📄 উপক্রমণিকা
সকল প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি সপ্ত আসমান ও জমিনসমূহের ধারণকারী এবং সকল মখলুকের ব্যবস্থাপক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো শরীক নেই। তিনি সত্য ও সুস্পষ্ট মালিক। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত রাসূল। আল্লাহ তার উপর, তার পরিবারবর্গ ও তার সকল সাথীর উপর সালাত ও সালাম নাযিল করুন।
অতঃপর, বক্ষ্যমাণ নিবন্ধ বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত সংক্ষিপ্ত এক রচনা, যা বর্তমান বিশ্বে আত্মপ্রকাশকারী ও অনেক ইসলামী দেশে শিকড় গেড়ে বসা 'ধর্মনিরপেক্ষ' নামক বাতিল গোষ্ঠী ও ফেরকা সম্পর্কে আলেমগণ লিখেছেন। এ মতবাদ ও তাদের ধারক-বাহকদের কথাবার্তা থেকে যদিও কখনো কখনো প্রকাশ্যে মনে হয় যে এরা তাদের স্বজাতির প্রতি মিল-মহব্বত ও দরদী; কিন্তু প্রায়শঃই তাদের অপ্রকাশ্য মূল উদ্দেশ্য প্রকাশ হয়ে পড়ে, আর তা হচ্ছে, ইসলাম ও তার শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও হিংসা। ইসলামী আইন, ইবাদত, লেনদেন ও আচার-আচরণ এ মতবাদের চক্ষুশূল। প্রবৃত্তির অনুসরণ ও পার্থিব স্বার্থ হাসিল করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
"রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক কর" তার শ্লোগান। এ মতবাদ ও তার ধ্বজাধারীরা দ্বীনদার লোকদেরকে রক্ষণশীল, প্রগতির অন্তরায় ও পশ্চাৎগামী বলে গালমন্দ করে। সন্দেহ নেই, এ মতবাদে বিশ্বাসীরা মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রথম যুগের মুনাফিকদের থেকেও বেশী ক্ষতিকর, বরং পথভ্রষ্ট যে কোনো দল অপেক্ষা তারা অধিক খারাপ।
লেখক এ ফেরকার অধিকাংশ লক্ষ্য ও তার প্রধান অনিষ্টগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন- আল্লাহ তাকে তৌফিক দান করুন-। এ মহাবিপদ থেকে নাজাতের জন্যে আত্মরক্ষার ঢাল সংগ্রহ করা, দুশমনকে চেনা, নিজেকে ও নিজের ভাইদেরকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'-র ন্যায় ভ্রান্ত মতবাদ থেকে দূরে রাখা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
একমাত্র আল্লাহ তা'আলা তৌফিকদাতা ও সঠিক পথে পরিচালনাকারী। আল্লাহ তা'আলা সালাত ও সালাম নাযিল করুন মুহাম্মদ, তার পরিবারবর্গ ও তার সকল সাথীর উপর।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আল-জাবরিন।
📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার রাসূল মুহাম্মদের উপর, তার পরিবারবর্গ ও তার সকল সাথীর উপর। অতঃপর,
মুসলিম জাতি বর্তমান সময়ে তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুরবস্থা পার করছে, সে আজ দুর্বল-লাঞ্ছিত; তার ঘাড়ে চেপে বসেছে নিকৃষ্ট জাতি ইয়াহুদী, খৃস্টান ও মূর্তিপূজারিরা। কারণ তারা নিজেদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত, যে দ্বীনকে আল্লাহ অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসার জন্য হিদায়েত ও পথপ্রদর্শক স্বরূপ নাযিল করেছেন-সে দিন থেকে তারা বিচ্যুত, এটাই একমাত্র কারণ।
দ্বীন থেকে এ বিচ্যুতি শুরুতে মুসলিম উম্মাহর এক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন তা সম্প্রসারিত হয়ে এ মুসলিম জাতির বিরাট সংখ্যক লোকের মাঝে বিস্তার লাভ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ফলে জাতীয় পর্যায়, আন্তর্জাতিক পরিসর, গবেষণার জগত ও মিডিয়ার রাজ্যে দিনদিন ইসলাম থেকে দূরত্ব বাড়ছে। যার ফলে মুসলিমরা আজ এতটাই বিচ্যুত যে, হিদায়েত ও তাকওয়ার মূল উৎস দ্বীনের দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে আসার প্রয়োজন বোধ করছে না।
এ জন্য 'ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার কুফল' নামক সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি মুসলিম দেশে প্রচার করছি, হয়তো সে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র প্রকৃত অবস্থা, মূল উৎস, দ্বীনের উপর তার কঠিন আঘাত ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে মুসলিম জাতিকে সজাগ করবে, অতঃপর তারা তা থেকে দ্রুত আত্মরক্ষা গ্রহণ করবে ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিবে। এ মতবাদ ও তার অনুসারীদের প্রত্যাখ্যান করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর ইচ্ছায় নির্মূল করতে পারবে। তাহলে আমরা আমাদের দ্বীনের দিকে ফিরে যেতে পারব, আমাদের হারানো সম্মান ফিরে পাব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “ইয্যত একমাত্র আল্লাহর জন্য, তার রাসূলের জন্য ও মুমিনদের জন্যই”¹
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে সঠিক পথ ও পদ্ধতির অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।
মুহাম্মদ শাকের আশ-শারীফ
মক্কাতুল মুকাররামাহ
টিকাঃ
¹ সূরা মুনাফিকুন: (৮)
📄 সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা কি?
যে মতবাদটিকে ইংরেজিতে secularism বলা হয় তার আরবি প্রতিশব্দ হিসেবে বহুলভাবে علماني [‘আলমানি] শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর বাংলায় এর (সত্যের অপলাপকৃত) অনুবাদ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ শব্দ দিয়ে। তাহলে দেখা যাক সে সেকুলারিজম (বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা) কী? ছোট্ট একটি প্রশ্ন, কিন্তু তার উত্তর চাই স্পষ্ট, নিখুঁত ও বিস্তারিত। এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রত্যেক মুসলিমের জানা-থাকা জরুরি। আল্লাহর মেহেরবানী যে, এ পর্যন্ত সেকুলারিজমের উপর বহু গ্রন্থ লিখা হয়েছে, আমাদের কর্তব্য শুধু জানা ও আমল করা।
এবার প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করি, তবে এ জন্য আমাদের বেশী কষ্ট করতে হবে না, কারণ যেখানে ‘সেকুলারিজম’ বা তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ মতবাদের জন্ম, সে পাশ্চাত্য দেশসমূহে লিখিত অভিধানগুলো আমাদেরকে সেটার অর্থ খোজা ও সন্ধান করার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইংরেজি অভিধানে secularism শব্দের নিম্নরূপ অর্থ এসেছে:
১. পার্থিববাদী অথবা বস্তুবাদী।
২. ধর্মভিত্তিক বা আধ্যাত্মিক নয়।
৩. দ্বীনপালনকারী নয়, দুনিয়াবিমুখ নয়²।
একই অভিধানে secularism শব্দের সংজ্ঞায় এসেছে: "secularism এমন একটি দর্শন, যার বক্তব্য হচ্ছে, চরিত্র- নৈতিকতা ও শিক্ষা ধর্মীয় নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না"। 'ব্রিটিশ বিশ্বকোষ'-এ আমরা দেখি, সেখানে সেকুলারিজম সম্পর্কে বলা হয়েছে: “সেকুলারিজম একটি সামাজিক আন্দোলন, যার একমাত্র লক্ষ্য মানুষদেরকে পরকালমুখী থেকে ফিরিয়ে এনে দুনিয়ামুখী করা"।
Encyclopedia Britanica নামীয় ব্রিটিশ বিশ্বকোষে Atheism বা 'নাস্তিকতা' শিরোনামের অধীন secularism এর আলোচনা এসেছে। তাতে Atheism তথা নাস্তিকতাকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১. তাত্ত্বিক নাস্তিকতা (إلحاد نظري) ২. ব্যবহারিক নাস্তিকতা (إلحاد عملي)। 'বিশ্বকোষ' সেকুলারিজমকে দ্বিতীয় প্রকার নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত করেছে³।
এ আলোচনা থেকে দু'টি বিষয় স্পষ্ট হল:
এক. সেকুলারিজম একটি কুফরি দর্শন, তার একমাত্র লক্ষ্য দুনিয়াকে দ্বীনের প্রভাব মুক্ত করা। সেকুলারিজম একটি মতবাদ, তার কাজ হচ্ছে পার্থিব জগতের সকল বিষয়কে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ থেকে মুক্ত রেখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার নিজের তৈরি বিধান দেওয়া ও সকল স্তরে নেতৃত্ব প্রদান করা।
দুই. সেকুলারিজমের সাথে জ্ঞান বা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই, যেমন কতক কুচক্রী মানুষদেরকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য বলে, সেকুলারিজম অর্থ 'ব্যবহারিক বিজ্ঞানের উপর গুরুত্বারোপ ও তার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা'। এ বক্তব্যের অসারতা ও সত্য গোপন করার অপকৌশল আমাদের বর্ণিত অর্থ থেকে স্পষ্ট, যা আমরা গ্রহণ করেছি 'সেকুলারিজম' এর সুতিকাগার থেকে, যে সমাজে তার জন্ম ও পরিচর্যা হয়েছে।
তাই 'সেকুলারিজম' এর অর্থ যদি করা হয় ধর্মহীনতা, তাহলে তার সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা ও সঠিক অর্থ প্রকাশ পাবে এবং তাতে অপলাপের কিছু থাকবে না, বরং যথার্থ অর্থই স্পষ্ট হবে।
টিকাঃ
২ 'দুনিয়াবিমুখিতা' বা 'সংসারবিরাগী' খৃস্ট ধর্মে একটি ইবাদতগত বিষয়। খৃস্টানগণ এ বিদ'আতটি আবিস্কার করেছে। সুতরাং যখন তারা বলে, সেক্যুলার অর্থ, 'সংসারবিরাগী নয়' তখন তারা এর দ্বারা অর্থ নেয় যে, সে ইবাদতকারী নয়। মুসলিমরা মনে করে যে সংসারবিরাগী হওয়া বিদ'আত। কিন্তু খৃস্টানরা এটাকে বিদ'আত মনে করে না। তারা এটাকে তাদের সত্যিকার দ্বীন মনে করে। সুতরাং যখন কেউ বলবে যে, অমুক সংসারবিরাগী নয় তখন সে এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেয় যে, লোকটি ইবাদতের ধার-ধারে না। 'বিদ'আত করে না' এ অর্থ উদ্দেশ্য নেয় না।
৩ নাস্তিকতার উপর আভিধানিক বিশ্লেষণ ড. মুহাম্মদ যায়ন আল-হাদি রচিত : نشأ العلمانية বা 'সেকুলারিজম এর উৎপত্তি' গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
📄 ধর্মনিরপেক্ষতা কিভাবে আত্মপ্রকাশ করল?
খৃস্টীয় পাশ্চাত্য সমাজ একসময় ধর্মীয় দোদুল্যতায় ভূগছিল, যা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের উর্বর ভূমি ও অনুকূল পরিবেশ, তখন সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ নামক বিষবৃক্ষটি জন্ম নেয় ও বেড়ে উঠে।
ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া প্রসিদ্ধ বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে সর্বপ্রথম ফ্রান্সই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের উপর রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করায়। এ মতবাদটি যদিও তার অভ্যন্তরে নাস্তিকতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে দ্বীনকে দূরে সরিয়ে রাখা, এমনকি দ্বীনের সাথে শত্রুতা-বিদ্বেষ ও দ্বীন বিরোধিতা ইত্যাদি মারাত্মক চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড লালন করত, তারপরও তখনকার সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের আত্মপ্রকাশ ও তার অনুশীলন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অদ্ভুত ছিল না, কারণ;
প্রথমত: সে-সময় তাদের ঈসায়ী দ্বীন আল্লাহর নিখাদ ওহী ভিত্তিক ছিল না, যা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল ঈসা ইবনে মারয়াম 'আলাইহিস সালামের নিকট প্রেরণ করেছেন, বরং তাতে বিকৃতি ও মিথ্যার হাত অন্যায় হস্তক্ষেপ করেছিল, তাই তাদের দ্বীন ছিল বিকৃত, পরিবর্তিত, বর্ধিত ও হ্রাসকৃত, যা মানব কল্যাণের বিপরীত অবস্থান নিয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথেও তা ছিল সাংঘর্ষিক। সে-সময় ধর্মীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দানকারী গির্জাগুলো তাদের সন্ন্যাসী ও সংসারবিরাগীদের বিকৃতি ও পরিবর্তনকে শুধু সমর্থন নয়, দ্বীন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যা পালন করা ও যার উপর অটল থাকা তখন প্রত্যেকের উপর ফরয ছিল। বৈজ্ঞানিক ও গবেষকদের বিরুদ্ধে গির্জায় অভিযোগ করা হয়, ফলে গির্জা তাদেরকে শাস্তি দেয়, কারণ তারা বিকৃত দ্বীনের বিপরীত আবিষ্কার করেছে, তাদেরকে যিন্দিক ও নাস্তিক বলে অপবাদ দেয়, অতঃপর তাদের অনেককে করা হয়েছে হত্যা, আবার অনেককে দেওয়া হয়েছে জ্বালিয়ে এবং তাদের বহুসংখ্যককে করা হয়েছে জেলে বন্দি।
দ্বিতীয়ত: খৃস্টানদের ধর্মীয় মুখপাত্র- গির্জাগুলো অত্যাচারী বাদশাহদের সাথে অনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তাদেরকে পবিত্র ও নিষ্পাপ সত্ত্বা হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা প্রজাদের উপর যে জুলুম ও অত্যাচার করত, গির্জাগুলো সেগুলোর বৈধতা প্রদান করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, এটাই প্রকৃত ধর্ম, যার শরণাপন্ন হওয়া ও যার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা সবার জন্য জরুরি।
তাই মানুষ গির্জার জেলখানা ও তার অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতির উপায় খুঁজে। তখন খৃস্টীয় দ্বীন থেকে বের হওয়া, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা, জীবন-ঘনিষ্ঠ সকল বিষয় যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও আদর্শ ইত্যাদি থেকে তাকে দূরে রাখা, বরং বিতাড়িত করা ব্যতীত মুক্তির কোনো উপায় ছিল না, কারণ তা জালেমদের পক্ষাবলম্বন ও বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
হায়! তাদের জন্য কতই না ভালো হত, যদি তারা সেই বিকৃত খৃস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করত, কিন্তু তারা সে বিকৃত খৃস্টান ধর্মের উপর বিরক্ত হয়ে সকল দ্বীনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে।
খৃস্টীয় পাশ্চাত্য সমাজে এ জাতীয় ঘটনার আত্মপ্রকাশ আশ্চর্য কোনো বিষয় নয়, তবে ইসলামে তার কোনো সুযোগ নেই, বরং কল্পনা করাও অসম্ভব। কারণ ইসলামে রয়েছে আল্লাহর ওহী, যার অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকে বাতিল অনুপ্রবেশ করতে পারে না। এ দ্বীন বিকৃতি ও পরিবর্তন মুক্ত, তাতে কোনো বিষয় বৃদ্ধি কিংবা হ্রাস করা সম্ভব নয়, সে কাউকে পরোয়া করে না, হোক সে রাজা কিংবা প্রজা। সবাই তার শরীয়তের সামনে সমান। এ দ্বীন মানুষের প্রকৃত স্বার্থ সংরক্ষণকারী, এতে একটি বিধান নেই যা তাদের স্বার্থ পরিপন্থী। এ দ্বীন (ইসলাম) জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহ প্রদান করে। এতে প্রমাণিত এমন কোনো বিষয় নেই, যা বিজ্ঞানের প্রমাণিত বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। অতএব দ্বীনে ইসলাম পুরোটাই সত্য, পুরো দ্বীনই কল্যাণ, পুরো দ্বীনই ন্যায় ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ থেকে আমরা বলতে পারি, পাশ্চাত্য সমাজে দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ ও অনীহা থেকে যে চিন্তা ও মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে, ইসলামী দেশে কখনো তা প্রকাশ পেত না, বরং মুসলিম দেশের কেউ তা শ্রবণও করত না, যদি না থাকত সংঘবদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধ, যা ইসলামের নিষ্ক্রিয় ও নিষ্প্রভ হালতে ঈমান-শূন্য কতক অন্তর ও সুস্থ চিন্তা-শূন্য কিছু বিবেককে শিকার করতে সক্ষম হয়েছে।
মুসলিম দেশে বসবাসকারী খৃস্টানরাও বিভিন্ন মিডিয়া ও প্রচার- যন্ত্রের সাহায্যে সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) মতবাদ আমদানি ও প্রসারের ক্ষেত্রে কম-যায়নি, তাদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা ও ক্ষতিকর প্রভাব। অনুরূপ সেকুলারিজম প্রচারের ক্ষেত্রে মুসলিম শিক্ষানবিশরাও ভূমিকা রেখেছে প্রচুর, যারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের জন্য পাশ্চাত্য দেশসমূহে গিয়েছিল। সেখানে তারা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ও তার আবিষ্কার দেখে ফেতনায় পতিত হয়, অতঃপর সে সকল দেশের প্রচলিত প্রথা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আচার-আচরণ বাস্তবায়ন ও প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে নিজ দেশে ফিরে আসে। অতঃপর এক শ্রেণির লোক সে সব লোকদের পেশ করা এ সব তথ্য ও নীতিগুলো গ্রহণযোগ্য হিসেবে লুফে নেয়, তাদের ধারণা এরাই উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক-বাহক ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
বস্তুত এসব বিদেশ ফেরৎ লোকদের দেখা অভ্যাস, প্রথা ও পদ্ধতি যেগুলো তারা খুব বড় ও মহত চিন্তাধারা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে তা এমন সমাজের-যার সাথে দ্বীনের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে আমরা মুসলিম দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে জানতে পারলাম, যা আমাদেরকে আরো দু'টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে:
এক. মুসলিম দেশে বাসকারী খৃস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা আমাদের জন্য ক্ষতিকর, তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই তাদের সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, আল্লাহ তাদেরকে যে স্থানে রাখতে বলেছেন আমরা তাদেরকে সেখানেই রাখব। তাদেরকে মুসলিম দেশে সামান্যতম কর্তৃত্ব ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ দেব না। সকল মিডিয়া, প্রচারযন্ত্র ও গণমাধ্যমগুলোর দরজা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত করে রাখব না, বরং বন্ধ করে রাখব, যেন তারা মুসলিমদের মাঝে তাদের বিষ ছড়ানোর সুযোগ না পায়। কিন্তু এ কাজ করবে কে! অধিকন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান সেকুলারিজমের বিষ ছড়ানোর জন্য তাদেরকে বিভিন্ন পদ ও পদবী দিয়ে রেখেছে!
দুই. শিক্ষানবিশদের বহির্বিশ্বে পাঠানোর ঝুঁকিও অনেক। তার পরিণতি ভয়াবহ। অনেক মুসলিম সন্তান এমন চেহারা ও অন্তর নিয়ে সেখান থেকে এসেছে যা নিয়ে সে সেখানে যায়নি। অতএব বস্তুগত জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য সেখানে যাওয়া যখন ঝুঁকিপূর্ণ, তখন দ্বীনি ইলম শিখার জন্য সেখানে যাওয়া কিভাবে নিরাপদ, বিশেষ করে আরবি কিংবা ইসলামী বিষয়াদি শেখার জন্য?! এটা কি কখনো সম্ভব বা যুক্তি সঙ্গত যে, একজন মুসলিম ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও শরীয়তের বিদ্যার্জন করবে এমন লোকদের থেকে, যারা কট্টর কাফের, ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণকারী?!
টিকাঃ
* লেখক আরবি ভাষাভাষি, তার দেশের অনেক ছাত্র আরবি ভাষা শেখা ও তার উপর ডক্টরেট হাসিল করার জন্য অমুসলিম দেশে যায়, তাদের নিরুৎসাহিত করে তিনি এ কথা বলছেন। লেখকের সাথে সুর মিলিয়ে আমরাও আমাদের সন্তানদেরকে দ্বীনে ইসলাম শেখার জন্য সেখানে পাঠানোর ব্যাপারে সাবধান করতে পারি।