📄 দ্বিতীয় দলীল: কুরআন মাজীদ শেখানোকে মোহর নির্ধারণ করা
সাহাবী সাহাল বিন সা'দ সায়িদী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসের মর্ম হল: একজন মহিলা নিজেকে নাবী (সা.)-এর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নাবী (সা.)-এর কোনো আগ্রহ ছিল না। একজন সাহাবী (রা.) নাবী (সা.)-এর নিকট ঐ মহিলাকে বিয়ের আবেদন করে। কিন্তু তার কাছে মোহর দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। শেষাবধি তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তার কি কুরআনের কিছু হেফয আছে? সবশেষে নাবী (সা.) তাকে বললেন:
(১) অন্যত্র বর্ণিত আছে: اذْهَبْ فَقَدْ أَنْكَحْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ “যাও, তোমাকে তার সাথে বিয়ে দিলাম তোমার কাছে কুরআনের যা আছে তার বিনিময়ে।”⁶⁷
(২) অন্যত্র বর্ণিত আছে: فَقَدْ زَوَّجْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ “তোমার সাথে তার বিয়ে দিলাম, যেটুকু কুরআন তোমার কাছে আছে তার বিনিময়ে।”⁶⁸
(৩) অন্যত্র বর্ণিত আছে: فَقَدْ زَوَّجْنَاكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ “ফদ তোমাকে কাছে কুরআনের যা আছে, তার বিনিময়ে মহিলাটির সাথে তোমার বিয়ে দিলাম।”⁶⁹
(৪) অন্যত্র বর্ণিত আছে: اذْهَبْ فَقَدْ مَلَّكْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ “যাও, তোমার কাছে কুরআনের যেটুকু আছে, তার বিনিময়ে তার সাথে তোমার বিয়ে দিলাম।”⁷⁰
(৫) অন্যত্র বর্ণিত আছে: أَمْلَكْنَاكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ “আমি তার সাথে তোমার বিয়ে দিলাম, যেটুকু কুরআন তোমার কাছে আছে তার বিনিময়ে।”⁷¹
এই হাদীসটি ইমাম বুখারী (রহ.) সহীহ বুখারীতে ঢের বার উল্লেখ করেছেন। আর প্রতিটি স্থানে তিনি হাদীসটির আলোকে কোনো না কোনো মাসআলা উল্লেখ করেছেন। একটি স্থানে ইমাম বুখারী (রহ.) নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদের অধীনে হাদীসটি এনেছেন:
بابُ التَّزْوِيجِ عَلَى الْقُرْآنِ وَغَيْرِ صَدَاقٍ. “অনুচ্ছেদ: কুরআন শিক্ষার বিনিময়ে মোহর ব্যতীত বিয়ে প্রদান।”⁹²
হাফেয ইবনু হাজার رَحِمَهُ اللّٰهُ অনুচ্ছেদটির দাবি সম্পর্কে লিখেছেন: أَيْ عَلَى تَعْلِيمِ الْقُرْآنِ وَغَيْرِ صَدَاقٍ مَالِيٍّ غَنِيٍّ. “অর্থাৎ তা‘লিমুল কুরআনের বিনিময় এবং বাহ্যিক মাল ছাড়া বিয়ে করা।”⁹³
আল্লামা সিদ্দীক رَحِمَهُ اللّٰهُ লিখেছেন: عَلَى مَا مَعَكَ أَي عَلَى تَعْلِيمِهَا “যে কুরআন তোমার কাছে আছে- অর্থাৎ যা তুমি তাকে তা‘লিম দিবে।”⁹⁴
হাদীসটি আরও যেসব প্রসিদ্ধ কিতাবে রয়েছে তার কয়েকটি নিম্নরূপ:
ক) সহীহ মুসলিম - কিতাবুন নিকাহ (باب الصداق) (অনুচ্ছেদ: মোহর)
খ) আবূ দাউদ - কিতাবুন নিকাহ (بَابٌ فِي التَّزْوِيجِ عَلَى الْعَمَلِ) (অনুচ্ছেদ: কাজের বিনিময়ে বিয়ে)
গ) তিরমিযী - কিতাবুন নিকাহ (بَابُ مَا جَاءَ فِي مُهُورِ النِّسَاءِ) (অনুচ্ছেদ: মহিলাদের মোহর সম্পর্কে যা এসেছে)।
ঘ) নাসাঈ – কিতাবুন নিকাহ (إباحَةُ التَّزَوُّجِ بِغَيْرِ صَدَاقٍ) (অনুচ্ছেদ: সম্পদের মোহর ব্যতীত বিয়ের বৈধতা)
ইমাম তিরমিযী رَحِمَهُ اللّٰهُ লিখেছেন: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ، وَقَدْ ذَهَبَ الشَّافِعِيُّ إِلَى هَذَا الْحَدِيثِ، فَقَالَ: «إِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ شَيْءٌ يُصَدِّقُهَا فَيُزَوِّجُهَا عَلَى سُورَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ، فَالنِّكَاحُ جَائِزٌ، وَيُعَلِّمُهَا سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ». وَقَالَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ: النِّكَاحُ جَائِزٌ، وَيَجْعَلُ لَهَا صَدَاقَ مِثْلِهَا، وَهُوَ قَوْلُ أَهْلِ الْكُوفَةِ، وَأَحْمَدَ، وَإِسْحَاقَ.
"এই হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীস অনুসারে অভিমত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, কারো যদি মোহর প্রদানের মতো কিছু না থাকে আর সে কোনো মহিলাকে কুরআনের কোনো সূরার বিনিময়ে বিয়ে করে তবে সে বিয়ে জায়েয। আর ঐ ব্যক্তি এই মহিলাকে কুরআনের সেই সূরা শিখিয়ে দেবে। কোনো কোনো আলেম বলেন, এমতাবস্থায় বিয়ে জায়েয হবে। তবে মহিলাকে মোহরও মিসালও দিতে হবে। এ হল, কুফাবাসী আলেম, আহমাদ ও ইসহাকের উক্তি।"⁷⁵
টিকাঃ
৬৭. সহীহ বুখারী হা/৫১৪৯।
৬৮. সহীহ বুখারী হা/৫০২৯, ৫১৩২।
৬৯. সহীহ বুখারী হা/৫০৩০, ৫১৩৫।
৭০. সহীহ বুখারী হা/৫০০৩, ৫০৮৭, ৫১২৬।
৭১. সহীহ বুখারী হা/৫১৩৯।
৯২. সহীহ বুখারী ২/৯৪৯-এর পূর্বের অনুচ্ছেদ।
৯৩. ফাতহুল বারী ৯/২০৫ পৃ:, আলোচ্য অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দ্র:।
৯৪. মূল লেখক সূত্রটি উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। আমরাও বুঝতে পারছি না কোথা থেকে তা নেয়া হয়েছে। – অনুবাদক
৭৫. সুনানে তিরমিযী হা/১১৪৪-এর শেষাংশ।
📄 তৃতীয় দলীল: খারিজাহ বিন সালতের বর্ণনা
عَنْ خَارِجَةَ بْنِ الصَّلْتِ عَنْ عَمِّهِ قَالَ: أَقْبَلْنَا مِنْ عِندِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فأنبينا عَلَى حَيٍّ مِنَ الْعَرَبِ فَقَالُوا: إِنَّا أَنبَأْنَا أَنَّكُمْ قَدْ جِئْتُمْ مِنْ عِندِ هَذَا الرَّجُلِ بِخَيْرٍ فَهَلْ عِندَكُمْ مِنْ دَوَاءٍ أَوْ رُقْيَةٍ فَإِنَّ عِندَنَا مَجْنُونًا فِي الْقُيُودِ فَقُلْنَا: نَعَمْ فَجَاءُوا بِمَعْتُوهِ فِي الْقُيُودِ فَقَرَأَتْ عَلَيْهِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ غَدْوَةً وَعَشِيَّةً أَجْمَعُ بَزَاقِي ثُمَّ أَتْفُلُ قَالَ: فَكَأَنَّمَا أُنْشِطَ مِنْ عِقَالٍ فَأَعْطَوْنِي جُعْلًا فَقُلْتُ: لَا حَتَّى أَسْأَلَ النَّبِيَّ ﷺ فَقَالَ: «كُلْ فَلَعَمْرِي لَمَنْ أَكَلَ بِرُقْيَةٍ بَاطِلٍ لَقَدْ أَكَلْتَ بِرُقْيَةٍ حَقٍّ»
“(তাবেঈ) খারিজা ইবনু সালত তার চাচা (সাহাবী ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: একবার আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট হতে রওয়ানা করলাম এবং একটি আরব গোত্রের নিকট পৌঁছলাম। তারা বলল, আমরা সংবাদ পেয়েছি, আপনারা এই ব্যক্তির (রসূলুল্লাহ ﷺ-এর) নিকট থেকে কল্যাণ (কুরআন) নিয়ে এসেছেন। আপনাদের নিকট কি কোনো ওষধ বা মন্ত্র আছে? আমাদের নিকট বাঁধা একটি পাগল আছে। আমরা বললাম, হ্যাঁ, আছে। তারা বাঁধা অবস্থাতে পাগলটাকে নিয়ে আসল। আমি তিন দিন সকাল-সন্ধ্যা একরূপে সূরা ফাতিহা পড়লাম যে, আমি আমার থুতু তার উপর থুকতাম। তিনি বলেন, এতে সে যেন হঠাৎ বন্ধন অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে গেল। বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর তারা আমাকে কিছু বিনিময় দিল। আমি বললাম: না (তা আমি নেব না), যতক্ষণ না নবী ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করি। [অতঃপর আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম] তিনি ﷺ বললেন: খাও! আমার জীবনের শপথ, কিছু লোক তো বাতিল মন্ত্র দ্বারা উপার্জন করে থাকে। আর তুমি উপার্জন করেছ সত্য ঝাড়ু-ফুঁক দ্বারা।”¹⁰⁰
এই বর্ণনাটির একজন রাবী খারিজাহ বিন সালত। হাফেয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহু তাকে ‘তাক্বরীবে’ (১/২৫৪ পৃ: ১৬১৮ নং) মাকবুল বলেছেন। আর ইয়াহাবী রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন: عَمُ الْصَدَقِ (তিনি সত্যনিষ্ঠ)।¹⁰⁴
হাফেয ইবনু হাজার রাহ. অন্যত্র বলেছেন: ...عن عبد الله بن مسعود وعنه الشعبي وعبد الأعلى بن الحكم الكلبي ذكره بن حيان في الثقات قلت وقد قال بن أبي خيثمة إذا روى الشعبي عن رجل وسماه فهو ثقة بختم تعذيبه "...তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তার থেকে বর্ণনা করেছেন শা'বি ও আব্দুল আ'লা বিন হাকাম আল-কালবি। ইবনু হিব্বান রাহ. তাকে 'সিকাহ' উল্লেখ করেছে। ইবনু আবী খায়সামাহ রাহ. বলেছেন: যখন ইমাম শা'বি কারো কাছ থেকে ও তার নাম উল্লেখ করেন- তখন তিনি সিকাহ হলে তার হাদীস দ্বারা দলীল দিতেন।"¹⁰⁰
এই হাদীসটির রাবী ইমাম শা'বি। আর তিনি রাহ. হাদীসটি খারিজাহ বিন সালত থেকে বর্ণনা করেছেন ও তার নাম উল্লেখ করেছেন। এ কারণে উপরে বর্ণিত উসূলের আলোকে হাদীসটি সহীহ। আর এ পর্যায়ে হাদীসটি মাকবুল স্তরের উপরে। আর যদি হাদীসটিকে 'আম উসূলের আলোকে তাকে মাকবুল গণ্য করি, তা হলেও মুতাবা' (সমর্থক) হাদীসের আলোকে মাকবুল বর্ণনাটি সহীহ স্তরে উত্তীর্ণ হয়। আর নিঃসন্দেহে হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরী রা. ও ইবনু আব্বাস রা.-এর সহীহ হাদীসের জবরদস্ত মুতাবা'। তা ছাড়া ইমাম হাকিম রাহ. ও হাফেয যাহাবী রাহ. হাদীসটিকে সহীহ গণ্য করেছেন। আর খারিজাহ বিন সালত পর্যন্ত হাদীসটি সম্পূর্ণ সহীহ ও মুতাওয়াত্বির।¹⁰¹
এই হাদীসটি থেকে প্রমাণিত হল, ১) ঝাড়-ফুঁকের মজুরি বৈধ। ২) জায়েয ঝাড়-ফুঁকের মজুরি বৈধ এবং নিষিদ্ধ মজুরি সেটাই, যা অবৈধ ও ভ্রান্ত ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কিছু মানুষ উল্টা-পাল্টা মন্ত্রের মাধ্যমে লোকদের অর্থ হাতিয়ে নেয়। সুতরাং সঠিক ও ভুলকে এক করা, হক ও না-হককে সমান মনে করা বৈধ নয়, যা সহীহ এবং তার দ্বারা ইসলাম মজুরি অর্জনের অনুমতি দিয়েছে, কারো ব্যক্তিগত বক্তব্যের দ্বারা তাকে নাজায়েয গণ্য করা যায় না।
তা ছাড়া হাদীসটির আরও সমর্থন রয়েছে কায়েস বিন আবী হাযেমের হাদীসে: حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحِيمِ، عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ أَبِي خَالِدٍ، عَنْ قَيْسِ بْنِ أَبِي حَازِمٍ، قَالَ: أَتَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ رَجُلٌ فَقَالَ: إِنِّي رَقَيْتُ فُلاَنًا وَكَانَ بِهِ جُنُونٌ، فَأُعْطِيتُ قَطِيعًا مِنَ غَنَمٍ، وَإِنَّمَا رَقَيْتُهُ بِالْقُرْآنِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَنْ أَخَذَ بِرُقْيَةٍ بَاطِلٍ فَقَدْ أَخَذَتْ بِرُقْيَةٍ حَقٍّ»
“...ক্বায়েস বিন আবী হাযম থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল: আমি অমুক ব্যক্তিকে ঝাড়-ফুঁক করেছি, সে পাগল ছিল। (সুস্থ হওয়ার পর) সে আমাকে এক পাল বকরি দিয়েছে। এক্ষেত্রে তাকে কুরআন দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা হয়েছে। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যারা বাতিল ঝাড়-ফুঁক দ্বারা অর্জন করে (তা অন্যায়)। আর তুমি হক্ক ঝাড়-ফুঁক দ্বারা তা অর্জন করেছ (সুতরাং এই মজুরি বৈধ)।" ¹⁰⁷ এই হাদীসের সমস্ত রাবী সিক্বাহ। ... ক্বায়েস বিন আবী হাযমও সিক্বাহ। কিছু বর্ণনানুযায়ী তিনি যখন নবী ﷺ-এর কাছে মদীনাত উপস্থিত হন, তখন নাবী ﷺ মারা গিয়েছেন। ... ¹⁰⁸
টিকাঃ
১০০. আবূ দাউদ ২/০৪২০, আহমাদ ৫/২৩০-১১ পৃ: হা/২২৬৭৯-৮০, মিশকাত (এমাদা) ৬/২৬৫ নং। শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (তা. আবু দাউদ ২/০৪২০, সহীহাহ ২/২০২৭)। শাইখ যুবায়েব আলী যায়ী রাহিমাহুল্লাহু হাদীসকে হাসান বলেছেন (তা. উর্দূ মিশকাত হা/২৩৬৬)।
১০৪. আল-কাশিফ ১/২২২ পৃ., হা/১০০৯ নং।
১০০. তাহযিবুত তাহযিব ৬/৭৫-৭৬ (শামেলা:২/৪১ পৃ: ১৪২ নং)।
১০১. মুস্তাদরাকে হাকিম ১/১৫৯-৬০; তা ছাড়া ইবনু হিব্বান তাঁর 'সহীহ'-তে (৫/৬১১০) ও হাফেয যাহাবী রাহ. 'আল-আ'রাকারে' (১/৩৩৫) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। -অনুবাদক
১০৭. মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৫/৪৪৬ পৃ: – চিকিৎসা অধ্যায় فِي الْأَخْذِ عَلَى الرُّقْيَةِ، مِنْ رُخَّصَ فِيهَا (শামেলা সংস্করণ: হা/২৫৮৮৬)
১০৮. হাদীসটি মুরসাল গণ্য করলেও পূর্বের সহীহ ও হাসান হাদীসগুলোর সমর্থনে উপস্থাপন যোগ্য। - অনুবাদক
📄 চতুর্থ দলীল: যাকাত আদায়কারী (সূরা তাওবা ৬০ আয়াতের প্রথমাংশ)
আল্লাহ্ ﷺ বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا
“নিশ্চয় সাদাক্বাহ (যাকাত) ফক্বীর, মিসকীন ও তা আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য...।” [সূরা তাওবাহ: ৬০ আয়াত]
আল্লাহ্ ﷺ যাকাত প্রাপ্তদেরকে আটটি ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে তৃতীয় ভাগটি যাকাত আদায়ে নিযুক্ত ব্যক্তি বা 'আমিলদের' জন্য নির্ধারিত। তাদের যাকাত আদায়ের কাজের জন্য বেতন বা মজুরি দেয়া হয়। যাকাত একটি ফরয (মালী) ইবাদাত, যা আদায়কারীদের জন্য আয়াতটিতেই মজুরি দেয়ার হুকুম দেয়া হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হল, ফরয ইবাদাতের ক্ষেত্রে মজুরি গ্রহণ করা বৈধ। ... [সংযোজন: মূলত এই ধরনের ইবাদাতের সাথে মানুষের হক্ব জড়িত, যা কেবল হুকুমগত ইবাদাতই নয় বরং সামাজিক দায়-দায়িত্বের সাথেও সম্পৃক্ত। এখানে আল্লাহর হকের সাথে সাথে বান্দার হক্বও জড়িত। ফলে এখানে দুনিয়াবী বা বস্তগত পরিশ্রম বা লেনদেনের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। আর এ কারণেই এটা দীনি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তার মজুরি বৈধ। পক্ষান্তরে সালাতের সাথে কোনো দুনিয়াবী লেনদেনের সম্পর্ক নেই। এ কারণে সালাতের কোনো মজুরি হয় না। কিন্তু ইমাম যখন সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের সাথে জড়িত হন এবং সালাতেরও ইমামতি করেন- তখন খলিফা, ক্বাযী প্রভৃতির ন্যায় এ দায়িত্বের কারণে বেতন বা মজুরি পাবেন। সমাজের ইমাম হওয়ার সালাত পড়ানোটা তার অপর একটি স্বতন্ত্র দায়িত্ব। কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি কেবল সালাতের ইমামই নন, বরং সমাজেরও ইমাম/প্রধান হিসেবে মেনে নেয়াটাও শর্ত। তার নির্দেশেই মুসলিমরা মসজিদভিত্তিক জীবন-যাপন ও আনুগত্য করতে বাধ্য। – অনুবাদক]
হাফেয সালাহুদ্দীন ইউসুফ লিখেছেন: “অর্থ: রাষ্ট্রের ঐ দায়িত্বশীল, যে যাকাত ও সাদাকা আদায়, বন্টন ও হিসাব-কিতাব রাখে।” ১০০৯ এ সম্পর্কে হাদীসে যে ব্যাখ্যা এসেছে তা নিম্নরূপ:
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنِ الزُّهْرِيِّ أَخْبَرَنَنِي السَّائِبُ بْنُ يَزِيدَ ابْنُ أُخْتِ نَمِرٍ أَنَّ عُوَيْقِبَ بْنَ عَبْدِ الْعُزَّى أَخْبَرَهُ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ السَّعْدِيِّ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ قَدِمَ عَلَى عُمَرَ فِي خِلافَتِهِ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ أَلَمْ أُحَدَّثْ أَنَّكَ تَلِي مِنْ أَعْمَالِ النَّاسِ أَعْمَالا فَإِذَا أُعْطِيتَ الْعِمَالَةَ كَرِهْتَهَا فَقُلْتُ بَلَى فَقَالَ عُمَرُ فَمَا تُرِيدُ إِلَى ذَلِكَ قُلْتُ إِنَّ لِي أَفْرَاسًا وَأَعْبُدًا وَأَنَا بِخَيْرٍ وَأُرِيدُ أَنْ تَكُونَ عِمَالَتِي صَدَقَةً عَلَى الْمُسْلِمِينَ قَالَ عُمَرُ لا تَفْعَلْ فَإِنِّي كُنْتُ أَرَدْتُ الَّذِي أَرَدْتَ فَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُعْطِينِي الْعَطَاءَ فَأَقُولُ أَفْقِرُ إِلَيْهِ مِنِّي حَتَّى أَعْطَانِي مَرَّةً مَالا فَقُلْتُ أَفْقِرُ إِلَيْهِ مِنِّي فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ خُذْهُ فَتَمَوَّلْهُ وَتَصَدَّقْ بِهِ فَمَا جَاءَكَ مِنَ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ مُشْرِفٍ وَلا سَائِلٍ فَخُذْهُ وَإِلا فَلا تُتْبِعْهُ نَفْسَكَ وَعَنِ الزُّهْرِيِّ قَالَ حَدَّثَنِي سَالِمٌ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ قَالَ سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْطِينِي الْعَطَاءَ فَأَقُولُ أَفْقِرُ إِلَيْهِ مِنِّي حَتَّى أَعْطَانِي مَرَّةً مَالا فَقُلْتُ أَفْقِرُهُ مِنْ هُوَ أَفْقَرُ إِلَيْهِ مِنِّي فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ خُذْهُ فَتَمَوَّلْهُ وَتَصَدَّقْ بِهِ فَمَا جَاءَكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ مُشْرِفٍ وَلا سَائِلٍ فَخُذْهُ وَإِلا فَلا تُتْبِعْهُ نَفْسَكَ
“...আব্দুল্লাহ বিন সা'দী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উমার (রাঃ)-এর খিলাফতকালে তিনি একবার তাঁর কাছে আসলেন। তখন উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন: আমাকে কি এ সম্পর্কে জানানো হয়নি যে, তুমি জনগণের অনেক দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে থাক। কিন্তু যখন তোমাকে এর পারিশ্রমিক দেয়া হয়, তখন তুমি সেটা নেয়া অপছন্দ কর? আমি বললাম: হ্যাঁ। উমার (রাঃ) বললেন: কী কারণে তুমি এরূপ কর? আমি বললাম: আমার অনেক ঘোড়া ও গোলাম আছে এবং আমি ভাল অবস্থায় আছি। কাজেই আমি চাই যে, আমার পারিশ্রমিক সাধারণ মুসলিমদের জন্য সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হোক। উমার (রাঃ) বললেন: এরকম করো না। কেননা, আমিও তোমার মতো এরকম ইচ্ছা পোষণ করতাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন আমাকে কিছু দিতেন, তখন আমি বলতাম, আমার চেয়ে যার প্রয়োজন বেশি তাকে দিন। একবার তিনি তিনি আমাকে কিছু মাল দিলেন। আমি বললাম: এই মাল আমার চেয়ে যার বেশি প্রয়োজন তাকে দিন। তখন নাবী (সাঃ) বললেন: এটা নিয়ে মালদার হও এবং তা বৃদ্ধি করে সাদাকাহ করো। তা না হলে এর পিছনে নিজেকে নিয়োজিত করো না।”১০১০
وَعَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: حَدَّثَنِي سَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ: سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ يَقُولُ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْطِينِي الْعَطَاءَ، فَأَقُولُ أَعْطِهِ أَفْقَرَ إِلَيْهِ مِنِّي، حَتَّى أَعْطَانِي مَرَّةً مَالاً، فَقُلْتُ: أَعْطِهِ مَنْ هُوَ أَفْقَرُ إِلَيْهِ مِنِّي، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «خُذْهُ، فَتَمَوَّلْهُ، وَتَصَدَّقْ بِهِ، فَمَا جَاءَكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ مُشْرِفٍ وَلَا سَائِلٍ فَخُذْهُ، وَمَا لَا فَلَا تُتْبِعْهُ نَفْسَكَ»
‘‘ইমাম যুহরি (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমাকে সালিম বিন আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)-কে বলতে শুনেছি: নবী (সা.) যখন আমাকে কিছু দান করতেন, তখন আমি বলতাম, আমার চেয়ে যার অধিক প্রয়োজন তাকে দিন। এভাবে একবার আমাকে কিছু মাল দিলেন। আমি বললাম, আমার চেয়ে যার আরও অধিক প্রয়োজন তাকে দিন। তিনি (সা.) বললেন: এটা নিয়ে নাও এবং বৃদ্ধি করে তা থেকে সাদাকাহ্ কর। আর এ রকম মালের যা-কিছু তোমার কাছে এমন অবস্থায় আসে যে, তুমি তার আশা কর না এবং প্রার্থীও নও তা হলে তা গ্রহণ কর। তবে যা এভাবে আসবে না নিজেকে তার অনুসারী বানাবে না।’’¹¹¹
সহীহ বুখারীর উর্দু অনুবাদক শাইখ দাউদ রায় লিখেছেন: ‘‘সুবহানাল্লাহ! নবী (সা.) এমন কথা বললেন যা উমার (রা.)-এর চিন্তাতেও আসেনি। অর্থাৎ যদি উমার (রা.) অর্থ না নিয়ে ফেরত দিতেন- সেটা অতটা ফায়দা দেতো না যতটা ফায়দা হতো তা গ্রহণ করে সাদাকাহ্ করাতে। কেননা এর ফলে সে সাদাকাহ্র সওয়াবও পাচ্ছে। মুহাক্কিক্বগণ বলেন, অনেক সময় এ ধরনের মাল গ্রহণ না করার ক্ষেত্রে নফসে অহংকার সৃষ্টি হয়। এমনটি হলে (অহংকার ত্যাগ করার জন্য) মাল গ্রহণ করা উচিত। অতঃপর সে তা দান করবে- এটা মাল গ্রহণ না করার থেকে উত্তম। আজকের সময় দ্বীনী খেদমাতদাতাদের জন্য এটা করাই উত্তম। ...’’¹¹²
হাদীস দুটি থেকে সুস্পষ্ট হল, দ্বীনী কাজের যে বিনিময় পাওয়া যায় তার উপর সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। বেশি আবেদন ও সুপারিশ করা ঠিক না। কেননা মুমিনের জন্য দুনিয়া মুসাফিরখানা। আর সফরের সময় মুসাফির ঠাণ্ডা-গরম (বড়ো-বৃষ্টি) সব ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এ কারণে দ্বীনের তালেবে ইলম হিসেবে এবং দুনিয়াতে ইসলামের শির উচ্চ করার স্বার্থে- সে সর্বদা আখিরাতকে প্রাধান্য দিবে। দুনিয়াতে জাঁকজমক ও আরাম আয়েশ কাফেরদের জন্য। পক্ষান্তরে মুমিনের প্রকৃত ঠিকানা হল আখিরাত। ...
টিকাঃ
১০০৯. তাফসীর আহসানুল বায়ান পৃ: ২৬৯।
১০১০. সহীহ বুখারী – কিতাবুল আহকাম وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا (অনুচ্ছেদ: প্রশাসন ও প্রশাসনিক কাজে নিযুক্তদের ভাতা) ২/৭৬৮।
১১১. সহীহ বুখারী – কিতাবুল আহকাম হা/৭১৬৪।
১১২. সহীহ বুখারী (উর্দু) ৮/৩১০ (লাহোর: মাকতাবাহ কুদ্দুসিয়্যাহ)।
📄 পঞ্চম দলীল: ফি-সাবিলিল্লাহ (সূরা তাওবা ৬০ আয়াতের শেষাংশ)
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ
“নিশ্চয় সাদাকাহ (যাকাত) ফকির, মিসকীন ও তা আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত, যাদের অন্তর (ইসলামের দিকে) আকর্ষণ করা প্রয়োজন, দাসমুক্তিতে, ঋণী ব্যক্তি, ফি-সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে) ও মুসাফিরের জন্য।”³¹⁰
হাফেয সালাহুদ্দীন ইউসুফ লিখেছেন: “ফি-সাবিলিল্লাহ- বলতে জিহাদ, অর্থাৎ- যুদ্ধের অস্ত্র ও উপকরণ এবং মুজাহিদিনের জন্য (সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও) যাকাত দেয়া জায়েয। হাদীস অনুযায়ী হজ্ব ও উমরাহও ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ কিছু আলেমের নিকট দা’ওয়াতও তাবলিগও ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। কেননা এরও উদ্দেশ্য হল, জিহাদের ন্যায় আল্লাহর কালিমাহ (বাণী) প্রতিষ্ঠিত করা।”³¹¹
আব্দুর রহমান কিলানী رحمه الله ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন: “এমন প্রত্যেকটি কাজ, যা দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয় এবং যা দ্বীনী কাজের ক্ষেত্র ও পথ প্রসারিত করে। অধিকাংশ সালাফদের উক্তি মোতাবেক এ খাতের সর্বোত্তম হল, জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহর জন্য খরচ করা। আর কিতাব ফি-সাবিলিল্লাহ এর সর্বোচ্চ স্তর। অন্যান্যরা বলেছেন, দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও তার ব্যয় বহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ছাড়া এ খাতের ব্যয় ঐসব ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যেখানে মৌখিক বা লিখিত দ্বীনী খেদমতের দায়িত্ব পালন করা হয়। তেমনি ইসলামের সেবা ও প্রতিরক্ষামূলক কাজের ক্ষেত্রে এ খাতের অর্থ ব্যয় করা জায়েয।”³¹²
অনুরূপভাবে হাদীসে ইলম অর্জনকেও ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংযোজন: উক্ত বিষয়গুলো সংক্ষেপে নিম্নোক্ত হাদীসগুলোর আলোকে ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত:
১) নাবী ﷺ বলেছেন:
جَاهِدُوا الْمُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَأَلْسِنَتِكُمْ. “মুশরিকদের সাথে জিহাদ কর মাল, জান ও মুখ দ্বারা।”¹¹¹⁶ আর ইসলামে ‘জিহাদ’ মাত্রই ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। যেমন- আল্লাহ ﷻ বলেন:
وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ. “তারা নিজেদের মাল ও জান দিয়ে ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’ (আল্লাহর পথে) জিহাদ করেছে।”¹¹¹⁷
হজ্জও ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। কেননা ঐ সফরে পথচলা কেবল আল্লাহর নির্দেশ ও আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। এ মর্মে আল্লাহ ﷻ বলেন:
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا. “আর আল্লাহর জন্য মানুষের উপর ঐ ঘরের হজ্জ (এক বিধান) রয়েছে যার সে পথে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে।”¹¹¹⁸ ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহু অনুচ্ছেদ লিখেছেন:
بَابُ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى ﴿وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ﴾ وَيُذْكَرُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ﷺ يَعْنِي مِنْ زَكَاةٍ مَالِهِ وَيُعْطِي فِي الْحَجِّ وَقَالَ الْحَسَنُ إِنِ اشْتَرَى أَبَاهُ مِنَ الزَّكَاةِ جَازَ وَيُعْطِي فِي الْمُجَاهِدِينَ وَالَّذِي لَمْ تَجِبْ لَهُ ﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ﴾ الآيَةُ فِي أَيِّهَا أَعْطَيْتَ أَجْزَأَتْ وَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ خَالِدٌ احْتَبَسَ أَدْرَاعَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَيُذْكَرُ عَنْ أَبِي لَاسٍ حَمَلَنَا النَّبِيُّ ﷺ عَلَى إِبِلِ الصَّدَقَةِ لِلْحَجِّ.
“অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী, '(যাকাত হল) দাসমুক্তি, ঋণমুক্তি ও ফি-সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে" (৯: ৬০) - ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, নিজের মালের যাকাত দ্বারা দাসমুক্ত করবে এবং হাজ্জ আদায়কারীকে দেবে। হাসান বসরি বলেন: কেউ যাকাতের অর্থ দ্বারা তার পিতাকে (দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য) ক্রয় করলে তা জায়েয হবে। আর মুজাহিদীন এবং যে হাজ্জ করেনি তাদের (যাকাত) দেবে। অতঃপর لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أَحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ﻵ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এর যে কোনো খাত দিয়েই যাকাত আদায় হবে। নাবী ﷺ বলেছেন: খালিদ (বিন ওয়ালিদ) তার বর্মসমূহ জিহাদের কাজে আবদ্ধ রেখেছেন। আবু লাইস থেকে (দুর্বল সূত্রে) বর্ণনা করা হয়, নাবী ﷺ আমাদের হাজ্জ আদায় করার জন্য বাহনরূপে যাকাতের উট দেন। ”¹¹⁹
বর্ণনাগুলোর মধ্যে দুর্বলতা থাকলেও পূর্বে বর্ণিত সুরা আলে ইমরানের ১৭৭ নং আয়াতের দাবি এগুলোকে সমর্থন করে।
আলেমদের দায়িত্ব-কর্তব্যের সাথেও ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পথ’ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- নাবী ﷺ বলেছেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
“হে মু'মিনগণ! অধিকাংশ পণ্ডিত ও পুরোহিতরা মানুষের মাল-সম্পদ বাতিলপন্থায় ভোগ করে থাকে এবং ফি-সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথ) থেকে দূরে রাখে।”¹²⁰
পরিপক্ক হক্্কপন্থী আলেমরা জনগণকে ‘ফি-সাবিলিল্লাহ’ বা আল্লাহর পথে পরিচালিত করে। যা তাদের দায়িত্ব কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। –অনুবাদক]
... তেমনি দ্বীনী তা'লিম তথা মসজিদ ও মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা খরচ। দা'ওয়াতি কাজের সাথে সম্পর্কিত ও আবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রকারান্তরে ‘জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ’র দাবিই পূরণ করছেন। এদের ব্যস্ততার কারণে তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ ﷻ বলেন:
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ تَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا ۗ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ۙ
“(সাদকা) এ গরীবদের জন্য, যারা আল্লাহ্র পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে। (যারা জীবিকার সন্ধানে) যমীনে ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। অজ্ঞ লোকেরা যাঞ্চা না করার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না। তোমরা যে সম্পদ ব্যয় কর সে ব্যাপারে আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন।”¹⁹¹
এই আয়াতে ঐ সমস্ত লোককে ফকির বলা হয়েছে, যারা দ্বীনি কাজে দিন-রাত ব্যস্ত রয়েছে। এর কারণে তারা দুনিয়াবী আয়-রোজগার ও লেনদেন করতে পারে না। এর মধ্যে মুজাহিদীন, দ্বীনি তা’লিম শেখা ও শেখানো, দ্বীনি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৩১০. সূরা তাওবাহ: ৬০ আয়াত।
৩১১. তাফসীর আহসানুল বায়ান – আলোচ্য আয়াতের তাফসীর দ্র:।
৩১২. তাফসীর তাইসিরুল কুরআন ( লাহোর: মাকতাবাতুল ইসলাম) ২/২২৭ পৃ:।
¹¹¹⁶. আবু দাউদ হা/২৫০৪; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ (তাঃ. মিশকাত হা/৩৮২১) ও শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ ‘হাসান’ বলেছেন (উর্দূ তাঃ. মিশকাত হা/৩৮২১) ।
¹¹¹⁷. সূরা আনফাল: ৭২।
¹¹¹⁸. সূরা আলি-ইমরান: ৯৭।
¹¹⁹. সহীহ বুখারী - কিতাবুল হাজ্জ ২/১৪৬৮-এর পূর্বের অনুচ্ছেদ।
¹²⁰. সুরা তাওবা: ৩৪।
¹⁹¹. সূরা বাক্বারাহ: ২৭৩ আয়াত。