📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 মুসলমানের কাছে ঈমানের দাবি

📄 মুসলমানের কাছে ঈমানের দাবি


কিন্তু সাথে সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এ কথায়ও একমত যে, কালিমা তখনই উপকার দেবে, যখন তার শর্তাবলিসহ পড়া হবে এবং এরপর তার দাবিসমূহ পূর্ণ করা হবে। তাই এমন কিছু শর্ত তাতে আছে, যা পূর্ণ করা ব্যতীত মুখে কালিমা পড়া সত্ত্বেও মানুষ কাফের হয়ে যায়। তেমনি এমন কিছু বিষয় আছে, যা বলা বা করার কারণে মানুষ কালিমা পড়া সত্ত্বেও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।

وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴿البقرة: ٢١٧﴾

"তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।” (সূরা বাকারাহ : ২১৭)

আল্লাহর কুরআন কত এমন লোকের ব্যর্থতা ও বিফলতার কথা ঘোষণা করছে, যারা মুখে কালিমা পড়ার দাবিদার। মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন- তারা জাহান্নামের নিচের স্তরে থাকবে। যদি শুধু মুখে কালিমা পড়া পরকালীন মুক্তির জন্য যথেষ্ট হতো, তাহলে মুনাফিকদেরকে কাফেরদের চেয়ে কঠিন আযাব কেন দেওয়া হবে? বুঝা গেল, কিছু শর্তের ভিত্তিতে মুখে কালিমা পড়া আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।

আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের অবস্থা বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ ﴿البقرة: ٨﴾

"আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।” (সূরা বাকারাহ : ৮)

إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ ﴿المنافقون: ١﴾

"মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” (সূরা মুনাফিকুন : ০১)

মুনাফিকদের এ স্তরটি কাফেরদের চেয়েও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا ﴿النساء : ١٤٥﴾

"নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।” (সূরা নিসা : ১৪৫)

তেমনি যে ব্যক্তি এ কালিমা পাঠ করার পর এমন কাজ করে বসে, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়, আর সেই অবস্থায় যদি সে মারা যায়; তাহলে সেই ব্যক্তিও কঠিন ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে না। বুঝা গেল, যে ব্যক্তি মুখে কালিমা পাঠ করা সত্ত্বেও এমন কাজ করে, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়; তাহলে সেই কালিমা তার কোনো উপকারে আসবে না। চাই সে মুসলমানের মতো নাম রাখুক, সালাত পড়ুক, হজ্ব করুক না কেন!

ঈমান সহীহ হওয়ার শর্তাবলির দিকে ইঙ্গিত করে আল্লামা শামী রহ. রদ্দুল মুখতারে বলেন, “সেই ব্যক্তির কাফের হওয়াতে কোনো সন্দেহ নেই, যে ব্যক্তি ইসলামের আবশ্যকীয় বিষয়ের বিরোধিতা করে; যদিও সে কেবলা মানুক এবং পুরো জীবন ইবাদত করুক।”

আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. ইকফারুল মুলহিদীন গ্রন্থে বলেন, রাসূল (ﷺ) এর এ হাদীস-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَلَّى صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا وَأَكَلَ ذَبِيحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللَّهِ وَذِمَّةً رَسُولِهِ فَلَا تُخْفِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি আমাদের ন্যায় সালাত আদায় করে, আমাদের কেবলামুখী হয় এবং আমাদের যবেহ করা প্রাণী খায়, সে-ই মুসলিম, যার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যিম্মাদার। সুতরাং তোমরা আল্লাহর যিম্মাদারীতে খিয়ানত করো না।” (সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৩৮৪, ই,ফা)

আমি এ হাদীসটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলি, এ হাদীসের ব্যাখ্যা হলো- দ্বীন পূর্ণাঙ্গভাবে মানতে হবে। কোনো কুফরী আবশ্যক করে এমন আকীদা, কথা বা কাজে জড়িত না হতে হবে। এর এ অর্থ নয় যে, যে ব্যক্তিই এ তিন কাজ করবে, যত কুফরী আকীদা ও কাজে জড়িত হোক না কেন; সে মুসলমান।

وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فَمَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلَّا بِحَقِّهِ وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পূর্ব পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ আমাকে দেওয়া হয়েছে। যে কেউ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলল, সে তার জীবন ও সম্পদ আমার পক্ষ থেকে নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের বিধান লংঘন করলে (শাস্তি দেওয়া যাবে), আর তার অন্তরের গভীরে (হৃদয়াভ্যন্তরে কুফরী বা পাপ লুকানো থাকলে এর) হিসাব-নিকাশ আল্লাহর জিম্মায়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩১৮, ই, ফা,)

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন- فتوهم طائفة من الصحابة أن مراده أن مجرد هذه الكلمة يعصم الدم حتى توقفوا في قتال من منع الزكاة، حتى بين لهم أبو بكر - ورجع الصحابة إلى قوله : أن المراد الكلمتان بحقوقهما ولوازمهما، وهو الإتيان ببقية مباني الإسلام
'কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম মনে করেন, এর (উল্লিখিত হাদীস) ব্যাখ্যা হলো, শুধু এ কালিমা পড়ে নেওয়া মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারে। এ কারণে, তাঁরা যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপর (প্রথমে) দ্বিধাবোধ করলেন। যখন আবু বকর রাযি. তাঁদেরকে (এ হাদীসের উদ্দেশ্য) বর্ণনা করলেন, সাহাবায়ে কেরামগণও তাঁর কথায় একমত পোষণ করলেন। এর ব্যাখ্যা হলো- এগুলো এমন দু'টি বাক্য; যা তার দাবি ও শর্তাবলিসহ প্রযোজ্য। আর তা হলো, ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিষয়সমূহ পালন করা।'

এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে, নবী (ﷺ) এর ওফাতের পর যখন জাযিরাতুল আরবে ইরতিদাদের ফেতনা মাথা চড়া দিয়ে ওঠে, তখন এসবের মধ্যে অন্যতম ছিল যাকাত অস্বীকারকারীদের দল। তাদের মাঝে এমন মানুষও ছিল, যারা যাকাত অস্বীকার করত না; তবে বলত যে, যাকাত নেওয়া রাসূল (ﷺ) এরই বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই এখন আমরা নিজেরাই যাকাত আদায় করব। হযরত আবূ বকরকে (জমা) দেব না। এ কারণেই হযরত আবূ বকর রাযি. তাদের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

قَالَ أَبُو بَكْرٍ: وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ؛ فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ الْمَالِ
'হযরত আবু বকর রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম! তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়িই আমি যুদ্ধ করবো, যারা সালাত ও যাকাতের মাঝে পার্থক্য করবে। কেননা, যাকাত হল সম্পদের উপর আরোপিত হক।'

সে সময় হযরত উমর রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি কালিমা পাঠ করেছে, তার জান-মাল নিরাপদ হয়ে গেছে। তখন আবু বকর রাযি. এ হাদীসের দলিল দিয়ে বলেন, সেই হাদীসে আছে, অর্থাৎ তার জান-মাল নিরাপদ থাকবে না, যে কালিমা পড়ার পরও ইসলামের হকসমূহ আদায় করেনি। আর যাকাত হলো ইসলামের হক। তাই আমি তাদের সাথে ততদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করব, যতদিন পর্যন্ত না তারা যাকাত আদায় করবে। এমনকি একটি উটের রশিও যদি তারা না দেয়, যা রাসূলের যুগে দিত; তার জন্যও যুদ্ধ চলবে। এ কথা শুনে উমর রাযি.ও একমত হলেন। বললেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা আবূ বকর রাযি. এর হৃদয়ের দ্বার খুলে দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বলতেন, আবূ বকরই আমাদেরকে ইরতিদাদ থেকে বাঁচিয়েছেন।

তেমনি এ হাদীসের ব্যাখ্যা করে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে বলেন- وقَدْ وَرَدَتِ الْأَحَادِيثُ بِذَلِكَ زَائِدًا بَعْضُهَا عَلَى بَعْضٍ فَفِي حَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ الِاقْتِصَارُ عَلَى قَوْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَفِي حَدِيثِهِ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ عِنْدَ مُسْلِمٍ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَفِي حَدِيثِ بْنِ عُمَرَ مَا ذَكَرْتُ وَفِي حَدِيثِ أَنَسٍ الْمَاضِي فِي أَبْوَابِ الْقِبْلَةِ فَإِذَا صَلَّوْا وَاسْتَقْبَلُوا وَأَكَلُوا ذَبِيحَتَنَا قَالَ الطَّبَرِيُّ وَغَيْرُهُ أَمَّا الْأَوَّلُ فَقَالَهُ فِي حَالَةِ قِتَالِهِ لِأَهْلِ الْأَوْثَانِ الَّذِينَ لَا يُقَرُّونَ بِالتَّوْحِيدِ وَأَمَّا الثَّانِي فَقَالَهُ فِي حَالَةِ قِتَالِ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِينَ يَعْتَرِفُونَ بِالتَّوْحِيدِ وَيَجْحَدُونَ نُبُوَّتَهُ عُمُومًا أَوْ خُصُوصًا وَأَمَّا الثَّالثُ فَفِيهِ الْإِشَارَةُ إِلَى أَنَّ مَنْ دَخَلَ فِي الْإِسْلَامِ وَشَهِدَ بِالتَّوْحِيدِ وَبِالنُّبُوَّةِ وَلَمْ يَعْمَلْ بِالطَّاعَاتِ أَنَّ حُكْمَهُمْ أَنْ يُقَاتَلُوا حَتَّى يُذْعِنُوا إِلَى ذَلِكَ وَقَدْ تَقَدَّمَتِ الْإِشَارَةُ إِلَى شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ فِي أَبْوَابِ الْقِبْلَةِ. (ফাতহুল বারী, খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-১১২, শামেলা)

'উল্লিখিত হাদীস বিভিন্ন শব্দে বর্ধিত হয়ে এসেছে। হযরত আবূ হুরাইরার হাদীসে শুধু 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' উল্লেখ আছে। আবার তাঁরই (বর্ণিত) হাদীস সহীহ মুসলিমে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর সাথে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহও উল্লেখ আছে এবং ইবনে উমরের হাদীসে, যা আমি উল্লেখ করেছি। হযরত আনাস রাযি. এর হাদীসে কালিমারের সাথে সালাত, কেবলা ও জবাইকৃত জন্তুর কথাও উল্লেখ আছে। ইমাম তবারী রহ. বলেন, প্রথম বর্ণনাটি মূর্তিপূজারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে এসেছে, যারা তাওহীদকেই অস্বীকার করে। দ্বিতীয় বর্ণনাটি এসেছে আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে, যারা তাওহীদের স্বীকারোক্তি তো দেয়; তবে নবী (ﷺ) এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে। তৃতীয় বর্ণনাটি তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা ঈমান এনেছে তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি; তবে আল্লাহর দেওয়া ফরযসমূহ পালন করেনি। তাদের ব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশ হলো, তাদের বিরুদ্ধে ততদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করতে হবে, যতদিন না তারা ফরয পালন আরম্ভ করবে। এ জাতীয় অধ্যায়গুলোর বিষয়ে পূর্বে কিছু ইশারা-ইঙ্গিত অতিবাহিত হয়েছে।'

মুখে কালিমা পড়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম বিস্তারিত এভাবে বলেছেন, ইমাম তহাবী রহ. 'শারহু মা'আনিল আসার' এ বলেন-
وَحَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي دَاوُدَ، قَالَ : ثنا عَمْرُو بْنُ مَرْزُوقٍ، قَالَ : ثنا شُعْبَةُ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مُرَّةَ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَلَمَةَ عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَسَّالٍ أَنَّ يَهُودِيًّا قَالَ لِصَاحِبِهِ : تَعَالَ نَسْأَلْ هَذَا النَّبِيَّ، فَقَالَ لَهُ الْآخَرُ: لَا تَقُلْ لَهُ نَبِيٌّ، فَإِنَّهُ إِنْ سَمِعَهَا صَارَتْ لَهُ أَرْبَعَةُ أَعْيُنٌ، فَأَتَاهُ فَسَأَلَهُ عَنْ هَذِهِ الْآيَةِ ﴿ وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ ﴾ ﴿الإسراء : ১০১﴾ فَقَالَ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَلَا تَسْرِقُوا ، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَسْحَرُوا ، وَلَا تَأْكُلُوا الرَّبَّا، وَلَا تَمْشُوا بِبَرِيءٍ إِلَى سُلْطَانٍ لِيَقْتُلَهُ، وَلَا تَقْذِفُوا الْمُحْصَنَةَ، وَلَا تَفِرُّوا مِنَ الرَّحْفِ، وَعَلَيْكُمْ خَاصَّةَ الْيَهُودِ ، أَنْ لَا تَعْدُوا فِي السَّبْتِ قَالَ: فَقَبَّلُوا يَدَهُ، وَقَالُوا: نَشْهَدُ أَنَّكَ نَبِيُّ، قَالَ فَمَا يَمْنَعُكُمْ أَنْ تَتْبَعُونِي؟ قَالُوا : إِنَّ دَاوُدَ دَعَا أَنْ لَا يَزَالَ فِي ذُرِّيَّتِهِ نَبِيٌّ، وَإِنَّا نَخْشَى إِنِ اتَّبَعْنَاكَ، أَنْ تَقْتُلَنَا الْيَهُودُ.

'হযরত সফওয়ান ইবনে আসসাল থেকে বর্ণিত, এক ইয়াহুদী তার বন্ধুকে বলল, আস! এই নবীর কাছে কিছু প্রশ্ন করি। দ্বিতীয়জন বলল, নবী বলো না। তিনি শুনে ফেললে আবার খুশিতে বাগবাগ হয়ে যাবেন। তখন তারা দু'জন নবী কারীম (ﷺ) এর কাছে এল। কুরআনের আয়াত- وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ ﴿الإسراء: 101﴾ - 'আমি মুসাকে নয়টি প্রকাশ্য নিদর্শন দান করেছি' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। নবী কারীম (ﷺ) এর উত্তরে বললেন, নয়টি নিদর্শন হলো এই- আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না, আল্লাহ তা'আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; তবে কোনো দন্ডবিধির কারণে হত্যা করা যাবে, চুরি করো না, ব্যভিচার করো না, জাদু করো না, সুদ খেয়ো না, কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে যেও না, সতী-সাধ্বী নারীদেরকে অপবাদ দিও না, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পালিয়ে যেও না, ইয়াহুদীদের জন্য আলাদা হুকুম হলো, তারা শনিবারে অবাধ্যতা থেকে মুক্ত থাকবে। তখন সেই দুই ইয়াহুদী রাসূল (ﷺ) এর হাতে চুমো খেল এবং বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর নবী। রাসূল বললেন, তারপরও কেন তোমরা আমার অনুসরণ করছ না? তারা বলল, দাউদ আ. আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন, তাঁর সন্তান-সন্তুতিতে সব সময় নবী থাকবে। সুতরাং আমাদের আশংকা হয়, আমরা আপনার অনুসরণ করলে ইয়াহুদীরা আমাদের হত্যা করে ফেলবে।'

ইমাম তহাবী রহ. বলেন, এ হাদীসের মধ্যে ইয়াহুদীরা আল্লাহর তাওহীদের স্বীকারোক্তি দেওয়ার সাথে সাথে নবী কারীম (ﷺ) এর নবুওয়াতকেও স্বীকার করে নিয়েছিল। তারপরও তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে বলেননি, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা অন্যান্য মুসলমানের মতো সেই বিষয়াবলি মেনে নেয়; যা মানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক।

সুতরাং বুঝা যায়, ইয়াহুদীরা সেই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে মুসলমান হয়ে যায়নি। এ কথাও প্রমাণিত হলো যে, সেসব বিষয় ছাড়া ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়, যা ইসলামে প্রবেশের উপর বুঝায়। আর সব ধর্ম ত্যাগ না করলে ইসলামে প্রবেশ করা যায় না। এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল থেকে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. একটি হাদীসও বর্ণনা করেছেন। (শারহু মা'আনিল আসার', হাদীস নং-৪৭৩৮ খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২১৫, শামেলা)

এ ব্যাপারে ইমাম তহাবী রহ. আরও বলেন-
حَدَّثَنَا ابْنُ مَرْزُوقٍ، قَالَ : ثنا عَبْدُ اللهِ بْنُ بَكْرٍ ، قَالَ : ثنا بَرُ بْنُ حَكِيمٍ، عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِهِ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا آيَةُ الْإِسْلَامِ؟ قَالَ أَنْ تَقُولَ أَسْلَمْتُ وَجْهِي لِلَّهِ، وَتَخَلَّيْتُ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ وَتُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ

'বাহায ইবনে হাকীম তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ﷺ)! ইসলামের নিদর্শনাবলি কী কী? তিনি বললেন, তোমরা বলো, আমি নিজের চেহারা আল্লাহর সামনে ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। সব ধর্মকে পরিত্যাগ করেছি। তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো। আর মুশরিকদের সাথে বসবাস ছেড়ে মুসলমানদের কাছে চলে এসো।

ইমাম তহাবী রহ. বলেন, এ অর্থ সব ধর্ম ছেড়ে দেওয়া। এর দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত বাকি সব দ্বীন পরিত্যাগ করবে না, সে ইসলামে প্রবেশ করেছে বলে ধর্তব্য হবে না। এটি ইমাম আবু হানিফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ. এর মতামত।' (শারহু মা'আনিল আসার', হাদীস নং-৪৭৪১, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২১৬, শামেলা)

বিস্তারিত আলোচনায় এ কথা প্রতিভাত হয় যে, কালিমার কিছু দাবি আছে, যা পূর্ণ করা ব্যতীত এ কালিমার প্রতি বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য হবে না।

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 ইলাহের সংজ্ঞা

📄 ইলাহের সংজ্ঞা


এখানে কালিমায়ে তায়্যিবার অর্থ সংক্ষেপে আলোচনা করা সমীচীন মনে করছি। ইমাম রাগেব ইস্পাহানী বলেন- وإله جَعَلُوهُ اسْمًا لِكُلِّ مَعْبُودٍ لَهُمْ، وَكَذَا اللَّاتُ، وَسَمَّوُا الشَّمْسَ إِلَاهَةً لِاتِّخَاذِهِمْ إِيَّاهَا مَعْبُودًا.
'তারা (কাফেররা) তাদের সব প্রভুকে ইলাহ (উপাস্য) নামকরণ করেছে। আর এমনিভাবে লাতকে। সূর্যকেও তারা ইলাহ নামকরণ করেছিল। কারণ, তারা সেটাকেও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং ইলাহ অর্থ এখানে উপাস্য।'

আল্লামা ইবনে জারীর তবারী রহ. ﴿مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي﴾ আয়াতের তাফসীরে বলেন- أي شيء تعبدون من بعدي"؟ أي من بعد وفاتي؟ قالوا : "نعبد إلهك"، يعني به قال بنوه له : نعبد معبودك الذي تعبده، ومعبود آبائك إبراهيم وإسماعيل وإسحاق، "إلها واحدا"
'হযরত ইয়াকুব আ. যখন স্বীয় সন্তানদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা আমার মৃত্যুর পর কার ইবাদত করবে? তখন তাঁরা উত্তর দিল, আমরা আপনার উপাস্য, আপনার পিতা-পিতামহ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক আ. এর উপাস্যের ইবাদত করব। যিনি একমাত্র ইলাহ।'

আল্লামা ইবনে জারীর তবারী রহ.ও এখানে ইলাহের অর্থ উপাস্য করেছেন।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন- أما كفار قريش كانوا يطلقونه في حق الأصنام 'কুরাইশের কাফেররা ইলাহ শব্দটি উপাস্য অর্থে ব্যবহার করত।'

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন- الإله هو المعبود المطاع فهو إله بمعنى مالوه 'ইলাহ সেই উপাস্য, যার অনুসরণ করা হয়। সুতরাং ইলাহ উপাস্য অর্থেই ব্যবহৃত হয়।'

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন- الإله هو الذي تأله القلوب محبة وإجلالا وإنابة وإكراما وتعظيما وخوفا ورجاء وتوكلا 'ইলাহ সেই সত্তা; যার সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক থাকে, ভালোবাসা-বড়ত্বের ক্ষেত্রে, আশ্রয় প্রার্থনা ও সম্মানদানের ক্ষেত্রে, ভয় ও আশা-ভরসার ক্ষেত্রে।'

আব্দুল কাদের জিলানী রহ. ইলাহের সংজ্ঞা দেন এভাবে- 'আজ তুমি ভরসা করছ নিজের উপর, নিজের টাকা-পয়সা, দিনার-দেরহামের উপর, নিজের কেনাকেটা ও স্বীয় শহরের প্রশাসকের উপর। যে বস্তুর উপরই তুমি ভরসা করবে, সেটিই তোমার উপাস্য। যে ব্যক্তিকে তুমি ভয় কর; কিংবা যার কাছে কোনো কিছু আশা কর, সেই তোমার উপাস্য। যে ব্যক্তিকে তুমি লাভ-ক্ষতির মালিক মনে কর, সেই তোমার উপাস্য। সুতরাং অনুধাবন কর, আল্লাহ তা'আলাই স্বীয় কুদরতে এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে তিনিই তোমার উপাস্য।'

'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু'র চুক্তিই তো এ জন্য যে, আল্লাহ ছাড়া কাউকেই উপাস্যের স্থানে বসানো যাবে না। আর তখনই গিয়ে ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে।

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 উপাসনা কার জন্য?

📄 উপাসনা কার জন্য?


উল্লিখিত আলোচনায় এ কথা প্রতিভাত হয় যে, ইলাহ অর্থ উপাস্য। অর্থাৎ যার উপাসনা করা হয়। এরপরে সমীচীন মনে হচ্ছে যে, উপাসনার সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করা। কারণ, আমাদের সমাজে উপাসনা বলতে বুঝায়, কেউ কাউকে সিজদা করা বা পূজা করা। অথচ শরীয়াহর ভাষায় তা আরও ব্যাপক।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿التوبة: ٣١﴾

"তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র।” (সূরা তাওবা : ৩১)

এ আয়াত সেসব খৃষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা আইন রচনা (হারাম, হালাল, বৈধতা-অবৈধতা) এর অধিকার নিজেদের পাদ্রীদেরকে সোপর্দ করেছে। যেটাকে তারা হালাল করে দিতেন, তাদের অনুসারীরাও তাকে হালাল বানিয়ে ফেলত; অথচ আল্লাহ তা'আলা তা হারাম করেছিলেন। তেমনি (তাদের) সেই সম্মানিত ও অভিজাতশ্রেণী যা হারাম ঘোষণা করত, মানুষও সেটাকে হারাম বানিয়ে ফেলত; অথচ আল্লাহ তা হালাল করেছিলেন।

এ আয়াতের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে অধিকাংশ মুফাসসির এ ঘটনা বর্ণনা করেন যে, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন আদী ইবনে হাতিম রাযি. যিনি ইতঃপূর্বে খৃষ্টান ছিলেন, রাসূল (ﷺ) কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো তাদেরকে উপাস্য বানাতাম না। রাসূল (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেছেন, তারা তা হারাম করত আর তোমরাও তা হারাম মানতে এবং আল্লাহ তা'আলা যা হারাম করেছেন, তারা তা হালাল করত আর তোমরাও তাকে হালাল ভাবতে। তখন আদী ইবনে হাতিম রাযি. বললেন, হ্যাঁ এমনটিই। তিনি বললেন, এটিই তাদের ইবাদত।

রাসূল (ﷺ) এ তাফসীরের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, কাউকে আইন রচনার ক্ষমতা দেওয়ার অর্থ হলো, তার উপাসনা করা।

📘 ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র > 📄 চিন্তার খোরাক

📄 চিন্তার খোরাক


গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কি পার্লামেন্টকে এ অধিকার দেওয়া হয়নি? গণতন্ত্রের প্রবক্তারা কি এ কথা দাবি করে না?—আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তো পার্লামেন্টের হাতে। তাছাড়া গণতান্ত্রিক সরকারগুলোতে বাস্তবেও কি এমন হচ্ছে না যে, সরকার যেটি ইচ্ছা হালাল করছে, যেটি ইচ্ছা নিষিদ্ধ করছে? তার আনুগত্য করা আবশ্যক করা হচ্ছে, তার বিরোধীদেরকে রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী এবং অস্বীকারকারীদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা হচ্ছে??

পূর্বে হোক বা পশ্চিমে, এটিই গণতন্ত্রের বাস্তবতা। সফলতার গ্যারান্টিদাতা (?) আসল গণতন্ত্রের প্রাণ এটিই। কয়েক ক্লাস পড়েছে আর এই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা জানে না এমন কেউ কি আছে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আসল প্রাণ হলো, আইন প্রণয়নের অধিকার নিরঙ্কুশভাবে পার্লামেন্টকে সোপর্দ করা।

এখন যদি কেউ বলে, পার্লামেন্ট তিয়াত্তরের আইন মেনেই চলে, যেখানে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আল্লাহর জন্য স্বীকার করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই যে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আল্লাহর জন্য—এটি কে মঞ্জুর করেছে? নিশ্চয় সেই পার্লামেন্টই। পৃথিবীতে কি এমন কোনো গণতন্ত্র আছে, যেখানে পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ক্ষমতাটি আল্লাহকে দেওয়া হয়েছে? যারাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও এর মূল প্রতিপাদ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা এ প্রশ্নের জবাব ভালোভাবেই জানে। এ ব্যবস্থা যদি এতই ইসলামী হয়, এসব যদি এতই ইসলামী হয়; তো রজম তথা প্রস্তর নিক্ষেপের শরীয়াহ আইনকে আইনে রূপ দেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের মঞ্জুরির বাধ্যবাধকতা কেন রাখা হয়েছে? আর সুদকে অবৈধ (হারাম) সাব্যস্ত করার জন্য পার্লামেন্ট নয় শুধু, বরং দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোট কেন লাগবে?

পরিষ্কার কথা হলো, এ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতা কে? যিনি মঞ্জুর করেন এবং যাকে মঞ্জুরির যোগ্য মনে করা হয়। মঞ্জুরি পেলে তো ভালো। অন্যথায় রদ করে দিলেও সংবিধানের পবিত্রতায় (গণতন্ত্রপূজারিদের দৃষ্টিতে) কোনো ঘাটতি আসে না। সুতরাং ভাবুন!

এ পার্লামেন্ট নিজের কাজের মাধ্যমে এ কথা বারবার প্রমাণ করছে যে, তার সামনে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ তথা আইন প্রণয়নের ক্ষমতার কী মর্যাদা আছে? যেমন সুদ, বিবাহিত ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ, মুসলমানদের হত্যায় কাফেরদের সাহায্য করা, নির্লজ্জতা ও নাস্তিকতা প্রসারকারী ব্যক্তি ও মাধ্যমগুলোর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দান, সুদব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি প্রদান; বরং এটি ইবাদত মনে করা, শরীয়াহ বাস্তবায়নে লড়াইকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে জিহাদ বলা, ইসলামের অটুট বিধান জিহাদকে অবৈধ ঘোষণা করা ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে পার্লামেন্ট এ কথা প্রমাণ করেছে যে, আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তাদেরই হাতে, আল্লাহর হাতে নয়। (নাউযুবিল্লাহ!)

এত স্পষ্ট কর্মপদ্ধতি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দ্বীন, কুরআন ও তাঁর নবীর আনীত শরীয়াহর বিরুদ্ধে (গণতন্ত্রপন্থীরা) এমন দুঃসাহস দেখাচ্ছে যে, প্রত্যেক কুফরীর উপর ইসলামের লেবেল লাগিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করা হচ্ছে। যদি কোনো কিছু (এ ব্যবস্থায়) গ্রহণ না করা হয়ে থাকে, তবে তা হলো আল্লাহর শরীয়াহ; যেটিকে তিনি সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। এটিকে সম্পূর্ণ আইন-কানুন মেনে নেওয়ার পরিবর্তে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লড়াই, জাতীয় পর্যায়ের দমন অভিযান, নিরপরাধ মুসলমানদেরকে গণহত্যা, তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। আচ্ছা, যদি তোমাদের সংবিধানই ইসলাম হয়, তো কুরআনের আইন-কানুনকে পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া মেনে নাও না কেন?

আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা দু'দিনের এ তুচ্ছ জীবনের স্বার্থে কুরআন বিক্রয় করো না। আল্লাহর আয়াতসমূহকে তার আসল অর্থ ও তাৎপর্য থেকে সরিয়ে কুরআন-বিকৃতির অপরাধে জড়িত হইও না। সত্যের প্রতি জোর দেওয়ার সাহস যদি তোমার নাও থাকে, বা তোমার কোনো ওজর থাকে; তাহলে অন্তত এতটুকু তো করতে পার যে, মুখটা বন্ধ করে চুপ মেরে থাকবে। হকের আজান দিতে পারছ না, তাতে সমর্থন দিতে পারছ না, তাতে সঙ্গ দিতে পারছ না; তো অন্তত: কুফরকে ইসলাম প্রমাণ করা থেকে বিরত থাক। পরাশক্তিগুলোর ভয় আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কায় ইসলাম আর কুফরকে তো এক করে ফেলতে পারো না! সিংহভাগ কুফর আর একটু ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলা থেকে বিরত থাক! আমরা জানি, তোমাদের উপর গোপন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চাপ ও তোমাদের অপারগতার কথা। এতটুকুতেই থামো! আল্লাহর জন্য থামো! কুফর ও তাকফীরের বিষয়গুলোর মধ্যে কুফর ও ইসলামকে গুলিয়ে ফেলো না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের প্রসিদ্ধ নীতি হলো, কোনো কথা বা কাজের কুফরী হওয়া এবং তাতে জড়িত ব্যক্তিকে কাফের বলা—দু'টি আলাদা মাসআলা। এ কথায় আমরা শতভাগ একমত যে, কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তিকে কাফের বলার ক্ষেত্রে উলামায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত যেসব শর্তাবলি আরোপ করেছেন, তা আমাদেরও আকীদা। আল-হামদুলিল্লাহ, আমরা আজও সেই আকীদার উপর অটল আছি। কিন্তু তোমরা তো কুফরকে ইসলাম প্রমাণ করতে চাচ্ছ। কুফরের পক্ষে প্রতিরোধ গড়তেই কুফরের প্রতিবন্ধকতাসমূহের দলিল দিচ্ছ। এখানে একটি পার্থক্য জেনে রাখবে যে, কুফরীতে লিপ্ত কোনো ব্যক্তিকে কাফের বলতে অনেক শর্ত আছে—এ কথার অর্থ এই নয় যে, সেই কুফরী কাজ বা কথাটি ইসলাম হয়ে গিয়েছে। এটি খুব ভালোভাবে বুঝে নাও। তোমরা জেনেশুনেই পুরো আলোচনায় বিষয়টা গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করছ। আল্লাহ তা'আলা তা ভালোভাবেই জানেন। তোমরা মানুষকে কুফরী থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাদের কুফরীগুলোকেই ইসলাম প্রমাণ করার চেষ্টা করছ। যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কারো আকীদা নয়। আল্লাহর সাথে সরাসরি কুফরীকে ইসলাম প্রমাণ করা—এটি খৃষ্টানদের সেই কথা থেকেও মারাত্মক, যা তারা আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে বলেছে।

وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا ﴿৮৮﴾ لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًا ﴿৮৯﴾ تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا ﴿৯০﴾ أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا ﴿৯১﴾ وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا ﴿৯২﴾

"আর তারা বলে, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয় তোমরা তো এক অদ্ভুত কান্ড করেছ। হয়তো এর কারণে এখনই নভোমন্ডল ফেটে পড়বে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হবে। এ কারণে যে, তারা দয়াময় আল্লাহর জন্য সন্তান আহবান করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়।" (সূরা মারইয়াম : ৮৮-৯২)

সুতরাং একটি সরাসরি কুফরীব্যবস্থা (গণতন্ত্র) কে ইসলামী প্রমাণ করা কত বড় অপরাধ? যদি তোমরা তা বুঝতে পারতে!!!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00