📄 কী এই পরীক্ষা?
ঈমানদারদের পরীক্ষা হলো, মুখে কালিমা পাঠ করার পর এ কালিমার সত্যতার উপর কতটুকু একীন আছে? এবং এ কালিমার জন্য কে জান-মাল উৎসর্গ করতে পারবে? কালিমার সত্যতা ও তার বিনিময়ে আসন্ন নেয়ামতের প্রতি এমন একীন হয়ে যায়, যেমনটি দুনিয়াবাসী চোখে দেখা দুনিয়ার উপর করে। তখন সে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। এ কালিমা কার অন্তরে কতটুকু জায়গা করে নিয়েছে?—তা দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতি তার একীন দেখে বোঝা যায়। যে ব্যক্তি আখিরাতের উপর এমন বিশ্বাস রাখে; যেন পলক পড়তেই সে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তার অর্থ হলো, তাওহীদের কালিমা তাঁর অন্তরে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়েছে যে, এটা ছাড়া অন্য সবই তাঁর অন্তর থেকে বের হয়ে গেছে।
পক্ষান্তরে কেউ যদি আখিরাতের পরিবর্তে চোখে দেখা পৃথিবীকে প্রাধান্য দেয়, তার নশ্বর জীবন ও মাল-দৌলতকে প্রাধান্য দেয়; তাহলে এটা স্পষ্ট যে, তার অন্তরে তাওহীদ কতটুকু আছে এবং অন্য বিষয় কতটুক জায়গা জুড়ে বসে আছে? আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার এক আয়াতে এ পুরো বিষয়টাকে খুব ভালভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন; যাতে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য কোনোরূপ জটিলতা না থাকে। তিনি ইরশাদ করেছেন-
لَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ ﴿التوبة: ৪৪﴾
"আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতের প্রতি যাদের ঈমান রয়েছে তারা মাল ও জান দ্বারা জেহাদ করা থেকে আপনার কাছে অব্যাহতি কামনা করবে না, আর আল্লাহ সাবধানীদের ভাল জানেন। (সূরা তাওবা: ৪৪)
অর্থাৎ আল্লাহ ও আখিরাতের উপর যার ঈমান আছে, সে জিহাদ থেকে অব্যাহতির অনুমতি চায় না। সে তো আল্লাহর সাথে মোলাকাত এবং কিয়ামতের দিন এ কালিমার জন্য প্রাণ-উৎসর্গকারীদের জন্য বরাদ্দ নেয়ামত পাওয়ার জন্য অস্থির থাকে। অনুমতি তো সেই চাইবে, যার অন্তরে এ কালিমা প্রবেশই করেনি এবং সে আখিরাতের পরিবর্তে এ পৃথিবীকেই আসল মনে করে। আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার প্রতি তাদের একীন ও বিশ্বাস বেশি। কালিমা তো তারা এমনিতেই পড়েছে। কিছু রসম-রেওয়াজ আদায় করবে আর মুসলমানদের তালিকায় প্রবেশ করবে—কালিমা দ্বারা এটাই তাদের উদ্দেশ্য।
ইমামুল মুফাসসিরীন ইমাম ইবনে জারীর তবারী রহ. এ আয়াতের তাফসীরে খুব কঠিন ও শক্ত কথা বলেছেন-
وهذا إعلام من الله نبيه صلى الله عليه وسلم سيما المنافقين أن من علاماتهم التي يُعرفون بما تخلفهم عن الجهاد في سبيل الله، باستئذانهم رسول الله صلى الله عليه وسلم في تركهم الخروج معه إذا استنفروا بالمعاذير الكاذبة
'এটার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল কে মুনাফিকদের আলামতসমূহ জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তাদের ঐ আলামতসমূহ যেগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে চেনা যাবে, তার অন্যতম হলো—তারা মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহ এবং রাসূল থেকে জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে আল্লাহর পথে জিহাদ করা থেকে পিছুটান মারবে।'
إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْবِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ ﴿التوبة: ৪৫﴾
"নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে (জিহাদে যাওয়া থেকে) অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।” (সূরা তাওবা: ৪৫)
এ কথা স্পষ্ট যে, যখন অন্তরেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে এবং যা কিছু হযরত মুহাম্মাদ আনয়ন করেছেন, সে ব্যাপারেই সন্দেহে পড়ে গেছে যে, মুহাম্মাদ এর আনীত শরীয়ত ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে, না ঐ 'শরীয়ত' যাকে আন্তর্জাতিক সুদখোরেরা বৈশ্বিক নেজাম বা ব্যবস্থাপনার নামে জাতিসংঘের মাধ্যমে চাপিয়ে দিয়েছে, তা বাঁচাতে পারবে?
সুতরাং যাদের কালিমা পড়ার ব্যাপারে আল্লাহপাক সাক্ষী দিচ্ছেন যে, তাদের ঈমান আনা ও কালিমা পাঠ করা মিথ্যা। তাদের কেবল মৌখিক কালিমা পাঠ করা তাদেরকে কতটুকু ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে?—তা অনুধাবন করা মুশকিল নয়।
নিজের দ্বীন ও ঈমানকে পরাজিত দেখেও বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিতাল না করা, কুফরের গোলামির জিন্দেগি গ্রহণ করে প্রাণ বাঁচিয়ে ফেরাকে কোন জাতির অভিধানে 'বিজয়' বলা হয়েছে? নিজের ঘরবাড়ি বাঁচাতে মুসলমানদের ঘরবাড়ি পুড়তে ও উজাড় হতে দেখে, জীর্ণশীর্ণ হয়ে যেতে দেখে তামাশার নিরব দর্শক হয়ে বসে থাকা কোথাকার ভদ্রতা? যখন একদিকে আল্লাহর দল ও অপরদিকে শয়তানের দল মুখোমুখি অবস্থানে, যখন উভয় দলই নিজ নিজ আকীদা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে নিজের সর্বস্ব বিলীন করতে প্রস্তুত। মুমিনগণ ইসলামের জন্য আর কাফেররা কুফরী নেজাম বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ করছে। এ যুদ্ধে নিজেকে যুদ্ধের কাতার থেকে আলাদা করে যদি এটা মনে করা হয় যে, আমি তো নিরেপক্ষ, তখন প্রশ্ন হলো—আপনি কোন দল থেকে নিরপেক্ষ হয়েছেন? ইসলাম থেকে?—যার জন্য প্রাণ দেওয়া আপনার উপর ফরয ছিল। রাহমাতুল্লিল আলামীন এর আনীত কুরআন থেকে?—যার জন্য ঘর-বাড়ি, মাল-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি সবকিছু কুরবান করে দেওয়ার আদেশ আছে। আপনি তো ইসলাম থেকে শুধু এ কারণে নিরপেক্ষ অবস্থানে গেছেন; যেন কুফরী ব্যবস্থার ধারকবাহক শক্তি আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে পড়ে।
আল্লাহর পরিপূর্ণ দ্বীনের দাওয়াত উলামায়ে কেরামের জিম্মাদারি; যদিও গোটা বিশ্ব তাঁদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যাক না কেন। বর্তমান সময়ে দ্বীনের দায়ীগণের বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মনে রাখতে হবে, إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ তথা সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, এর স্লোগান তোলার পর এ সূরার দ্বিতীয় অংশ : وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ (একে অপরকে হক্ক ও ধৈর্যের উপদেশ দান)—কেও মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। তা না হলে ইসলামী আন্দোলনের দুর্বল ভিত্তি, অন্তঃসারশূন্য স্লোগান বা দুর্বল ভূমিকার কারণে মানুষ ইসলামী জাগরণ সম্বন্ধেও ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হবে।
একবার যখন 'আমাদের প্রভু আল্লাহ' এ ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, তখন আবশ্যক হলো: এটার উপরই অটল ও অবিচল থাকতে হবে। এটার উপরই জীবনযাপন করতে হবে, এর উপরই মরতে হবে। গাইরুল্লাহ'র প্রত্যেক নেজাম থেকে বিদ্রোহের ঘোষণা দিতে হবে। কেবল মুহাম্মাদ এর আনীত নেজাম প্রতিষ্ঠার জন্যই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্যই শত্রুতা, দুশমনি, অন্ধকার কুঠরি, ফাঁসির কাষ্ঠ এবং দেশান্তর—এগুলো ক্ষতি নয়, এগুলোই হলো চূড়ান্ত সফলতা। কেননা, এসব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই, তাঁর দ্বীনের বিজয়ের জন্যই বরণ করা হয়।
তাই দ্বীনের দায়ীগণ এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালিমাকেই বুলন্দ করার মহান ব্রত নিয়ে জাগ্রত হওয়া লোকদের জন্য আবশ্যক হলো, এ সূরার শেষ আয়াতকে নিজের মানহায ও কর্মপদ্ধতি হিসেবে বেছে নেওয়া; যাতে কাফেলা সফলতার পথে চলমান থাকে।
মুসলিম উম্মাহর চিন্তাশীল শ্রেণীকেও এটা বুঝতে হবে যে, নিজেদের দাওয়াত এবং মানহায ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিজয়ী করার জন্য ক্ষমতাশীল শক্তির সামনে বিদ্রোহের ঘোষণা দেওয়া আম্বিয়ায়ে কেরাম আ.-এর সুন্নাত। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত দ্বীনের পরিপূর্ণ দাওয়াত—কাফেরদের যতই খারাপ লাগুক, সর্বাবস্থায় তা চালু আছে। এর জন্য যখন নিজের জান, ঘরবাড়ি এবং দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, তখন নিঃসঙ্কোচে সেটাই করা হয়েছে। এমনকি দলের পর দল এ দাওয়াত ও মানহাযের জন্য শহীদ হয়ে গেছেন। লড়াইয়ের ময়দানে দলের পর দল শহীদ হয়ে যাওয়া ও ক্ষমতাশীল শক্তির অন্ধকার কালো প্রকোষ্ঠ থেকে তাঁদের জানাযা বের হওয়াকে পুরুষোচিত ইতিহাস পরাজয় বলে না। এতে তো তাঁদের মানহায ও মতবাদের বিজয়ই হয়। পরাজয় হলো, দলের নেতৃবৃন্দ নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য কর্মীদের কুরবানির সাথে গাদ্দারি করে নিজেদের মানহায ও মতবাদ থেকে দূরে সরে আসা। তারা দুনিয়ার ক্ষণিকের জীবন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আখিরাতের স্থায়ী ও অবিনশ্বর জীবন থেকে গাফেল হয়ে যায়। বিপ্লবের ইতিহাসে শোচনীয় পরাজয় এটাকেই বলা হয় যে, নেতৃবৃন্দ নিজেদের মৌলিক মতবাদ ও চিন্তাধারা থেকে ভীত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে সাহস হারিয়ে ফেলে বা অন্য কোনো কারণে সরে পড়ে।
হক্কের কাফেলা নিজেদের স্লোগান ও মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন, এটা এমনই এক বিজয়; যার মাধ্যমে ইতিহাসের পাতা সব সময় জ্বলজ্বল করতে থাকে। যাঁরা হক্কের পথে নানা রকম কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করেছেন, কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন এবং প্রাকৃতিক ক্ষতি বরদাশত করেও এ পথে অবিচল থেকেছেন, কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা এ পাগলদের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ ﴿آل عمران: ১৪৬﴾
“আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে জেহাদ করেছে; আল্লাহর পথে—তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর রাহে তারা হেরেও যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৪৬)
ইমাম ইবনে জারীর তবারী রহ. বলেন, আহলে হেজায ও বসরার কেরাতের (তিলাওয়াতরীতি) মধ্যে এ আয়াতে قُتل এর জায়গায় قَاتَلَ পড়া হয়েছে। অর্থাৎ কত নবী ছিলেন, যাঁদের সাথে উলামা ও ফকীহগণ শহীদ হয়ে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের পরবর্তীরা তাঁদের পর কিতাল করা থেকে সাহস হারায়নি এবং দুর্বলতাও প্রকাশ করেনি।
📄 আল্লাহর দলই বিজয়ী
ইলাল্লাযীনা আমানু (إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا) : এক আল্লাহর জন্য হয়ে যাওয়া, তাঁর জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার অদম্য ইচ্ছা, তাঁর জন্য জীবন, তাঁর জন্য মরণ, তাঁর জন্য ভালোবাসা, তাঁর জন্য ঘৃণা, তাঁর বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব, তাঁর শরীয়তের শত্রুদের সাথে শত্রুতা।
وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ : আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ : ভালো ও সওয়াবের কাজে সহায়তা এবং গোনাহ ও পাপাচারে কোনো সাহায্য নয়।
وَتَভোাসَوْا بِالْحَقِّ : পৃথিবীর বুক থেকে শয়তানি বাদ-মতবাদকে বিতাড়িত করে পূর্ণাঙ্গভাবে শুধু আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য। পুরো কুরআনকে বাস্তবায়ন করার জন্য। মানবতাকে কুফরের আঁধার থেকে বের করে আখিরাতের আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য।
وَتَভোাসَوْا بِالصَّبْرِ : অর্থাৎ পুরো দ্বীনের জন্য নবী এর দাওয়াতে অবিচল থাকা, দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়া, মুছে যাওয়া, বাতিলের ভয়ে ভীত হয়ে এ দাওয়াতে বেশ-কম না করা; বরং এর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়া।
📄 সফলতার স্তরসমূহ
সফল ব্যক্তিগণ মর্যাদার দৃষ্টিকোণে বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকেন। সুতরাং কে কত সফল হয়েছেন? কে কী পরিমাণ ক্ষতি থেকে বাঁচতে পেরেছেন? স্বীয় পুঁজিকে কে কত লাভজনক করতে পেরেছেন?—কুরআনে কারীম তা-ই বর্ণনা করছে-
وَالسَّابِقُونَ السَّابِقُونَ ﴿১০﴾ أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ ﴿১১﴾ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ﴿১২﴾
“অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই। তাঁরাই নৈকট্যশীল, (তাঁরা অবস্থান করবে) নেয়ামতপূর্ণ উদ্যানসমূহে।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: ১০-১২)
وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ ﴿الواقعة: ২৭﴾
"যারা ডান দিকে থাকবে, তারা কত ভাগ্যবান।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: ২৭)
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿التوبة: ১০০﴾
"আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।” (সূরা তাওবা: ১০০)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ ﴿১০﴾ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي সَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿১১﴾ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿১২﴾
"মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বানিজ্যের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম; যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জান্নাতে উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য।” (সূরা সাফফ: ১০-১২)
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ وَذُلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿التوبة: ১১১﴾
"আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহেঃ অতঃপর মারে ও মরে। তওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।” (সূরা তাওবা: ১১১)
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَيُدْخِلُهُمْ رَبُّهُمْ فِي رَحْمَتِهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْمُبِينُ ﴿الجاثية: ৩০﴾
"যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তাদের পালনকর্তা স্বীয় রহমতে দাখিল করবেন। এটাই প্রকাশ্য সাফল্য।” (সূরা জাসিয়া: ৩০)
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِم بُشْرَاكُمُ الْيَوْمَ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿الحديد: ১২﴾
“যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখ ভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে বলা হবেঃ আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।” (সূরা হাদীদ: ১২)
يَوْমَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِن قِبَلِهِ الْعَذَابُ ﴿الحديد: ১৩﴾
“যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবেঃ তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা কর, আমরাও কিছু আলো নিব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবেঃ তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ কর। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।” (সূরা হাদীদ: ১৩)
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذُلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿النساء: ১৩﴾
“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ ও রসূলের আদেশমত চলে, তিনি তাকে জান্নাত সমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হল বিরাট সাফল্য।” (সূরা নিসা: ১৩)
নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেন-
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ أَرَاهُ فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ.
"আল্লাহর পথের মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে একশ'টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু'টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের ন্যায়। তোমরা আল্লাহর কাছে চাইলে জান্নাতুল ফিরদাউস-ই চাইবে। কেননা, এটাই হলো: সবচাইতে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ-ও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে রহমানের আরশ। আর সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৫৯৮, ই.ফা.)
📄 মানুষের তৈরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লোকসানই লোকসান
ঢুন্ডনে ওয়ালা সিতারো কি গুজারগাহো কা
আপনে আফকার কি দুনিয়া মে সফর কর না সাকা
আপনি হিকমত কে খাম ও পেচ মে উলঝা অ্যায়সা
আজ তাক ফয়সালা নাফে ও জারার করনা সাকা
"তারকারাজির পথ-অন্বেষীরা স্বীয় চিন্তার জগতে প্রবেশ করতে পারল না। হিকমাহ'র বাহানায় ফেঁসেছে আজ পর্যন্ত নিজের লাভ-লোকসান চিহ্নিত করতে পারল না।"
কুরআনুল কারীমের এ ছোটতম সূরার ছোটতম আয়াত ﴿إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ﴾ পশ্চিমা বিজ্ঞানীসমাজ, ভারতীয় ব্রাহ্মণসমাজ এবং নব্য জাহেলী জীবনব্যবস্থা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের জন্য এখনো চ্যালেঞ্জ। হে মানবতার ধ্বজাধারীরা! যেমনি পূর্বযুগের উম্মাতরা উন্নতি করা সত্ত্বেও আল্লাহর কিতাব ত্যাগ করার কারণে ক্ষতিতে নিপতিত, তেমনি তোমাদেরও একই অবস্থা। তোমরাও ক্ষতির গর্তে নিপতিত হচ্ছ। উন্নতির সব দাবি মিথ্যা। তোমরা পৃথিবীর বুক থেকে আল্লাহর দ্বীনকে শেষ করে দিয়ে নিজেদের গড়া ব্যবস্থা চালু করেছ। তোমরা মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আনীত জীবনব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের জাহেলী সভ্যতা দুনিয়ার উপর চাপিয়ে দিয়েছ। ফলাফল কী হয়েছে?
আজ তোমরাই প্রত্যক্ষ করছ, ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্ব একাকিত্ব, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, অশান্তির সয়লাবে ভাসছে। জীবনে সুখ-শান্তির নামগন্ধও তাদের নেই। নিষ্ঠা ও দায়িত্বজ্ঞান, অগ্রাধিকার ও কুরবানি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা পশ্চিমা সমাজে অনুপস্থিত। পুরো সমাজই লাভের থিউরির উপর দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কারো নয়। সবাই চায় স্বার্থ। স্ত্রী ততক্ষণ স্ত্রী থাকে, যতক্ষণ স্বামীর সাথে স্বার্থ জড়িত থাকে। স্বামী ততক্ষণ স্বামী থাকে, যতক্ষণ স্ত্রীর সাথে স্বার্থ জড়িত থাকে। অবস্থা এতই নাজুক যে, স্ত্রী স্বামীর উপর ভরসা করতে পারে না। মা তার সন্তানের উপর আস্থা রাখতে পারে না। বোন ভাইয়ের উপর আস্থা রাখতে পারে না।
অথচ পশ্চিমা জীবনাদর্শের দাবিই হলো, একমাত্র পার্থিব জীবনকেই সুন্দর করা। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করানোর জন্য প্রথম যে স্লোগানটি জাতির সামনে তুলেছিল; তা হলো—তাদের কাছে যে জীবনদর্শন আছে, যে জীবনব্যবস্থা তারা নিয়ে এসেছে, তার উপর চলে এমন এক উন্নতির মহাসড়কে ওঠতে পারবে, দুরাবস্থা কখনো তাদেরকে স্পর্শ করবে না। এ জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করার পর মানুষের জীবনমান এতই উন্নত হবে যে, চতুর্দিকে খাবারের পর্যাপ্ততা, তৃপ্তি ও মুক্তহৃদয়ই থাকবে। এমন এক সমাজ হবে, যেখানে শান্তি-নিরাপত্তা, মান-সম্মান থাকবে ভূরি ভূরি। মোটকথা, পৃথিবীটা পরিণত হবে সুখময় উদ্যানে!
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য না করে সৃষ্টি কীভাবে সুখ-শান্তি লাভ করবে? তাঁর দ্বীনকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেওয়া ব্যতীত সুখ-সমৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব? যে শরীয়ত মুহাম্মাদ (ﷺ) নিয়ে এসেছেন, তা বাস্তবায়ন না করে রহমতের আশা করা সুদূর পরাহত।
ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও ব্রাহ্মণ চিন্তাবিদেরা কি এ কথা অস্বীকার করতে পারবে যে, ভারতবর্ষে ইসলামের আলো আসার আগে ভারতীয় সমাজব্যবস্থা কেমন শোচনীয় অবস্থায় ছিল? হিন্দুসমাজ শ্রেণীবৈষম্য, সতীদাহ প্রথা ও মেয়েদেরকে অপয়া ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ছিল। শেষমেষ তো এমন হয়েছিল, স্বামী মৃত্যুবরণ করলে সাথে স্ত্রীকেও চিতার আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হতো!
সাধারণ মানুষকে জমিদার, মহারাজ, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা নিজেদের গোলাম বানিয়ে নিয়ে ছিল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মানুষ তাদের দাসত্বে লিপ্ত ছিল। তারা সেই অধিকারও ভোগ করতে পারেনি, যা আজ কুকুর-বিড়ালরাও ভোগ করছে। রাহমাতুল্লিল আলামীনের এ দ্বীনই তো হিন্দুসমাজকে মানবতা শিখিয়েছে। মানবমর্যাদা ও পবিত্র সত্তার অপমানের কথা তাদের বুঝিয়েছে। ভারতীয় ব্রাহ্মণদের বুঝিয়েছে যে, মানুষের রক্ত জীবজন্তুর রক্তের চেয়ে অনেক মূল্যবান। তাদের সামনে এ রহস্য বাতলে দিয়েছে যে, পুরুষের মতো নারী সত্তাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তার স্বামীর মৃত্যুতে সে এমন কোনো অপরাধ করেনি, যার কারণে তাকে জীবন্ত চিতার আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
ভারতবর্ষ থেকে ধর্মীয় শাসনের সমাপ্তির পর অর্থাৎ ইংরেজরা দিল্লি দখল করার পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এ সমাজটি অবর্ণনীয় অবস্থার শিকার। ব্যভিচার, ঘুষ, সুদ, জুলুম, শ্রেণীবৈষম্য (যদিও তার বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে) এর মতো অসংখ্য চারিত্রিক অধঃপতনের উইপোকা এ সমাজকে শেষ করে দিয়েছে।
আশ্চর্য লাগে, এ আধুনিক যুগেও হিন্দুরা নিজেদেরকে পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে পেশ করছে! এ পৃথিবীতে এখনো এমন মানুষও রয়ে গেছে, যারা নিজেদের খোদিত পাথরকে তাদের প্রভু হিসেবে মেনে নিয়েছে! নিজেরাই তাদের পুরোনো প্রভুদের ক্ষমতা কখনো বাড়ায়, কখনো কমায়! কখনো এক প্রভুর ক্ষমতা আরেকজনকে, কখনো কয়েক প্রভুর ক্ষমতা একজনের মাঝে সন্নিবেশ করে দেয়! বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও শিল্প-সাহিত্যে উৎকর্ষ-সাধনের দাবিদার ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা কি কখনো এ কথা চিন্তা করার সাহস করে না যে, শেষমেষ এ আধুনিক যুগেও অজ্ঞতার সেই পুরোনো আঁধারগুলো বিদ্যমান? টিভির পর্দায় বড় বড় স্লোগানধারীরা কি কখনো নিজেদেরকে নিয়ে একটু ভাবার সময় পায় না? নাকি এখনো তাদের গলায় সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী দড়ি ঝুলে আছে?—যা ইসলাম আসার আগে ছিল। হিন্দুধর্ম নিয়ে কথা বলা আজও কি সেই অন্ধকার যুগের ন্যায় অমার্জনীয় অপরাধ?
এসব মন্দ কাজের একটাই কারণ। তারা তাদের আসল সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারেনি। তাঁর প্রেরিত জীবনব্যবস্থাকে ত্যাগ করেছে। সুতরাং পূর্ব-পশ্চিম আল্লাহদ্রোহিতার পরিণাম আজ ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছে। মানবজাতির ইতিহাসে কি কখনো মানুষ এত লাঞ্ছিত হয়েছে, যতটা এ আধুনিক যুগে হয়েছে? তোমরা মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছ। তোমরা তাদেরকে আসল স্রষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে নিজেদের হাতে খোদিত পাথরের দাস বানিয়ে নিয়েছ। কোথাও গণতন্ত্রের নামে, কোথাও রাজতন্ত্রের আড়ালে, কোথাও সমাজতন্ত্রের ব্যানারে তো কোথাও পুঁজিতন্ত্রের শিরোনামে।
তোমরা মানবসমাজকে সেই জঙ্গলের চেয়ে নিকৃষ্ট বানিয়ে দিয়েছ, যেখানে জীবজন্তুরাও লজ্জাশরম ও চরিত্রের প্রতি লক্ষ্য রাখে। তোমরা পরিবারগুলোকে ধ্বংস করার এমন বীজ বপন করেছ যে, ঘরবাড়ি ও বংশধারা আজ বিলুপ্তির পথে। সন্তানরা ভুলে গেছে তাদের পিতামাতাকে। পিতামাতা ভুলে গেছে তাদের সন্তানকে। পশ্চিমাবাজারে তো মায়েদের মমতার লাশ দাফন করে দেওয়া হয়েছে। ভাইবোনের পবিত্র সম্পর্ক বিনষ্টকারী তোমরাই। তোমরাই তো নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা ও সতীত্ব বিক্রিকে এমন এক শিল্পে রূপ দিয়েছ যে, সেই সতীত্ব বিক্রির টাকায় তোমাদের রাজত্ব ফুলে ওঠছে। তোমাদের বেহায়াপনা দেখে অভিজাত পরিবারগুলো লজ্জা ও পবিত্রতার জন্য মাতম করছে। বিকৃতিতে ভরা শহরগুলোয় লজ্জাশরমের অবস্থা এতই শোচনীয় যে, কোথাও সসম্মানে থাকাও মুশকিল। তোমরা সাধারণ নাগরিকদের কী অধিকার দেবে? তোমরা তো তাদের একটি বড় অংশকে স্বীয় বংশধ্বস্ত থেকেও বঞ্চিত করেছ। তারপরও বড় গলায় বলছ যে, তোমাদের লাইফ স্টাইলই মানবতাকে সম্মানিত করতে পারে!!
তোমাদের সঞ্চয়ের লোভ বাজারের বিশ্বস্ততা ছিনিয়ে নিয়ে বেঈমানি ও ধোঁকায় সেই স্থান দখল করে নিয়েছে। কোনো অঙ্গীকার রক্ষা করা হয় না। রাখা হয় না কারো কথা। রিযিকের নামে তোমরা পুরো মানব সভ্যতাকে সুদে জড়িত করেছ এবং একটি একটি রুটির টুকরোর মালিক বানিয়ে দিয়েছ। তোমাদের এ ঘৃণ্য সুদ ব্যবস্থার ফলে মূল্যবৃদ্ধি, বাজারমন্দা, প্রতারণা ও জালিয়াতি ছাড়া মানুষ কিছুই পেল না।
সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমা সভ্যতা প্রযুক্তির মাধ্যমে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দারা চারিত্রিক ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিপতিত, সেখানে মানবতা চরমভাবে লজ্জিত। স্বীকার করি, আধুনিক প্রযুক্তি পশ্চিমা জাতির জীবনে এত গতি এনেছে যে, একজন তরুণ তার কামরায় বসেই পুরো পৃথিবীর খবর রাখতে পারছে। কিন্তু তারা মানবতা থেকে এতই দূরে অবস্থান করছে যে, পাশের কামরার বুড়ো মায়ের খবরও পর্যন্ত নেয় না, যিনি এক গ্লাস পানির অভাবে শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও গতিময় উপার্জনব্যবস্থা তরুণদের আয় বহুগুণ বাড়িয়েছে; কিন্তু সুদ ব্যবস্থায় জড়িয়ে তরুণরা ব্যাংক ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি থেকে ঋণ নিতে নিতে বার্ধক্যে উপনীত হচ্ছে। কৃষির আধুনিকায়নের ফলে কৃষকরা দ্রুত ফসল উৎপাদন তো করছে; কিন্তু এ জমিনে আল্লাহর শরীয়াহ বাস্তবায়িত না হওয়ায় জমিন তার খাদ্যগুণ আটকে রেখেছে। এখন জমি তো অনেক আছে; কিন্তু অনেক কষ্টের বিনিময়ে অল্পই তাতে উৎপাদিত হয়। যার উপকারিতাও অনেক কম। খাদ্যগুণ নেই বললেই চলে। দেখতে প্রত্যেকটি খুব বড় ও মোটা মনে হয়; কিন্তু তাতে খাদ্যগুণের রেশও থাকে না!
মোটকথা, তোমাদের সভ্যতা-দর্শন, সক্ষমতা ও জীবনব্যবস্থা, শিক্ষা ও অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও সংসদীয় সিস্টেম—সবই ব্যর্থ হয়েছে। সময়ই বলে দিচ্ছে, পশ্চিমা চিন্তাবিদরা যেসব বাদ-মতবাদ আবিষ্কার করেছে, তা স্পর্শকাতর স্থানে অবস্থান করছিল। আসমানকে সাক্ষী রেখে বলছি, তোমাদের সভ্যতা নিজের খঞ্জর দিয়ে আত্মঘাতী করছে। যে সভ্যতাকে তোমরা মেকআপ করে সাজিয়ে গুছিয়ে দুনিয়াবাসীর সাথে প্রতারণা করেছিলে, আজ সেটির লাশ থেকে পোকামাকড় বের হচ্ছে, যার দুর্গন্ধ এ সাত সমুদ্রের এপারের জীবনও বিপর্যস্ত করে তুলছে।
তোমরা মানুষকে আদর্শ চরিত্র ও উত্তম শিষ্টাচার কী শিখাবে? বাস্তবতা হলো, তোমরা শয়তানের আদর্শ ও তার আশা-আকাঙ্ক্ষাই বাস্তবায়ন করছ। এখনো তোমরা তার মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পৃথিবীকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছ। হয়তো তোমরা ভাবছ, আরও রক্ত প্রবাহিত করে বিশ্বকে জয় করার প্রতিযোগিতায় জিতবে এবং এভাবে আগামীর বিশ্ব তোমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। কিন্তু এটি পাগলের দুঃস্বপ্ন মাত্র!
অ্যাঁ খেয়াল ইস্ত ও মহাল ইস্ত ও জুনু
"সবই খেয়ালিপনা, অসম্ভব বিষয়ের মাতলামি।"
তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, দিনরাত পৃথিবীজুড়ে তোমাদের ভ্রমণ—সবই শয়তানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ﴾ ﴿سبأ: ২০﴾
"আর তাদের উপর ইবলীস তার অনুমান সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। ফলে তাদের মধ্যে মুমিনদের একটি দল ব্যতীত সকলেই তার পথ অনুসরণ করল।” (সূরা সাবা: ২০)
আল্লাহর কুরআন আজকের এ একবিংশ শতাব্দীতেও তোমাদেরকে ধমক দিয়ে বলছে, হে নব্য জাহেলী সভ্যতার মানুষ! তুমি ক্ষতিতে নিপতিত। তোমার প্রতিটি মুহূর্ত ক্ষতি ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তুমি সমুদ্রগভীরে হাবুডুবু খাচ্ছ; কিংবা শূন্যে ওড়ছ তুলোর মতো। তোমার বৈষয়িক উন্নতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, আলোকোজ্জ্বল শহর—সবই থাকা সত্ত্বেও তোমার এক এক মুহূর্ত, একেক সেকেন্ড, একেক নিঃশ্বাস তোমার ক্ষতিই বৃদ্ধি করছে। যদিও তোমার অদূরদৃষ্টির কারণে তুমি মনে করছ, নব্য জাহিলিয়্যাত উন্নতিই করছে। তুমি সৃষ্টির রহস্যের খোঁজে এগিয়ে যাচ্ছ। তোমার জীবনোপকরণ উন্নত হচ্ছে। তোমার সোনাদানা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবই দৃষ্টিভ্রম ও আত্মপ্রবঞ্চনা।