📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 উলামা ও পারচর্চা

📄 উলামা ও পারচর্চা


কোন নির্দিষ্ট আলেম বা সাধারণ লোকের চর্চা বা নিন্দা করা, কারো চুগলী ও হিংসা করা; অনুমান' ও ধারণা করে 'কারোর 'বদনাম'ইত্যাদি' করা আহলে ইলমের জন্য আদৌ সমীচীন নয়। কারণ, তা সকলের জন্য মহাপাপ, এবং আহলে ইল্মের জন্য আরো বড় মহাপাপ, যেহেতু সাধারণ লোক তাঁদের অনুসরণ করে, আলেম যা করেন তাই তার কার্যের জন্য দলীল মনে করে। তাছাড়া পরচর্চা ও পরনিন্দায় বিদ্বেষ ও বিবাদ সৃষ্টি হয় এবং বহু মূল্যবান সময় অযথা নষ্ট হয়। যাতে ইল্মের আলোক ও আলেমের প্রতি ভক্তি অন্তর্হিত হয়ে যায়।

ওলামাদের জন্য আরো এক জরুরী কর্তব্য যে, তাঁরা যেন তাঁদের আপোসে ঐক্য, সংহতি, সৌহার্দ্য, সদ্ভাব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ইত্যাদি বজায় রাখেন এবং অনৈক্য বিদ্বেষ, মাৎসর্য, বৈরিতা প্রভৃতি নিন্দনীয় ও সর্বনাশী কাজ-কর্ম থেকে দূরে থাকেন। সকল কাজে ইখলাস রেখে, সকলের ইজতেহাদী অভিমতকে শ্রদ্ধাদৃষ্টিতে দেখে, শৃঙ্খলা, বিনয় ও নিষ্ঠার সহিত সত্যের পরিচয় জানিয়ে সর্বদা একতার খেয়াল রাখবেন। সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির সুন্দর পরিবেশ ফুটিয়ে তুলবেন। যেহেতু সকলের উদ্দেশ্য এক, ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা এক, হিতৈষণাও এক। অতএব এই মহান উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা (দ্বীন প্রতিষ্ঠা)কে বাস্তবায়িত করতে অবশ্যই মিলিত প্রীতিপূর্ণ প্রয়াসের দরকার। এই সুসাধ্য সাধনের পথে সকল প্রকার ক্ষতিকর উপাদান ও উদ্দেশ্যকে প্রতিহত ও নির্মূল করতে আদৌ অলসতা করা উচিত নয়। সুতরাং এক আলেম অপর আলেম ভাইকে শ্রদ্ধা করবেন ও ভালোবাসবেন। এক অপরের তরফ হতে মান সংরক্ষা, প্রতিবাদ ও দোষক্ষালন করবেন। প্রমাণ করবেন যে, গৌণ (ইজতেহাদী মাআলা) বিষয়ে সামান্য মতভেদ - যা সম্প্রীতি ও সদ্ভাব নষ্ট করে -তাকে মুখ্য (আকীদা ও তাওহীদ) বিষয় -যাতে ঐক্য ও মিলন প্রতিষ্ঠা হয় - তার উপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। বরং মুখ্য বিষয় ঠিক রেখে গৌণ বিষয়ে আপোসে সমঝতা ও মীমাংসার মাঝে আপোস নিষ্পত্তি করা কর্তব্য। আর এ বিষয়ে সালিস, সন্ধিকর্তা ও ফায়সালাকারী হবে কিতাব ও (সহীহ) সুন্নাহ। ছোট-খাট ইজতেহাদী ভুলের জন্য আপোসের সদ্ভাবকে অবশ্যই নষ্ট করা যাবে না। আর সাবধান হবেন, যাতে ইলমের (কিতাব ও সুন্নাহর) দুশমনরা তাঁদের আপোসের মাঝে বৈরিতা ও বিদ্বেষ ছড়াতে এবং একতাবদ্ধ জামাআতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে কৃতার্থ না হয়।

সম্প্রীতির মত সম্পদের প্রতিষ্ঠায় যে লাভ ও কল্যাণ আছে তা বলাই বাহুল্য। সদ্ভাব এমন এক ধর্মীয় বিধান যার উপর শরীয়ত সর্বতোভাবে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। যা ইখলাস (ঐকান্তিকতা) উৎসর্গও স্বার্থত্যাগের এক বড় ন্দলীল। আর উৎসর্গ ও ইখলাস দ্বীনের প্রাণ ও কেন্দ্রবিন্দু। আলেম এই গুণে গুণান্বিত হয়েই সেই আলেম হন; যে আলেম ও আহলে ইলমের প্রশংসা কুরআন ও হাদীসে করা হয়েছে। সম্প্রীতি ও সদ্ভাবের মাধ্যমে ওলামাদের ইল্ল্মী উন্নতি লাভ হয়। আর ইল্ল্মী পরিপূর্ণতার প্রতি পৌঁছনোর জন্য তাঁদের পথ প্রশস্ত ও সুগম হয়। কারণ, আহলে ইলমের পথ ও পদ্ধতি যখন এক হবে তখন এক অপরের নিকট নিঃসংকোচ ও অকুণ্ঠভাবে ইল্ম শিক্ষা ও জ্ঞানলাভ করতে প্রয়াসী হবেন। এক অপরের হিতার্থে তাঁকে শিক্ষা দেবেন। কিন্তু যদি দলাদলি করে একদল অপরদল হতে বৈমুখ থাকেন এবং আপোসে হিংসা ও ঘৃণায় জর্জরিত থাকেন তবে নিশ্চয় সে উপকার আর থাকে না। বরং তার পরিবর্তে অপকারই বিরাজ করে। হিংসা, বৈরিতা, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব, নাহক রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি, এক অপরের ছিদ্রান্বেষণ এবং তার মাধ্যমে অপরের সমালোচনা, অপবাদ, অপযশ ও অপপ্রচারের শিকার করে। যার প্রত্যেকটিই দ্বীন, জ্ঞান ও সলফে সালেহীনদের রীতির পরিপন্থী; অনেক জাহেল যাকে দ্বীন মনে করে থাকে। অথচ আলেমের উচিত, সূরা হুজুরাত গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।

মানুষ হয়ে ভুল করা আশ্চর্যের কথা নয়। বরং আশ্চর্য ও বিস্ময়ের কথা তো এটাই যে, 'মানুষ হয়েও কোন ভুল না করা।' অতএব আলেম যত বড়ই হন তাঁর দ্বারা কোন ভুল হওয়াটা বিসায়ের কথা নয়, যেহেতু মানুষ কেউই ত্রুটিমুক্ত নয়। (অবশ্য আম্বিয়াদের কথা স্বতন্ত্র।) তাই কোন ত্রুটিকে কেন্দ্র করে কোন আলেমের ইজ্জত ও সম্ভ্রমের উপর হামলা করা বড় অন্যায় ও যুলুম। যার শাস্তি একাধিক ভয়ানক।

ছিদ্রান্বেষণ করা মুসলিমের কর্ম নয়। মুসলিমদের চরিত্র নয়, কোন খবর শোনামাত্র তা হাওয়ায় উড়িয়ে বেড়ানো। এক অপরের মুখ থেকে গ্রহণ করে সত্যাসত্য বিচার না করে অন্ধভাবেই না বুঝে-সুঝে প্রচার করা। ইসলাম-বিরোধী প্রচার-মাধ্যমগুলোর রায়ে সায় দিয়ে নিজেদের ভক্তিভাজনদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া। অথবা কোন অসদুপায়ে (যেমন, শিকী তাবীয লিখে, স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ সৃষ্টি করে, যোগ-যাদু করে) সমাজের মাল ভক্ষণ করে তাদের বিরুদ্ধ মন্তব্য শোনা। এ ব্যাপারে রব্বুল আলামীন বলেন, “হে মুমিনগণ! যদি কোন ফাসেক (সত্যত্যাগী) তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রয়দায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (কুঃ ৪৯/৬)

তিনি অন্যত্র বলেন, "আর যখন শাস্তি অথবা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা প্রচার করে, অথচ যদি তারা রসূল কিংবা তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের গোচরে তা আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তবে তোমাদের কিছু লোক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করতে।” (কুঃ ৪/৮৩)

মুসলিমের উচিত, কোন মানুষের (বিশেষ করে কোন আলেমের) সদ্‌গুণ ও অবদানকে অস্বীকার না করা এবং কোন ভুল বা অপরাধ করলে তাতে আনন্দবোধ না করা। অথবা তাঁর অপযশ রটিয়ে নিজের কীর্তিত্ব জাহির না করা। বরং যথাসম্ভব তাঁর সংশোধনের উপায় অনুসন্ধান করা তার কর্তব্য।

মুসলিমের কর্তব্য প্রত্যেকের ছোট-খাট ও ইজতেহাদী ভুলকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। সুধারণার সহিত সে সবের উপর অনুচিত গুরুত্ব দিয়ে ভুলকারীর ইজ্জত না লুটা।

এ বিষয়ে ইমাম সানআনী (রঃ) বলেন, 'ওলামাদের এমন কোন ব্যক্তি নেই যাঁর কোন ত্রুটি বা উদ্ভটি নেই; যা তাঁর অন্যান্য অবদানের পার্শ্বে চাপা পড়া উচিত এবং সেই ত্রুটি থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। (অর্থাৎ তা ধরে বসে প্রচার করে তাঁর মান ক্ষুন্ন করা অথবা তা মান্য করা উচিত নয়।' (সুবুলুস সালাম)

আবু হিলাল আস্কারী বলেন, 'অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান আলেমের অনিচ্ছাকৃত দু'-একটি ত্রুটি তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার লাঘব করে না। যেহেতু আল্লাহ যাঁকে বাঁচিয়েছেন তিনি ছাড়া কেউই ভুল থেকে মুক্ত ও পবিত্র নয়। জ্ঞানীরা বলেন, মহৎ সেই ব্যক্তি যার ত্রুটি গণনা করা যায়--।'

আল্লামাহ যাহাবী (রঃ) বলেন, 'জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ ওলামাদের মধ্যে কোন আলেমের সঠিকতা অধিক হলে, তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসা সুপরিচিত হলে, জ্ঞানের পরিসর বেশী হলে, তাঁর বুদ্ধিমত্তা বিকশিত থাকলে, তাঁর সংশুদ্ধি, সংযমশীলতা ও (কিতাব ও সুন্নাহর) আনুগত্য প্রসিদ্ধ হলে তাঁর বিচ্যুতি ক্ষমার্হ। তাঁকে আমরা ভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করতে পারি না। তাঁকে আমরা বর্জনও করতে পারি না; আর পারি না তাঁর অবদান ও সদগুণাদিকে ভুলতে। তবে হ্যাঁ, আমরা তাঁর বিদআত বা ভুলের অনুকরণ বা অনুসরণ করব না। এবং তার জন্য তওবা ও প্রত্যাবর্তনের আশা রাখব।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৫/২৭১)

তিনি মুহাম্মদ বিন নস্ত্র আল মরুযীর তরফ থেকে প্রতিবাদ করে বলেন, 'যখনই কোন ইমাম ছোট-খাট মাসায়েলে মার্জনীয় ত্রুটি করেন তখনই যদি আমরা তাঁর উপর আক্রমণ শুরু করে দিই; তাঁকে বিদআতী বলি এবং তাঁর সাথে বয়কট করি তাহলে কেউই (ত্রুটিহীন) অবশিষ্ট থাকবে না; না ইবনে নস্ত্র, আর না ইবনে মান্দাহ, আর না-ই তাঁরা যাঁরা তাঁদের চেয়েও বড়। পরন্ত আল্লাহই সৃষ্টিকে সত্যের প্রতি পথপ্রদর্শন করেন এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাময়। সুতরাং আমরা আল্লাহর নিকট কুপ্রবৃত্তি ও পরুষতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।'

ইমাম গাযালীর কিছু পদস্খলন উল্লেখ করার পর বলেন, 'গাযালী একজন বড় আলেম। কিন্তু কোন আলেমের জন্য এটা শর্ত নয় যে, তিনি ভুল করবেন না।' (ঐ ১৯/৩৩৯)

‘অতএব আল্লাহ রহম করেন ইমাম আবু হামেদ (গাযালী)কে। জ্ঞান ও মর্যাদায় তাঁর নযীর কে আছে? কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে আমরা তাঁকে পবিত্র বলে দাবী করি না। (যেহেতু তিনি সূফীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন)। আর অসূল (মৌলিক বিষয়ে) কোন তকলীদ (অন্ধানুকরণ) নেই।' (ঐ ১৯/৩৪৬)

যেমন ইমাম নওবী, ইবনে হাজার প্রভৃতি উলামারও বড় বড় ত্রুটি ছিল। তাঁরা আল্লাহর স্পষ্ট গুণাবলীর দূর ব্যাখ্যা (তা'বীল) করতেন এবং সূফীবাদের কতক আকীদাহ তাঁদের মাঝেও ছিল! তবুও আমরা একথায় বিশ্বাসী যে, 'পানির পরিমাণ দুই কুল্লা (২৭০ লিটার) হলে এবং তার উপর সামান্য অপবিত্র পড়লে তাতে কোন প্রভাব পড়ে না। আর ঐ পানি অপবিত্র ও ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে যায় না। যেমন একথাও জানি যে, প্রদীপ্ত সূর্যের পাশে ছোট ছোট তারকারাজি অদৃশ্য ও বিলীন হয়ে যায়।

তাই তো বড় আলেমের বিরাট ইল্মী অবদানের কাছে তাঁর ছোট-খাট দু'-একটি ভুল ধর্তব্য নয়। মুসলিম ঐ ধরনের আলেমদের নিকট হতে তাঁদের সঠিক ইল্ম দ্বারা উপকৃত হতে ভুল করে না। অবশ্য সে তাঁদের ভুলের অনুসরণ করে না এবং তা নিষ্ঠা ও শিষ্টতার সহিত প্রকাশ ও প্রচার করতে এবং সাধারণ মানুষকে সে বিষয়ে সতর্ক করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং তাঁদের অবদানের কাছে তাঁদের ঐ সামান্য ত্রুটির কথা বিস্মৃত হয় এবং তাঁদের ঐ ভুলের কারণে তাঁদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।

তবে বিদআতী ওলামাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। তাদের থেকে মুসলিমকে ভয় করা ও সাবধান থাকা উচিত। তাদের বিদআত থেকে সর্বসাধারণকে সতর্ক করা ওয়াজেব। যাদের সহিত মিলামিশা উচিত নয়। তাদের নিকট ইল্ম অনুসন্ধান করাও অনুচিত। কারণ, তা হলাহল জহর। (আত্মাআলুম)

এক গ্লাস দুধে এক বিন্দু গোমূত্র পড়ার মত বিদআতীর অন্যান্য কীর্তিও পণ্ড এবং দৃষ্টিচ্যুত হয়।

পক্ষান্তরে হে মুহতারাম! আপনি যদি সত্যানুসারী হয়েও পরশ্রীকাতর ও হিংসুকদের শিকার ও তাদের লিখন ও বক্তৃতার বিষয় হন তাহলে মনোযোগপূর্বক এই উপদেশ গ্রহণ করুনঃ-

১- আপনি যে দুই পবিত্র ওহীর জ্যোতির্ময় উজ্জ্বল সত্যে প্রতিষ্ঠিত, সলফে সালেহীনদের যে সঠিক পথের আপনি পথিক সেই সত্য ও সুপথে আপনি নির্বিচল থাকুন। নির্বিকার-চিত্তে তারই প্রতি মানুষকে আহ্বান করুন। আপনার সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীদের অন্যায় মন্তব্য ও কথা এবং গুজব রটনাকারীদের অমূলক প্রচারণা যেন আপনাকে ঐ নীতি ও পথ হতে বিচলিত না করতে পারে। নচেৎ আপনি ভ্রষ্ট হয়ে যাবেন।

হাফেয ইবনে আব্দুল বার (রঃ) এর এই স্বর্ণটুকরার মত কথাটিকে আপনি আপনার ভগ্ন অন্তরাধারে কুড়িয়ে রাখুন; তিনি বলেন, 'যাঁরা আবু হানীফা (রঃ) থেকে রেওয়ায়েত (বর্ণনা) করেছেন, তাঁকে আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত বলেছেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন তাঁদের সংখ্যা তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচকদের অপেক্ষা অধিক। আর আহলে হাদীসদের মধ্য হতে যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেছেন তাঁরা অধিকাংশ তাঁর রায়, কিয়াস এবং ইরজা' (ঈমান অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে উচ্চারণের নাম, আমল ঈমানের মূল অংশ নয় এই অভিমত)এ নিমজ্জিত হওয়ার ফলে তাঁর নিন্দা করেছেন। তাঁর প্রসঙ্গে বলা হত যে, তাঁর ব্যাপারে লোকেদের পরস্পর-বিরোধী ও বিপরীত মন্তব্য এই কথারই স্বাক্ষর বহন করে যে, মানুষটির খ্যাতি ও মর্যাদা আছে। হযরত আলী (রাঃ)কে দেখ না, তাঁর ব্যাপারে দুই প্রকার মানুষ ধ্বংস হয়েছে; অতিভক্তির ভক্ত এবং তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী। হাদীসে এসেছে যে, “তাঁর ব্যাপারে দুই ব্যক্তি ধ্বংস হবে; অতিভক্তির ভক্ত এবং মিথ্যা রচনা করে বিদ্বেষপোষণকারী।” আর এটাই হচ্ছে যশস্বী ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং যিনি দ্বীন ও সম্মানের শীর্ষস্থানে পৌঁছেছেন তাঁর নিদর্শনণ (জামেউ বারানিল ইলল্ম ২১৪৩৯)・・・・

২- ওরা আপনার সম্পর্কে যা বলে তাতে আপনি কোন ক্ষোভ প্রকাশ করবেন না এবং বিষন্নও হবেন না। বরং এ ব্যাপারে আপনি হযরত নূহ (আঃ)কে প্রদত্ত আল্লাহ তাআলার অসীয়ত গ্রহণ করুন; তিনি বলেন, “নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিল যে, 'যারা ঈমান এনেছে তারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনো ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে তার জন্য তুমি ক্ষোভ করো না।” (কুঃ ১১/৩৬)

আর সেই অসিয়ত গ্রহণ করুন যা হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইকে দান করেছিলেন; “আমিই তোমার (সহোদর) ভাই, সুতরাং ওরা যা করত তার জন্য তুমি দুঃখ করো না।” (কুঃ ১২/৩৬)

জেনে রাখুন যে, শয়তান প্রকৃতির মানব ও দানব নবীগণের শত্রু ছিল; যারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করত। (কুঃ ৬/১১২) আর আপনি নবীর ওয়ারেস। সুতরাং আপনার যে দুশমন থাকবে না, তা নয়।

৩- আপনার বিরুদ্ধে এই গুজব বা সমালোচনা যেন আপনাকে আপনার ন্যায্য ভূমিকা ও কর্তব্য থেকে অপসারিত না করে ফেলে। যেহেতু আপনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সহিত আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্ববানকারী। অতএব তাঁরই উপর ভরসা রেখে আপনাকে ঐ পথ ও পদেই সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা উচিত। আর আল্লাহ সত্যানুসারী সৎলোকদের অভিভাবক। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, “সম্ভবতঃ তুমি আল্লাহ যা তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছেন তার কিছু বর্জন করবে এবং ব্যথিত হবে এই জন্য যে, তারা (তোমার সম্পর্কে) বলে, 'কেন তার উপর ধনভান্ডার অবতীর্ণ হয় না অথবা তার সাথে কোন ফিরিশা আসে না?' (কিন্তু তা করা তোমার উচিত নয়।) -আসলে তুমি তো কেবল সতর্ককারী। এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ের দায়িত্বভার নিয়েছেন।” (কুঃ ১১/১২)

৪- আপনার চরিত্র ও আচরণে, অন্তর ও অভ্যন্তরে যেন অনাবিলতা, স্বচ্ছলতা ও সৃষ্টির প্রতি মমত্ব থাকে। যাতে আপনি অপরকে সহ্য করতে পারেন, রাগ সংবরণ করতে পারেন এবং যারা আপনার ইজ্জতের পিছে লেগেছে তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে বিমুখতা অবলম্বন করতে পারেন।

তাদের ঐ সমস্ত রটনা নিয়ে আপনি স্বীয় হৃদয়াত্মকে ব্যাপৃত করে আত্মগ্লানির শিকার হবেন না। বরং আপনি 'বোধ-স্বাতন্ত্র্য' ব্যবহার করুন। এটাই আত্মর মহানুভবতা, আকর-সারকতা এবং মুসলিমের সচ্চরিত্রতার পরাকাষ্ঠা। এতে আপনি আপনার প্রতি অন্যায়কারী জালেমকে বীতস্পৃহ করে পরিবর্তিত ও নিরস্ত করতে সক্ষম হবেন।

(আপনি যেমনই হন না কেন, যত ভালোই হন না কেন তবুও সমালোচকদের বিরুদ্ধ সমালোচনার কবল থেকে রেহাই পাবেন না। কারণ, একই সঙ্গে আপনি সকলের মনমত অবশ্যই হতে পারবেন না।

একদা এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছিল। সঙ্গে ছিল একটি গাধা ও তার এক ছেলে। ছেলেটিকে গাধার পিঠে বসিয়ে নিজে পায়ে হেঁটে পথ চলছিল। তা দেখে একদল লোক আপোসে বলতে লাগল, 'ছেলেটা কত বড় বেআদব! নিজে সওয়ার হয়ে বাপকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!' এ সমালোচনা ছেলেটির কানে এলে সে গাধার পিঠ থেকে নেমে বাপকে বসতে বলল।

কিছুদূর অগ্রসর হতেই আর একদল লোক তাদেরকে দেখে আপোসে বলল, 'লোকটা কত বড় নির্দয়! নিজে সওয়ার হয়ে ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল! দু'জনে চাপলেই তো হয়।'

এ সমালোচনা শুনে লোকটি ছেলেটিকেও গাধার পিঠে তুলে নিল। কিন্তু আরো কিছুদূর অগ্রসর হতেই আরো একদল লোকের সমালোচনা তাদের কানে এল; তারা বলল, 'ওঃ! লোকদু'টি কত নিষ্ঠুর! এক সঙ্গে দু'জন গাধার পিঠে চেপেছে, গাধাটার কত না কষ্ট হচ্ছে!'

এ মন্তব্য শুনে দু'জনেই গাধার পিঠ থেকে নেমে পায়ে হেঁটেই সফর করতে লাগল। কিন্তু পথিমধ্যে আরো একদল লোক তাদের সমালোচনা করে বলল, 'আরে! লোক দু'টো কত বোকা দেখ! সঙ্গে সওয়ার থাকতে হেঁটে হেঁটে পথ চলছে!'

চেষ্টা সত্ত্বেও কোন অবস্থাতেই বিরুদ্ধ মন্তব্য ও সমালোচনার হাত থেকে তারা নিজেদেরকে বাঁচাতে না পেরে পরিশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হল যে, সকল মন্তব্যকে উপেক্ষা করে যা করা ভালো তা করে যাওয়াই ভালো।

জেনে রাখুন, হরিণ কুকুরের চেয়ে অধিকতর বেগে দৌড়াতে পারে। কিন্তু যখনই সে তার পশ্চাতে কুকুরের দৌড় ও ধাওয়া দেওয়ার কথায় ভ্রূক্ষেপ করে মনে স্থান দেয় তখনই তার পায়ে জড়তা আসে; ফলে সে কুকুরের অনর্থক অত্যাচার থেকে বাঁচতে অক্ষম হয়। অন্যথায় কুকুর তার নাগাল পায় না। সুতরাং আপনি সত্যের অনুসারী হলে এবং বাতিল পন্থীরা আপনার পেছনে লাগলে সর্বদা এই প্রবাদ মনে রাখবেন,

**হাথীচলতা রাহেগা, কুত্তা-ভুঁকতা রাহেপা।'………

সর্ববিষয় তার যথার্থতার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফেনায়িত বস্তু তো ক্ষণকাল পরেই স্বতঃ বিলীন হয়ে যায়। (তাসনীফুন্নাস, বকর আবু যায়দ ৭০-৭২পৃঃ)

৫- আপনি বারংবার আত্মসমালোচনা করুন। নিজের দোষ আপনার নিকট ধরা পড়লে উদার মনে তা স্বীকার করুন। হঠকারিতা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ না করে হকের প্রতি প্রত্যাবর্তন করুন। যেহেতু অন্যায় স্বীকার ও ত্যাগ করে ন্যায়ের প্রতি ফিরে আশায় মানহানি হয় না বরং মর্যাদাবর্ধন হয়।

পক্ষান্তরে বিপথগামী কোন আলেমের কোন ভ্রান্ত মত বা রায়কে খন্ডন করতে বা গঠনমূলক সমালোচনা করতে কতকগুলি নিয়ম জানা ও মানা আবশ্যিক:-

১- তাতে ইখলাস, হিতৈষিতা, অপরের ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। নিজের কীর্তিত্ব বা বড়াই প্রদর্শন উদ্দেশ্য না হওয়া। ভাষায় এমন ভাব-ভঙ্গিমা ও তীক্ষ্ণতা বা তিক্ততা থাকা উচিত নয়, যাতে বিপক্ষের মানহানি হয় অথবা তার যশে আঘাত লাগে। কারণ তা হলে 'হক' গ্রহণ করার আশা তার তরফ থেকে খুবই কম হয়ে থাকে। বরং অধিকভাবে বাতিলেই তার অবিচল ও অবিমৃশ্য থাকার আশঙ্কা থাকে।

২- খন্ডনে শরয়ী নসীহত ব্যবহার করা, যাতে সংহতি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়ে যায়।

৩- এই বিরুদ্ধ-সমালোচনায় আল্লাহভীতি ও সংযমশীলতা রাখা।

৪- মুসলিম ভায়ের প্রতি সুধারণা রাখা এবং খেয়াল রাখা যে, ধারণা করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।

৫- খন্ডনীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট জ্ঞান ও ধারণা হওয়া এবং ন্যায় ও ইনসাফের সহিত খণ্ডন বা গঠনমূলক সমালোচনা করা। অন্যায়ভাবে বা অজান্তে কোন বিষয়ে কটুক্তি ও মন্তব্য করা উচিত নয়।

৬- অপরের দোষ-গুণ বর্ণনায় ন্যায়পরায়ণতা ব্যবহার করা।

৭- অবদান, উপকার ও মাহাত্ম্যের আধিক্যকে দৃষ্টিচ্যুত না করা।

৮- লোকেদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দানে ন্যায্যতা রাখা।

৯- ভক্তি ও বিদ্বেষে সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করা।

১০- এক জনের ভুলকে এক জামাআতের সাধারণ ভুল অথবা কারো চারিত্রিক ত্রুটিকে নীতির ত্রুটি মনে না করা।

মোট কথা, এ বিষয়ে অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। যুগ্ম কিয়ামতের অন্ধকার, প্রত্যেক কল্যাণের মূল হচ্ছে ইল্ম (সঠিক জ্ঞান) ও ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রত্যেক অকল্যাণের মূল হচ্ছে মূর্খতা ও অন্যায়। (ওয়াকেউনাল মুআসির, মুহাম্মদ উসাইমীন)

আল্লাহর তরফ তেকে অনুপ্রাণিত ও তওফীকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আলেম; যিনি আল্লাহর তওহীদ মান্য ও সম্প্রচার করেন, ইখলাস ও সওয়াবের উদ্দেশ্য নিয়ে, যথাসাধ্য পরিপূরক বিষয় নিয়ে, তাঁর প্রকাশ্য ও গুপ্ত ইবাদত ও আনুগত্য করে আল্লাহর জন্য হিতোপদেষ্টা হন।

আল্লাহর কিতাবের জন্য হিতৈষী হন, তাতে উল্লেখিত যাবতীয় বিষয়াদির উপর বিশ্বাসস্থাপন করে ও ঈমান এনে, তা এবং তার সম্পৃক্ত যাবতীয় ইল্ম শিক্ষা করার জন্য প্রয়াসী হয়ে।

রসূল ﷺ এর জন্য হিতোপদেষ্টা হন, আনীত দ্বীনের মুখ্য ও গৌণ সকল বিষয়ের উপর ঈমান এনে, আল্লাহর মহব্বতের পর তার মহব্বতকে সকল ব্যক্তি ও বস্তুর মহব্বতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এবং তাঁর শরীয়তের গুপ্ত ও প্রকাশ্য সমস্ত বিষয়ে কেবল তাঁরই অনুকরণ ও অনুসরণ করে।

মুসলিম সমাজের ইমাম, নেতা ও ওলামাবর্গের জন্য হিতোপদেষ্টা হন, তাঁদের জন্য শুভকামনা করে এবং সেই শুভ ও মঙ্গল সাধনে কথা ও কর্ম দ্বারা তাঁদের সহযোগীতা করে, তাঁদের প্রজা ও অনুগামীদের আনুগত্য ও বশ্যতার আশা রেখে এবং তাঁদের বিরোধিতা, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ কামনা ও প্রকাশ না করে।

মুসলিম জনসাধারণের জন্য হিতোপদেষ্টা হন, নিজের জন্য যা পছন্দ করেন তা অপরের জন্যও পছন্দ করে, যা নিজের জন্য অপছন্দ করেন তা অপরের জন্যও অপছন্দ করে, যথাসাধ্য যে কোন উপায়ে অপরের জন্য উপকার ও কল্যাণ সাধন করে, তাঁর ভিতর-বাহির এবং কথা ও কর্মকে এক করে। সকলকে এই সুন্দর শাশ্বত মানবতার দ্বীনের প্রতি আহ্বান করে ও তাদেরকে দোযখের মুখ হতে রক্ষা করে।

এই তো সেই আলেম, যাঁর চরিত্রে ও পরিবারে অন্যের নসীহতের দরকার পড়ে না এবং এই তো সেই মুবাল্লেগ, যাঁর অধীনস্থ লোক, ছাত্র ও মাদ্রাসার জন্য বাইরের কোন তবলীগের প্রয়োজন হয় না।

وصلى الله على نبينا مد وعلى آله وصحبه أ، ومن تبعهم بإحسان إ يوم الدين.

** সমাপ্তি**

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00