📄 ইমাম বুখারী –এর উপস্থাপনা
ইমাম বুখারী رَحِمَهُ اللهُ আলোচ্য হাদীসটি নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদের অধীনে এনেছেন: بَاب مَا يُفْعَلُ فِي الرُّقْيَةِ عَلَى أَحْيَاءِ الْعَرَبِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ “অনুচ্ছেদ: কোনো আরব গোত্রে সুরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়-ফুঁক করার বদলে কিছু দেয়া হলে।”⁴⁸
এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইমাম বুখারী رَحِمَهُ اللهُ-ও ঝাড়-ফুঁকের বিনিময় নেওয়াকে সমর্থন করেন। হাদীসটি অপর একটি অনুচ্ছেদের অধীনেও এনেছেন, যা নিম্নরূপ:
بَاب الشَّرْطِ فِي الرُّقْيَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ [بِقَطِيعٍ مِنَ الْغَنَمِ] “অনুচ্ছেদ: সুরা ফাতিহার দ্বারা ঝাড়-ফুঁকের ক্ষেত্রে (বকরির অংশ) শর্ত করা।”⁴⁹ বুখারী যাচ্ছে, ইমাম বুখারীর رَحِمَهُ اللهُ নিকট ঝাড়-ফুঁকের শর্ত আরোপ করা অর্থাৎ – এতটা বকরি বা টাকা-প্রভৃতি জায়েয। এছাড়া ইমাম বুখারী رَحِمَهُ اللهُ ‘বিবাহ অধ্যায়ে’ بَاب التَّزْوِيجِ عَلَى تَعْلِيمِ الْقُرْآنِ “অনুচ্ছেদ: তা’লিমুল কুরআনের বিনিময় (মোহর) দ্বারা বিবাহ” লিখেছেন। যা দ্বারা তিনি এই মাসআলাটিই প্রমাণ করেছেন যে, তা’লিমুল কুরআনকে বিনিময় বা মজুরি বানানো জায়েয।
ইমাম বুখারী রহ. ‘কিতাবুল ইজারাত’ একটি অনুচ্ছেদের ওপর প্রথামদিকে সাহাবী ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীসটি উল্লেখ করেছেন যেখানে এই শব্দগুলো ছিল:
إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ “নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ্-ই (কুরআন) বেশি হক (উপযুক্ত)।” অতঃপর লিখেছেন:
وَقَالَ الشَّعْبِيُّ: «لَا يُشْتَرَطُ الْمُعَلِّمُ، إِلَّا أَنْ يُعْطَى شَيْئًا فَيَقْبَلَهُ» وَقَالَ الْحَكَمُ: «لَمْ أَسْمَعْ أَحَدًا كَرِهَ أَجْرَ الْمُعَلِّمِ» وَأَعْطَى الْحَسَنُ دَرَاهِمَ عَشَرَةً শা‘বি রহ. বলেন: শিক্ষক কোনোরূপ (পারিশ্রমিকের) শর্তারোপ করবে না। তবে (বিনা শর্তে) যদি তাকে কিছু দেওয়া হয় তিনি তা গ্রহণ করতে পারেন। হাকাম রহ. বলেন: আমি এমন কারো কথা শুনিনি, যিনি শিক্ষকের পারিশ্রমিক গ্রহণ করাটাকে মাকরূহ মনে করেছেন। হাসান বসরি রহ. শিক্ষকের পারিশ্রমিক বাবদ দশ দিরহাম দিয়েছেন।⁵⁰
উক্ত হাদীস ও আছারগুলো দ্বারা ইমাম বুখারী রহ.-এর উদ্দেশ্য হলো, তা‘লিমুল কুরআনের বিনিময় জায়েয হিসেবে উল্লেখ করা।
টিকাঃ
৪৮. সহীহ বুখারী – কিতাবুল ইজারা হা/২২৭৬ নং এর পূর্বের অনুচ্ছেদ।
৪৯. সহীহ বুখারী– হা/৫৭০৭-এর পূর্বের অনুচ্ছেদ। বন্ধনীর অংশ ‘মাকতাবাতু শামেলাতে’ আছে, কিন্তু بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ নেই।
৫০. সহীহ বুখারী ২/২২৭৬-এর পূর্বের অনুচ্ছেদ।
📄 ইমাম ইবনুল আরাবি মালিকী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম ইবনুল আরাবি মালিকী রহ. (মৃত: ৫৪৩ হি.) সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণনাটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: جوَازُ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى الْقُرْآنِ وَقَدِ اتَّبَعَهُ بِقَوْلِهِ فِي الصَّحِيحِ إِنْ أَحَقُّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ “হাদীসটি থেকে কুরআনের দ্বারা মজুরি নেয়া জায়েয প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া এর সমর্থন রয়েছে সহীহ বুখারীর ঐ হাদীসে যেখানে রয়েছে: নিশ্চয় তোমরা যেসব ক্ষেত্রে মজুরি নাও সেসব ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ্-ই (কুরআন) বেশি হকদার (উপযুক্ত)।⁵¹”
টিকাঃ
৫১. আরিযাতুল আহওয়াযি শরহে তিরমিযী ১/২৬৮ পৃ:।
📄 ইমাম বায়হাক্কী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম বায়হাকী র. সাহাবী ইবনু আব্বাস রা. -এর হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন: وَهُوَ عَامٌ فِي جَوَازِ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى كِتَابِ اللّٰهِ تَعَالٰى بِالتَّعْلِيمِ وَغَيْرِهِ وَإِذَا جَازَ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَيْهِ جَازَ أَنْ يَكُوْنَ مَهْرًا وَحَدِيْثُ ابْنِ عَبَّاسٍ أَصَحُّ مِنْ حَدِيْثِ عِبَادَةِ... “সাহাবী ইবনু আব্বাস রা. -এর হাদীসটি কিতাবুল্লাহ (কুরআন) তা‘লিমসহ অন্যান্যভাবে মজুরি গ্রহণ জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে ‘আম (ব্যাপকার্থক দলীল)। আর যখন কিতাবুল্লাহ’র তা‘লিম দ্বারা মজুরি গ্রহণ জায়েয তখন এ উপায়ে মোহর প্রদানও জায়েয হয়। আর ইবনু আব্বাসের রা. হাদীসটি উবাদাহ রা. -এর (ধনুক হাদিযা দেয়ার) হাদীসের থেকে বেশি শক্তিশালী।”⁶² ইমাম বায়হাকী র. কুরআন দ্বারা মজুরি গ্রহণ নাজায়েয হওয়ার যঈফ ও মনসূখ বর্ণনাগুলো সম্পর্কে লিখেছেন: قَالَ أَحْمَدُ: وَيُشْبِهُ إِنْ كَانَ شَيْءٌ مِنْ هَذَا ثَابِتًا أَنْ يَكُوْنَ مَنْسُوْخًا بِحَدِيْثِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَمَا رُوِيَ فِيْ مَعْنَاهُ عَنْ أَبِيْ سَعِيْدِ الْخُدْرِيِّ، وَيُسْتَدَلُّ عَلٰى ذٰلِكَ بِذَهَابِ عَامَّةِ أَهْلِ الْعِلْمِ عَلٰى تَرْكِ ظَاهِرِهِ، “ইমাম আহমাদ র. বলেন: যদি নাজায়েয হওয়ার হাদীস প্রমাণিত হয়, তবে তা ইবনু আব্বাসের রা. হাদীস দ্বারা মানসূখ হয়েছে। তা ছাড়া একই মর্মে আবূ সাঈদ খুদরী রা. -এর হাদীস রয়েছে। ফলে ‘আমভাবে আলেমগণ এ হাদীসগুলোর যাহেরি মর্মের আলোকে সে (যঈফ)গুলো বর্জন করেছেন।”⁶³
টিকাঃ
৬২. মা‘রিফাতু সুনান ওয়াল আছার ৫/৩৮১, শামেলী সংস্করণ: ১০/২২১ পৃ:, ۱۴২৫৯-৬৯ নং।
৬৩. মা‘রিফাতু সুনান ওয়াল আছার ৫/৩৮১, ৩৮২ শামেলী সংস্করণ: ১০/২২১ পৃ:, ১৪২৫৯ নং।
📄 ইমাম আবূ সুলায়মান আল-খাত্তাবী –এর বিশ্লেষণ
ইমাম আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী رَحِمَهُ اللهُ আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন:
فِي هَذَا بَيَانُ جَوَازِ أَخْذِ الأَجْرَةِ عَلَى تَعْلِيمِ الْقُرْآنِ وَلَوْ كَانَ ذَلِكَ حَرَامًا لأَمَرَهُمْ النَّبِيُّ ﷺ بِرَدِّ الْقَطِيعِ، فَلَمَّا صَوَّبَ فِعْلَهُمْ وَقَالَ لَهُمْ أَحْسَنْتُمْ وَرَضِيَ الْأَجْرَةَ الَّتِي أَخَذُوهَا لِنَفْسِهِ فَقَالَ اضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ بِسَهْمٍ ثَبَتَ أَنَّهُ طَلْقٌ مُبَاحٌ وَأَنَّ الْمَذْهَبَ الَّذِي ذَهَبَ إِلَيْهِ مِنْ جَمْعِ بَيْنَ أَخْبَارِ الإِبَاحَةِ وَالْكَرَاهَةِ فِي جَوَازِ أَخْذِ الْأَجْرَةِ عَلَى مَا لَا يَتَعَيَّنُ الْفَرْضُ فِيهِ عَلَى مُعَلِّمِهِ وَنَفَى جَوَازِهِ عَلَى مَا يَتَعَيَّنُ فِيهِ التَّعْلِيمُ مَذْهَبٌ سَدِيدٌ وَهُوَ قَوْلُ أَبِي سَعِيدٍ الْأَصْطَخَرِيِّ.
وَفِي الْحَدِيثِ دَلِيلٌ عَلَى جَوَازِ بَيْعِ الْمَصَاحِفِ وَأَخْذِ الأَجْرَةِ عَلَى كُتُبِهَا، وَفِيهِ إِبَاحَةُ الرُّقْيَةِ بِذِكْرِ اللَّهِ فِي أَسْمَائِهِ، وَفِيهِ إِبَاحَةُ أَجْرِ الطَّبِيبِ وَالْمُعَالِجِ وَذَلِكَ أَنَّ الْقِرَاءَةَ وَالرُّقْيَةَ وَالنَّفْثَ فِعْلٌ مِنَ الْأَفْعَالِ الْمُبَاحَةِ، وَقَدْ أَبَاحَ لَهُ أَخْذَ الْأَجْرَةِ عَلَيْهَا فَكَذَلِكَ مَا يَفْعَلُهُ الطَّبِيبُ مِنْ قَوْلِ وَوَصْفٍ وَعِلاجٍ فَعَلَ لَا فَرْقَ بَيْنَهُمَا
“এই হাদীস দ্বারা তা'লীমুল কুরআনের মজুরি জায়েয প্রমাণিত হয়। যদি তা হারাম হতো, তা হলে নবী ﷺ বকরির পাল ফেরত দেওয়ার হুকুম দিতেন। সুতরাং যখন তিনি সেটা গ্রহণ করেছেন এবং তাদেরকে বলেছেন: তোমরা ভাল কাজ করেছ। আর তিনি ঐ মজুরির ব্যাপারে রাজি ছিলেন যা তারা নিজেদের জন্য গ্রহণ করেছিল। নবী ﷺ এটাও বলেছিলেন যে: আমারও অংশ রেখ। প্রমাণিত হল, এটা মুবাহ। আর যে মাযহাবের দিকে আলেমদের একদল গিয়েছেন, যারা মুবাহ ও মাকরুহ উভয় বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করেছেন। তাদের নিকট শিক্ষকের জন্য যা শেখানো ফরয হিসেবে বর্তায় না সেক্ষেত্রে মজুরি জায়েয বলেছেন। পক্ষান্তরে যেক্ষেত্রে শিক্ষকের শেখানোটা ফরয সেক্ষেত্রে মজুরিকে নাজায়েয বলেছেন। এটা শক্তিশালী মাযহাব। এটা আবু সাঈদ আল-উসতোখারিয়ার رَحِمَهُ اللهُ উক্তি।
এই হাদীসটিতে দলীল রয়েছে যে, কুরআন মাজীদ ক্রয় করা ও লেখার বিনিময়ে মজুরি গ্রহণ জায়েয। তা ছাড়া হাদীসটি দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে ঝাড়-ফুঁক করা মুবাহ হয়। অনুরূপ ডাক্তারী ও হেকিমি’র মজুরি মুবাহ হয়। তেমনি কিরাআত, ঝাড়-ফুঁক, দম প্রভৃতি মুবাহ কাজের অন্তর্ভুক্ত। আর এগুলোর মজুরি গ্রহণ জায়েয। এভাবে চিকিৎসক তার কথা, ব্যবস্থাপনা ও ওষুধের দ্বারা যা-কিছু করে, তার সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই।”³⁴
টিকাঃ
৩৪. মা’আলিমুস সুনান (শরহে আবী দাউদ) সালালা সংস্করণ: ৩/১০১ পৃ:।