📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 মূসা –এর বিয়ের মোহর

📄 মূসা –এর বিয়ের মোহর


মূসা -এর হাতে যখন একজন কিবতির মৃত্যু হল, তখন গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে তিনি মিসর ত্যাগ করে মাদায়েনে যান। শেষাবধি তিনি শুআইব -এর কাছে পৌঁছান। তাঁর (দুই) মেয়ে মূসা -এর শক্তি ও আমানতদারী প্রত্যক্ষ করে। একজন তাঁর পিতাকে সুপারিশ করে বলে:
قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَاجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَاجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ ﴿٢٦﴾ قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنْكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَى أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ ۚ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ ۖ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ ۚ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ ﴿٢٧﴾ قَالَ ذَلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ ۖ أَيُّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ ۖ وَاللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ ﴿٢٨﴾
“তাদের একজন বলল: হে আমার পিতা! আপনি তাকে মজুর নিযুক্ত করুন। কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি - যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত। তিনি মূসা আলাইহিস সালাম-কে বললেন: আমি আমার এই কন্যদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই, এ শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, আর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, সে তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সদাচারী পাবে। মূসা আলাইহিস সালাম বললেন: আমার ও আপনার মধ্যে এ চুক্তিই রইল। এ দুটি মেয়াদের কোনো একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকবে না। আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি তাতে আল্লাহর উপর ভরসা করছি।”
এই বিবরণ থেকে বুঝা যায়, মূসা আলাইহিস সালাম-এর বিয়ে উক্ত শর্তের উপর হয়েছিল। অর্থাৎ তিনি শুআইব আলাইহিস সালাম-এর নিকট আট বছর মজদুরি করেন। সেখানে আট বছর ছাগল চরানোর চুক্তি করেন। যদি তিনি দশ বছর করতেন তা হলে সেটা তার ইহসান হতো। অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম বিয়ের মোহর হিসেবে শুআইব আলাইহিস সালাম-এর নিকট দশ বছর চাকরি করেন।
এই ঘটনাটি পূর্বে বর্ণিত হাদীসের সমর্থন ও ব্যাখ্যা করে। ... এখন যে বলে ‘আমি মানবই না’ তার ওযুর কারো কাছে নেই।

টিকাঃ
৪১. সূরা কাসাস: ২৬-২৮।

📘 দ্বীনী কাজের বিনিময় বা মজুরী > 📄 কিছু অভিযোগের জবাব

📄 কিছু অভিযোগের জবাব


সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী ও সাহাবী ইবনু আব্বাস ؓ -এর হাদীসগুলোর প্রতি বিরোধী পক্ষ কিছু আপত্তি করেছে। তারা হাদীস দুটির জবাব দেয়ার ব্যাপক চেষ্টা করেছে ও বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিয়েছে। এমনকি হাদীসগুলোর মর্ম পরিবর্তনেরও চেষ্টা করেছে। এ পর্যায়ে তাদের অভিযোগগুলো উপস্থাপন করে তার জবাব দিচ্ছি। ফলে সব ধরনের সংশয় দূর হয়ে যাবে।
প্রথম অভিযোগ: ড. ক্যাপ্টেন মাস'উদ উদ্দীন উসমানী লিখেছেন: “এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। এই বিশেষ ঘটনাটিতে সাহাবীগণের ؓ গোত্রটির নিকট থেকে মজুরি গ্রহণের ঘটনাটি ঘটেছিল কেবল তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করার কারণে।”⁸²
ডক্টর সাহেবের একজন একনিষ্ঠ মুকাল্লিদ লিখেছেন: “হাদীসটি সুস্পষ্ট করে এটি দ্বীনী লেনদেন সম্পর্কিত ছিল না। এই হাদীসটি দ্বারা দ্বীনী কাজের বিনিময়কে দলীল গণ্য করাটা আহাম্মকি (حَمْقٌ -আহাম্মাক্বী) ও মূর্খতা। প্রকৃতপক্ষে মাল কামানোর অতি আগ্রহে দ্বীনী ও দ্বীনদারীর পথে তাদের কোনো সহযোগিতা নেই। দ্বীনের সাথে তাদের কেবল পেশাদারিত্বই অবশিষ্ট আছে। আবূ সাঈদ খুদরী ؓ যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তা কেবল ঐ ঘটনাটির সাথে খাস বা সুনির্দিষ্ট। সে যামানাতে যেহেতু হোটেল ও রেস্তোঁরার প্রচলন ছিল না এবং গোত্রগুলোর চারিত্রিক নীতি ও প্রসিদ্ধ প্রথার বিরোধীতায় মেহমানদারী অস্বীকার করার ক্ষেত্রে অননোপায়ের বিধান অবলম্বন করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এমন নিরুপায় অবস্থায় মেহমানদারীর হক আদায়ে এ ধরনের উদ্যোগ জায়েজ হয়। মেহমানদারীর অধিকার আদায়ে নবী ؓ -এর নির্দেশনা নিম্নরূপ:
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ ؓ أَنَّهُ قَالَ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تَبْعَثُنَا فَنَنْزِلُ بِقَوْمٍ فَلَا يَقْرُونَنَا فَمَا تَرَى فَقَالَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ ؓ إِنْ نَزَلْتُمْ بِقَوْمٍ فَأَمَرُوا لَكُمْ بِمَا يَنْبَغِي لِلضَّيْفِ فَاقْبَلُوا فَإِنْ لَمْ يَفْعَلُوا فَخُذُوا مِنْهُمْ حَقَّ الضَّيْفِ الَّذِي يَنْبَغِي لَهُمْ
“উকবাহ বিন আমির رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাদেরকে কোনো জায়গায় পাঠালে আমরা এমন গোত্রের কাছে হাজির হই, যারা আমাদের মেহমানদারী করে না। এ ব্যাপারে আপনার হুকুম কী? তখন তিনি আমাদেরকে বললেন: যদি তোমরা কোনো গোত্রের নিকট হাজির হও, আর তারা তোমাদের মেহমানদারীর জন্য উপযুক্ত যত্ন নেয়, তবে তোমরা তা গ্রহণ কর। আর যদি তারা তা করে না, তা হলে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের থেকে মেহমানের হক আদায় করে নেবে।”⁴⁰
দ্বীনের বিশেষজ্ঞরা কি কুরআন চর্চা করে না? মূসা عليه السلام ও খিযির عليه السلام একটি বসতিতে পৌঁছলেন। তাদেরকে বলা সত্ত্বেও তারা খানাপিনার ব্যবস্থা করল না। খিযির عليه السلام যখন একটি প্রায় ভঙ্গুর দেয়ালকে মজবুত করার ব্যবস্থা করছিলেন, তখন মূসা عليه السلام তাঁকে বললেন: لَوْ شِئْتَ لَاتَّخَذْتَ عَلَيْهِ أَجْرًا “যদি আপনি চান তা হলে এর বিনিময় গ্রহণ করুন।”⁴¹
আল্লাহর নাবী ﷺ-গণ তো চারিত্রিক ও জ্ঞানের উৎকর্ষতার দিক থেকে নিজেরাই আদর্শ। তাই নিছক চারিত্রিক বিচ্যুতি তাদের মানায় না। কিন্তু যখন হোটেল ও রেস্টোরার ব্যবস্থা ছিল না, তখন মেহমানের হক আদায় না করার প্রেক্ষাপট ছিল একটি ভয়ানক সামাজিক রোগ। এ কারণে উক্ত উপায়হীন অবস্থাতে মেহমানের হক আদায়ের জন্য মূসা عليه السلام-এর মুখে উক্ত কথা চলে আসে।”⁴²
জবাব: এটা সঠিক যে, সাহাবীগণ গোত্রটির অমানবিক আচরণের (মেহমানদারী না করার) কারণে তাদের থেকে (চিকিৎসা বাবদ) মজুরি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেটা কুরআনের দু’আ পাঠের বিনিময় হওয়ায় সাহাবীগণের মনে এই সংশয়ের সৃষ্টি হয় যে, ঝাড়ু-ফুঁকের বিনিময় নেয়া জায়েজ হবে কি না? ঐ সাহাবীদের কেউ কেউ এই মজুরি গ্রহণকে পছন্দ করেননি। এমনকি তারা নাবী ﷺ-কে এভাবে জিজ্ঞাসা করলেন যে, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে কিতাবুল্লাহর বিনিময়ে মজুরি গ্রহণ করেছে? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ-ই (কুরআন) বেশি হকদার (উপযুক্ত)।”⁴²
অপর বর্ণনান্তে: قَدْ أَمْنتُمُ "তোমরা ঠিকই করেছ।"¹⁵ আবার অন্য বর্ণনাতে আছে: أحْسَنْتُمُ "তোমরা ভালোই করেছ।"
এই বাক্যগুলো উসমানী সাহেবের সমস্ত ব্যাখ্যার ভাগদ্বারকে ছিদ্র করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, যা থেকে সুস্পষ্ট হয়- প্রেক্ষাপটটি যতই করুণ বা নিরুপায় অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হোক না কেন, সাহাবীদের উপস্থাপনা ও তাদের সংশয় নিরসনে নবী ﷺ-এর উত্তর প্রদান মানুষের অর্জিত সমস্ত ধরনের মজুরীর সাথে তুলনাত্মক ছিল। এর ফলাফল হল, মানুষের অর্জিত সমস্ত মজুরীর মধ্যে কুরআন দ্বারা অর্জিত মজুরি সবচেয়ে বেশি উত্তম তথা পাক ও পবিত্র, যা ভোগ করার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। (অনুবাদক সহযোগীসহ ভাবানুবাদ)
কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, উক্তর ক্যাপ্টেন মাসউদ উদ্দীন উসমানী সহীহ বুখারীর বিস্তারিত হাদীস ও আবু সাঈদ খুদরীর ﷺ বর্ণনাতে উল্লিখিত أَمْنتُمُ و 'তোমরা ঠিকই করেছ' বাক্যগুলো উল্লেখই করেননি। কেননা সেক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠিত দর্শনটির যবনিকাপাত ঘটে। উক্তর সাহেবের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হল, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে এ ধরনের খেয়ানত প্রায়ই করে থাকেন। ক্ববরের আযাব সংক্রান্ত হাদীসের ক্ষেত্রেও যে সমস্ত হাদীস তাঁর আক্বীদার বিরোধী সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি উল্লেখ করেননি। বিস্তারিত দেখুন: তাঁর লেখা 'আযাবে ক্ববর'।
দ্বীন ইসলামের অনেক মাসআলা কোনো না কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে এসেছে। তেমনি কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত বা সূরা কোনো বিশেষ ঘটনাতে নাযিল হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এটা বলেননি যে, যেহেতু আয়াতটি অমুক ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত, সুতরাং সেটা ঐ ঘটনার সাথেই সুনির্দিষ্ট বুঝতে হবে। প্রকৃতপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার কারণে যে মাসআলা পাওয়া যায়, সেটা ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ থাকবে। দ্বীন ইসলামের আদেশ ও নিষেধমূলক অনেক হুকুম কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনা থেকেই উৎসারিত হয়েছে। তেমনি আলোচ্য ঘটনাটি যদিও সুনির্দিষ্ট (যেভাবে দাবি করা হয়েছে), কিন্তু এর ফলাফল রসূলুল্লাহ ﷺ-এর 'আম তথা ব্যাপক কথাসমূহ নির্দেশের কারণে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মু'মিনের জন্য আইন হিসেবে প্রযোজ্য। কেননা এক্ষেত্রে দুটি সহীহ হাদীস দ্বারা মাসআলাটি সুস্পষ্ট হয়।¹⁶
বাকি থাকলো বিরোধী পক্ষের এই দাবি যে, 'সাহাবীগণ প্রকৃতপক্ষে মেহমানদারীর হক আদায় করেছিলেন' – এটা দুর্বল দাবি। যার কোনো দলিল বর্ণনাটিতে নেই। যদিও গোত্রের লোকেরা সাহাবীগণের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করেছিল। আর তখন আল্লাহ কুদরতের প্রকাশ হয়, সে সময় তাদের সর্দারকে কোনো বিষধর সাপ (বা বিচ্ছু) দংশন করে। যখন গোত্রের লোকেরা তার চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হল, তখন তারা সাহাবীগণের দ্বারস্থ হল। সাহাবীগণ তখন ঝাড়-ফুঁকের পূর্বে এর মজুরি নির্দিষ্ট করে নেন। যদি ধরে নিই যে, সাহাবীগণ বকরীগুলো তাদের মেহমানদারীর হক আদায়ে গ্রহণ করেছিলেন। তা হলে সাহাবীগণ নবী ﷺ-এর সামনে যখন ঘটনাটি বললেন, তখন তো নবী ﷺ মেহমানদারীর হক আদায় সম্পর্কিত উপদেশ দিতেন।
(যেমন – ১. তখন তোমরা ঝাড়-ফুঁক করলে তারা তো মেহমানদারীর হক করবে, ফলে তাতে তোমাদের হক আদায় হবে। কিংবা ২. যেটুকু জবরদস্তির মাধ্যমে মেহমানদারী গ্রহণ করা হক সেটুকু গ্রহণ করবে। ... প্রভৃতি। অথচ দেখা যাচ্ছে, নবী ﷺ ও সাহাবীগণের প্রশ্নোত্তররের মধ্যে ঝাড়-ফুঁক ও কুরআনের বদলে মজুরি গ্রহণের বৈধতা সম্পর্কিত আলোচনাই মুখ্য বিষয় ছিল। এ ঘটনাটিতে জবরদস্তিমূলক সঙ্গত মেহমানদারী আদায়ের কোনো বর্ণনা উল্লেখ হয়নি –অনুবাদক)
প্রকৃতপক্ষে ঘটনাটির শেষাংশে যে বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, লেখক সে ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে নিজের চোখ বন্ধ রেখেছেন, যা প্রকৃতপক্ষে হাদীসকে ইনকার বা অস্বীকার করার নামান্তর।
সহীহ মুসলিমের (কিতাবুল আদাব ওয়াল আযকার وَالْأَذْكَارِ بِالرُّقْيَةِ عَلَى الْأَجْرَةِ بَابُ جَوَازِ أَخْذِ) বর্ণনাতে আছে, গোত্রটি সাহাবীগণকে দুধ দ্বারা আপ্যায়ন করেছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয়, গোত্রবাসী যখন নিজেদের ভুল বুঝলো, তখন তারা দুধ দ্বারা সাহাবীগণকে মেহমানদারীর হক দিয়েছিল। (অথচ সাহাবীগণ বকরীগুলো মজুরির বদলা হিসেবে পেয়েছিলেন এবং তা নবী ﷺ-এর কাছেও নিয়েও গিয়েছিলেন। কাজেই মেহমানদারীর হক দুধ পান ও মজুরি হিসেবে বকরির গ্রহণের বিষয়টির স্বতন্ত্রতা সুস্পষ্ট হয়ে গেল। – অনুবাদক)
এ থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, ডক্টর সাহেব ও তার মুকাল্লিদদের সমস্ত আনুমানিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। যা তারা উভয়ে দার্শনিক দৃষ্টিতে খুব বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।
ডক্টর সাহেবের মুকাল্লিদ লেখকও তারই মতো উল্লিখিত أَصَبْتُمْ فَدُ 'তোমরা ঠিকই করেছ' ও أَحْسَنْتُمْ 'তোমরা ভালই করেছ' বাক্যগুলো উল্লেখই করেননি। কেননা এগুলো উল্লেখ করলে তাদের আবিষ্কৃত ব্যাখ্যার সমাপ্তি ঘটে। ... এই তাকলীদি মানসিকতার কারণে তিনি কেবল ডক্টর সাহেবের অনুসরণ করেছেন এবং মুহাদ্দিসগণের বুঝ ও উপস্থাপনাকে আড়ালে রেখেছেন। ইংরেজি শিক্ষাগুলোতে ইংরেজি ও আধুনিক পাঠে জীবন উৎসর্গকারী এ সমস্ত ‘সাহেব’রা দীনী ইলম ও আরবি ইলম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে। ফলে তাদের দৃষ্টিতে অন্য আলেম ও মুহাদ্দিসগণই অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে। তারা হাদীসগুলোর দাবি না বুঝে নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য লিখেছেন: “এই হাদীসটি দ্বারা দীনী কাজের বিনিময়কে দলীল গণ্য করাটা আহাম্মাকি (حُمق – আহাম্মাক্ব) ও মূর্খতা। প্রকৃতপক্ষে মাল কামানোর অভিপ্রায়ে দীনী ও দীনদারীর পথে তাদের কোনো সহযোগিতা নেই। দীনের সাথে তাদের কেবল পেশাদারিত্বই অবশিষ্ট আছে ...প্রভৃতি।”
... বাকি থাকল মেহমানদারী না করার হাদীসের দাবি। হাদীসটি উকবাহ বিন আমির  থেকে বর্ণিত। যেখানে মেহমানদারী না করলে সে হক্বটুকু আদায় করে নিতে বলা হয়েছে। ইমাম বুখারী হাদীসটি কিতাবুল আদাব بَابُ إِكْرَامِ الضَّيْفِ وَخِدْمَتِهِ إِيَّاهُ بِنَفْسِهِ (অনুচ্ছেদ: মেহমানের সম্মান করা এবং নিজেই মেহমানের খেদমত করা)-এ উল্লেখ করেছেন যদি হাদীসটার সাথে আলোচ্য মাসআলাটির সম্পৃক্ততা থাকত তা হলে ইমাম বুখারী  অবশ্যই সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে এটি আনতেন। যা ইমাম বুখারী -এর সাধারণ স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য। আর তিনি তো একটি হাদীস দ্বারা কয়েকটি মাসআলা উল্লেখও করে থাকেন।... হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী  উকবাহ বিন আমির -এর হাদীসটি সম্পর্কে লিখেছেন:
وَقَالَ الْجُمْهُورُ الضِّيَافَةُ سُنَّةٌ مُؤَكَّدَةٌ وَأَجَابُوا عَنْ حَدِيثِ الْبَابِ بِأَجْوِبَةٍ أَحَدُهَا حَمْلُهُ عَلَى الْمُضْطَرِّينَ ثُمَّ اخْتَلَفُوا هَلْ يَلْزَمُ الْمُضْطَرَّ الْعِوَضُ أَمْ لَا وَقَدْ تَقَدَّمَ بَيَانُهُ فِي أَوَاخِرِ أَبْوَابِ اللُّقْطِ وَأَشَارَ التِّرْمِذِيُّ إِلَى أَنَّهُ مَحْمُولٌ عَلَى مَنْ طَلَبَ الشِّرَاءَ مُحْتَاجًا فَامْتَنَعَ صَاحِبُ الطَّعَامِ فَلَهُ أَنْ يَأْخُذَهُ مِنْهُ كَرْهَا قَالَ وَرُوِيَ نَحْوُ ذَلِكَ فِي بَعْضِ الْحَدِيثِ مُفَسِّرًا.
“জুমহুর বলেছেন, মেহমানদারী সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তারা হাদীসটির কয়েকটি জবাব দিয়েছেন। একটি জবাব হল, এটি উপায়হীন অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতঃপর তারা এ ব্যাপারে মতপার্থক্য করেছেন যে, উপায়হীন অবস্থায় তা আদায় করা জরুরি কি না? এ ব্যাপারে আমি ‘লুকতাত’ অধ্যায়ের শেষে আলোচনা করেছি। আর ইমাম তিরমিযী র. ইশারা করেছেন যে, এটা সেই ব্যক্তির উপরই প্রযোজ্য, যে জরুরি অবস্থাতে খাদ্য কিনতে চায় কিন্তু আহারদাতা সেটা দেয় না। সেক্ষেত্রে শক্তিবান্না খাদ্য নেয়া জায়েয। এ বিষয়টি কিছু হাদীসে ব্যাখ্যা করা হয়েছে.¹⁰
ইবনু হাজার র. হাদীসটার অনেকগুলো জবাব উল্লেখ করার পর লিখেছেন: وَأَقْوَى الْأَجْوِيَةِ الْأَوَّلِ وَاسْتَدَلَّ بِهِ عَلَى مَسْأَلَةِ الظُّفْرِ وَبِمَا قَالَ الشَّافِعِيُّ.
“জবাবগুলোর মধ্যে প্রথমটি সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী (যা কিছু পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে), এটা নখের মাসআলা থেকে দলীল নেয়া হয়েছে। আর এটাই ইমাম শাফেঈর উক্তি।”¹¹
বুঝা যাচ্ছে, উকুবাহ বিন আমিরের র. হাদীসের দাবি উপায়হীন অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ পরিস্থিতিতে যদি গোত্রবাসী মেহমানদারী করে তবে সেটা সঙ্গত, এক্ষেত্রে তাদের প্রতি জবরদস্তি করা যাবে না। কিন্তু যদি ক্ষুধার তাড়নাতে উপায়হীন অবস্থা সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে হারাম খাদ্য গ্রহণের বৈধতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের প্রতি জবরদস্তি করা যাবে। সাধারণ অবস্থাতে যখন মূসা আলাইহিস সালাম ও খিদির আলাইহিস সালাম এলাকাবাসীর কাছে খাবার চেয়েছিলেন, তখন তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করে। কিন্তু তারা ঐ এলাকাবাসীর প্রতি কোনো জবরদস্তি করেননি। বরং তাদের প্রতি একটি ইহসান করেছিলেন, ইয়াতিম বাচ্চাদের ঘরের দেয়াল মজবুত করে দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম সেসময় খিদির আলাইহিস সালাম-কে বলেছিলেন: আপনি চাইলে তো দেয়াল দেয়ার জন্য মজুরি নিতে পারতেন। কিন্তু খিদির আলাইহিস সালাম মজুরি নেননি। কেননা বাচ্চগুলো ইয়াতিম ছিল এবং তাদের পিতামাতা নেককার ছিল।¹²

টিকাঃ
৮২. তারিখ ও সীরাত পৃ: ৯৪।
৪০. সহীহ বুখারী হা/৬১৩৭ – কিতাবুল আদাব بَابُ إِكْرَامِ الضَّيْفِ وَخِدْمَتِهِ إِيَّاهُ بِنَفْسِهِ (অনুচ্ছেদ: মেহমানের সম্মান করা এবং নিজেই মেহমানের খেদমত করা); সহীহ মুসলিম – কিতাবুল হুদূদ بَابُ الضِّيَافَةِ وَنَحْوِهَا আবু দাউদ হা/৩৭৬২, ইবনু মাজাহ হা/৩৬৭৬।
৪১. সূরা কাহাফ: ৭৭ আয়াত।
৪২. দ্বীনদারী না দোকানদারী পৃ: ১৪।
৪২. সহীহ বুখারী হা/৫৭০৭।
১৫. সহীহ বুখারী হা/২২৭১।
১৬. আবু দাউদের হা/৩০০।
১৭. মূল লেখক আরও কিছুদূর পর্যন্ত একই ধরনের বক্তব্য কিছুটা সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তি করেছেন মাত্র। এ কারণে ঐ অংশগুলোর অনুবাদ প্রয়োজন দেখছি না। - অনুবাদক।
১০. সহীহ বুখারী হা/৬১৩৭。
¹⁰. ফতহুল বারি ৫/১০৮ – কিতাবুল মুয়ারাআহ। [১]
¹¹. ফতহুল বারি ৫/১০৯ পৃ:।
¹². দ্র: সুরা কাহফ: ৭৭ আয়াত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00