📄 সন্ধির প্রস্তাবনা
হক্ক-বাতিলের মাঝে চলমান এ লড়াইয়ে বাতিলের পক্ষ থেকে শক্তিপ্রয়োগ করে হক্কের আহ্বানকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। তাঁদের উপর সব ধরনের নির্যাতন বৈধ করা হয়। জুলুম-নির্যাতন ও হুমকি-ধমকিতে ব্যর্থ হয়ে বাতিলের পক্ষ থেকে আলোচনা, সহাবস্থান, বোঝাপড়া, শান্তিচুক্তি, ঐক্য ইত্যাদি মুখরোচক স্লোগানের মাধ্যমে হক্ক-বাতিলকে ওলটপালট করার চেষ্টা করা হয়।
রাহমাতুল্লিল আলামীনের বিরুদ্ধে জাযিরাতুল আরবের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি কুরাইশের সর্দারশ্রেণী যখন দেখল যে, ইসলামকে জোর করে দাবিয়ে রাখার প্রয়াস বারবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে, তখন তারাও শান্তিচুক্তি, আলোচনা ও সহাবস্থানের নামে অসাম্প্রদায়িকতার ঢোল পেটাতে শুরু করল। তাদের পক্ষ থেকে রাহমাতুল্লিল আলামীন (ﷺ) এর কাছে বিভিন্ন প্রস্তাবনা পেশ করতে শুরু করল।
ইমাম বাগাভী রহ. বলেন, একদিন মক্কা মুকাররমার পাঁচজন লোক আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইয়া মাখযুমী, ওয়ালীদ ইবনে মুগيرة, মিকরায ইবনে হাফস, আমর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবী কাইস আল-আমেরী ও আস ইবনে ওয়ায়েল নবী কারীম (ﷺ) এর কাছে এল। তারা বলল, আপনি যদি চান যে, আমরা আপনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি; তবে আপনি এই কুরআন বাদ দিয়ে আরেকটি কুরআন নিয়ে আসুন!
আল্লাহ তা'আলা তাদের এ প্রস্তাবনাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন-
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا انْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِلْهُ ... ﴿يونس: ১৫﴾
"আর যখন তাদের কাছে আমার প্রকৃষ্ট আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন সে সমস্ত লোক বলে, যাদের আশা নেই আমার সাক্ষাতের, নিয়ে এসো কোন কোরআন এটি ছাড়া, অথবা একে পরিবর্তিত করে দাও।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
সুতরাং আমাদের ও আপনার মাঝে সন্ধির একটি মাত্র পথ আছে। ঘৃণাভরা, শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তা বিনষ্টকারী বিষয়গুলো বন্ধ করা হোক। এর জন্য আবশ্যক হলো, এ কুরআন বাদ দিয়ে অন্য কোনো কুরআন নিয়ে আসুন! যেখানে লাত, মানাত ও উজ্জার উপাসনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই। অথবা এ কুরআনে পরিবর্তন করুন। সেখান থেকে এমন সব কথা বের করে দিন; যাতে আমাদের জীবনব্যবস্থা ও মূর্তি সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা হয়েছে। আমাদের কাছে আমাদের পার্লামেন্টে (দারুন নাদওয়া) অনুমোদিত আইন-কানুন ও জীবনব্যবস্থাকে ত্যাগ করার দাবি জানানো হয়েছে। আমাদের জীবনব্যবস্থায় যেসব বিষয়কে হারাম বলা হয়েছে, তা হালাল করে দেওয়া হোক। আমরা যাদেরকে উপাস্য বানিয়েছি, যাদেরকে আমরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছি; এ কুরআন তা হারাম বলছে, তাকে বাতিল ও তাগুত বলছে। সুতরাং তাতে সংস্কার করা হোক। যা হালাল বলা হয়েছে তা হারাম করা হোক।
কিন্তু আসল উপাস্য আল্লাহ তা'আলা প্রিয় নবীকে বলেছেন-
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ ﴿يونس: ১৫﴾
"তাহলে বলে দাও, একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ নয়। আমি সে নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে। যদি আমি আপন প্রতিপালকের অবাধ্যতা করি, তবে কঠিন দিবসের আযাবের ভয় করি।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
আজ চৌদ্দশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কুফরের মানস যেমন পরিবর্তিত হয়নি, তেমনি কাফের বিদ্রোহীদের কর্মপন্থাও পরিবর্তিত হয়নি। সারা বিশ্বের কুফরী শক্তি জাতীয় হোক বা প্রাদেশিক, এক আল্লাহকে উপাস্য মান্যকারীদের কাছে এমনই দাবি করছে যে, কুরআনের এমন সব কথা বলা থেকে বিরত থাকুন—যা কাফেরদের অপছন্দ হয়, যেসব কথায় কাফেরদের তৈরি আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় উপাস্যসমূহকে (জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার আইন) মন্দ বলা হয় এবং এ কুফরীব্যবস্থা শেষ করে দিয়ে শুধুমাত্র এক আল্লাহর নাযিলকৃত জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়ে থাকে।
📄 চিন্তার মুহূর্ত
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূলের পবিত্র মুখে ঘোষণা করিয়ে দিয়েছেন যে, এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা অসম্ভব। এটিই কুরআন, যা আমার উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এটাকেই মানতে হবে। সন্ধির অন্য কোনো ধরন অসম্ভব।
কিন্তু আজকের যুগের ধর্মীয় সন্ধি স্থাপনকারীদের দেখুন! বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে আগামীর দিনগুলোতে কুফর ও ইসলামকে এক করার নামে মেলা সাজাচ্ছে। তাদের মাঝে পারস্পরিক ঐক্য, সৌহার্দ্য, মৈত্রী, সহমর্মিতা সৃষ্টি করার প্রয়াস চালাচ্ছে। কখনো জাতীয়তার দোহাই দিয়ে, কখনো গণতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে, কখনো আবার রাষ্ট্রদেবীর পবিত্রতার নামে একাকার হওয়ার আতশবাজিতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ওপরে উঠছে।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোক! বিবেক তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, যখন সেই মেলায় এমন সব লোককেও দেখি—যাদেরকে দ্বীনি ইলমের ধারকবাহক ভাবা হয়। কুফর ও ইসলামের মাঝে ঐক্য ও সৌহার্দ্য, আল্লাহ ও মূর্তির মাঝে ঐক্যবদ্ধতা—এ ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ নবী (ﷺ) এর ভাষায় দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে যে-
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ ... ﴿يونس: ১৫﴾
"তাহলে বলে দাও, একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ নয়। আমি সে নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
কিন্তু সেই জ্ঞানপাপীদের আল্লাহর উপর কী দুঃসাহস দেখো, কেমন হঠকারিতার সাথে এসব কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করছে এবং তা ছবি বানিয়ে ও ভিডিও ধারণ করে বিশ্ববাসীকেও সেই দুঃসাহসের সাক্ষী বানাচ্ছে। এসব জ্ঞানপাপীরা সেসব মেলায় এ জন্যই অংশ নেয় যে, নিজের কথা ও লেখা বিক্রি করে পার্থিব ভোগ-বিলাসের উপকরণ কিনবে। আল্লাহর আয়াতের কথা বলে নিজেদের পেটকে জাহান্নামের গর্তে পরিণত করবে।
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿البقرة: ১৭৪﴾
"নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (সূরা বাকারাহ : ১৭৪)
أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ ﴿البقرة: ১৭৫﴾
"এরাই হল সে সমস্ত লোক, যারা হেদায়েতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করেছে এবং (খরিদ করেছে) ক্ষমা ও অনুগ্রহের বিনিময়ে আযাব। অতএব, তারা দোযখের উপর কেমন ধৈর্য্য ধারণকারী।” (সূরা বাকারাহ : ১৭৫)
📄 দ্বিতীয় প্রস্তাবনা
এ প্রস্তাবনায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন পয়েন্ট উল্লেখ করেন। ইমামুল মুফাসসিরীন ইবনে জারীর তবারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. এর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন, একদিন মক্কার সর্দারশ্রেণীর কিছু লোক নবী কারীম (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা আপনাকে এত সম্পদ দেব যে, আপনি মক্কার সবচেয়ে ধনী হয়ে যাবেন এবং আরবের সবচেয়ে সুন্দরী রমণীকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দেব। এটি আমাদের পক্ষ থেকে আপনার কাছে প্রস্তাবনা। এর বিনিময়ে আপনি আমাদের প্রভুদের ব্যাপারে মন্দ কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন। তাদের মানহানি করবেন না। যদি এটি আপনি গ্রহণ না করেন; তবে আরও একটি প্রস্তাব আমাদের পক্ষ থেকে আছে, যাতে রয়েছে আমাদের উভয়ের কল্যাণ। রাসূল জিজ্ঞাসা করলেন, সেটি কী? তারা বলল, এক বছর আপনি আমাদের প্রভু লাত-উজ্জার উপাসনা করুন। আমরা এক বছর আপনার প্রভুর উপাসনা করব। এই প্রেক্ষিতেই সূরা কাফিরুন অবতীর্ণ হয়।
📄 আবূ জাহেলের ধর্মনিরপেক্ষ প্রস্তাবনা
ইমাম আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. তাঁর তাফসীর গ্রন্থে ইমাম মুকাতিল রহ. এর রেওয়ায়েতে আবু জাহালের এক আশ্চর্যজনক প্রস্তাবনা বর্ণনা করেছেন।
ندخل معك في بعض ما تعبد وتدخل معنا في بعض ديننا أو نتبرأ من آلهتنا وتتبرأ من إلهك.
'আমরা আপনার সাথে আপনার কিছু ইবাদতে অংশ নেব। আপনিও আমাদের সাথে আমাদের দ্বীনের কিছু ইবাদাতে অংশ নেবেন। অথবা আমরা আমাদের প্রভুদের থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করি। আপনিও আপনার প্রভু থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করুন।'
এ প্রস্তাবনার প্রথম অংশ 'আমরা আপনার সাথে আপনার কিছু ইবাদতে অংশ নেব। আপনিও আমাদের সাথে আমাদের দ্বীনের কিছু ইবাদাতে অংশ নেবেন।' আজকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আবারও মুসলমানদের কাছে এটাই পেশ করছে। সেক্যুলার ব্যক্তি (সে আসল কাফের হোক বা মুসলমান নামের সেক্যুলার হোক) ইসলামের ইবাদতসমূহ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রস্তুত। নিজ নিজ দেশে সেটির অনুমতি; বরং সেটির সহায়তার জন্যেও প্রস্তুত। কিন্তু জীবনব্যবস্থা ও সংবিধানের প্রশ্নে সে চুল পরিমাণও পিছু হটতে প্রস্তুত নয়; বরং এ ব্যাপারে এদের চাওয়া হলো, সংবিধান ও জীবনব্যবস্থার ক্ষেত্রে আপনাদেরকে আমাদের সিস্টেমেই আসতে হবে। মানতে হবে গণতন্ত্র, বৈশ্বিক সুদব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ—যেটি শত্রুতা ও বন্ধুত্বের মাপকাঠি, নারী স্বাধীনতা, প্রবৃত্তি ও মুক্তচিন্তার উপর ভাসমান জীবন। আর এটিকে আদর্শ জীবন ও অনুকরণীয় ব্যবস্থা হিসেবে মানতে হবে। সুতরাং কেউ যদি এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে চায়, তখন প্রত্যেক রাষ্ট্রই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাদের মতবাদকে স্বীকার করে নেয়।
এটি আবূ জাহালের প্রস্তাবের প্রথমাংশ। আবূ জাহাল বিশ্বধর্মের যে প্রস্তাব করেছে, সে এ ব্যাপারটি মানতে কখনো প্রস্তুত ছিল না যে—রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন অর্থাৎ বৈধতা-অবৈধতা দানের ব্যাপারে সে হাত দেবে না।
তার প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অংশ ছিল, 'অথবা আমরা আমাদের প্রভুদের থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করি। আপনিও আপনার প্রভু থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করুন।' অর্থাৎ কোনো ধর্ম মানারই প্রয়োজন নেই। তার এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, আবূ জাহাল নিতান্ত বিশুদ্ধ চিন্তার সেক্যুলার ছিল; যে সর্বদা স্বীয় প্রবৃত্তির দাস ছিল। নিজের প্রভুদের মান-সম্মান (হানি হবে), তার জন্য এটা কোনো ব্যাপারই ছিল না। শুধু নিজের সর্দারি-রাজত্ব ও প্রবৃত্তিই তার প্রিয় ছিল। তা রক্ষা করার জন্য সে স্বীয় প্রভুদের থেকেও সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করতে কুণ্ঠিত ছিল না!
এ সবগুলো প্রস্তাবনায় যদি লক্ষ্য করা হয়; তবে সবকিছুর একটিই সারমর্ম বেরিয়ে আসে। আমরা যে সংবিধান প্রণয়ন করেছি, পার্লামেন্টে (দারুন নাদওয়া) আমরা যেসব আইন পাশ করেছি, সেসবের দুর্নাম করা যাবে না। আপনি ব্যক্তিগত ইবাদত চালিয়ে যান; কিন্তু আমাদের দ্বীন ও সংবিধানকে কুফর বলবেন না। কারণ, আমাদের ধর্ম মানে আল্লাহরই ধর্ম। এ কথাও বলবেন না যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। সেই ক্ষমতাটি আমাদের প্রভুদের জন্যও মেনে নিন। হোক না সেটা কুফরী আইনকে ইসলামী প্রমাণ করার অপব্যাখ্যার মাধ্যমেই!
এখানে চিন্তার বিষয় হলো, কুরাইশ-সর্দার কি এতই নির্বোধ ছিল যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর কাছে সে এমন দাবি করেছিল; তাতে কি তার এ ক্ষতি ছিল না? সে যখন এক বছর মুহাম্মাদ (ﷺ) এর প্রভুর ইবাদত করবে, তখন পুরো জাযিরাতুল আরবে বিদ্যমান তার অনুসারীদের মধ্যে কী প্রভাব পড়বে?
আমরা যদি কুরাইশ নেতৃবর্গের এ প্রস্তাবনাকে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে বুঝতে পারব যে, কোনো চিন্তা-ভাবনা করা ছাড়াই তারা নবী কারীম (ﷺ) এর দাওয়াতে বিরক্ত হয়ে এমন প্রস্তাব করে বসেছিল। কিন্তু যে ব্যক্তিই তাওহীদ ও কুফরের মানস বোঝে, সে বিশেষত মূর্তিপূজারী ধর্মের দিকে তাকিয়ে এ প্রস্তাবের গভীরতা আঁচ করতে পারবে। কুরাইশের বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ জানত যে, কেউ যদি একবার তাদের মূর্তির অবস্থানকে মেনে নেয়; তবে পরবর্তীতে সে কখনো নিজ আকীদার উপর অবিচল থাকতে পারবে না। পরিশেষে সেও একদিন মূর্তিপূজাকেই গ্রহণ করবে।
মূর্তিপূজা কেমন ধর্ম বুঝতে চাইলে হিন্দুস্তানের হিন্দুধর্মের ইতিহাস পড়তে পারেন। হিন্দুধর্ম কত সভ্যতা ও ধর্ম-বিশ্বাসকে গিলে খেয়েছে, আজ যার অস্তিত্বও বাকি নেই। খৃষ্টধর্মকে শিরকের নর্দমায় নিক্ষেপ করেছে এ মূর্তিপূজাই। মূর্তিপূজা এমন ধর্ম, যার কোনো উৎস ও ভিত্তি নেই; বরং এটি শতভাগ সেক্যুলার তথা প্রবৃত্তির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। অভিজাতশ্রেণীর (আরবে ছিল কুরাইশ কাফের, হিন্দুস্তানে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়) যাকে ইচ্ছে হয়েছে, তাকেই প্রভুর স্থান দিয়েছে। কারণ, বাধাদানকারী কোনো ভিত্তিই তো (ওদের) ছিল না! তবে আসমানী ধর্ম তার ব্যতিক্রম। যে কোনো শক্তিশালী, উপকারী, ক্ষতিকর বা জনপ্রিয় মানুষ আসে, (মূর্তিপূজারিরা) এটিকে নিজের প্রমাণ করে নিজের অবস্থান তৈরি করে এবং পরে তারই পূজা করতে থাকে।
হয়তো এ কারণেই হিন্দুত্ববাদের সর্দারশ্রেণীর (ব্রাহ্মণদের) ইসলাম গ্রহণের হার অন্যান্য জাতির তুলনায় অনেক কম। কারণ, আপনি তাকে যত দলিলই দিন না কেন, সে তা মেনে নিলেও; সত্যের গন্ডিতে আসার পরিবর্তে সেই সত্যকেই নিজের প্রবৃত্তি মতে ঢেলে সাজাবে। সেই ধর্ম গ্রহণ করার পরিবর্তে সেটিকে হিন্দুত্ববাদে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নেবে যে, সে ধর্মের অস্তিত্বের খবরও জানা যাবে না। যেমন, আপনি তাদেরকে যদি আল্লাহ তা'আলার সত্তার ব্যাপারে দলিল দিয়ে বুঝান, তখন তারা তা বুঝবে ঠিক; কিন্তু তা এমন পন্থায় মানবে যে, আল্লাহর জন্যও একটি মূর্তি বানিয়ে সামনে রেখে দেবে। তাই প্রমাণিত সত্য হলো, অধিকাংশ ব্রাহ্মণ সত্য গ্রহণ করার পরও মুসলমান হতে পারে না; তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।
সুতরাং কুরাইশ পৌত্তলিকদের এ চুক্তির ফলাফল খুব খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এতে মক্কার কাফেরদেরই ফায়দা হতো। কারণ এ চুক্তির পর আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব হতো না। এ ঘটনার মাঝে বর্তমান ঐ সকল লোকদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় আছে, যারা ইসলাম ও হিন্দুত্ববাদ বা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও অন্যান্য মতাদর্শের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি, বোঝাপড়া ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের নামে ইসলাম ও কুফরকে একীভূত করে মুসলমানদেরকে প্রকাশ্য কুফরের দিকে দাওয়াত দিচ্ছে।
উপমহাদেশের হক্কানী উলামায়ে কেরাম যুগে যুগে মুসলমানদেরকে এ ধরনের কুফরী চুক্তি ও উদ্যোগের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. 'দ্বীনে হক্ক ওয়া উলামায়ে রব্বানী' নামক রিসালায় বলেন, আম্বিয়ায়ে কেরা আ. কুফরকে পরিপূর্ণরূপে মূলোৎপাটন করতেন। তাঁরা কুফরের প্রতি এবং তাদের সাথে নমনীয় চুক্তি সম্পাদনের প্রতি সহিষ্ণু ছিলেন না। কুফরের পরিচয় চেনার ক্ষেত্রে তাঁদের দারুণ যোগ্যতা ছিল। এক্ষেত্রে তাঁদের দৃষ্টি ছিল খুবই তীক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী। আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ হেকমত ও দৃঢ়তা দান করেছেন। আল্লাহপ্রদত্ত বিচক্ষণতা ও অন্তর্দৃষ্টির উপর ভরসা করা ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় নেই। দ্বীনের হেফাযতের জন্য এটাই একমাত্র উপায় যে, ইসলাম ও কুফরের যে সীমানা তাঁরা স্থাপন করে দিয়েছেন এবং যে নিদর্শনাবলি তাঁরা উল্লেখ করে দিয়েছেন, তার পরিপূর্ণ হেফাযত করতে হবে। এর মধ্যে সামান্য উদারবোধ ও সহিষ্ণুতা দ্বীনকে এমনভাবে বিকৃত করে ফেলে, যেমনিভাবে ইয়াহুদী ধর্ম, খৃষ্টান ধর্ম ও ভারতের ধর্মসমূহ বিকৃত হয়ে পড়েছে।
হক্কানী উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে তিনি লিখেন, আম্বিয়ায়ে কেরাম আ. এর সত্যিকারের অনুসারীগণও এ বিষয়ে তাঁদের মতো বিচক্ষণতা ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। তাঁরা এক এক করে কুফরের সকল নিশানা মুছে ফেলেন। এক এক করে জাহিলিয়্যাতের দাগ দূরীভূত করেন। কুফর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের বোধশক্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। কুফর যে বেশে এবং যে আকৃতিতেই আসুক না কেন, তা তাঁরা ঠিকই ধরে ফেলেন এবং নিজের কোমর বেঁধে তার বিরোধিতায় নেমে পড়েন। কখনো তাঁরা ভারতে বিধবাদের দ্বিতীয় বিবাহকে হারাম মনে করা ও তার প্রতি প্রবল ঘৃণা পোষণ করার মাঝে কুফরের গন্ধ পান এবং সেটার (বিধবাদের দ্বিতীয় বিবাহ) প্রচার-প্রসার ঘটানো এবং এই সুন্নাহকে জীবিত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অনেক সময় তার জন্য জানবাজি রেখে সংগ্রাম করেন। কখনো শরয়ী কানুনের উপর প্রচলিত রীতি-রেওয়াজকে প্রাধান্য দেওয়া এবং বোনদেরকে মিরাস-অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জোর দেওয়াকে তাঁদের নিকট কুফরী মনে হয় এবং এ ধরনের লোকদের বিরোধিতা ও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ফরয মনে করেন তাঁরা।
কখনো আল্লাহ ও রাসূল (ﷺ) এর পরিষ্কার বিধান জানার পর না মানা এবং গাইরে ইলাহী আদালত ও আইনের আশ্রয় নেওয়া ও অনৈসলামিক আহকাম ও কানুন প্রতিষ্ঠা করাকে ইসলামের গন্ডি থেকে খারিজকারী বিষয় বলে মনে হয় তাঁদের নিকট এবং তাঁরা এর প্রতিবাদ করতে অপারগ হলে সেখান থেকে হিজরত করে চলে যান। কখনো কোনো নওমুসলিম বা এমন মুসলিম, যে অমুসলিমদের সাথে ওঠাবসা করে এবং এমন জবাইকৃত জন্তু ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকে ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাকে ঘৃণা করে, যে জবাইকৃত জন্তু থেকে তাদের মিত্র জাতি ও দেশবাসী প্রবলভাবে বেঁচে থাকে। আর এ বিষয়ে তাদের মধ্যে যথেষ্ট ঘৃণা ও দূরত্ববোধ রয়েছে। এমন মুসলমানদের ঈমানে দুর্বলতা ও তাদের মাঝে পুরাতন ধর্ম বা অমুসলিমদের ধর্মের প্রভাব আছে বলে মনে করেন তাঁরা।
যুগে যুগে এ ধরনের আল্লাহওয়ালা ও সত্যপথে অবিচল পথিকদের বিরুদ্ধে অনেক কথা হয়েছে। বিষাক্ত তীর-বর্শার আঘাত তাঁদের অন্তরকে চালনি করে দিয়েছে। তাঁদের বিরোধিতা ও যুক্তি খন্ডনের জন্য নফসের পূজারীদেরকে উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাসম্পন্ন পদ-পদবি ও নিকৃষ্ট পৃথিবীর নিকৃষ্ট সম্পদ প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে; যার সাহায্যে তারা নিজেদের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরেছে। এ সম্পর্কে আরো বলেন, তাঁদের যুগের নির্বোধ ও সকল ধর্মের মাঝে সাম্য ও সহাবস্থানের প্রবক্তারা তাঁদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে; যাঁরা হারাম ও মন্দির, কাবা ও প্রতীমার মাঝে পার্থক্য করাকেও কুফর মনে করে। তাচ্ছিল্যবশত তাঁদেরকে শহরের ফকীহ, সমালোচক, উর্বশী বক্তা ও খোদায়ী সেনাপতি নামে অভিহিত করেছে। তবুও তাঁরা পরিপূর্ণ স্থিরতা ও ধৈর্যের সাথে নিজেদের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। নিঃসন্দেহে এ লোকগুলো আম্বিয়ায়ে কেরাম আ. এর দ্বীনের হেফাযত করেছেন। আজ ইসলাম, খৃষ্টবাদ, ইয়াহুদীবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ ইত্যাদির মাঝে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, এটা তাঁদের সাহসিকতা, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতারই ফল।
এখানে কুফর ও হিন্দুত্ববাদের স্বরূপ ও প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করার উদ্দেশ্য হলো, যাতে এটা বোঝার পর এ বিষয়টাও বুঝতে সহজ হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা; যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের রূপে প্রকাশিত। এটাও প্রকৃতি ও প্রভাবের দিক দিয়ে হিন্দুইজমের মতোই। প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তি জানে যে, সেক্যুলারিজম বা গণতন্ত্র আসলে প্রবৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটা ধর্ম (শাসনব্যবস্থা)। যেখানে প্রভাবশালী শ্রেণীর ইচ্ছাকেই দ্বীন, উপাস্য ও আইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বৈধতা ও অবৈধতা দানের পুরো ক্ষমতা এ শ্রেণীর হাতেই ন্যস্ত থাকে। এর অনুসরণ করা প্রত্যেক অধিবাসীর জন্য আবশ্যক করে দেওয়া হয়। তবে প্রভাবশালী শ্রেণীর চাহিদাকে নির্ভরযোগ্য করার জন্য সেটাকে জনগণের রায় ও ইচ্ছা বলে নাম দেওয়া হয়। হিন্দুত্ববাদের মতো গণতন্ত্রের দেবীর কাছেও এ পার্থক্য নেই যে, তাকে কে মান্য করছে—ইয়াহুদী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, না মুসলমান? সে সবার কাছ থেকে কেবল এটাই চায় যে, সবাই নিজ নিজ ধর্মের উপর থাকুক আর তাকে শুধু আইন প্রণয়নের এখতিয়ার দিলেই হলো। অর্থাৎ জনগণের জীবন পরিচালনার নিয়ম-নীতি প্রবর্তন করার ক্ষমতা—যার দ্বারা যেটা ইচ্ছা মানুষের জন্য বৈধ আর যেটা ইচ্ছা তাদের জন্য অবৈধ ও আইন পরিপন্থী সাব্যস্ত করা যায়।
অতএব, যেমনিভাবে মক্কার পৌত্তলিকরা সর্বশেষ নবী (ﷺ) এর সামনে এ উদ্যোগ তুলে ধরেছিল যে, আপনি আপনার দ্বীনের উপর থাকবেন; কিন্তু আমাদের কতক প্রতীমার সত্যতা মেনে নেবেন। অথবা আপনার কিছু বিষয় আমরা মেনে নেব আর আমাদের কিছু বিষয় আপনি মেনে নেবেন। গণতন্ত্রও প্রত্যেক নাগরিক থেকে এতটুকুই চায়। যে এটা মেনে নেয় তার সাথে গণতন্ত্রের কোনো লড়াই নেই। সে হয় সম্মানিত নাগরিক; চাই সে ইয়াহুদী অথবা খৃষ্টান বা হিন্দু হোক কিংবা চাই সে মুরতাদ হোক বা কট্টর নাস্তিক হোক। এ দেবীর দৃষ্টিতে সবার ধর্ম এক সমান। কেউ না মানলে সে হবে আতঙ্কবাদী এবং রাষ্ট্রের দেবী-মার বাগী বা বিদ্রোহী।
যাই হোক, মক্কার পৌত্তলিক সর্দাররাও রাসূল (ﷺ) এর নিকট এ ধরনের প্রস্তাবনা পেশ করল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাযিলকৃত ধর্মের অপছন্দকারীদের এ জবাব দিয়ে আশাহত করে দিলেন যে, কিছু ইসলাম আর কিছু কুফরের খড়কুটো কখনো ইসলাম হতে পারে না। এখান থেকে কিছু ওখান থেকে কিছুর এ মিশ্রিত ধর্মটা কুফরই হবে।
আল্লামা যাফর আহমাদ উসমানী রহ. এলাউস সুনান এ বলেন-
قلت: وأما محاربة الرعية المسلمة ملكها الكافر بالمقاطعة الجوعية أو المظاهرة العامة فليس لها أصل في الشرع لم يستعملها أسلافنا المقيمون بدار الحرب مع ملكها قط، وإنما أخذها أبناء زماننا من أوربا و يجوز استعمال ما سوى الأول بعد النبذ إليهم على سواء إذا كنا نرجو الشوكة عليهم بذلك، وكان المقصود إعلاء كلمة الله والدعاء إلى الدين، دون إحرار الوطن وإقامة السلطنة الجمهورية المركبة من أعضاء بعضهم مسلمون وبعضهم كفرة مشركون، فإن بذل الجهد لذلك ليس من الجهاد في شيء لخلوه عن غرضه الأصلي وهو إعلاء كلمة الله والدعاء إلى الدين القويم . والسلطنة المركبة من الأعضاء المسلمين والكافرين لا يكون سلطنة إسلامية قط، وإنما هي سلطنة الكفر لا سيما إذا كانت الكثرة لهم لا لنا، فإن المركب من الخسيس والشريف خسيس من الطيب والخبيث خبيث .
"আমি বলছি, এমন সাধারণ মুসলমান যাদের শাসক কাফের হয়; তাদের অনশন, হরতাল বা বিক্ষোভ মিছিল করা—শরীয়তে এসবের কোনো হাকীকত নেই। দারুল হরবে অবস্থানকারী আমাদের আসলাফদের কেউ এমন করেননি। আমাদের যমানার লোকেরা এসব ইউরোপ থেকে আমদানি করেছে। তবে অনশন ও হরতাল ব্যতীত বিক্ষোভ মিছিল করা ঐ অবস্থায় জায়েয হবে, যখন তা কাফেরদের সাথে কৃত চুক্তি শেষ করার ঘোষণা দেওয়ার জন্য হয় এবং এ মিছিল বা গণঅভ্যুত্থানের কারণে কাফেরদের উপর বিজয় লাভ করার আশা করা যায়। উপরন্তু এর উদ্দেশ্য আল্লাহর কালিমার বুলন্দি ও কাফেরদেরকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বান করা হতে হবে। দেশের স্বাধীনতা বা অন্য গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য হলে হবে না, যার কিছু সদস্য মুসলমান আর কিছু সদস্য কাফের। কারণ তার জন্য চেষ্টা করাকে জিহাদ বলা হবে না। এতে তার উদ্দেশ্য আল্লাহর কালিমার বুলন্দি ও স্পষ্ট দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দেওয়া নয়। আর এমন সরকার, যা মুসলমান ও কাফের সাংসদ নিয়ে গঠিত, এটা কখনো ইসলামী রাষ্ট্র হতে পারে না। নিঃসন্দেহে এটা কুফরী রাষ্ট্রই হবে। বিশেষ করে, যখন তার অধিকাংশ সদস্য কাফের হয়। কারণ নিকৃষ্ট ও উৎকৃষ্টের মিশেলে গঠিত বস্তু নিকৃষ্টই হয় এবং পবিত্র ও অপবিবের মিশ্রণে গঠিত বস্তু অপবিত্রই হয়।”
আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. 'দ্বীনে হক্ক ওয়া উলামায়ে রব্বানী'তে বলেন, "শিরক একটা স্বতন্ত্র ধর্ম ও পরিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা (এ পরিপূর্ণতা মানবগড়া, যাতে শান্তি-সফলতার লেশমাত্রও নেই)। শিরক ও আল্লাহর ধর্ম কোনো শরীরে, কোনো মন-মানসিকতায় বা কোনো ভূখণ্ডে একসাথে জমা হওয়া সম্ভব নয়। এ গাইরে ইলাহী ধর্ম শরীরে ও মনে এবং এর বাহিরে এতটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হয়, যতটা আল্লাহর ধর্মের জন্য মোটামুটি দরকার হয়।”
একই পৃষ্ঠায় কয়েক লাইন পর তিনি বলেন, “এজন্য যতক্ষণ পর্যন্ত জমিন থেকে শিরকের সকল শাখা এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শিকড় উপড়ে ফেলা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীনের চারা লাগানো সম্ভব হবে না। কারণ এ চারা এমন জমিনে শিকড় গাড়ে না, যেখানে অন্য কোনো গাছের শিকড় বা বীজ থাকে। তার ডালপালা তখনই আসমানের সাথে কথা বলে এবং তখনই ফল-ফুল দেয়, যখন তার ভিত্তি ও শিকড় গভীর ও শক্ত হয়।" পরের পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, “সুতরাং যে সকল ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের স্বভাব ও স্বরূপ সম্পর্কে অবগত, তারা তাকে কোনো জায়গায় কায়েম করার জন্য সে জায়গাকে পরিপূর্ণরূপে পরিষ্কার, সমান ও উপযোগী করে নেয়। শিরক ও জাহিলিয়্যাতের সকল শিকড় খুঁজে খুঁজে বের করে দেয়। একটা একটা করে শিরক ও জাহিলিয়্যাতের বীজ উপড়ে ফেলে দিয়ে পুরো জমিনকেই একেবারে ওলট-পালট করে দেয়।"
সামনে গিয়ে তিনি কুফরের সংজ্ঞা দিয়ে বলেন, "কুফর হলো আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর শরীয়তকে অস্বীকার করা। এ অস্বীকার করা মানে হলো: তাঁর হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তাঁর আহকাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া; চাই সেটা যে কোনো উপায়েই হোক বা যে কোনো আলামত দ্বারা প্রকাশিত হোক। কুফরের এ সংজ্ঞা ঐসব লোকদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছে, যারা কোনো হুকুমকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এর বিধান জানার পরও মান্য করে না বা মৌখিকভাবে স্পষ্ট অস্বীকার না করলেও ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিরোধিতা করে। এ ধরনের লোক চাই অন্যান্য আহকামের যতই পাবন্দি করুক না কেন, কুফরের গন্ডি থেকে বাহিরে নয়। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেন-
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِ الْعَدَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ﴿البقرة: ৮৫﴾
"তবে কি তোমরা গ্রন্থের (তাওরাতের) কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে- খবর নন।” (সূরা বাকারাহ: ৮৫)
কেবলমাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব ও সার্বভৌম ক্ষমতা স্বীকার করে নিলে স্বাভাবিকভাবে প্রভুত্ব ও হাকিমিয়্যাত (আইন ও বিধান প্রণয়নের অধিকার) এর দাবিদারদের প্রভুত্ব ও হাকিমিয়্যাতের অস্বীকার হয়ে যায়। কিন্তু যে সকল লোক বাতিল প্রভুদের প্রভুত্ব ও হাকিমিয়্যাতের (আইন ও বিধান প্রণয়নের অধিকার) স্পষ্ট অস্বীকার করতে প্রস্তুত নয় বা তারা এ কেবলার দিকে মুখ তো ফিরিয়ে নিয়েছে; তবে অন্য কেবলার দিকে তাদের পিঠ যায় না অর্থাৎ তা থেকে পরিপূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি এবং তারা কখনো কখনো এর উপর আমল করে, আবার প্রয়োজন পড়লে ওটার উপরও আমল করে—প্রকৃতপক্ষে এরা ইসলামের আওতাভুক্ত নয়। ঈমান বিল্লাহ তথা আল্লাহর উপর ঈমান আনার জন্য কুফর বিত-তাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার করা আবশ্যক।"
কিছুদূর গিয়ে তিনি বলেন, "এজন্য কুরআন এ ধরনের মানুষের ঈমানের দাবিকে মেনে নেয়নি, যারা গাইরে ইলাহী বিধি-বিধান এবং তার প্রবক্তা ও কেন্দ্রের প্রতি ঝুঁকে থাকে এবং তাদেরকে নিজের বিচারক ও ফায়সালাকারী স্বীকার করে। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴿النساء: ৬০﴾
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” (সূরা নিসা : ৬০)
মুফতী মুখতার উদ্দীন শাহ সাহেব স্বীয় কিতাব 'ইসলামী আকাঈদ ওয়া নাযারিয়্যাত' এ লিখেন—বিরোধী বিধি-বিধান ও গাইরুল্লাহর ইবাদত থেকে অসন্তুষ্টি:
"এ মহান কালিমার মধ্যে এ কথার ওয়াদাও রয়েছে যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করব না। যে কানুন ও বিধান আল্লাহর কানুনের পরিপন্থী হবে বা রাসূল থেকে প্রমাণিত পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে, তার অস্বীকার করব।” ১২ নং পৃষ্ঠায় সূরা নিসার ৬০ নং আয়াতের অনুবাদে ব্র্যাকেটের ভিতরে লিখেন—"কেননা, আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল এর উপর ঈমান আনার জন্য আবশ্যক হলো, তাগুতকে অস্বীকার করা। তাগুতকে অস্বীকার করা ছাড়া ঈমানও গ্রহণযোগ্য নয় এবং খালেছ ইবাদতও সম্ভব নয়। কিন্তু এই দুর্বল ও মস্তিষ্ক-ঢিলাগোষ্ঠী উভয়টাকে জমা করতে চায়; অথচ এটা একটা শয়তানি চাল।"
পরের পৃষ্ঠায় লিখেন, এ আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্টত: প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল এর উপর ঈমান আনার জন্য তাগুত তথা দ্বীন ইসলামের পরিপন্থী আইন-কানুনকে অস্বীকার করা আবশ্যক।