📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ওস্তায নির্বাচন

📄 ওস্তায নির্বাচন


এই দুয়ের পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে আনুষঙ্গিক ও সহায়ক অন্যান্য ইল্ম শিক্ষা করা।

আসমায়ী বলেন, 'যে তালেবে ইল্ম ঠিকমত নহু (আরবী ব্যাকরণ) না শিখে, তার উপর আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয় যে, (হাদীস পড়ার সময়) আল্লাহর নবী ﷺ এর এই কথায় সে শামিল হয়ে যাবে, “যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যা বলে সে নিজের ঠিকানা ও বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৯/১৭৮)

আব্বাস বিন মুগীরাহ বলেন, আব্দুল আযীয দারাঅর্দী কিছু লোকসহ আমার পিতার নিকট এলেন একটি কিতাব পড়ে শুনাতে। দারাঅর্দী তাদের সকলের জন্য পড়তে লাগলেন। কিন্তু তাঁর ভাষা খুব অশুদ্ধ ছিল। পড়তে পড়তে মারাত্মক-মারাত্মক ভুল পড়ছিলেন তিনি। তখন আমার পিতা তাঁকে বললেন, 'খুব হয়েছে দারাঅর্দী! এসবে (ইলমে) ধ্যান দেওয়ার পূর্বে তোমার জন্য অধিক প্রয়োজন ছিল নিজ ভাষা শুদ্ধ করা।' (ঐ৮/৩৬৮)

তদনুরূপ তালেবে ইল্মের উচিত, তার মাতৃভাষাতেও দক্ষতা লাভ করা। নচেৎ অমার্জিত ও অশুদ্ধ ভাষায় দাওয়াতি কাজ প্রতিহত হতে পারে। মানতেক ফালসাফায় অধিক মনোযোগ না দিয়ে যুগোপযোগী সাধারণ জ্ঞান (বিজ্ঞান, ভুগোল, ইংরাজী, অংক প্রভৃতি) শিক্ষার প্রবণতা রাখবে। সর্ব বিষয়ে পারদর্শিতা যদিও সম্ভব নয় তবুও আসল (কিতাব ও সুন্নাহর) ইল্ম যথাযথভাবে শিক্ষা করে সাধারণ জ্ঞান কিছু কিছু করে শিখতে পারলে দাওয়াতে অবশ্যই সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। যেমন বিদেশী ভাষা শিখলে বিদেশে দাওয়াত-কর্মে অংশ গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করবে।

অনুরূপভাবে তালেবে ইলমের কর্তব্য, তার উপযুক্ত শিক্ষক ও ওস্তায নির্বাচনে ভাবনা-চিন্তা করা। অতএব সেই ওস্তাযের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করবে যিনি হবেন অধিক জ্ঞানী, অভিজ্ঞ, পরহেযগার এবং বয়স্ক। যেমন আবু হানীফা (রঃ) চিন্তা-ভাবনা করার পর হাম্মাদ বিন সুলাইমানকে ওস্তাযরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যাঁর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'আমি তাঁকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ধৈর্যশীল ও সহ্যশীল শায়খরূপে পেয়েছিলাম। তাঁর নিকট দৃঢ়ভাবে স্থায়ী ছিলাম তাই আমি উদ্গত হয়েছি।' (তা'লীমুল মুতাআল্লিম ১২পৃঃ)

ইবনে জামাআহ বলেন, 'তালেবে ইল্মকে সর্বাগ্রে ভাবনা-চিন্তা করে এবং আল্লাহর নিকট ইস্তেখারা করে দেখা উচিত যে, সে কার নিকট হতে ইল্ম গ্রহণ করবে এবং সদাচরণ, আদব ও শিষ্টতা কার নিকট হতে শিক্ষা করবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে তাকে এমন ওস্তায গ্রহণ করা উচিত, যাঁর যোগ্যতা পরিপূর্ণ হয়েছে, স্নেহ-বাৎসল্য বাস্তবায়িত হয়েছে, শালীনতা অভিব্যক্ত হয়েছে, নৈতিক পবিত্রতা সুপরিচিত হয়েছে এবং সংযমশীলতা প্রসিদ্ধ হয়েছে। যিনি শিক্ষাদানে উত্তম শিক্ষক ও পাঠ্যবিষয় বুঝতে সুদক্ষ। তালেবে ইল্ম তাঁর নিকট তার ইল্ম বৃদ্ধির আশা ও আগ্রহ যেন না রাখে যাঁর দ্বীন, সংযমশীলতা, পরহেযগারী এবং সচ্চরিত্রতায় কমি রয়েছে।'

ইবনে সীরীন বলেন, 'এই ইল্ম তো দ্বীন। অতএব তোমরা কার নিকট হতে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ তা লক্ষ্য করো।' (মুসলিম, মুকাদ্দামাহ)

কেবল প্রসিদ্ধ ওলামাদের নিকট হতেই শিক্ষা গ্রহণ সীমাবদ্ধ হওয়া এবং অপ্রসিদ্ধ যোগ্য ওলামাদের নিকট শিক্ষা ত্যাগ করা হতে সাবধান হওয়া উচিত। যেহেতু গাযালী প্রভৃতি ওলামাগণ এরূপ করাকে ইলমে অহংকার প্রকাশ করার মধ্যে গণ্য করছেন এবং তা একপ্রকার আহাম্মকী বলে আখ্যায়ন করেছেন। কারণ, হিকমত ও জ্ঞান মুমিনের হারিয়ে যাওয়া বস্তু, যেখানেই পায় সেখান হতেই সে তা কুড়িয়ে নেয়। যেখানেই তা লাভ করার সুযোগ পায় সেখানেই গনীমত জেনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। যেই তার অনুগ্রহ করতে চায় তারই নিকট হতে তা সাদরে গ্রহণ করে। যেহেতু সে তো মূর্খতা থেকে পলায়ন করতে চায়; যেমন বাঘ হতে পলায়ন করা হয়। আর বাঘের কবল হতে যে মুক্তির পথ দেখায় পলায়নকারী তাকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করে না; তাতে সে যেই হোক না কেন।

সুতরাং এই অপ্রসিদ্ধ আলেমের নিকট যদি বর্কতের (তাকওয়া ও ইলমে প্রাচুর্যের) আশা থাকে তাহলে তাঁর দ্বারা উপকার ব্যাপক হয়। তাঁর তরফ থেকে প্রশিক্ষণ পরিপক্ক হয়। আর যদি পুর্বগামী ও পরগামী ওলামাদের অবস্থা সমীক্ষা করে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ উপকৃত তিনিই হয়েছেন এবং সফলতা তিনিই লাভ করেছেন যাঁর শায়খ বা ওস্তায খুব পরহেযগার ছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদের জন্য তাঁর বাৎসল্য ও হিতাকাংখায় তিনি উজ্জ্বল আদর্শ ছিলেন। অনুরূপভাবে যদি লিখিত বই-পুস্তকের উপর সমীক্ষা চালানো যায় তাহলে দেখা যাবে যে অধিক মুত্তাকী ও বিষয়-বিরাগী আলেমের লিখিত গ্রন্থই অধিক উপকারী এবং সেই গ্রন্থ অধ্যয়নেই অধিক সাফল্য বর্তমান।

তালেবে ইলমের আরো চেষ্টা করা উচিত, যাতে তার ওস্তায শরীয়তের ইমে পরিপূর্ণ অবহিত হন। সমসাময়িক অন্যান্য আস্থাভাজন ওলামাদের সহিত যেন তাঁর অধিকাধিক যোগাযোগ, ইল্মী-আলোচনা এবং দীর্ঘ বৈঠক হয়। তিনি যেন সরাসরি কিতাব থেকে গৃহীত ইলমের আলেম না হন; যিনি সুদক্ষ ওলামাদের সাহচর্যে সুপরিচিত নন।

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি কিতাব সমূহের উদর হতেই ফিক্‌হ গ্রহণ করবে সে আহকাম বিনষ্ট করে ফেলবে।' আর অনেকে বলেছেন যে, 'কিতাব বা কাগজকে ওস্তায করা খুব বড় আপদ। অর্থাৎ যারা কেবল কিতাব থেকেই ইল্ম শিখতে চায় তারা ওলামাদের বালাই।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৮৫পৃঃ)

ইব্রাহীম বলেন, 'ওঁরা যখন কারো নিকট ইল্ম গ্রহণ করতে আসতেন তখন তাঁর বেশভূষা, নামায এবং অন্যান্য অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করতেন। অতঃপর তাঁর নিকট ইলম গ্রহণ করতেন।'

সওরী বলেন, 'যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর নিকট কিছু শোনে আল্লাহ সেই শোনাতে তাকে উপকৃত করবেন না। আর যে ব্যক্তি তার সহিত মুসাফাহা করল সে ইসলামকে ধ্বংস করল।'

মালেক বিন আনাস বলেন, 'চার ব্যক্তি হতে ইলম গ্রহণ করা হবে না; বাকী অন্যান্য হতে গ্রহণ করা হবে; নির্বুদ্ধিতা প্রকাশকারী নির্বোধের নিকট হতে ইলম গ্রহণ করোনা; যদিও সে সবচেয়ে অধিক বর্ণনাকারী হয়। মিথ্যুকের নিকট থেকে ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষের সহিত ব্যবহারে কথাবার্তায় মিথ্যা বলে থাকে -যখন তাকে পরীক্ষা করে দেখা যাবে যে সে সত্যই মিথ্যা বলে; যদিও সে রসূল ﷺ এর উপর মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত নয়। কোন প্রবৃত্তি পূজারীর নিকটেও ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষকে তার প্রবৃত্তি (বিদআত) এর প্রতি আহ্বান করে। আর সেই শায়খ হতে ইল্ম গ্রহণ করো না যার অবদান ও ইবাদত আছে, কিন্তু কি বয়ান করে তা সে নিজেই জানে না। (আল-জামে' লিআখলাকির রাবী ১/১৩৯)

শত সাবধান সেই আলেম, মুদারিস ও ওস্তায হতে যার হৃদয় মরিচায় কালো হয়ে আছে। ফলে তার চিন্তাশক্তি, বোধ ও উপলব্ধি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার কারণে সে হক ও ন্যায় গ্রহণ করে না এবং বাতিল ও অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করে না। যার মূলে রয়েছে ঔদাস্য ও প্রবৃত্তি পূজা; যা অন্তজ্যোতিকে নিষ্প্রভ করে এবং তার হৃদয়ের দৃষ্টি-শক্তিকে অন্ধ করে দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি নিজেকে ওদেরই সংসর্গে রাখবে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় নিজেদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে ওদের থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। আর যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে উদাসীন করে দিয়েছি, যে তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না।” (সূরা কাহফ ২৮ আয়াত)

সুতরাং কোন তালেবে ইল্ম বা কোনও সাধারণ ব্যক্তি যখন কারো অনুসরণ করতে চাইবে তখন তাকে লক্ষ্য করা উচিত যে, সে অনুসরণীয় ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণকারী অথবা তাঁর সারণে উদাসীনদের মধ্যে গণ্য? তার জীবনে প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশীর আধিপত্য বর্তমান অথবা ওহীর? যদি তার জীবনে খেয়ালখুশী ও মানসতাই আধিপত্য বিস্তার করে থাকে এবং সে উদাসীন হয় তবে তার কর্ম সীমালঙ্ঘিত ও বিনষ্ট। যে এমন গুণের গুণী তার অনুসরণ ও আনুগত্য করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অতএব ওস্তায যদি এরূপই হয়ে থাকেন তবে তাঁর থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত এবং তাঁকে নিজের অনুসরণীয় ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা ও স্থিরীকৃত না করাই কর্তব্য। পক্ষান্তরে যদি তাঁকে আল্লাহর স্মরণ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং সৎকর্মে জাগ্রত, তৎপর ও সীমাবদ্ধ পায়, আর তাঁর কর্তব্যে দূরদর্শী ও পারদর্শী পায় তাহলে তাঁরই পিছু ধরা উচিত। যেহেতু মৃত ও জীবিতের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে আল্লাহর যিক্র। যে আল্লাহকে স্মরণ করে সে জীবিত এবং যে করে না সে মৃত। আর মৃতের নিকট কি কিছু শিখা যায়? (আল ওয়াবিলুস স্বইয়্যেব ৩৭ পৃঃ)

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 নিষ্ঠা ও শিষ্টাচারিতা

📄 নিষ্ঠা ও শিষ্টাচারিতা


যে ব্যক্তি যা কিছু পাঠ বা শ্রবণ করে সেই তদ্দ্বারা উপকৃত হতে পারে এমনটা নয়। যেহেতু পড়া ও শোনার সাথে মনের যোগ না হলে তা নিরর্থক হয়।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'কুরআন দ্বারা যদি উপকৃত হতে চাও তবে তেলাঅতের সময় তোমার হৃদয়কে উপস্থিত কর, শ্রবণকালে উৎকর্ণ থাক এবং মনে মনে সেই পরিবেশে হাজীর হও যে পরিবেশের মানুষকে আল্লাহ তাআলা ঐ আয়াত দ্বারা সম্বোধন করেছেন। যেহেতু তা তাঁর দূত মারফৎ তোমার জন্যও সম্বোধন। আল্লাহ পাক বলেন,

إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرِى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ

অর্থাৎ, “নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য যার হৃদয় আছে অথবা নিবিষ্টচিত্তে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে। (সূরা ক্বাফ ৩৭ আয়াত)

যেহেতু পরিপূর্ণ প্রভাব-প্রভাবশালী উপযোগী কথা, গ্রহণকারী স্থান বা পাত্র, প্রভাব লাভ করার শর্ত এবং তার কোন বাধা না থাকার অন্যসাপেক্ষ। উক্ত আয়াত এই সবকিছুকে সংক্ষিপ্ত শব্দে বর্ণনা করেছে।

'নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে' এই বাণী দ্বারা সূরার প্রথম থেকে এই আয়াত পর্যন্ত সমস্ত কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং এটাই হল প্রভাবশালী উপযোগী কথা। 'যার হৃদয় আছে' এ কথায় ইঙ্গিত রয়েছে গ্রহণকারী পাত্রের প্রতি, উদ্দেশ্য জীবিত হৃদয়; যা আল্লাহর বাণী বুঝতে সক্ষম। যেমন তিনি বলেন, “এতো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন; যার দ্বারা (মুহাম্মদ জাগ্রত-চিত্ত) জীবিত ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করতে পারে।” (সূরা ইয়াসীন ৬৯-৭০ আয়াত)

'উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে' অর্থাৎ তার কর্ণকে খাড়া করে এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে তাকে যা বলা হচ্ছে তার প্রতি সংযোগ করে। আর এটা হচ্ছে প্রভাব লাভের শর্ত। 'নিবিষ্টচিত্তে' বা 'উপস্থিত হয়ে' অর্থাৎ নিজের মন ও হৃদয়কে তাতে হাজির করে, অন্যস্থানে ফেলে না রেখে বা উদাসীন না হয়ে শ্রবণ করা। আর এর দ্বারা প্রভাবলাভের প্রতিবন্ধী বিষয়সমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে; আর তা হল, হৃদয়ের ঔদাস্য, যা বলা হচ্ছে তার জন্য মনের অনুপস্থিতি এবং প্রণিধানে অমনোযোগিতা।

সুতরাং যখন প্রভাবকারী-আর তা হল কুরআন- ও গ্রহণকারী পাত্র -আর তা হল জাগ্রতচিত্ত একত্রে, সমরেত হয় এবং সর্বশর্ত পূরণ হয় আর তা হল উৎকর্ণতা, অতঃপর প্রতিবন্ধক থেকে খালি হয় আর-তা হল মনের অনবধানতা, অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা হতে ঔদাস্য বা অন্য কোন বিষয়ে মনোযোগী হওয়া-তাহলেই প্রভাব অর্জন হয়; অর্থাৎ কুরআন ও উপদেশ দ্বারা উপকৃত হতে পারা যায়।' (আল-ফাওয়াইদ ৫পৃঃ)

ইল্ম সেই বস্তু যাতে মনোযোগী, নিষ্ঠাবান ও জাগ্রতচিত্ত না হলে লাভ করা যায় না। কবি বলেন,

'বই পড়ে কিন্তু যে নাহি দেয় মন,
কেমনে সে জন বল পাবে জ্ঞান ধন?
প্রদীপে না দিয়ে তেল বাতি যদি জ্বালো,
কখনো কি সে প্রদীপ দিয়ে থাকে আলো?'

আর কথায় বলে, 'কলম কালি মন, লিখে তিনজন।'

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 শিক্ষকের প্রতি সমীহ

📄 শিক্ষকের প্রতি সমীহ


অনুরূপভাবে ইল্মের আরো এক নীতি, ওস্তায ও শিক্ষকের প্রতি বিনয়, শিষ্টতা ও সমীহ প্রদর্শন। যা না হলে শিক্ষক ও ছাত্রের সংযোগ থাকে না। দেওয়া-নেওয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ থাকে না। ফলে উভয়ের কর্তব্য পালন তো হয়; কিন্তু ফললাভ হয় না। তাই তালেবে ইল্মের উচিত, নিজ ওস্তাযের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। বিনয়ের সাথে তাঁর সেবা করা।

শা'বী বলেন, 'একদা যায়দ বিন সাবেত এক জানাযার নামায পড়লেন। অতঃপর তাঁর প্রতি একটি অশ্বতরী পেশ করা হল; যাতে তিনি সওয়ার হন। তৎক্ষণাৎ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এসে সওয়ারীর পা-দানে ধরলেন। (যাতে তিনি সহজে চড়তে পারেন)। যায়দ তাঁকে বললেন, 'ছাড়ুন, হে রসূলুল্লাহ ﷺ এর পিতৃব্যপুত্র!' ইবনে আব্বাস বললেন, 'ওলামাদের সহিত এইরূপ ব্যবহারই করতে হয়।' (ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, হাকেম)

হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি আমাকে একটি হরফও শিখিয়েছে আমি তার গোলাম। সে ইচ্ছা করলে আমাকে বিক্রয় করতে পারে। নচেৎ ইচ্ছা করলে আমাকে গোলাম করে রাখতে পারে।'

সলফে সালেহীনগণ স্ব-স্ব ওস্তাযের বড় সম্মান করতেন। সমীহর সহিত শিক্ষকের প্রতি তাকাতে তাঁদের মনে ত্রাস সঞ্চার হত।

মুগীরাহ বলেন, 'যেমন আমীরকে ভয় করা হয় তেমনি আমরা (আমাদের ওস্তায) ইব্রাহীম নখয়ীকে ভয় করতাম।'

আইয়ুব বলেন, 'তালেবে ইল্ম হাসানের নিকট তিন বছর ধরে (দর্সে) বসত কিন্তু তাঁর ত্রাসে কোন বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতে সাহস করত না।'

ইসহাক বলেন, 'আমি ইয়াহয়্যা কাত্তানকে আসরের নামায পড়ে মসজিদের মিনার গোড়ায় হেলান দিতে দেখতাম। তাঁর সম্মুখে আলী বিন মাদানী, শাযাকুনী, আম্র বিন আলী, আহমদ বিন হাম্বাল, ইয়াহয়্যা বিন মাঈন প্রভৃতি খাড়া হয়ে তাঁকে হাদীস বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। তাঁরা একই অবস্থায় মাগরেবের নামায নিকটবর্তী হওয়া পর্যন্ত পায়ের উপর ভর করে দণ্ডায়মান থাকতেন। তবুও তিনি (কাত্তান) তাঁদের কাউকেও বলতেন না যে, 'বস।' আর তাঁরাও তাঁর ত্রাস ও সমীহতে বসতে সাহস করতেন না!'

ইবনুল খাইয়াত মালেক বিন আনাসের প্রশংসায় বলেন, 'তিনি কোন বিষয়ে উত্তর না দিলে তাঁর ত্রাসে দ্বিতীয়বার আর কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করত না। সমস্ত জিজ্ঞাসুরা চিবুক নত করে থাকত। তাঁর উপর উদ্ভাসিত হত প্রবল ব্যক্তিত্বের প্রভা এবং পরহেযগারীর মাহাত্ম্য। তিনি ভয়াবহ ছিলেন অথচ তিনি কোন শাসক ছিলেন না।'

আহমদ বিন হাম্বল খালাফ আহমারকে বলেছিলেন, 'আমি আপনার সম্মুখে ছাড়া বসিনা, আমরা আমাদের শিক্ষকের নিকট বিনয়ী হতে আদিষ্ট হয়েছি।'

সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত, তার সকল বিষয়ে ওস্তাযের কথা মানা। তাঁর অভিমত ও তদবীবের বাইরে কোন কাজ না করা। সদা তাঁর সহিত দক্ষ চিকিৎসকের পার্শ্বে এক রোগীর মত অবস্থান করবে। যা করতে ইচ্ছা করবে সে বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেবে। অন্যান্য সকল কর্মে তাঁর সম্মতি অবশ্যই নেবে। তাঁর প্রতি গভীর সমীহ রাখবে। তাঁর সেবার মাধ্যমে আল্লাহর সামীপ্য আশা করবে। আর একথা জানবে যে, ওস্তাযের খাতিরে লাঞ্ছনা পাওয়া মর্যাদা, তাঁর জন্য বিনয়াবনত হওয়া গর্ব এবং তাঁর নিকট নিচু হওয়া উন্নতির কারণ।

তালেবে ইল্মের কর্তব্য, তার ওস্তাযের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা-দৃষ্টিতে তাকানো। সকল বিষয়ে তাঁর বিরক্তি ও বিরাগকে এড়িয়ে চলা। তাঁর সকল অবস্থা ও উপস্থিতিকে পরোয়া করে চলা। সলফরা এরূপই করতেন। তাঁদের অনেকে মনে মনে দুআ করতেন, 'আল্লাহ! তুমি আমার দৃষ্টি হতে আমার ওস্তাযের ত্রুটিকে গোপন কর। আর আমার নিকট হতে তাঁর ইলমের বর্কত তুমি ছিনিয়ে নিওনা।' (তাযকিরাতুস সামে' ৮৮পৃঃ)

ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেন, 'আমি মালেক (রঃ) এর নিকট তাঁর ভয়ে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে (বই বা খাতার) পাতা উল্টাতাম; যাতে তিনি উল্টানোর শব্দ না শুনতে পান।'

তালেব আমীরজাদা হলেও ওস্তাযের সামনে বিনতির সাথে বসবে। যেহেতু ইল্ম ও আলেমের সম্মান সকল পার্থিব বিষয়ের ঊর্ধ্বে। ওস্তাযকে সম্বোধনকালে 'আপনি, লেন-দেন' প্রভৃতি বলবে। নাম ধরে না ডেকে সম্মানসূচক উপাধি দ্বারা ডাকবে। তাঁর অনুপস্থিতকালেও তাঁর নাম নেবে না, নিলেও সম্মানপূর্ণ খেতাব জুড়ে নাম নেবে। তাঁর অবর্তমানেও 'উনি-তিনি, বলেন' ইত্যাদি ব্যবহার করবে। কোন প্রকার অসম্মানসূচক আখ্যায়নে তাঁর উল্লেখ করবে না; যেমন বহু জাহেল অবজ্ঞার সাথে দ্বীনের আলেমকে তুচ্ছজ্ঞান করে 'মোল্লাজী, মৈলিবি' ইত্যাদি বলে আখ্যায়ন করে থাকে। আর তা এই কারণে যে, 'তাঁদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত' (?) গীর্জা বা রকেট পর্যন্ত নয় তাই! সত্যিই তো! যে দেশের লোকেরা কাপড়ই পরে না সে দেশে ধোপার আর কি কদর থাকতে পারে?

তালেবে ইল্ম ওস্তাযের সমস্ত অধিকার ও হক আদায় করবে; তাঁর অনুগ্রহ ও অবদান বিস্মৃত হবে না। তাঁর শ্রদ্ধার সংরক্ষণ করবে, তাঁর গীবতের প্রতিবাদ করতে, তাঁর জন্য রাগান্বিত হবে; তা না পারলে সেই গীবতের মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করবে। সর্বদা তাঁর জন্য দুআ করবে। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য দুআ এবং তাঁর অসহায় পরিবারের যথাসম্ভব তত্ত্বাবধান করবে।

শিক্ষার ময়দানে তালেবে ইল্মের উচিত, ওস্তাযের ক্রোধ ও বিভিন্ন কোপজ দোষের সম্মুখে ধৈর্য ও সহ্যশীলতা অবলম্বন করা। প্রহার করলেও দাহ বা মাদ্রাসা ত্যাগ করে পলায়ন না করা অথবা তাঁর বিরুদ্ধে অভিভাবক অথবা শাসকগোষ্ঠীর নিকট অভিযোগ না করা। করলে তা হবে বড় আহাম্মকী।

একদা আ'মাশ তাঁর এক ছাত্রের উপর ক্রোধান্বিত হলেন। অপর এক ছাত্র ঐ ছাত্রকে বলল, 'যদি উনি আমার প্রতি এমন ক্রোধ দেখান যেমন তোমাকে দেখিয়েছেন তাহলে আমি আর উনার নিকট ফিরব না।' আ'মাশ শুনলে তিনি বললেন, 'তাহলে সে তো আহম্মক। আমার অসদাচারণের কারণে সে তার লাভজনক জিনিস ছেড়ে চলে যাবে।'

সুফিয়ানকে বলা হল, 'কত লোক পৃথিবীর সারা দেশ হতে আপনার নিকট আসছে তাদের উপর আপনি ক্রোধান্বিত হন? সম্ভতঃ ওরা আপনাকে ত্যাগ করে চলে যাবে।' তিনি উত্তরে বললেন, 'তারা তোমার মতই আহাম্মক তাহলে; যদি তারা আমার অসদাচরণের কারণে তাদের উপকারী বস্তু ছেড়ে চলে যায়।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৯০পৃঃ, আল জামে'২২৩পৃঃ)

কিছু সলফ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি শিক্ষার লাঞ্ছনার উপর ধৈর্য ধারণ করে না সে তো সারা জীবন মূর্খতার অন্ধত্বে থাকে। আর যে ব্যক্তি সবর করে লিখা-পড়া করে দুনিয়া ও আখেরাতে তার সম্মানলাভ হয়।'

ইবনে আব্বাস বলেন, 'ছাত্র হয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করেছি তাই আজ শিক্ষক হয়ে সম্মান লাভ করছি।'

শিক্ষকের উপর ক্রোধ প্রকাশ ছাত্রের জন্য সমীচীন নয়। যেহেতু শিক্ষক তাকে যে কড়া কথা বলেন অথবা প্রহার করেন তা তো তার মঙ্গলের জন্যই করেন, তাতে শিক্ষকের কোন স্বার্থ নেই। অনুরূপভাবে (দলীল ও যুক্তির ভিত্তিতে স্বমত ভিন্ন হলেও) শিক্ষকের সহিত তর্কাতর্কি করাও তার জন্য সঙ্গত নয়। যেহেতু এতে বহু অমঙ্গল আছে যা তার ইলমের আকাশে মেঘ ডেকে আনে। তাই মাইমুন বিন মিহরান বলেন, 'তোমার চেয়ে যে অধিক জ্ঞানী তার সহিত তর্ক করো না। যদি তা কর তবে সে তোমার উপর হতে তার ইল্ম রুখে নেবে এবং তার কোন নোকসান হবে না।'

যুহরী বলেন, 'সালামাহ ইবনে আব্বাসের সহিত তর্ক করত, যার ফলে বহু ইলম হতে সে বঞ্চিত ছিল।' (জামেউ বায়ানিল ইল্যু ১৭১ পৃঃ)

মোটকথা, তালেবে ইল্ম যদি তার সদাচরণ, নিষ্ঠা ও শিষ্টতা দ্বারা ওস্তাযকে সমীহ এ শ্রদ্ধা করে আনন্দিত করতে পারে তবে শিক্ষক তাঁর ইলমের পাত্র তার পাত্রে ঢেলে দেবেন। নচেৎ মনের মধ্যে 'কিন্তু' সৃষ্টি করে দিলে তিনি তার জন্য হিতাকাঙ্খী না হয়ে কেবল দায়িত্ব পালনকারী হবেন।

তদনুরূপ মুদার্রেসের উপর অসম্মানজনক চাপ, কমিটি বা মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অহেতুক বা অমূলক টিপ্পনী বা ফোড়ন, তাঁদের সম্মানে আঘাত লাগে এমন কর্তৃত্ব ইত্যাদি প্রকৃত ইলমের স্বার্থে নয়। যাতে ছাত্রদের প্রকৃত উন্নতির কথা ভাবতে গেয়ে তাঁদের মন ভেঙ্গে হিতে বিপরীত হয়। সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙ্গে বসে থাকে। যার কারণেই অনেক মাদ্রাসায় তালাও পড়ে যায়।

তালেব ইলমের উচিত, ওস্তাযকে কোন প্রকার বিরক্ত ও 'ডিস্টার্ব' না করা। নিদ্রিত থাকলে কোন অজরুরী কাজের জন্য বা কোন প্রশ্নের জন্য অথবা সবক বুঝে নেওয়ার জন্য জাগ্রত না করা, দরজা বন্ধ থাকলে অনুমতি না নিয়ে তাঁর রুমে প্রবেশ না করা, আদবের সহিত অতি ধীরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া এবং অনুমতি দিলে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। ওস্তাযের সামনে বা ক্লাসে গেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এবং শরীরের দুর্গন্ধ দূর করে যাবে। যেহেতু তাঁর মজলিস ইল্মের মজলিস, যিক্র ও ইবাদতের মজলিস।

তিনি কোন কাজে ব্যস্ত থাকলে নিজের কোন কাজের জন্য তাঁর নিকট যাবে না। সেখানে পৌঁছে তিনি যদি আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেন অথবা অপেক্ষা করতে বলেন তাহলে অপেক্ষা করবে, নচেৎ সালাম দিয়ে সত্বর তাঁর নিকট হতে বের হয়ে যাবে। আর তিনি অনুমতি দিলেও বেশীক্ষণ তাঁর সময় নষ্ট করবে না।

ওস্তাযের নিকট বা ক্লাসে গেলে তার অন্তরকে সমস্ত ব্যস্ততা থেকে খালি করবে এবং মস্তিষ্ককে স্বচ্ছ করবে। তন্দ্রা, ক্রোধ অতি ক্ষুধা বা পিপাসা ইত্যাদির অবস্থায় যাবে না। যাতে তার হৃদয় প্রশস্ত হয় এবং যা বলা হয় তা আয়ত্ত করতে পারে।

সর্বদা চেষ্টা করবে যেন একটা ক্লাসও ছুটে না যায়। কারণ শিক্ষকের নিকট সে দস্ ছুটে যায় তার কোন বিকল্প ও বিনিময় নেই।

অসময়ে ওস্তাযের নিকট পড়া বুঝতে যাবে না। নিজের জন্য তাঁর নিকট হতে কোন নির্দিষ্ট সময় অথবা স্থান নির্ধারিত করতে চাইবে না; যদিও সে আমীরজাদা বা ধনীর ছেলে হয়। যেহেতু তাতে ওস্তায ও অন্যান্য ছাত্রদের উপর অহংকার ও আহাম্মকি প্রদর্শন হয়।

ক্লাসে পৌঁছে সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিবে, ব্যাখ্যা না চললে ওস্তাযকে বিশেষ অভিবাদন জানাবে। অতঃপর মজলিস যেখানে শেষ হয়েছে তার একপ্রান্তে নীরবে বসে যাবে। ক্লাস চলাকালীন কাউকে ডিস্টার্ব অবশ্যই করবে না। একেবারে ওস্তাযের মুখোমুখি অথবা পাশাপাশি বেআদবের মত বসবে না। তাঁর সম্মুখে বিনয় ও শিষ্টতার সহিত বসবে, তাঁর প্রতি তাকিয়ে উৎকর্ণ হবে, নিজ দেহ-মন সবকিছু দ্বারা তাঁর প্রতি মুখ করে বসবে। তিনি যা বলছেন বা ব্যাখ্যা করছেন তা নিবিষ্টচিত্তে শ্রবণ করবে ও বুঝবে। এসময়ে এদিকে ওদিক দৃষ্টি ফিরাবে না। বিশেষ করে তাকে সম্বোধন করে কথা বললে অপ্রয়োজনে তাঁর নিকট হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। পার্শ্বে বা বাইরে কোন শব্দ পেলেও ফিরে তাকাবে না। তাঁর সম্মুখে জামা-কাপড় বা চাদরাদি ঝাড়বে না। জামার হাতা গুটাবে না। হাত বা পায়ের আঙ্গুল, দাড়ি, নাক, দাঁত, কলম বা সিট ইত্যাদি নিয়ে খেলা করবে না। নাক বা দাঁতের ময়লা সাফ করবে না, ঘা থাকলে তা খুঁটবে না, হাই বা হাঁচির সময় মুখে রুমাল বা হাত রেখে নেবে। হাঁচির সময় খুব জোরে শব্দ না করার চেষ্টা করবে, হো-হো করে সশব্দে হাই তুলবে না।

তার সামনে কিছুতে হেলান দিয়ে অথবা পায়ের উপর পা চাপিয়ে অথবা তাঁর দিকে পা বাড়িয়ে অথবা তাঁর চেয়ে উঁচু জায়গায় বসবে না। অপ্রয়োজনে অধিক কথা বলবে না। বেআদবীপূর্ণ অশ্লীল বা হাস্যকর কোন কথা বা গল্প শুনাবে না। অকারণে হাসবে না। হাসলে মুচকি হাসবে। অপ্রয়োজনে অধিকাধিক গলা ঝাড়বে না। তাঁর সহিত হাত হিলিয়ে বা চোখ ঠেরে কথা বলবে না। তাঁর মজলিসের বিশেষ আদব করবে; যেমন সলফে সালেহীনরা করতেন। তাঁরা ইল্মী মজলিসে এমন একাগ্রতার সহিত বসতেন এবং এমন ধীর ও স্থির থাকতেন যেন তাঁদের মাথায় কোন পাখী বসে থাকত।

ওস্তাযের কোন কথার উপর প্রতিবাদ প্রয়োজন হলে সশ্রদ্ধ প্রতিবাদ আদবপূর্ণ শব্দে পেশ করবে। তিনি কোন কাহিনী, কবিতা বা তথ্য পেশ করলে এবং তা তার পূর্ব হতে জানা থাকলেও বিস্ময়ের সাথে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করবে। জ্ঞান-পিপাসা ও জানার আগ্রহ প্রকাশ করে তা শোনা মাত্র আনন্দিত হবে। এই ভাব প্রকাশ করবে যে, সে যেন তা কখনো শুনেনি; আজ সে নতুন শুনল।

তাঁর ব্যাখ্যাদানের পূর্বে কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা, তাঁর উত্তর দেওয়ার পূর্বে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবে না। অথবা সে তার ব্যাখ্যা বা উত্তর জানে তা ভাবে-ভঙ্গিতেও প্রকাশ করবে না। মজলিসে তাঁর কথা কাটবে না। তাঁর বক্তৃতা চলাকালীন অন্য কারো সহিত মুখে বা ইঙ্গিতে কথা বলবে না।

তাঁকে কোন জিনিস দেওয়ার সময় ছুঁড়ে দেবে না। আদবের সহিত ধরিয়ে বা রেখে দেবে। কোন প্রয়োজন না হলে ওস্তাযের সামনে বা পাশাপাশি চলবে না; বরং তাঁর পিছনে চলবে। তিনি পায়ে হেঁটে চললে তাঁর সহিত সওয়ার হয়ে চলবে না। পথে তাঁর সহিত সাক্ষাৎ হলে আগে আগে স্মিতমুখে সালাম করবে এবং তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করবে।

তিনি কোন বিষয়ে পরামর্শ না চাইলে তাঁকে পরামর্শ দিতে যাবে না। পরামর্শ চাইলে বিনয়ের সাথে উচিত পরামর্শ দেবে। অবশ্য কোন বিপদ হতে সতর্ক করতে কোন সময়ই ভুলবে না।

দস্ চলাকালীন কোন বিষয় বুঝতে না পারলে আদবের সহিত তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে। জিজ্ঞাসা করতে কোন লজ্জা বা কুণ্ঠাবোধ করবে না। অথবা অহংকারের সাথে প্রশ্ন করা অপ্রয়োজন ভাববে না। আবার তাঁকে পেঁচে ফেলার জন্য অথবা পরীক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত প্রশ্নাদি করবে না। কোন বিষয় বুঝতে না পারলে এবং ওস্তায তাকে বুঝতে পেরেছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলে স্পষ্ট 'না' বলতে কোন লজ্জা বা সংকোচ নেই। না বুঝে 'হুঁ-হুঁ' করে ভবিষ্যতের জন্য বোঝা বাড়ানো উচিত নয়। আবার বুঝেও না বুঝার ভান করে তাকে বিরক্ত করা বৈধ নয়। কথায় বলে, 'বুঝেও যে বুঝেনা তাকে বুঝাবে কে? আর না বুঝে যে হুঁ-হুঁ করে তাকে ভূতে ধরেছে।'

অজানা বিষয়ে প্রশ্ন করা কোন দোষের নয়। প্রশ্ন করলে যদি কেউ বোকা মনে করে করুক, তবুও প্রশ্ন ত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ, প্রশ্ন করে যে কিছু জানতে চায় সে বোকা হয় মাত্র দু'-পাঁচ মিনিটের জন্য। কিন্তু জানার ভান করে যে কখনও প্রশ্ন করে না সে বোকা থাকে সারাটা জীবন।

কোন সবক বুঝতে বা তৈরী করতে কঠিন ও কষ্টবোধ হলেও নিরাশ হওয়া চলবে না। 'আরবী, পারবি তো পারবি, নচেৎ হেগে-মুতে ছাড়বি' কথায় ঘাবড়ে গেলে হবে না। একবারে না বুঝলে ওস্তাযের নিকট বারবার বুঝে নিয়ে, সহপাঠীদের সহিত বারংবার পুনরালোচনা ও অভ্যাস করে, একাধিকবার নিজে পড়ে মুখস্থ করে তবেই ক্ষান্ত হতে হবে। সবককে শুরু থেকেই কোনক্রমেই কঠিন মনে করা চলবে না। 'বুঝতে পারছি না' বলে হাত গুটিয়ে বসে গেলে হবে না। মনের মাঝে আনতে হবে অধ্যাবসায় ও সাধনার ঝড়।

কথিত আছে যে, জনৈক ছাত্র মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে সবক বুঝতে ও স্মৃতিস্থ করতে না পারলে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে মনস্থ করে। ফেরার পথে পিপাসায় এক কুয়োতলায় পানি পান করতে গিয়ে দেখে, একটি পাথর ক্ষয় হয়ে তাতে গর্ত হয়ে গেছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করে যখন সে জানতে পারল যে, মাটির কলসী বারবার রাখার ফলেই পাথরটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে তখন সে তার মনের ভিতর হারানো সাহস ও উদ্যম ফিরে পেল। ভাবল, বারবার মাটির কলসী রাখার ফলে যদি একটা পাথরও ক্ষয়ে যায় তাহলে বারবার চেষ্টার সাথে পড়ার পরেও আমার ব্রেনে দাগ পড়বে না এবং সবক মুখস্থ হবে না কেন? এই বলে পুনরায় নতুন উদ্যোগ নিয়ে সে মাদ্রাসায় ফিরে যায়। ভবিষ্যতে সেই ছাত্রই এক বড় পণ্ডিতরূপে খ্যাতি লাভ করে।

অনুরূপ আর এক ছাত্র একটি পিপড়েকে একটুকরা খাবার নিয়ে কোন দেয়ালে উঠতে অক্ষম ও পরক্ষণেই বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহু চেষ্টার পর উঠতে সক্ষম দেখে নিজের উদ্যম ফিরে পেয়েছিল। এরূপ প্রত্যেক ছাত্রই যথেষ্ট মেহনত, সুদৃঢ় মনোবল ও অবিরাম সাধনা প্রয়োগ করলে বিদ্যায় পারদর্শী হতে পারে। কবি বলেন,

'পারিবো না' একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার।
দশজনে পারে যাহা
তুমিও পারিবে তাহা
একবারে না পারিলে দেখ শতবার।'

তালেবে ইলমের উচিত, তার কিতাবের সহিতও আদব করা; মুসহাফকে মাটির উপর না রাখা, তাঁর প্রতি পা না করা, তা পিছন করে না বসা, আঙ্গুলে থুথু নিয়ে তার পাতা না উল্টানো, কোন কিতাবের নিচে তা না রাখা। হাদীস, তফসীর প্রভৃতি কিতাব; যাতে কুরআনী আয়াত বা আল্লাহর নাম আছে তা পা দ্বারা না ধরা, তার উপর হেলান না দেওয়া, যেখানে সেখানে ফেলে না রাখা, ঐরূপ পত্রিকার কাগজকে খাওয়ার দস্তরখান বা বসার সিট না করা। কিতাবের উপর কলম দ্বারা লিখে না খেলা; প্রয়োজনীয় টীকা ছাড়া অন্য কিছু না লিখা, এসব কিছু নষ্ট হয়ে গেলে কোন সম্মানিত স্থানে দাফন করা বা জ্বালিয়ে তার ছাই পবিত্র পানিতে ফেলা ইত্যাদি। এ আদব কাগজের প্রতি নয় বরং তা ইলমের প্রতি, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বাণীর প্রতি।

প্রয়োজনে সহপাঠীকে কিতাব পড়তে দেওয়া উচিত। সহপাঠীরও উচিত উক্ত কিতাবের যথার্থ হিফাযত করা। লিখার সময় 'বিসমিল্লাহ' লিখা ও বলা, আল্লাহর নামের সহিত 'তাআলা, সুবহানাহু, আয্যা অজাল্ল, তাবারাকা অতাআলা, রব্বুল আলামীন, রব্বুল ইষ্যাত' ইত্যাদি লিখা ও পলা। নবী ﷺ এর নাম লিখার সমর দরূদ সম্পূর্ণভাবে লিখা ও বলা।

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 শিক্ষকের কর্তব্য

📄 শিক্ষকের কর্তব্য


মুদার্রেসের উচিত, প্রথমতঃ তালেবে ইল্মের ধীগুণ (অর্থাৎ কৌতূহল, শ্রবণ, আহরণ, স্মৃতিতে ধারণ বা স্মরণ, সন্দেহ বা তর্ক, সন্দেহ-নিরসন, অর্থবোধ ও মর্মাবধারণ এই অষ্টবিধ বুদ্ধিগুণ) পরীক্ষা করা, পড়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অথবা দুর্বলতা লক্ষ্য করা এবং সেই অনুযায়ী তার উপর পাঠের দায়িত্ব প্রদান করা। তিনি শিক্ষার্থীর জন্য সর্বদা হিতাকাঙ্খী ও মঙ্গলকামী হবেন। এত চাপ দেবেন না যাতে সে বুঝতেও সুযোগ না পায়। কারণ, ছাত্র বুঝতে পারে ও মনে রাখে এমন পাঠ বুঝতে পারে না অথবা ভুলে যায় এমন বহু পাঠ হতেও উত্তম। অনুরূপভাবে যাতে তালেব বুঝতে পারে তার বুঝশক্তি অনুপাতে দর্স বা পাঠ ব্যাখ্যা করবেন। সংক্ষিপ্ত বা বিশদভাবে যখন যেমন প্রয়োজন তখন তেমনিভাবে বুঝাবেন। নচেৎ বিপরীত করলে বিরক্ত হয়ে তালেবের বোধশক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।

শিক্ষার মাধ্যম ভাষা উর্দু হলেও অতিমার্জিত উর্দু বলে ছাত্রদেরকে হতভম্ব করা অনুচিত। যাতে 'তোতার অর্থ বাবগা' বুঝে, কিন্তু তার মাতৃভাষায় তোতা কি তা না বুঝে তাহলে ফল বিপরীত হয়। ভারসাম্য রক্ষা করে মূল উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত, যাতে ছাত্র সুস্পষ্টভাবে পাঠ্যবিষয় নিজের ভাষাতেও বুঝে প্রকাশ করতে পারে।

সুতরাং উদাহরণস্বরূপ, ওস্তায বললেন, 'বুর্তাক্বাল কা মা'না সান্তারাহ।' ছাত্র প্রশ্ন করল, 'জী, সান্তারাহ কি জিনিস?' ওস্তায বললেন, 'দস্ উর্দু মেঁ হ্যায়, উর্দু মে পূছো।' ছাত্র বলল, 'জী, সান্তারাহ কিয়া চীয হ্যায়?' ওস্তায বললেন, 'এক কিস্স কা ফল হ্যায়।' বাস! ছাত্র জানতেও পারল না যে ঐ কিসিমের ফল তার ঘরে আছে অথবা সে প্রায় খেয়ে থাকে। সে ভাবল, সে হয়তো আরবের কোন ফল। নচেৎ আমাদের দেশের কোন প্রসিদ্ধ ফল হলে নিশ্চয় ওস্তায ইঙ্গিত করতে অলসতা করতেন না।

এমনটি আমাদের বাংলার মাদ্রাসায় ঘটে থাকে। যার ফলে বাঙালী ছাত্রদের প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিভাত হতে পায় না। কুরআন হাদীস শিক্ষার জন্য আরবী শিখবে, কিন্তু তার ব্যাকরণ শিখবে ফারসীতে, ফারসীর অনুবাদ হবে উর্দুতে, অথচ শিক্ষার্থীর মাতৃভাষা বাংলা। সম্ভবতঃ তাও সে ঠিকমত বুঝে না। এই জন্য বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দ্বীনী শিক্ষার্জনের অবস্থা অন্ধের পায়স খাওয়ার মত হয়েছে; অন্ধ যখন শুনল যে, তাকে পায়স খেতে দেওয়া হবে তখন সে প্রশ্ন করল, 'পায়স কি রকম?' একজন বলল, 'সাদা ধন্ধবে।' অন্ধ বলল, 'সাদা ধন্ধবে কেমন?' বলল, 'বকের মত।' অন্ধটি আবার প্রশ্ন করল, 'বক আবার কেমন?' তখন উত্তরদাতা বুঝল, অন্ধ মানুষ কথায় বুঝবে না; হাতের ইঙ্গিত ও ভঙ্গিমায় বুঝবে। তাই তার হাতটি ধরে বাঁকা করে বলল, 'এই দেখ, বক এই রকম হয়।' তখন অন্ধ বিস্ময়ের সাথে ভাবল, তাহলে পায়স বুঝি এত লম্বা আর এ রকম বাঁকা হয়? বলল, 'আমি পায়স খাব না!' (হয়তো গলায় আঁটকে যাবে তাই।)

ছাত্র বাংলা অথবা ইংরেজী গ্রামার পূর্বে পড়ে ও বুঝে থাকলে ওস্তায যদি তা আরবী গ্রামার পড়াবার সময় ঐ পরিভাষা বাংলা বা ইংরেজীর সহিত মিলিয়ে বুঝাতে পারেন তাহলে সোনায় সোহাগা হবে এবং অল্প মেহনতে ছাত্র সহজে বুঝে যাবে। আর তা পড়তে তাকে মোটেই কষ্টবোধ হবে না।

একটি পাঠ বা মাসআলাহ তালেবের ভালোরূপে না বুঝা পর্যন্ত ওস্তায তাকে অন্য পাঠ বা মাসআলাহ পড়তে দেবেন না। পুনরালোচনার মাধ্যমে পূর্বের পাঠ বুঝেছে দেখলে পরের পাঠ দিলে উভয় পাঠই বুঝতে তার পক্ষে সহজ হবে। নচেৎ তার বুঝার পূর্বে এক মাসআলাহর উপর অন্য আর এক মাসআলাহর অনুশীলন দিলে প্রথমটি বিনষ্ট হবে এবং দ্বিতীয়টিও বুঝতে সক্ষম হবে না। আর এইভাবে পরবর্তী পাঠও উপলব্ধি করতে না পেরে একটার পর একটা বরং প্রায় সবটাই একত্রিত হয়ে মস্তিষ্কে এক প্রকার ক্লান্তি ও অবসাদ সৃষ্টি করবে। ফলে সে সব পুনরাবৃত্তি করতেও তার নিকট বিরক্তি ও আলস্য দেখা দেবে; যা ইলমের পথে বড় ব্যাঘ্যাত হয়ে দাঁড়াবে। আর তা অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা মুআল্লেমের আদৌ উচিত নয়।

মুদার্রেসের উচিত, তালেবের ব্যাপারে সর্বদা মঙ্গল কামনা করা, বুঝতে না পারলে বারংবার বুঝিয়ে দিতে ধৈর্য ধারণ করা, তার বেআদবী ও অশিষ্টতার উপর সহনশীলতা অবলম্বন করা এবং যাতে সে সহজে বুঝতে পারে, আদব ও ভদ্রতা যাতে শিখতে পারে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে এসে যাতে তাঁকেই সবকিছু মনে করতে পারে এবং ইল্মের প্রতি বিরক্তি ও নৈরাশ্য প্রকাশ না করে তার প্রচেষ্টা করা। যেহেতু শিক্ষকের উপর শিক্ষার্থীর কিছু হক বা অধিকার আছে। ছাত্র হয়ে তাঁর নিকট এসে সেই ইল্ম শিক্ষা করতে নিরত হয়; যা তার জন্য এবং সমাজের জন্য উপকারী। ছাত্র যে ইল্ম তাঁর নিকট হতে গ্রহণ করে তা প্রকৃতপক্ষে তাঁরই সম্পদ ও পুঁজি। ছাত্র তা সংরক্ষণ করে এবং তাতে সমৃদ্ধি দান করে থাকে; যা এক লাভদায়ক উপার্জন। তাই ছাত্রই শিক্ষকের জন্য প্রকৃত পুত্র ও উত্তরাধিকারী। আল্লাহ পাক যাকারিয়া (আঃ) এর প্রার্থনা উল্লেখ করে বলেন, “সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর; যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকুবের বংশের।---” (সূরা মারয়্যাম ৬ আয়াত) উদ্দেশ্য, ইল্‌ল্ম ও হিকমতের উত্তরাধিকারী।

মুআল্লেম তাঁর তা'লীম দানের বিনিময়ে সওয়াব ও পুণ্যের অধিকারী হবেন; তাতে তালেব তা বুঝে কিংবা না বুঝে।। কিন্তু যদি সে তা বুঝতে পারে আর নিজে তদ্দ্বারা উপকৃত হয় এবং অপরকেও উপকৃত করে তবে মুআল্লেমের সওয়াব প্রবাহমান ও চিরস্থায়ী হবে। এ ওর ছাত্রকে সে তার ছাত্রকে এবং এইভাবে ধারাবাহিকতার সহিত যেমন শিক্ষা চলতেই থাকবে তেমনি ঐ প্রথম মুআল্লেম এবং সেইরূপ তাঁর পরবর্তী প্রত্যেক মুআল্লেমের সওয়াব মরণের পরেও জারী থেকে যাবে। (সঃ জামে' ৭৯৩নং) এ এমন এক বাণিজ্য যার উপর প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে!

সুতরাং মুআল্লেমের উচিত, সেই লাভজনক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তাতে যাতে সমৃদ্ধি ও উন্নতি লাভ হয় তার প্রতি আপ্রাণ চেষ্টা করা। কারণ এটা তাঁর এক আমল এবং আমলের এক স্মৃতি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমিই মৃতকে জীবিত করি এবং লিখে রাখি ওদের কৃতকর্ম (যা ওরা আগে পাঠিয়েছে) এবং (ওদের স্মৃতি) যা ওরা পশ্চাতে রেখে যায়।” (সূরা ইয়াসীন ১২) অর্থাৎ আমলের সুফল ও উত্তম প্রভাব অথবা তার কুফল ও মন্দ প্রভাব লিপিবদ্ধ করা হয়।

তালেবকে প্রতি সেই উপায় ও পন্থার কথা মুআল্লেম জানিয়ে দেবেন যে উপায়ে তার পক্ষে সর্বপ্রকার পাঠ বুঝতে সহজ হয়, পঠনে উদ্যম ও উদ্দীপনা পায় এবং বুঝতে ও অভ্যাস করতে কোন রকমের কষ্ট বা শ্রান্তি অনুভব না করে। ওস্তাযের উচিত, যাতে ছাত্রদের পঠিত বিষয় তাদের নিকট স্মৃতিস্থ ও সংরক্ষিত থেকে যায় তার প্রচেষ্টা করা; বারংবার আলোচনা করতে তাকীদ দেওয়া, পুরানো পাঠের উপর মাঝে মাঝে প্রশ্নাদি করা, পরীক্ষা নেওয়া ও তাদের আপোস পুনরালোচনার উপর গুরুত্ব প্রদান করা। কারণ ওস্তাযের নিকট পাঠ গ্রহণ (ক্লাস) করায় কেবল বৃক্ষরোপণ করা হয় এবং পুনরালোচনা ও মুখস্থ ইত্যাদি করা তার সিঞ্চন, সার দান ও আগাছা দূরীকরণ করার ন্যায়। যাতে নির্বিঘ্নে ও সহজে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে এবং শাখা-প্রশাখায় ও ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে।

যে ইমাম বুখারীর ৬ লাখ হাদীস সনদ সহ মুখস্থ ছিল সেই বুখারীকে একদা তাঁর কাতেব গোপনে জিজ্ঞাসা করল যে, 'স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য কোন ওষুধ আছে কি?' তিনি 'জানি না' বলে পুনরায় বললেন, 'স্মরণশক্তির জন্য সবচেয়ে বড় উপকারী জিনিস হল মানুষের (ইল্মের প্রতি) চরম আগ্রহ এবং বিরতিহীন পুনরাবৃত্তি।' (হাদয়্যুস্ সারী ৪৮৭পৃঃ)

ইলম মনে রাখার এক সহজ-সরল উপায় ভদ্র বাদানুবাদ ও তর্কালোচনা। ওস্তাযের উচিত ছাত্রদের মাঝে এমন মার্জিত উপায় খুঁজে দেওয়া যাতে তারা আপোসে কোন মাআলাহ ও তার দলীলাদি নিয়ে বাদানুবাদ করতে পারে। যার কেবল একটাই উদ্দেশ্য হয়, হক সন্ধান। দলীল যাকে সমর্থন করে তারই অনুসরণ।

এই পদ্ধতিতে ছাত্রদের চিন্তাশীলতা, মননশীলতা, যুক্তিপূর্ণ প্রতর্কক্ষমতা এবং গবেষণার স্মৃতিদ্বার উদ্‌ঘাটিত হবে। ইল্মের উৎসমুখ এবং দলীল ও তা উপস্থিত করার বিষয়ে পরিচিতি লাভ করবে। আর প্রকৃত হক ও সত্যের অনুসারী হতে শিখবে।

তবে এ প্রসঙ্গে সতর্কতার বিষয় যে, এ নিয়ে যাতে আন্তরিক মনোমালিন্য সৃষ্টি না হয়ে যায় অথবা বিতর্কের ভাষা যেন রূঢ় না হয়। নচেৎ হিতে বিপরীত হয়ে অনৈক্য ও কলহ সৃষ্টি হবে। ছাত্রদের উচিত, যেন তারা কোন বাক্য বা বক্তার জন্য 'তাআসসুব' বা অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব না করে। তর্কের উদ্দেশ্য যেন সে যা বলেছে অথবা সে যার তা'যীম করে বা যাকে মানে তার কথার পৃষ্ঠপোষকতা করা না হয়। কারণ অন্ধ-পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামী ইখলাস নষ্ট করে ফেলে। ইসলামের সৌন্দর্য ধ্বংস করে দেয়। যথার্থতা, বাস্তব ও হক দেখতে হক অনুসন্ধানীকে অন্ধ করে ফেলে। ক্ষতিকর ঈর্ষা ও দ্বেষ এবং সর্বনাশী বিবাদ-বিছিন্নতা সৃষ্টি করে। যেমন ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতাই ইল্মের সৌন্দর্য। ইখলাস, পরহিতৈষিতা ও নিষ্কৃতি লাভের শিরোনাম।

তালেবের জন্যও জরুরী যে, সে তার ওস্তাযকে সম্মান ও সমীহ করবে। যথাসম্ভব ভদ্রতা ও আদবের সহিত তাঁর সহিত ব্যবহার করবে। যেহেতু তার উপর তাঁর বহু সাধারণ ও নির্দিষ্ট অধিকার আছে।

সাধারণ অধিকার যা তালেব ছাড়াও সাধারণ মুসলমানরা একজন আলেম ও মুআল্লেমের প্রতি স্বীকার করে থাকে। যেহেতু তিনি মঙ্গলের শিক্ষক। তাঁর শিক্ষা ও ফতোয়া দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিকে তিনি উপকৃত করে থাকেন। তাই সকল মানুষের উপর তাঁর এমন অধিকার আছে যেমন একজন উপকারী ও অনুগ্রহকারীর অধিকার থাকে। আর তাঁর মত আর কারো উপকার ও অনুগ্রহ বড় হতে পারে না; যিনি মানুষকে শিক্ষা, চেতনা, সদাচারণ, সংস্কার, সংশুদ্ধি ও দ্বীনী আদর্শ দান করে থাকেন। ভালো-মন্দ, উপকার-অপকার ও মঙ্গলামঙ্গলকে চিহ্নিত করেন, যাঁর দ্বারা কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত ও নির্দেশিত হয়, অকল্যাণ ও মন্দ অপসারিত হয়, যিনি সমাজের মূর্খতার আঁধার দূর করে আনেন জ্ঞানের আলো। যিনি ধর্ম ও সত্যের বাণী বহন ও প্রচার করে থাকেন; যা তওহীদবাদী ও তার পরবর্তী সকল বংশধরের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণ। বরং সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর জ্ঞানের জ্যোতি চলার পথের দিশারী।

যেহেতু যদি ইল্ম না হত তাহলে মানুষ পশুর ন্যায় মূর্খতা ও অশ্লীলতার ঘোর অন্ধকারে দিদিশাহারা হত। প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে পশুর মত আচরণ করত। ইল্ম তো সেই আলোক; যদ্দ্বারা অন্ধকারে পথের ঠিকানা পাওয়া যায়। ইল্মই তো অন্তর, আত্ম, দ্বীন ও দুনিয়ার প্রাণ। যে দেশে এমন মানুষ নেই; যিনি সকলকে চরিত্র, আদর্শ ও মানবতা বা সৃষ্টিকর্তার পথনির্দেশ শিক্ষা দেবেন, প্রয়োজনে পথের দিশা দেবেন-সে দেশ সত্যই নিঃস্ব ও মিসকীন। যাঁর অভাব তাদের ইহ-পরলোক উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকারক, যদিও তারা রকেট, উপগ্রহ ও কম্পিউটার ইত্যাদির আবিষ্কর্তা হয়।

অতএব যাঁর উপকারিতা এত বৃহৎ, মানুষের মনুষ্যত্বের জন্য যাঁর প্রয়োজন ও প্রভাব এত বিরাট তাঁর প্রতি কেমন করে সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য সম্মান, শ্রদ্ধা, সমীহ ও ভালোবাসা ওয়াজেব না হয়? তাঁর প্রাপ্য হক ও অধিকার কি কম বলা যায়?

তালেবের উপর ওস্তাযের নির্দিষ্ট অধিকারও অনেক। যেহেতু তিনি হলেন তার শিক্ষা ও আদবের গুরুভার বহনকারী। সে যাতে সুউচ্চ পদ ও মর্যাদায় পৌঁছতে পারে তার প্রতি আন্তরিক কামনা ও ইচ্ছা রাখেন। তাই পিতা-মাতার অনুগ্রহ ও উপকারও -একদিক হতে- সেই মুআল্লেম ও পালয়িতার উপকারের সমতুল নয় যিনি মানুষকে মানুষ হয়ে চলতে শিখান, সৎপথের পথিক করে প্রকৃত ও চিরসুখ ও শান্তির ঠিকানা বাতলে থাকেন। যাঁরা নিজের মূল্যবান সময় তার উপর ব্যয় করে থাকেন। সাধ্যমত নিজের সুচিন্তিত মত ও সিদ্ধান্ত দিয়ে তাকে সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে সাহায্য করে থাকেন।

পৃথিবীতে বহু শিক্ষক, বহু পালয়িতা এবং বহু ধরনের ওস্তায আছেন। তাঁদের অধিকাংশ ওস্তায বর্তমান জীবন হতে মরণ পর্যন্ত সময়কালীন সুখ-সামগ্রীর সন্ধান দিয়ে থাকেন। যাঁদের দৌড় কেবল গোর পর্যন্ত, মাত্র ষাট অথবা সত্তর বছরের প্রতিযোগিতায় তাঁরা অংশ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু ঐ শিক্ষকের দৌড় (কেবল মসজিদ পর্যন্তই নয়;) অনন্তকালের। যিনি মরণের পরেও সুখ-সামগ্রীলাভের উপায়-উপকরণের খোঁজ দিয়ে থাকেন। এঁরা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামান্য আয়ুতে ইহ-পরকাল উভয় জীবনের পরম স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নয়নের বিভিন্ন পথ ও পাথেয় আবিষ্কার (সংস্কার) করে থাকেন। কিন্তু “ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত। আর পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা অনবধান।” (সূরা রূম ৭আয়াত) যদিও 'ওঁরা' তাঁদেরকে কেবল 'মোল্লা' রূপে চিনে থাকে।

কেউ যদি কোন মানুষকে কোন আর্থিক উপহার দান করে থাকে -যা কিছুদিন হিতসাধন করে ধ্বংস ও নষ্ট হয়ে যায়-তার উপর উপহারদাতার বড় হক থাকে এবং সে তার কাছে বাধিত হয়। তাহলে যিনি অমূল্য ইল্মের সওগাত দান করেন, যদ্বারা পার্থিব শান্তির জীবন লাভ করে এবং মরণের পরেও আখেরাতে চিরসুখ অর্জন করে। যাঁর হিতসাধন ও অনুগ্রহ ধারাবাহিকভাবে চিরস্থায়ী থাকে -তিনিই সবার চেয়ে অধিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র নিশ্চয়ই। যাঁর সহিত আদবপূর্ণ ব্যবহার করা, তিনি যা নির্দেশ করেন তার অনুসরণ করা, তাঁর ইঙ্গিতের বাইরে না যাওয়া ছাত্রের কর্তব্য। যেহেতু বিশেষ করে ইল্ম বিষয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তা তার অজানা, তাই তাঁরই মতে নিজের জীবন গড়া উচিত। অবশ্যই তিনি তার শুভাকাংখী। ছাত্র বা পথ অনুসন্ধানকারী অর্থে আমীরজাদা হলেও তিনি তো ইল্মের রাজা। পারলৌকিক ধনের কাছে পার্থিব ধনের যে কোন মূল্য নেই।

শিক্ষার্থী (অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিম) আলেমের সামনে আদরের সহিত বসবে। নিজের জ্ঞানপিপাসা তাঁর নিকট প্রকাশ করবে। সম্মুখে ও পশ্চাতে তাঁর জন্য দুআ করবে। যদি কোন বিষয়ে জ্ঞান বা কোন কঠিন মাআলার ব্যাখ্যার ভেট পেশ করেন তবে তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং সাগ্রহে শ্রবণ করবে। এরূপ ভাব প্রকাশ করবে না যে, সে আগে হতেই এটা জানত; যদিও বা সত্য-সত্যই পূর্ব হতেই জানত। প্রত্যেক ইল্ম অর্জনে ও আলাপনে সকল মানুষের জন্য এই আদব বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আয়নার পারা খসে পড়ায় কারণে তার আর সে মূল্য ও কদর নেই। তাই আলেম সমাজেরও কদর কমে গেছে। তবে প্রকৃত আলেমের কদর অবশ্যই হারায়নি এবং হারাবেও না। খাদযুক্ত বা নকল সোনার মূল্য না থাকলেও খাঁটি সোনার উপর নর্দমার কাদা ছিটানো হলেও তার মূল্য অবশ্যই কমে না।

মানুষ মাত্রেই ভুল হয়। ওস্তায কোন বিষয়ে ভুল করলে, (মুত্বালাআহ না করে) ভ্রম অর্থ বা ব্যাখ্যা করলে (এবং তালেব তা ধরতে পারলে) তাঁকে বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে তা ধরিয়ে দেবে। নিজের বাহাদুরী প্রকাশের উদ্দেশ্যে ভরা মজলিসে তার অপমান করা, অথবা 'আপনি ভুল বলছেন' বা 'আপনি যা বলছেন তা ঠিক নয়' -ইত্যাদি বলে রুক্ষ কথায় মুখামুখি প্রতিবাদ করা উচিত নয়। বরং সহজ ও সুন্দর ভাষার ইঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে ভার অন্তর ব্যথিত না হয়। যেহেতু এও তাঁর এক প্রকার প্রাপ্য হক। আর এই নিয়মে বড়দের কথায় প্রতিবাদ নির্ভুল ও সঠিকতায় পৌঁছতে সহায়ক হয়। অন্যথায় অন্তরে আঘাত দিয়ে, অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞার সাথে তাঁদের কথা খণ্ডন করলে এক প্রকার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভাব সৃষ্টি হয়, যার দরুন প্রকৃত হক ও সঠিকতায় পৌঁছতে বাধা পরে থাকে।

অবশ্য মুআল্লেমের জন্যও একান্ত কর্তব্য যে, ছাত্র কোন ভুল সংশোধন করে দিলে তাতে লজ্জিত ও ক্রোধান্বিত না হওয়া এবং সঠিক ও সত্যকে গ্রহণ করে নেওয়া। যে কথা বলে ফেলেছেন সেটাকেই সাব্যস্ত রেখে সঠিক ও হক গ্রহণ না করা আলেমের এক ত্রুটি। কারণ হকের অনুসরণ করা সর্বদা ওয়াজেব এবং তাই ইনসাফ ও ন্যায্যতা; চাহে সে হক কোন বড়র হাতেই থাক্ অথবা কোন ছোটর হাতে।

ওস্তাযের জন্য এটা এক আল্লাহর প্রদত্ত নিয়ামত বা অনুগ্রহ যে, তাঁর ছাত্রদের মধ্যে এমন ছাত্রও আছে, যে তাঁর ভুল সংশোধন করতে পারে, সঠিকতার প্রতি ভুলে যাওয়া পথ প্রদর্শন করতে পারে। যাতে ভুলের উপরেই চির অবিচলতা দূর হয়ে যায় এবং ইল্ম পরিপূর্ণতা লাভ হয়। এমন নেয়ামতের উপর আল্লাহর দরবারে লাখ শুক্র জ্ঞাপন করা কর্তব্য এবং তারপর তার শুকরিয়া আদায় করা উচিত, যার হাতে আল্লাহ তাঁর ইলমী পরিপূর্ণতা দান করেন; চাহে সে তাঁর ছাত্রই হোক বা অন্য কেউ।

অনেক আলেম আছেন, যাঁকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তার উত্তর না জানলেও নিজের তরফ হতে মনগড়া কোন একটা উত্তর দিয়ে থাকেন; যাতে তাঁর সম্মানের লাঘব না হয়। কোন কোন সময় অনুমানের তীর লেগেও যায় বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ভুল হয়; যা প্রশ্নকারী শিক্ষার্থীর পক্ষে এক মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আলেমের পক্ষে ওয়াজেব এই যে, যে বিষয়ে তাঁর ইল্ম নেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে 'আল্লাহু আ'লাম' (আল্লাহই জানেন) অথবা স্পষ্টভাবে 'জানি না' বলা, আর এতে তাঁর সম্মান হানি হবার কিছু নেই, বরং এতে তাঁর ইজ্জত আরো বর্ধমান হয়। কারণ এরূপ নীতি অবলম্বন করা দ্বীনী ও ঈমানী পরিপূর্ণতা এবং তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসার পরিচায়ক। ইমাম শাফেয়ী তাঁর ওস্তায ইমাম মালেক প্রসঙ্গে বলেন, 'একদা তিনি ৪৮টি মাআলা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলেন। কিন্তু এর মধ্যে ৩২টির প্রশ্নের উত্তরে তিনি 'জানি না (বা জানা নেই)' বললেন!

ইমাম গাযালী বলেন, 'এই ঘটনা এই কথার দলীল যে, তিনি ইল্ম প্রচারে আল্লাহর সন্তুষ্টিই কামনা করতেন। নচেৎ যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য অন্য কিছু হয় সে ব্যক্তির মন তার গহীন কোণেও কোন মতেই স্বীকার করবে না যে, 'এ বিষয়ে সে জানে না।' (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন)

পক্ষান্তরে এই তাওয়াক্কুফে (কোন বিষয়ে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত হওয়াতে) বহু উপকারও আছে। যেমন, অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ ওয়াজেব; তাই তাঁর ওয়াজেব পালন হয়।

তিনি যখন তাওয়াক্কুফ করে 'আল্লাহ আ'লম' বলে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবেন তখন তার পরপরই পুস্তকালোচনায় সে বিষয়ে ইল্ম লাভ করে সবল হবেন এবং ছাত্ররা যখন ওস্তাযের তাওয়াক্কুফ দেখবে তখন তারাও নিজে নিজে সে বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রতিযোগীতামূলক অনুসন্ধান শুরু করবে ও উক্ত প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে ওস্তাযকে তোহফা দেওয়ার চেষ্টা করবে।

আলেম যখন অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ করবেন তখন যে বিষয়ের তিনি ব্যাখ্যা দেবেন তা সকলের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রণিধানযোগ্য হবে এবং তাঁর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীও প্রতিপাদিত হবে। যেমন যিনি জানা অজানা সব বিষয়ের মুখ চালান বলে পরিচিত তাঁর প্রত্যেক কথা -এমন কি যা স্পষ্ট সত্য তাও-বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে সকলের মনে আশঙ্কা ও সংশয় জন্মাবে।

ছাত্ররা ওস্তাযের অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ দেখলে তা তাদের জন্যও তা'লীম হবে এবং কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে তা'লীম তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে তারাও অজানা বিষয়ে তাওয়াক্কুফ করতে শিখবে। তাহলে ভবিষ্যতে কাউকে ভুল শিক্ষা দেবে না বা আন্দাজে ফতোয়া দিয়ে কারো বিপদ আনবে না।

তবে আলেম যদি মাহের ও যোগ্য হন অথবা পড়াবার পূর্বে মুত্বালাআহ (পাঠ্যবিষয়ে পূর্বালোচনা) করেন তবে এসব ভুলের আশঙ্কা থাকে না। বরং মাহের হলেও অন্ততঃপক্ষে একবারও মুত্বালাআহ করা প্রয়োজন। যাতে ছাত্রদের সম্মুখে লজ্জিত হতে না হয়।

ওস্তাযের প্রতি যেমন সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবে তেমনি ছাত্র তার সহপাঠীর সহিতও সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখবে। যেহেতু এ সহপাঠে একে অপরের উপর বড় হক ও অধিকার থাকে। ভ্রাতৃত্ব সাহচর্যের হক, একই ওস্তাযের প্রতি সম্পর্ক স্থাপনের হক এবং তারা তাঁর নিকট তাঁর সন্তানের ন্যায় -সে হিসাবে (ভ্রাতৃত্বের) হক রয়েছে। তাই আপোসে সহানুভূতি, সহায়তা এবং যৌথ সফলতার উপর মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রযত্ন থাকা উচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00