📄 হক্কানী উলামায়ে কেরাম ও وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস যেগুলো হক্ক বলা এবং হক্ককে লুকানোর ব্যাপারে এসেছে, এগুলোই উলামায়ে হক্কানীর ঘুম হারাম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেহেতু অডিও-ভিডিও ভাষণের জয়জয়কার চলছে এবং দ্বীনের নামে বিচিত্র রকমের কথা বলে হক্ককে বাতিল, কুফরকে ইসলাম আর ইসলামকে ইসলামের বাহিরের প্রমাণ করার অপপ্রয়াস চলছে।
প্রভাবশালীগোষ্ঠী তাদের পদলেহী সরকারি মোল্লাদের মাধ্যমে তাদের প্রবৃত্তি ও ইচ্ছাকে ইসলাম প্রমাণ করার চেষ্টায় লিপ্ত। এহেন পরিস্থিতিতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের উপর ফরয হলো—তারা দ্বীনকে তার মূল অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। শরয়ী পরিভাষা, তার সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যাকে হেফাযত করবেন। কুফর ও ইসলামের সীমারেখা রক্ষা করবেন। তার জন্য যদিও আসলাফ ও আকাবিরদের পদ্ধতি তথা শাসকগোষ্ঠীর আক্রোশ, জেল-জুলুম, দেশান্তর এবং ফাঁসি বরণ করে নিতে হয়। এটাই তো সত্যিকারের উলামাদের উত্তরাধিকার। উত্তরসূরিরা তো ওরাই হয়—যারা উত্তরাধিকার অর্জন করে নেয়।
কুফরী নেযাম ও ব্যবস্থাপনার প্রতি আপনি দৃষ্টি মেললে দেখবেন, তারা কতটা পাবন্দি ও ধারাবাহিকতার সাথে কুফরী ও পাপাচারের প্রচার-প্রসার করে যাচ্ছে। মিডিয়ার মাধ্যমে দিনরাত মেহনত করে যাচ্ছে তারা। তাদের মেহনতের উদ্দেশ্য একটাই—অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে কুফর ও ইসলামকে গোঁজামিল করে দেওয়া; যাতে সাধারণ মুসলমান তো বটেই, বিশেষ মুসলমানরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। এসব দেখতে দেখতে সমাজে এমন সব পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে, কয়েক বছর পূর্বে যার কল্পনাও করা যেত না। এমনকি দ্বীনদার শ্রেণীরাও এমন এমন পাপাচারে জড়িয়ে পড়ে, যার কল্পনা করাও ধার্মিক পরিবারে পাপ মনে করা হতো। সবচেয়ে দুঃখের কথা হলো, এ পাপগুলোকে পাপ মনে করার অনুভূতিটুকুই বের হয়ে যাচ্ছে মানুষের অন্তর থেকে।
এভাবে কোনো ভাল কাজ থেকে বাধা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হলে তার প্রভাবও সমাজের উপর পড়ে। ফলে সমাজ এ ভাল কাজকে ভাল মনে করা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকতে শুরু করে। তারপর এমন একটা সময় আসে, যখন ঐ কাজটা করতে সমাজের সামনে লজ্জা অনুভব করতে শুরু করে। বর্তমান নতুন সমাজব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি মেললে স্পষ্টভাবে বুঝে আসে যে, মানুষ কিন্তু জন্মগতভাবে খুব একটা খারাপ নয়, কিন্তু সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে সে মন্দ হতে বাধ্য হয়ে যায়। অথবা সে খারাপ তো হয় না, কিন্তু নিজেকে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য খারাপ সাজার চেষ্টা করে।
বুঝা গেল وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ এর আমল সমাজের পরিবর্তন সাধন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যদি দ্বীনের দায়ীগণ সমাজকে সংশোধন করতে চান; তাহলে তাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ এর আমলকে খুব জোরালোভাবে চালু করতে হবে। বরং তার উপরের স্তরের দাওয়াত তথা বলপূর্বক দাওয়াতের সাথে মিলিয়ে দাওয়াতকে জোরালো ও মজবুত করার দিকে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে হবে। যে যতটুকু শক্তি ব্যয় করে এ আমল করার সামর্থ্য রাখে, তাকে ততটুকুই করা চাই। আল্লাহর হুকুম পালনে নির্দেশ দিতে কাউকে ভয় করা উচিত নয়। আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিষেধ করতে কাউকে পরোয়া করা যাবে না। এ আমল ব্যক্তিগতভাবেও করতে হবে। পারিবারিক, গ্রামভিত্তিক, গোত্রভিত্তিক এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয়ভাবেও করা চাই। এতে যে যতটুকু অংশ নেবে, সে ততটুকুই ক্ষতি ও অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারবে এবং ততটুকুই ফায়দা অর্জন করতে পারবে। কারণ প্রবহমান সময়ের স্রোতে হয়তো ক্ষতির বোঝা ভারী করে চলছে, নয়তো লাভের স্টক সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে।
📄 وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
ইমাম ওয়াহিদী রহ. বলেন-
وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ على طاعة الله والجهاد في سبيله 'তারা আল্লাহর আনুগত্য এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র উপর অবিচল থাকার জোর দেয়।'
ইমাম রাযী রহ. বলেন-
والتواصي بالصبر يدخل فيه حمل النفس على مشقة التكليف في القيام بما يجب، وفي اجتنابهم ما يحرم إذ الإقدام على المكروه، والإحجام عن المراد كلاهما شاق شديد
'আবশ্যক বিষয়াবলি আদায় করার মধ্যে যা কষ্টকর, তা সহ্য করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাও وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ এর অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে হারাম বিষয়াবলি থেকে বেঁচে থাকাও। কারণ, যে কাজ করতে মন চায় না, তা করা এবং যা মন চায়, তা বর্জন করা—উভয়টাই কঠিন ব্যাপার।'
ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ এর গর্জনের মাধ্যমে সমাজে এক আওয়াজ তোলা কোনো নতুন কথা নয়। সত্যের স্লোগানে স্লোগানে হৃদয়গুলোকে উষ্ণ করে, যুবসমাজের বুকে চেতনার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়াও কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। সেই জাগরণে শামিল একটি বড় অংশকে সংঘবদ্ধ করাও সাধারণ ব্যাপার মাত্র! وَتَوَاصَوْা بِالصَّبْرِ এর আহ্বানে অলি-গলি, হাট-বাজার ও সাধারণ-বিশেষের সব মিলনমেলাই মুখরিত হয়।
এসব কিছু হয় প্রাথমিক স্তরে; তবে পরীক্ষার স্তর এরপরেই শুরু হয়, যখন বিরোধী জীবনব্যবস্থা গতিশীল হয়। স্বীয় রাজত্ব-কর্তৃত্ব, সর্দারি-নেতৃত্ব, স্বীয় মতবাদ ও বিশ্বাস এবং স্বীয় হস্তে খোদিত প্রবৃত্তির বানানো প্রভুদের রক্ষা করতে বিরোধী শিবির তখন শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে।
ক্ষমতার নেশায় বুঁদ ও শক্তির হটকারিতায় ডুবে থাকা অভিজাতশ্রেণীর কাছে যখন দলিল ফুরিয়ে যায়, তখন তাদের বারান্দা থেকে এ আওয়াজ আসতে শুরু করে—
﴿قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهِتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ﴾ ﴿الأنبياء: ৬৮﴾
"তারা বললঃ একে (ইবরাহীম আ.) পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও।” (সূরা আম্বিয়া: ৬৮)
﴿فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَن قَالُوا أَخْرِجُوا آلَ لُوطٍ مِّن قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ﴾ ﴿النمل: ৫৬﴾
"উত্তরে তাঁর কওম শুধু এ কথাটিই বললো, লুত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়।” (সূরা নামল: ৫৬)
এবার শুরু হয় আসল পরীক্ষা। খড়কুটো বেছে নেওয়ার পালা। পার্থক্য হয়ে যায় সত্য-মিথ্যা। দ্বীনের পথে বিপদ ও পরীক্ষাসমূহের ব্যাপারে এ ধারণা রাখা ঠিক নয় যে, প্রত্যেক যুগে এটি রুখসত-আজিমত তথা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবেই ছিল—যে তা পালন করবে, বড় সওয়াবের মালিক হবে। আর যে তা করবে না, তার ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং কখনো-কখনো এ বিপদ ও পরীক্ষাসমূহ দ্বীনের আবশ্যিক বিষয়ও হতে পারে। এটি যুগ-যুগান্তরে চলে আসা আল্লাহর এক অমোঘ বিধান।
﴿الم﴾ ﴿العنكبوت: ১﴾ ﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ﴾ ﴿العنكبوت: ২﴾
"আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আনকাবুত: ১-২)
﴿وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾ ﴿العنكبوت: ৩﴾
"আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।” (সূরা আনকাবুত: ৩)
﴿وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ﴾ ﴿العنكبوت: ১১﴾
"আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন যারা মুনাফেক।” (সূরা আনকাবুত: ১১)
﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ﴾ ﴿آل عمران: ১৪২﴾
"তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্য্যশীল।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৪২)
﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ﴾ ﴿البقرة: ২১৪﴾
"তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনি ভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবী ও তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে পর্যন্ত একথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্যে! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহর সাহায্যে একান্তই নিকটবর্তী।” (সূরা বাকারাহ: ২১৪)
সুতরাং সত্যের আহ্বায়কদের জন্য এটি আল্লাহর এক অমোঘ বিধান। তাঁদেরকেই পরীক্ষার ফাঁদে পা ফেলতে হয়। শত্রুর জেলখানা ও ফাঁসির মঞ্চ তাঁদের প্রাথমিক দীক্ষালয়। বিপদাপদের ঘূর্ণিঝড় তাদের অভিজ্ঞতার বিস্তীর্ণ মাঠ। সেসব বিপদাপদে দুঃখের সান্তনা হিসেবে নেমে আসে নতুন বিপদাপদ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
﴿فَأَثَابَكُمْ غَمَّا بِغَمٍّ ... ﴾ ﴿آل عمران: ১৫৩﴾
"অতঃপর তোমাদের উপর এলো শোকের ওপরে শোক” (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৩)
যাতে এক দুঃখের সান্তনাস্বরূপ আরেক নতুন দুঃখ পেয়ে বসে। এ পথটিই এমন। যেখানে জখমের চিকিৎসা নতুন এক জখমের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যাতে জখম সইতে সইতে অন্তর অবিচল হয়ে যায়।
﴿فَأَثَابَكُمْ غَمَّا بِغَمٍّ لِكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾ ﴿آل عمران: ১৫৩﴾
"অতঃপর তোমাদের উপর এলো শোকের ওপরে শোক, যাতে তোমরা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুর জন্য দুঃখ না কর এবং যার সম্মুখীণ হচ্ছ সেজন্য বিমর্ষ না হও। আর আল্লাহ তোমাদের কাজের ব্যাপারে অবহিত রয়েছেন।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৩)
কারণ, পরীক্ষার নিয়মে এটিই চলমান। এভাবেই চলতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ﴾ ﴿محمد: ৩১﴾
"আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যে পর্যন্ত না ফুটিয়ে তুলি তোমাদের জেহাদকারীদেরকে এবং সবরকারীদেরকে এবং যতক্ষণ না আমি তোমাদের অবস্থান সমূহ যাচাই করি।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৩১)
এ আয়াত প্রত্যেক মুসলমান এবং বিশেষত প্রত্যেক মুজাহিদের জন্য শিউরে ওঠার মতো। সর্বজ্ঞানী পরওয়ারদেগার গুরুত্বসহ ঘোষণা করছেন, মুজাহিদ ও গাইরে মুজাহিদ পার্থক্য করার জন্য এবং আল্লাহর পথে অবিচল মুজাহিদ ও তা থেকে পলায়নকারীকে প্রকাশ করে দেওয়ার জন্য আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষায় নিপতিত করব। তোমাদের উপর এমন অবস্থার সৃষ্টি করব, যাতে স্পষ্ট হয়ে যায়, তাওহীদকে স্বীকার করে নেওয়ার পর কে তা পুরোপুরি আদায় করতে পারে? জিহাদে আসার পর কে তাতে অবিচল থাকতে পারে? এমনকি নিজের প্রাণও সেই কালিমার জন্য কুরবান করে দিয়ে সফলদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
📄 উম্মাহর অবস্থা ভালো করার সূক্ষ্ম এক রহস্য
এ আয়াত থেকে জানতে পারি যে, কিতালের মহান কাজ চালু রাখাই এ উম্মাহকে সব ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচানোর মাধ্যম। কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও মুসলমানদের সামাজিক অবস্থা শুদ্ধ করার মাধ্যম। যখনই এ উম্মাহ কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ'র আমলকে ছেড়ে বসবে, তখনই তাদের অধঃপতন শুরু হবে। তারা যুদ্ধে হেরে বসবে। নেতৃত্ব তাদের হাত থেকে বেরিয়ে শরীয়াহ'র দুশমন (কাফের, মুরতাদ ও মুনাফিক) এর হাতে চলে যাবে।
তাইতো মনে হচ্ছে, বাতিলশক্তিও এ রহস্য ভালোভাবেই জানে। তাই তারা সর্বপ্রথম শর্ত দেয় যে, আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা যাবে না। যুদ্ধ বন্ধ করে অস্ত্রসমর্পণ করতে হবে। তারা জানে, তারপর মুসলমানদেরকে ষড়যন্ত্রের জালে ফাঁসানো একদম সহজ।
📄 একটি প্রশ্ন
যেমনটি আপনি বলছিলেন যে, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কিতালকারীদের সম্পর্কে অঙ্গীকার করছেন যে, তিনি তাঁদের পথপ্রদর্শন করবেন এবং তাঁদের অবস্থা ভালো করে দেবেন, তো অনেক মুজাহিদ বা বিভিন্ন জিহাদী দল সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয় কেন?
এ প্রশ্নের জবাব স্বয়ং আয়াতেই বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা মুজাহিদদের দিক-নির্দেশনা ও তাঁদের অবস্থা ভালো করে দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন, তাতে একটি শর্ত আছে। তা হলো, وَالَّذِينَ قَاتَلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থাৎ, যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ হিসেবে তাই গ্রহণযোগ্য হবে, যা আল্লাহর রাসূল বর্ণনা করেছেন।
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا الْقِتَالُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّ أَحَدَنَا يُقَاتِلُ غَضَبًا وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً فَرَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ قَالَ وَمَا رَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ قَائِمًا فَقَالَ مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
হযরত আবূ মূসা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূল এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর পথে যুদ্ধ কোনটি? কেননা, আমাদের কেউ কেউ লড়াই করে ক্রোধের বশীভূত হয়ে, আবার কেউ লড়াই করে প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য। তখন রাসূল তাঁর দিকে মাথা তুলে তাকালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর মাথা তোলার কারণ হলো, লোকটি দাঁড়ানো ছিল। অতঃপর তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করে সেই আল্লাহর রাস্তায়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১২৫, ই.ফা)
সুতরাং যদি কোনো মুজাহিদ ব্যক্তিগত মতামত বা কোনো জিহাদী জামা'আতের সংঘবদ্ধ মতামতের কারণে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথবা আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে লিপ্ত হয় এবং তাদের অধঃপতন হতে থাকে, তখন বুঝতে হবে, وَالَّذِينَ قَاتَلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ কিতাল ফী সাবীলিল্লাহর কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ হচ্ছে। জিহাদের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে গেছে। দ্বীনের বিজয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে পার্থিব উপকারিতা ও সাম্প্রদায়িকতাই সেই জায়গা দখলে নেয়। এটি সংঘবদ্ধভাবে শরীয়াহর অনুসরণে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথবা কোনো মুজাহিদ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কারণ, মুজাহিদের কাজ জিহাদে অবিচলতা ও দুর্বলতার কারণ হয়।
হযরত আবু দারদা রাযি. বলেন- وَقَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ إِنَّمَا تُقَاتِلُونَ بِأَعْمَالِكُمْ
“ আমল অনুসারে তোমরা জিহাদ করে থাকো।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৭৫৪, ই.ফা)
قوله: (إنما يقاتلون بأعمالكم أي إن الأعمال الصالحة تورث ثبات القدم عند القتال. فالقتাল يكون بسبب بركة الأعمال. فهي دخيلة فيه.
অর্থাৎ, সৎকাজ যুদ্ধাবস্থায় দৃঢ়তা দান করে। সুতরাং সৎকাজের কল্যাণেই যুদ্ধ হয়। তাই যুদ্ধে সৎকাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আল্লাহর তা'আলার তাওফীকের স্বল্পতা ও মুজাহিদদের অবস্থার অধঃপতন যতই হবে, ততই বুঝতে হবে যে, এ পরিমাণ যুদ্ধের কাজে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোথাও শরীয়াহবিরোধী বা আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ হচ্ছে। অথবা সেটিকে এভাবে বলতে পারেন যে, কিতালের মহান কাজকে যত ইখলাসের সাথে এবং নবীজীর সুন্নাহ মতে করা যাবে, আল্লাহর তাওফীক, মুজাহিদীন ও জিহাদী দলের অবস্থা ততই ভালো থাকবে। তেমনি মুজাহিদ এর সম্পর্ক আপন পালনকর্তার সাথে যত সুদৃঢ় হবে, তাঁর তাওফীক ও পথ-নির্দেশনাও ততই তাদের সাথে থাকবে। এমন কি আকণ্ঠ নিমজ্জিত ফেতনাকালেও তাদের অন্তর সত্যপথে অটুট থাকবে। এটি মুজাহিদদের জন্য রিজার্ভ।
সুতরাং وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ এর উপর আমলের পর অশুভ শক্তিগুলো কলকাঠি নাড়া শুরু করে। কারণ হক্ক-বাতিল ও ভালো-মন্দের এ যুদ্ধে বাতিল সর্বদা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে যে, তারা হক্কপন্থীদের দাবিয়ে রাখবে, তাঁদেরকে দ্বীনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবে এবং তাঁদের দাওয়াতী কার্যক্রমকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য তারা সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন করাকেও বৈধ মনে করছে। তাতে না তারা কোনো শিষ্টাচার অবশিষ্ট রেখেছে, আর না কোনো সম্পর্ক বা আত্মীয়তার ধার ধারে। যেমনটি পাকিস্তান আর্মি শরীয়াহ আইন চালুর দাবিকারীদের প্রতি করেছে।
কারণ, এটি এমন এক যুদ্ধ; যাতে হক্কের কাছে শুধু দ্বীন ও আকীদা এবং বাতিলের কাছে প্রবৃত্তি ও ক্ষমতাই অভিষ্ট লক্ষ্য হয়। সত্যবাদীরা হক্কের জন্য এবং প্রবৃত্তিপূজারিরা স্বীয় প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে আছে। সত্যবাদীদের উপর জালিমের এ জুলুম-নির্যাতনের উদ্দেশ্য শুধু এই নয় যে, সত্যের পথে আহ্বানকারীদের অস্তিত্ব মুছে যাক; বরং ধূর্ত শত্রুদের প্রথম প্রয়াস হলো, দাওয়াতের উদীয়মান দলটিকে তাদের দাওয়াত ও নীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া। তারা জানে, সবাইকে হত্যা করার চেয়ে অধিক কল্যাণকর হলো, তাঁদের নীতি ও পদ্ধতিতে বিকৃতি সাধন করা।
তাঁরা যে স্লোগান নিয়ে বেরিয়েছে, যে কোনো উপায়ে তাঁদেরকে তা থেকে হটিয়ে দেওয়া। কারণ, সবাইকে হত্যা করলে সেই নীতি ও পদ্ধতি নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং আগের চেয়ে আরও বেশি প্রসারতা লাভ করে। পক্ষান্তরে তাঁদেরকে নীতি ও পদ্ধতি থেকে সরিয়ে দিলে পরবর্তী প্রজন্ম বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের চিন্তা-চেতনার অপমৃত্যু ঘটে। সুতরাং এমন দল যতই ছড়িয়ে পড়ুক না কেন, শত্রুদের জন্য কোনো আশঙ্কা থাকে না। বরং তার অস্তিত্বই উপকারী হয়ে ওঠে। সেই দলের করুণ অবস্থা দেখে কেউ ওঠে দাঁড়ানোর সাহস পায় না। তাছাড়া জাগরণের কর্মী-সমর্থকরাও আগামী দিনে এমন ভুলে জড়াবে না। কারণ, এত কুরবানির ফলাফল কী এল? কিছু সরকারি পদ, দায়িত্ব ও চেয়ার! বরং কেউ কেউ তো নিজের জান বাঁচাতে নিজেদের স্লোগান থেকে সরে আসছে।
এ সত্যের আহ্বানকে দাবিয়ে রাখতে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে। অথচ তখন সত্যবাদীরা প্রাণ হাতে নিয়েই কাজ করে। প্রাণ বিলিয়ে দিয়েই তাঁরা তাঁদের কাজ, মিশন ও স্লোগানের সত্যতা প্রমাণ করে দেখায়।
তাই আহলে হক্ককে পরীক্ষার এ স্তরে সবরের শক্তিতে বলিয়ান হতে হবে। একে অপরকে এসব পরীক্ষায় অবিচলতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস উঁচু রাখার জোর দিতে হবে। এটিই যে কোনো জাগরণের কান্ডারীদেরকে পরীক্ষার সেই বিক্ষিপ্ত মুহূর্তে জমিয়ে রাখার মূলসূত্র।
হযরত লুকমান হাকীম স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন- يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿لقمان: ১৭﴾
“হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।” (সূরা লুকমান: ১৭)
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় হাবীব (ﷺ) কে কতই না আদুরে ভাষায় সবরের কথা বলেছেন-
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ ... ﴿الأحقاف: ৩৫﴾
"অতএব, আপনি সবর করুন, যেমন উচ্চ সাহসী পয়গম্বরগণ সবর করেছেন।” (আহকাফ: ৩৫)
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ ﴿১﴾ قُمْ فَأَنذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿৩﴾ وَثِيَابَكَ فَطَهِّরْ ﴿৪﴾ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ ﴿৫﴾ وَلَا تَمنَن تَسْتَكْثِرُ ﴿৬﴾ وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ ﴿৭﴾
“হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। আর অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না। এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সবর করুন।” (সূরা মুদ্দাসসির: ১-৭)
হক্ক ও সত্যের দাওয়াতে অটলতা, অবিচলতা ও হাসিমুখে সব সহ্য করার ক্ষমতাই আহলে হক্ককে সফলতার মুখ দেখায়। জালিমের হিংস্রতা, হত্যা-লুণ্ঠন ও রক্তপ্রবাহের কাজ চলছেই অবিরত। জেল আবাদ হয়ে যায়। রিমান্ড মঞ্জুর হয়ে যায়। কারাগারগুলোতে জালিমের স্লোগান গর্জে ওঠে। কিন্তু আহলে হক্করা, উঁচু সাহসিকতার সাথে সবরের তালকীন দিয়ে একে অপরের হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়ায়। ফাঁসির মঞ্চে যায়। ফাঁসির রশি গলায় নিয়েও তাদের মুখে উচ্চারিত হয় নারায়ে তাকবীর! শরীয়ত নয়তো শাহাদাত। আর এতেই যুদ্ধ থাকে চলমান।
আল-হামদুলিল্লাহ! আজকের দিনেও আল্লাহ তা'আলা এমন সব তরুণ সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা আল্লাহ দ্বীনের জন্য, মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আনীত ধর্মের বাস্তবায়নে পৃথিবীজুড়ে নিজেদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে নবায়ন করছেন। তাঁরা কারাবরণ করেছেন। কারাগারের দৃশ্যই তাঁরা পাল্টে দিয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তি মিললে পুনরায় তাঁরা সেই মিশনে যোগ দেন। দ্রোহের আগুন নিভেনি। মুহাম্মাদ (ﷺ) এর শরীয়তের জন্য কুরবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায়নি। তাঁরা কাঠগড়ায় দাঁড়ালে বিচারক পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। ঢাকঢোল পিটিয়ে ফাঁসি ঘোষণাকারীরাই চুপিচুপি তাঁদেরকে ফাঁসি দিচ্ছে।
আজকের পাকিস্তানে হক্কানী উলামায়ে কেরাম ও শরীয়তের স্লোগানধারী পাগলদের উপর যে অত্যাচার চালানো হয়েছে, তা গুয়েনতানামো বে'র অত্যাচারকেও হার মানিয়েছে।
বিশেষত, ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত এ পাকিস্তানে হক নেওয়াজ জঙ্গভী শহীদ রহ., ডাক্তার হাবীবুল্লাহ মুখতার শহীদ রহ. থেকে নিয়ে গাজী আব্দুর রশীদ শহীদ রহ. এবং মুফতী আব্দুল মাজীদ দীনপুরী শহীদ রহ. পর্যন্ত যত উলামায়ে কেরাম শহীদ হয়েছেন, সবার একটাই অপরাধ—তাঁরা পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করেছেন।
পাকিস্তানের গোপন এজেন্সিগুলোর টর্চার সেলে যে অত্যাচার মুজাহিদদের উপর চালানো হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত গুয়েনতানামো ও বাগরামেও খুঁজে পাওয়া যায় না।
এত জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও এই স্তরে সেসব পাগলদের বিজয়ই দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের কাছে সব ধরনের শক্তি ও অস্ত্র থাকার পরও তাঁদেরকে এ পথের দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি।