📄 দ্বীন ইসলামই গ্রহণযোগ্য; মিশ্র ধর্ম নয়
নবীগণের ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, তাঁদের সাথে তাঁদের বিরোধীদের মূল দ্বন্দ্ব ছিল—তাঁরা এ কথার দাওয়াত দিতেন যে, জীবনের সকল শাখায় ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাথে সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রেও গাইরুল্লাহ'র পরিবর্তে এক আল্লাহর হুকুমের আনুগত্য করা হবে।
হযরত শুআইব আ. যখন দ্বীনের এ শাখার দাওয়াত দিলেন, তখন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা বড়ই আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল-
قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَن نَّতْرُكَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا أَوْ أَن نَّفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ إِنَّكَ لَأَنتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ ﴿هود: ৮৭﴾
"তারা বলল—হে শোয়ায়েব (আঃ) আপনার নামায কি আপনাকে ইহাই শিক্ষা দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব আমাদের বাপ-দাদারা যাদের উপাসনা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব? আপনি তো একজন খাস মহৎ ব্যক্তি ও সৎপথের পথিক।” (সূরা হুদ : ৮৭)
অর্থাৎ তাঁর জাতিও এ বিষয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিল যে, হযরত শুআইব আ. এর ধর্ম আমাদের অর্থনীতিব্যবস্থা ও পার্থিব লেনদেন এর মাঝে নাক গলাচ্ছে কেন?
আজকের দিনেও হক্ক-বাতিলের মাঝে এ লড়াই-ই বিদ্যমান। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ এমন 'পাগলদের' বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে, যাঁরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাথে সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রেও এক আল্লাহর অবতীর্ণ আইন বাস্তবায়নের দাবি জানায়।
কিন্তু যাঁরা এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেই পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহর উপর, যা মুহাম্মাদ (ﷺ) এর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। যিনি আল্লাহর সাথে আধুনিক যুগের কোনো মূর্তিকে উপাস্য বানাননি। যিনি মাসজিদেও এক আল্লাহকে উপাস্য মানতেন। লেনদেন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, আইন-আদালত, লাভ-লোকসানেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বানানো যাবে না। তিনি শুধু আল্লাহর নাযিলকৃত দ্বীনের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করতেন। ইসলামের সাথে তিনি অন্য কোনো মতবাদকে মানতেন না। মিশ্র ধর্মকেও তিনি মানতেন না, যাতে কিছু ইসলাম থেকে নেওয়া হয়েছে, কিছু অন্য ধর্ম থেকে নিয়ে এক নতুন ধর্মের সৃষ্টি করা হয়েছে।
📄 সন্ধির প্রস্তাবনা
হক্ক-বাতিলের মাঝে চলমান এ লড়াইয়ে বাতিলের পক্ষ থেকে শক্তিপ্রয়োগ করে হক্কের আহ্বানকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। তাঁদের উপর সব ধরনের নির্যাতন বৈধ করা হয়। জুলুম-নির্যাতন ও হুমকি-ধমকিতে ব্যর্থ হয়ে বাতিলের পক্ষ থেকে আলোচনা, সহাবস্থান, বোঝাপড়া, শান্তিচুক্তি, ঐক্য ইত্যাদি মুখরোচক স্লোগানের মাধ্যমে হক্ক-বাতিলকে ওলটপালট করার চেষ্টা করা হয়।
রাহমাতুল্লিল আলামীনের বিরুদ্ধে জাযিরাতুল আরবের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি কুরাইশের সর্দারশ্রেণী যখন দেখল যে, ইসলামকে জোর করে দাবিয়ে রাখার প্রয়াস বারবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে, তখন তারাও শান্তিচুক্তি, আলোচনা ও সহাবস্থানের নামে অসাম্প্রদায়িকতার ঢোল পেটাতে শুরু করল। তাদের পক্ষ থেকে রাহমাতুল্লিল আলামীন (ﷺ) এর কাছে বিভিন্ন প্রস্তাবনা পেশ করতে শুরু করল।
ইমাম বাগাভী রহ. বলেন, একদিন মক্কা মুকাররমার পাঁচজন লোক আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইয়া মাখযুমী, ওয়ালীদ ইবনে মুগيرة, মিকরায ইবনে হাফস, আমর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবী কাইস আল-আমেরী ও আস ইবনে ওয়ায়েল নবী কারীম (ﷺ) এর কাছে এল। তারা বলল, আপনি যদি চান যে, আমরা আপনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি; তবে আপনি এই কুরআন বাদ দিয়ে আরেকটি কুরআন নিয়ে আসুন!
আল্লাহ তা'আলা তাদের এ প্রস্তাবনাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন-
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا انْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِلْهُ ... ﴿يونس: ১৫﴾
"আর যখন তাদের কাছে আমার প্রকৃষ্ট আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন সে সমস্ত লোক বলে, যাদের আশা নেই আমার সাক্ষাতের, নিয়ে এসো কোন কোরআন এটি ছাড়া, অথবা একে পরিবর্তিত করে দাও।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
সুতরাং আমাদের ও আপনার মাঝে সন্ধির একটি মাত্র পথ আছে। ঘৃণাভরা, শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তা বিনষ্টকারী বিষয়গুলো বন্ধ করা হোক। এর জন্য আবশ্যক হলো, এ কুরআন বাদ দিয়ে অন্য কোনো কুরআন নিয়ে আসুন! যেখানে লাত, মানাত ও উজ্জার উপাসনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই। অথবা এ কুরআনে পরিবর্তন করুন। সেখান থেকে এমন সব কথা বের করে দিন; যাতে আমাদের জীবনব্যবস্থা ও মূর্তি সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা হয়েছে। আমাদের কাছে আমাদের পার্লামেন্টে (দারুন নাদওয়া) অনুমোদিত আইন-কানুন ও জীবনব্যবস্থাকে ত্যাগ করার দাবি জানানো হয়েছে। আমাদের জীবনব্যবস্থায় যেসব বিষয়কে হারাম বলা হয়েছে, তা হালাল করে দেওয়া হোক। আমরা যাদেরকে উপাস্য বানিয়েছি, যাদেরকে আমরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছি; এ কুরআন তা হারাম বলছে, তাকে বাতিল ও তাগুত বলছে। সুতরাং তাতে সংস্কার করা হোক। যা হালাল বলা হয়েছে তা হারাম করা হোক।
কিন্তু আসল উপাস্য আল্লাহ তা'আলা প্রিয় নবীকে বলেছেন-
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ ﴿يونس: ১৫﴾
"তাহলে বলে দাও, একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ নয়। আমি সে নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে। যদি আমি আপন প্রতিপালকের অবাধ্যতা করি, তবে কঠিন দিবসের আযাবের ভয় করি।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
আজ চৌদ্দশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কুফরের মানস যেমন পরিবর্তিত হয়নি, তেমনি কাফের বিদ্রোহীদের কর্মপন্থাও পরিবর্তিত হয়নি। সারা বিশ্বের কুফরী শক্তি জাতীয় হোক বা প্রাদেশিক, এক আল্লাহকে উপাস্য মান্যকারীদের কাছে এমনই দাবি করছে যে, কুরআনের এমন সব কথা বলা থেকে বিরত থাকুন—যা কাফেরদের অপছন্দ হয়, যেসব কথায় কাফেরদের তৈরি আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় উপাস্যসমূহকে (জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার আইন) মন্দ বলা হয় এবং এ কুফরীব্যবস্থা শেষ করে দিয়ে শুধুমাত্র এক আল্লাহর নাযিলকৃত জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়ে থাকে।
📄 চিন্তার মুহূর্ত
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূলের পবিত্র মুখে ঘোষণা করিয়ে দিয়েছেন যে, এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা অসম্ভব। এটিই কুরআন, যা আমার উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এটাকেই মানতে হবে। সন্ধির অন্য কোনো ধরন অসম্ভব।
কিন্তু আজকের যুগের ধর্মীয় সন্ধি স্থাপনকারীদের দেখুন! বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে আগামীর দিনগুলোতে কুফর ও ইসলামকে এক করার নামে মেলা সাজাচ্ছে। তাদের মাঝে পারস্পরিক ঐক্য, সৌহার্দ্য, মৈত্রী, সহমর্মিতা সৃষ্টি করার প্রয়াস চালাচ্ছে। কখনো জাতীয়তার দোহাই দিয়ে, কখনো গণতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে, কখনো আবার রাষ্ট্রদেবীর পবিত্রতার নামে একাকার হওয়ার আতশবাজিতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ওপরে উঠছে।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোক! বিবেক তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, যখন সেই মেলায় এমন সব লোককেও দেখি—যাদেরকে দ্বীনি ইলমের ধারকবাহক ভাবা হয়। কুফর ও ইসলামের মাঝে ঐক্য ও সৌহার্দ্য, আল্লাহ ও মূর্তির মাঝে ঐক্যবদ্ধতা—এ ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ নবী (ﷺ) এর ভাষায় দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে যে-
قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ ... ﴿يونس: ১৫﴾
"তাহলে বলে দাও, একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ নয়। আমি সে নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে।” (সূরা ইউনুস: ১৫)
কিন্তু সেই জ্ঞানপাপীদের আল্লাহর উপর কী দুঃসাহস দেখো, কেমন হঠকারিতার সাথে এসব কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করছে এবং তা ছবি বানিয়ে ও ভিডিও ধারণ করে বিশ্ববাসীকেও সেই দুঃসাহসের সাক্ষী বানাচ্ছে। এসব জ্ঞানপাপীরা সেসব মেলায় এ জন্যই অংশ নেয় যে, নিজের কথা ও লেখা বিক্রি করে পার্থিব ভোগ-বিলাসের উপকরণ কিনবে। আল্লাহর আয়াতের কথা বলে নিজেদের পেটকে জাহান্নামের গর্তে পরিণত করবে।
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿البقرة: ১৭৪﴾
"নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (সূরা বাকারাহ : ১৭৪)
أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ ﴿البقرة: ১৭৫﴾
"এরাই হল সে সমস্ত লোক, যারা হেদায়েতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করেছে এবং (খরিদ করেছে) ক্ষমা ও অনুগ্রহের বিনিময়ে আযাব। অতএব, তারা দোযখের উপর কেমন ধৈর্য্য ধারণকারী।” (সূরা বাকারাহ : ১৭৫)
📄 দ্বিতীয় প্রস্তাবনা
এ প্রস্তাবনায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন পয়েন্ট উল্লেখ করেন। ইমামুল মুফাসসিরীন ইবনে জারীর তবারী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. এর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন, একদিন মক্কার সর্দারশ্রেণীর কিছু লোক নবী কারীম (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা আপনাকে এত সম্পদ দেব যে, আপনি মক্কার সবচেয়ে ধনী হয়ে যাবেন এবং আরবের সবচেয়ে সুন্দরী রমণীকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দেব। এটি আমাদের পক্ষ থেকে আপনার কাছে প্রস্তাবনা। এর বিনিময়ে আপনি আমাদের প্রভুদের ব্যাপারে মন্দ কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন। তাদের মানহানি করবেন না। যদি এটি আপনি গ্রহণ না করেন; তবে আরও একটি প্রস্তাব আমাদের পক্ষ থেকে আছে, যাতে রয়েছে আমাদের উভয়ের কল্যাণ। রাসূল জিজ্ঞাসা করলেন, সেটি কী? তারা বলল, এক বছর আপনি আমাদের প্রভু লাত-উজ্জার উপাসনা করুন। আমরা এক বছর আপনার প্রভুর উপাসনা করব। এই প্রেক্ষিতেই সূরা কাফিরুন অবতীর্ণ হয়।