📄 নিষ্ঠা ও শিষ্টাচারিতা
যে ব্যক্তি যা কিছু পাঠ বা শ্রবণ করে সেই তদ্দ্বারা উপকৃত হতে পারে এমনটা নয়। যেহেতু পড়া ও শোনার সাথে মনের যোগ না হলে তা নিরর্থক হয়।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'কুরআন দ্বারা যদি উপকৃত হতে চাও তবে তেলাঅতের সময় তোমার হৃদয়কে উপস্থিত কর, শ্রবণকালে উৎকর্ণ থাক এবং মনে মনে সেই পরিবেশে হাজীর হও যে পরিবেশের মানুষকে আল্লাহ তাআলা ঐ আয়াত দ্বারা সম্বোধন করেছেন। যেহেতু তা তাঁর দূত মারফৎ তোমার জন্যও সম্বোধন। আল্লাহ পাক বলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرِى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
অর্থাৎ, “নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য যার হৃদয় আছে অথবা নিবিষ্টচিত্তে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে। (সূরা ক্বাফ ৩৭ আয়াত)
যেহেতু পরিপূর্ণ প্রভাব-প্রভাবশালী উপযোগী কথা, গ্রহণকারী স্থান বা পাত্র, প্রভাব লাভ করার শর্ত এবং তার কোন বাধা না থাকার অন্যসাপেক্ষ। উক্ত আয়াত এই সবকিছুকে সংক্ষিপ্ত শব্দে বর্ণনা করেছে।
'নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে' এই বাণী দ্বারা সূরার প্রথম থেকে এই আয়াত পর্যন্ত সমস্ত কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং এটাই হল প্রভাবশালী উপযোগী কথা। 'যার হৃদয় আছে' এ কথায় ইঙ্গিত রয়েছে গ্রহণকারী পাত্রের প্রতি, উদ্দেশ্য জীবিত হৃদয়; যা আল্লাহর বাণী বুঝতে সক্ষম। যেমন তিনি বলেন, “এতো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন; যার দ্বারা (মুহাম্মদ জাগ্রত-চিত্ত) জীবিত ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করতে পারে।” (সূরা ইয়াসীন ৬৯-৭০ আয়াত)
'উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে' অর্থাৎ তার কর্ণকে খাড়া করে এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে তাকে যা বলা হচ্ছে তার প্রতি সংযোগ করে। আর এটা হচ্ছে প্রভাব লাভের শর্ত। 'নিবিষ্টচিত্তে' বা 'উপস্থিত হয়ে' অর্থাৎ নিজের মন ও হৃদয়কে তাতে হাজির করে, অন্যস্থানে ফেলে না রেখে বা উদাসীন না হয়ে শ্রবণ করা। আর এর দ্বারা প্রভাবলাভের প্রতিবন্ধী বিষয়সমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে; আর তা হল, হৃদয়ের ঔদাস্য, যা বলা হচ্ছে তার জন্য মনের অনুপস্থিতি এবং প্রণিধানে অমনোযোগিতা।
সুতরাং যখন প্রভাবকারী-আর তা হল কুরআন- ও গ্রহণকারী পাত্র -আর তা হল জাগ্রতচিত্ত একত্রে, সমরেত হয় এবং সর্বশর্ত পূরণ হয় আর তা হল উৎকর্ণতা, অতঃপর প্রতিবন্ধক থেকে খালি হয় আর-তা হল মনের অনবধানতা, অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা হতে ঔদাস্য বা অন্য কোন বিষয়ে মনোযোগী হওয়া-তাহলেই প্রভাব অর্জন হয়; অর্থাৎ কুরআন ও উপদেশ দ্বারা উপকৃত হতে পারা যায়।' (আল-ফাওয়াইদ ৫পৃঃ)
ইল্ম সেই বস্তু যাতে মনোযোগী, নিষ্ঠাবান ও জাগ্রতচিত্ত না হলে লাভ করা যায় না। কবি বলেন,
'বই পড়ে কিন্তু যে নাহি দেয় মন,
কেমনে সে জন বল পাবে জ্ঞান ধন?
প্রদীপে না দিয়ে তেল বাতি যদি জ্বালো,
কখনো কি সে প্রদীপ দিয়ে থাকে আলো?'
আর কথায় বলে, 'কলম কালি মন, লিখে তিনজন।'
📄 শিক্ষকের প্রতি সমীহ
অনুরূপভাবে ইল্মের আরো এক নীতি, ওস্তায ও শিক্ষকের প্রতি বিনয়, শিষ্টতা ও সমীহ প্রদর্শন। যা না হলে শিক্ষক ও ছাত্রের সংযোগ থাকে না। দেওয়া-নেওয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ থাকে না। ফলে উভয়ের কর্তব্য পালন তো হয়; কিন্তু ফললাভ হয় না। তাই তালেবে ইল্মের উচিত, নিজ ওস্তাযের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। বিনয়ের সাথে তাঁর সেবা করা।
শা'বী বলেন, 'একদা যায়দ বিন সাবেত এক জানাযার নামায পড়লেন। অতঃপর তাঁর প্রতি একটি অশ্বতরী পেশ করা হল; যাতে তিনি সওয়ার হন। তৎক্ষণাৎ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এসে সওয়ারীর পা-দানে ধরলেন। (যাতে তিনি সহজে চড়তে পারেন)। যায়দ তাঁকে বললেন, 'ছাড়ুন, হে রসূলুল্লাহ ﷺ এর পিতৃব্যপুত্র!' ইবনে আব্বাস বললেন, 'ওলামাদের সহিত এইরূপ ব্যবহারই করতে হয়।' (ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, হাকেম)
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি আমাকে একটি হরফও শিখিয়েছে আমি তার গোলাম। সে ইচ্ছা করলে আমাকে বিক্রয় করতে পারে। নচেৎ ইচ্ছা করলে আমাকে গোলাম করে রাখতে পারে।'
সলফে সালেহীনগণ স্ব-স্ব ওস্তাযের বড় সম্মান করতেন। সমীহর সহিত শিক্ষকের প্রতি তাকাতে তাঁদের মনে ত্রাস সঞ্চার হত।
মুগীরাহ বলেন, 'যেমন আমীরকে ভয় করা হয় তেমনি আমরা (আমাদের ওস্তায) ইব্রাহীম নখয়ীকে ভয় করতাম।'
আইয়ুব বলেন, 'তালেবে ইল্ম হাসানের নিকট তিন বছর ধরে (দর্সে) বসত কিন্তু তাঁর ত্রাসে কোন বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতে সাহস করত না।'
ইসহাক বলেন, 'আমি ইয়াহয়্যা কাত্তানকে আসরের নামায পড়ে মসজিদের মিনার গোড়ায় হেলান দিতে দেখতাম। তাঁর সম্মুখে আলী বিন মাদানী, শাযাকুনী, আম্র বিন আলী, আহমদ বিন হাম্বাল, ইয়াহয়্যা বিন মাঈন প্রভৃতি খাড়া হয়ে তাঁকে হাদীস বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। তাঁরা একই অবস্থায় মাগরেবের নামায নিকটবর্তী হওয়া পর্যন্ত পায়ের উপর ভর করে দণ্ডায়মান থাকতেন। তবুও তিনি (কাত্তান) তাঁদের কাউকেও বলতেন না যে, 'বস।' আর তাঁরাও তাঁর ত্রাস ও সমীহতে বসতে সাহস করতেন না!'
ইবনুল খাইয়াত মালেক বিন আনাসের প্রশংসায় বলেন, 'তিনি কোন বিষয়ে উত্তর না দিলে তাঁর ত্রাসে দ্বিতীয়বার আর কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করত না। সমস্ত জিজ্ঞাসুরা চিবুক নত করে থাকত। তাঁর উপর উদ্ভাসিত হত প্রবল ব্যক্তিত্বের প্রভা এবং পরহেযগারীর মাহাত্ম্য। তিনি ভয়াবহ ছিলেন অথচ তিনি কোন শাসক ছিলেন না।'
আহমদ বিন হাম্বল খালাফ আহমারকে বলেছিলেন, 'আমি আপনার সম্মুখে ছাড়া বসিনা, আমরা আমাদের শিক্ষকের নিকট বিনয়ী হতে আদিষ্ট হয়েছি।'
সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত, তার সকল বিষয়ে ওস্তাযের কথা মানা। তাঁর অভিমত ও তদবীবের বাইরে কোন কাজ না করা। সদা তাঁর সহিত দক্ষ চিকিৎসকের পার্শ্বে এক রোগীর মত অবস্থান করবে। যা করতে ইচ্ছা করবে সে বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেবে। অন্যান্য সকল কর্মে তাঁর সম্মতি অবশ্যই নেবে। তাঁর প্রতি গভীর সমীহ রাখবে। তাঁর সেবার মাধ্যমে আল্লাহর সামীপ্য আশা করবে। আর একথা জানবে যে, ওস্তাযের খাতিরে লাঞ্ছনা পাওয়া মর্যাদা, তাঁর জন্য বিনয়াবনত হওয়া গর্ব এবং তাঁর নিকট নিচু হওয়া উন্নতির কারণ।
তালেবে ইল্মের কর্তব্য, তার ওস্তাযের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা-দৃষ্টিতে তাকানো। সকল বিষয়ে তাঁর বিরক্তি ও বিরাগকে এড়িয়ে চলা। তাঁর সকল অবস্থা ও উপস্থিতিকে পরোয়া করে চলা। সলফরা এরূপই করতেন। তাঁদের অনেকে মনে মনে দুআ করতেন, 'আল্লাহ! তুমি আমার দৃষ্টি হতে আমার ওস্তাযের ত্রুটিকে গোপন কর। আর আমার নিকট হতে তাঁর ইলমের বর্কত তুমি ছিনিয়ে নিওনা।' (তাযকিরাতুস সামে' ৮৮পৃঃ)
ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেন, 'আমি মালেক (রঃ) এর নিকট তাঁর ভয়ে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে (বই বা খাতার) পাতা উল্টাতাম; যাতে তিনি উল্টানোর শব্দ না শুনতে পান।'
তালেব আমীরজাদা হলেও ওস্তাযের সামনে বিনতির সাথে বসবে। যেহেতু ইল্ম ও আলেমের সম্মান সকল পার্থিব বিষয়ের ঊর্ধ্বে। ওস্তাযকে সম্বোধনকালে 'আপনি, লেন-দেন' প্রভৃতি বলবে। নাম ধরে না ডেকে সম্মানসূচক উপাধি দ্বারা ডাকবে। তাঁর অনুপস্থিতকালেও তাঁর নাম নেবে না, নিলেও সম্মানপূর্ণ খেতাব জুড়ে নাম নেবে। তাঁর অবর্তমানেও 'উনি-তিনি, বলেন' ইত্যাদি ব্যবহার করবে। কোন প্রকার অসম্মানসূচক আখ্যায়নে তাঁর উল্লেখ করবে না; যেমন বহু জাহেল অবজ্ঞার সাথে দ্বীনের আলেমকে তুচ্ছজ্ঞান করে 'মোল্লাজী, মৈলিবি' ইত্যাদি বলে আখ্যায়ন করে থাকে। আর তা এই কারণে যে, 'তাঁদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত' (?) গীর্জা বা রকেট পর্যন্ত নয় তাই! সত্যিই তো! যে দেশের লোকেরা কাপড়ই পরে না সে দেশে ধোপার আর কি কদর থাকতে পারে?
তালেবে ইল্ম ওস্তাযের সমস্ত অধিকার ও হক আদায় করবে; তাঁর অনুগ্রহ ও অবদান বিস্মৃত হবে না। তাঁর শ্রদ্ধার সংরক্ষণ করবে, তাঁর গীবতের প্রতিবাদ করতে, তাঁর জন্য রাগান্বিত হবে; তা না পারলে সেই গীবতের মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করবে। সর্বদা তাঁর জন্য দুআ করবে। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য দুআ এবং তাঁর অসহায় পরিবারের যথাসম্ভব তত্ত্বাবধান করবে।
শিক্ষার ময়দানে তালেবে ইল্মের উচিত, ওস্তাযের ক্রোধ ও বিভিন্ন কোপজ দোষের সম্মুখে ধৈর্য ও সহ্যশীলতা অবলম্বন করা। প্রহার করলেও দাহ বা মাদ্রাসা ত্যাগ করে পলায়ন না করা অথবা তাঁর বিরুদ্ধে অভিভাবক অথবা শাসকগোষ্ঠীর নিকট অভিযোগ না করা। করলে তা হবে বড় আহাম্মকী।
একদা আ'মাশ তাঁর এক ছাত্রের উপর ক্রোধান্বিত হলেন। অপর এক ছাত্র ঐ ছাত্রকে বলল, 'যদি উনি আমার প্রতি এমন ক্রোধ দেখান যেমন তোমাকে দেখিয়েছেন তাহলে আমি আর উনার নিকট ফিরব না।' আ'মাশ শুনলে তিনি বললেন, 'তাহলে সে তো আহম্মক। আমার অসদাচারণের কারণে সে তার লাভজনক জিনিস ছেড়ে চলে যাবে।'
সুফিয়ানকে বলা হল, 'কত লোক পৃথিবীর সারা দেশ হতে আপনার নিকট আসছে তাদের উপর আপনি ক্রোধান্বিত হন? সম্ভতঃ ওরা আপনাকে ত্যাগ করে চলে যাবে।' তিনি উত্তরে বললেন, 'তারা তোমার মতই আহাম্মক তাহলে; যদি তারা আমার অসদাচরণের কারণে তাদের উপকারী বস্তু ছেড়ে চলে যায়।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৯০পৃঃ, আল জামে'২২৩পৃঃ)
কিছু সলফ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি শিক্ষার লাঞ্ছনার উপর ধৈর্য ধারণ করে না সে তো সারা জীবন মূর্খতার অন্ধত্বে থাকে। আর যে ব্যক্তি সবর করে লিখা-পড়া করে দুনিয়া ও আখেরাতে তার সম্মানলাভ হয়।'
ইবনে আব্বাস বলেন, 'ছাত্র হয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করেছি তাই আজ শিক্ষক হয়ে সম্মান লাভ করছি।'
শিক্ষকের উপর ক্রোধ প্রকাশ ছাত্রের জন্য সমীচীন নয়। যেহেতু শিক্ষক তাকে যে কড়া কথা বলেন অথবা প্রহার করেন তা তো তার মঙ্গলের জন্যই করেন, তাতে শিক্ষকের কোন স্বার্থ নেই। অনুরূপভাবে (দলীল ও যুক্তির ভিত্তিতে স্বমত ভিন্ন হলেও) শিক্ষকের সহিত তর্কাতর্কি করাও তার জন্য সঙ্গত নয়। যেহেতু এতে বহু অমঙ্গল আছে যা তার ইলমের আকাশে মেঘ ডেকে আনে। তাই মাইমুন বিন মিহরান বলেন, 'তোমার চেয়ে যে অধিক জ্ঞানী তার সহিত তর্ক করো না। যদি তা কর তবে সে তোমার উপর হতে তার ইল্ম রুখে নেবে এবং তার কোন নোকসান হবে না।'
যুহরী বলেন, 'সালামাহ ইবনে আব্বাসের সহিত তর্ক করত, যার ফলে বহু ইলম হতে সে বঞ্চিত ছিল।' (জামেউ বায়ানিল ইল্যু ১৭১ পৃঃ)
মোটকথা, তালেবে ইল্ম যদি তার সদাচরণ, নিষ্ঠা ও শিষ্টতা দ্বারা ওস্তাযকে সমীহ এ শ্রদ্ধা করে আনন্দিত করতে পারে তবে শিক্ষক তাঁর ইলমের পাত্র তার পাত্রে ঢেলে দেবেন। নচেৎ মনের মধ্যে 'কিন্তু' সৃষ্টি করে দিলে তিনি তার জন্য হিতাকাঙ্খী না হয়ে কেবল দায়িত্ব পালনকারী হবেন।
তদনুরূপ মুদার্রেসের উপর অসম্মানজনক চাপ, কমিটি বা মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অহেতুক বা অমূলক টিপ্পনী বা ফোড়ন, তাঁদের সম্মানে আঘাত লাগে এমন কর্তৃত্ব ইত্যাদি প্রকৃত ইলমের স্বার্থে নয়। যাতে ছাত্রদের প্রকৃত উন্নতির কথা ভাবতে গেয়ে তাঁদের মন ভেঙ্গে হিতে বিপরীত হয়। সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙ্গে বসে থাকে। যার কারণেই অনেক মাদ্রাসায় তালাও পড়ে যায়।
তালেব ইলমের উচিত, ওস্তাযকে কোন প্রকার বিরক্ত ও 'ডিস্টার্ব' না করা। নিদ্রিত থাকলে কোন অজরুরী কাজের জন্য বা কোন প্রশ্নের জন্য অথবা সবক বুঝে নেওয়ার জন্য জাগ্রত না করা, দরজা বন্ধ থাকলে অনুমতি না নিয়ে তাঁর রুমে প্রবেশ না করা, আদবের সহিত অতি ধীরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া এবং অনুমতি দিলে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। ওস্তাযের সামনে বা ক্লাসে গেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এবং শরীরের দুর্গন্ধ দূর করে যাবে। যেহেতু তাঁর মজলিস ইল্মের মজলিস, যিক্র ও ইবাদতের মজলিস।
তিনি কোন কাজে ব্যস্ত থাকলে নিজের কোন কাজের জন্য তাঁর নিকট যাবে না। সেখানে পৌঁছে তিনি যদি আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেন অথবা অপেক্ষা করতে বলেন তাহলে অপেক্ষা করবে, নচেৎ সালাম দিয়ে সত্বর তাঁর নিকট হতে বের হয়ে যাবে। আর তিনি অনুমতি দিলেও বেশীক্ষণ তাঁর সময় নষ্ট করবে না।
ওস্তাযের নিকট বা ক্লাসে গেলে তার অন্তরকে সমস্ত ব্যস্ততা থেকে খালি করবে এবং মস্তিষ্ককে স্বচ্ছ করবে। তন্দ্রা, ক্রোধ অতি ক্ষুধা বা পিপাসা ইত্যাদির অবস্থায় যাবে না। যাতে তার হৃদয় প্রশস্ত হয় এবং যা বলা হয় তা আয়ত্ত করতে পারে।
সর্বদা চেষ্টা করবে যেন একটা ক্লাসও ছুটে না যায়। কারণ শিক্ষকের নিকট সে দস্ ছুটে যায় তার কোন বিকল্প ও বিনিময় নেই।
অসময়ে ওস্তাযের নিকট পড়া বুঝতে যাবে না। নিজের জন্য তাঁর নিকট হতে কোন নির্দিষ্ট সময় অথবা স্থান নির্ধারিত করতে চাইবে না; যদিও সে আমীরজাদা বা ধনীর ছেলে হয়। যেহেতু তাতে ওস্তায ও অন্যান্য ছাত্রদের উপর অহংকার ও আহাম্মকি প্রদর্শন হয়।
ক্লাসে পৌঁছে সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিবে, ব্যাখ্যা না চললে ওস্তাযকে বিশেষ অভিবাদন জানাবে। অতঃপর মজলিস যেখানে শেষ হয়েছে তার একপ্রান্তে নীরবে বসে যাবে। ক্লাস চলাকালীন কাউকে ডিস্টার্ব অবশ্যই করবে না। একেবারে ওস্তাযের মুখোমুখি অথবা পাশাপাশি বেআদবের মত বসবে না। তাঁর সম্মুখে বিনয় ও শিষ্টতার সহিত বসবে, তাঁর প্রতি তাকিয়ে উৎকর্ণ হবে, নিজ দেহ-মন সবকিছু দ্বারা তাঁর প্রতি মুখ করে বসবে। তিনি যা বলছেন বা ব্যাখ্যা করছেন তা নিবিষ্টচিত্তে শ্রবণ করবে ও বুঝবে। এসময়ে এদিকে ওদিক দৃষ্টি ফিরাবে না। বিশেষ করে তাকে সম্বোধন করে কথা বললে অপ্রয়োজনে তাঁর নিকট হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। পার্শ্বে বা বাইরে কোন শব্দ পেলেও ফিরে তাকাবে না। তাঁর সম্মুখে জামা-কাপড় বা চাদরাদি ঝাড়বে না। জামার হাতা গুটাবে না। হাত বা পায়ের আঙ্গুল, দাড়ি, নাক, দাঁত, কলম বা সিট ইত্যাদি নিয়ে খেলা করবে না। নাক বা দাঁতের ময়লা সাফ করবে না, ঘা থাকলে তা খুঁটবে না, হাই বা হাঁচির সময় মুখে রুমাল বা হাত রেখে নেবে। হাঁচির সময় খুব জোরে শব্দ না করার চেষ্টা করবে, হো-হো করে সশব্দে হাই তুলবে না।
তার সামনে কিছুতে হেলান দিয়ে অথবা পায়ের উপর পা চাপিয়ে অথবা তাঁর দিকে পা বাড়িয়ে অথবা তাঁর চেয়ে উঁচু জায়গায় বসবে না। অপ্রয়োজনে অধিক কথা বলবে না। বেআদবীপূর্ণ অশ্লীল বা হাস্যকর কোন কথা বা গল্প শুনাবে না। অকারণে হাসবে না। হাসলে মুচকি হাসবে। অপ্রয়োজনে অধিকাধিক গলা ঝাড়বে না। তাঁর সহিত হাত হিলিয়ে বা চোখ ঠেরে কথা বলবে না। তাঁর মজলিসের বিশেষ আদব করবে; যেমন সলফে সালেহীনরা করতেন। তাঁরা ইল্মী মজলিসে এমন একাগ্রতার সহিত বসতেন এবং এমন ধীর ও স্থির থাকতেন যেন তাঁদের মাথায় কোন পাখী বসে থাকত।
ওস্তাযের কোন কথার উপর প্রতিবাদ প্রয়োজন হলে সশ্রদ্ধ প্রতিবাদ আদবপূর্ণ শব্দে পেশ করবে। তিনি কোন কাহিনী, কবিতা বা তথ্য পেশ করলে এবং তা তার পূর্ব হতে জানা থাকলেও বিস্ময়ের সাথে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করবে। জ্ঞান-পিপাসা ও জানার আগ্রহ প্রকাশ করে তা শোনা মাত্র আনন্দিত হবে। এই ভাব প্রকাশ করবে যে, সে যেন তা কখনো শুনেনি; আজ সে নতুন শুনল।
তাঁর ব্যাখ্যাদানের পূর্বে কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা, তাঁর উত্তর দেওয়ার পূর্বে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবে না। অথবা সে তার ব্যাখ্যা বা উত্তর জানে তা ভাবে-ভঙ্গিতেও প্রকাশ করবে না। মজলিসে তাঁর কথা কাটবে না। তাঁর বক্তৃতা চলাকালীন অন্য কারো সহিত মুখে বা ইঙ্গিতে কথা বলবে না।
তাঁকে কোন জিনিস দেওয়ার সময় ছুঁড়ে দেবে না। আদবের সহিত ধরিয়ে বা রেখে দেবে। কোন প্রয়োজন না হলে ওস্তাযের সামনে বা পাশাপাশি চলবে না; বরং তাঁর পিছনে চলবে। তিনি পায়ে হেঁটে চললে তাঁর সহিত সওয়ার হয়ে চলবে না। পথে তাঁর সহিত সাক্ষাৎ হলে আগে আগে স্মিতমুখে সালাম করবে এবং তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করবে।
তিনি কোন বিষয়ে পরামর্শ না চাইলে তাঁকে পরামর্শ দিতে যাবে না। পরামর্শ চাইলে বিনয়ের সাথে উচিত পরামর্শ দেবে। অবশ্য কোন বিপদ হতে সতর্ক করতে কোন সময়ই ভুলবে না।
দস্ চলাকালীন কোন বিষয় বুঝতে না পারলে আদবের সহিত তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে। জিজ্ঞাসা করতে কোন লজ্জা বা কুণ্ঠাবোধ করবে না। অথবা অহংকারের সাথে প্রশ্ন করা অপ্রয়োজন ভাববে না। আবার তাঁকে পেঁচে ফেলার জন্য অথবা পরীক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত প্রশ্নাদি করবে না। কোন বিষয় বুঝতে না পারলে এবং ওস্তায তাকে বুঝতে পেরেছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলে স্পষ্ট 'না' বলতে কোন লজ্জা বা সংকোচ নেই। না বুঝে 'হুঁ-হুঁ' করে ভবিষ্যতের জন্য বোঝা বাড়ানো উচিত নয়। আবার বুঝেও না বুঝার ভান করে তাকে বিরক্ত করা বৈধ নয়। কথায় বলে, 'বুঝেও যে বুঝেনা তাকে বুঝাবে কে? আর না বুঝে যে হুঁ-হুঁ করে তাকে ভূতে ধরেছে।'
অজানা বিষয়ে প্রশ্ন করা কোন দোষের নয়। প্রশ্ন করলে যদি কেউ বোকা মনে করে করুক, তবুও প্রশ্ন ত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ, প্রশ্ন করে যে কিছু জানতে চায় সে বোকা হয় মাত্র দু'-পাঁচ মিনিটের জন্য। কিন্তু জানার ভান করে যে কখনও প্রশ্ন করে না সে বোকা থাকে সারাটা জীবন।
কোন সবক বুঝতে বা তৈরী করতে কঠিন ও কষ্টবোধ হলেও নিরাশ হওয়া চলবে না। 'আরবী, পারবি তো পারবি, নচেৎ হেগে-মুতে ছাড়বি' কথায় ঘাবড়ে গেলে হবে না। একবারে না বুঝলে ওস্তাযের নিকট বারবার বুঝে নিয়ে, সহপাঠীদের সহিত বারংবার পুনরালোচনা ও অভ্যাস করে, একাধিকবার নিজে পড়ে মুখস্থ করে তবেই ক্ষান্ত হতে হবে। সবককে শুরু থেকেই কোনক্রমেই কঠিন মনে করা চলবে না। 'বুঝতে পারছি না' বলে হাত গুটিয়ে বসে গেলে হবে না। মনের মাঝে আনতে হবে অধ্যাবসায় ও সাধনার ঝড়।
কথিত আছে যে, জনৈক ছাত্র মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে সবক বুঝতে ও স্মৃতিস্থ করতে না পারলে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে মনস্থ করে। ফেরার পথে পিপাসায় এক কুয়োতলায় পানি পান করতে গিয়ে দেখে, একটি পাথর ক্ষয় হয়ে তাতে গর্ত হয়ে গেছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করে যখন সে জানতে পারল যে, মাটির কলসী বারবার রাখার ফলেই পাথরটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে তখন সে তার মনের ভিতর হারানো সাহস ও উদ্যম ফিরে পেল। ভাবল, বারবার মাটির কলসী রাখার ফলে যদি একটা পাথরও ক্ষয়ে যায় তাহলে বারবার চেষ্টার সাথে পড়ার পরেও আমার ব্রেনে দাগ পড়বে না এবং সবক মুখস্থ হবে না কেন? এই বলে পুনরায় নতুন উদ্যোগ নিয়ে সে মাদ্রাসায় ফিরে যায়। ভবিষ্যতে সেই ছাত্রই এক বড় পণ্ডিতরূপে খ্যাতি লাভ করে।
অনুরূপ আর এক ছাত্র একটি পিপড়েকে একটুকরা খাবার নিয়ে কোন দেয়ালে উঠতে অক্ষম ও পরক্ষণেই বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহু চেষ্টার পর উঠতে সক্ষম দেখে নিজের উদ্যম ফিরে পেয়েছিল। এরূপ প্রত্যেক ছাত্রই যথেষ্ট মেহনত, সুদৃঢ় মনোবল ও অবিরাম সাধনা প্রয়োগ করলে বিদ্যায় পারদর্শী হতে পারে। কবি বলেন,
'পারিবো না' একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার।
দশজনে পারে যাহা
তুমিও পারিবে তাহা
একবারে না পারিলে দেখ শতবার।'
তালেবে ইলমের উচিত, তার কিতাবের সহিতও আদব করা; মুসহাফকে মাটির উপর না রাখা, তাঁর প্রতি পা না করা, তা পিছন করে না বসা, আঙ্গুলে থুথু নিয়ে তার পাতা না উল্টানো, কোন কিতাবের নিচে তা না রাখা। হাদীস, তফসীর প্রভৃতি কিতাব; যাতে কুরআনী আয়াত বা আল্লাহর নাম আছে তা পা দ্বারা না ধরা, তার উপর হেলান না দেওয়া, যেখানে সেখানে ফেলে না রাখা, ঐরূপ পত্রিকার কাগজকে খাওয়ার দস্তরখান বা বসার সিট না করা। কিতাবের উপর কলম দ্বারা লিখে না খেলা; প্রয়োজনীয় টীকা ছাড়া অন্য কিছু না লিখা, এসব কিছু নষ্ট হয়ে গেলে কোন সম্মানিত স্থানে দাফন করা বা জ্বালিয়ে তার ছাই পবিত্র পানিতে ফেলা ইত্যাদি। এ আদব কাগজের প্রতি নয় বরং তা ইলমের প্রতি, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বাণীর প্রতি।
প্রয়োজনে সহপাঠীকে কিতাব পড়তে দেওয়া উচিত। সহপাঠীরও উচিত উক্ত কিতাবের যথার্থ হিফাযত করা। লিখার সময় 'বিসমিল্লাহ' লিখা ও বলা, আল্লাহর নামের সহিত 'তাআলা, সুবহানাহু, আয্যা অজাল্ল, তাবারাকা অতাআলা, রব্বুল আলামীন, রব্বুল ইষ্যাত' ইত্যাদি লিখা ও পলা। নবী ﷺ এর নাম লিখার সমর দরূদ সম্পূর্ণভাবে লিখা ও বলা।
📄 শিক্ষকের কর্তব্য
মুদার্রেসের উচিত, প্রথমতঃ তালেবে ইল্মের ধীগুণ (অর্থাৎ কৌতূহল, শ্রবণ, আহরণ, স্মৃতিতে ধারণ বা স্মরণ, সন্দেহ বা তর্ক, সন্দেহ-নিরসন, অর্থবোধ ও মর্মাবধারণ এই অষ্টবিধ বুদ্ধিগুণ) পরীক্ষা করা, পড়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অথবা দুর্বলতা লক্ষ্য করা এবং সেই অনুযায়ী তার উপর পাঠের দায়িত্ব প্রদান করা। তিনি শিক্ষার্থীর জন্য সর্বদা হিতাকাঙ্খী ও মঙ্গলকামী হবেন। এত চাপ দেবেন না যাতে সে বুঝতেও সুযোগ না পায়। কারণ, ছাত্র বুঝতে পারে ও মনে রাখে এমন পাঠ বুঝতে পারে না অথবা ভুলে যায় এমন বহু পাঠ হতেও উত্তম। অনুরূপভাবে যাতে তালেব বুঝতে পারে তার বুঝশক্তি অনুপাতে দর্স বা পাঠ ব্যাখ্যা করবেন। সংক্ষিপ্ত বা বিশদভাবে যখন যেমন প্রয়োজন তখন তেমনিভাবে বুঝাবেন। নচেৎ বিপরীত করলে বিরক্ত হয়ে তালেবের বোধশক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।
শিক্ষার মাধ্যম ভাষা উর্দু হলেও অতিমার্জিত উর্দু বলে ছাত্রদেরকে হতভম্ব করা অনুচিত। যাতে 'তোতার অর্থ বাবগা' বুঝে, কিন্তু তার মাতৃভাষায় তোতা কি তা না বুঝে তাহলে ফল বিপরীত হয়। ভারসাম্য রক্ষা করে মূল উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত, যাতে ছাত্র সুস্পষ্টভাবে পাঠ্যবিষয় নিজের ভাষাতেও বুঝে প্রকাশ করতে পারে।
সুতরাং উদাহরণস্বরূপ, ওস্তায বললেন, 'বুর্তাক্বাল কা মা'না সান্তারাহ।' ছাত্র প্রশ্ন করল, 'জী, সান্তারাহ কি জিনিস?' ওস্তায বললেন, 'দস্ উর্দু মেঁ হ্যায়, উর্দু মে পূছো।' ছাত্র বলল, 'জী, সান্তারাহ কিয়া চীয হ্যায়?' ওস্তায বললেন, 'এক কিস্স কা ফল হ্যায়।' বাস! ছাত্র জানতেও পারল না যে ঐ কিসিমের ফল তার ঘরে আছে অথবা সে প্রায় খেয়ে থাকে। সে ভাবল, সে হয়তো আরবের কোন ফল। নচেৎ আমাদের দেশের কোন প্রসিদ্ধ ফল হলে নিশ্চয় ওস্তায ইঙ্গিত করতে অলসতা করতেন না।
এমনটি আমাদের বাংলার মাদ্রাসায় ঘটে থাকে। যার ফলে বাঙালী ছাত্রদের প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিভাত হতে পায় না। কুরআন হাদীস শিক্ষার জন্য আরবী শিখবে, কিন্তু তার ব্যাকরণ শিখবে ফারসীতে, ফারসীর অনুবাদ হবে উর্দুতে, অথচ শিক্ষার্থীর মাতৃভাষা বাংলা। সম্ভবতঃ তাও সে ঠিকমত বুঝে না। এই জন্য বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দ্বীনী শিক্ষার্জনের অবস্থা অন্ধের পায়স খাওয়ার মত হয়েছে; অন্ধ যখন শুনল যে, তাকে পায়স খেতে দেওয়া হবে তখন সে প্রশ্ন করল, 'পায়স কি রকম?' একজন বলল, 'সাদা ধন্ধবে।' অন্ধ বলল, 'সাদা ধন্ধবে কেমন?' বলল, 'বকের মত।' অন্ধটি আবার প্রশ্ন করল, 'বক আবার কেমন?' তখন উত্তরদাতা বুঝল, অন্ধ মানুষ কথায় বুঝবে না; হাতের ইঙ্গিত ও ভঙ্গিমায় বুঝবে। তাই তার হাতটি ধরে বাঁকা করে বলল, 'এই দেখ, বক এই রকম হয়।' তখন অন্ধ বিস্ময়ের সাথে ভাবল, তাহলে পায়স বুঝি এত লম্বা আর এ রকম বাঁকা হয়? বলল, 'আমি পায়স খাব না!' (হয়তো গলায় আঁটকে যাবে তাই।)
ছাত্র বাংলা অথবা ইংরেজী গ্রামার পূর্বে পড়ে ও বুঝে থাকলে ওস্তায যদি তা আরবী গ্রামার পড়াবার সময় ঐ পরিভাষা বাংলা বা ইংরেজীর সহিত মিলিয়ে বুঝাতে পারেন তাহলে সোনায় সোহাগা হবে এবং অল্প মেহনতে ছাত্র সহজে বুঝে যাবে। আর তা পড়তে তাকে মোটেই কষ্টবোধ হবে না।
একটি পাঠ বা মাসআলাহ তালেবের ভালোরূপে না বুঝা পর্যন্ত ওস্তায তাকে অন্য পাঠ বা মাসআলাহ পড়তে দেবেন না। পুনরালোচনার মাধ্যমে পূর্বের পাঠ বুঝেছে দেখলে পরের পাঠ দিলে উভয় পাঠই বুঝতে তার পক্ষে সহজ হবে। নচেৎ তার বুঝার পূর্বে এক মাসআলাহর উপর অন্য আর এক মাসআলাহর অনুশীলন দিলে প্রথমটি বিনষ্ট হবে এবং দ্বিতীয়টিও বুঝতে সক্ষম হবে না। আর এইভাবে পরবর্তী পাঠও উপলব্ধি করতে না পেরে একটার পর একটা বরং প্রায় সবটাই একত্রিত হয়ে মস্তিষ্কে এক প্রকার ক্লান্তি ও অবসাদ সৃষ্টি করবে। ফলে সে সব পুনরাবৃত্তি করতেও তার নিকট বিরক্তি ও আলস্য দেখা দেবে; যা ইলমের পথে বড় ব্যাঘ্যাত হয়ে দাঁড়াবে। আর তা অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা মুআল্লেমের আদৌ উচিত নয়।
মুদার্রেসের উচিত, তালেবের ব্যাপারে সর্বদা মঙ্গল কামনা করা, বুঝতে না পারলে বারংবার বুঝিয়ে দিতে ধৈর্য ধারণ করা, তার বেআদবী ও অশিষ্টতার উপর সহনশীলতা অবলম্বন করা এবং যাতে সে সহজে বুঝতে পারে, আদব ও ভদ্রতা যাতে শিখতে পারে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে এসে যাতে তাঁকেই সবকিছু মনে করতে পারে এবং ইল্মের প্রতি বিরক্তি ও নৈরাশ্য প্রকাশ না করে তার প্রচেষ্টা করা। যেহেতু শিক্ষকের উপর শিক্ষার্থীর কিছু হক বা অধিকার আছে। ছাত্র হয়ে তাঁর নিকট এসে সেই ইল্ম শিক্ষা করতে নিরত হয়; যা তার জন্য এবং সমাজের জন্য উপকারী। ছাত্র যে ইল্ম তাঁর নিকট হতে গ্রহণ করে তা প্রকৃতপক্ষে তাঁরই সম্পদ ও পুঁজি। ছাত্র তা সংরক্ষণ করে এবং তাতে সমৃদ্ধি দান করে থাকে; যা এক লাভদায়ক উপার্জন। তাই ছাত্রই শিক্ষকের জন্য প্রকৃত পুত্র ও উত্তরাধিকারী। আল্লাহ পাক যাকারিয়া (আঃ) এর প্রার্থনা উল্লেখ করে বলেন, “সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর; যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকুবের বংশের।---” (সূরা মারয়্যাম ৬ আয়াত) উদ্দেশ্য, ইল্ল্ম ও হিকমতের উত্তরাধিকারী।
মুআল্লেম তাঁর তা'লীম দানের বিনিময়ে সওয়াব ও পুণ্যের অধিকারী হবেন; তাতে তালেব তা বুঝে কিংবা না বুঝে।। কিন্তু যদি সে তা বুঝতে পারে আর নিজে তদ্দ্বারা উপকৃত হয় এবং অপরকেও উপকৃত করে তবে মুআল্লেমের সওয়াব প্রবাহমান ও চিরস্থায়ী হবে। এ ওর ছাত্রকে সে তার ছাত্রকে এবং এইভাবে ধারাবাহিকতার সহিত যেমন শিক্ষা চলতেই থাকবে তেমনি ঐ প্রথম মুআল্লেম এবং সেইরূপ তাঁর পরবর্তী প্রত্যেক মুআল্লেমের সওয়াব মরণের পরেও জারী থেকে যাবে। (সঃ জামে' ৭৯৩নং) এ এমন এক বাণিজ্য যার উপর প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে!
সুতরাং মুআল্লেমের উচিত, সেই লাভজনক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তাতে যাতে সমৃদ্ধি ও উন্নতি লাভ হয় তার প্রতি আপ্রাণ চেষ্টা করা। কারণ এটা তাঁর এক আমল এবং আমলের এক স্মৃতি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমিই মৃতকে জীবিত করি এবং লিখে রাখি ওদের কৃতকর্ম (যা ওরা আগে পাঠিয়েছে) এবং (ওদের স্মৃতি) যা ওরা পশ্চাতে রেখে যায়।” (সূরা ইয়াসীন ১২) অর্থাৎ আমলের সুফল ও উত্তম প্রভাব অথবা তার কুফল ও মন্দ প্রভাব লিপিবদ্ধ করা হয়।
তালেবকে প্রতি সেই উপায় ও পন্থার কথা মুআল্লেম জানিয়ে দেবেন যে উপায়ে তার পক্ষে সর্বপ্রকার পাঠ বুঝতে সহজ হয়, পঠনে উদ্যম ও উদ্দীপনা পায় এবং বুঝতে ও অভ্যাস করতে কোন রকমের কষ্ট বা শ্রান্তি অনুভব না করে। ওস্তাযের উচিত, যাতে ছাত্রদের পঠিত বিষয় তাদের নিকট স্মৃতিস্থ ও সংরক্ষিত থেকে যায় তার প্রচেষ্টা করা; বারংবার আলোচনা করতে তাকীদ দেওয়া, পুরানো পাঠের উপর মাঝে মাঝে প্রশ্নাদি করা, পরীক্ষা নেওয়া ও তাদের আপোস পুনরালোচনার উপর গুরুত্ব প্রদান করা। কারণ ওস্তাযের নিকট পাঠ গ্রহণ (ক্লাস) করায় কেবল বৃক্ষরোপণ করা হয় এবং পুনরালোচনা ও মুখস্থ ইত্যাদি করা তার সিঞ্চন, সার দান ও আগাছা দূরীকরণ করার ন্যায়। যাতে নির্বিঘ্নে ও সহজে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে এবং শাখা-প্রশাখায় ও ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে।
যে ইমাম বুখারীর ৬ লাখ হাদীস সনদ সহ মুখস্থ ছিল সেই বুখারীকে একদা তাঁর কাতেব গোপনে জিজ্ঞাসা করল যে, 'স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য কোন ওষুধ আছে কি?' তিনি 'জানি না' বলে পুনরায় বললেন, 'স্মরণশক্তির জন্য সবচেয়ে বড় উপকারী জিনিস হল মানুষের (ইল্মের প্রতি) চরম আগ্রহ এবং বিরতিহীন পুনরাবৃত্তি।' (হাদয়্যুস্ সারী ৪৮৭পৃঃ)
ইলম মনে রাখার এক সহজ-সরল উপায় ভদ্র বাদানুবাদ ও তর্কালোচনা। ওস্তাযের উচিত ছাত্রদের মাঝে এমন মার্জিত উপায় খুঁজে দেওয়া যাতে তারা আপোসে কোন মাআলাহ ও তার দলীলাদি নিয়ে বাদানুবাদ করতে পারে। যার কেবল একটাই উদ্দেশ্য হয়, হক সন্ধান। দলীল যাকে সমর্থন করে তারই অনুসরণ।
এই পদ্ধতিতে ছাত্রদের চিন্তাশীলতা, মননশীলতা, যুক্তিপূর্ণ প্রতর্কক্ষমতা এবং গবেষণার স্মৃতিদ্বার উদ্ঘাটিত হবে। ইল্মের উৎসমুখ এবং দলীল ও তা উপস্থিত করার বিষয়ে পরিচিতি লাভ করবে। আর প্রকৃত হক ও সত্যের অনুসারী হতে শিখবে।
তবে এ প্রসঙ্গে সতর্কতার বিষয় যে, এ নিয়ে যাতে আন্তরিক মনোমালিন্য সৃষ্টি না হয়ে যায় অথবা বিতর্কের ভাষা যেন রূঢ় না হয়। নচেৎ হিতে বিপরীত হয়ে অনৈক্য ও কলহ সৃষ্টি হবে। ছাত্রদের উচিত, যেন তারা কোন বাক্য বা বক্তার জন্য 'তাআসসুব' বা অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব না করে। তর্কের উদ্দেশ্য যেন সে যা বলেছে অথবা সে যার তা'যীম করে বা যাকে মানে তার কথার পৃষ্ঠপোষকতা করা না হয়। কারণ অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামী ইখলাস নষ্ট করে ফেলে। ইসলামের সৌন্দর্য ধ্বংস করে দেয়। যথার্থতা, বাস্তব ও হক দেখতে হক অনুসন্ধানীকে অন্ধ করে ফেলে। ক্ষতিকর ঈর্ষা ও দ্বেষ এবং সর্বনাশী বিবাদ-বিছিন্নতা সৃষ্টি করে। যেমন ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতাই ইল্মের সৌন্দর্য। ইখলাস, পরহিতৈষিতা ও নিষ্কৃতি লাভের শিরোনাম।
তালেবের জন্যও জরুরী যে, সে তার ওস্তাযকে সম্মান ও সমীহ করবে। যথাসম্ভব ভদ্রতা ও আদবের সহিত তাঁর সহিত ব্যবহার করবে। যেহেতু তার উপর তাঁর বহু সাধারণ ও নির্দিষ্ট অধিকার আছে।
সাধারণ অধিকার যা তালেব ছাড়াও সাধারণ মুসলমানরা একজন আলেম ও মুআল্লেমের প্রতি স্বীকার করে থাকে। যেহেতু তিনি মঙ্গলের শিক্ষক। তাঁর শিক্ষা ও ফতোয়া দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিকে তিনি উপকৃত করে থাকেন। তাই সকল মানুষের উপর তাঁর এমন অধিকার আছে যেমন একজন উপকারী ও অনুগ্রহকারীর অধিকার থাকে। আর তাঁর মত আর কারো উপকার ও অনুগ্রহ বড় হতে পারে না; যিনি মানুষকে শিক্ষা, চেতনা, সদাচারণ, সংস্কার, সংশুদ্ধি ও দ্বীনী আদর্শ দান করে থাকেন। ভালো-মন্দ, উপকার-অপকার ও মঙ্গলামঙ্গলকে চিহ্নিত করেন, যাঁর দ্বারা কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত ও নির্দেশিত হয়, অকল্যাণ ও মন্দ অপসারিত হয়, যিনি সমাজের মূর্খতার আঁধার দূর করে আনেন জ্ঞানের আলো। যিনি ধর্ম ও সত্যের বাণী বহন ও প্রচার করে থাকেন; যা তওহীদবাদী ও তার পরবর্তী সকল বংশধরের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণ। বরং সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর জ্ঞানের জ্যোতি চলার পথের দিশারী।
যেহেতু যদি ইল্ম না হত তাহলে মানুষ পশুর ন্যায় মূর্খতা ও অশ্লীলতার ঘোর অন্ধকারে দিদিশাহারা হত। প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে পশুর মত আচরণ করত। ইল্ম তো সেই আলোক; যদ্দ্বারা অন্ধকারে পথের ঠিকানা পাওয়া যায়। ইল্মই তো অন্তর, আত্ম, দ্বীন ও দুনিয়ার প্রাণ। যে দেশে এমন মানুষ নেই; যিনি সকলকে চরিত্র, আদর্শ ও মানবতা বা সৃষ্টিকর্তার পথনির্দেশ শিক্ষা দেবেন, প্রয়োজনে পথের দিশা দেবেন-সে দেশ সত্যই নিঃস্ব ও মিসকীন। যাঁর অভাব তাদের ইহ-পরলোক উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকারক, যদিও তারা রকেট, উপগ্রহ ও কম্পিউটার ইত্যাদির আবিষ্কর্তা হয়।
অতএব যাঁর উপকারিতা এত বৃহৎ, মানুষের মনুষ্যত্বের জন্য যাঁর প্রয়োজন ও প্রভাব এত বিরাট তাঁর প্রতি কেমন করে সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য সম্মান, শ্রদ্ধা, সমীহ ও ভালোবাসা ওয়াজেব না হয়? তাঁর প্রাপ্য হক ও অধিকার কি কম বলা যায়?
তালেবের উপর ওস্তাযের নির্দিষ্ট অধিকারও অনেক। যেহেতু তিনি হলেন তার শিক্ষা ও আদবের গুরুভার বহনকারী। সে যাতে সুউচ্চ পদ ও মর্যাদায় পৌঁছতে পারে তার প্রতি আন্তরিক কামনা ও ইচ্ছা রাখেন। তাই পিতা-মাতার অনুগ্রহ ও উপকারও -একদিক হতে- সেই মুআল্লেম ও পালয়িতার উপকারের সমতুল নয় যিনি মানুষকে মানুষ হয়ে চলতে শিখান, সৎপথের পথিক করে প্রকৃত ও চিরসুখ ও শান্তির ঠিকানা বাতলে থাকেন। যাঁরা নিজের মূল্যবান সময় তার উপর ব্যয় করে থাকেন। সাধ্যমত নিজের সুচিন্তিত মত ও সিদ্ধান্ত দিয়ে তাকে সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে সাহায্য করে থাকেন।
পৃথিবীতে বহু শিক্ষক, বহু পালয়িতা এবং বহু ধরনের ওস্তায আছেন। তাঁদের অধিকাংশ ওস্তায বর্তমান জীবন হতে মরণ পর্যন্ত সময়কালীন সুখ-সামগ্রীর সন্ধান দিয়ে থাকেন। যাঁদের দৌড় কেবল গোর পর্যন্ত, মাত্র ষাট অথবা সত্তর বছরের প্রতিযোগিতায় তাঁরা অংশ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু ঐ শিক্ষকের দৌড় (কেবল মসজিদ পর্যন্তই নয়;) অনন্তকালের। যিনি মরণের পরেও সুখ-সামগ্রীলাভের উপায়-উপকরণের খোঁজ দিয়ে থাকেন। এঁরা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামান্য আয়ুতে ইহ-পরকাল উভয় জীবনের পরম স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নয়নের বিভিন্ন পথ ও পাথেয় আবিষ্কার (সংস্কার) করে থাকেন। কিন্তু “ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত। আর পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা অনবধান।” (সূরা রূম ৭আয়াত) যদিও 'ওঁরা' তাঁদেরকে কেবল 'মোল্লা' রূপে চিনে থাকে।
কেউ যদি কোন মানুষকে কোন আর্থিক উপহার দান করে থাকে -যা কিছুদিন হিতসাধন করে ধ্বংস ও নষ্ট হয়ে যায়-তার উপর উপহারদাতার বড় হক থাকে এবং সে তার কাছে বাধিত হয়। তাহলে যিনি অমূল্য ইল্মের সওগাত দান করেন, যদ্বারা পার্থিব শান্তির জীবন লাভ করে এবং মরণের পরেও আখেরাতে চিরসুখ অর্জন করে। যাঁর হিতসাধন ও অনুগ্রহ ধারাবাহিকভাবে চিরস্থায়ী থাকে -তিনিই সবার চেয়ে অধিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র নিশ্চয়ই। যাঁর সহিত আদবপূর্ণ ব্যবহার করা, তিনি যা নির্দেশ করেন তার অনুসরণ করা, তাঁর ইঙ্গিতের বাইরে না যাওয়া ছাত্রের কর্তব্য। যেহেতু বিশেষ করে ইল্ম বিষয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তা তার অজানা, তাই তাঁরই মতে নিজের জীবন গড়া উচিত। অবশ্যই তিনি তার শুভাকাংখী। ছাত্র বা পথ অনুসন্ধানকারী অর্থে আমীরজাদা হলেও তিনি তো ইল্মের রাজা। পারলৌকিক ধনের কাছে পার্থিব ধনের যে কোন মূল্য নেই।
শিক্ষার্থী (অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিম) আলেমের সামনে আদরের সহিত বসবে। নিজের জ্ঞানপিপাসা তাঁর নিকট প্রকাশ করবে। সম্মুখে ও পশ্চাতে তাঁর জন্য দুআ করবে। যদি কোন বিষয়ে জ্ঞান বা কোন কঠিন মাআলার ব্যাখ্যার ভেট পেশ করেন তবে তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং সাগ্রহে শ্রবণ করবে। এরূপ ভাব প্রকাশ করবে না যে, সে আগে হতেই এটা জানত; যদিও বা সত্য-সত্যই পূর্ব হতেই জানত। প্রত্যেক ইল্ম অর্জনে ও আলাপনে সকল মানুষের জন্য এই আদব বাঞ্ছনীয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আয়নার পারা খসে পড়ায় কারণে তার আর সে মূল্য ও কদর নেই। তাই আলেম সমাজেরও কদর কমে গেছে। তবে প্রকৃত আলেমের কদর অবশ্যই হারায়নি এবং হারাবেও না। খাদযুক্ত বা নকল সোনার মূল্য না থাকলেও খাঁটি সোনার উপর নর্দমার কাদা ছিটানো হলেও তার মূল্য অবশ্যই কমে না।
মানুষ মাত্রেই ভুল হয়। ওস্তায কোন বিষয়ে ভুল করলে, (মুত্বালাআহ না করে) ভ্রম অর্থ বা ব্যাখ্যা করলে (এবং তালেব তা ধরতে পারলে) তাঁকে বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে তা ধরিয়ে দেবে। নিজের বাহাদুরী প্রকাশের উদ্দেশ্যে ভরা মজলিসে তার অপমান করা, অথবা 'আপনি ভুল বলছেন' বা 'আপনি যা বলছেন তা ঠিক নয়' -ইত্যাদি বলে রুক্ষ কথায় মুখামুখি প্রতিবাদ করা উচিত নয়। বরং সহজ ও সুন্দর ভাষার ইঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে ভার অন্তর ব্যথিত না হয়। যেহেতু এও তাঁর এক প্রকার প্রাপ্য হক। আর এই নিয়মে বড়দের কথায় প্রতিবাদ নির্ভুল ও সঠিকতায় পৌঁছতে সহায়ক হয়। অন্যথায় অন্তরে আঘাত দিয়ে, অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞার সাথে তাঁদের কথা খণ্ডন করলে এক প্রকার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভাব সৃষ্টি হয়, যার দরুন প্রকৃত হক ও সঠিকতায় পৌঁছতে বাধা পরে থাকে।
অবশ্য মুআল্লেমের জন্যও একান্ত কর্তব্য যে, ছাত্র কোন ভুল সংশোধন করে দিলে তাতে লজ্জিত ও ক্রোধান্বিত না হওয়া এবং সঠিক ও সত্যকে গ্রহণ করে নেওয়া। যে কথা বলে ফেলেছেন সেটাকেই সাব্যস্ত রেখে সঠিক ও হক গ্রহণ না করা আলেমের এক ত্রুটি। কারণ হকের অনুসরণ করা সর্বদা ওয়াজেব এবং তাই ইনসাফ ও ন্যায্যতা; চাহে সে হক কোন বড়র হাতেই থাক্ অথবা কোন ছোটর হাতে।
ওস্তাযের জন্য এটা এক আল্লাহর প্রদত্ত নিয়ামত বা অনুগ্রহ যে, তাঁর ছাত্রদের মধ্যে এমন ছাত্রও আছে, যে তাঁর ভুল সংশোধন করতে পারে, সঠিকতার প্রতি ভুলে যাওয়া পথ প্রদর্শন করতে পারে। যাতে ভুলের উপরেই চির অবিচলতা দূর হয়ে যায় এবং ইল্ম পরিপূর্ণতা লাভ হয়। এমন নেয়ামতের উপর আল্লাহর দরবারে লাখ শুক্র জ্ঞাপন করা কর্তব্য এবং তারপর তার শুকরিয়া আদায় করা উচিত, যার হাতে আল্লাহ তাঁর ইলমী পরিপূর্ণতা দান করেন; চাহে সে তাঁর ছাত্রই হোক বা অন্য কেউ।
অনেক আলেম আছেন, যাঁকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তার উত্তর না জানলেও নিজের তরফ হতে মনগড়া কোন একটা উত্তর দিয়ে থাকেন; যাতে তাঁর সম্মানের লাঘব না হয়। কোন কোন সময় অনুমানের তীর লেগেও যায় বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ভুল হয়; যা প্রশ্নকারী শিক্ষার্থীর পক্ষে এক মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আলেমের পক্ষে ওয়াজেব এই যে, যে বিষয়ে তাঁর ইল্ম নেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে 'আল্লাহু আ'লাম' (আল্লাহই জানেন) অথবা স্পষ্টভাবে 'জানি না' বলা, আর এতে তাঁর সম্মান হানি হবার কিছু নেই, বরং এতে তাঁর ইজ্জত আরো বর্ধমান হয়। কারণ এরূপ নীতি অবলম্বন করা দ্বীনী ও ঈমানী পরিপূর্ণতা এবং তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসার পরিচায়ক। ইমাম শাফেয়ী তাঁর ওস্তায ইমাম মালেক প্রসঙ্গে বলেন, 'একদা তিনি ৪৮টি মাআলা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলেন। কিন্তু এর মধ্যে ৩২টির প্রশ্নের উত্তরে তিনি 'জানি না (বা জানা নেই)' বললেন!
ইমাম গাযালী বলেন, 'এই ঘটনা এই কথার দলীল যে, তিনি ইল্ম প্রচারে আল্লাহর সন্তুষ্টিই কামনা করতেন। নচেৎ যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য অন্য কিছু হয় সে ব্যক্তির মন তার গহীন কোণেও কোন মতেই স্বীকার করবে না যে, 'এ বিষয়ে সে জানে না।' (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন)
পক্ষান্তরে এই তাওয়াক্কুফে (কোন বিষয়ে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত হওয়াতে) বহু উপকারও আছে। যেমন, অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ ওয়াজেব; তাই তাঁর ওয়াজেব পালন হয়।
তিনি যখন তাওয়াক্কুফ করে 'আল্লাহ আ'লম' বলে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবেন তখন তার পরপরই পুস্তকালোচনায় সে বিষয়ে ইল্ম লাভ করে সবল হবেন এবং ছাত্ররা যখন ওস্তাযের তাওয়াক্কুফ দেখবে তখন তারাও নিজে নিজে সে বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রতিযোগীতামূলক অনুসন্ধান শুরু করবে ও উক্ত প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে ওস্তাযকে তোহফা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
আলেম যখন অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ করবেন তখন যে বিষয়ের তিনি ব্যাখ্যা দেবেন তা সকলের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রণিধানযোগ্য হবে এবং তাঁর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীও প্রতিপাদিত হবে। যেমন যিনি জানা অজানা সব বিষয়ের মুখ চালান বলে পরিচিত তাঁর প্রত্যেক কথা -এমন কি যা স্পষ্ট সত্য তাও-বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে সকলের মনে আশঙ্কা ও সংশয় জন্মাবে।
ছাত্ররা ওস্তাযের অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ দেখলে তা তাদের জন্যও তা'লীম হবে এবং কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে তা'লীম তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে তারাও অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ করতে শিখবে। তাহলে ভবিষ্যতে কাউকে ভুল শিক্ষা দেবে না বা আন্দাজে ফতোয়া দিয়ে কারো বিপদ আনবে না।
তবে আলেম যদি মাহের ও যোগ্য হন অথবা পড়াবার পূর্বে মুত্বালাআহ (পাঠ্যবিষয়ে পূর্বালোচনা) করেন তবে এসব ভুলের আশঙ্কা থাকে না। বরং মাহের হলেও অন্ততঃপক্ষে একবারও মুত্বালাআহ করা প্রয়োজন। যাতে ছাত্রদের সম্মুখে লজ্জিত হতে না হয়।
ওস্তাযের প্রতি যেমন সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবে তেমনি ছাত্র তার সহপাঠীর সহিতও সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখবে। যেহেতু এ সহপাঠে একে অপরের উপর বড় হক ও অধিকার থাকে। ভ্রাতৃত্ব সাহচর্যের হক, একই ওস্তাযের প্রতি সম্পর্ক স্থাপনের হক এবং তারা তাঁর নিকট তাঁর সন্তানের ন্যায় -সে হিসাবে (ভ্রাতৃত্বের) হক রয়েছে। তাই আপোসে সহানুভূতি, সহায়তা এবং যৌথ সফলতার উপর মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রযত্ন থাকা উচিত।
📄 উলামা ও পারচর্চা
কোন নির্দিষ্ট আলেম বা সাধারণ লোকের চর্চা বা নিন্দা করা, কারো চুগলী ও হিংসা করা; অনুমান' ও ধারণা করে 'কারোর 'বদনাম'ইত্যাদি' করা আহলে ইলমের জন্য আদৌ সমীচীন নয়। কারণ, তা সকলের জন্য মহাপাপ, এবং আহলে ইল্মের জন্য আরো বড় মহাপাপ, যেহেতু সাধারণ লোক তাঁদের অনুসরণ করে, আলেম যা করেন তাই তার কার্যের জন্য দলীল মনে করে। তাছাড়া পরচর্চা ও পরনিন্দায় বিদ্বেষ ও বিবাদ সৃষ্টি হয় এবং বহু মূল্যবান সময় অযথা নষ্ট হয়। যাতে ইল্মের আলোক ও আলেমের প্রতি ভক্তি অন্তর্হিত হয়ে যায়।
ওলামাদের জন্য আরো এক জরুরী কর্তব্য যে, তাঁরা যেন তাঁদের আপোসে ঐক্য, সংহতি, সৌহার্দ্য, সদ্ভাব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ইত্যাদি বজায় রাখেন এবং অনৈক্য বিদ্বেষ, মাৎসর্য, বৈরিতা প্রভৃতি নিন্দনীয় ও সর্বনাশী কাজ-কর্ম থেকে দূরে থাকেন। সকল কাজে ইখলাস রেখে, সকলের ইজতেহাদী অভিমতকে শ্রদ্ধাদৃষ্টিতে দেখে, শৃঙ্খলা, বিনয় ও নিষ্ঠার সহিত সত্যের পরিচয় জানিয়ে সর্বদা একতার খেয়াল রাখবেন। সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির সুন্দর পরিবেশ ফুটিয়ে তুলবেন। যেহেতু সকলের উদ্দেশ্য এক, ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা এক, হিতৈষণাও এক। অতএব এই মহান উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা (দ্বীন প্রতিষ্ঠা)কে বাস্তবায়িত করতে অবশ্যই মিলিত প্রীতিপূর্ণ প্রয়াসের দরকার। এই সুসাধ্য সাধনের পথে সকল প্রকার ক্ষতিকর উপাদান ও উদ্দেশ্যকে প্রতিহত ও নির্মূল করতে আদৌ অলসতা করা উচিত নয়। সুতরাং এক আলেম অপর আলেম ভাইকে শ্রদ্ধা করবেন ও ভালোবাসবেন। এক অপরের তরফ হতে মান সংরক্ষা, প্রতিবাদ ও দোষক্ষালন করবেন। প্রমাণ করবেন যে, গৌণ (ইজতেহাদী মাআলা) বিষয়ে সামান্য মতভেদ - যা সম্প্রীতি ও সদ্ভাব নষ্ট করে -তাকে মুখ্য (আকীদা ও তাওহীদ) বিষয় -যাতে ঐক্য ও মিলন প্রতিষ্ঠা হয় - তার উপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। বরং মুখ্য বিষয় ঠিক রেখে গৌণ বিষয়ে আপোসে সমঝতা ও মীমাংসার মাঝে আপোস নিষ্পত্তি করা কর্তব্য। আর এ বিষয়ে সালিস, সন্ধিকর্তা ও ফায়সালাকারী হবে কিতাব ও (সহীহ) সুন্নাহ। ছোট-খাট ইজতেহাদী ভুলের জন্য আপোসের সদ্ভাবকে অবশ্যই নষ্ট করা যাবে না। আর সাবধান হবেন, যাতে ইলমের (কিতাব ও সুন্নাহর) দুশমনরা তাঁদের আপোসের মাঝে বৈরিতা ও বিদ্বেষ ছড়াতে এবং একতাবদ্ধ জামাআতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে কৃতার্থ না হয়।
সম্প্রীতির মত সম্পদের প্রতিষ্ঠায় যে লাভ ও কল্যাণ আছে তা বলাই বাহুল্য। সদ্ভাব এমন এক ধর্মীয় বিধান যার উপর শরীয়ত সর্বতোভাবে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। যা ইখলাস (ঐকান্তিকতা) উৎসর্গও স্বার্থত্যাগের এক বড় ন্দলীল। আর উৎসর্গ ও ইখলাস দ্বীনের প্রাণ ও কেন্দ্রবিন্দু। আলেম এই গুণে গুণান্বিত হয়েই সেই আলেম হন; যে আলেম ও আহলে ইলমের প্রশংসা কুরআন ও হাদীসে করা হয়েছে। সম্প্রীতি ও সদ্ভাবের মাধ্যমে ওলামাদের ইল্ল্মী উন্নতি লাভ হয়। আর ইল্ল্মী পরিপূর্ণতার প্রতি পৌঁছনোর জন্য তাঁদের পথ প্রশস্ত ও সুগম হয়। কারণ, আহলে ইলমের পথ ও পদ্ধতি যখন এক হবে তখন এক অপরের নিকট নিঃসংকোচ ও অকুণ্ঠভাবে ইল্ম শিক্ষা ও জ্ঞানলাভ করতে প্রয়াসী হবেন। এক অপরের হিতার্থে তাঁকে শিক্ষা দেবেন। কিন্তু যদি দলাদলি করে একদল অপরদল হতে বৈমুখ থাকেন এবং আপোসে হিংসা ও ঘৃণায় জর্জরিত থাকেন তবে নিশ্চয় সে উপকার আর থাকে না। বরং তার পরিবর্তে অপকারই বিরাজ করে। হিংসা, বৈরিতা, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব, নাহক রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি, এক অপরের ছিদ্রান্বেষণ এবং তার মাধ্যমে অপরের সমালোচনা, অপবাদ, অপযশ ও অপপ্রচারের শিকার করে। যার প্রত্যেকটিই দ্বীন, জ্ঞান ও সলফে সালেহীনদের রীতির পরিপন্থী; অনেক জাহেল যাকে দ্বীন মনে করে থাকে। অথচ আলেমের উচিত, সূরা হুজুরাত গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।
মানুষ হয়ে ভুল করা আশ্চর্যের কথা নয়। বরং আশ্চর্য ও বিস্ময়ের কথা তো এটাই যে, 'মানুষ হয়েও কোন ভুল না করা।' অতএব আলেম যত বড়ই হন তাঁর দ্বারা কোন ভুল হওয়াটা বিসায়ের কথা নয়, যেহেতু মানুষ কেউই ত্রুটিমুক্ত নয়। (অবশ্য আম্বিয়াদের কথা স্বতন্ত্র।) তাই কোন ত্রুটিকে কেন্দ্র করে কোন আলেমের ইজ্জত ও সম্ভ্রমের উপর হামলা করা বড় অন্যায় ও যুলুম। যার শাস্তি একাধিক ভয়ানক।
ছিদ্রান্বেষণ করা মুসলিমের কর্ম নয়। মুসলিমদের চরিত্র নয়, কোন খবর শোনামাত্র তা হাওয়ায় উড়িয়ে বেড়ানো। এক অপরের মুখ থেকে গ্রহণ করে সত্যাসত্য বিচার না করে অন্ধভাবেই না বুঝে-সুঝে প্রচার করা। ইসলাম-বিরোধী প্রচার-মাধ্যমগুলোর রায়ে সায় দিয়ে নিজেদের ভক্তিভাজনদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া। অথবা কোন অসদুপায়ে (যেমন, শিকী তাবীয লিখে, স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ সৃষ্টি করে, যোগ-যাদু করে) সমাজের মাল ভক্ষণ করে তাদের বিরুদ্ধ মন্তব্য শোনা। এ ব্যাপারে রব্বুল আলামীন বলেন, “হে মুমিনগণ! যদি কোন ফাসেক (সত্যত্যাগী) তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রয়দায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (কুঃ ৪৯/৬)
তিনি অন্যত্র বলেন, "আর যখন শাস্তি অথবা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা প্রচার করে, অথচ যদি তারা রসূল কিংবা তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের গোচরে তা আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তবে তোমাদের কিছু লোক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করতে।” (কুঃ ৪/৮৩)
মুসলিমের উচিত, কোন মানুষের (বিশেষ করে কোন আলেমের) সদ্গুণ ও অবদানকে অস্বীকার না করা এবং কোন ভুল বা অপরাধ করলে তাতে আনন্দবোধ না করা। অথবা তাঁর অপযশ রটিয়ে নিজের কীর্তিত্ব জাহির না করা। বরং যথাসম্ভব তাঁর সংশোধনের উপায় অনুসন্ধান করা তার কর্তব্য।
মুসলিমের কর্তব্য প্রত্যেকের ছোট-খাট ও ইজতেহাদী ভুলকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। সুধারণার সহিত সে সবের উপর অনুচিত গুরুত্ব দিয়ে ভুলকারীর ইজ্জত না লুটা।
এ বিষয়ে ইমাম সানআনী (রঃ) বলেন, 'ওলামাদের এমন কোন ব্যক্তি নেই যাঁর কোন ত্রুটি বা উদ্ভটি নেই; যা তাঁর অন্যান্য অবদানের পার্শ্বে চাপা পড়া উচিত এবং সেই ত্রুটি থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। (অর্থাৎ তা ধরে বসে প্রচার করে তাঁর মান ক্ষুন্ন করা অথবা তা মান্য করা উচিত নয়।' (সুবুলুস সালাম)
আবু হিলাল আস্কারী বলেন, 'অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান আলেমের অনিচ্ছাকৃত দু'-একটি ত্রুটি তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার লাঘব করে না। যেহেতু আল্লাহ যাঁকে বাঁচিয়েছেন তিনি ছাড়া কেউই ভুল থেকে মুক্ত ও পবিত্র নয়। জ্ঞানীরা বলেন, মহৎ সেই ব্যক্তি যার ত্রুটি গণনা করা যায়--।'
আল্লামাহ যাহাবী (রঃ) বলেন, 'জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ ওলামাদের মধ্যে কোন আলেমের সঠিকতা অধিক হলে, তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসা সুপরিচিত হলে, জ্ঞানের পরিসর বেশী হলে, তাঁর বুদ্ধিমত্তা বিকশিত থাকলে, তাঁর সংশুদ্ধি, সংযমশীলতা ও (কিতাব ও সুন্নাহর) আনুগত্য প্রসিদ্ধ হলে তাঁর বিচ্যুতি ক্ষমার্হ। তাঁকে আমরা ভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করতে পারি না। তাঁকে আমরা বর্জনও করতে পারি না; আর পারি না তাঁর অবদান ও সদগুণাদিকে ভুলতে। তবে হ্যাঁ, আমরা তাঁর বিদআত বা ভুলের অনুকরণ বা অনুসরণ করব না। এবং তার জন্য তওবা ও প্রত্যাবর্তনের আশা রাখব।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৫/২৭১)
তিনি মুহাম্মদ বিন নস্ত্র আল মরুযীর তরফ থেকে প্রতিবাদ করে বলেন, 'যখনই কোন ইমাম ছোট-খাট মাসায়েলে মার্জনীয় ত্রুটি করেন তখনই যদি আমরা তাঁর উপর আক্রমণ শুরু করে দিই; তাঁকে বিদআতী বলি এবং তাঁর সাথে বয়কট করি তাহলে কেউই (ত্রুটিহীন) অবশিষ্ট থাকবে না; না ইবনে নস্ত্র, আর না ইবনে মান্দাহ, আর না-ই তাঁরা যাঁরা তাঁদের চেয়েও বড়। পরন্ত আল্লাহই সৃষ্টিকে সত্যের প্রতি পথপ্রদর্শন করেন এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাময়। সুতরাং আমরা আল্লাহর নিকট কুপ্রবৃত্তি ও পরুষতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।'
ইমাম গাযালীর কিছু পদস্খলন উল্লেখ করার পর বলেন, 'গাযালী একজন বড় আলেম। কিন্তু কোন আলেমের জন্য এটা শর্ত নয় যে, তিনি ভুল করবেন না।' (ঐ ১৯/৩৩৯)
‘অতএব আল্লাহ রহম করেন ইমাম আবু হামেদ (গাযালী)কে। জ্ঞান ও মর্যাদায় তাঁর নযীর কে আছে? কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে আমরা তাঁকে পবিত্র বলে দাবী করি না। (যেহেতু তিনি সূফীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন)। আর অসূল (মৌলিক বিষয়ে) কোন তকলীদ (অন্ধানুকরণ) নেই।' (ঐ ১৯/৩৪৬)
যেমন ইমাম নওবী, ইবনে হাজার প্রভৃতি উলামারও বড় বড় ত্রুটি ছিল। তাঁরা আল্লাহর স্পষ্ট গুণাবলীর দূর ব্যাখ্যা (তা'বীল) করতেন এবং সূফীবাদের কতক আকীদাহ তাঁদের মাঝেও ছিল! তবুও আমরা একথায় বিশ্বাসী যে, 'পানির পরিমাণ দুই কুল্লা (২৭০ লিটার) হলে এবং তার উপর সামান্য অপবিত্র পড়লে তাতে কোন প্রভাব পড়ে না। আর ঐ পানি অপবিত্র ও ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে যায় না। যেমন একথাও জানি যে, প্রদীপ্ত সূর্যের পাশে ছোট ছোট তারকারাজি অদৃশ্য ও বিলীন হয়ে যায়।
তাই তো বড় আলেমের বিরাট ইল্মী অবদানের কাছে তাঁর ছোট-খাট দু'-একটি ভুল ধর্তব্য নয়। মুসলিম ঐ ধরনের আলেমদের নিকট হতে তাঁদের সঠিক ইল্ম দ্বারা উপকৃত হতে ভুল করে না। অবশ্য সে তাঁদের ভুলের অনুসরণ করে না এবং তা নিষ্ঠা ও শিষ্টতার সহিত প্রকাশ ও প্রচার করতে এবং সাধারণ মানুষকে সে বিষয়ে সতর্ক করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং তাঁদের অবদানের কাছে তাঁদের ঐ সামান্য ত্রুটির কথা বিস্মৃত হয় এবং তাঁদের ঐ ভুলের কারণে তাঁদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
তবে বিদআতী ওলামাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। তাদের থেকে মুসলিমকে ভয় করা ও সাবধান থাকা উচিত। তাদের বিদআত থেকে সর্বসাধারণকে সতর্ক করা ওয়াজেব। যাদের সহিত মিলামিশা উচিত নয়। তাদের নিকট ইল্ম অনুসন্ধান করাও অনুচিত। কারণ, তা হলাহল জহর। (আত্মাআলুম)
এক গ্লাস দুধে এক বিন্দু গোমূত্র পড়ার মত বিদআতীর অন্যান্য কীর্তিও পণ্ড এবং দৃষ্টিচ্যুত হয়।
পক্ষান্তরে হে মুহতারাম! আপনি যদি সত্যানুসারী হয়েও পরশ্রীকাতর ও হিংসুকদের শিকার ও তাদের লিখন ও বক্তৃতার বিষয় হন তাহলে মনোযোগপূর্বক এই উপদেশ গ্রহণ করুনঃ-
১- আপনি যে দুই পবিত্র ওহীর জ্যোতির্ময় উজ্জ্বল সত্যে প্রতিষ্ঠিত, সলফে সালেহীনদের যে সঠিক পথের আপনি পথিক সেই সত্য ও সুপথে আপনি নির্বিচল থাকুন। নির্বিকার-চিত্তে তারই প্রতি মানুষকে আহ্বান করুন। আপনার সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীদের অন্যায় মন্তব্য ও কথা এবং গুজব রটনাকারীদের অমূলক প্রচারণা যেন আপনাকে ঐ নীতি ও পথ হতে বিচলিত না করতে পারে। নচেৎ আপনি ভ্রষ্ট হয়ে যাবেন।
হাফেয ইবনে আব্দুল বার (রঃ) এর এই স্বর্ণটুকরার মত কথাটিকে আপনি আপনার ভগ্ন অন্তরাধারে কুড়িয়ে রাখুন; তিনি বলেন, 'যাঁরা আবু হানীফা (রঃ) থেকে রেওয়ায়েত (বর্ণনা) করেছেন, তাঁকে আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত বলেছেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন তাঁদের সংখ্যা তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচকদের অপেক্ষা অধিক। আর আহলে হাদীসদের মধ্য হতে যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেছেন তাঁরা অধিকাংশ তাঁর রায়, কিয়াস এবং ইরজা' (ঈমান অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে উচ্চারণের নাম, আমল ঈমানের মূল অংশ নয় এই অভিমত)এ নিমজ্জিত হওয়ার ফলে তাঁর নিন্দা করেছেন। তাঁর প্রসঙ্গে বলা হত যে, তাঁর ব্যাপারে লোকেদের পরস্পর-বিরোধী ও বিপরীত মন্তব্য এই কথারই স্বাক্ষর বহন করে যে, মানুষটির খ্যাতি ও মর্যাদা আছে। হযরত আলী (রাঃ)কে দেখ না, তাঁর ব্যাপারে দুই প্রকার মানুষ ধ্বংস হয়েছে; অতিভক্তির ভক্ত এবং তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী। হাদীসে এসেছে যে, “তাঁর ব্যাপারে দুই ব্যক্তি ধ্বংস হবে; অতিভক্তির ভক্ত এবং মিথ্যা রচনা করে বিদ্বেষপোষণকারী।” আর এটাই হচ্ছে যশস্বী ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং যিনি দ্বীন ও সম্মানের শীর্ষস্থানে পৌঁছেছেন তাঁর নিদর্শনণ (জামেউ বারানিল ইলল্ম ২১৪৩৯)・・・・
২- ওরা আপনার সম্পর্কে যা বলে তাতে আপনি কোন ক্ষোভ প্রকাশ করবেন না এবং বিষন্নও হবেন না। বরং এ ব্যাপারে আপনি হযরত নূহ (আঃ)কে প্রদত্ত আল্লাহ তাআলার অসীয়ত গ্রহণ করুন; তিনি বলেন, “নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিল যে, 'যারা ঈমান এনেছে তারা ব্যতীত তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনো ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে তার জন্য তুমি ক্ষোভ করো না।” (কুঃ ১১/৩৬)
আর সেই অসিয়ত গ্রহণ করুন যা হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইকে দান করেছিলেন; “আমিই তোমার (সহোদর) ভাই, সুতরাং ওরা যা করত তার জন্য তুমি দুঃখ করো না।” (কুঃ ১২/৩৬)
জেনে রাখুন যে, শয়তান প্রকৃতির মানব ও দানব নবীগণের শত্রু ছিল; যারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করত। (কুঃ ৬/১১২) আর আপনি নবীর ওয়ারেস। সুতরাং আপনার যে দুশমন থাকবে না, তা নয়।
৩- আপনার বিরুদ্ধে এই গুজব বা সমালোচনা যেন আপনাকে আপনার ন্যায্য ভূমিকা ও কর্তব্য থেকে অপসারিত না করে ফেলে। যেহেতু আপনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সহিত আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্ববানকারী। অতএব তাঁরই উপর ভরসা রেখে আপনাকে ঐ পথ ও পদেই সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা উচিত। আর আল্লাহ সত্যানুসারী সৎলোকদের অভিভাবক। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, “সম্ভবতঃ তুমি আল্লাহ যা তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছেন তার কিছু বর্জন করবে এবং ব্যথিত হবে এই জন্য যে, তারা (তোমার সম্পর্কে) বলে, 'কেন তার উপর ধনভান্ডার অবতীর্ণ হয় না অথবা তার সাথে কোন ফিরিশা আসে না?' (কিন্তু তা করা তোমার উচিত নয়।) -আসলে তুমি তো কেবল সতর্ককারী। এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ের দায়িত্বভার নিয়েছেন।” (কুঃ ১১/১২)
৪- আপনার চরিত্র ও আচরণে, অন্তর ও অভ্যন্তরে যেন অনাবিলতা, স্বচ্ছলতা ও সৃষ্টির প্রতি মমত্ব থাকে। যাতে আপনি অপরকে সহ্য করতে পারেন, রাগ সংবরণ করতে পারেন এবং যারা আপনার ইজ্জতের পিছে লেগেছে তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে বিমুখতা অবলম্বন করতে পারেন।
তাদের ঐ সমস্ত রটনা নিয়ে আপনি স্বীয় হৃদয়াত্মকে ব্যাপৃত করে আত্মগ্লানির শিকার হবেন না। বরং আপনি 'বোধ-স্বাতন্ত্র্য' ব্যবহার করুন। এটাই আত্মর মহানুভবতা, আকর-সারকতা এবং মুসলিমের সচ্চরিত্রতার পরাকাষ্ঠা। এতে আপনি আপনার প্রতি অন্যায়কারী জালেমকে বীতস্পৃহ করে পরিবর্তিত ও নিরস্ত করতে সক্ষম হবেন।
(আপনি যেমনই হন না কেন, যত ভালোই হন না কেন তবুও সমালোচকদের বিরুদ্ধ সমালোচনার কবল থেকে রেহাই পাবেন না। কারণ, একই সঙ্গে আপনি সকলের মনমত অবশ্যই হতে পারবেন না।
একদা এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছিল। সঙ্গে ছিল একটি গাধা ও তার এক ছেলে। ছেলেটিকে গাধার পিঠে বসিয়ে নিজে পায়ে হেঁটে পথ চলছিল। তা দেখে একদল লোক আপোসে বলতে লাগল, 'ছেলেটা কত বড় বেআদব! নিজে সওয়ার হয়ে বাপকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!' এ সমালোচনা ছেলেটির কানে এলে সে গাধার পিঠ থেকে নেমে বাপকে বসতে বলল।
কিছুদূর অগ্রসর হতেই আর একদল লোক তাদেরকে দেখে আপোসে বলল, 'লোকটা কত বড় নির্দয়! নিজে সওয়ার হয়ে ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল! দু'জনে চাপলেই তো হয়।'
এ সমালোচনা শুনে লোকটি ছেলেটিকেও গাধার পিঠে তুলে নিল। কিন্তু আরো কিছুদূর অগ্রসর হতেই আরো একদল লোকের সমালোচনা তাদের কানে এল; তারা বলল, 'ওঃ! লোকদু'টি কত নিষ্ঠুর! এক সঙ্গে দু'জন গাধার পিঠে চেপেছে, গাধাটার কত না কষ্ট হচ্ছে!'
এ মন্তব্য শুনে দু'জনেই গাধার পিঠ থেকে নেমে পায়ে হেঁটেই সফর করতে লাগল। কিন্তু পথিমধ্যে আরো একদল লোক তাদের সমালোচনা করে বলল, 'আরে! লোক দু'টো কত বোকা দেখ! সঙ্গে সওয়ার থাকতে হেঁটে হেঁটে পথ চলছে!'
চেষ্টা সত্ত্বেও কোন অবস্থাতেই বিরুদ্ধ মন্তব্য ও সমালোচনার হাত থেকে তারা নিজেদেরকে বাঁচাতে না পেরে পরিশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হল যে, সকল মন্তব্যকে উপেক্ষা করে যা করা ভালো তা করে যাওয়াই ভালো।
জেনে রাখুন, হরিণ কুকুরের চেয়ে অধিকতর বেগে দৌড়াতে পারে। কিন্তু যখনই সে তার পশ্চাতে কুকুরের দৌড় ও ধাওয়া দেওয়ার কথায় ভ্রূক্ষেপ করে মনে স্থান দেয় তখনই তার পায়ে জড়তা আসে; ফলে সে কুকুরের অনর্থক অত্যাচার থেকে বাঁচতে অক্ষম হয়। অন্যথায় কুকুর তার নাগাল পায় না। সুতরাং আপনি সত্যের অনুসারী হলে এবং বাতিল পন্থীরা আপনার পেছনে লাগলে সর্বদা এই প্রবাদ মনে রাখবেন,
**হাথীচলতা রাহেগা, কুত্তা-ভুঁকতা রাহেপা।'………
সর্ববিষয় তার যথার্থতার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফেনায়িত বস্তু তো ক্ষণকাল পরেই স্বতঃ বিলীন হয়ে যায়। (তাসনীফুন্নাস, বকর আবু যায়দ ৭০-৭২পৃঃ)
৫- আপনি বারংবার আত্মসমালোচনা করুন। নিজের দোষ আপনার নিকট ধরা পড়লে উদার মনে তা স্বীকার করুন। হঠকারিতা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ না করে হকের প্রতি প্রত্যাবর্তন করুন। যেহেতু অন্যায় স্বীকার ও ত্যাগ করে ন্যায়ের প্রতি ফিরে আশায় মানহানি হয় না বরং মর্যাদাবর্ধন হয়।
পক্ষান্তরে বিপথগামী কোন আলেমের কোন ভ্রান্ত মত বা রায়কে খন্ডন করতে বা গঠনমূলক সমালোচনা করতে কতকগুলি নিয়ম জানা ও মানা আবশ্যিক:-
১- তাতে ইখলাস, হিতৈষিতা, অপরের ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। নিজের কীর্তিত্ব বা বড়াই প্রদর্শন উদ্দেশ্য না হওয়া। ভাষায় এমন ভাব-ভঙ্গিমা ও তীক্ষ্ণতা বা তিক্ততা থাকা উচিত নয়, যাতে বিপক্ষের মানহানি হয় অথবা তার যশে আঘাত লাগে। কারণ তা হলে 'হক' গ্রহণ করার আশা তার তরফ থেকে খুবই কম হয়ে থাকে। বরং অধিকভাবে বাতিলেই তার অবিচল ও অবিমৃশ্য থাকার আশঙ্কা থাকে।
২- খন্ডনে শরয়ী নসীহত ব্যবহার করা, যাতে সংহতি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়ে যায়।
৩- এই বিরুদ্ধ-সমালোচনায় আল্লাহভীতি ও সংযমশীলতা রাখা।
৪- মুসলিম ভায়ের প্রতি সুধারণা রাখা এবং খেয়াল রাখা যে, ধারণা করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।
৫- খন্ডনীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট জ্ঞান ও ধারণা হওয়া এবং ন্যায় ও ইনসাফের সহিত খণ্ডন বা গঠনমূলক সমালোচনা করা। অন্যায়ভাবে বা অজান্তে কোন বিষয়ে কটুক্তি ও মন্তব্য করা উচিত নয়।
৬- অপরের দোষ-গুণ বর্ণনায় ন্যায়পরায়ণতা ব্যবহার করা।
৭- অবদান, উপকার ও মাহাত্ম্যের আধিক্যকে দৃষ্টিচ্যুত না করা।
৮- লোকেদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দানে ন্যায্যতা রাখা।
৯- ভক্তি ও বিদ্বেষে সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করা।
১০- এক জনের ভুলকে এক জামাআতের সাধারণ ভুল অথবা কারো চারিত্রিক ত্রুটিকে নীতির ত্রুটি মনে না করা।
মোট কথা, এ বিষয়ে অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। যুগ্ম কিয়ামতের অন্ধকার, প্রত্যেক কল্যাণের মূল হচ্ছে ইল্ম (সঠিক জ্ঞান) ও ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রত্যেক অকল্যাণের মূল হচ্ছে মূর্খতা ও অন্যায়। (ওয়াকেউনাল মুআসির, মুহাম্মদ উসাইমীন)
আল্লাহর তরফ তেকে অনুপ্রাণিত ও তওফীকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আলেম; যিনি আল্লাহর তওহীদ মান্য ও সম্প্রচার করেন, ইখলাস ও সওয়াবের উদ্দেশ্য নিয়ে, যথাসাধ্য পরিপূরক বিষয় নিয়ে, তাঁর প্রকাশ্য ও গুপ্ত ইবাদত ও আনুগত্য করে আল্লাহর জন্য হিতোপদেষ্টা হন।
আল্লাহর কিতাবের জন্য হিতৈষী হন, তাতে উল্লেখিত যাবতীয় বিষয়াদির উপর বিশ্বাসস্থাপন করে ও ঈমান এনে, তা এবং তার সম্পৃক্ত যাবতীয় ইল্ম শিক্ষা করার জন্য প্রয়াসী হয়ে।
রসূল ﷺ এর জন্য হিতোপদেষ্টা হন, আনীত দ্বীনের মুখ্য ও গৌণ সকল বিষয়ের উপর ঈমান এনে, আল্লাহর মহব্বতের পর তার মহব্বতকে সকল ব্যক্তি ও বস্তুর মহব্বতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এবং তাঁর শরীয়তের গুপ্ত ও প্রকাশ্য সমস্ত বিষয়ে কেবল তাঁরই অনুকরণ ও অনুসরণ করে।
মুসলিম সমাজের ইমাম, নেতা ও ওলামাবর্গের জন্য হিতোপদেষ্টা হন, তাঁদের জন্য শুভকামনা করে এবং সেই শুভ ও মঙ্গল সাধনে কথা ও কর্ম দ্বারা তাঁদের সহযোগীতা করে, তাঁদের প্রজা ও অনুগামীদের আনুগত্য ও বশ্যতার আশা রেখে এবং তাঁদের বিরোধিতা, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ কামনা ও প্রকাশ না করে।
মুসলিম জনসাধারণের জন্য হিতোপদেষ্টা হন, নিজের জন্য যা পছন্দ করেন তা অপরের জন্যও পছন্দ করে, যা নিজের জন্য অপছন্দ করেন তা অপরের জন্যও অপছন্দ করে, যথাসাধ্য যে কোন উপায়ে অপরের জন্য উপকার ও কল্যাণ সাধন করে, তাঁর ভিতর-বাহির এবং কথা ও কর্মকে এক করে। সকলকে এই সুন্দর শাশ্বত মানবতার দ্বীনের প্রতি আহ্বান করে ও তাদেরকে দোযখের মুখ হতে রক্ষা করে।
এই তো সেই আলেম, যাঁর চরিত্রে ও পরিবারে অন্যের নসীহতের দরকার পড়ে না এবং এই তো সেই মুবাল্লেগ, যাঁর অধীনস্থ লোক, ছাত্র ও মাদ্রাসার জন্য বাইরের কোন তবলীগের প্রয়োজন হয় না।
وصلى الله على نبينا مد وعلى آله وصحبه أ، ومن تبعهم بإحسان إ يوم الدين.
** সমাপ্তি**