَلَيْهِ. “নিশ্চয় আযানের মজুরি গ্রহণ জায়েয। ইমাম মালেক (রহ.) ও শাফেঈদের অনেকে এটাকে রুখসাতও (শিথিল) গণ্য করেছেন। কেননা এটা জ্ঞাত আমল। এ কারণে এর উপর মজুরি বৈধ। যেভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রে মজুরি নেয়া হয়। আমরা জানি না, আযানের মজুরি জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) আছে।”[¹⁴⁵]
৪) মুহাদ্দিস আবদুর রহমান মুবারকপুরী (রহ.) আল্লামা মুহাম্মাদ বিন বাশার ইবনুল আ'রাবী (রহ.)-এর উক্তি থেকে নকল করেছেন: الصَّحِيحُ جَوَازُ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى الْأَذَانِ وَالصَّلَاةِ وَالْقَضَاءِ وَجَمِيعِ الْأَعْمَالِ الدِّينِيَّةِ. “আযান, সালাত, বিচারসহ সমস্ত দীনী কাজের মজুরি জায়েয হওয়াটা সহীহ।”[¹⁴⁶]
(৭) প্রসিদ্ধ হাদীস ব্যাখ্যাকারী আল্লামা হুসাইন বিন মুহাম্মাদ ত্বীবী (রাহ: মৃত: ৭১৩ হি:) বলেন: قيل: تمسك به من منع الاستئجار علي الأذان، ولا دليل فيه، لجواز انه صلى الله عليه وسلم أمره بذلك أخذا بالافضل.
“একটি (দুর্বল) উক্তি হল: এই হাদীসটি তাদের দলীল যারা আযানের মজুরি হারাম গণ্য করেন। কিন্তু এতে এমন কোনো দলীল নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশটি কেবলই আফযাল (উত্তম) হিসেবে দিয়েছেন।”²⁴⁷ তিনি আরও লিখেছেন: وأن يستحب للإمام التخفيف في الصلاة، واستحباب الأذان بغير أجرة. “ইমামের জন্য সলাত ছোট করা মুস্তাহাব। আর আযান মজুরিহীন হওয়া মুস্তাহাব।”²⁴⁸
অর্থাৎ উম্মাতের অধিকাংশ আলেম হাদীসটি দ্বারা হারামের বদলে অপছন্দের দলীল নিয়েছেন। এ থেকে বুঝা যায়, আযানের মজুরি নেয়া হারাম নয়। আর সাধারণভাবে অপছন্দনীয়তা জায়েযের দলীল হয়। যেমন:

টিকাঃ
258. সহীহ বুখারী ৯১/৭৯০০-এর পূর্বের অনুচ্ছেদ।
259. ফাতহুল বারী ১০/৩৫৩ পৃ:।
৩০৬. ফাতহুল বারী ১০/৩৫৩ পৃ:।
৩০৭. ফাতহুল বারী ১০/৩৫৩ পৃ:।
৩০৮. নিহায়াতুল-আলাম ওয়াল ওলাম ২/১৮৩ পৃ: সূত্র: রাহে সুন্নাত পৃ: ২৫২।
১৩৯. মুসনাদে আহমাদ ২৪/৩৮, নাসায়ি – কিতাবুল আযান باب كَيْفَ الْأَذَانُ ১/৩৩২ – এর বাক্য নেওয়া হয়েছে (সংক্ষেপিত); ইবনু মাজাহ – কিতাবুল আযান ২/৭০৮ – এর সনদ হাসান。
১৪০. সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী ১/৩০১ – দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বৈরূত ২০০০ ঈসায়ী।
১৪১. মুসনাদে আহমাদ ২৬/২০০, ২৬/২০৫; আবূ দাউদ ২/৫০১, নাসাঈ ২/৬৭২ – এর সনদ সহীহ。
১৪২. তাহযীবুত তাহযীব ফি আহাদীসিত তা'লীক ৪/১৮০।
[১৪০]. তিরমিযী – সালাত অধ্যায় بَابُ مَا جَاءَ فِي كَرَاهِيَةِ أَنْ يَأْخُذَ الْمُؤَذِّنُ عَلَى الْأَذَانِ أَجْرًا এর ২/২০৯-এর আলোচনা。
[১৪৪]. শরহে সুন্নাহ ২/২৬০ পৃ:।
[১৪৫]. আল-মুগনী (মাকতাবাতুল কাহিরাহ ১৯৯৮) ১/৩০১ পৃ:।
[১৪৬]. তুহফাতুল আহওয়াযী ১/৫২৮ পৃ:, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ – বৈরুত।
২৪৭. শরহে ত্বিবি আলা মিশকাতিল মাসাবিহ ৩/১৯৮।
২৪৮. শরহে ত্বিবি আলা মিশকাতিল মাসাবিহ ৩/১৯৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00