📘 ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার কুফল 📄 ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের বিবিধ স্তর

📄 ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের বিবিধ স্তর


সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতালম্বীরা আরব ও ইসলামী বিশ্বে সংখ্যায় অগণিত, আল্লাহ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না করুন, তাদের অনেকে লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক; কাউকে বলা হয় চিন্তাবিদ, আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের বিরাট এক সংখ্যা বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে কর্মরত ও কর্তৃত্বকারী, এ ছাড়া অন্যান্য পেশায়ও তাদের সংখ্যা কম নয়।

এসব পেশায় নিয়োজিত তারা সবাই একে অপরের সহযোগী, সবাই মিলে সেকুলার (বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা যা সত্যিকার অর্থে ধর্মহীনতা সে) মতবাদ প্রচারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ব্যয় করে, যে কারণে সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতা আজ মানুষের জীবনের অধিকাংশ শাখায় বিস্তার লাভ করেছে। আল্লাহর নিকট মুক্তি ও নিরাপত্তা চাই।

📘 ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার কুফল 📄 আরব বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বে এ মতবাদের কুফল

📄 আরব বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বে এ মতবাদের কুফল


ইসলামী বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতা বিস্তারের ফলে মুসলিমদের দ্বীন ও দুনিয়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে আমরা তার কিছু কুফল বর্ণনা করছি:

১. সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা বিস্তারের ফলে রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর বিধানকে নিষিদ্ধ করা, জীবনের সকল শাখা থেকে শরীয়তকে বিতাড়িত করা এবং নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিলকৃত ওহীর পরিবর্তে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী কাফেরদের তৈরি বিধানকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আল্লাহর বিধানকে মানা ও মানব-রচিত বিধান প্রত্যাখ্যান করার আহ্বানকে তারা প্রগতির অন্তরায়, পশ্চাৎগামী ও রক্ষণশীলতা জ্ঞান করে। আল্লাহর দিকে দা'ঈ বা আহ্বানকারীদেরকে তারা নানাভাবে হেয় ও উপহাস করে, সরকারি চাকুরী ও ক্ষমতা থেকে দূরে রাখে, যেন তারা জাতি ও যুবকদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হয়।

২. সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীদের কাজই হচ্ছে ইসলামী ইতিহাসকে বিকৃত করা, তাতে মিথ্যার অনুপ্রবেশ ঘটানো ও দিগ্বিজয়ী ইসলামী আন্দোলনের ফসল স্বর্ণযুগকে ব্যক্তি স্বার্থ ও জঙ্গীবাদ বা জংলীপনার ফলাফল বলে গালমন্দ করা এবং সমাজে এ জাতীয় ধ্যান-ধারণা তৈরি করা।

৩. সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার সেবাদাসরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে তাদের সেকুলার মতাদর্শের সেবক বানানোর কাজে লিপ্ত। এ কাজ তারা বিভিন্নভাবে সম্পন্ন করে, যেমন:
ক. শিক্ষা উপকরণ ও সিলেবাস দ্বারা ছাত্রদের মাঝে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রচার করা।
খ. ধর্মীয় শিক্ষার নির্ধারিত সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা ও সংকুচিত করা।
গ. নির্দিষ্ট কতক ধর্মীয় বিষয় পাঠদানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, যে বিষয়গুলো সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারে কিংবা সে মতবাদের ভ্রষ্টতার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
ঘ. শরীয়ত তথা কুরআন ও সুন্নাহর বিভিন্ন ভাষ্যের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ও অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে বিকৃতি ঘটানো, যেন মানুষ বুঝে শরীয়ত সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমর্থন করে, অথবা ন্যূনতম পক্ষে বুঝে যে, ইসলামের সাথে তার সংঘর্ষ নেই।
ঙ. পূর্ণাঙ্গভাবে দ্বীন পালনকারী শিক্ষকদেরকে পাঠদান ও শিক্ষাঙ্গন থেকে দূরে রাখা এবং ছাত্রদেরকে তাদের সাথে মিশতে না দেওয়া। এ কাজ তারা বিভিন্নভাবে সম্পন্ন করে, যেমন দাফতরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে তাদেরকে ব্যস্ত রাখা, অথবা অর্থ উপার্জনের অন্য কোনো পথে তাদেরকে মগ্ন করে দেওয়া।
চ. ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্বহীন ও অতিরিক্ত বিষয়ের মান দেওয়া, যেমন শেষ পিরিয়ডে রাখা, যখন ছাত্রদের মাঝে ক্লান্তির ভাব সৃষ্টি হয়, যেন তারা ধর্মীয় শিক্ষায় উজ্জীবিত না হয়। আবার এমনভাবে এ বিষয়কে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা যে এর সাথে ছাত্রদের পাশ-ফেলের সম্ভাবনা না থাকা।

৪. সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অন্যতম কাজ হচ্ছে, সত্য দ্বীনের অনুসারী ও মিথ্যা-বিকৃত দ্বীনের অনুসারী যেমন মুসলিম-ইয়াহুদী-খৃস্টান ও নাস্তিকদের থেকে পার্থক্য তুলে দেয়া, অতঃপর সবাইকে এক মানদণ্ডে রাখা ও বাহ্যিকভাবে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়া, যদিও সত্যিকার অর্থে তারা কাফের, নাস্তিক, পাপাচারী ও অপরাধীদেরকে তাওহীদের ধারক-বাহক, আল্লাহর আনুগত্যকারী ও ইমানদার লোকদের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

এ মতবাদের সামনে মুসলিম, খৃস্টান, ইয়াহুদী, ব্রাহ্মণ, মূর্তিপূজক সবাই সমান, তাদের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব তখনই তাদের কাছে মুখ্য হবে যখন কেউ তাদের মতবাদের আহ্বানে সাড়া দিবে। এ মতবাদের ধ্বজাধারীদের দৃষ্টিতে খৃস্টান, ইয়াহুদী, বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ বা সমাজতন্ত্রীর সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে বৈধ, কোনো সমস্যা নেই, অনুরূপ তার দৃষ্টিতে মুসলিম দেশে ইয়াহুদী অথবা খৃস্টান অথবা অন্য কোনো কুফরি ধর্মের অনুসারীর শাসক হতে সমস্যা নেই। তারা জাতীয় ঐক্য বা জাতীয়তাবাদের আড়ালে মুসলিম দেশের কর্তৃত্ব কাফেরদের হাতে তুলে দিতে চায়। বরং জাতীয় ঐক্য বা জাতীয়তাবাদ ও দেশের অখণ্ডতাকে মূলনীতি ও একমাত্র ঐক্যের বন্ধন হিসেবে দেখে। কুরআনুল কারীমের যে অংশ অথবা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে হাদিস তাদের এ তথাকথিত জাতীয় ঐক্য বা জাতীয়তাবাদ নীতি বিরুদ্ধ হয়, তাকেই তারা ছুড়ে ফেলে ও প্রত্যাখ্যান করে। আর বলে: এটা দেশীয় একতা ও ঐক্য বিনষ্টকারী!

৫. এ মতবাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য হচ্ছে, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার প্রসার করা এবং পারিবারিক সিস্টেম ধ্বংস করা। এ জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যেমন:
ক. অশ্লীলতাকে বৈধতা দেওয়া ও তার জন্য কাউকে শাস্তি প্রদান করা যাবে না মর্মে আইন প্রণয়ন করা; যার দৃষ্টিতে ব্যভিচার ও সমকামিতা ব্যক্তি স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত, যে ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রত্যেকের জন্য নিশ্চিত করা জরুরি।
খ. শালীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী ও সেগুলোর সহায়তায় নিয়োজিত পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও রেডিও-টেলিভিশনের অনুমোদন দেওয়া ও তাতে অংশ গ্রহণ করা। কখনো পরোক্ষভাবে আবার কখনো প্রত্যক্ষভাবে সেসব অশ্লীলতা প্রচারে রত থাকা।
গ. স্কুল-ভার্সিটি, সামাজিক সংগঠন ও সংস্থাসমূহে পর্দা নিষিদ্ধ করা এবং অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতাকে চাপিয়ে দেওয়া।

৬. বিভিন্নভাবে ইসলামী দাওয়াত বাধাগ্রস্ত করা, যেমন:
ক. ইসলামী বই-পুস্তক প্রকাশ ও প্রচারণায় বিধি-নিষেধ আরোপ করা, পক্ষান্তরে যেসব বই-পুস্তকের কারণে অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করবে, ইসলামী ঈমান-আকিদা বিনষ্ট হবে ও শরীয়তের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হবে, সেগুলো অধিকহারে প্রকাশ ও বিতরণ করা।
খ. সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতাবলম্বী লোকদের বিভিন্ন মিডিয়ায় সুযোগ দেওয়া, যেন তারা দেশের অধিকাংশ মানুষের সামনে তাদের পথভ্রষ্টতা প্রচার করার সুযোগ পায় ও শরীয়তকে বিকৃত করতে সক্ষম হয়; পক্ষান্তরে যেসব আলেম মানুষের সামনে দ্বীনের হাকিকত তুলে ধরবেন তাদেরকে মিডিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়, অথবা ইসলামিক মিডিয়াগুলো বন্ধ করা হয়।

৭. সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের অন্যতম কাজ হচ্ছে, আল্লাহর পথে আহ্বানকারী দা'ঈদের হয়রানী করে বেড়ানো, তাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা, তাদের উপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করা এবং তাদেরকে বিভিন্ন খারাপ বিশেষণে বিশেষায়িত করা; সমাজে প্রচার করা যে, তারা রক্ষণশীল, বিবেক প্রতিবন্ধী ও পশ্চাতমুখী; আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে বৈরিতা পোষণকারী, চরমপন্থি ও উগ্রবাদী, বাস্তবতা বুঝে না, তারা মূল বস্তু ত্যাগ করে খোসা ধরে রাখে ইত্যাদি।

৮. এ মতবাদের অনুসারীদের অন্যতম কাজ হচ্ছে, যেসব মুসলিম সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে আপোষ করে না তাদেরকে নিঃশেষ করে দেওয়া, তাদেরকে দেশান্তর করে দেওয়া, অথবা জেলে দেওয়া অথবা হত্যা করা।

৯. এ মতবাদের অনুসারীদের অন্যতম কাজ হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের আবশ্যকতা অস্বীকার করা, জিহাদ নিষিদ্ধ করা এবং জিহাদকে একপ্রকার ডাকাতি ও বর্বরতা জ্ঞান করা। কারণ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অর্থ আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করা, যেন পৃথিবীর বুকে ইসলামী হুকুমত ব্যতীত দাপুটে ও শক্তিধর কোনো হুকুমত না থাকে; পক্ষান্তরে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হচ্ছে দুনিয়ার সকল শাখা থেকে ইসলামকে বিতাড়িত করা। ধর্ম সম্পর্কে তাদের সবচেয়ে সুন্দর উক্তি হচ্ছে: "মানুষ ও তার উপাস্যের মাঝে ধর্ম বিশেষ এক বন্ধন, যার প্রভাব ইবাদতগৃহের বাইরে ব্যক্তির কথা, কাজ ও চরিত্রে প্রতিফলিত হবে না"। অতএব আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করার জন্যে জিহাদের অনুমতি তাদের দৃষ্টিতে না-থাকাই স্বাভাবিক। ধর্মনিরপেক্ষ ও তার অনুসারীদের নিকট সম্পদ ও ভূ-খণ্ড রক্ষা ব্যতীত যুদ্ধ করা বৈধ নয়; দ্বীনের সুরক্ষা, দ্বীন প্রচার ও তার বিজয়ের জন্য জিহাদ করা তাদের নিকট বর্বরতা ও সীমালঙ্ঘনের শামিল, যা সভ্য প্রগতিশীল মানুষের নিকট গ্রাহ্য নয়!!

১০. তারা জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধের দাওয়াত দেয়, তার ভিত্তিতে তারা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্ন দেখে। তাদের নিকট একতার মানদণ্ড হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, অথবা ভাষা, অথবা ভূ-খণ্ড অথবা পার্থিব কোনো স্বার্থ; ধর্মের ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হওয়া তাদের সংবিধানে বৈধ নয়, বরং দ্বীন তাদের দৃষ্টিতে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টির বড় কারণ। তাদের কেউ এমনও বলেছে: "রক্তাক্ত শতাব্দীগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, পরকালীন জীবনের নিরাপত্তার জিম্মাদার কথিত ধর্ম বা দ্বীন শান্তিকে ধ্বংস করেছে"।

আমরা এখানে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অনুসারীদের জন্ম দেওয়া মুসলিম দেশে বিদ্যমান কয়েকটি কুফল উল্লেখ করলাম, বস্তুত তার কুফল আরো অধিক, আরো ব্যাপক। কেউ দৃষ্টি দিলে এ সকল কুফল অথবা তার বেশিরভাগ কুফল অধিকাংশ মুসলিম দেশে অনুভব করবে বা স্বচক্ষে দেখবে। আরো দেখবে যে, মুসলিম দেশের গভীর পর্যন্ত এ সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা স্বীয় শিকড় শক্তিশালী করেছে। একজন মুসলিম তার ডানে-বামে মুসলিম অধ্যুষিত যে কোনো দেশের দিকে তাকালে খুব সহজে, বিনা কষ্টে ও অনায়াসে সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার এক বা একাধিক কুফল দেখতে পাবে, বরং তার বিবিধ কুফল থেকে মুক্ত কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

📘 ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার কুফল 📄 মুসলিমদের অন্তরে দ্বীন বিকৃত ও বিনষ্ট করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

📄 মুসলিমদের অন্তরে দ্বীন বিকৃত ও বিনষ্ট করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ


মুসলিমদের দ্বীন বিকৃত করার নিমিত্তে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকে, যেমন:

১. দুর্বল প্রকৃতি ও দোদুল্যমান ঈমানদার লোকদেরকে সম্পদ ও পদের প্রলোভন দেওয়া, অথবা নারীর টোপ দেওয়া, যেন তারা সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী ও শ্লোগান মানুষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করাতে ও প্রচার করতে পারে। অবশ্য তার পূর্বেই তারা তাদের প্রতারণার শিকার লোকদেরকে বিভিন্ন মিডিয়ায়, যেগুলোতে তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে, সেগুলোতে এমনভাবে তুলে ধরে যেন মানুষ তাদেরকে আলেম, চিন্তাবিদ ও প্রচুর জান্তা হিসেবে জানে এবং সাধারণ লোকদের নিকট তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়, অতঃপর তাদের দ্বারা সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচার করায়, এভাবে তারা অনেক মানুষকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়।

২. কতিপয় লোককে তারা পাশ্চাত্য দেশে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদীদের আশ্রমে লালন করে এবং তাদেরকে একাডেমিক বিভিন্ন নামী-দামী পদবি প্রদান করে, যেমন 'ডক্টরেট' অথবা 'প্রফেসর' ইত্যাদি। অতঃপর সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর দ্বীনকে বিকৃত ও ভিন্নভাবে উপস্থাপনের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে তাদের অস্তিত্ব কতটুকুন ক্ষতিকর; অথচ তারাই সুশীল নামে খ্যাত, স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটির কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব তাদের হাতেই ন্যাস্ত।

৩. এ মতবাদে বিশ্বাসী লোকদের অপর একটি কূটকৌশল হচ্ছে, দ্বীন বা ধর্মকে বিভক্ত করা, তার নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সমালোচনা ও লেখা-লেখি করা এবং মানুষদেরকে তাতে ব্যস্ত রাখা। এ লক্ষ্যে তারা দীনি ছাত্র, ধর্মীয় আলেম ও ইসলামের দিকে আহ্বানকারী দা'ঈদের সাথে অযথা তর্কে লিপ্ত হয়, যেন তারা মানুষদেরকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপদেশ-নসিহত প্রদানের পরিবর্তে তর্কে ব্যস্ত থাকে।

৪. দীনি আলেম, ধর্মীয় ছাত্র ও আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দা'ঈদেরকে রেডিও-টেলিভিশন ও বিভিন্ন মিডিয়ায় পশ্চাৎগামী, চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত ও দ্বিতীয় শ্রেণির লোক হিসেবে উপস্থাপন করা। আরো প্রচার করা যে, তারা পদ, সম্পদ ও নারী লোভী, যেন মানুষেরা তাদের কথায় বিশ্বাস না করে ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচারের ময়দান উন্মুক্ত হয়।

৫. বিরোধপূর্ণ মাসআলা ও আলেমদের ইখতিলাফ নিয়ে বেশী আলোচনা করা, যেন মানুষ জানে দ্বীন মতবিরোধের স্থান এবং দীনি আলেমদের মাঝে কোনো ঐক্য নেই। এভাবে মানুষ বিশ্বাস করতে শিখবে যে, দ্বীনের কোনো বিষয় অকাট্য ও চূড়ান্ত নয়, অন্যথায় এতো বিরোধ সংগঠিত হত না। ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারীরা এ দিকটার প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করে। মুসলিম সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার কুপ্রভাব ছড়ানোর লক্ষ্যে এ জাতীয় বিষয়কে তারা বড় আকারে পেশ করে, যার অর্থ মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীন থেকে দূরে রাখা।

৬. পাশ্চাত্য দেশসমূহের আদলে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি ও অপরিচিত কালচার সেন্টার নির্মাণ করা। এসব প্রতিষ্ঠান মুসলিম দেশে নির্মিত হলেও পরিচালিত হয় প্রকৃতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে। ইসলামের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক দুর্বল করার লক্ষ্যে তারা চেষ্টার ত্রুটি করে না। একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষবাষ্প ছড়ানোর কাজও করে ব্যাপকভাবে, বিশেষ করে সামাজিক, দার্শনিক ও মনোবিদ্যা বিভাগে তাদের পদচারণা ও প্রচারণা খুব বেশী।

৭. শরীয়তের কতক বিধান, যার প্রয়োগ ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ও সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি রয়েছে, তার উপর স্থানকাল-পাত্র ও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে অন্ধভাবে জমে থাকা। এভাবে তারা শরীয়তের ভুল ও বিকৃত দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে ধর্মনিরপেক্ষতা বা তার অধিকাংশ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে। উদাহরণত শরীয়তের একটি নীতি রয়েছে: 'মাসালেহে মুরসালাহ' (জনস্বার্থ), এ নীতিকে তারা উল্টোভাবে বুঝে ও ভুল পথে প্রয়োগ করে, অতঃপর তার দোহাই দিয়ে ইসলামের যে অংশ তারা পছন্দ করে না তা প্রত্যাখ্যান করে ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিধানগুলো বাস্তবায়ন করে, যেকারণে মুসলিম দেশে ধীরেধীরে ধর্মনিরপেক্ষতা শক্তিশালী ও তার ভিত্তিসমূহ মজবুত হচ্ছে।

অনুরূপ শরীয়তের আর একটি নীতি রয়েছে: "দু'টি ক্ষতিকর বস্তু থেকে কম ক্ষতিকর বস্তু ও দু'টি ফেতনা থেকে ছোট ফেতনাকে গ্রহণ কর"। আরেকটি নীতি রয়েছে: "প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকেও বৈধতা প্রদান করে"। আরেকটি নীতি রয়েছে: "ফায়দা হাসিল করার চেয়ে ক্ষতি দূর করাই অধিক শ্রেয়”। অনুরূপ একটি নীতি হচ্ছে: "ইসলাম সর্বযুগে উপযোগী”। আরেকটি নীতি রয়েছে: "অবস্থার ভিন্নতার ভিত্তিতে ফতোয়া ভিন্ন হয়"। এ জাতীয় নীতিকে তারা গলদভাবে প্রয়োগ করে অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের সাথে ইসলামকে গুলিয়ে ফেলে ও মুসলিমদের ধোঁকা দেয়। অনুরূপ এসব নীতিকে তারা কাফেরদের দেশে প্রচলিত অর্থনৈতিক বিধান, রাজনৈতিক ভাবনা ও দর্শনকে মুসলিম দেশে আমদানি করার হাতিয়ার হিসেবে গলদভাবে প্রয়োগ করে, যেন অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত অবস্থা না জেনে বদ্দীন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমার দৃষ্টিতে তাদের এ কৌশল সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়ঙ্কর, কারণ এতে মানুষ সন্দেহ ও ধোঁকায় পতিত হয়, তারা ভাবে এসব তো শরীয়তের নীতি ও ইসলামের নিকট স্বীকৃত। তাদের এ কৌশলের মুখোশ উন্মোচনের জন্য স্বতন্ত্র কিতাব প্রয়োজন, তবেই দ্বীন থেকে সন্দেহ ও অস্পষ্টতা দূর করা সম্ভব হবে এবং মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝানো যাবে। এখানে আমরা স্পষ্ট করতে চাই যে, এ জাতীয় নীতির উপর তাদের ভরসা করার অর্থ এ নয় যে, তারা ইসলামের এসব নীতিতে বিশ্বাসী। আবার এ অর্থও নয় যে, যে-উৎস থেকে এসব বিধান এসেছে, সে ইসলামের ব্যাপ্তি, ব্যাপকতা ও পরিপূর্ণতার উপর তাদের ঈমান রয়েছে, বরং এসব তাদের একটি বাহানা, এভাবে তারা নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য ও ভ্রান্ত মতবাদ বাস্তবায়ন করতে চায়।

📘 ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার কুফল 📄 মুসলিমদের কর্তব্য

📄 মুসলিমদের কর্তব্য


বর্তমান চরম খারাপ পরিস্থিতিতে, মুসলিমরা যা পার করছে, তাদের দায়িত্ব অনেক বড়, অনেক বেশি, অর্থাৎ এ খারাপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা, যা পুরো উম্মতকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সকল মুসলিমের নিকট বর্তমান সময়ের দাবি: সময়, সম্পদ, নিজের জান ও সন্তান দ্বারা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও এ বিপদ থেকে মুক্তির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা; যদিও আলেম সমাজ, তালেবে ইলম, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী, ক্ষমতার অধিকারী ও প্রভাবশালী মুসলিমের দায়িত্ব অনেক, যার উপযুক্ত সাধারণ মুসলিমরা নয়, কারণ তারা নেতৃত্ব দেবে, অন্যরা তাদের অনুসরণ করবে।

এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য ইলম ও আমলের বিকল্প নেই, কারণ আমলহীন ইলম কখনো পরিস্থিতি পাল্টাতে সক্ষম নয়, আবার ইলমহীন আমল সংস্কার অপেক্ষা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে ঢের বেশী। ইলম দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কতক ফিকহি মাসআলা, ইসলামী আদব ও শিষ্টাচারের জ্ঞান নয়, যার প্রতি অধিকাংশ মানুষ অধিক গুরুত্বারোপ করে, যে পরিমাণ গুরুত্বারোপ ইসলামও করেনি। ইলম দ্বারা আমার উদ্দেশ্য অন্তরে ঈমান সৃষ্টিকারী ইলম, যার ফলে আল্লাহর মহব্বত, তার রাসূলের মহব্বত ও তার দ্বীনের মহব্বত সকল বস্তুর উপর অগ্রাধিকার পায়। যে ইলমের কারণে ব্যক্তি নিজের জান ও প্রিয় বস্তুর বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনকে তার জমিনে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। জ্ঞাতব্য যে, তাওহীদ যা ইসলামের মূল হিসেবে স্বীকৃত তা সম্পর্কে পরিপূর্ণ, ব্যাপক ও পরিপক্ক ইলম ব্যতীত এ ত্যাগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা কখনো সম্ভব নয়। অতঃপর দ্বীন পরিপন্থী বস্তুর ইলম থাকা ও জরুরি, যা মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। সেসব শত্রু সম্পর্কে ইলম থাকাও জরুরি, যারা ইসলামকে ক্ষতি করার জন্য ওঁৎ পেতে আছে এবং মুসলিম উম্মাহর মাঝে সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যায় বাতিল ও ধ্বংসাত্মক মতবাদ প্রচলন করতে চায়। আবার ইলমের দাবি অনুযায়ী ইসলামের দুশমনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও মুমিনদের সাথে সম্পর্ক যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতি পূর্ণ গুরুত্ব প্রদান করা।

যারা সাধারণ মুসলিম, তাদের উপর ওয়াজিব সহি ইলম ও পরিপূর্ণ জ্ঞান হাসিল করার জন্য ইলম তলব করা ও আহলে ইলমের শরণাপন্ন হওয়া। অনুরূপভাবে যারা লেখক ও প্রকাশক রয়েছেন, তাদের উপর ওয়াজিব ইসলামী কিতাব অধিকহারে প্রচার ও বাজারজাত করা, যা মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত করবে এবং সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি ব্যতীত শরীয়তের বিধান ও হুকুমসমূহের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদানের পথ দেখাবে। প্রতিটি বিধানকে তার স্ব-স্ব স্থানে রাখা, এক বিধানকে অপর বিধানের উপর বিনা কারণে গুরুত্বারোপ না করা। আবার কোনো বিধানকে তার প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে নীচে নিয়ে না আসা। এক বিধানের বাস্তবায়ণ যেন অপর বিধানের ক্ষতি করে করা না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ময়দানে লেখক ও প্রকাশকদের বিকল্প নেই, বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে। তাদের পক্ষে সমীচীন নয় সাধারণ মানুষের মন-মগজ বিবেচনা করে অপেক্ষাকৃত কমগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা আর অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করা বা ভুলে যাওয়া। আমরা এটাও চাই না যে, তারা কম-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একেবারে ত্যাগ করে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সকল মনোযোগ নিবিষ্ট করুন, বরং উভয়ের মাঝে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য রক্ষার আহ্বান করি, অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বের ভিত্তিতে প্রত্যেক বিষয়ে লেখা থাকা চাই।

এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয় যে, জিন, জাদু, ভেলকিবাজি, তাকওয়া, যুহুদ, যিকির-আযকার, ফাজায়েলে আমাল ও ফিকহের মাসআলা ইত্যাদিতে কোনো লাইব্রেরি ভরপুর থাকবে, অথচ মানুষকে সঠিক পথ দেখানো, যুগোপযোগী আলোচনা ও ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে সতর্ক করে কোনো কিতাব তাতে থাকবে না, যার গুরুত্ব স্থানকাল-পাত্র ভেদে ঢের বেশী। যেমন 'ইসলামে রাজনীতির বিধান', পূর্বে যার নাম ছিল 'সুলতানি বিধান' বা রাষ্ট্রীয় বিধান। অনুরূপ 'ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন মতবাদ ও রাজনৈতিক দর্শন', যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, দেশাত্মবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কুফরি আকিদা লালনকারী বার্থপার্টি ও জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত দলসমূহ সম্পর্কে আলোচনা থাকা জরুরি। অনুরূপ জিহাদ সম্পর্কে লেখালেখি করা জরুরি। জিহাদ দ্বারা জিহাদ ফরয হওয়া ও কিয়ামত পর্যন্ত তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকা বুঝানো আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং আমার উদ্দেশ্য তার পাশাপাশি শাসক ও কর্তৃত্বের অধিকারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, যারা তথাকথিত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তা ইত্যাদি মতবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ও মানুষের উপর তা চাপিয়ে দিচ্ছে। অনুরূপভাবে বিলুপ্ত ইসলামী খিলাফত কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সে সম্পর্কে অধিকহারে আলোচনা থাকা জরুরি, যার গুরুত্ব মুসলিম জীবনে অনেক বেশী।

কোনো লেখক বা প্রকাশক বলতে পারেন: "এসব কিতাব মানুষ পড়তে আগ্রহী নয়"। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোনো সুনির্দিষ্ট বাণী প্রচার করতে বদ্ধপরিকর সে কি মানুষের মন-মগজ ও তাদের প্রবৃত্তির তোয়াক্কা করে তার বাণী প্রচার করবে? তাছাড়া কোনো লেখক যদি কোনো কিতাবের ব্যাপক প্রচার ও প্রসিদ্ধ চায়, তাহলে সে অবশ্যই মানুষকে আকৃষ্ট করা ও তাদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে। অতএব যদি সত্যিই হয় যে, এ জাতীয় কিতাবের প্রতি মানুষের আগ্রহ নেই, তাহলে তাদের অনাগ্রহের জন্য আপনারা ও কম দায়ী নন, তাদের অনাগ্রহের প্রতি আপনাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ পাচ্ছে। তাদেরকে আপনারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে দেননি, তাদেরকে বলনেনি এক বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করে অপর বিষয় ত্যাগ করা সমীচীন নয়। এরূপ ঘটতে থাকলে মানুষেরা ইসলামকে কোনো এক ইবাদত, অথবা কোনো এক আদব অথবা কোনো এক অভ্যাসে সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ করে ফেলবে, বরং অনেকের নিকট তো এখনই সালাত, সিয়াম ও কতক জিকিরের মাঝে ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

আপনি যদি তাদেরকে ইসলামের ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতার প্রতি দাওয়াত দেন, তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, যেমন আল্লাহর তাওহীদ, আখিরাতের প্রতি ঈমান, আল্লাহর বিধান মোতাবেক ফয়সালা করা ও তার শরীয়ত আঁকড়ে ধরা; অথবা ইসলামী খিলাফত পুনরুদ্ধার ও কায়েম করার আলোচনা এবং কুফরি মতবাদসমূহের বাতুলতা প্রকাশ করেন, যেমন গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি, তাহলে তারা ভাববে আপনি ইসলাম ছাড়া অপর কোনো বিষয়ে আলোচনা করছেন। তারা বলবে, 'এটাই তো রাজনীতি, আর রাজনীতির সাথে দ্বীনকে সম্পৃক্ত করা বৈধ নয়।' এ জাতীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী লোকদের জন্য যদি সেসব বিষয় জুমার খুতবা, মসজিদের হালকা, বিভিন্ন সেমিনার ও ছোট ছোট কিতাবে প্রকাশ করা হত, যা পড়া ও বুঝা সহজ, তাহলে তাদের থেকে এরূপ বিচ্যুতিমূলক কথা কখনো বের হত না।

আমরা লেখক বা প্রকাশক যাই হই, পাঠকদের চাহিদা ও বেচাকেনার বাজার গরম রাখার জন্য দ্বীনকে অসম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা, দ্বীনকে বিকৃত করা, তার এক বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে অপর বিষয়কে ত্যাগ করার মত মারাত্মক ক্ষতিকর কাজে প্রবৃত্ত হওয়া ও তাতে অংশগ্রহণ না করা ওয়াজিব। এরূপ আচরণ আমাদের থেকে প্রকাশ পেলে প্রকারান্তরে আমরাই দ্বীনের গণ্ডিকে সংকীর্ণ করে ফেলব এবং দ্বীনকে জীবন ও রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার ক্ষেত্রে সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের সহযোগী হয়ে যাব।

ইসলাম প্রচার ও ব্যাপক করার জন্য প্রাথমিক থেকে শুরু করে ভার্সিটি পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষক, প্রফেসর ও অধ্যাপকদের নিম্নরূপ দায়িত্ব পালন করা জরুরি:
১. বিশুদ্ধ শিক্ষানীতি ও সিলেবাস তৈরি করা, যেন শিক্ষার প্রত্যেক শাখা ইসলামের সেবায় ব্যবহার হয়, একমাত্র গবেষণাই যেন তার উদ্দেশ্য না হয়। উল্লেখ্য যে, আমাদের দ্বীন আল্লাহর পক্ষ থেকে, তাতে অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকে বাতিল প্রবেশ করতে পারে না, আবার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও আল্লাহর সৃষ্ট, অতএব বিজ্ঞান ও দ্বীনের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই, তাই বৈজ্ঞানিক অনেক আবিষ্কারকে ঈমানের সেবক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অনুরূপ নাস্তিকতার বাতুলতা প্রমাণ ও তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য বিজ্ঞানের অনেক মূলনীতিকে ব্যবহার করা যায়, যাতে খোদ নাস্তিকরা বিশ্বাসী, যার বিপরীত কোনো নীতি তারা বিশ্বাস করে না। এ জন্য ছাত্রদের সিলেবাস নির্ধারণের সময় এসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
২. শিক্ষা উপকরণকে তাতে প্রবিষ্ট কুফরি ও গোমরাহি মুক্ত করা, হতে পারে কোনো বই এমন লোকের তৈরি, যে দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা দ্বীন বিদ্বেষী। তাই মুসলিম শিক্ষক কখনো বই-পুস্তক যেভাবে আছে সেভাবে পাঠদান করে ক্ষান্ত হয় না, এরূপ করা বৈধও নয়। তার কর্তব্য হচ্ছে, বই-পুস্তকে বিদ্যমান ভ্রষ্টতা ছাত্রদেরকে বলা ও তা থেকে সতর্ক করা।
৩. ইসলামকে ভালোভাবে বুঝানো, অথবা ইসলামী আকিদা প্রতিষ্ঠা করা, অথবা মুসলিমদের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া, তাদের সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্তি দূর করা, অথবা ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার যখন কোনো সুযোগ আসবে শিক্ষক সেটাই লুফে নিবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px