📄 ইমাম ইবনুল আরাবি মালিকী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম ইবনুল আরাবি মালিকী রহ. (মৃত: ৫৪৩ হি.) সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণনাটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: جوَازُ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى الْقُرْآنِ وَقَدِ اتَّبَعَهُ بِقَوْلِهِ فِي الصَّحِيحِ إِنْ أَحَقُّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ “হাদীসটি থেকে কুরআনের দ্বারা মজুরি নেয়া জায়েয প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া এর সমর্থন রয়েছে সহীহ বুখারীর ঐ হাদীসে যেখানে রয়েছে: নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ্-ই (কুরআন) বেশি হকদার (উপযুক্ত)।⁵¹”
টিকাঃ
৫১. আরিযাতুল আহওয়াযি শরহে তিরমিযী ১/২৬৮ পৃ:।
📄 ইমাম বায়হাক্কী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম বায়হাকী র. সাহাবী ইবনু আব্বাস রা. -এর হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন: وَهُوَ عَامٌ فِي جَوَازِ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى كِتَابِ اللّٰهِ تَعَالٰى بِالتَّعْلِيمِ وَغَيْرِهِ وَإِذَا جَازَ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَيْهِ جَازَ أَنْ يَكُوْنَ مَهْرًا وَحَدِيْثُ ابْنِ عَبَّاسٍ أَصَحُّ مِنْ حَدِيْثِ عِبَادَةِ... “সাহাবী ইবনু আব্বাস রা. -এর হাদীসটি কিতাবুল্লাহ (কুরআন) তা‘লিমসহ অন্যান্যভাবে মজুরি গ্রহণ জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে ‘আম (ব্যাপকার্থক দলীল)। আর যখন কিতাবুল্লাহ’র তা‘লিম দ্বারা মজুরি গ্রহণ জায়েয তখন এ উপায়ে মোহর প্রদানও জায়েয হয়। আর ইবনু আব্বাসের রা. হাদীসটি উবাদাহ রা. -এর (ধনুক হাদিযা দেয়ার) হাদীসের থেকে বেশি শক্তিশালী।”⁶² ইমাম বায়হাকী র. কুরআন দ্বারা মজুরি গ্রহণ নাজায়েয হওয়ার যঈফ ও মনসূখ বর্ণনাগুলো সম্পর্কে লিখেছেন: قَالَ أَحْمَدُ: وَيُشْبِهُ إِنْ كَانَ شَيْءٌ مِنْ هَذَا ثَابِتًا أَنْ يَكُوْنَ مَنْسُوْخًا بِحَدِيْثِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَمَا رُوِيَ فِيْ مَعْنَاهُ عَنْ أَبِيْ سَعِيْدِ الْخُدْرِيِّ، وَيُسْتَدَلُّ عَلٰى ذٰلِكَ بِذَهَابِ عَامَّةِ أَهْلِ الْعِلْمِ عَلٰى تَرْكِ ظَاهِرِهِ، “ইমাম আহমাদ র. বলেন: যদি নাজায়েয হওয়ার হাদীস প্রমাণিত হয়, তবে তা ইবনু আব্বাসের রা. হাদীস দ্বারা মানসূখ হয়েছে। তা ছাড়া একই মর্মে আবূ সাঈদ খুদরী রা. -এর হাদীস রয়েছে। ফলে ‘আমভাবে আলেমগণ এ হাদীসগুলোর যাহেরি মর্মের আলোকে সে (যঈফ)গুলো বর্জন করেছেন।”⁶³
টিকাঃ
৬২. মা‘রিফাতু সুনান ওয়াল আছার ৫/৩৮১, শামেলী সংস্করণ: ১০/২২১ পৃ:, ۱۴২৫৯-৬৯ নং।
৬৩. মা‘রিফাতু সুনান ওয়াল আছার ৫/৩৮১, ৩৮২ শামেলী সংস্করণ: ১০/২২১ পৃ:, ১৪২৫৯ নং।
📄 ইমাম আবূ সুলায়মান আল-খাত্তাবী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী رَحِمَهُ اللهُ আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন:
فِي هَذَا بَيَانُ جَوَازِ أَخْذِ الأَجْرَةِ عَلَى تَعْلِيمِ الْقُرْآنِ وَلَوْ كَانَ ذَلِكَ حَرَامًا لأَمَرَهُمْ النَّبِيُّ ﷺ بِرَدِّ الْقَطِيعِ، فَلَمَّا صَوَّبَ فِعْلَهُمْ وَقَالَ لَهُمْ أَحْسَنْتُمْ وَرَضِيَ الْأَجْرَةَ الَّتِي أَخَذُوهَا لِنَفْسِهِ فَقَالَ اضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ بِسَهْمٍ ثَبَتَ أَنَّهُ طَلْقٌ مُبَاحٌ وَأَنَّ الْمَذْهَبَ الَّذِي ذَهَبَ إِلَيْهِ مِنْ جَمْعِ بَيْنَ أَخْبَارِ الإِبَاحَةِ وَالْكَرَاهَةِ فِي جَوَازِ أَخْذِ الْأَجْرَةِ عَلَى مَا لَا يَتَعَيَّنُ الْفَرْضُ فِيهِ عَلَى مُعَلِّمِهِ وَنَفَى جَوَازِهِ عَلَى مَا يَتَعَيَّنُ فِيهِ التَّعْلِيمُ مَذْهَبٌ سَدِيدٌ وَهُوَ قَوْلُ أَبِي سَعِيدٍ الْأَصْطَخَرِيِّ.
وَفِي الْحَدِيثِ دَلِيلٌ عَلَى جَوَازِ بَيْعِ الْمَصَاحِفِ وَأَخْذِ الأَجْرَةِ عَلَى كُتُبِهَا، وَفِيهِ إِبَاحَةُ الرُّقْيَةِ بِذِكْرِ اللَّهِ فِي أَسْمَائِهِ، وَفِيهِ إِبَاحَةُ أَجْرِ الطَّبِيبِ وَالْمُعَالِجِ وَذَلِكَ أَنَّ الْقِرَاءَةَ وَالرُّقْيَةَ وَالنَّفْثَ فِعْلٌ مِنَ الْأَفْعَالِ الْمُبَاحَةِ، وَقَدْ أَبَاحَ لَهُ أَخْذَ الْأَجْرَةِ عَلَيْهَا فَكَذَلِكَ مَا يَفْعَلُهُ الطَّبِيبُ مِنْ قَوْلِ وَوَصْفٍ وَعِلاجٍ فَعَلَ لَا فَرْقَ بَيْنَهُمَا
“এই হাদীস দ্বারা তা'লীমুল কুরআনের মজুরি জায়েয প্রমাণিত হয়। যদি তা হারাম হতো, তা হলে নবী ﷺ বকরির পাল ফেরত দেওয়ার হুকুম দিতেন। সুতরাং যখন তিনি সেটা গ্রহণ করেছেন এবং তাদেরকে বলেছেন: তোমরা ভাল কাজ করেছ। আর তিনি ঐ মজুরির ব্যাপারে রাজি ছিলেন যা তারা নিজেদের জন্য গ্রহণ করেছিল। নবী ﷺ এটাও বলেছিলেন যে: আমারও অংশ রেখ। প্রমাণিত হল, এটা মুবাহ। আর যে মাযহাবের দিকে আলেমদের একদল গিয়েছেন, যারা মুবাহ ও মাকরুহ উভয় বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করেছেন। তাদের নিকট শিক্ষকের জন্য যা শেখানো ফরয হিসেবে বর্তায় না সেক্ষেত্রে মজুরি জায়েয বলেছেন। পক্ষান্তরে যেক্ষেত্রে শিক্ষকের শেখানোটা ফরয সেক্ষেত্রে মজুরিকে নাজায়েয বলেছেন। এটা শক্তিশালী মাযহাব। এটা আবু সাঈদ আল-উসতোখারিয়ার رَحِمَهُ اللهُ উক্তি।
এই হাদীসটিতে দলীল রয়েছে যে, কুরআন মাজীদ ক্রয় করা ও লেখার বিনিময়ে মজুরি গ্রহণ জায়েয। তা ছাড়া হাদীসটি দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে ঝাড়-ফুঁক করা মুবাহ হয়। অনুরূপ ডাক্তারী ও হেকিমি’র মজুরি মুবাহ হয়। তেমনি কিরাআত, ঝাড়-ফুঁক, দম প্রভৃতি মুবাহ কাজের অন্তর্ভুক্ত। আর এগুলোর মজুরি গ্রহণ জায়েয। এভাবে চিকিৎসক তার কথা, ব্যবস্থাপনা ও ওষুধের দ্বারা যা-কিছু করে, তার সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই।”³⁴
টিকাঃ
৩৪. মা’আলিমুস সুনান (শরহে আবী দাউদ) সালালা সংস্করণ: ৩/১০১ পৃ:।
📄 ইমাম ইবনু হাযম আন্দালুসী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম ইবনু হাযম আন্দালুসী رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ বলেন: وَالْإِجَارَةُ جَائِزَةٌ عَلَى تَعْلِيمِ الْقُرْآنِ، وَعَلَى تَعْلِيمِ الْعِلْمِ مُشَاهَرَةً وَجُمْلَةً، وَكُلُّ ذَلِكَ جَائِزٌ – وَعَلَى الرُّقَى، وَعَلَى نَسْخِ الْمَصَاحِفِ، وَنَسْخِ كُتُبِ الْعِلْمِ؛ لِأَنَّهُ لَا يَأْتِ فِي النَّهْيِ عَنْ ذَلِكَ نَصٌّ، بَلْ قَدْ جَاءَتِ الْإِبَاحَةُ، كَمَا رُوِّينَا مِنْ طَرِيقِ الْبُخَارِيِّ ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ " وَالْخَبَرُ الْمَشْهُورُ " أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ زَوَّجَ امْرَأَةً مِنْ رَجُلٍ بِمَا مَعَهُ مِنَ الْقُرْآنِ " أَيْ لِيُعَلِّمَهَا إِيَّاهُ – وَهُوَ قَوْلُ مَالِكٍ، وَالشَّافِعِيِّ، وَأَبِي سُلَيْمَانَ.
“তা‘লিমুল কুরআনের উপর মজুরি জায়েয। তেমনি ইলম পাঠাদানের উপর মাসিক বেতন বা এককালীন বিনিময় গ্রহণ–এ সবই জায়েয; (যেমন:) ঝাড়–ফুঁক করা, কুরআন মাজীদ লেখা, ইলমি কিতাব লেখা প্রভৃতি। কেননা এগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো নস (দলীল) নাবী ﷺ থেকে আসেনি। বরং মুবাহ হওয়ার দলীল এসেছে। যেমন: ইমাম বুখারীর সনদে বর্ণিত হয়েছে, ... (সন্দসহ সাহাবী ইবনু আব্বাস رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ –এর হাদীসটি বর্ণনা করেন, যার শেষাংশ হল:) রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ্-ই (কুরআন) বেশি হক (উপযুক্ত)।’ এছাড়া অপর একটি প্রসিদ্ধ হাদীস: রসূলুল্লাহ ﷺ এক মহিলাকে কুরআন দ্বারা বিয়ে দেন। অর্থাৎ কুরআন শেখানোকে মোহর সাব্যস্ত করেন। এটা ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও আবু সুলায়মান رَحِمَهُمُ اللهُ –এর মত।”⁵⁵ হাফেয ইবনু হাযম رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ও সমস্ত বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন, যেগুলোতে নিষিদ্ধতার উল্লেখ আছে। তিনি সেগুলোর প্রতি জারাহ (আপত্তি/অভিযোগ) করেছেন ও বলেছেন:
أَمَّا الْأَحَادِيثُ فِي ذَلِكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَلَا يَصِحُّ مِنْهَا شَيْءٌ
“এক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ ﷺ থেকে নিষেধ হওয়া সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার কিছুই সহীহ নয়।”⁵⁶
ثُمَّ لَوْ صَحَّتْ لَكَانَتْ كُلُّهَا قَدْ خَالَفَهَا أَبُو حَنِيفَةَ وَأَصْحَابُهُ، لِأَنَّهَا كُلُّهَا إِنَّمَا جَاءَتْ فِيمَا أُعْطِيَ بِغَيْرِ أُجْرَةٍ وَلَا مُشَارَطَةٍ، وَهُمْ يُجِيزُونَ هَذَا الْوَجْهَ فَمَوْهُوا بَإِيرَادِ أَحَادِيثَ لَيْسَ فِيهَا شَيْءٌ مِمَّا مَنَعُوا – وَهُمْ مُخَالِفُونَ لِمَا فِيهَا – فَبَطَلَ كُلُّ مَا فِي هَذَا الْبَابِ، وَالصَّحَابَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ قَدِ اخْتَلَفُوا، فَبَقِيَ الْأَقْرَانُ الصَّحِيحَانِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ اللَّذَانِ أَوْرَدْنَا لَا مُعَارِضَ لَهُمَا وَبِاللَّهِ تَعَالَى التَّوْفِيقُ.
“আর যদিওবা বর্ণনাগুলো সহীহও হয়, তারপরেও এগুলো ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর সাহাবিদের বিরোধিতা করে। কেননা এ সমস্ত বর্ণনায় যে তুফকা দেয়ার উল্লেখ এসেছে, তা (পূর্ব থেকে) মুহাজিরীন ও শর্তহীন ছিল। যা এ পদ্ধতিটির বৈধতা দেয়। তারা কৌশল অবলম্বন করে এ ধরনের বর্ণনাগুলো উল্লেখ করে, যেখানে কোনো নিষিদ্ধতা আসেনি, যা দ্বারা তারা নিষেধ করে থাকে। অথচ বর্ণনাগুলোতে যাকিছু আছে তা তাদের বিরোধিতা করে। সুতরাং এ সম্পর্কিত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত (নাবী ﷺ-এর সাথে সম্পর্কিত/ মারফূ’ হাদীসের) সবকিছুই বাতিল। এক্ষেত্রে সাহাবিদের মধ্যে ইখতিলাফ হয়েছে। বাকী থাকল ঐ দু’টি সহীহ হাদীস যা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে। এ দু’টি মধ্যে কোনো সংঘর্ষ নেই। আল্লাহ’ই তাওফিক্বদাতা।”⁵⁷
টিকাঃ
৫৫. মুরাহ্হায়া (মাযমেলা) ৬/৩৫৮-৫৯ পৃ:।
৫৬. মুরাহ্হায়া (মাযমেলা) ৬/৩৬০ পৃ:।
৫৭. মুয়াত্তা (শামেলা সংস্করণ) ৬/৩৩০ পৃ:।