📄 খলীল আহমাদ সাহারানপুরী হানাফী –এর বিশ্লেষণ
খলীল আহমদ সাহারানপুরী হানাফী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ বলেন: وَفِي الْحَدِيْثِ أَعْظَمُ دَلِيْلٍ أَن لا يَجُوزُ الأَجْرَةُ عَلَى الرُّقَى وَالطَّبَ وَكَمَا قَالَ الشَّافِعِيُّ وَمَالِكٌ وَ أَبُوْ حَنِيْفَةَ وَأَحَدُ أَمَّا الأَجْرَةُ عَلَى تَعْلِيْمِ الْقُرْآنِ فَأَجَازَهَا الْجُمْهُوْرُ كَمَا الْحَدِيْثِ وَبِرِوَايَةِ الْبُخَارِيِّ أن أحق ما أخذتم عليه أجرا كتاب الله وحرمه أبو حنيفة قاله ابن رسلان قلت ولكن أجازه متأخرو الحنفية لضرورة.
“এই হাদীসটিতে ঝাড়-ফুঁক ও চিকিৎসার মজুরি নেওয়ার অনেক বড় দলীল রয়েছে। যা ইমাম শাফেঈ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, ইমাম মালেক رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ ও ইমাম আবু হানিফা رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ বলেছেন। বাকি থাকল, তা’লীমুল কুরআনের মজুরি। এক্ষেত্রে জুমহুর (অধিকাংশ আলেম) আলোচ্য হাদীসটির আলোকে অনুমতি দিয়েছেন। কেননা সহীহ বুখারীর এই বর্ণনা: ‘নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও, সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ্-ই (কুরআন) বেশি হক (উপযুক্ত)’ (এক্ষেত্রে দলীল)। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ মজুরি হারাম বলেছেন, যা ইবনু রাসুলান উল্লেখ করেছেন। আমি (খলীল আহমাদ) বলছি: কিন্তু পরবর্তী হানাফী আলেমগণ জরুরতের ভিত্তিতে মজুরির অনুমতি দিয়েছেন।”⁵⁹
উপরের বিশ্লেষণগুলো থেকে সুস্পষ্ট হল, এ মাসআলাতে সমস্ত আলেমদের ইজমা’ হয়েছে। এমনকি হানাফীদেরও সমর্থন রয়েছে। বুঝা যাচ্ছে তা’লীমুল কুরআনের মজুরির ব্যাপারে জুমহুর আলেম একমত। অর্থাৎ উম্মাতের অধিকাংশ আলেম কুরআনের বিনিময়ের পক্ষে বক্তব্য রয়েছে। এ সম্পর্কিত যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সহীহ হওয়ার ব্যাপারেও উম্মাত ঐকমত্য। পক্ষান্তরে নিষেধ হওয়ার পক্ষে উপস্থাপিত বর্ণনাগুলো না সহীহ, আর না সুস্পষ্ট। এ সম্পর্কে সামনে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ্।
টিকাঃ
৫৯. বাযলুল মাজহুদ ফি হাল্লি আবী দাউদ ৬/১১১ পৃ:।
📄 হানাফীদের অবস্থান
ইমাম আবু হানিফা رحمة الله عليه বাদ-ফুঁক ছাড়া অন্য কোনো দীনি ব্যাপারে মজুরি বৈধ হওয়ার সমর্থক নন। যদিও তাঁর যামানাতে ‘বাইতুল মাল’ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তখন দীনি কাজের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বাইতুল মাল থেকেই ভাতা দেওয়া হতো। কিন্তু যখন ‘বাইতুল মাল’ ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটল, তখন হানাফী আলেমগণ নিজেদের অবস্থানকে পরিবর্তন করলেন এবং দীনি কাজের বিনিময়ের সমর্থক হয়ে গেলেন। এভাবে এ মাসআলাটিতে উম্মাতের ইজমা‘ হয়ে গেল। যেমন- হানাফিদের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ইমাম কাযী খান হানাফী رحمة الله عليه লিখেছেন: إِنَّمَا كَرِهَ الْمُتَقَدِّمُونَ الِاسْتِئْجَارَ لِتَعْلِيمِ الْقُرْآنِ وَكَرِهُوا أَخْذَ الْأَجْرِ عَلَى ذَلِكَ (لِأَنَّهُ كَانَ لِلْمُعَلِّمِينَ عَطَايَا فِي بَيْتِ الْمَالِ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ وَكَانَ لَهُمْ زِيَادَةُ رَغْبَةٍ فِي أَمْرِ الدِّينِ وَإِقَامَةِ الْحِسْبَةِ) وَفِي زَمَانِنَا انْقَطَعَتْ عَطَايَاهُمْ وَانْقَضَتْ رَغَائِبُ النَّاسِ فِي أَمْرِ الْآخَرِ فَلَوْ اشْتَغَلُوا بِالتَّعْلِيمِ مَعَ الْحَاجَةِ إِلَى مَصَالِحِ الْمَعَاشِ لِاخْتَلَّ مَعَاشُهُمْ فَقُلْنَا بِصِحَّةِ الْإِجَارَةِ وَوُجُوبِ الْأُجْرَةِ لِلْمُعَلِّمِ بِحَيْثُ لَوْ امْتَنَعَ الْوَالِدُ عَنْ إِعْدَادِ الْأَجْرِ حَبَسَ فِيهِ.
“নিঃসন্দেহ মুতাকাদ্দিম (পূর্ববর্তী হানাফী) আলেমগণ তা'লিমুল কুরআনের মজুরির বিনিময়ে নিয়োগকে মাকরূহ মনে করতেন। এই মজুরি অর্জনকেও মাকরূহ গণ্য করতেন। (কেননা, সে যামানাতে শিক্ষকের জন্য বাইতুল মাল থেকে ভাতা দেওয়া হতো। তা ছাড়া দীনি কাজ ও ‘ইক্বামাতুল হাসাবাহ’⁶⁰ (ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধ)-এ তাদের ব্যাপক উদ্যম ছিল।) আর আমাদের যামানাতে (বাইতুল মাল থেকে) ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে এবং আখিরাতের ব্যাপারে লোকদের উদ্যম হ্রাস পেয়েছে। সুতরাং এ লোকেরা দরিদ্র অবস্থাতেও যদি ইলম চর্চা অব্যাহত রাখতে রুচি কামানোতে ব্যস্ত হয়, তা হলে তাদের কর্তব্য ধস আসবে। এ কারণে আমরা বলছি, মজুরি গ্রহণ সঠিক এবং শিক্ষকের জন্য মজুরি ওয়াজিব। যদি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর পিতামাতা (অভিভাবক, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ প্রভৃতি) শিক্ষকের ভাতা দিতে বিরত থাকে, তা হলে তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে। ”⁶¹
আল্লামা ইবনুল নাজিম হানাফী رَحِمَهُ اللهُ বলেন: أما على المختار للفتوى في زماننا فيجوز أخذ الأجر للإمام والمؤذن والمعلم والمفتي “আমাদের যামানাতে গ্রহণযোগ্যা ফাতাওয়া হল, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুআল্লিম ও মুফতির মজুরি জায়েয।”⁵²
‘হিদায়া’ কিতাবের লেখক এই উপস্থাপনার দ্বারা বলেছেন যে, এখন ফাতাওয়া জায়েযের উপর।⁵³
[সংযোজন: ‘হিদায়া’ কিতাবে এ সম্পর্কে শুরু করা হয়েছে নিম্নরূপে: ولا الاستئجار على الأذان والحلج، وكذا الإمامة وتعليم القرآن والفقه والأصل أن كل طاعة يختص بها المسلم لا يجوز الاستئجار عليه عندنا “আযান ও হজ্বের মজুরি নেই। তেমনি ইমামতি, তা’লিমুল কুরআন ও ফিকাহ্ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও। এই ব্যাপারে মূলনীতি হল, যে কোনো ইবাদাতের কাজ মুসলিমের সাথে বিশিষ্ট, আমাদের মতে তা আঞ্জাম দেয়ার উপর মজুরি গ্রহণ বা প্রদান জায়েয নয়।”⁵⁴
পশ্চাতরে শেষ করা হয়েছে নিম্নোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে: وبعض مشائخنا استحسنوا الاستئجار على تعليم القرآن اليوم؛ لأنه ظهر التواني في الأمور الدينية. ففي الامتناع تضيع حفظ القرآن وعليه الفتوى. “তবে আমাদের কোনো কোনো শাইখ বর্তমান যুগে কুরআন শিক্ষা দানের মজুরি গ্রহণ করা বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। কেননা দ্বীনি বিষয়ে অলসতা প্রকট হয়ে গেছে। সুতরাং মজুরি গ্রহণে বিরত থাকায় কুরআনের হেফাযতকর্ম নষ্ট হয়ে যাবে। আর এর উপরই ফাতাওয়া।” – অনুবাদক]
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী رَحِمَهُ اللهُ-ও একই কথা বলেছেন।⁵⁵
টিকাঃ
৬০. হাসাবাহ : الْحِسْبَةُ اصْطِلَاحًا : عَرَّفَهَا جُمْهُورُ الْفُقَهَاءِ بِأَنَّهَا الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ إِذَا ظَهَرَ تَرْكُهُ، وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ إِذَا ظَهَرَ فِعْلُهُ. পারিভাষিক দিক থেকে 'হাসাবাহ' : জমহুর ফকীহদের সর্বজনগ্রাহ্য সেটা হল, সৎকাজের আদেশ করা- যখন তা ত্যাগ করা হয় এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা- যখন অসৎ আমল প্রকাশ পায়। [দ্র: সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামিদ, তা'যীম সিক্বাফাতুল হাসাবাহ - ভূমিকা দ্র:; আহকামুস সুলতানিয়া পৃ: ২৪, মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ ১৭/২২৩ পৃ: (শামেলা ১৮/২৪২)]
৬১. ফাতাওয়া কাযী খান (নওলকিশোর লক্ষ্ণৌ ছাপা) ৩/৪৫৪ পৃ:; শামেলা সংস্করণে দাদানো অংশগুলো নেই: ২/২৬৯ পৃ:।
৫২. বাহরুর রায়েক ১/২৫৪ পৃঃ।
৫৩. হিদায়া ৪/৩১৫ পৃঃ।
৫৪. আল-হিদায়া (ইফফা) ৩/৩০৫ পৃঃ।
৫৫. বিনায়াহ শরহে হিদায়া ৫/৬৬৫ পৃঃ।