📄 ইলম্ নির্বাচন
তিনি আরো বলেন, “মুমিন ছাড়া আর কারো সাথী হয়ো না। আর তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ না খায়।” (আবু দাউদ)
আর মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও। (সূরা তাওবাহ ১১৯)
নিয়ত শুদ্ধ করার পর তালেবে ইলমের উচিত, অধিক প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে তলব আরম্ভ করা; শরীয়তের ইল্ম, আরবী ও তার সহায়ক ইল্ম শিক্ষা করা। শুরুতে আরবী আদবের উপর জোর দেওয়া। এই পদ্ধতির বিশদ বিবরণ ও পাঠ্য-নির্ঘন্ট বিদিত ও প্রচলিত; যা কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। তবে এমন নিকটবর্তী পথে চলা উচিত, যে পথ যথার্থ ইলমী গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়। এমন বই-পুস্তক নির্বাচিত করা এবং তার অধ্যয়নে অভিনিবিষ্ট হওয়া উচিত, যা বিষয়গত দিক থেকে সবচেয়ে উত্তম, স্পষ্টতর বোধগম্য এবং অধিক উপকারী।
তালেবে ইল্ম তা যথাসাধ্য হিফ্য করায় প্রয়াসী হবে অথবা বারংবার তা নিয়ে পুনরোনুশীলন করবে যাতে কিতাবের বিষয়বস্তু যথার্থভাবে উপলব্ধ ও স্মৃতিস্থ হয়ে যায়।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'ইল্ম (শিক্ষা ও জ্ঞান) এর মর্যাদা মা'লুম (শিক্ষণীয় ও জ্ঞাতব্য) বিষয়বস্তুর মর্যাদার অনুসারী। যেহেতু তার যুক্তি-প্রমাণ ও দলীলের উপর আত্মা আস্থাবان হয়। তা জানার প্রয়োজন অতি বেশী হয় এবং তদ্দ্বারা সর্বাধিক লাভবানও হওয়া যায়। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সর্বশ্রেষ্ঠ, বৃহৎ ও মহান জ্ঞাতব্য-বিষয় হল আল্লাহ; যিনি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই, যিনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর নিয়ন্তা। যিনি রাজা, সত্য ও ব্যক্ত, সকল পূর্ণতাগুণে তিনি গুণান্বিত, প্রত্যেক ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা হতে তিনি পবিত্র, তাঁর পূর্ণতা-গুণে প্রত্যেক দৃষ্টান্ত ও সাদৃশ্য হতে তিনি নিরঞ্জন। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁর নামাবলী, গুণগ্রাম এবং কর্মসমূহের ইল্মই সকল ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রকৃষ্ট ইল্ম। এই ইল্মের তুলনায় অন্যান্য ইল্ম (অদ্বীনী শিক্ষা) এর মান যেমন এর জ্ঞাতব্য বিষয়' (আল্লাহর) তুলনায় অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয়ের মান। যেমন তাঁর ইল্ম সমস্ত ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। তেমনি এই ইল্ম অন্যান্য সকল ইলমের মূল। যেমন সারা সৃষ্টির অস্তিত্ব তাঁরই অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী এবং তিনিই সকল বস্তুর প্রভু, প্রতিপালক, মালিক ও উদ্ভাবক।-----
সুতরাং এই ইল্মই বান্দার সৌভাগ্য, পূর্ণতা ও তার ইহ-পরকালের মঙ্গলের মৌলিক ইল্ম। যা না জানা তার আত্মা এবং তার কল্যাণ, পূর্ণতা, শুদ্ধি ও নিষ্কৃতির পথ না জানা; যা বান্দার দুর্ভাগ্যের মূল।
পক্ষান্তরে বান্দার পক্ষে তার সৃজনকর্তা ও স্রষ্টার প্রেম, তাঁর সর্বদা স্মরণ এবং তার সন্তষ্টিলাভের নিরন্তর প্রচেষ্টা অপেক্ষা তার হৃদয় ও জীবনের জন্য অন্য কোন জিনিসই অধিক উত্তম, সুস্বাদু, ও সুললিত নেই।
বান্দার জন্য এটাই তো নৈপুণ্য ও পরিপূর্ণতা। যা ব্যতীত সে 'কামেল' হতেই পারে না। এর জন্যই তো সৃষ্টিজগৎ রচিত হয়েছে, আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বেহেশ্ ও দোযখ সৃষ্টি হয়েছে, রসূল ও আম্বিয়া প্রেরিত হয়েছেন, ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, শরীয়তের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে, কা'বা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আল্লাহর যিক্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মানুষের উপর ঐ গৃহের হজ্জ ফরয করা হয়েছে; যা তাঁর প্রেম ও সন্তুষ্টি বিধানেরই অঙ্গবিশেষ।
এ জন্যই তো জিহাদের আদেশ এসেছে, যে তা অস্বীকার করেছে এবং অন্য কিছুকে তার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে তার শিরশ্ছেদ করা হয়েছে এবং পরকালে তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনাময় বাসস্থান।
এই বৃহৎ বিষয়ের উপরেই দ্বীনের বুনিয়াদ রাখা হয়েছে ও কেবলা নির্ধারিত হয়েছে। যে বিষয় সৃষ্টিবৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু এবং দ্বীন ও কেবলার প্রাণকেন্দ্র। আর ইল্মের সিংহদ্বার ব্যতীত এর প্রতি দ্বিতীয় কোন প্রবেশপথ নেই। যেহেতু কোন বস্তুকে ভালোবাসা তাকে অনুভব করার পরবর্তী পর্যায়। যে ব্যক্তি সবার চেয়ে অধিক আল্লাহকে চেনে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক আল্লাহর প্রেমিক। কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রকৃতভাবে জানবে ও চিনবে সে ব্যক্তি তাঁকে ভালোবাসবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীকে প্রকৃতভাবে চিনবে সে তাতে অনাসক্ত হবে। সুতরাং ইল্মই এই বৃহৎ দরজা উন্মুক্ত করে যা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্দেশের রহস্য।' (মিফতাহু দা-রিস সাআদাহ ১/৮-৬, আদাবু তালেবিল ইল্ম ১২৩-১২৬পৃঃ)
সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত যে, সে এমন ইল্ম নির্বাচন করবে যা ইহ-পরকালের জন্য তার অধিক প্রয়োজন ও উপকারী। সুতরাং আল্লাহ, আয্যা অজাল তাঁর নাম ও গুণাবলী এবং কর্মাবলীর ইল্ম সর্বাগ্রে অর্জন করবে। তা আয়ত্ত হলে এই উম্মাহর অগ্রগণ্য সলফের সমঝে কিতাব ও সুন্নাহর ইল্ম অর্জন করতে মনোযোগী হবে। যাতে রসূল ﷺ কর্তৃক প্রদত্ত ও বর্ণিত শিক্ষা গ্রহণ তার জন্য বিশুদ্ধ, সঠিক ও সহজ হয়ে যাবে।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) আরো বলেন, 'রসূল ﷺ হতে ইল্ম গ্রহণ করা দুই প্রকার; কোন মাধ্যমের সাহায্য না নিয়ে সরাসরি গ্রহণ এবং মাধ্যমের সাহায্যে গ্রহণ। সরাসরি ইল্ম গ্রহণ তো তাঁদের ভাগ্যে ছিল যাঁরা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন এবং অভীষ্ট বস্তু অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে উম্মতের কারো আর সে আশা নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে তাঁদের সরল পথের অনুসারী, তাঁদের নিখুঁত নীতির অনুবর্তী। আর সেই ব্যক্তি পশ্চাদ্গামী যে তাঁদের পথ হতে ডানে-বামে সরে যায়। এই ব্যক্তিই পথচ্যুত এবং ধ্বংস ও ভ্রষ্টতার মরুভূমিতে নিরুদ্দেশ।
কোন্ এমন গুণ বা উত্তম কর্ম আছে যার গুণাধার বা কর্তা তাঁরা ছিলেন না? এমন কোন্ কল্যাণ ও সত্যের পরিকল্পনা আছে যার তাঁরা অধিকারী ছিলেন না? আল্লাহর শপথ! তাঁরা সঞ্জীবনী নির্ঝর হতে সুমিষ্ট ও নির্মল পানি সরাসরি পান করেছেন। ইসলামের ভিত্তিসমূহকে এমন সুদৃঢ় করে গেছেন যাতে আর কারোর জন্য কোন দ্বিরুক্তির সুযোগ নেই। কুরআন ও ঈমান দ্বারা ইনসাফ করে মানুষের চিত্তজয় করে গেছেন। তরবারি ও বর্শা দ্বারা জিহাদ করে বহু দেশ জয় করে গেছেন। অতঃপর তাঁরা তাঁদের তাবেঈন (অনুসারীবর্গ) পর্যন্ত (সেই ইল্ম ও আমানত) বিশুদ্ধ ও নির্মল অবস্থায় (আমানতের সাথে) পৌঁছে দিয়েছেন; যা তাঁরা নবুয়তের আলোকবর্তিকার তাক হতে গ্রহণ করেছিলেন। যাতে তাঁদের সনদ (বর্ণনাসূত্র) ছিল, নবী ﷺ হতে, তিনি জিবরীল (আঃ) হতে এবং তিনি রব্বুল আলামীন হতে; যা বিশুদ্ধ সুউচ্চ সনদ ছিল। তাঁরা বিদায়ের পূর্বে বলে যান, 'এটা আমাদের প্রতি নবী ﷺ এর প্রতিশ্রুতি যদ্বারা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করলাম। আর এটা আমাদের প্রতিপালকের অসিয়ত ও অধ্যাদেশ এবং আমাদের উপর তাঁর ফরয (অবশ্যকর্তব্য); যা তোমাদের জন্যও অধ্যাদেশ ও ফরয।'
সুতরাং একনিষ্ঠ অনুসারী (তাবেঈন)গণ তাঁদের সুদৃঢ় নিখুঁত নীতির উপর পরিচালিত হলেন। সরল পথের উপর তাঁদের পদাঙ্কানুসরণ করলেন। অতঃপর 'তাঁদের 'অনুবর্তী (তাবে-তাবেঈন)গণ এই সত্যপথেরই' অনুগামী হলেন। সত্য কথা এবং প্রশংসিত ন্যায্য পথের দিশা পেলেন। তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তীগণের তুলনায় সেইরূপই ছিলেন যেরূপ অনুপম সত্যবাদী ঘোষণা করেছেন, “এদের বৃহৎ দলটি হবে অগ্রগামীদের মধ্য হতে; আর এদের কিছু লোক পশ্চাদ্গামীদের মধ্যেও থাকবে।” (সূরা ওয়াকিয়াহ ১৩-১৪আয়াত)
অতঃপর চতুর্থ শতাব্দীর ইমামগণের আবির্ভাব হল। যে শতাব্দীও এক বর্ণনামতে শ্রেষ্ঠ শতাব্দী; যেমন আবুসাঈদ, ইবনে মসউদ, আবু হুরাইরা, আয়েশা এবং ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) এর হাদীস হতে শুদ্ধ প্রমাণিত। তাঁরাও তাঁদের পূর্ববর্তীগণের পদরেখা দেখে উক্ত পথেই পরিচালিত হলেন। তাঁদের জ্ঞানালোকের তাক হতে সেই জ্ঞান আহরণ করলেন। যাঁদের অন্তর ও বক্ষ আল্লাহর দ্বীনের উপর কারো রায়, অন্ধানুকরণ অথবা কিয়াসকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হতে বহু ঊর্ধ্বে। যার ফলে তাদের সুপ্রশংসার পতাকা বিশ্বজাহানে উড্ডীন হয়েছে। আর আল্লাহ পাক তাঁদের জিহ্বায় সত্যবাদিতা দান করেছিলেন।
অতঃপর তাঁদের পদাঙ্কানুসরণ করে তাঁদের অনুগামীদের অগগ্রামী দল পরিচালিত হলেন। তাঁদের দলভুক্ত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তিবর্গ তাঁদেরই নীতির উপর চলমান হলেন। কোনও ব্যক্তি বিশেষের অন্যায় পক্ষপাতিত্ব হতে দূরে থেকে, দলীল ও প্রমাণের সহিত থেমে, হক ও ন্যায়ের সাথে চলতেন; যেদিকে তার বাহন চলত। সঠিকের সাথে কুচ করতেন; যেখানে তার শিবির কুচ করত। দলীল যখন তার যাদুক্রিয়ার সহিত তাঁদের নিকট স্পষ্ট হত তখন তাঁরা একাকী ও দলেদলে সেদিকেই উড়ে যেতেন। রসূল ﷺ (শুদ্ধ হাদীস) যখন তাঁদেরকে কোন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতেন তখন বিনা কোন কৈফিয়তে তাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতেন। তাঁদের হৃদয় ও বক্ষে (কিতাব ও সুন্নাহর) স্পষ্ট উক্তি এত মহান ও সম্মানিত ছিল যে, তার উপর তাঁরা আর কারো কথাকে প্রাধান্য দিতেন না, অথবা আর কারো রায় বা কিয়াসকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন না।' (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন ১/৫)
মোটকথা তালেবে ইলমের উচিত, কুরআন ও সুন্নাহর ইল্মসমূহের প্রতি তার সকল সামর্থ্য, মনোযোগ ও হিম্মতকে ব্যয় করা। যেহেতু এই দুয়ের ইল্মই প্রকৃত ও সত্য ইল্ম এবং উভয় ব্যতীত অন্য কিছুকে না জানা এমন মূর্খতা যাতে কোন (পারলৌকিক) ক্ষতি নেই।
ইলমের খনি ও তার প্রধান হল, আল্লাহ আয্যা অজাল্লার কিতাব এবং দ্বিতীয় ওহী 'রসূল ﷺ এর সুন্নাহ।' সুতয়াৎ 'এই' দুয়ের উপর যত্নবান হওয়া 'তালেবে ইলমেয় একান্ত কর্তব্য।
📄 ওস্তায নির্বাচন
এই দুয়ের পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে আনুষঙ্গিক ও সহায়ক অন্যান্য ইল্ম শিক্ষা করা।
আসমায়ী বলেন, 'যে তালেবে ইল্ম ঠিকমত নহু (আরবী ব্যাকরণ) না শিখে, তার উপর আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয় যে, (হাদীস পড়ার সময়) আল্লাহর নবী ﷺ এর এই কথায় সে শামিল হয়ে যাবে, “যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যা বলে সে নিজের ঠিকানা ও বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৯/১৭৮)
আব্বাস বিন মুগীরাহ বলেন, আব্দুল আযীয দারাঅর্দী কিছু লোকসহ আমার পিতার নিকট এলেন একটি কিতাব পড়ে শুনাতে। দারাঅর্দী তাদের সকলের জন্য পড়তে লাগলেন। কিন্তু তাঁর ভাষা খুব অশুদ্ধ ছিল। পড়তে পড়তে মারাত্মক-মারাত্মক ভুল পড়ছিলেন তিনি। তখন আমার পিতা তাঁকে বললেন, 'খুব হয়েছে দারাঅর্দী! এসবে (ইলমে) ধ্যান দেওয়ার পূর্বে তোমার জন্য অধিক প্রয়োজন ছিল নিজ ভাষা শুদ্ধ করা।' (ঐ৮/৩৬৮)
তদনুরূপ তালেবে ইল্মের উচিত, তার মাতৃভাষাতেও দক্ষতা লাভ করা। নচেৎ অমার্জিত ও অশুদ্ধ ভাষায় দাওয়াতি কাজ প্রতিহত হতে পারে। মানতেক ফালসাফায় অধিক মনোযোগ না দিয়ে যুগোপযোগী সাধারণ জ্ঞান (বিজ্ঞান, ভুগোল, ইংরাজী, অংক প্রভৃতি) শিক্ষার প্রবণতা রাখবে। সর্ব বিষয়ে পারদর্শিতা যদিও সম্ভব নয় তবুও আসল (কিতাব ও সুন্নাহর) ইল্ম যথাযথভাবে শিক্ষা করে সাধারণ জ্ঞান কিছু কিছু করে শিখতে পারলে দাওয়াতে অবশ্যই সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। যেমন বিদেশী ভাষা শিখলে বিদেশে দাওয়াত-কর্মে অংশ গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করবে।
অনুরূপভাবে তালেবে ইলমের কর্তব্য, তার উপযুক্ত শিক্ষক ও ওস্তায নির্বাচনে ভাবনা-চিন্তা করা। অতএব সেই ওস্তাযের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করবে যিনি হবেন অধিক জ্ঞানী, অভিজ্ঞ, পরহেযগার এবং বয়স্ক। যেমন আবু হানীফা (রঃ) চিন্তা-ভাবনা করার পর হাম্মাদ বিন সুলাইমানকে ওস্তাযরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যাঁর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'আমি তাঁকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ধৈর্যশীল ও সহ্যশীল শায়খরূপে পেয়েছিলাম। তাঁর নিকট দৃঢ়ভাবে স্থায়ী ছিলাম তাই আমি উদ্গত হয়েছি।' (তা'লীমুল মুতাআল্লিম ১২পৃঃ)
ইবনে জামাআহ বলেন, 'তালেবে ইল্মকে সর্বাগ্রে ভাবনা-চিন্তা করে এবং আল্লাহর নিকট ইস্তেখারা করে দেখা উচিত যে, সে কার নিকট হতে ইল্ম গ্রহণ করবে এবং সদাচরণ, আদব ও শিষ্টতা কার নিকট হতে শিক্ষা করবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে তাকে এমন ওস্তায গ্রহণ করা উচিত, যাঁর যোগ্যতা পরিপূর্ণ হয়েছে, স্নেহ-বাৎসল্য বাস্তবায়িত হয়েছে, শালীনতা অভিব্যক্ত হয়েছে, নৈতিক পবিত্রতা সুপরিচিত হয়েছে এবং সংযমশীলতা প্রসিদ্ধ হয়েছে। যিনি শিক্ষাদানে উত্তম শিক্ষক ও পাঠ্যবিষয় বুঝতে সুদক্ষ। তালেবে ইল্ম তাঁর নিকট তার ইল্ম বৃদ্ধির আশা ও আগ্রহ যেন না রাখে যাঁর দ্বীন, সংযমশীলতা, পরহেযগারী এবং সচ্চরিত্রতায় কমি রয়েছে।'
ইবনে সীরীন বলেন, 'এই ইল্ম তো দ্বীন। অতএব তোমরা কার নিকট হতে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ তা লক্ষ্য করো।' (মুসলিম, মুকাদ্দামাহ)
কেবল প্রসিদ্ধ ওলামাদের নিকট হতেই শিক্ষা গ্রহণ সীমাবদ্ধ হওয়া এবং অপ্রসিদ্ধ যোগ্য ওলামাদের নিকট শিক্ষা ত্যাগ করা হতে সাবধান হওয়া উচিত। যেহেতু গাযালী প্রভৃতি ওলামাগণ এরূপ করাকে ইলমে অহংকার প্রকাশ করার মধ্যে গণ্য করছেন এবং তা একপ্রকার আহাম্মকী বলে আখ্যায়ন করেছেন। কারণ, হিকমত ও জ্ঞান মুমিনের হারিয়ে যাওয়া বস্তু, যেখানেই পায় সেখান হতেই সে তা কুড়িয়ে নেয়। যেখানেই তা লাভ করার সুযোগ পায় সেখানেই গনীমত জেনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। যেই তার অনুগ্রহ করতে চায় তারই নিকট হতে তা সাদরে গ্রহণ করে। যেহেতু সে তো মূর্খতা থেকে পলায়ন করতে চায়; যেমন বাঘ হতে পলায়ন করা হয়। আর বাঘের কবল হতে যে মুক্তির পথ দেখায় পলায়নকারী তাকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করে না; তাতে সে যেই হোক না কেন।
সুতরাং এই অপ্রসিদ্ধ আলেমের নিকট যদি বর্কতের (তাকওয়া ও ইলমে প্রাচুর্যের) আশা থাকে তাহলে তাঁর দ্বারা উপকার ব্যাপক হয়। তাঁর তরফ থেকে প্রশিক্ষণ পরিপক্ক হয়। আর যদি পুর্বগামী ও পরগামী ওলামাদের অবস্থা সমীক্ষা করে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ উপকৃত তিনিই হয়েছেন এবং সফলতা তিনিই লাভ করেছেন যাঁর শায়খ বা ওস্তায খুব পরহেযগার ছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদের জন্য তাঁর বাৎসল্য ও হিতাকাংখায় তিনি উজ্জ্বল আদর্শ ছিলেন। অনুরূপভাবে যদি লিখিত বই-পুস্তকের উপর সমীক্ষা চালানো যায় তাহলে দেখা যাবে যে অধিক মুত্তাকী ও বিষয়-বিরাগী আলেমের লিখিত গ্রন্থই অধিক উপকারী এবং সেই গ্রন্থ অধ্যয়নেই অধিক সাফল্য বর্তমান।
তালেবে ইলমের আরো চেষ্টা করা উচিত, যাতে তার ওস্তায শরীয়তের ইমে পরিপূর্ণ অবহিত হন। সমসাময়িক অন্যান্য আস্থাভাজন ওলামাদের সহিত যেন তাঁর অধিকাধিক যোগাযোগ, ইল্মী-আলোচনা এবং দীর্ঘ বৈঠক হয়। তিনি যেন সরাসরি কিতাব থেকে গৃহীত ইলমের আলেম না হন; যিনি সুদক্ষ ওলামাদের সাহচর্যে সুপরিচিত নন।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি কিতাব সমূহের উদর হতেই ফিক্হ গ্রহণ করবে সে আহকাম বিনষ্ট করে ফেলবে।' আর অনেকে বলেছেন যে, 'কিতাব বা কাগজকে ওস্তায করা খুব বড় আপদ। অর্থাৎ যারা কেবল কিতাব থেকেই ইল্ম শিখতে চায় তারা ওলামাদের বালাই।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৮৫পৃঃ)
ইব্রাহীম বলেন, 'ওঁরা যখন কারো নিকট ইল্ম গ্রহণ করতে আসতেন তখন তাঁর বেশভূষা, নামায এবং অন্যান্য অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করতেন। অতঃপর তাঁর নিকট ইলম গ্রহণ করতেন।'
সওরী বলেন, 'যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর নিকট কিছু শোনে আল্লাহ সেই শোনাতে তাকে উপকৃত করবেন না। আর যে ব্যক্তি তার সহিত মুসাফাহা করল সে ইসলামকে ধ্বংস করল।'
মালেক বিন আনাস বলেন, 'চার ব্যক্তি হতে ইলম গ্রহণ করা হবে না; বাকী অন্যান্য হতে গ্রহণ করা হবে; নির্বুদ্ধিতা প্রকাশকারী নির্বোধের নিকট হতে ইলম গ্রহণ করোনা; যদিও সে সবচেয়ে অধিক বর্ণনাকারী হয়। মিথ্যুকের নিকট থেকে ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষের সহিত ব্যবহারে কথাবার্তায় মিথ্যা বলে থাকে -যখন তাকে পরীক্ষা করে দেখা যাবে যে সে সত্যই মিথ্যা বলে; যদিও সে রসূল ﷺ এর উপর মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত নয়। কোন প্রবৃত্তি পূজারীর নিকটেও ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষকে তার প্রবৃত্তি (বিদআত) এর প্রতি আহ্বান করে। আর সেই শায়খ হতে ইল্ম গ্রহণ করো না যার অবদান ও ইবাদত আছে, কিন্তু কি বয়ান করে তা সে নিজেই জানে না। (আল-জামে' লিআখলাকির রাবী ১/১৩৯)
শত সাবধান সেই আলেম, মুদারিস ও ওস্তায হতে যার হৃদয় মরিচায় কালো হয়ে আছে। ফলে তার চিন্তাশক্তি, বোধ ও উপলব্ধি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার কারণে সে হক ও ন্যায় গ্রহণ করে না এবং বাতিল ও অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করে না। যার মূলে রয়েছে ঔদাস্য ও প্রবৃত্তি পূজা; যা অন্তজ্যোতিকে নিষ্প্রভ করে এবং তার হৃদয়ের দৃষ্টি-শক্তিকে অন্ধ করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি নিজেকে ওদেরই সংসর্গে রাখবে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় নিজেদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে ওদের থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। আর যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে উদাসীন করে দিয়েছি, যে তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না।” (সূরা কাহফ ২৮ আয়াত)
সুতরাং কোন তালেবে ইল্ম বা কোনও সাধারণ ব্যক্তি যখন কারো অনুসরণ করতে চাইবে তখন তাকে লক্ষ্য করা উচিত যে, সে অনুসরণীয় ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণকারী অথবা তাঁর সারণে উদাসীনদের মধ্যে গণ্য? তার জীবনে প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশীর আধিপত্য বর্তমান অথবা ওহীর? যদি তার জীবনে খেয়ালখুশী ও মানসতাই আধিপত্য বিস্তার করে থাকে এবং সে উদাসীন হয় তবে তার কর্ম সীমালঙ্ঘিত ও বিনষ্ট। যে এমন গুণের গুণী তার অনুসরণ ও আনুগত্য করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অতএব ওস্তায যদি এরূপই হয়ে থাকেন তবে তাঁর থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত এবং তাঁকে নিজের অনুসরণীয় ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা ও স্থিরীকৃত না করাই কর্তব্য। পক্ষান্তরে যদি তাঁকে আল্লাহর স্মরণ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং সৎকর্মে জাগ্রত, তৎপর ও সীমাবদ্ধ পায়, আর তাঁর কর্তব্যে দূরদর্শী ও পারদর্শী পায় তাহলে তাঁরই পিছু ধরা উচিত। যেহেতু মৃত ও জীবিতের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে আল্লাহর যিক্র। যে আল্লাহকে স্মরণ করে সে জীবিত এবং যে করে না সে মৃত। আর মৃতের নিকট কি কিছু শিখা যায়? (আল ওয়াবিলুস স্বইয়্যেব ৩৭ পৃঃ)
📄 নিষ্ঠা ও শিষ্টাচারিতা
যে ব্যক্তি যা কিছু পাঠ বা শ্রবণ করে সেই তদ্দ্বারা উপকৃত হতে পারে এমনটা নয়। যেহেতু পড়া ও শোনার সাথে মনের যোগ না হলে তা নিরর্থক হয়।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'কুরআন দ্বারা যদি উপকৃত হতে চাও তবে তেলাঅতের সময় তোমার হৃদয়কে উপস্থিত কর, শ্রবণকালে উৎকর্ণ থাক এবং মনে মনে সেই পরিবেশে হাজীর হও যে পরিবেশের মানুষকে আল্লাহ তাআলা ঐ আয়াত দ্বারা সম্বোধন করেছেন। যেহেতু তা তাঁর দূত মারফৎ তোমার জন্যও সম্বোধন। আল্লাহ পাক বলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرِى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
অর্থাৎ, “নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য যার হৃদয় আছে অথবা নিবিষ্টচিত্তে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে। (সূরা ক্বাফ ৩৭ আয়াত)
যেহেতু পরিপূর্ণ প্রভাব-প্রভাবশালী উপযোগী কথা, গ্রহণকারী স্থান বা পাত্র, প্রভাব লাভ করার শর্ত এবং তার কোন বাধা না থাকার অন্যসাপেক্ষ। উক্ত আয়াত এই সবকিছুকে সংক্ষিপ্ত শব্দে বর্ণনা করেছে।
'নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে' এই বাণী দ্বারা সূরার প্রথম থেকে এই আয়াত পর্যন্ত সমস্ত কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং এটাই হল প্রভাবশালী উপযোগী কথা। 'যার হৃদয় আছে' এ কথায় ইঙ্গিত রয়েছে গ্রহণকারী পাত্রের প্রতি, উদ্দেশ্য জীবিত হৃদয়; যা আল্লাহর বাণী বুঝতে সক্ষম। যেমন তিনি বলেন, “এতো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন; যার দ্বারা (মুহাম্মদ জাগ্রত-চিত্ত) জীবিত ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করতে পারে।” (সূরা ইয়াসীন ৬৯-৭০ আয়াত)
'উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করে' অর্থাৎ তার কর্ণকে খাড়া করে এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে তাকে যা বলা হচ্ছে তার প্রতি সংযোগ করে। আর এটা হচ্ছে প্রভাব লাভের শর্ত। 'নিবিষ্টচিত্তে' বা 'উপস্থিত হয়ে' অর্থাৎ নিজের মন ও হৃদয়কে তাতে হাজির করে, অন্যস্থানে ফেলে না রেখে বা উদাসীন না হয়ে শ্রবণ করা। আর এর দ্বারা প্রভাবলাভের প্রতিবন্ধী বিষয়সমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে; আর তা হল, হৃদয়ের ঔদাস্য, যা বলা হচ্ছে তার জন্য মনের অনুপস্থিতি এবং প্রণিধানে অমনোযোগিতা।
সুতরাং যখন প্রভাবকারী-আর তা হল কুরআন- ও গ্রহণকারী পাত্র -আর তা হল জাগ্রতচিত্ত একত্রে, সমরেত হয় এবং সর্বশর্ত পূরণ হয় আর তা হল উৎকর্ণতা, অতঃপর প্রতিবন্ধক থেকে খালি হয় আর-তা হল মনের অনবধানতা, অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা হতে ঔদাস্য বা অন্য কোন বিষয়ে মনোযোগী হওয়া-তাহলেই প্রভাব অর্জন হয়; অর্থাৎ কুরআন ও উপদেশ দ্বারা উপকৃত হতে পারা যায়।' (আল-ফাওয়াইদ ৫পৃঃ)
ইল্ম সেই বস্তু যাতে মনোযোগী, নিষ্ঠাবান ও জাগ্রতচিত্ত না হলে লাভ করা যায় না। কবি বলেন,
'বই পড়ে কিন্তু যে নাহি দেয় মন,
কেমনে সে জন বল পাবে জ্ঞান ধন?
প্রদীপে না দিয়ে তেল বাতি যদি জ্বালো,
কখনো কি সে প্রদীপ দিয়ে থাকে আলো?'
আর কথায় বলে, 'কলম কালি মন, লিখে তিনজন।'
📄 শিক্ষকের প্রতি সমীহ
অনুরূপভাবে ইল্মের আরো এক নীতি, ওস্তায ও শিক্ষকের প্রতি বিনয়, শিষ্টতা ও সমীহ প্রদর্শন। যা না হলে শিক্ষক ও ছাত্রের সংযোগ থাকে না। দেওয়া-নেওয়ার ঐকান্তিক আগ্রহ থাকে না। ফলে উভয়ের কর্তব্য পালন তো হয়; কিন্তু ফললাভ হয় না। তাই তালেবে ইল্মের উচিত, নিজ ওস্তাযের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। বিনয়ের সাথে তাঁর সেবা করা।
শা'বী বলেন, 'একদা যায়দ বিন সাবেত এক জানাযার নামায পড়লেন। অতঃপর তাঁর প্রতি একটি অশ্বতরী পেশ করা হল; যাতে তিনি সওয়ার হন। তৎক্ষণাৎ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এসে সওয়ারীর পা-দানে ধরলেন। (যাতে তিনি সহজে চড়তে পারেন)। যায়দ তাঁকে বললেন, 'ছাড়ুন, হে রসূলুল্লাহ ﷺ এর পিতৃব্যপুত্র!' ইবনে আব্বাস বললেন, 'ওলামাদের সহিত এইরূপ ব্যবহারই করতে হয়।' (ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, হাকেম)
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি আমাকে একটি হরফও শিখিয়েছে আমি তার গোলাম। সে ইচ্ছা করলে আমাকে বিক্রয় করতে পারে। নচেৎ ইচ্ছা করলে আমাকে গোলাম করে রাখতে পারে।'
সলফে সালেহীনগণ স্ব-স্ব ওস্তাযের বড় সম্মান করতেন। সমীহর সহিত শিক্ষকের প্রতি তাকাতে তাঁদের মনে ত্রাস সঞ্চার হত।
মুগীরাহ বলেন, 'যেমন আমীরকে ভয় করা হয় তেমনি আমরা (আমাদের ওস্তায) ইব্রাহীম নখয়ীকে ভয় করতাম।'
আইয়ুব বলেন, 'তালেবে ইল্ম হাসানের নিকট তিন বছর ধরে (দর্সে) বসত কিন্তু তাঁর ত্রাসে কোন বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতে সাহস করত না।'
ইসহাক বলেন, 'আমি ইয়াহয়্যা কাত্তানকে আসরের নামায পড়ে মসজিদের মিনার গোড়ায় হেলান দিতে দেখতাম। তাঁর সম্মুখে আলী বিন মাদানী, শাযাকুনী, আম্র বিন আলী, আহমদ বিন হাম্বাল, ইয়াহয়্যা বিন মাঈন প্রভৃতি খাড়া হয়ে তাঁকে হাদীস বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। তাঁরা একই অবস্থায় মাগরেবের নামায নিকটবর্তী হওয়া পর্যন্ত পায়ের উপর ভর করে দণ্ডায়মান থাকতেন। তবুও তিনি (কাত্তান) তাঁদের কাউকেও বলতেন না যে, 'বস।' আর তাঁরাও তাঁর ত্রাস ও সমীহতে বসতে সাহস করতেন না!'
ইবনুল খাইয়াত মালেক বিন আনাসের প্রশংসায় বলেন, 'তিনি কোন বিষয়ে উত্তর না দিলে তাঁর ত্রাসে দ্বিতীয়বার আর কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করত না। সমস্ত জিজ্ঞাসুরা চিবুক নত করে থাকত। তাঁর উপর উদ্ভাসিত হত প্রবল ব্যক্তিত্বের প্রভা এবং পরহেযগারীর মাহাত্ম্য। তিনি ভয়াবহ ছিলেন অথচ তিনি কোন শাসক ছিলেন না।'
আহমদ বিন হাম্বল খালাফ আহমারকে বলেছিলেন, 'আমি আপনার সম্মুখে ছাড়া বসিনা, আমরা আমাদের শিক্ষকের নিকট বিনয়ী হতে আদিষ্ট হয়েছি।'
সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত, তার সকল বিষয়ে ওস্তাযের কথা মানা। তাঁর অভিমত ও তদবীবের বাইরে কোন কাজ না করা। সদা তাঁর সহিত দক্ষ চিকিৎসকের পার্শ্বে এক রোগীর মত অবস্থান করবে। যা করতে ইচ্ছা করবে সে বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেবে। অন্যান্য সকল কর্মে তাঁর সম্মতি অবশ্যই নেবে। তাঁর প্রতি গভীর সমীহ রাখবে। তাঁর সেবার মাধ্যমে আল্লাহর সামীপ্য আশা করবে। আর একথা জানবে যে, ওস্তাযের খাতিরে লাঞ্ছনা পাওয়া মর্যাদা, তাঁর জন্য বিনয়াবনত হওয়া গর্ব এবং তাঁর নিকট নিচু হওয়া উন্নতির কারণ।
তালেবে ইল্মের কর্তব্য, তার ওস্তাযের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা-দৃষ্টিতে তাকানো। সকল বিষয়ে তাঁর বিরক্তি ও বিরাগকে এড়িয়ে চলা। তাঁর সকল অবস্থা ও উপস্থিতিকে পরোয়া করে চলা। সলফরা এরূপই করতেন। তাঁদের অনেকে মনে মনে দুআ করতেন, 'আল্লাহ! তুমি আমার দৃষ্টি হতে আমার ওস্তাযের ত্রুটিকে গোপন কর। আর আমার নিকট হতে তাঁর ইলমের বর্কত তুমি ছিনিয়ে নিওনা।' (তাযকিরাতুস সামে' ৮৮পৃঃ)
ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেন, 'আমি মালেক (রঃ) এর নিকট তাঁর ভয়ে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে (বই বা খাতার) পাতা উল্টাতাম; যাতে তিনি উল্টানোর শব্দ না শুনতে পান।'
তালেব আমীরজাদা হলেও ওস্তাযের সামনে বিনতির সাথে বসবে। যেহেতু ইল্ম ও আলেমের সম্মান সকল পার্থিব বিষয়ের ঊর্ধ্বে। ওস্তাযকে সম্বোধনকালে 'আপনি, লেন-দেন' প্রভৃতি বলবে। নাম ধরে না ডেকে সম্মানসূচক উপাধি দ্বারা ডাকবে। তাঁর অনুপস্থিতকালেও তাঁর নাম নেবে না, নিলেও সম্মানপূর্ণ খেতাব জুড়ে নাম নেবে। তাঁর অবর্তমানেও 'উনি-তিনি, বলেন' ইত্যাদি ব্যবহার করবে। কোন প্রকার অসম্মানসূচক আখ্যায়নে তাঁর উল্লেখ করবে না; যেমন বহু জাহেল অবজ্ঞার সাথে দ্বীনের আলেমকে তুচ্ছজ্ঞান করে 'মোল্লাজী, মৈলিবি' ইত্যাদি বলে আখ্যায়ন করে থাকে। আর তা এই কারণে যে, 'তাঁদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত' (?) গীর্জা বা রকেট পর্যন্ত নয় তাই! সত্যিই তো! যে দেশের লোকেরা কাপড়ই পরে না সে দেশে ধোপার আর কি কদর থাকতে পারে?
তালেবে ইল্ম ওস্তাযের সমস্ত অধিকার ও হক আদায় করবে; তাঁর অনুগ্রহ ও অবদান বিস্মৃত হবে না। তাঁর শ্রদ্ধার সংরক্ষণ করবে, তাঁর গীবতের প্রতিবাদ করতে, তাঁর জন্য রাগান্বিত হবে; তা না পারলে সেই গীবতের মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করবে। সর্বদা তাঁর জন্য দুআ করবে। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য দুআ এবং তাঁর অসহায় পরিবারের যথাসম্ভব তত্ত্বাবধান করবে।
শিক্ষার ময়দানে তালেবে ইল্মের উচিত, ওস্তাযের ক্রোধ ও বিভিন্ন কোপজ দোষের সম্মুখে ধৈর্য ও সহ্যশীলতা অবলম্বন করা। প্রহার করলেও দাহ বা মাদ্রাসা ত্যাগ করে পলায়ন না করা অথবা তাঁর বিরুদ্ধে অভিভাবক অথবা শাসকগোষ্ঠীর নিকট অভিযোগ না করা। করলে তা হবে বড় আহাম্মকী।
একদা আ'মাশ তাঁর এক ছাত্রের উপর ক্রোধান্বিত হলেন। অপর এক ছাত্র ঐ ছাত্রকে বলল, 'যদি উনি আমার প্রতি এমন ক্রোধ দেখান যেমন তোমাকে দেখিয়েছেন তাহলে আমি আর উনার নিকট ফিরব না।' আ'মাশ শুনলে তিনি বললেন, 'তাহলে সে তো আহম্মক। আমার অসদাচারণের কারণে সে তার লাভজনক জিনিস ছেড়ে চলে যাবে।'
সুফিয়ানকে বলা হল, 'কত লোক পৃথিবীর সারা দেশ হতে আপনার নিকট আসছে তাদের উপর আপনি ক্রোধান্বিত হন? সম্ভতঃ ওরা আপনাকে ত্যাগ করে চলে যাবে।' তিনি উত্তরে বললেন, 'তারা তোমার মতই আহাম্মক তাহলে; যদি তারা আমার অসদাচরণের কারণে তাদের উপকারী বস্তু ছেড়ে চলে যায়।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৯০পৃঃ, আল জামে'২২৩পৃঃ)
কিছু সলফ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি শিক্ষার লাঞ্ছনার উপর ধৈর্য ধারণ করে না সে তো সারা জীবন মূর্খতার অন্ধত্বে থাকে। আর যে ব্যক্তি সবর করে লিখা-পড়া করে দুনিয়া ও আখেরাতে তার সম্মানলাভ হয়।'
ইবনে আব্বাস বলেন, 'ছাত্র হয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করেছি তাই আজ শিক্ষক হয়ে সম্মান লাভ করছি।'
শিক্ষকের উপর ক্রোধ প্রকাশ ছাত্রের জন্য সমীচীন নয়। যেহেতু শিক্ষক তাকে যে কড়া কথা বলেন অথবা প্রহার করেন তা তো তার মঙ্গলের জন্যই করেন, তাতে শিক্ষকের কোন স্বার্থ নেই। অনুরূপভাবে (দলীল ও যুক্তির ভিত্তিতে স্বমত ভিন্ন হলেও) শিক্ষকের সহিত তর্কাতর্কি করাও তার জন্য সঙ্গত নয়। যেহেতু এতে বহু অমঙ্গল আছে যা তার ইলমের আকাশে মেঘ ডেকে আনে। তাই মাইমুন বিন মিহরান বলেন, 'তোমার চেয়ে যে অধিক জ্ঞানী তার সহিত তর্ক করো না। যদি তা কর তবে সে তোমার উপর হতে তার ইল্ম রুখে নেবে এবং তার কোন নোকসান হবে না।'
যুহরী বলেন, 'সালামাহ ইবনে আব্বাসের সহিত তর্ক করত, যার ফলে বহু ইলম হতে সে বঞ্চিত ছিল।' (জামেউ বায়ানিল ইল্যু ১৭১ পৃঃ)
মোটকথা, তালেবে ইল্ম যদি তার সদাচরণ, নিষ্ঠা ও শিষ্টতা দ্বারা ওস্তাযকে সমীহ এ শ্রদ্ধা করে আনন্দিত করতে পারে তবে শিক্ষক তাঁর ইলমের পাত্র তার পাত্রে ঢেলে দেবেন। নচেৎ মনের মধ্যে 'কিন্তু' সৃষ্টি করে দিলে তিনি তার জন্য হিতাকাঙ্খী না হয়ে কেবল দায়িত্ব পালনকারী হবেন।
তদনুরূপ মুদার্রেসের উপর অসম্মানজনক চাপ, কমিটি বা মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অহেতুক বা অমূলক টিপ্পনী বা ফোড়ন, তাঁদের সম্মানে আঘাত লাগে এমন কর্তৃত্ব ইত্যাদি প্রকৃত ইলমের স্বার্থে নয়। যাতে ছাত্রদের প্রকৃত উন্নতির কথা ভাবতে গেয়ে তাঁদের মন ভেঙ্গে হিতে বিপরীত হয়। সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙ্গে বসে থাকে। যার কারণেই অনেক মাদ্রাসায় তালাও পড়ে যায়।
তালেব ইলমের উচিত, ওস্তাযকে কোন প্রকার বিরক্ত ও 'ডিস্টার্ব' না করা। নিদ্রিত থাকলে কোন অজরুরী কাজের জন্য বা কোন প্রশ্নের জন্য অথবা সবক বুঝে নেওয়ার জন্য জাগ্রত না করা, দরজা বন্ধ থাকলে অনুমতি না নিয়ে তাঁর রুমে প্রবেশ না করা, আদবের সহিত অতি ধীরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া এবং অনুমতি দিলে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। ওস্তাযের সামনে বা ক্লাসে গেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এবং শরীরের দুর্গন্ধ দূর করে যাবে। যেহেতু তাঁর মজলিস ইল্মের মজলিস, যিক্র ও ইবাদতের মজলিস।
তিনি কোন কাজে ব্যস্ত থাকলে নিজের কোন কাজের জন্য তাঁর নিকট যাবে না। সেখানে পৌঁছে তিনি যদি আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেন অথবা অপেক্ষা করতে বলেন তাহলে অপেক্ষা করবে, নচেৎ সালাম দিয়ে সত্বর তাঁর নিকট হতে বের হয়ে যাবে। আর তিনি অনুমতি দিলেও বেশীক্ষণ তাঁর সময় নষ্ট করবে না।
ওস্তাযের নিকট বা ক্লাসে গেলে তার অন্তরকে সমস্ত ব্যস্ততা থেকে খালি করবে এবং মস্তিষ্ককে স্বচ্ছ করবে। তন্দ্রা, ক্রোধ অতি ক্ষুধা বা পিপাসা ইত্যাদির অবস্থায় যাবে না। যাতে তার হৃদয় প্রশস্ত হয় এবং যা বলা হয় তা আয়ত্ত করতে পারে।
সর্বদা চেষ্টা করবে যেন একটা ক্লাসও ছুটে না যায়। কারণ শিক্ষকের নিকট সে দস্ ছুটে যায় তার কোন বিকল্প ও বিনিময় নেই।
অসময়ে ওস্তাযের নিকট পড়া বুঝতে যাবে না। নিজের জন্য তাঁর নিকট হতে কোন নির্দিষ্ট সময় অথবা স্থান নির্ধারিত করতে চাইবে না; যদিও সে আমীরজাদা বা ধনীর ছেলে হয়। যেহেতু তাতে ওস্তায ও অন্যান্য ছাত্রদের উপর অহংকার ও আহাম্মকি প্রদর্শন হয়।
ক্লাসে পৌঁছে সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিবে, ব্যাখ্যা না চললে ওস্তাযকে বিশেষ অভিবাদন জানাবে। অতঃপর মজলিস যেখানে শেষ হয়েছে তার একপ্রান্তে নীরবে বসে যাবে। ক্লাস চলাকালীন কাউকে ডিস্টার্ব অবশ্যই করবে না। একেবারে ওস্তাযের মুখোমুখি অথবা পাশাপাশি বেআদবের মত বসবে না। তাঁর সম্মুখে বিনয় ও শিষ্টতার সহিত বসবে, তাঁর প্রতি তাকিয়ে উৎকর্ণ হবে, নিজ দেহ-মন সবকিছু দ্বারা তাঁর প্রতি মুখ করে বসবে। তিনি যা বলছেন বা ব্যাখ্যা করছেন তা নিবিষ্টচিত্তে শ্রবণ করবে ও বুঝবে। এসময়ে এদিকে ওদিক দৃষ্টি ফিরাবে না। বিশেষ করে তাকে সম্বোধন করে কথা বললে অপ্রয়োজনে তাঁর নিকট হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। পার্শ্বে বা বাইরে কোন শব্দ পেলেও ফিরে তাকাবে না। তাঁর সম্মুখে জামা-কাপড় বা চাদরাদি ঝাড়বে না। জামার হাতা গুটাবে না। হাত বা পায়ের আঙ্গুল, দাড়ি, নাক, দাঁত, কলম বা সিট ইত্যাদি নিয়ে খেলা করবে না। নাক বা দাঁতের ময়লা সাফ করবে না, ঘা থাকলে তা খুঁটবে না, হাই বা হাঁচির সময় মুখে রুমাল বা হাত রেখে নেবে। হাঁচির সময় খুব জোরে শব্দ না করার চেষ্টা করবে, হো-হো করে সশব্দে হাই তুলবে না।
তার সামনে কিছুতে হেলান দিয়ে অথবা পায়ের উপর পা চাপিয়ে অথবা তাঁর দিকে পা বাড়িয়ে অথবা তাঁর চেয়ে উঁচু জায়গায় বসবে না। অপ্রয়োজনে অধিক কথা বলবে না। বেআদবীপূর্ণ অশ্লীল বা হাস্যকর কোন কথা বা গল্প শুনাবে না। অকারণে হাসবে না। হাসলে মুচকি হাসবে। অপ্রয়োজনে অধিকাধিক গলা ঝাড়বে না। তাঁর সহিত হাত হিলিয়ে বা চোখ ঠেরে কথা বলবে না। তাঁর মজলিসের বিশেষ আদব করবে; যেমন সলফে সালেহীনরা করতেন। তাঁরা ইল্মী মজলিসে এমন একাগ্রতার সহিত বসতেন এবং এমন ধীর ও স্থির থাকতেন যেন তাঁদের মাথায় কোন পাখী বসে থাকত।
ওস্তাযের কোন কথার উপর প্রতিবাদ প্রয়োজন হলে সশ্রদ্ধ প্রতিবাদ আদবপূর্ণ শব্দে পেশ করবে। তিনি কোন কাহিনী, কবিতা বা তথ্য পেশ করলে এবং তা তার পূর্ব হতে জানা থাকলেও বিস্ময়ের সাথে উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করবে। জ্ঞান-পিপাসা ও জানার আগ্রহ প্রকাশ করে তা শোনা মাত্র আনন্দিত হবে। এই ভাব প্রকাশ করবে যে, সে যেন তা কখনো শুনেনি; আজ সে নতুন শুনল।
তাঁর ব্যাখ্যাদানের পূর্বে কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা, তাঁর উত্তর দেওয়ার পূর্বে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবে না। অথবা সে তার ব্যাখ্যা বা উত্তর জানে তা ভাবে-ভঙ্গিতেও প্রকাশ করবে না। মজলিসে তাঁর কথা কাটবে না। তাঁর বক্তৃতা চলাকালীন অন্য কারো সহিত মুখে বা ইঙ্গিতে কথা বলবে না।
তাঁকে কোন জিনিস দেওয়ার সময় ছুঁড়ে দেবে না। আদবের সহিত ধরিয়ে বা রেখে দেবে। কোন প্রয়োজন না হলে ওস্তাযের সামনে বা পাশাপাশি চলবে না; বরং তাঁর পিছনে চলবে। তিনি পায়ে হেঁটে চললে তাঁর সহিত সওয়ার হয়ে চলবে না। পথে তাঁর সহিত সাক্ষাৎ হলে আগে আগে স্মিতমুখে সালাম করবে এবং তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করবে।
তিনি কোন বিষয়ে পরামর্শ না চাইলে তাঁকে পরামর্শ দিতে যাবে না। পরামর্শ চাইলে বিনয়ের সাথে উচিত পরামর্শ দেবে। অবশ্য কোন বিপদ হতে সতর্ক করতে কোন সময়ই ভুলবে না।
দস্ চলাকালীন কোন বিষয় বুঝতে না পারলে আদবের সহিত তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে। জিজ্ঞাসা করতে কোন লজ্জা বা কুণ্ঠাবোধ করবে না। অথবা অহংকারের সাথে প্রশ্ন করা অপ্রয়োজন ভাববে না। আবার তাঁকে পেঁচে ফেলার জন্য অথবা পরীক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত প্রশ্নাদি করবে না। কোন বিষয় বুঝতে না পারলে এবং ওস্তায তাকে বুঝতে পেরেছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলে স্পষ্ট 'না' বলতে কোন লজ্জা বা সংকোচ নেই। না বুঝে 'হুঁ-হুঁ' করে ভবিষ্যতের জন্য বোঝা বাড়ানো উচিত নয়। আবার বুঝেও না বুঝার ভান করে তাকে বিরক্ত করা বৈধ নয়। কথায় বলে, 'বুঝেও যে বুঝেনা তাকে বুঝাবে কে? আর না বুঝে যে হুঁ-হুঁ করে তাকে ভূতে ধরেছে।'
অজানা বিষয়ে প্রশ্ন করা কোন দোষের নয়। প্রশ্ন করলে যদি কেউ বোকা মনে করে করুক, তবুও প্রশ্ন ত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ, প্রশ্ন করে যে কিছু জানতে চায় সে বোকা হয় মাত্র দু'-পাঁচ মিনিটের জন্য। কিন্তু জানার ভান করে যে কখনও প্রশ্ন করে না সে বোকা থাকে সারাটা জীবন।
কোন সবক বুঝতে বা তৈরী করতে কঠিন ও কষ্টবোধ হলেও নিরাশ হওয়া চলবে না। 'আরবী, পারবি তো পারবি, নচেৎ হেগে-মুতে ছাড়বি' কথায় ঘাবড়ে গেলে হবে না। একবারে না বুঝলে ওস্তাযের নিকট বারবার বুঝে নিয়ে, সহপাঠীদের সহিত বারংবার পুনরালোচনা ও অভ্যাস করে, একাধিকবার নিজে পড়ে মুখস্থ করে তবেই ক্ষান্ত হতে হবে। সবককে শুরু থেকেই কোনক্রমেই কঠিন মনে করা চলবে না। 'বুঝতে পারছি না' বলে হাত গুটিয়ে বসে গেলে হবে না। মনের মাঝে আনতে হবে অধ্যাবসায় ও সাধনার ঝড়।
কথিত আছে যে, জনৈক ছাত্র মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে সবক বুঝতে ও স্মৃতিস্থ করতে না পারলে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে মনস্থ করে। ফেরার পথে পিপাসায় এক কুয়োতলায় পানি পান করতে গিয়ে দেখে, একটি পাথর ক্ষয় হয়ে তাতে গর্ত হয়ে গেছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করে যখন সে জানতে পারল যে, মাটির কলসী বারবার রাখার ফলেই পাথরটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে তখন সে তার মনের ভিতর হারানো সাহস ও উদ্যম ফিরে পেল। ভাবল, বারবার মাটির কলসী রাখার ফলে যদি একটা পাথরও ক্ষয়ে যায় তাহলে বারবার চেষ্টার সাথে পড়ার পরেও আমার ব্রেনে দাগ পড়বে না এবং সবক মুখস্থ হবে না কেন? এই বলে পুনরায় নতুন উদ্যোগ নিয়ে সে মাদ্রাসায় ফিরে যায়। ভবিষ্যতে সেই ছাত্রই এক বড় পণ্ডিতরূপে খ্যাতি লাভ করে।
অনুরূপ আর এক ছাত্র একটি পিপড়েকে একটুকরা খাবার নিয়ে কোন দেয়ালে উঠতে অক্ষম ও পরক্ষণেই বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহু চেষ্টার পর উঠতে সক্ষম দেখে নিজের উদ্যম ফিরে পেয়েছিল। এরূপ প্রত্যেক ছাত্রই যথেষ্ট মেহনত, সুদৃঢ় মনোবল ও অবিরাম সাধনা প্রয়োগ করলে বিদ্যায় পারদর্শী হতে পারে। কবি বলেন,
'পারিবো না' একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার।
দশজনে পারে যাহা
তুমিও পারিবে তাহা
একবারে না পারিলে দেখ শতবার।'
তালেবে ইলমের উচিত, তার কিতাবের সহিতও আদব করা; মুসহাফকে মাটির উপর না রাখা, তাঁর প্রতি পা না করা, তা পিছন করে না বসা, আঙ্গুলে থুথু নিয়ে তার পাতা না উল্টানো, কোন কিতাবের নিচে তা না রাখা। হাদীস, তফসীর প্রভৃতি কিতাব; যাতে কুরআনী আয়াত বা আল্লাহর নাম আছে তা পা দ্বারা না ধরা, তার উপর হেলান না দেওয়া, যেখানে সেখানে ফেলে না রাখা, ঐরূপ পত্রিকার কাগজকে খাওয়ার দস্তরখান বা বসার সিট না করা। কিতাবের উপর কলম দ্বারা লিখে না খেলা; প্রয়োজনীয় টীকা ছাড়া অন্য কিছু না লিখা, এসব কিছু নষ্ট হয়ে গেলে কোন সম্মানিত স্থানে দাফন করা বা জ্বালিয়ে তার ছাই পবিত্র পানিতে ফেলা ইত্যাদি। এ আদব কাগজের প্রতি নয় বরং তা ইলমের প্রতি, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বাণীর প্রতি।
প্রয়োজনে সহপাঠীকে কিতাব পড়তে দেওয়া উচিত। সহপাঠীরও উচিত উক্ত কিতাবের যথার্থ হিফাযত করা। লিখার সময় 'বিসমিল্লাহ' লিখা ও বলা, আল্লাহর নামের সহিত 'তাআলা, সুবহানাহু, আয্যা অজাল্ল, তাবারাকা অতাআলা, রব্বুল আলামীন, রব্বুল ইষ্যাত' ইত্যাদি লিখা ও পলা। নবী ﷺ এর নাম লিখার সমর দরূদ সম্পূর্ণভাবে লিখা ও বলা।