📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 উম্মাহর অবস্থা ভালো করার সূক্ষ্ম এক রহস্য

📄 উম্মাহর অবস্থা ভালো করার সূক্ষ্ম এক রহস্য


এ আয়াত থেকে জানতে পারি যে, কিতালের মহান কাজ চালু রাখাই এ উম্মাহকে সব ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচানোর মাধ্যম। কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও মুসলমানদের সামাজিক অবস্থা শুদ্ধ করার মাধ্যম। যখনই এ উম্মাহ কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ'র আমলকে ছেড়ে বসবে, তখনই তাদের অধঃপতন শুরু হবে। তারা যুদ্ধে হেরে বসবে। নেতৃত্ব তাদের হাত থেকে বেরিয়ে শরীয়াহ'র দুশমন (কাফের, মুরতাদ ও মুনাফিক) এর হাতে চলে যাবে।

তাইতো মনে হচ্ছে, বাতিলশক্তিও এ রহস্য ভালোভাবেই জানে। তাই তারা সর্বপ্রথম শর্ত দেয় যে, আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা যাবে না। যুদ্ধ বন্ধ করে অস্ত্রসমর্পণ করতে হবে। তারা জানে, তারপর মুসলমানদেরকে ষড়যন্ত্রের জালে ফাঁসানো একদম সহজ।

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 একটি প্রশ্ন

📄 একটি প্রশ্ন


যেমনটি আপনি বলছিলেন যে, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কিতালকারীদের সম্পর্কে অঙ্গীকার করছেন যে, তিনি তাঁদের পথপ্রদর্শন করবেন এবং তাঁদের অবস্থা ভালো করে দেবেন, তো অনেক মুজাহিদ বা বিভিন্ন জিহাদী দল সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয় কেন?

এ প্রশ্নের জবাব স্বয়ং আয়াতেই বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা মুজাহিদদের দিক-নির্দেশনা ও তাঁদের অবস্থা ভালো করে দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন, তাতে একটি শর্ত আছে। তা হলো, وَالَّذِينَ قَاتَلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থাৎ, যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ হিসেবে তাই গ্রহণযোগ্য হবে, যা আল্লাহর রাসূল বর্ণনা করেছেন।

عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا الْقِتَالُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّ أَحَدَنَا يُقَاتِلُ غَضَبًا وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً فَرَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ قَالَ وَمَا رَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ قَائِمًا فَقَالَ مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.

হযরত আবূ মূসা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূল এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর পথে যুদ্ধ কোনটি? কেননা, আমাদের কেউ কেউ লড়াই করে ক্রোধের বশীভূত হয়ে, আবার কেউ লড়াই করে প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য। তখন রাসূল তাঁর দিকে মাথা তুলে তাকালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর মাথা তোলার কারণ হলো, লোকটি দাঁড়ানো ছিল। অতঃপর তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করে সেই আল্লাহর রাস্তায়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১২৫, ই.ফা)

সুতরাং যদি কোনো মুজাহিদ ব্যক্তিগত মতামত বা কোনো জিহাদী জামা'আতের সংঘবদ্ধ মতামতের কারণে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথবা আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে লিপ্ত হয় এবং তাদের অধঃপতন হতে থাকে, তখন বুঝতে হবে, وَالَّذِينَ قَاتَلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ কিতাল ফী সাবীলিল্লাহর কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ হচ্ছে। জিহাদের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে গেছে। দ্বীনের বিজয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে পার্থিব উপকারিতা ও সাম্প্রদায়িকতাই সেই জায়গা দখলে নেয়। এটি সংঘবদ্ধভাবে শরীয়াহর অনুসরণে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথবা কোনো মুজাহিদ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কারণ, মুজাহিদের কাজ জিহাদে অবিচলতা ও দুর্বলতার কারণ হয়।

হযরত আবু দারদা রাযি. বলেন- وَقَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ إِنَّمَا تُقَاتِلُونَ بِأَعْمَالِكُمْ
“ আমল অনুসারে তোমরা জিহাদ করে থাকো।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৭৫৪, ই.ফা)

قوله: (إنما يقاتلون بأعمالكم أي إن الأعمال الصالحة تورث ثبات القدم عند القتال. فالقتাল يكون بسبب بركة الأعمال. فهي دخيلة فيه.

অর্থাৎ, সৎকাজ যুদ্ধাবস্থায় দৃঢ়তা দান করে। সুতরাং সৎকাজের কল্যাণেই যুদ্ধ হয়। তাই যুদ্ধে সৎকাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আল্লাহর তা'আলার তাওফীকের স্বল্পতা ও মুজাহিদদের অবস্থার অধঃপতন যতই হবে, ততই বুঝতে হবে যে, এ পরিমাণ যুদ্ধের কাজে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোথাও শরীয়াহবিরোধী বা আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ হচ্ছে। অথবা সেটিকে এভাবে বলতে পারেন যে, কিতালের মহান কাজকে যত ইখলাসের সাথে এবং নবীজীর সুন্নাহ মতে করা যাবে, আল্লাহর তাওফীক, মুজাহিদীন ও জিহাদী দলের অবস্থা ততই ভালো থাকবে। তেমনি মুজাহিদ এর সম্পর্ক আপন পালনকর্তার সাথে যত সুদৃঢ় হবে, তাঁর তাওফীক ও পথ-নির্দেশনাও ততই তাদের সাথে থাকবে। এমন কি আকণ্ঠ নিমজ্জিত ফেতনাকালেও তাদের অন্তর সত্যপথে অটুট থাকবে। এটি মুজাহিদদের জন্য রিজার্ভ।

সুতরাং وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ এর উপর আমলের পর অশুভ শক্তিগুলো কলকাঠি নাড়া শুরু করে। কারণ হক্ক-বাতিল ও ভালো-মন্দের এ যুদ্ধে বাতিল সর্বদা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে যে, তারা হক্কপন্থীদের দাবিয়ে রাখবে, তাঁদেরকে দ্বীনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবে এবং তাঁদের দাওয়াতী কার্যক্রমকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য তারা সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন করাকেও বৈধ মনে করছে। তাতে না তারা কোনো শিষ্টাচার অবশিষ্ট রেখেছে, আর না কোনো সম্পর্ক বা আত্মীয়তার ধার ধারে। যেমনটি পাকিস্তান আর্মি শরীয়াহ আইন চালুর দাবিকারীদের প্রতি করেছে।

কারণ, এটি এমন এক যুদ্ধ; যাতে হক্কের কাছে শুধু দ্বীন ও আকীদা এবং বাতিলের কাছে প্রবৃত্তি ও ক্ষমতাই অভিষ্ট লক্ষ্য হয়। সত্যবাদীরা হক্কের জন্য এবং প্রবৃত্তিপূজারিরা স্বীয় প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে আছে। সত্যবাদীদের উপর জালিমের এ জুলুম-নির্যাতনের উদ্দেশ্য শুধু এই নয় যে, সত্যের পথে আহ্বানকারীদের অস্তিত্ব মুছে যাক; বরং ধূর্ত শত্রুদের প্রথম প্রয়াস হলো, দাওয়াতের উদীয়মান দলটিকে তাদের দাওয়াত ও নীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া। তারা জানে, সবাইকে হত্যা করার চেয়ে অধিক কল্যাণকর হলো, তাঁদের নীতি ও পদ্ধতিতে বিকৃতি সাধন করা।

তাঁরা যে স্লোগান নিয়ে বেরিয়েছে, যে কোনো উপায়ে তাঁদেরকে তা থেকে হটিয়ে দেওয়া। কারণ, সবাইকে হত্যা করলে সেই নীতি ও পদ্ধতি নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং আগের চেয়ে আরও বেশি প্রসারতা লাভ করে। পক্ষান্তরে তাঁদেরকে নীতি ও পদ্ধতি থেকে সরিয়ে দিলে পরবর্তী প্রজন্ম বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের চিন্তা-চেতনার অপমৃত্যু ঘটে। সুতরাং এমন দল যতই ছড়িয়ে পড়ুক না কেন, শত্রুদের জন্য কোনো আশঙ্কা থাকে না। বরং তার অস্তিত্বই উপকারী হয়ে ওঠে। সেই দলের করুণ অবস্থা দেখে কেউ ওঠে দাঁড়ানোর সাহস পায় না। তাছাড়া জাগরণের কর্মী-সমর্থকরাও আগামী দিনে এমন ভুলে জড়াবে না। কারণ, এত কুরবানির ফলাফল কী এল? কিছু সরকারি পদ, দায়িত্ব ও চেয়ার! বরং কেউ কেউ তো নিজের জান বাঁচাতে নিজেদের স্লোগান থেকে সরে আসছে।

এ সত্যের আহ্বানকে দাবিয়ে রাখতে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে। অথচ তখন সত্যবাদীরা প্রাণ হাতে নিয়েই কাজ করে। প্রাণ বিলিয়ে দিয়েই তাঁরা তাঁদের কাজ, মিশন ও স্লোগানের সত্যতা প্রমাণ করে দেখায়।

তাই আহলে হক্ককে পরীক্ষার এ স্তরে সবরের শক্তিতে বলিয়ান হতে হবে। একে অপরকে এসব পরীক্ষায় অবিচলতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস উঁচু রাখার জোর দিতে হবে। এটিই যে কোনো জাগরণের কান্ডারীদেরকে পরীক্ষার সেই বিক্ষিপ্ত মুহূর্তে জমিয়ে রাখার মূলসূত্র।

হযরত লুকমান হাকীম স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন- يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿لقمان: ১৭﴾
“হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।” (সূরা লুকমান: ১৭)

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় হাবীব (ﷺ) কে কতই না আদুরে ভাষায় সবরের কথা বলেছেন-
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ ... ﴿الأحقاف: ৩৫﴾
"অতএব, আপনি সবর করুন, যেমন উচ্চ সাহসী পয়গম্বরগণ সবর করেছেন।” (আহকাফ: ৩৫)

يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ ﴿১﴾ قُمْ فَأَنذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿৩﴾ وَثِيَابَكَ فَطَهِّরْ ﴿৪﴾ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ ﴿৫﴾ وَلَا تَمنَن تَسْتَكْثِرُ ﴿৬﴾ وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ ﴿৭﴾
“হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। আর অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না। এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সবর করুন।” (সূরা মুদ্দাসসির: ১-৭)

হক্ক ও সত্যের দাওয়াতে অটলতা, অবিচলতা ও হাসিমুখে সব সহ্য করার ক্ষমতাই আহলে হক্ককে সফলতার মুখ দেখায়। জালিমের হিংস্রতা, হত্যা-লুণ্ঠন ও রক্তপ্রবাহের কাজ চলছেই অবিরত। জেল আবাদ হয়ে যায়। রিমান্ড মঞ্জুর হয়ে যায়। কারাগারগুলোতে জালিমের স্লোগান গর্জে ওঠে। কিন্তু আহলে হক্করা, উঁচু সাহসিকতার সাথে সবরের তালকীন দিয়ে একে অপরের হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়ায়। ফাঁসির মঞ্চে যায়। ফাঁসির রশি গলায় নিয়েও তাদের মুখে উচ্চারিত হয় নারায়ে তাকবীর! শরীয়ত নয়তো শাহাদাত। আর এতেই যুদ্ধ থাকে চলমান।

আল-হামদুলিল্লাহ! আজকের দিনেও আল্লাহ তা'আলা এমন সব তরুণ সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা আল্লাহ দ্বীনের জন্য, মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আনীত ধর্মের বাস্তবায়নে পৃথিবীজুড়ে নিজেদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে নবায়ন করছেন। তাঁরা কারাবরণ করেছেন। কারাগারের দৃশ্যই তাঁরা পাল্টে দিয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তি মিললে পুনরায় তাঁরা সেই মিশনে যোগ দেন। দ্রোহের আগুন নিভেনি। মুহাম্মাদ (ﷺ) এর শরীয়তের জন্য কুরবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায়নি। তাঁরা কাঠগড়ায় দাঁড়ালে বিচারক পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। ঢাকঢোল পিটিয়ে ফাঁসি ঘোষণাকারীরাই চুপিচুপি তাঁদেরকে ফাঁসি দিচ্ছে।

আজকের পাকিস্তানে হক্কানী উলামায়ে কেরাম ও শরীয়তের স্লোগানধারী পাগলদের উপর যে অত্যাচার চালানো হয়েছে, তা গুয়েনতানামো বে'র অত্যাচারকেও হার মানিয়েছে।

বিশেষত, ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত এ পাকিস্তানে হক নেওয়াজ জঙ্গভী শহীদ রহ., ডাক্তার হাবীবুল্লাহ মুখতার শহীদ রহ. থেকে নিয়ে গাজী আব্দুর রশীদ শহীদ রহ. এবং মুফতী আব্দুল মাজীদ দীনপুরী শহীদ রহ. পর্যন্ত যত উলামায়ে কেরাম শহীদ হয়েছেন, সবার একটাই অপরাধ—তাঁরা পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করেছেন।

পাকিস্তানের গোপন এজেন্সিগুলোর টর্চার সেলে যে অত্যাচার মুজাহিদদের উপর চালানো হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত গুয়েনতানামো ও বাগরামেও খুঁজে পাওয়া যায় না।

এত জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও এই স্তরে সেসব পাগলদের বিজয়ই দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের কাছে সব ধরনের শক্তি ও অস্ত্র থাকার পরও তাঁদেরকে এ পথের দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 নেতৃত্ব পরীক্ষার অগ্নিচুল্লির মাঝে

📄 নেতৃত্ব পরীক্ষার অগ্নিচুল্লির মাঝে


বাতিল ও ভ্রান্ত আন্দোলনের মতো হক্কপন্থীদের আন্দোলনে এমন হয় না যে, ত্যাগ ও কুরবানির জন্য শুধু কর্মীদেরকেই সামনে বাড়ানো হয় এবং নেতৃবৃন্দ ও তাদের সন্তানেরা বিলাসিতা ও আরাম আয়েশে মত্ত থাকে। এমনকি একসময় এ নেতৃত্ব ও তাদের সন্তানেরা বিলাসিতার এ নোংরামিতে ঢুকে নিজেরাই জুলুমকারীর অংশে পরিণত হয়ে যায়; যে জুলুমের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনের স্লোগান তুলেছিল। বরং আহলে হক্কের আন্দোলনে কর্মীদের পূর্বে নেতাদেরকেই পরীক্ষার অগ্নিচুল্লিতে যাচাই করা হয়। আল্লাহ তা'আলা প্রথমে নবীগণকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন, তারপর তাঁদের অনুসারীদের পালা এসেছে।

হযরত ইবরাহীম আ. কে কত কঠিন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীব (ﷺ) কে সব ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন, তাঁর মেয়েদেরকে, তাঁর পরিবারকে এবং তাঁর জামাতা ও নাতিদেরকে কঠিন পরীক্ষার এ স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে।

সর্ব সম্মতিক্রমে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.কে প্রথম খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছিল। এর কারণ কী ছিল? কে ছিলেন তিনি? তাঁর কী অবদান ছিল? ইসলামের পরিচর্যা ও আল্লাহর রাসূল এর জন্য কুরবান ও উৎসর্জনে তাঁর অবস্থান কী ছিল? সকল আরববাসী এ মহান ব্যক্তিত্ব, তাঁর যোগ্যতা, তাঁর ত্যাগ এবং নেতৃত্বের অধিকারকে খুব ভালভাবে জানত। একইভাবে দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি. কে ছিলেন? ইসলাম এবং মুসলমানরা তাঁর থেকে কী উপকার লাভ করেছে? আল্লাহর রাসূল এর সাথে তিনি কীভাবে সময় কাটিয়েছেন? আরবের মরুভূমি ও পাহাড় এ সাধক বীরপুরুষকে খুব ভালভাবেই চিনত। এভাবে দ্বীনের জন্য হযরত উসমান রাযি. ও হযরত আলী রাযি. এর কুরবানির ব্যাপারে আপন-পর সকলেই অবগত ছিলেন।

এ নিয়মটাই আল্লাহ তা'আলা হক্কপন্থীদের সাথে আজ পর্যন্ত জারি রেখেছেন। আন্তর্জাতিক কুফরী ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জিহাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দই সর্বপ্রথম কুরবানি দিয়েছেন। নিজেদের ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ এবং আরাম-আয়েশ উম্মাহর ভবিষ্যতের জন্য কুরবানি করে দিয়েছেন। এ পথে নিজেদের সন্তানদেরকে চোখে দেখা মৃত্যুর মুখে পতিত করেছেন এবং উম্মাহর জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন।

আমীরুল মু'মিনীন মোল্লা উমর মুজাহিদ রহ. কুরবানির এমন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, যার উপর ইসলামী জাগরণের আন্দোলন আজীবন গর্ব করতে পারবে। হক্কানী উলামায়ে কেরাম কাফেরগোষ্ঠীর সামনে বুক ফুলিয়ে এ মহান ব্যক্তিত্বকে নিজেদের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলতে পারেন, ইনি মু'মিনদের নেতা। আল্লাহ এ মর্দে মুজাহিদকে উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম বদলা দান করুন। তিনি আপন সত্তা ও সন্তান-সন্ততির কুরবানি, ক্ষমতা ও নেতৃত্বের কুরবানি দিয়েছেন। একইভাবে তাঁর সহযোদ্ধাগণও নিজের জান-মাল, সন্তান-সন্ততি এবং নিজ জাতি ও গোষ্ঠীর কুরবানি দিয়েছেন।

মুজাদ্দিদে জিহাদ শাইখ উসামা ইবনে লাদেন রহ. সর্বপ্রথম নিজের জানমাল, ঘরবাড়ির কুরবানি দিয়েছেন। নিজের সন্তানদেরকে এ রাস্তায় উৎসর্গ করেছেন। তাঁর মেয়েগণ বিধবা-জীবন বরণ করে নিয়েছেন। এভাবে শাইখ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফি. নিজের যৌবন কাটিয়েছেন বন্দীশালার কষ্ট এবং হিজরত, দেশান্তর ও যুদ্ধের কষ্টের মাধ্যমে। তাঁর জীবনসঙ্গিনী আল্লাহর রাহে এমনভাবে শহীদ হয়েছেন যে, কবরে মাটি দেওয়াও সম্ভব হয়নি। তাঁর সাথে শাইখের ছেলেও ইসলাম ও উম্মাহর তরে কুরবান হয়ে যান। তারপর তাঁর মেয়েগণ, নাতি-নাতনিগণ বছরের পর বছর বন্দী জীবনের নির্মম কষ্ট-যাতনার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আকাশ দেখারও তাঁদের নসীব হয়নি। তারপর দুই মেয়ের প্রেমময় স্বামীরা আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেছেন।

হিজরত, বিচ্ছেদ, দেশান্তর, জেল-জুলুম এবং শাহাদাত... এ ধরনের মর্যাদা আলহামদুলিল্লাহ, ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক জিহাদী সম্প্রদায়ের নেতাগণ অর্জন করেছেন। এ স্পষ্ট দ্বীনের জন্য, উম্মাহর সম্মান ও ইজ্জতের জন্য তাঁরা নিজেদের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। মনে রাখতে হবে, আহলে হক্কের নেতৃবৃন্দ কৃত্রিম আন্দোলন, দাজ্জালী মিডিয়ার প্রচার-প্রসার ও পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার থেকে নেতৃত্ব লাভ করেন না, তারা তো যুদ্ধের বিকট চিৎকার ও চেঁচামেচির মধ্যে পাখা মেলেন। হিজরত তাঁদেরকে এ পৃথিবীর প্রতি অশ্রদ্ধা শিক্ষা দেয়। আগত দিনগুলোর শাহাদাত তাঁদেরকে নশ্বর দেহের বাস্তবতা উপলব্ধি করায়। বন্দীশালা তাঁদেরকে জীবন যাপনের পদ্ধতি শেখায়। ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত মিসাইল তাঁদের সাহসিকতার জুতোয় ফিতা বেঁধে দেয়। সব সময় মৃত্যুর ছায়া তাঁদের প্রবৃত্তি ও চাহিদা পরিষ্কার করার কাজ দেয়, যা তাঁদেরকে বর্তমান অবস্থাকে কুরবান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে; যাতে তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ (পরকাল) সজ্জিত ও সমৃদ্ধ করতে পারেন।

গণতন্ত্রবাদীদের মতো আহলে হক্কের নেতৃত্বে কোনো আসন নয়; বরং ছাপ্পড় খাট বা কাঁটায় সাজানো বিছানা হয়ে থাকে, যার উপর ঘুমালেও মানুষ আরাম পায় না। এটি চিন্তা ও টেনশনের এমন এক বোঝা, যা পাহাড়ের উপরও যদি তুলে দেওয়া হয়; তাহলে এত কঠিন কষ্ট সইতে না পেরে তাও কালো হয়ে যাবে। তাঁরা নেতৃত্বের দোহাই দিয়ে আলীশান প্রাসাদ বানান না; বরং নিজেদের ঘর-বাড়িকে জীর্ণশীর্ণ করে উম্মাহর দ্বীন, আকীদা, ঈমান ও ঘরবাড়ির হেফাযত করেন। আল্লাহর শাসনব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত এ উজাড় অনাবাদি জমিনকে নিজেদের তপ্ত খুন দ্বারা সিক্ত করেন; যাতে তার উপর শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা করে তাকে আবাদের যোগ্য করে তোলা যায়। তাদের এ আবাদ করার সাথে মিশে আছে তাঁদের হা হুতাশ ও শোক-চিৎকার। এ আবাদির সৌন্দর্য ও আরাম আয়েশ জারি আছে তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জলাঞ্জলি দিয়ে এবং তাঁদের ইচ্ছা ও চাহিদার মৃত্যু ঘটিয়ে।

হক্ক ও বাতিলের এ পার্থক্য খুব ভালভাবে বুঝতে হবে, বর্তমান যুগেও বাতিল দলসমূহের নেতা তৈরি করার প্রক্রিয়া কৃত্রিমতা ও ধোঁকার উপর প্রতিষ্ঠিত। বাতিল শক্তি কাজ হিসেবে কর্মী খোঁজে। তারপর কোনো এক কুশপুত্তলিকাকে নেতা বানিয়ে পৃথিবীর সামনে পেশ করে দেয়। আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী, ইউরোপের দ্বিতীয় নবযৌবন (আসলে খৃষ্টবিশ্বের প্রাথমিক ধ্বংস) থেকে আজ পর্যন্ত বিশেষ করে উসমানী খেলাফতের পতন থেকে এ প্রতারণার মাধ্যমে পৃথিবীর সামনে এমন কর্মীদেরকে নেতা বানিয়ে পেশ করা হয়েছে, যারা অতিমাত্রায় অযোগ্য ও নিষ্কর্মা। কিন্তু প্রচারমাধ্যমের প্রতারণা এবং বর্তমান যুগের ইতিহাস বিকৃতকারীদের ধোঁকাবাজি নর্তকী, ভাঁড়, গায়ক এবং গর্হিত সমকামিতায় জড়িত লোকদেরকেও এই জাহেলী সমাজের হিরো বানিয়ে পেশ করেছে। মূলকথা হলো, যদি স্যান্ট ভ্যালেন্টাইনের মতো অশ্লীল ও নোংরা মানসিকতাধারী লোককে নেতা, আদর্শ ও বীর হিসেবে পেশ করা যেতে পারে; তাহলে অন্যান্য নির্বোধ লোক তো তার থেকেও যোগ্য হবেই।

বাস্তবতা হলো, গণতন্ত্র একটা তামাশা যেখানে রাষ্ট্রের প্রভাবশালী শক্তি (সেনাবাহিনী ও গোপন এজেন্সিসমূহ) এ গণতান্ত্রিক জনগণকেই নেতা বানিয়ে পেশ করে এবং একের পর এককে ব্যবহার করে লাথি মারতে থাকে। সবাই জানে, প্ল্যান কোথায় তৈরি করা হয় এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়াবলি সম্পর্কে পরিকল্পনা কোথায় নেওয়া হয়? বর্তমান যুগের প্রতারণা ও ধোঁকা হলো, এ যুগের ইতিহাস সাজাচ্ছে শয়তান। প্রচারমাধ্যম, আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এ সাজানো ইতিহাস রচনার মৌলিক ভিত্তি। এজন্য তারা যাকে ইচ্ছা নায়ক বানিয়ে দেয়, আর যাকে ইচ্ছা সন্ত্রাসী প্রমাণ করে। যাকে চায় পথপ্রদর্শনকারী আর যাকে চায় লুটেরা সাব্যস্ত করে। এ সবকিছুই হচ্ছে দাজ্জালী যুগের কারসাজি। শুধু দেখতে থাকুন! আর নিজ প্রভুর সত্যতার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখুন! তিনি কীভাবে লোকদের মাঝে বাতিল পন্থাগুলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ ধরনের পন্থা দ্বারা দ্বীনের বিজয় তো দূরের কথা, মাথার পাগড়ি বড় করা ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না।

যাইহোক, হক্ক ও বাতিলের নেতৃবৃন্দের মাঝে এতটা স্পষ্ট পার্থক্য আছে, যেমনটা দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে আছে, স্বার্থত্যাগ ও স্বার্থপরতার মাঝে আছে, আলো আর অন্ধকার, জ্ঞান আর অজ্ঞতার মাঝে আছে।

তাই যে আন্দোলন স্পষ্ট দ্বীন তথা ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গড়ে ওঠে, সেটা তার প্রবর্তকের বাতলানো তরীকা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সে এ পন্থাই অবলম্বন করে; যা আল্লাহর শেষ রাসূল (ﷺ) অবলম্বন করেছিলেন। সে এ দায়িত্বকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত আমানত মনে করে। এটার মাধ্যমে সে আখিরাতের কামিয়াবি এবং জান্নাতের দরজা বুলন্দির প্রার্থী হয়। এজন্য সে এ পথের প্রত্যেক ত্যাগ ও কুরবানিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের মর্যাদা বৃদ্ধির উপায় মনে করে।

وَتَভোাসَوْা بِالْحَقِّ এর পথে আগত সমস্যা সত্ত্বেও একই স্লোগান, একই দৃঢ়তা, একই লড়াই—যার উপর আন্দোলন ও জামাআতের ভিত্তি রাখা হয়েছে এবং তারপর একই মানহায ও ফিকিরের উপর وَتَভোাসَوْা بِالصَّبْرِ এর স্লোগান কখনো ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে, কখনো বন্দীশালা থেকে, কখনো শাস্তির গোপন প্রকোষ্ঠ থেকে আবার কখনো তপ্ত তক্তার উপর দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে দিয়ে যায়।

وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا রাস্তা বদলায়নি, সহযাত্রী বদলায়নি, কাফেলা ত্যাগ করেনি, কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্নও হয়নি। এ স্তরগুলো ইসলামী আন্দোলনগুলোর জীবনে জীবন-মৃত্যু এবং সফলতা-ব্যর্থতার মারহালা বা স্তর হয়। কারণ যদি নেতৃবৃন্দ নিজের মিশনের উপর নিজেদের জান কুরবান করে দেন; তাহলে এটা তাঁদের বিজয় হয় এবং বাতিল শাসনব্যবস্থার মুখে পরাজয়ের চুনকালি পড়ে, যা দূর করা যায় না।

এ পরীক্ষা ও বিপদে পতিত করা তো আল্লাহর সুন্নাত। আল্লাহ চাইলে তো কুফরকে এমনিতেই ধ্বংস করে দিতে পারেন। সূরা মুহাম্মাদে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَانتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ ﴿محمد: ৪﴾
"এটা এজন্য যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৪)

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 কী এই পরীক্ষা?

📄 কী এই পরীক্ষা?


ঈমানদারদের পরীক্ষা হলো, মুখে কালিমা পাঠ করার পর এ কালিমার সত্যতার উপর কতটুকু একীন আছে? এবং এ কালিমার জন্য কে জান-মাল উৎসর্গ করতে পারবে? কালিমার সত্যতা ও তার বিনিময়ে আসন্ন নেয়ামতের প্রতি এমন একীন হয়ে যায়, যেমনটি দুনিয়াবাসী চোখে দেখা দুনিয়ার উপর করে। তখন সে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। এ কালিমা কার অন্তরে কতটুকু জায়গা করে নিয়েছে?—তা দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতি তার একীন দেখে বোঝা যায়। যে ব্যক্তি আখিরাতের উপর এমন বিশ্বাস রাখে; যেন পলক পড়তেই সে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তার অর্থ হলো, তাওহীদের কালিমা তাঁর অন্তরে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়েছে যে, এটা ছাড়া অন্য সবই তাঁর অন্তর থেকে বের হয়ে গেছে।

পক্ষান্তরে কেউ যদি আখিরাতের পরিবর্তে চোখে দেখা পৃথিবীকে প্রাধান্য দেয়, তার নশ্বর জীবন ও মাল-দৌলতকে প্রাধান্য দেয়; তাহলে এটা স্পষ্ট যে, তার অন্তরে তাওহীদ কতটুকু আছে এবং অন্য বিষয় কতটুক জায়গা জুড়ে বসে আছে? আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার এক আয়াতে এ পুরো বিষয়টাকে খুব ভালভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন; যাতে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য কোনোরূপ জটিলতা না থাকে। তিনি ইরশাদ করেছেন-

لَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ ﴿التوبة: ৪৪﴾

"আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতের প্রতি যাদের ঈমান রয়েছে তারা মাল ও জান দ্বারা জেহাদ করা থেকে আপনার কাছে অব্যাহতি কামনা করবে না, আর আল্লাহ সাবধানীদের ভাল জানেন। (সূরা তাওবা: ৪৪)

অর্থাৎ আল্লাহ ও আখিরাতের উপর যার ঈমান আছে, সে জিহাদ থেকে অব্যাহতির অনুমতি চায় না। সে তো আল্লাহর সাথে মোলাকাত এবং কিয়ামতের দিন এ কালিমার জন্য প্রাণ-উৎসর্গকারীদের জন্য বরাদ্দ নেয়ামত পাওয়ার জন্য অস্থির থাকে। অনুমতি তো সেই চাইবে, যার অন্তরে এ কালিমা প্রবেশই করেনি এবং সে আখিরাতের পরিবর্তে এ পৃথিবীকেই আসল মনে করে। আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার প্রতি তাদের একীন ও বিশ্বাস বেশি। কালিমা তো তারা এমনিতেই পড়েছে। কিছু রসম-রেওয়াজ আদায় করবে আর মুসলমানদের তালিকায় প্রবেশ করবে—কালিমা দ্বারা এটাই তাদের উদ্দেশ্য।

ইমামুল মুফাসসিরীন ইমাম ইবনে জারীর তবারী রহ. এ আয়াতের তাফসীরে খুব কঠিন ও শক্ত কথা বলেছেন-

وهذا إعلام من الله نبيه صلى الله عليه وسلم سيما المنافقين أن من علاماتهم التي يُعرفون بما تخلفهم عن الجهاد في سبيل الله، باستئذانهم رسول الله صلى الله عليه وسلم في تركهم الخروج معه إذا استنفروا بالمعاذير الكاذبة

'এটার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল কে মুনাফিকদের আলামতসমূহ জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তাদের ঐ আলামতসমূহ যেগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে চেনা যাবে, তার অন্যতম হলো—তারা মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহ এবং রাসূল থেকে জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে আল্লাহর পথে জিহাদ করা থেকে পিছুটান মারবে।'

إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْবِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ ﴿التوبة: ৪৫﴾

"নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে (জিহাদে যাওয়া থেকে) অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।” (সূরা তাওবা: ৪৫)

এ কথা স্পষ্ট যে, যখন অন্তরেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে এবং যা কিছু হযরত মুহাম্মাদ আনয়ন করেছেন, সে ব্যাপারেই সন্দেহে পড়ে গেছে যে, মুহাম্মাদ এর আনীত শরীয়ত ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে, না ঐ 'শরীয়ত' যাকে আন্তর্জাতিক সুদখোরেরা বৈশ্বিক নেজাম বা ব্যবস্থাপনার নামে জাতিসংঘের মাধ্যমে চাপিয়ে দিয়েছে, তা বাঁচাতে পারবে?

সুতরাং যাদের কালিমা পড়ার ব্যাপারে আল্লাহপাক সাক্ষী দিচ্ছেন যে, তাদের ঈমান আনা ও কালিমা পাঠ করা মিথ্যা। তাদের কেবল মৌখিক কালিমা পাঠ করা তাদেরকে কতটুকু ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে?—তা অনুধাবন করা মুশকিল নয়।

নিজের দ্বীন ও ঈমানকে পরাজিত দেখেও বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিতাল না করা, কুফরের গোলামির জিন্দেগি গ্রহণ করে প্রাণ বাঁচিয়ে ফেরাকে কোন জাতির অভিধানে 'বিজয়' বলা হয়েছে? নিজের ঘরবাড়ি বাঁচাতে মুসলমানদের ঘরবাড়ি পুড়তে ও উজাড় হতে দেখে, জীর্ণশীর্ণ হয়ে যেতে দেখে তামাশার নিরব দর্শক হয়ে বসে থাকা কোথাকার ভদ্রতা? যখন একদিকে আল্লাহর দল ও অপরদিকে শয়তানের দল মুখোমুখি অবস্থানে, যখন উভয় দলই নিজ নিজ আকীদা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে নিজের সর্বস্ব বিলীন করতে প্রস্তুত। মুমিনগণ ইসলামের জন্য আর কাফেররা কুফরী নেজাম বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ করছে। এ যুদ্ধে নিজেকে যুদ্ধের কাতার থেকে আলাদা করে যদি এটা মনে করা হয় যে, আমি তো নিরেপক্ষ, তখন প্রশ্ন হলো—আপনি কোন দল থেকে নিরপেক্ষ হয়েছেন? ইসলাম থেকে?—যার জন্য প্রাণ দেওয়া আপনার উপর ফরয ছিল। রাহমাতুল্লিল আলামীন এর আনীত কুরআন থেকে?—যার জন্য ঘর-বাড়ি, মাল-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি সবকিছু কুরবান করে দেওয়ার আদেশ আছে। আপনি তো ইসলাম থেকে শুধু এ কারণে নিরপেক্ষ অবস্থানে গেছেন; যেন কুফরী ব্যবস্থার ধারকবাহক শক্তি আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে পড়ে।

আল্লাহর পরিপূর্ণ দ্বীনের দাওয়াত উলামায়ে কেরামের জিম্মাদারি; যদিও গোটা বিশ্ব তাঁদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যাক না কেন। বর্তমান সময়ে দ্বীনের দায়ীগণের বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মনে রাখতে হবে, إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ তথা সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, এর স্লোগান তোলার পর এ সূরার দ্বিতীয় অংশ : وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ (একে অপরকে হক্ক ও ধৈর্যের উপদেশ দান)—কেও মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। তা না হলে ইসলামী আন্দোলনের দুর্বল ভিত্তি, অন্তঃসারশূন্য স্লোগান বা দুর্বল ভূমিকার কারণে মানুষ ইসলামী জাগরণ সম্বন্ধেও ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হবে।

একবার যখন 'আমাদের প্রভু আল্লাহ' এ ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, তখন আবশ্যক হলো: এটার উপরই অটল ও অবিচল থাকতে হবে। এটার উপরই জীবনযাপন করতে হবে, এর উপরই মরতে হবে। গাইরুল্লাহ'র প্রত্যেক নেজাম থেকে বিদ্রোহের ঘোষণা দিতে হবে। কেবল মুহাম্মাদ এর আনীত নেজাম প্রতিষ্ঠার জন্যই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্যই শত্রুতা, দুশমনি, অন্ধকার কুঠরি, ফাঁসির কাষ্ঠ এবং দেশান্তর—এগুলো ক্ষতি নয়, এগুলোই হলো চূড়ান্ত সফলতা। কেননা, এসব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই, তাঁর দ্বীনের বিজয়ের জন্যই বরণ করা হয়।

তাই দ্বীনের দায়ীগণ এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালিমাকেই বুলন্দ করার মহান ব্রত নিয়ে জাগ্রত হওয়া লোকদের জন্য আবশ্যক হলো, এ সূরার শেষ আয়াতকে নিজের মানহায ও কর্মপদ্ধতি হিসেবে বেছে নেওয়া; যাতে কাফেলা সফলতার পথে চলমান থাকে।

মুসলিম উম্মাহর চিন্তাশীল শ্রেণীকেও এটা বুঝতে হবে যে, নিজেদের দাওয়াত এবং মানহায ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিজয়ী করার জন্য ক্ষমতাশীল শক্তির সামনে বিদ্রোহের ঘোষণা দেওয়া আম্বিয়ায়ে কেরাম আ.-এর সুন্নাত। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত দ্বীনের পরিপূর্ণ দাওয়াত—কাফেরদের যতই খারাপ লাগুক, সর্বাবস্থায় তা চালু আছে। এর জন্য যখন নিজের জান, ঘরবাড়ি এবং দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, তখন নিঃসঙ্কোচে সেটাই করা হয়েছে। এমনকি দলের পর দল এ দাওয়াত ও মানহাযের জন্য শহীদ হয়ে গেছেন। লড়াইয়ের ময়দানে দলের পর দল শহীদ হয়ে যাওয়া ও ক্ষমতাশীল শক্তির অন্ধকার কালো প্রকোষ্ঠ থেকে তাঁদের জানাযা বের হওয়াকে পুরুষোচিত ইতিহাস পরাজয় বলে না। এতে তো তাঁদের মানহায ও মতবাদের বিজয়ই হয়। পরাজয় হলো, দলের নেতৃবৃন্দ নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য কর্মীদের কুরবানির সাথে গাদ্দারি করে নিজেদের মানহায ও মতবাদ থেকে দূরে সরে আসা। তারা দুনিয়ার ক্ষণিকের জীবন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আখিরাতের স্থায়ী ও অবিনশ্বর জীবন থেকে গাফেল হয়ে যায়। বিপ্লবের ইতিহাসে শোচনীয় পরাজয় এটাকেই বলা হয় যে, নেতৃবৃন্দ নিজেদের মৌলিক মতবাদ ও চিন্তাধারা থেকে ভীত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে সাহস হারিয়ে ফেলে বা অন্য কোনো কারণে সরে পড়ে।

হক্কের কাফেলা নিজেদের স্লোগান ও মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন, এটা এমনই এক বিজয়; যার মাধ্যমে ইতিহাসের পাতা সব সময় জ্বলজ্বল করতে থাকে। যাঁরা হক্কের পথে নানা রকম কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করেছেন, কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন এবং প্রাকৃতিক ক্ষতি বরদাশত করেও এ পথে অবিচল থেকেছেন, কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা এ পাগলদের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-

وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ ﴿آل عمران: ১৪৬﴾

“আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে জেহাদ করেছে; আল্লাহর পথে—তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর রাহে তারা হেরেও যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৪৬)

ইমাম ইবনে জারীর তবারী রহ. বলেন, আহলে হেজায ও বসরার কেরাতের (তিলাওয়াতরীতি) মধ্যে এ আয়াতে قُتل এর জায়গায় قَاتَلَ পড়া হয়েছে। অর্থাৎ কত নবী ছিলেন, যাঁদের সাথে উলামা ও ফকীহগণ শহীদ হয়ে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের পরবর্তীরা তাঁদের পর কিতাল করা থেকে সাহস হারায়নি এবং দুর্বলতাও প্রকাশ করেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00