📘 ডিপ্রেশন কারণ ও প্রতিকার > 📄 ডিপ্রেশন প্রতিরোধে বাইশটি উপায়

📄 ডিপ্রেশন প্রতিরোধে বাইশটি উপায়


এক. নেক কাজ সম্বলিত ইমানের দ্বারা সজ্জিত হওয়া।
মহান আল্লাহ বলেন—
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةٌ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
পুরুষ বা নারীর মধ্য থেকে যে-ই মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত, তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদের উত্তম প্রতিদান দেবো।[২২]
এটার কারণ স্পষ্ট। কারণ, আল্লাহ তাআলার প্রতি যারা সঠিকভাবে ইমান আনে এবং সৎকর্মপালন বাড়িয়ে দেয়, যা মানুষের অন্তর, চরিত্র, দুনিয়া ও আখিরাতকে সংশোধন করে, তাদের মধ্যে এমন নীতি ও বিশ্বাস থাকে, যা দ্বারা তারা তাদের ওপর আপতিত সকল বিপদাপদ ও দুশ্চিন্তার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
তারা রবের প্রদত্ত সকল নিয়ামত ও উন্নতিকে উত্তমরূপে গ্রহণ করে; এর জন্য প্রশংসাজ্ঞাপন করে; এগুলোকে উপকারী ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। যখন তারা এই কাজগুলো করে, তখন নিয়ামতের প্রাচুর্যতার স্বাদ অনুভব করে। তারা আশা করে, যাতে এগুলো তাদের মাঝে সর্বদা টিকে থাকে; এগুলো থেকে বরকত লাভ ও এগুলোর কৃতজ্ঞতার প্রতিদানপ্রাপ্তি এবং সাথে আরও অনেক মহৎ বিষয় অর্জনের আশা করে, যা এসব নিয়ামতের কল্যাণ ও বরকত থেকেও অনেক বড়। অপরদিকে তারা সকল মন্দ, ক্ষতিকর বিষয়, দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতার মধ্য থেকে যেগুলোকে প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেগুলোকে প্রতিরোধ করে; যেগুলোকে হ্রাস করা সম্ভব, সেগুলোকে হ্রাস করে। আর যেগুলো থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই, সেগুলোর জন্য উত্তমরূপে ধৈর্যধারণ করে। ফলে তারা এই বিপদের প্রতিদানস্বরূপ অনেক কল্যাণ লাভ করে থাকে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কল্যাণকর প্রতিরোধ, উপকারী অভিজ্ঞতা, মনের মধ্যে দৃঢ়তা অর্জিত হওয়া। সেই সাথে ধৈর্যধারণ করা এবং এটার প্রতিদান ও সওয়াবের প্রত্যাশা করা। এছাড়া আরও অনেক উত্তম ফায়েদা রয়েছে, যা এই বিপদের সাথে অন্তর্নিহিত থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের পর রয়েছে অনেক অনেক স্বস্তি ও উত্তম আশা এবং আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদা ও প্রতিদান প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা। যেমনটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
عَجَباً لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْراً لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْراً لَهُ.
মুমিনের ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক। তার সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ব্যতীত কারও জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যবস্থা নেই। তারা আনন্দ (সুখ-শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে; এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।[২৩]
এভাবেই বিভিন্ন বিপদাপদে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা হয়।
দুই. দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা আপতিত হওয়ার ফলে মুসলিম ব্যক্তির অর্জিত গুনাহ মার্জনা, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টিপাত করা।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمَّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمِّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ.
মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও বিষণ্ণতা আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফোটে, এ সব কিছুর দ্বারাই আল্লাহ তার গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেন।[২৪]
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে:
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنَ مِنْ وَصَبٍ وَلَا نَصَبٍ وَلَا سَقَمٍ وَلَا حَزَنٍ حَتَّى الْهَمَّ يُهَمُّهُ إِلَّا كُفَّرَ بِهِ مِنْ سَيِّئَاتِهِ.
মুমিন ব্যক্তিকে যত কষ্ট-ক্লেশ, ব্যথা-বেদনা, রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট এমনকি দুশ্চিন্তা— যা তাকে চিন্তিত-বিষণ্ণ করে তোলে— আক্রান্ত করে, এর বিনিময়ে তার কোনো না কোনো গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।[২৫]
সকল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি যেন জেনে রাখে, দুশ্চিন্তার ফলে তার যে মানসিক কষ্ট হয়, তা বৃথা যাবে না। বরং এটা তার প্রতিদান বৃদ্ধি ও গুনাহ ক্ষমা করার ক্ষেত্রে অনেক কার্যকরী প্রমাণিত হবে। প্রতিটি মুসলিমের জেনে রাখা উচিত, যদি বিপদ না আসত, তাহলে কিয়ামতের দিন আমরা সাওয়াব-শূন্য অবস্থায় উত্থিত হতাম, যেমনটা সালাফগণ বলেছেন। তাই তাঁরা বিপদে তেমনই খুশি হতেন, যেভাবে আমরা প্রাচুর্যতায় খুশি হই।
যখন আল্লাহর কোনো বান্দা এটা জানতে পারবে যে, তার ওপর আপতিত সকল বিপদই তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়, তখন সে খুশি হবে ও সুসংবাদ গ্রহণ করবে। বিশেষত যদি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরই তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তি আপতিত হয়; যা কোনো কোনো সাহাবির ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
رواه عَبْد اللهِ بْن مُغَفَّل رضي الله عنه أَنَّ رَجُلا لَقِيَ امْرَأَةً كَانَتْ بَغِيًّا فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَجَعَلَ يُلاعِبُهَا حَتَّى بَسَطَ يَدَهُ إِلَيْهَا فَقَالَتِ الْمَرْأَةُ مَهُ فَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ ذَهَبَ بِالشَّرْكِ وَقَالَ عَفَّانُ مَرَّةً ذَهَبَ بِالْجَاهِلِيَّةِ وَجَاءَنَا بالإِسْلامِ فَوَلَّى الرَّجُلُ فَأَصَابَ وَجْهَهُ الْحَائِطُ فَشَجَّهُ ثُمَّ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ فَقَالَ أَنْتَ عَبْدُ أَرَادَ اللَّهُ بِكَ خَيْرًا إِذَا أَرَادَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِعَبْدٍ خَيْراً عَجَلَ لَهُ عُقُوبَةَ ذَنْبِهِ وَإِذَا أَرَادَ بِعَبْدٍ شَرًا أَمْسَكَ عَلَيْهِ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَفَّى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُ عَيْرِ.
আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি এক নারীর সাথে সাক্ষাৎ করল, যে জাহিলিয়াতের যুগে পতিতা ছিল। সে তার সাথে খেলা করতে শুরু করল একসময় (ব্যভিচারের জন্য) তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তখন মহিলাটি বলল, থামো; নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শিরককে মিটিয়ে দিয়েছেন। আফফান (হাদিসটির একজন বর্ণনাকারী) একবার বলেন, জাহিলিয়াতকে (জাহিলিয়াতের যুগের পাপকে) দূর করে দিয়েছেন; এবং আমাদের কাছে ইসলাম নিয়ে এসেছেন। তখন সে ব্যক্তিটি ফিরে চলে গেল। তখন তার চেহারা দেয়ালের সাথে আঘাত খেয়ে ফেটে যায়। অতঃপর সে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের কাছে এসে এই ঘটনা জানায়। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি আল্লাহর এমন বান্দা, যার মঙ্গল কামনা করা হয়েছে। যখন আল্লাহ তাঁর বান্দার মঙ্গল চান, তখন তিনি তাকে তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে (পাপের) শাস্তি দিয়ে দেন। আর যখন আল্লাহ তাঁর বান্দার অমঙ্গল চান, তখন তিনি তাকে (শাস্তিদানে) বিরত থাকেন। পরিশেষে কিয়ামতের দিন তাকে পুরোপুরি শাস্তি দেবেন।[২৬]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
إن الله إذا أراد بعبد خيراً عجل له العقوبة في الدنيا، وإذا أراد بعبد شراً أمسك عنه حتى يوافى يوم القيامة بذنبه
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে দুনিয়াতেই ত্বরিত শাস্তি দিয়ে দেন। আর তিনি যখন কোনো বান্দার অকল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তার গুনাহের শাস্তি প্রদান থেকে বিরত থাকেন। অবশেষে কিয়ামতের দিন তাকে গুনাহের পরিপূর্ণ বদলা দিয়ে দেবেন।[২৭]
তিন. দুনিয়ার বাস্তবতা অনুধাবন করা।
যখন মুমিন ব্যক্তি জানতে পারবে যে, দুনিয়া ধ্বংসশীল এবং এটার সুখ অনেক স্বল্প; এটার স্বাদ অনেক তিক্ত, যা কারোর জন্যই সুস্বাদু নয়। এটা স্বল্প হাসায়; কিন্তু অনেক কাঁদায়; দেয় অল্প কিছু, কিন্তু বহু কিছু রুখে দেয়। মুমিন এই দুনিয়াতে বন্দির মতো। যেমনটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফিরের জন্য জান্নাত (স্বরূপ)।[২৮]
দুনিয়া হল কষ্ট, দুর্দশা, বিপদ ও মুসিবতের স্থান। তাই মুমিন যখন দুনিয়া ছেড়ে যায়, তখন সে প্রশান্তি লাভ করে। যেমনটা হাদিসে এসেছে :
عن أَبي قَتَادَةَ بْنِ رِبْعِيُّ الأَنْصَارِيِّ أَنَّهُ كَانَ يُحَدِّثُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُرَّ عَلَيْهِ بِجِنَازَةٍ فَقَالَ مُسْتَرِيحُ وَمُسْتَرَاحُ مِنْهُ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْمُسْتَرِيحُ وَالْمُسْتَرَاحُ مِنْهُ قَالَ الْعَبْدُ الْمُؤْمِنُ يَسْتَرِيحُ مِنْ نَصَبِ الدُّنْيَا وَأَذَاهَا إِلَى رَحْمَةِ اللهِ وَالْعَبْدُ الْفَاجِرُ يَسْتَرِيحُ مِنْهُ الْعِبَادُ وَالْبِلادُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ.
আবু কাতাদা বিন রিবইয়ি আনসারি রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি হাদিস বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি বললেন, 'মুসতারিহ' ও 'মুসতারাহ মিনহু'। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! 'মুসতারিহ' ও 'মুসতারাহ মিনহু'-এর অর্থ কী? তিনি বললেন, মুমিন বান্দা দুনিয়ার কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে পৌঁছে (মুসতারিহ) শান্তিপ্রাপ্ত হয়। আর গুনাহগার বান্দার আচার-আচরণ থেকে সকল মানুষ, শহর-বন্দর, বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু (মুসতারাহ মিনহু) শান্তিপ্রাপ্ত হয়।[২৯]
একজন মুমিনের মৃত্যু তার জন্য দুনিয়ার সকল দুশ্চিন্তা-পেরেশানি ও কষ্ট থেকে মুক্তির মাধ্যম হয়। যেমনটা হাদিসে এসেছে:
إِذَا حُضِرَ الْمُؤْمِنُ أَتَتْهُ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ بِحَرِيرَةٍ بَيْضَاءَ فَيَقُولُونَ اخْرُجِي رَاضِيَةً مَرْضِيّاً عَنْكِ إِلَى رَوْحِ اللهِ وَرَيْحَانِ وَرَبُّ غَيْرِ غَضْبَانَ فَتَخْرُجُ كَأَطِيبٍ رِيحِ الْمِسْكِ حَتَّى أَنَّهُ لَيُنَاوِلُهُ بَعْضُهُمْ بَعْضاً حَتَّى يَأْتُونَ بِهِ بَابَ السَّمَاءِ فَيَقُولُونَ مَا أَطْيَبَ هَذِهِ الرِّيحَ الَّتِي جَاءَتْكُمْ مِنَ الْأَرْضِ فَيَأْتُونَ بِهِ أَرْوَاحَ الْمُؤْمِنِينَ فَلَهُمْ أَشَدُّ فَرَحاً بِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ بِغَائِبِهِ يَقْدَمُ عَلَيْهِ فَيَسْأَلُونَهُ مَاذَا فَعَلَ فُلانٌ مَاذَا فَعَلَ فُلانٌ فَيَقُولُونَ دَعُوهُ فَإِنَّهُ كَانَ فِي غَمِّ الدُّنْيَا فَإِذَا قَالَ أَمَا أَتَاكُمْ قَالُوا ذُهِبَ بِهِ إِلَى أُمِّهِ الْهَاوِيَةِ وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا احْتُضِرَ أَتَتْهُ مَلَائِكَةُ الْعَذَابِ بِمِسْحٍ فَيَقُولُونَ اخْرُجِي سَاخِطَةٌ مَسْخُوطاً عَلَيْكِ إِلَى عَذَابِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَتَخْرُجُ كَأَنْتَنِ رِيحِ جِيفَةٍ حَتَّى يَأْتُونَ بِهِ بَابَ الْأَرْضِ فَيَقُولُونَ مَا أَنْتَنَ هَذِهِ الرِّيحَ حَتَّى يَأْتُونَ بِهِ أَرْوَاحَ الْكُفَّارِ.
আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন মুমিনের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন ফেরেশতাগণ সাদা রেশমি কাপড় নিয়ে আসেন এবং রুহকে বলেন, তুমি আল্লাহ তাআলার ওপর সন্তুষ্ট, আল্লাহও তোমার ওপর সন্তুষ্ট— এ অবস্থায় দেহ থেকে বেরিয়ে এসো এবং আল্লাহ তাআলার করুণা ও উত্তম নিয়ামতের দিকে চলো; তিনি তোমার ওপর রাগান্বিত নন। তখন নিসকের খুশবুর মতো রুহ দেহ থেকে বেরিয়ে আসে। ফেরেশতাগণ সম্মানের সাথে তাকে হাতে হাতে নিয়ে চলে। এমনকি আসমানের দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসে। ওখানে ফেরেশতাগণ পরস্পর বলাবলি করেন, কী পবিত্র খুশবু জমিনের দিক থেকে আসছে! তারপর তাকে মুমিনদের রুহের কাছে আনা হয়। ওই রুহগুলো এ রুহটিকে দেখে এভাবে খুশি হয়ে যায়, যেভাবে তোমাদের কেউ সফর থেকে ফিরে এলে তোমরা খুশি হও। তারপর সব রুহ এ রুহটিকে জিজ্ঞেস করে অমুক কী করেছে? তমুক কী করেছে? তারা নিজেরা আবার বলাবলি করে, এখন একে ছেড়ে দাও। এখন সে দুনিয়ার শোকতাপে আছে। তারপর এ রুহ বলে, সে কি তোমাদের কাছে আসেনি? রুহগুলো বলে, তাকে তো তার ঠিকানা তথা হাবিয়া জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তেমনিভাবে কোনো কাফিরের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তার কাছে আজাবের ফেরেশতা শক্ত চটের বিছানা নিয়ে আসেন। আর তার রুহকে বলেন, হে রুহ! আল্লাহর আজাবের দিকে বেরিয়ে এসো— এ অবস্থায় যে, তুমি আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্ট ছিলে, তিনিও তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট। তারপর রুহ তার দেহ থেকে পচা লাশের দুর্গন্ধ নিয়ে বেরিয়ে আসবে। ফেরেশতারা একে জমিনের দরজার দিকে নিয়ে যাবে। সেখানে ফেরেশতাগণ বলবে, কত খারাপ এ দুর্গন্ধ! তারপর এ রুহটিকে কাফিরদের রুহের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।[৩০]
দুনিয়ার এই বাস্তবতা যখন কোনো মুমিন অনুধাবন করতে সক্ষম হবে, তখন তার জন্য দুনিয়ার অনেক বিপদ, দুশ্চিন্তার কষ্ট ও পেরেশানির চাপ সহজ হয়ে যাবে। কারণ, তার এটা জানা থাকবে যে, এটাই দুনিয়ার স্বাভাবিক প্রকৃতি, তাই এমন হওয়া আবশ্যক।
চার. রাসুল ﷺ ও নেককারদের পদাঙ্ক অনুসরণ এবং তাঁদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।
তাঁরাই দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। সবাই দুনিয়াতে তার দ্বীনের পরিমাণ অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে মহব্বত করেন, তখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন। সাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন-
يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءٌ قَالَ الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ فَيُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبٍ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ دِينُهُ صُلْباً اشْتَدَّ بَلاؤُهُ وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رقَة ابْتُلَى عَلَى حَسَبِ دِينِهِ فَمَا يَبْرَحُ البَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَتْرُكْهُ يَمْشِى عَلَى الْأَرْضِ مَا عَلَيْهِ خَطِيئَةُ.
হে আল্লাহর রাসুল! কোন মানুষের সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা হয়? তিনি বললেন, নবিগণের। অতঃপর মর্যাদার দিক থেকে তাদের পরবর্তীদের এবং তাদের পরবর্তীদের। বান্দাকে তার দ্বীনদারির মাত্রা অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। যদি সে তার দ্বীনদারিতে অবিচল হয়, তবে তার পরীক্ষাও হয় ততটা কঠিন। আর যদি সে তার দ্বীনদারিতে নমনীয় হয়, তবে তার পরীক্ষাও তদানুপাতে হয়। অতঃপর বান্দা অহরহ বিপদাপদ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। শেষে সে পৃথিবীর বুকে গুনাহমুক্ত হয়ে পাকসাফ অবস্থায় বিচরণ করে।[৩১]
পাঁচ. বান্দা আখিরাতকে তার মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া।
যাতে আল্লাহ তাআলা তার সকল বিষয়কে সুসংহত করে দেন।
رواه أنس رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللَّهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمْلَهُ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ.
আনাস বিন মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্রিত করে সুসংহত করে দেবেন; তখন তার কাছে দুনিয়াটা নগণ্য হয়ে দেখা দেবে। আর যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির অভাব-অনটন দু'চোখের সামনে লাগিয়ে রাখবেন এবং তার কাজগুলো এলোমেলো ও ছিন্নভিন্ন করে দেবেন; তার জন্য যা নির্দিষ্ট রয়েছে, দুনিয়াতে সে এর চাইতে বেশি পাবে না।[৩২]
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন সকাল-সন্ধ্যার একমাত্র চিন্তা শুধু আল্লাহ তাআলাকে নিয়েই করে, আল্লাহ তাআলা তার সকল প্রয়োজন পূরণের ভার নিয়ে নেন এবং তার সকল চিন্তা দূর করে দেন। তার অন্তরকে শুধুই তাঁর মহব্বতের জন্য, জিহ্বাকে তাঁর জিকিরের জন্য এবং শরীরকে তাঁর ইবাদাতের জন্য অবসর করে দেন। আর যে ব্যক্তির সকাল-সন্ধ্যার একমাত্র চিন্তা দুনিয়া হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা তখন দুনিয়ার সকল চিন্তা-পেরেশানি ও সব বোঝা তার উপর চাপিয়ে দেন। তার অন্তরকে রবের পরিবর্তে সৃষ্টির মহব্বতে পূর্ণ করে দেন। জবানকে সৃষ্টির আলোচনায় ব্যস্ত রাখেন। শরীরকে সৃষ্টির সেবা ও ব্যস্ততায় লিপ্ত রাখেন। ফলে সে অন্যের সেবায় পশুর মতো খাটতে থাকে। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য ও মহব্বত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার উপর মাখলুকের ইবাদত, মহব্বত ও গোলামি করার শাস্তি চাপিয়ে দেয়া হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ থাকে, আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী।[৩৩]
ছয়. মৃত্যুর স্মরণ।
এটি একটি উপকারী ও বিস্ময়কর প্রতিকার।
যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ
তোমরা বেশি পরিমাণে জীবনের স্বাদ হরণকারীর তথা মৃত্যুর স্মরণ করো।[৩৪]
কারণ, কেউ যদি জীবনের কোনো কঠিন সময়ে বা দুরবস্থায় মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তবে তার কাছে এই কঠিন ও কষ্টসাধ্য অবস্থাটাই (মৃত্যুর বিপরীতে) প্রশস্ত ও প্রাচুর্যশীল মনে হবে। আবার কেউ যদি জীবনের কোনো প্রশস্ততা ও প্রাচুর্যের অবস্থায় মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তবে মৃত্যু তার সামনে এই প্রাচুর্যকেই সংকীর্ণ ও কষ্টসাধ্য বানিয়ে দেবে!
সাত. আল্লাহর কাছে দুআ করা।
দুআ অনেক উপকারী। দুআর মধ্যে কিছু আছে প্রতিরক্ষামূলক আর কিছু প্রতিষেধক। প্রতিরক্ষামূলক দুআ হলো— প্রত্যেক মুসলিম মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিয়ে, তাঁর কাছে বিনীত হয়ে দুআ করবে, তিনি যেন তাকে সকল দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করেন এবং তার ও দুশ্চিন্তার মাঝে দূরত্ব তৈরি করে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সর্বদা এমনটা করতেন। রাসুলের খাদিম আনাস বিন মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে বর্ণনা করেন-
كنت أخدم رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا نزل فكنت أسمعه كثيراً يقول: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমত করতাম। যখনই তিনি কোনো মনজিলে অবতরণ করতেন, আমি তাঁকে প্রায়ই বলতে শুনতাম :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ভীরুতা, ঋণের ভার এবং মানুষের আধিপত্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”[৩৫]
এই দুআটি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার পূর্বে তা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনেক কার্যকরী। আর প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে সহজ।
ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপকারী দুআর একটি হলো, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতেন। আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِي فِي كُلِّ خَيْرٍ وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٌّ.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, “আল্লাহ! আপনি আমার দ্বীন ইসলাহ (পরিশুদ্ধ) করে দিন, যে দ্বীনে আমার রক্ষাকবচ; আপনি সংশোধন করে দিন আমার দুনিয়াকে, যেথায় আমার জীবিকা (রয়েছে); আপনি ইসলাহ (কল্যাণকর) করে দিন আমার আখিরাতকে, যেখানে আমার প্রত্যাবর্তনস্থল (রয়েছে); আপনি প্রতিটি কল্যাণময় কাজের জন্য আমার জীবনকে দীর্ঘায়িত করে দিন এবং আপনি আমার মৃত্যুকে সব মন্দ (ও অনিষ্টকর বিষয়) থেকে আরামদায়ক বানিয়ে দিন।”[৩৬]
যদি কষ্ট ও পেরেশানি কোনো ব্যক্তিকে গ্রাসও করে ফেলে, তখনও দুআর দরজা বন্ধ না হয়ে তার জন্য খোলা থাকে। মহা দয়ালু আল্লাহ তাআলার দরজায় যখন প্রার্থনা করা হয়, তখন তিনি দান করেন এবং দুআর জবাব দেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ইমান আনে। আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে চলবে।[৩৭]
দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করা এবং কষ্টের পর স্বস্তি আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুআর একটি হলো সেই প্রসিদ্ধ মহান দুআ, যা শেখা ও মুখস্থ করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম সেই সব লোককে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যারাই দুআটি শুনবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا أَصَابَ أَحَداً قَطُّ هَم وَلا حَزَنُ فَقَالَ اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ نَاصِيَتِي بِيَدِكَ مَاضٍ فِي حُكْمُكَ عَدْلٌ فِي قَضَاؤُكَ أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَداً مِنْ خَلْقِكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ ربيع قَلْبِي وَنُورَ صَدْرِي وَجِلاءَ حُزْنِي وَذَهَابَ هَمِّي إِلَّا أَذْهَبَ اللَّهُ هَمَّهُ وَحُزْنَهُ وَأَبْدَلَهُ مَكَانَهُ فَرَجا قَالَ فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ أَلا نَتَعَلَّمُهَا فَقَالَ بَلَى يَنْبَغِي لِمَنْ سَمِعَهَا أَنْ يَتَعَلَّمَهَا
যে ব্যক্তিকে কখনো কোনো দুশ্চিন্তা বা দুঃখ-কষ্ট আক্রান্ত করেছে, সে যদি বলে, (অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা, তোমার বান্দার পুত্র, তোমার বান্দীর পুত্র। আমি তোমার হাতের মুঠে, আমার অদৃষ্ট তোমার হাতে। তোমার হুকুম আমার ওপর কার্যকর, তোমার আদেশ আমার পক্ষে ন্যায়। আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি তোমার সেসব নামের অসিলায়, যাতে তুমি নিজেকে অভিহিত করেছ অথবা তুমি তোমার কিতাবে নাজিল করেছ কিংবা তুমি তোমার সৃষ্টির কাউকেও তা শিক্ষা দিয়েছ অথবা তুমি তোমার বান্দাদের ওপর ইলহাম (অদৃশ্য অবস্থায় থেকে অন্তরে কথা বসিয়ে দেয়া) করেছ কিংবা তুমি গায়েবের পর্দায় তা তোমার কাছে অদৃশ্য রেখেছ— তুমি কুরআনকে আমার অন্তরের বসন্ত ও বক্ষের নুর এবং দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা দূর করার মাধ্যম বানিয়ে দাও।) যে বান্দা যখনই তা পড়বে আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেবেন এবং তার পরিবর্তে মনে নিশ্চিন্ততা (প্রশান্তি) দান করবেন। বর্ণনাকারী বলেন, বলা হল ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা কি তা শিখব না? তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্যই, যে ব্যক্তিই এটি শুনবে, তার উচিত এই দুআ শিখে নেওয়া।[৩৮]
মহান এই হাদিস বান্দার এই স্বীকারোক্তিকে ধারণ করছে যে, সে আল্লাহর বান্দা; আল্লাহ তাআলা থেকে সে অমুখাপেক্ষী নয়; তিনি ছাড়া তার কোনো মনিব নেই; সে রবের ইবাদাতকে আঁকড়ে ধরেছে; রবের সামনে অনুগত হয়েছে এবং রবের আদেশ ও নিষেধকে মেনে নিয়েছে; আল্লাহ তাআলা তাকে যেভাবে ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। এই হাদিসে রয়েছে আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ ও তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্টির ঘোষণা। অতঃপর আল্লাহ তাআলার সমস্ত নামের দ্বারা অসিলা গ্রহণ করে কাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা এবং প্রয়োজনীয় বিষয় কামনা।
নবিজির হাদিসে দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও মানসিক চাপের ব্যাপারে আরও দুআ বর্ণিত হয়েছে। সেগুলোর কিছু এখানে উল্লেখ করছি—

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ عِنْدَ الْكَرْبِ
ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, সংকটের সময় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআ পড়তেন :
لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো (প্রকৃত) ইলাহ নেই, যিনি অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও অশেষ ধৈর্যশীল; আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, যিনি মহান আরশের রব; আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, যিনি আসমান ও জমিনের প্রতিপালক এবং সম্মানিত আরশের মালিক।”[৩৯]
২।
وعن أنس رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا حزبه أمر قال
আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে কোনো কঠিন বিষয় উপস্থিত হলে বলতেন:
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيتُ
“হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! তোমার রহমতের অসিলায় আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।”[৪০]

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلا أُعَلِّمُكِ كَلِمَاتٍ تَقُولِينَهُنَّ عِنْدَ الْكَرْبِ أَوْ فِي الْكَرْبِ
আসমা বিনতু উমায়িস রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেবো না, যা তুমি বিপদাপদের সময় পাঠ করবে? তা হচ্ছে--
اللهُ اللهُ رَبِّي لَا أُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا
“আল্লাহ, আল্লাহ, আমার প্রতিপালক, আমি তাঁর সাথে কোনো কিছুকেই শরিক করি না।”[৪১]

এই বিষয়ে আরেকটি উপকারী দুআ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন-
دَعَوَاتُ الْمَكْرُوبِ
বিপদগ্রস্ত লোকের দুআ হলো:
اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو فَلا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ وَأَصْلِحُ لِي شَأْنِي كُلَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমতের প্রত্যাশী; অতএব, আপনি আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও আমার নফসের হাতে সমর্পণ করবেন না। আর আপনি আমার সব ব্যাপার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে দিন। আপনি ছাড়া আর কোনো (প্রকৃত) ইলাহ নেই।”[৪২]
কোনো বান্দা যখন আল্লাহর সামনে অন্তরকে হাজির করে ও সত্য নিয়ত এবং দুআ কবুলের সকল উপায়-উপকরণ অর্জনের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার সাথে এই দুআগুলো পাঠ করতে থাকবে, আল্লাহ তাআলা তার দুআ, আশা ও কাজ বাস্তবায়ন করে দেবেন; তার দুশ্চিন্তাকে খুশি ও আনন্দে বদলে দেবেন।
আট. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দুরুদ পাঠ করা।
এটা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বান্দার দুশ্চিন্তা দূর করার অনেক বড় এক মাধ্যম। হাদিসে এসেছে-
روى الطَّفَيْلُ بْنُ أُبَيَّ بْنُ كَعْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهَ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا ذَهَبَ ثُلُنَا اللَّيْلِ قَامَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا اللَّهَ اذْكُرُوا اللهَ جَاءَتِ الرَّاجِفَةُ تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ قَالَ أَتَى قُلْتُ يَا رَسُول الله إلى أكثرُ الصَّلاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاتِي فَقَالَ مَا شِئْتَ قَالَ قُلْتُ الرُّبُعَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قُلْتُ النِّصْفَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلاتِي كُلَّهَا قَالَ إِذَا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ
উবাই ইবনু কাব রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাতের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করো, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করো। কম্পন সৃষ্টিকারী প্রথম শিঙ্গাধ্বনি এসে পড়েছে এবং পরপর আসবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
উবাই রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো খুব অধিকহারে আপনার প্রতি দুরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দুরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দুরুদ পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দুরুদ পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভালো। আমি বললাম, তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার উপর দুরুদ পাঠে কাটিয়ে দেবো? তিনি বললেন, তাহলে তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।[৪৩]
নয়. আল্লাহ তাআলার উপর তাওয়াক্কুল করা এবং সকল বিষয় তাঁর কাছেই ন্যস্ত করা।
যে ব্যক্তি এটা বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান, তিনি সকল কিছু গ্রহণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়। আর বান্দা নিজেকে নিজে পরিচালনার তুলনায় বান্দাকে আল্লাহ তাআলার পরিচালনা করা কল্যাণকর। কেননা তিনি বান্দার স্বার্থের ব্যাপারে স্বয়ং সেই বান্দা থেকে ভালো জানেন। সেই স্বার্থ অর্জন ও হাসিলের ক্ষেত্রে তিনি বান্দা থেকে অধিক সক্ষম। বান্দার জন্য তার নিজের চেয়ে বেশি কল্যাণকামী এবং তার উপর তার নিজের থেকে বেশি দয়ালু। তার নিজের তুলনায় বেশি অনুগ্রহকারী। সে যখন আরও জানবে যে, তার রবের আদেশের সামনে একটি পদেক্ষপ নিতেও সক্ষম নয় এবং রবের সিদ্ধান্ত থেকে এক কদম পিছিয়ে আসতেও সক্ষম নয়। কেননা তার রবের ফায়সালা ও সিদ্ধান্তকে কোন কিছুই এগিয়ে দিতে পারে না বা পেছাতে পারে না। তখন সে নিজে রবের সামনে সমর্পণ করবে এবং নিজের সকল বিষয় তাঁর কাছেই ন্যস্ত করবে। রবের সামনে এমনভাবে লুটিয়ে পড়বে যেভাবে দুর্বল গোলাম শক্তিশালী মনিবের সামনে লুটিয়ে পড়ে। সেই মনিব তার গোলামের সাথে যা ইচ্ছা করতে পারে এবং সেই গোলাম নিজের ব্যাপারে কোনো কিছু করার সামর্থ্য রাখে না। ঠিক তখনই সে, সমস্ত দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ ও আফসোস থেকে মুক্তি পাবে। তার সকল প্রয়োজন ও কল্যাণ হাসিলের ভার এমন সত্তা বহন করে নেবেন, যিনি কোনো বোঝাকে পরোয়া করেন না এবং কোনো কিছু তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করা বা তাঁকে ক্লান্ত করতে পারে না। তখন তিনি বান্দার দায়িত্ব গ্রহণ করে নেন এবং বান্দাকে নিজের দয়া, অনুগ্রহ, রহমত ও বদান্যতা প্রদর্শন করেন বান্দার কোনো কষ্ট বা বিপদ ব্যতীত। এমনকি বান্দার কোনো মনোযোগ দেয়া ছাড়াই। কেননা সে তো একমাত্র রবকে তার সকল মনোযোগের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে। তাই তিনিও তার দুনিয়ার সকল প্রয়োজন ও স্বার্থ অর্জন থেকে তার মনোযোগকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং তার অন্তরকে সেসব থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। এই অবস্থায় তার জীবন কতই না পবিত্র ও তার অন্তর কতই না পরিশুদ্ধ এবং তার আনন্দ ও খুশি কতই না মহৎ। তবে যে ব্যক্তি নিজের পরিচালনার তার নিজ কাঁধে তুলে নেবে, নিজের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেবে এবং আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে নিজের অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করবে, তখন তিনি তাকে তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেবেন; সে যেদিকে যেতে চায়, সেদিকে যেতে দেবেন। ফলে তার ওপর সকল পেরেশানি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, ভয়, ক্লান্তি, দুর্দশা চেপে বসবে; মন বিষণ্ণতায় ভরে উঠবে এবং অবস্থা খারাপ হতে থাকবে; তার অন্তর পরিশুদ্ধ হবে না, তার কাজগুলো ভালো হবে না; মনে কোনো আশা জাগ্রত হবে না; প্রশান্তি অর্জন করতে পারবে না; কোনো স্বাদ ভোগ করবে না; বরং কখনো হয়তো তার আনন্দ-ফুর্তি ও চক্ষু শীতলকারী বিষয় থেকে বাধা দেওয়া হবে। তখন সে দুনিয়ার পেছনে পশুর মতো খেটে যাবে; কিন্তু তা থেকে কোনো আশার আলো পাবে না এবং ভবিষ্যতের পাথেয় সংগ্রহ করতে পারবে না।[৪৪]
অন্তর যখন আল্লাহর ওপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল করবে, কোনো কল্পনার সামনে নত হবে না, কোনো খারাপ দুশ্চিন্তা তার ওপর ভর করবে না, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখবে এবং তাঁর দয়ার প্রতি আগ্রহী হবে, তখন এর মাধ্যমে তার সকল দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর হয়ে যাবে; তার অনেক মানসিক ও শারীরিক রোগ সুস্থ হয়ে যাবে; অন্তরের মধ্যে এমন শক্তি, প্রফুল্লতা ও খুশি অর্জিত হবে, যা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। সে আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দায় পরিণত হবে, যাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং অন্তরের সাথে মুজাহাদার তাওফিক দিয়েছেন, যাতে অন্তরকে শক্তিশালীকারী ও দুশ্চিন্তা দূরকারী সকল উপকারী মাধ্যম অর্জন করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।[৪৫]
অর্থাৎ, তার দ্বীন ও দুনিয়ার সকল চিন্তার সমাধানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুলকারী বান্দা এমন শক্তিশালী অন্তরের অধিকারী, যার ওপর কোনো দুশ্চিন্তা প্রভাব ফেলতে পারে না এবং কোনো ঘটনা তাকে পেরেশান করতে পারে না। কেননা, সে জানে যে, এগুলো হল দুর্বল অন্তরের ফসল এবং এমন ভয় ও শঙ্কা, যার কোনো বাস্তবতা নেই। সেই সাথে সে এটাও বিশ্বাস করে যে, যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার পরিপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ফলে সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে এবং তার ওয়াদার ব্যাপারে আশ্বস্ত হবে। তখন তার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর হয়ে যাবে; তার সংকীর্ণতা প্রাচুর্যতায় ভরে যাবে; দুঃখ আনন্দে পালটে যাবে এবং তার ভয় নিরাপত্তায় পরিণত হবে। তাই আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে চাই যে, তিনি যেন আমাদের অন্তরের শক্তি ও পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুলের ওপর অবিচলতা দান করেন; যে অন্তরের শক্তি ও পূর্ণ তাওয়াক্কুলের অধিকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলা সকল কল্যাণের জিম্মাদার হয়েছেন; যাদের থেকে সকল অকল্যাণ ও ক্ষতিকে দূর করে দিয়েছেন।[৪৬]
দশ. দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূরীভূতকারী আরেকটি বিষয় হল উপকারী কাজের প্রতি আগ্রহী হওয়া এবং সমস্ত মনোযোগকে আজকের বর্তমান কাজের ওপর নিবদ্ধ রাখা; ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন না হওয়া এবং অতীত নিয়ে দুঃখ পরিহার করা।
এজন্যই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে পানাহ চেয়েছেন; অতীতের বিষয় নিয়ে দুঃখ করা থেকে বিরত থেকেছেন, যা ফিরিয়ে আনা বা সংশোধন করা সম্ভব নয়। তেমনিভাবে ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে পানাহ চেয়েছেন। বরং প্রত্যেক ব্যক্তিকে হতে হবে বর্তমানের সন্তান; যে তার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা আজকের দিনকে সুন্দর করতে এবং বর্তমানকে উন্নত করতে ব্যয় করবে। আর অন্তরের সকল মনোযোগ বর্তমানে নিবদ্ধ করার ফলে কাজগুলো সফল হতে থাকবে এবং এর মাধ্যমেই প্রতিটা ব্যক্তি তার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো দুআ করতেন অথবা তাঁর উম্মতকে কোনো দুআর নির্দেশনা দিতেন, তখন আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য কামনা করার প্রতি এবং যে বিষয়ে দুআ করছে, তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। কারণ, দুআ সর্বদাই চেষ্টার সাথে সংযুক্ত থাকে। তাই প্রত্যেক বান্দা তার দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারী বিষয়ে নিজ প্রচেষ্টা ব্যয় করবে এবং তার রবের কাছে নিজ উদ্দেশ্য সফলতার জন্য দুআ করবে এবং সাহায্য কামনা করবে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ وَفِي كُلِّ خَيْرُ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ
আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের (মুমিনের) মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার উপকার করবে, তার প্রতি তুমি লালায়িত হও; আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং অক্ষম হয়ে থেকো না। যদি কোনো কিছু (বিপদ) তোমার ওপর আপতিত হয়, তবে এমনটা বলো না যে, যদি আমি (ওটা/ওরকম) করতাম, তবে এমন এমন হতো; বরং এই বলো যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন। কারণ, لَوْ (যদি) শব্দটি শয়তানের আমলের দুয়ার খুলে দেয়।[৪৭]
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি বিষয়ের সম্মিলন ঘটিয়েছেন— একদিকে সকল ক্ষেত্রে উপকারী বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হওয়া, আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করা এবং অলসতা ও অক্ষমতার সামনে আত্মসমর্পণ না করা; আর অন্যদিকে এমন বিষয়ের সামনে আত্মসমর্পণ করা, যা অবধারিত এবং আল্লাহ তাআলার তাকদির ও ফয়সালাকে মেনে নেওয়া।
তিনি সব বিষয়কে দুই ভাগ করেছেন— এক ভাগ হচ্ছে সে সমস্ত বিষয়, যা অর্জনের জন্য চেষ্টা করা বান্দার পক্ষে সম্ভব অথবা এমন মাধ্যম অর্জন করা সম্ভব, যা দ্বারা সেগুলো অর্জিত হবে কিংবা প্রতিরোধ করা যাবে বা যথাসম্ভব হ্রাস করা যাবে। এসব ক্ষেত্রে বান্দা তার সর্বোচ্চ সাধ্য ব্যয় করবে এবং তার রবের সাহায্য কামনা করবে। আরেক প্রকার হচ্ছে, যেখানে এগুলো সম্ভব নয়। তখন বান্দা নিজেকে আশ্বস্ত করবে, তাকদিরের ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট হবে এবং নিজেকে সমর্পণ করবে। নিঃসন্দেহে এই মূলনীতি মেনে চললে সুখ-শান্তি অর্জিত হবে এবং দুঃখ ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে।[৪৮]
উল্লিখিত হাদিসটি দুশ্চিন্তার কারণগুলো দূর করার এবং সুখ-শান্তির মাধ্যমগুলো অর্জনের চেষ্টা করার নির্দেশনা প্রদান করে। এর পদ্ধতি হচ্ছে— অতীতের যেসব দুর্ঘটনা এখন আর প্রতিহত করা সম্ভব নয়, সেগুলো ভুলে থাকা এবং এটা উপলব্ধি করা যে, অতীতের এসব বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা অনর্থক ও অসম্ভব বিষয়; এগুলো হচ্ছে বোকামি ও পাগলামি। তাই সে মানসিকভাবে এসব চিন্তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করবে, তেমনি ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া থেকেও নিজের মনকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে। যেমন দারিদ্রতা বা ভয় ইত্যাদি অন্যান্য বিপদ, যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের ব্যাপারে কল্পনায় উদ্ভাসিত হয়। সে এটা বিশ্বাস করবে, ভবিষ্যতের কল্যাণ-অকল্যাণ ও আশা-নিরাশার সব বিষয়ই অজ্ঞাত। এ সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতেই ন্যস্ত। বান্দার হাতে শুধু কল্যাণ অর্জন এবং ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য চেষ্টা করা ব্যতীত আর কিছুই করার নেই। আল্লাহর বান্দাগণ এটা জানবে যে, সে যখন ভবিষ্যতের সব দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবে এবং সেসব কিছু সংশোধনের জন্য একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করবে এবং তার ওপর আশ্বস্ত থাকবে, তখন তার সকল অবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে থাকবে এবং তার থেকে সকল দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর হয়ে যাবে।[৪৯]
এগারো. অন্তরের প্রশান্তি অর্জনের অনেক বড় একটা মাধ্যম হচ্ছে অধিকহারে আল্লাহর জিকির করা।
কারণ, মনের আনন্দ ও প্রশান্তি অর্জন এবং দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করার ক্ষেত্রে এটার অনেক বড় আশ্চর্য প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।[৫০]
মৃত্যুর সময়ের কঠিন পেরেশানি দূর করার সবচেয়ে বড় জিকির হল—
لا إله إلا الله
এ সম্পর্কে তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু উমর রাজিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাদিস বর্ণনা করেন—
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: "كَلِمَةٌ لَا يَقُولُهَا عَبْدُ عِنْدَ مَوْتِهِ إِلَّا فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَتَهُ، وَأَشْرَقَ لَوْنُهُ". فَمَا مَنَعَنِي أَنْ أَسْأَلَهُ عَنْهَا إِلَّا الْقُدْرَةُ عَلَيْهَا حَتَّى مَاتَ. فَقَالَ لَهُ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: إِنِّي لَأَعْلَمُهَا، فَقَالَ لَهُ طَلْحَةُ: وَمَا هِيَ؟ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ : هَلْ تَعْلَمُ كَلِمَةً هِيَ أَعْظَمَ مِنْ كَلِمَةٍ أَمَرَ بِهَا عَمَّهُ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. فَقَالَ طَلْحَةُ: هِيَ وَاللَّهِ، هِيَ
তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, এমন একটি বাক্য রয়েছে, যা কোনো বান্দা তার মৃত্যুর সময় বলামাত্রই আল্লাহ তাআলা তার দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে দেন এবং তার রঙ উজ্জ্বল করে দেন। সেই বাক্যের ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করতে আমি সক্ষম হইনি—এর পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করেন। (এ শুনে) উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে (আবু তালহাকে) বললেন, অবশ্যই আমি বাক্যটি জানি। তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, সেটি কী? তখন উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি কি এমন কোনো বাক্য সম্পর্কে জানো, যা সেই বাক্য থেকে উত্তম, যে বাক্যটি পাঠ করতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন? (আর এই বাক্য হচ্ছে—) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত উপাস্য নেই)। তখন তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হ্যাঁ, এটিই সেই বাক্য; আল্লাহর কসম! এটিই সেই বাক্য![৫১]
বারো. সালাতের শরণাপন্ন হওয়া।
মহান আল্লাহ বলেন :
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ
আর তোমরা সবর (ধৈর্য) ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।[৫২]
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرُ صَلَّى
হুজাইফা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যখন কোনো সমস্যা (বা বিপদ) আপতিত হতো, তখন তিনি নামাজ পড়তেন।[৫৩]
তেরো. দুশ্চিন্তা বিদূরিতকারী আরেকটি বিষয় হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ করা :
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
عَلَيْكُمْ بِالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى فَإِنَّهُ بَابُ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ يُذْهِبُ اللَّهُ بِهِ الْهَمَّ وَالْغَمَّ
আল্লাহ তাআলার রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত থাকা তোমাদের ওপর আবশ্যক। কারণ, এটি জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা দূর করে দেন।[৫৪]
চৌদ্দ. আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য ও গোপন নিয়ামতরাজির আলোচনা।
আল্লাহ তাআলার নিয়ামতরাজির পরিচয় লাভ করা এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করার দ্বারা দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর হয়ে যায়। এটা একজন বান্দাকে শুকরিয়া জ্ঞাপনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, যা সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে উন্নত স্তর। যদিও সেই বান্দা দরিদ্রতা বা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো বিপদের মধ্যে থাকে। কারণ, সে যদি আল্লাহ তাআলার অসংখ্য-অগণিত নিয়ামত এবং তার ওপর আপতিত বিপদাপদের মাঝে তুলনা করে, তবে আল্লাহ তাআলার এতসব নিয়ামতের বিপরীতে তার ওপর আপতিত বিপদাপদের কোনো অনুপাতই দাঁড় হবে না (নগণ্য, তুচ্ছ হিসেবে বিবেচিত হবে)। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে বিপদাপদের দ্বারা পরীক্ষা করেন এবং সেই বান্দা ধৈর্যধারণ করে, (আল্লাহর ফয়সালার প্রতি) সন্তুষ্টি ও মেনে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে, তখন তার কষ্ট দূর হয়ে যায় এবং দুশ্চিন্তা লাঘব হয়ে যায়। অন্যদিকে বান্দার এই ধৈর্যধারণ ও সন্তুষ্টির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কৃত আল্লাহর তাআলার ইবাদতের প্রতিদান ও পুরস্কারের প্রত্যাশায় তিক্ত বিষয়গুলোও মিষ্টতায় ভরে ওঠে। তখন তার প্রতিদানের মিষ্টতা ধৈর্যের তিক্ততাকে ভুলিয়ে দেয়।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপকারী হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসের মধ্যে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
(জাগতিক বিষয়ে) তোমাদের তুলনায় নিম্নস্তরের (কম বিত্তশালী) লোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করো; তোমাদের তুলনায় উচ্চস্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। কেননা, তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তম পন্থা।[৫৫]
কোনো বান্দা যখন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বদা তার চোখের সামনে রাখবে, তখন সে নিজেকে সৃষ্টির বহু সদস্য থেকে সুস্থতার ক্ষেত্রে অনেক ঊর্ধ্বে পাবে। তার জীবিকার অবস্থা যতই খারাপ হোক, সে অন্য অনেকের তুলনায় নিজেকে উত্তম পাবে। তখন তার দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও উদ্বিগ্নতা দূর হয়ে যাবে। তার মাঝে প্রফুল্লতা বৃদ্ধি পাবে এবং অন্যদের থেকে যেসব নিয়ামতের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বে রয়েছে, সেসব নিয়ে আনন্দিত হবে।
কোনো আল্লাহর বান্দা তার ওপর আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য ও গোপন, দ্বীনি ও দুনিয়াবি নিয়ামতগুলো নিয়ে যত বেশি চিন্তা করবে, সে দেখতে পাবে, তার রব তাকে বহু নিয়ামত দান করেছেন এবং তার থেকে অনেক অকল্যাণ সরিয়ে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা তার দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা দূর করে দেবে এবং তার মনে আনন্দ ও প্রফুল্লতা নিয়ে আসবে।[৫৬]
পনেরো. কোনো কাজে বা উপকারী ইলম অর্জনে ব্যস্ত থাকা।
কোনো কাজে বা উপকারী ইলম অর্জনে ব্যস্ত থাকাটা অন্তরকে সেসব বিষয় থেকে দূরে রাখবে, যেসব বিষয় তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে দিয়েছিল। অনেক সময় এগুলোর মাধ্যমে সে ওইসব কারণ ভুলে যাবে, যেগুলো তাকে দুঃখী ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে দিয়েছিল। ফলে তার অন্তর প্রফুল্ল হয়ে উঠবে এবং তার উদ্দম ও তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। এই বিষয়টা মুমিন ও অন্যদের মাঝে সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে মুমিনগণ তাদের ইমান, ইখলাস ও এমন উপকারী ইলম অর্জনের প্রতিদান প্রত্যাশার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হয়, যে ইলম তারা শেখে বা শেখায় এবং সে অনুযায়ী আমল করে। তার কাজটি যদি কোনো ইবাদত হয়, তাহলে তো তা ইবাদতই; আর যদি তা দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততা অথবা পার্থিব কোনো অভ্যাসও হয়, যার সাথে উত্তম নিয়ত এবং সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের ইচ্ছা সংযুক্ত হয়, তাহলে তার দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা দূর করার ক্ষেত্রে এগুলোর অনেক কার্যকরী প্রভাব থাকবে। কত মানুষ এমন রয়েছে, যাদের দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নিয়েছিল এবং বিপর্যয় অতিষ্ঠ করে তুলেছিল! কিন্তু তখন সে বিভিন্ন ধরনের রোগে অসুস্থ হয়ে যায়, ফলে এটা তার জন্য সফল ওষুধে পরিণত হয়। যার কারণে সে তার দুশ্চিন্তা ও দুর্দশার কারণগুলো ভুলে যায় এবং তার দায়িত্বের কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে সে যে কাজে ব্যস্ত হবে, তা অবশ্যই তার কাছে স্বাচ্ছন্দ্য ও আগ্রহের বস্তু হতে হবে। কারণ, এর ফলে মূল উদ্দেশ্য অধিক কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।[৫৭]
ষোলো. যেসব ঘটনা থেকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ পায়, সেসবেও ইতিবাচক দিকসমূহে দৃষ্টি দেওয়া।
আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةٌ إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। (কারণ,) যদি সে তার একটি আচরণকে অপছন্দ করে, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।[৫৮]
এই হাদিসের নির্দেশনার একটি ফায়েদা হচ্ছে— এই নির্দেশনা মেনে চললে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর হয় এবং আন্তরিকতা বিদ্যমান থাকে; (স্বামী-স্ত্রী) উভয় পক্ষই ওয়াজিব ও মুসতাহাব অধিকারসমূহ আদায়ে নিয়োজিত থাকে এবং উভয় পক্ষের মাঝেই শান্তি-স্বস্তি অর্জিত হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লিখিত নির্দেশনা গ্রহণ করে না; বরং বিষয়টাকে উল্টে দেয়, সে শুধু ভুলগুলোর প্রতিই দৃষ্টি দেয়; কিন্তু ভালো কাজগুলোর প্রতি তাকায় না। ফলে আবশ্যিকভাবেই সে অস্থির হবে; তার সাথে যাদের মহব্বতের সম্পর্ক রয়েছে, অবশ্যই তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে; অনেক অধিকার আদায়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যেগুলো রক্ষা করা উভয়ের ওপরই আবশ্যক ছিল।[৫৯]
সতেরো. জীবনের প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করা, জীবন অনেক সংক্ষিপ্ত; সময় এখানে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়া থেকে অনেক বেশি দামি।
বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই জানে যে, তার সুস্থ জীবনই সুখ ও প্রশান্তির জীবন। আর এই জীবন অনেক সংক্ষিপ্ত, ছোট। তাই ছোট এই জীবনটাকে দুশ্চিন্তায় আরও ছোট করে ফেলা এবং দুঃখ-কষ্ট ও বিষণ্ণতার সাথে নিঃশেষ হতে দেওয়া কোনোভাবে উচিত নয়। কেননা, এগুলো সুস্থ জীবনের পরিপন্থি। বরং দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা তার জীবনের সময়গুলো ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য পাপাচারী ও সৎ ব্যক্তির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু একজন মুমিন এই বৈশিষ্ট্য অর্জনের মাধ্যমে অনেক কল্যাণ এবং তাৎক্ষণিক ও ভবিষ্যতের অনেক ফায়েদা অর্জন করতে পারবে। সেই সাথে যার ওপর কোনো বিপদ নেমে আসবে অথবা বিপদের আশঙ্কা করবে, তার জন্য আবশ্যক হচ্ছে, তার অর্জিত দ্বীনি ও দুনিয়ার নিয়ামতসমূহের সাথে তার বিপদগুলোর তুলনা করা। এই তুলনার মাধ্যমে তার কাছে নিয়ামতের আধিক্য এবং বিপদের স্বল্পতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তেমনিভাবে ভবিষ্যতে যে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, সেটার সাথে ভবিষ্যতে যত কল্যাণের সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে তুলনা করবে। তখন সে দুর্বল সম্ভাবনাগুলোকে অধিক শক্তিশালী সম্ভাবনাগুলোর ওপর বিজয়ী হতে দেবে না। আর এভাবে তার দুশ্চিন্তা ও ভয় দূর হয়ে যাবে। সে তার ওপর যত বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে, তাও অনুমান করবে। ফলে নিজেকে যে কোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুত করে তুলবে; যেগুলো এখনো ঘটেনি, সেসব প্রতিরোধের চেষ্টা করবে। আর যেগুলো ঘটে গেছে, সেগুলো দূর করা বা হ্রাস করার চেষ্টা করবে।
উপকারী বিষয়গুলো আপনার দৃষ্টির সামনে রাখুন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করুন। কোনো ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। যেন এর মাধ্যমে আপনি দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কারণগুলো ভুলে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে অন্তরের প্রশান্তি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করার দ্বারা সাহায্য নিন।[৬০]
আঠারো. কাজ ও দায়িত্বসমূহকে জমতে না দেওয়া।
এটা হবে যে কোনো কাজ তৎক্ষণাৎ সম্পন্ন করে ভবিষ্যতের কাজের প্রতি মনোনিবেশ করার দ্বারা। কারণ, যখন আপনি কাজগুলোকে যথাসময়ে সম্পাদন করবেন না, তখন আপনার ওপর পূর্বের অসম্পূর্ণ কাজগুলো স্তূপাকারে জমা হয়ে যাবে এবং এর সাথে পরবর্তী আরও অনেক কাজ এসে যুক্ত হবে। তখন এই সব কাজ সমাধা করা আপনার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে। অপরদিকে যদি আপনি প্রতিটা কাজ যথাসময়ে সম্পাদন করে নেন, তাহলে আপনি ভবিষ্যতের কাজের প্রতি চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তি সহকারে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনার উচিত হল, অধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকারী কাজগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে এর পরে রাখা। সেই সাথে যেসব কাজে আপনার মন স্থির থাকে এবং আগ্রহ সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে আলাদা করুন। কারণ, এর বিপরীত বিষয়গুলো ক্লান্তি, কষ্ট ও বিরক্তি সৃষ্টি করবে। এসব ক্ষেত্রে সঠিক চিন্তা ও অন্যদের সাথে পরামর্শের দ্বারা সাহায্য নিন। কারণ, যে ব্যক্তি পরামর্শ করে, তার কখনো আফসোস করতে হয় না। আপনি যা করতে চাচ্ছেন, তা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করুন। (পর্যালোচনা করে) যদি আপনি এই কাজের কল্যাণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান এবং সংকল্প করে ফেলেন, তবে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।[৬১]
উনিশ. সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতি অনুমান করে রাখা এবং সেগুলো মোকাবিলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা।
মানুষ যখন তার কোনো বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার বা নিকটাত্মীয় অসুস্থ হওয়ার কিংবা সে ঋণগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার অথবা শত্রুর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কিংবা অন্য যে কোনো বিপদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রাখবে, যা এখনও ঘটেনি; সেইসাথে এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাইবে এবং নিরাপত্তার প্রত্যাশা করবে, তখন এমন কোনো বিষয় যদি তার সাথে বাস্তবে ঘটেও যায়, তবু সেটা তার জন্য মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে এবং সে শান্ত থাকতে পারবে। যেহেতু সে এটা আগেভাগেই অনুমান করে রাখবে।
তবে এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা আবশ্যক। তা হলো— অনেক উচ্চ মনোবলের অধিকারী মানুষ বড় কোনো বিপর্যয় বা দুর্যোগের সময় নিজেকে স্থির রাখতে পারেন। নিজেকে ধৈর্যশীল ও শান্ত রাখতে পারেন। কিন্তু সাধারণ তুচ্ছ বিষয়ে তারা পেরেশান হয়ে যান। তার স্থিরতা নড়বড়ে হয়ে যায়। এটার কারণ হচ্ছে, তারা বড় বিষয়ের ক্ষেত্রে নিজের মনকে প্রস্তুত করে রেখেছিল। কিন্তু ছোট বিষয়গুলোকে অবহেলা করেছিল। ফলে এগুলো তাকে ক্ষতি করতে এবং তার শান্তচিত্তকে অস্থির করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তাই সর্বদা নিজেকে ছোট-বড় সকল বিষয়ের ব্যাপারে প্রস্তুত রাখতে হবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাইতে হবে, যাতে তিনি এক মুহূর্তের জন্য তাকে তার নিজের উপর ছেড়ে না দেন। তখন তার সামনে ছোট বিষয়গুলো সহজ হয়ে উঠবে, যেমন বড় বিষয়গুলো সহজে পরিণত হয়েছিল। ফলে সে সর্বদা প্রশান্ত চিত্ত ও স্থিরতা ধরে রাখতে পারবে।
বিশ. দ্বীনদার ও আলিমদের কাছে অভিযোগ-অনুযোগ করা এবং তাঁদের কাছে নসিহত ও পরামর্শ চাওয়া। কারণ, তাঁদের নসিহত ও মতামতগুলো বিপদাপদে অবিচলতার সবচেয়ে বড় পাথেয় হয়ে থাকে।
সাহাবিগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে কাফিরদের বিভিন্ন নির্যাতনের ব্যাপারে অভিযোগ জানাতেন।
خباب بن الأَرَتِّ رضي الله عنه يقول: شَكَوْنَا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُتَوَسِّدُ بُرْدَةً لَهُ فِي ظِلَّ الْكَعْبَةِ قُلْنَا لَهُ أَلَا تَسْتَنْصِرُ لَنَا أَلَا تَدْعُو اللَّهَ لَنَا قَالَ كَانَ الرَّجُلُ فِيمَنْ قَبْلَكُمْ يُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ فَيُجْعَلُ فِيهِ فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُشَقُّ بِاثْنَتَيْنِ وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَيُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ لَحْمِهِ مِنْ عَظْمٍ أَوْ عَصَبٍ وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ أَوِ الذَّنْبَ عَلَى غَنَمِهِ وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ
খাব্বাব ইবনুল আরাত রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে (কাফিরদের নির্যাতনের বিষয়ে) অভিযোগ করলাম। তখন তিনি নিজের চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরিফের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করবেন না? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করবেন না? তিনি বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীগণের অবস্থা ছিল এই, তাদের জন্য মাটিতে গর্ত খনন করা হতো এবং ঐ গর্তে তাদেরকে পুঁতে রেখে করাত দিয়ে তাদের মস্তক দ্বিখণ্ডিত করা হতো। কিন্তু এসব (নির্যাতন) তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। লোহার চিরুনী দিয়ে আঁচড়িয়ে শরীরের হাড় পর্যন্ত গোশত ও শিরা-উপশিরা সব কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিত। এ (নির্যাতন) তাদেরকে দ্বীন থেকে বিমুখ করতে পারেনি। আল্লাহর কসম, আল্লাহ এ দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন। সে সময় একজন উষ্ট্রারোহী সানআ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করবে না, অথবা তার মেষপালের জন্য নেকড়ে বাঘের আশঙ্কা করবে, কিন্তু তোমরা (ঐ সময়ের অপেক্ষা না করে) তাড়াহুড়ো করছ।[৬২]
একইভাবে তাবিয়িগণ সাহাবিদের কাছে অভিযোগ জানাতেন।
يقول الزبير بن عدي: أَتَيْنَا أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ فَشَكَوْنَا إِلَيْهِ مَا نَلْقَى مِنَ الْحَجَّاجِ فَقَالَ اصْبِرُوا فَإِنَّهُ لا يَأْتِي عَلَيْكُمْ زَمَانُ إِلَّا الَّذِي بَعْدَهُ شَرٌّ مِنْهُ حَتَّى تَلْقَوْا رَبَّكُمْ سَمِعْتُهُ مِنْ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
জুবাইর ইবনু আদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা আনাস ইবনু মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলাম এবং হাজ্জাজের দ্বারা আমরা যে জ্বালাতন ভোগ করছিলাম, সে সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি বললেন, ধৈর্য ধরো। কারণ, মহান রবের সাথে মিলিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের ওপর এমন কোনো যুগ অতীত হবে না, যার পরের যুগ তার চেয়েও বেশি খারাপ নয়। তিনি বলেন, এ কথাটি আমি তোমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি।[৬৩]
বিপদগ্রস্ত বা হতাশাগ্রস্ত মানুষ সেই আলিম ও আদর্শবান মুসলিম ব্যক্তিদের থেকে এমন কথা শুনবে, যা তাকে প্রশান্ত করবে এবং তার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানির কষ্ট লাঘব করবে।
এই ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হল, সত্যবাদী ভাই, বুদ্ধিমান নিকটাত্মীয়, বিশ্বস্ত স্বামী ও স্ত্রীর কাছে আশ্রয় নেওয়া। যেমন: ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহা যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিলেন, তখন তার স্বামী আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ করেন।
روى القصة عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ رضي الله عنهما أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى فَاطِمَةَ رَضِي اللهُ عَنْهَا فَوَجَدَ عَلَى بَابِهَا سِتْراً فَلَمْ يَدْخُلْ قَالَ وَقَلَّمَا كَانَ يَدْخُلُ إِلا بَدَأَ بِهَا فَجَاءَ عَلِيُّ رَضِي اللَّه عَنْهُ فَرَاهَا مُهْتَمَّةً فَقَالَ مَا لَكِ قَالَتْ جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيَّ فَلَمْ يَدْخُلْ فَأَتَاهُ عَلَيَّ رَضِي اللَّهُ عَنْهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فَاطِمَةَ اشْتَدَّ عَلَيْهَا أَنَّكَ جِئْتَهَا فَلَمْ تَدْخُلْ عَلَيْهَا قَالَ وَمَا أَنَا وَالدُّنْيَا وَمَا أَنَا وَالرَّقْمَ ( أي النقش والرسم ( فَذَهَبَ إِلَى فَاطِمَةَ فَأَخْبَرَهَا بِقَوْلِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ قُلْ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا يَأْمُرُنِي بِهِ قَالَ قُلْ لَهَا فَلْتُرْسِلْ بِهِ إِلَى بَنِي فُلانٍ [ وَكَانَ سِتْراً مَوْشِيَاً ] (أي مزخرفاً منقوشاً)
আবদুল্লাহ বিন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহার ঘরে উপস্থিত হয়ে তাঁর দরজায় একটি কারুকার্যখচিত পর্দা ঝুলতে দেখেন; যে কারণে তিনি ভেতরে প্রবেশ না করে ফিরে আসেন। কদাচিৎ এরকম হতো যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেতরে প্রবেশের আগে ফাতিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেন না। এ সময় আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু ঘরে ফিরে ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহাকে চিন্তিত দেখে জিজ্ঞেস করেন, ব্যাপার কী, তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, আমার কাছে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছিলেন; কিন্তু তিনি ভিতরে প্রবেশ করেননি।
তখন আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি ফাতিমার নিকট গিয়ে ঘরে প্রবেশ না করায় তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছেন। তখন নবিজি বললেন, দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? কারুকার্যের সাথে আমার কী সম্পর্ক? এরপর তিনি ফাতিমার কাছে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য শুনালে, ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বলুন, তিনি এ ব্যাপারে আমাকে কী করতে বলেন। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে যেন তা অমুক লোকের কাছে পাঠিয়ে দেয়।[৬৪]
একুশ. দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন ব্যক্তির এটা বিশ্বাস করা যে, কষ্টের পরে সুখ রয়েছে; সংকীর্ণতার পরে প্রাচুর্য রয়েছে।
সে যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে। কারণ, তিনি অবশ্যই তার জন্য প্রশস্ততা ও মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।
সংকট যত গাঢ় হবে এবং বিপদ যত বৃদ্ধি পাবে, মুক্তি ও স্বস্তি ততই নিকটে আসবে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।[৬৫]
এই আয়াতে একটি কষ্টের সাথে দুটি ভিন্ন স্বস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহুমাকে অসিয়ত করে বলেছেন :
النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ وَأَنَّ الْفَرَجَ مَعَ الْكَرْبِ وَأَنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْراً
ধৈর্যের সাথে রয়েছে সাহায্য, কষ্টের সাথে রয়েছে মুক্তি এবং কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।[৬৬]
বাইশ. কিছু দুশ্চিন্তা লাঘব হয় খাবারের মাধ্যমে।
عن عَائِشَةَ رَضِي الله عَنْهَا أَنَّهَا كَانَتْ تَأْمُرُ بِالتَّلْبِينِ لِلْمَرِيضِ وَلِلْمَحْرُونِ عَلَى الْهَالِكِ وَكَانَتْ تَقُولُ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّ التَّلْبِينَةَ تُجِمُّ فُؤَادَ الْمَرِيضِ وَتَذْهَبُ بِبَعْضِ الْحُزْنِ
আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে, তিনি রোগীকে এবং কারো মৃত্যুতে শোকাহত ব্যক্তিকে তালবিনা খাওয়ানোর আদেশ করতেন। তিনি বলতেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, 'তালবিনা' রোগীর কলিজা মজবুত করে এবং নানাবিধ দুশ্চিন্তা দূর করে।[৬৭]
عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهَا كَانَتْ إِذَا مَاتَ الْمَيِّتُ مِنْ أَهْلِهَا فَاجْتَمَعَ لِذَلِكَ النِّسَاءُ ثُمَّ تَفَرَّقْنَ إِلَّا أَهْلَهَا وَخَاصَّتَهَا أَمَرَتْ بِبُرْمَةٍ مِنْ تَلْبِينَةٍ فَطُبِخَتْ ثُمَّ صُنِعَ تَرِيدُ فَصُبَّتِ التَّلْبِينَةُ عَلَيْهَا ثُمَّ قَالَتْ كُلْنَ مِنْهَا فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ التَّلْبِينَةُ مُجمَّةٌ لِفُؤَادِ الْمَرِيضِ تَذْهَبُ بِبَعْضِ الْحُزْن
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে, তাঁর পরিবারের কোনো ব্যক্তি মারা গেলে মহিলারা এসে জড়ো হল। তারপর তাঁর আত্মীয়রা ও বিশেষ ঘনিষ্ঠ মহিলারা ব্যতীত বাকি সবাই চলে গেলে, তিনি ডেগে 'তালবিনা' রান্না করতে বললেন। তা পাকানো হল। এরপর 'সারিদ' প্রস্তুত করা হল এবং তাতে তালবিনা ঢালা হল। তিনি বললেন, তোমরা এ থেকে খাও। কারণ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, 'তালবিনা' রুগ্ন ব্যক্তির হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং শোক-দুঃখ কিছুটা দূর করে।[৬৮]
তালবিনা: এটা যব বা ভুসি দিয়ে তৈরি এক প্রকার স্যুপ, যার মধ্যে মধু মিশ্রিত করা হয়। এটাকে তালবিনা নামকরণ করা হয়েছে— (তালবিনা শব্দের মূলধাতু হচ্ছে লাবান; আর লাবান শব্দের অর্থ হচ্ছে দুধ।) যেহেতু এটা দুধের সাথে সাদৃশ্য রাখে। এটা যবের আটা দিয়ে তৈরি করা হয়।
হাদিসে 'মুজিম্মাহ' শব্দের অর্থ হচ্ছে (তালবINA) প্রশান্তিদায়ক, প্রফুল্লকারক ও দুশ্চিন্তা বিদূরিতকারী।
সারিদ: গোশতের মধ্যে রুটির টুকরো দিয়ে তৈরি করা খাবার।
عنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قِيلَ لَهُ إِنَّ فُلانًا وَجِعُ لا يَطْعَمُ الطَّعَامَ قَالَ عَلَيْكُمْ بِالتَّلْبِينَةِ فَحَسُّوهُ إِيَّاهَا فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَغْسِلُ بَطْنَ أَحَدِكُمْ كَمَا يَغْسِلُ أَحَدُكُمْ وَجْهَهُ بِالْمَاءِ مِنَ الْوَسَخِ.
আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি বলা হতো; অমুক ব্যক্তি যন্ত্রণাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, কোনো খাবার খেতে পারছে না। তখন তিনি বলতেন; তোমরা তাকে তালবিনার শরবত পান করাও। শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, এটা তোমাদের পেটকে সেভাবে পরিষ্কার করে, যেভাবে তোমরা পানি দ্বারা চেহারার ময়লা পরিষ্কার করো।[৬৯]
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَخَذَ أَهْلَهُ الْوَعَكَ أَمَرَ بِالْحِسَاءِ فَصُنِعَ ثُمَّ أَمَرَهُمْ فَحَسَوْا مِنْهُ وَكَانَ يَقُولُ إِنَّهُ لَيَرْتُقُ فُؤَادَ الْحَزِينِ وَيَسْرُو عَنْ فُؤَادِ السَّقِيمِ كَمَا تَسْرُو إِحْدَاكُنَّ الْوَسَخَ بِالْمَاءِ عَنْ وَجْهِهَا.
আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের লোকদের জ্বর হলে তিনি হিসা (দুধ ও ময়দা সহযোগে তরল পথ্য) বানানোর নির্দেশ দিতেন। তা বানানো হলে তিনি পরিবারের লোকদের নির্দেশ দিতেন এটা রোগীকে পান করাতে। তিনি বলতেন, এটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে শক্তি জোগায় এবং রোগীর মনের ক্লেশ ও দুঃখ দূর করে। ঠিক যেমন তোমাদের কোনো মহিলা পানি দ্বারা তার মুখমণ্ডলের ময়লা পরিষ্কার করে থাকে।[৭০]
যদিও অনেকে এতে আশ্চর্যান্বিত হয়; তবে এটা সত্য ও বাস্তব— যতক্ষণ এটা নিষ্পাপ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে অহি দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলাই খাদ্য সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি এসবের বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। তাই উল্লিখিত যবের হিসা প্রফুল্লতা দানকারী খাবার। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।[৭১]
অন্যদিকে শারীরিকভাবে অসুস্থ ও মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য রান্নার রেসিপির ব্যাপারে ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, সম্ভবত অসুস্থ ব্যক্তির জন্য আস্ত যবের ফুটন্ত পানি এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ভুসির ফুটন্ত পানি উপকারী হবে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।[৭২]

টিকাঃ
[২২] সুরা নাহল : ৯৭
[২৩] সহিহু মুসলিম: ২৯৯৯
[২৪] সহিহুল বুখারি: ৫৬৪২
[২৫] সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩
[২৬] মুসনাদু আহমাদ : ১৬৮০৬; মুসতাদরাকু হাকিম : ৮১৩৩, ১/৩৪৯; সহিহ ইবনি হিব্বান : ২৯১১
[২৭] জামিউত তিরমিজি : ২৩৯৬; সহিহুল জামি: ৩০৮; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪০৩১
[২৮] সহিহ মুসলিম: ২৯৫৬
[২৯] সহিহুল বুখারি: ৬৫১২
[৩০] নাসায়ি: ১৮৩৩; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৬২; মুসনাদু আহমাদ: ৮৭৬৯; আলবানি: সহিহ, সহিহুন নাসায়ি : ১৩০৯
[৩১] জামিউত তিরিমিজি: ২৩৯৮; সহিহু সুনানিত তিরমিজি : ১৯৫৬
[৩২] জামিউত তিরমিজি : ২৩৮৯; আলবানি: সহিহ, সহিহুল জামি : ৬৫১০
[৩৩] সুরা যুখরুফ: ৩৬
[৩৪] জামিউত তিরমিজি: ২৩০৭; সুনানুন নাসায়ি: ১৮২৪; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫৮; মুসনাদু আহমাদ : ৭৯২৫; মুসনাদুল বাজার, আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহর সূত্রে; আলবানি: হাসান, সহিহল জামি: ১২১১; সহিহ, ইরওয়াউল গালিল: ৬৮২
[৩৫] সহিহুল বুখারি: ২৮৯৩
[৩৬] সহিহু মুসলিম : ২৭২০
[৩৭] সুরা বাকারাহ: ১৮৬
[৩৮] মুসনাদু আহমাদ: ৩৭১২, ১/৩৯১; আলবানি: সহিহ, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ: ১৯৮; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৪৫২; তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির: ১০৩৫২; আল-কালিমুত তাইয়িব : ১২৪; সহিহ আত-তারগিব: ১৮২২
[৩৯] সহিহুল বুখারি : ৬৩৪৬
[৪০] জামিউত তিরমিজি : ৩৫২৪; আলবানি: হাসান, সহিহুল জামি: ৪৬৫৩
[৪১] সুনানু আবি দাউদ: ১৫২৫; সহিহুল জামি: ২৬২০
[৪২] সুনানু আবি দাউদ : ৫০৯০; আলবানি: হাসান, সহিহুল জামি: ৩৩৮৮; সহিহ সুনানি আবি দাউদ : ৪২৪৬
[৪৩] জামিউত তিরমিজি: ২৪৫৭, ইমাম তিরমিজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ: আলবানি: হাসান, মিশকাত: ৯২৯
[৪৪] ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত আল-ফাওয়ায়িদ : ২০৯
[৪৫] সুরা তালাক: ৩
[৪৬] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৪৭] সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪
[৪৮] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৪৯] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৫০] সুরা রাদ: ২৮
[৫১] মুসনাদু আহমাদ : ১৩৮৬
[৫২] সুরা বাকারাহ : ৪৫
[৫৩] সুনানু আবি দাউদ : ১৩১৯; আলবানি: হাসান, সহিহুল জামি : ৪৭০৩; মুসনাদু আহমাদ : ২৩২৯৯
[৫৪] মুসনাদু আহমাদ : ২২৭১৯, ৫/৩১৯; আলবানি: সহিহ, সহিহুল জামি : ৪০৬৩; সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ: ১৯৪১; তবরানি, আল-মুজামুল আওসাত: ৮৩৩৪
[৫৫] জামিউত তিরমিজি : ২৫১৩; সহিহুল জামি: ১৫০৭
[৫৬] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৫৭] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৫৮] সহিহু মুসলিম : ১৪৬৯
[৫৯] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৬০] ইবনু সাদি, আল-ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সায়িদাহ
[৬১] প্রাগুক্ত
[৬২] সহিহুল বুখারি: ৩৬১২
[৬৩] সহিহুল বুখারি: ৭০৮৮
[৬৪] সুনানু আবি দাউদ; সহিহু আবি দাউদ: ৩৪৯৬
[৬৫] সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬
[৬৬] মুসনাদু আহমদ : ১/২৯৩; আস-সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ : ২৩৮২; আলবানি: সহিহ, সহিহুল জামি: ৬৮০৬
[৬৭] সহিহুল বুখারি: ৫৬৮৯
[৬৮] সহিহুল বুখারি: ৫১৪৭
[৬৯] মুসনাদু আহমাদ: ৬/১৫২
[৭০] জামিউত তিরমিজি: ২০৩৯
[৭১] আরও দেখুন- জাদুল মাআদ, ইমাম ইবনুল কাইয়িম: ৪/১২০
[৭২] দেখুন- ফাতহুল বারি: ১৪৭

📘 ডিপ্রেশন কারণ ও প্রতিকার > 📄 দুশ্চিন্তা হতাশা ও বিষণ্ণতা দূর করার বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়িমের পরামর্শ

📄 দুশ্চিন্তা হতাশা ও বিষণ্ণতা দূর করার বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়িমের পরামর্শ


ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ পনেরোটি উপায় সম্পর্কে লিখেছেন, যেগুলোর দ্বারা আল্লাহ তাআলা বান্দার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করে দেন।
এক. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ।
দুই. তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ।
তিন. তাওহিদুল ইলমিল ইতিকাদি (আসমা ওয়াস-সিফাত)।
চার. আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর জুলুম করবেন কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই বান্দাকে পাকড়াও করবেন (যা জুলুমকে আবশ্যক করে) – এ থেকে মহান রবকে পবিত্র ঘোষণা করা।
পাঁচ. বান্দার স্বীকার করা যে, সে জালিম।
ছয়. আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয়ের দ্বারা প্রার্থনা করা। সেগুলো হল তার নাম ও গুণাবলিসমূহ। আসমা ওয়াস সিফাতের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে—
الحي القيوم
“তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক।”
সাত. একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া।
আট. প্রত্যাশার সাথে বান্দার রবের স্বীকৃতি দেওয়া।
নয়. তাওয়াক্কুল বাস্তবায়ন করা, তাঁর কাছে নিজেকে অর্পণ করা। বান্দার এটা স্বীকার করা যে, তার ললাট তার রবের হাতেই রয়েছে; তিনি যেভাবে ইচ্ছা, পরিচালনা করেন; তার ওপর রবের সমস্ত হুকুম বাস্তবায়িত হয়; রবের সকল ফয়সালা ইনসাফপূর্ণ হয়।
দশ. তার অন্তর কুরআনের বাগানের সুবাসে সুশোভিত করা। সকল বিপদে তা থেকে পাথেয় গ্রহণ করবে। অন্তরের সকল রোগে তা থেকে চিকিৎসা নেবে। তখন এটা হবে তার দুঃখ দূরীভূতকারী এবং তার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানির জন্য শিফা।
এগারো. ইস্তিগফার।
বারো. তাওবা।
তেরো. জিহাদ।
চৌদ্দ. নামাজ।
পনেরো. সকল যোগ্যতা ও শক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত বিশ্বাস করা এবং এগুলোকে সেই সত্তার ওপর ন্যস্ত করা, যার হাতে এসব রয়েছে।
আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে সকল দুশ্চিন্তা থেকে পানাহ চাচ্ছি। তিনি যেন আমাদের সকল বিপদ থেকে মুক্তি দেন এবং আমাদের সকল দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও দুআ কবুলকারী। তিনি চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।

📘 ডিপ্রেশন কারণ ও প্রতিকার > 📄 জ্ঞাতব্য

📄 জ্ঞাতব্য


দুনিয়ার দুশ্চিন্তার এতসব প্রকার ও সমাধান উল্লেখ করার পর এখানে আরও আলোচনা করা আবশ্যক যে, আখিরাতের দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি হবে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সেখানের বিপদ হবে সবচেয়ে কঠিন। যার একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, হাশরের ময়দানে মানুষের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়, যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِي اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ.. أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهَلْ تَدْرُونَ مِمَّ ذَلِكَ يَجْمَعُ اللَّهُ النَّاسَ الْأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ يُسْمِعُهُمُ الدَّاعِي وَيَنْفُذُهُمُ الْبَصَرُ وَتَدْنُو الشَّمْسُ فَيَبْلُغُ النَّاسَ مِنَ الْغَمِّ وَالْكَرْبِ مَا لَا يُطِيقُونَ وَلَا يَحْتَمِلُونَ فَيَقُولُ النَّاسُ أَلَا تَرَوْنَ مَا قَدْ بَلَغَكُمْ أَلَا تَنْظُرُونَ مَنْ يَشْفَعُ لَكُمْ إِلَى رَبِّكُمْ فَيَقُولُ بَعْضُ النَّاسِ لِبَعْضٍ عَلَيْكُمْ بِآدَمَ ...
আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের সর্দার। তোমাদের কি জানা আছে, তা কেন? কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষ এমন এক ময়দানে সমবেত হবে, যেখানে একজন আহ্বানকারীর আহ্বান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই একসঙ্গে দৃষ্টিগোচর হবে; সূর্য নিকটে এসে যাবে; মানুষ এমনই কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে, যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছো না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদমের কাছে চলো।...[৭৩]
সেদিন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া এসব দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه خير قوم والحمد لله الذي لا تأخذه سنة ولا نوم .

টিকাঃ
[৭৩] সহিহুল বুখারি: ৪৭১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00