📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 স্বল্প ভোজন, শয়ন ও কথন

📄 স্বল্প ভোজন, শয়ন ও কথন


পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, তালেবে ইলমের উচিত, হালাল রুজী হতে পরিমিত আহার করা; যে অভ্যাস রসূল ﷺ ও তাঁর অনুসারীদের।

তদনুরূপ পরিমিত নিদ্রা যাওয়া। শরীর ও মস্তিষ্কের ক্ষতি না হলে তালেবে ইল্ম যথাসম্ভব কম ঘুমাবে। দিবা-রাত্রে আট ঘন্টার অধিক এবং ছয় ঘণ্টার কম অবশ্যই নিদ্রিত থাকবে না; নচেৎ ইল্ম যাবে অথবা সুস্থতা। যেমন দ্বিপ্রহরের সময় একটু বিশ্রাম ব্যতীত দিবা-নিদ্রাও এক কামজ দোষ। দ্বিপ্রহরের বিশ্রামের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে প্রিয় নবী ﷺ বলেন, “তোমরা দুপুর বেলায় একটু ঘুমিয়ে বিশ্রাম নাও। কারণ, শয়তানরা ঐ সময় বিশ্রাম নেয় না।” (সহীহুল জামে' ৪৪৩১নং)

হাসান বিন যিয়াদ (রঃ) ফিহ্ন শিক্ষা করতে শুরু করলেন, তখন তাঁর বয়স আশি বছর। (ইন্ন শিক্ষার সময়) তিনি চল্লিশ বছর বিছানায় রাত্রি কাটাননি।

যুবাইর বিন আবী বকর বলেন, 'একদা আমার ভাগ্নী আমার স্ত্রীকে বলল, আমার মামা মামীর পক্ষে কত ভালো মানুষ; মামীর উপর সতীন আনেনি, আর কোন দাসীও ক্রয় করেনি। তা শুনে স্ত্রী তাকে বলল, 'আল্লাহর কসম, এই বইগুলো আমার পক্ষে তিনটে সতীনের চেয়েও অধিক কঠিন!' (আল-জামে' লিআখলাকির রাবী আদাবিস সামে’ ১/৯৯)

মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানী (রঃ) রাত্রিকালে ঘুমাতেন না। নিজের পাশে সর্বদা খাতা-পত্র রেখে নিতেন। যখন একটি বিষয় দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যেতেন তখন তা ছেড়ে অন্য বিষয় দেখতে শুরু করতেন। নিজের কাছে এক গ্লাস পানিও রাখতেন। নিদ্রা এলে পানি দ্বারা দূর করতেন। তিনি বলতেন, 'নিদ্রা উষ্ণতা থেকে সৃষ্টি হয় তাই তা শীতল পানি দ্বারা দূর করা উচিত।' (তা'লীমুল মুতাআল্লিম ২৩ পৃঃ)

রসূল ﷺ বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন শয়তান তার মস্তকের শেষাংশে তিনটা গিরা বেঁধে দেয়। প্রত্যেক গিরার স্থানে বলে, 'তোমার জন্য এখনও লম্বা রাত বাকী, ঘুমাও।' সুতরাং সে যদি উঠে আল্লাহর যিক্র করে তাহলে একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর যদি অযু করে তবে আরও একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর যদি সে নামায পড়ে তাহলে তার অপর গিরাটিও খুলে যায়। তখন সে সস্ফূর্তির সহিত সুস্থ মনে সকালে উঠে। নচেৎ অসুস্থ মনে অলসতার সহিত সকাল করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

যে ব্যক্তি সারা রাত্রি নিদ্রায় কাটায় এবং নামাযের জন্য উঠে না সে ব্যক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শয়তান তার কানে প্রস্রাব করে দেয়।”

আল্লাহ জাল্লা শানুহ মুত্তাকী ও সৎলোকদের প্রশংসা করে বলেন, “তারা রাত্রের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করত এবং রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা যারিয়াত ১৭-১৮- আয়াত)

স্থুলকথা এই যে, অতিনিদ্রা তালেবে ইলমের গুণ নয়। অবকাশ এলে ঘুমিয়ে আশা মিটানো তার স্বভাব নয়। তার গুণ ও স্বভাব তো সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইল্মের আশায় প্রযত্ন ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মুমিন পারলৌকিক কল্যাণ পেয়ে কোনদিন তৃপ্ত হয় না। যত কল্যাণ, যত পুণ্য সে পায় তত তার পাওয়ার আকাংখা আরো বৃদ্ধি হতে থাকে। পরিশেষে সে জান্নাতে গিয়ে শেষবারের মত তৃপ্তিলাভ করবে।

অনুরূপভাবে তালেবে ইল্মের আর এক সদ্‌গুণ হল, অল্প কথা বলা। নবী ﷺ সকল মুসলিমের উদ্দেশ্যেই বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন উত্তম কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরাং গপে বা বখাটে হওয়া কোন মুসলিমের সদ্‌গুণ নয়; যা একজন তালেবে ইল্মের যে হতেই পারে না তা অনুমেয়।

ইবনে আবুল বার বলেন, 'আলেমের ফিতনার মধ্যে এটাও একটি যে, তার নিকট শ্রবণ অপেক্ষা' ধচন প্রিয়তর 'হয়া' এ 'কথা ইয়াযীদ বিন আবী 'হাবীধ হতে বর্ণিতা

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 উচিত সংঘ

📄 উচিত সংঘ


ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,

س - لام ء - لى الـ ـ دنيا إذا يكن ا + صديق صدوق صادق الوعد منصفا

অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

সমাজে মিলেমিশে একত্রে বাস করা মানুষের নৈতিক ও প্রাকৃতিক গুণ। পাড়া-প্রতিবেশীর লোক, ভাই-বন্ধু ইত্যাদির সহিত মিশতে হয়। বন্ধুদের মধ্যে কেউ হয় জানী (প্রাণের), কেউ হয় নানী (খাবার-দাবারের) এবং কেউ হয় জবানী (মুখের) বন্ধু ও সাথী। এই তিন প্রকার সাথীদের মধ্য থেকে তালেবে ইল্মকে এমন সাথী নির্বাচিত করতে হয়, যার কারণে নিরর্থক তার সময় নষ্ট না হয় অথবা প্রভাবে সঙ্গ-দোষে সেও দূষিত না হয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞানী, মেধাবী, নিষ্ঠাবান ও উপকারী বন্ধু নির্বাচন করে নিজের ইল্ম ও আমলে বৃদ্ধি সাধন করা উচিত। এমন সঙ্গী থেকে দূরে থাকা উচিত, যার দ্বারায় তার জ্ঞান, মান, প্রাণ, ধন ও ঈমানের কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। মৃত হৃদয়ের সঙ্গী থেকে নিঃসঙ্গ থাকা বহু উত্তম।

ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, 'যার হৃদয় মৃত সে তোমার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে, অতএব যথাসম্ভব তার নিকট থেকে দূরে থেকে নিজের মনকে শান্তি দাও। যেহেতু সে উপস্থিত হলেই তুমি আতঙ্কিত হয়ে থাক। অতএব ঐ প্রকার ব্যক্তি দ্বারা মসীবতে পড়লে তুমি ওকে তোমার বাহ্যিক ব্যবহার দাও, হৃদয় নিয়ে ওর নিকট থেকে পলায়ন কর এবং অভ্যন্তর নিয়ে ওর কাছ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও। ওকে নিয়ে তুমি ঐ জিনিস থেকে ব্যস্ত হয়ে যেওনা যা তোমার জন্য শ্রেষ্টতম।

জেনে রেখো, সেই ব্যক্তিকে নিয়ে নিবিষ্ট হওয়াতে শত আফশোষ হবে; যে ব্যক্তির সহিত নিবিষ্টতা কেবল আল্লাহ তাআলা হতে তোমার প্রাপ্য অংশ থেকে তোমার জন্য বঞ্চনা ডেকে আনে। তাঁর নিকট থেকে তোমাকে দূরে ঠেলে দেয়, অযথা তোমার সময় নষ্ট করে, সংকল্পকে দুর্বল করে এবং চিন্তাকে বিভিন্নমুখী করে ফেলে। এমন লোকের পাল্লায় যদি তুমি ফেঁসেই থাক আর তাকে তোমার প্রয়োজনও থাকে তাহলে তার মধ্যেই আল্লাহর কাজ করে যাও এবং যথাসম্ভব তার উপর সওয়াবের আশা রাখ। তার মধ্যেই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির প্রতি নৈকট্য লাভ কর। তার সহিত তোমার সমাবেশকে এমন ব্যবসা বানাও যাতে তুমি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হও। আর তুমি তার পক্ষে এমন ব্যক্তির মত হও, যে কোন পথে চলতে থাকে, এমন সময় এক ব্যক্তি তার সামনে এসে তাকে চলা থেকে থামিয়ে দেয়। অতঃপর তুমি চেষ্টা কর ওকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলতে। যাতে তুমি ওকে বহন কর এবং ও যেন তোমাকে বহন না করে। তাতে যদি সে অস্বীকার করে ও তোমার সাথে পথ চলতে যদি তার আগ্রহ না থাকে তবে তুমি তার নিকট থেমে যেও না। বরং তাকে বর্জন কর এবং তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না। যেহেতু সে তোমার পথ অবরোধকারী (লুটেরা); তাতে সে যেই হোক না কেন। অতএব তুমি তোমার হৃদয় নিয়ে অব্যাহতি লাভ কর। তোমার দিন ও রাত্রি ব্যয় করতে কার্পণ্য কর। আর গন্তব্যস্থলে পৌঁছবার পূর্বেই যেন তোমার পথিমধ্যে সূর্য অস্তমিত না হয়ে যায়, নচেৎ তুমি ধৃত হবে।' (আল-ওয়া বিলুস সাইয়েব ৪৫ পৃঃ, আদাবু ত্বালেবিল ইল্ম ১১২-১১৩পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত, অপ্রয়োজনীয় ও অপকারী সংস্রব ত্যাগ করা এবং সেই সকল সম্পর্কও বর্জন করা যাতে তার দ্বীন ও দুনিয়ায় ক্ষতি হয়। বিশেষ করে নারী জাতির কুহকে না ফাঁসা, যার ফিতনা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিতনা এবং যার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জ্ঞানী জ্ঞানহারা, মানী মান হারা এবং কতলোক প্রাণহারা হয়। তারুণ্যের প্রারম্ভে সঙ্গতার খোঁজ হলে খোদাভীতির সহিত তালেবে ইল্মকে এমন সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন এবং ইল্ম-প্রদীপের পার্শ্ববর্তী বেষ্টনী কাঁচে কালিমা না পড়ে যায়। তদনুরূপ এমন সাথীও গ্রহণ করবে না যার খেল-তামাশাই অধিক এবং জ্ঞান-বুদ্ধি-ভিত্তিক কর্মকান্ড অল্প। যেহেতু মানুষের মন এক প্রকার চোর এবং তো. চুরিও হয় অতিসত্বর।

অনর্থক সংস্রবের তো কোন লাভই নেই। যাতে নিরর্থক আয়ু ক্ষয় হয়, অর্থ ব্যয় হয়, মানহীন সঙ্গতায় মানও যায় এবং দ্বীনহীন সাহচর্যে দ্বীন হারানোরও আশঙ্কা থাকে। সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত, এমন ব্যক্তির সহিত সংস্রব রাখা যাকে সে উপকৃত করতে পারবে অথবা তার নিকট হতে নিজে উপকৃত হবে। আর যদি এমন কোন ব্যক্তির অযাচিত সংস্রবে পড়েই যায়; যার সহিত বৃথা সময় নষ্ট হয়, না তাকে উপকৃত করতে পারে, না নিজেকে এবং তার ইলমী চলার পথে সে যদি কোন সহায়তা না করতে পারে; বরং বাদ সাধে তাহলে কুপ্রবৃত্তির ঝোঁকে না পড়ে সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার পূর্বেই ধীরে ধীরে তার সংসর্গ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নচেৎ (বিশেষ করে নারী-প্রেম) বিষয় যখন গভীরতায় পৌঁছে যায় তখন তা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং যখন 'তুলে ফেলা থেকে ঠেলে ফেলা সহজ' তখনই উচিত ব্যবস্থা নেওয়া জ্ঞানীর কাজ।

কোন সাথীর যদি একান্তই প্রয়োজন হয় তাহলে এমন সাথী হওয়া উচিত, যে হবে সৎ, দ্বীনদার, মুত্তাকী, পরহেযগার, বুদ্ধিমান, কল্যাণ-প্রিয়, যার মন্দ খুবই কম, যে সহ্যশীল ও সদ্ভাব-প্রিয়, কথায় কথায় যে তর্ক করে না, যে ভুলে গেলে স্মরণ করায়, স্মরণ করলে সাহায্য করে, প্রয়োজনে প্রবোধ দান করে, কথার আঘাত পড়লে সবর করে, ভুল ধরিয়ে দিলে ভুল স্বীকার করে, বন্ধুত্বের সাথে সমীহও রাখে ইত্যাদি। (তাযকিরাতুস সামে' ৮-৩পৃঃ)

ইব্রাহীম বিন আদহমকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি লোকেদের সহিত মিশেন না কেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'কারণ যদি আমি আমার চেয়ে নিচু মানের লোকের সঙ্গে মিশি তাহলে সে তার মূর্খতায় আমাকে কষ্ট দেয়। যদি আমি আমার চেয়ে নিচুমানের লোকের সহিত মিশতে যাই তাহলে সে অহংকার দেখায়। আর যদি আমি সমতুল কোন ব্যক্তির সহিত মিশি তাহলে সে আমার প্রতি হিংসা করে। তাই আমি তাঁর (আল্লাহর) সঙ্গতায় নিরত থাকি যাঁর সঙ্গতায় কোন বিরক্তি নেই, যাঁর মিলনের কোন ছিন্নতা নেই এবং যার সংসর্গে কোন আতঙ্ক নেই।'

জনৈক জ্ঞানী বলেন, 'খবরদার! কোন অহংকারীর সাথী হয়ো না। কারণ, যদি সে তোমার নিকট কোন ভালো দেখে তবে সে তা নিজের নামের সাথে জোড়ার চেষ্টা করবে আর যদি তার নিজের তরফ থেকে কোন মন্দ ব্যক্ত হয়ে পড়ে তবে তা তোমার নামের সাথে জুড়ে দেবে।'

মানুষ চার প্রকারের; প্রথমজনঃ জানে এবং সে জানে যে, সে জানে। তার সাথী হও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর। দ্বিতীয়জনঃ জানে এবং সে জানে না যে, সে জানে। সে বিস্মৃত তাকে স্মরণ করাও। তৃতীয়জনঃ জানে না এবং সে জানে যে, সে জানে না। সে অনুসন্ধানী, সে তোমার সাহচর্য চাইলে তা দাও এবং তাকে শিক্ষা দাও। আর চতুর্থজনঃ জানে না এবং জানে না যে, সে জানে না। এমন ব্যক্তি মূর্খ, তাকে বর্জন কর।

সাথী নির্বাচন করা এবং সংস্রব রাখার সময় কথাগুলি সস্মরণে রাখলে তালেবে ইল্মকে সত্যিই বিপদে পড়তে হয় না। প্রয়োজন ও কাল-পাত্র বিচার করে সঙ্গী নির্বাচন করা উচিত, নচেৎ তালেবে ইল্মের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হল কিতাব।

ইবনে কুদামাহ (রঃ) বলেন, 'জেনে রেখো যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই বন্ধুত্বের যোগ্য নয়। বন্ধুত্ব গড়ার জন্য এমন কতক আচরণ, গুণ ও বৈশিষ্ট্য বন্ধুর মধ্যে থাকা উচিত, যার ফলে বন্ধুত্বে আগ্রহ বাড়ে। তুমি যাকে সঙ্গী ও বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে তার মধ্যে নিম্নের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকা উচিতঃ-

সে যেন বুদ্ধিমান ও চরিত্রবান হয়। ফাসেক, বিদআতী এবং অর্থলোভী না হয়। যেহেতু জ্ঞান তো মানুষের মূলধন, আহম্মক ও নির্বোধের বন্ধুত্বে কোন কল্যাণ নেই। কারণ সে তোমাকে উপকার করতে চাইলেও অপকার করে বসে থাকবে। (প্রশংসা কুড়াবার উদ্দেশ্যে ভক্তির আতিশয্যে ক্ষতি সাধন করেও ভুলের কথা বলতে গেলে বলবে, 'ভালোর কাল নেই।') জ্ঞানী বলতে সেই বন্ধুকে বুঝাতে চাচ্ছি যে সমস্ত বিষয়কে যথার্থভাবে যথোপযুক্তরূপে নিজে নিজেই বুঝে, নচেৎ তাকে বুঝিয়ে দিলে অবশ্যই বুঝে যায়।

অনুরূপভাবে সদাচরণ তো একান্ত আবশ্যক। যেহেতু জ্ঞানী হলেও অনেকে ক্রোধ বা কামনার বশবর্তী হয়ে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে থাকে। এমন জ্ঞানী বন্ধুর সাহচর্যেও কোন ফল নেই।

ফাসেক যে, সে তো আল্লাহকে ভয় করে না, আর যার বুকে আল্লাহর ভীতি নেই তার বিপত্তি হতে কোন নিরাপত্তা নেই এবং তার উপর আস্থা রাখাও যায় না।

বিদআতীর সংস্রবও বিপজ্জনক। যেহেতু তার মনেও বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটার আশঙ্কা থাকে। অর্থলোভী, দুনিয়াদার এবং স্বার্থপর ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্বও হানিকর। যেহেতু সে স্বার্থের খাতিরে অসময়ে সরে পড়তেও পারে অথবা স্বার্থলোভে বন্ধুর বন্ধুত্বে ছুরি-চালাতেও পারে।

হযরত উমর (রাঃ) বলেন, 'তোমরা সত্যবাদীদের সাহচর্য গ্রহণ কর, তাদের ছায়া ও সংস্পর্শে জীবন-যাপন কর। যেহেতু তাঁরা সুখের সময়ের সৌন্দর্য এবং দুঃখের সময়ের হাতিয়ার। নিজের ভাই-এর প্রতি সুধারণা রাখ যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তার নিকট এমন কাণ্ড লক্ষ্য করেছ যাতে তুমি ক্ষুব্ধ হও। শত্রু হতে দূরে থাক। আমানতদার ব্যতীত সকল বন্ধু থেকেও সাবধান থাক। আর আমানতদার সেই, যে আল্লাহকে ভয় করে। অপকর্মকারীদের বন্ধু হয়ো না। নচেৎ তুমিও অপকর্ম শিখে নেবে। তাকে তোমার ভেদ ও রহস্য জানাও না। আর তোমার সর্ববিষয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ কর যারা আল্লাহকে ভয় করে।'

ইয়াহয়্যা বিন মুআয বলেন, 'নিকৃষ্ট বন্ধু সে, যাকে দুআর জন্য আবেদন জানাতে হয়, এক তরফাভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে যার সহিত চলতে হয় অথবা কোন কাজে বা ভুলে তার নিকট অজুহাত দেখাতে হয় বা ক্ষমাপ্রার্থী হতে হয়।'

বন্ধুর উপর বন্ধুর অনেক অধিকারও আছে। যেমন, যাচিত ও অযাচিতভাবে তার প্রয়োজন মিটানো, তার দোষ-ত্রুটি গোপন করা, সৎকাজে সতর্ক করা, মন্দ কাজে বাধা দেওয়া। কথায় কথায় বিতর্ক না করা, নিজেকে বড় না ভাবা, বড়াই প্রকাশ না করা, তার দুঃখে দুঃখী হওয়া, তার সহিত সদ্ব্যবহার করা, সর্বদা হিতসাধনের চেষ্টা করা, তার সপক্ষে (ন্যায্যতার সাথে) সহায়তা ও প্রতিরক্ষা করা, ইল্ম ও উপহার দিয়ে সাহায্য করা, কোন দোষ দেখলে গোপনে উপদেশ দেওয়া, তার জন্য দুআ করা, প্রেম ও বন্ধুত্বকে চিরন্তন করা, বন্ধুত্বে স্বার্থ না রাখা, তার বন্ধুত্বে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য রাখা, কোন কঠিন কাজের ভার বা দায়িত্ব না দেওয়া ইত্যাদি।

সেই বন্ধু উত্তম, যে কাছে এলেও যেমন একাকী থাকা যায় ঠিক তেমনিই তার সামনেও থাকা যায়। যার উপস্থিতিতে কোন কুণ্ঠা ও শঙ্কা নেই। অলসের বন্ধুত্ব গ্রহণ করলে নিজেকে অলস করার ভয় থাকে, তাই তার থেকে দূরে থাকাই উত্তম।

বন্ধুর মধ্যে যে সবগুণই বর্তমান থাকবে তা অসম্ভব। তবুও যার অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গলের পরিমাণ অধিক বেশী সেই বন্ধু হলেও যথেষ্ট।

নবী ﷺ বলেন, “অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত, যেমন এক কামার; যার নিকট বসলে দুর্গন্ধ ও ধুঁয়া লাগে এবং আগুনের ফিনিক দ্বারা কাপড় পুড়ে থাকে। আর সৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত, যেমন কোন আতরওয়ালা; যার নিকট বসলে সুগন্ধ পাওয়া যায়। সে আতর উপহার দেয় অথবা তা ক্রয় করা যায়।” (আবু দাউদ)

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ইলম্ নির্বাচন

📄 ইলম্ নির্বাচন


তিনি আরো বলেন, “মুমিন ছাড়া আর কারো সাথী হয়ো না। আর তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ না খায়।” (আবু দাউদ)

আর মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও। (সূরা তাওবাহ ১১৯)

নিয়ত শুদ্ধ করার পর তালেবে ইলমের উচিত, অধিক প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে তলব আরম্ভ করা; শরীয়তের ইল্ম, আরবী ও তার সহায়ক ইল্ম শিক্ষা করা। শুরুতে আরবী আদবের উপর জোর দেওয়া। এই পদ্ধতির বিশদ বিবরণ ও পাঠ্য-নির্ঘন্ট বিদিত ও প্রচলিত; যা কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। তবে এমন নিকটবর্তী পথে চলা উচিত, যে পথ যথার্থ ইলমী গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়। এমন বই-পুস্তক নির্বাচিত করা এবং তার অধ্যয়নে অভিনিবিষ্ট হওয়া উচিত, যা বিষয়গত দিক থেকে সবচেয়ে উত্তম, স্পষ্টতর বোধগম্য এবং অধিক উপকারী।

তালেবে ইল্ম তা যথাসাধ্য হিফ্য করায় প্রয়াসী হবে অথবা বারংবার তা নিয়ে পুনরোনুশীলন করবে যাতে কিতাবের বিষয়বস্তু যথার্থভাবে উপলব্ধ ও স্মৃতিস্থ হয়ে যায়।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'ইল্ম (শিক্ষা ও জ্ঞান) এর মর্যাদা মা'লুম (শিক্ষণীয় ও জ্ঞাতব্য) বিষয়বস্তুর মর্যাদার অনুসারী। যেহেতু তার যুক্তি-প্রমাণ ও দলীলের উপর আত্মা আস্থাবان হয়। তা জানার প্রয়োজন অতি বেশী হয় এবং তদ্দ্বারা সর্বাধিক লাভবানও হওয়া যায়। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সর্বশ্রেষ্ঠ, বৃহৎ ও মহান জ্ঞাতব্য-বিষয় হল আল্লাহ; যিনি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই, যিনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর নিয়ন্তা। যিনি রাজা, সত্য ও ব্যক্ত, সকল পূর্ণতাগুণে তিনি গুণান্বিত, প্রত্যেক ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা হতে তিনি পবিত্র, তাঁর পূর্ণতা-গুণে প্রত্যেক দৃষ্টান্ত ও সাদৃশ্য হতে তিনি নিরঞ্জন। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁর নামাবলী, গুণগ্রাম এবং কর্মসমূহের ইল্মই সকল ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রকৃষ্ট ইল্ম। এই ইল্মের তুলনায় অন্যান্য ইল্ম (অদ্বীনী শিক্ষা) এর মান যেমন এর জ্ঞাতব্য বিষয়' (আল্লাহর) তুলনায় অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয়ের মান। যেমন তাঁর ইল্ম সমস্ত ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। তেমনি এই ইল্ম অন্যান্য সকল ইলমের মূল। যেমন সারা সৃষ্টির অস্তিত্ব তাঁরই অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী এবং তিনিই সকল বস্তুর প্রভু, প্রতিপালক, মালিক ও উদ্ভাবক।-----

সুতরাং এই ইল্মই বান্দার সৌভাগ্য, পূর্ণতা ও তার ইহ-পরকালের মঙ্গলের মৌলিক ইল্ম। যা না জানা তার আত্মা এবং তার কল্যাণ, পূর্ণতা, শুদ্ধি ও নিষ্কৃতির পথ না জানা; যা বান্দার দুর্ভাগ্যের মূল।

পক্ষান্তরে বান্দার পক্ষে তার সৃজনকর্তা ও স্রষ্টার প্রেম, তাঁর সর্বদা স্মরণ এবং তার সন্তষ্টিলাভের নিরন্তর প্রচেষ্টা অপেক্ষা তার হৃদয় ও জীবনের জন্য অন্য কোন জিনিসই অধিক উত্তম, সুস্বাদু, ও সুললিত নেই।

বান্দার জন্য এটাই তো নৈপুণ্য ও পরিপূর্ণতা। যা ব্যতীত সে 'কামেল' হতেই পারে না। এর জন্যই তো সৃষ্টিজগৎ রচিত হয়েছে, আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বেহেশ্ ও দোযখ সৃষ্টি হয়েছে, রসূল ও আম্বিয়া প্রেরিত হয়েছেন, ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, শরীয়তের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে, কা'বা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আল্লাহর যিক্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মানুষের উপর ঐ গৃহের হজ্জ ফরয করা হয়েছে; যা তাঁর প্রেম ও সন্তুষ্টি বিধানেরই অঙ্গবিশেষ।

এ জন্যই তো জিহাদের আদেশ এসেছে, যে তা অস্বীকার করেছে এবং অন্য কিছুকে তার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে তার শিরশ্ছেদ করা হয়েছে এবং পরকালে তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনাময় বাসস্থান।

এই বৃহৎ বিষয়ের উপরেই দ্বীনের বুনিয়াদ রাখা হয়েছে ও কেবলা নির্ধারিত হয়েছে। যে বিষয় সৃষ্টিবৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু এবং দ্বীন ও কেবলার প্রাণকেন্দ্র। আর ইল্মের সিংহদ্বার ব্যতীত এর প্রতি দ্বিতীয় কোন প্রবেশপথ নেই। যেহেতু কোন বস্তুকে ভালোবাসা তাকে অনুভব করার পরবর্তী পর্যায়। যে ব্যক্তি সবার চেয়ে অধিক আল্লাহকে চেনে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক আল্লাহর প্রেমিক। কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রকৃতভাবে জানবে ও চিনবে সে ব্যক্তি তাঁকে ভালোবাসবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীকে প্রকৃতভাবে চিনবে সে তাতে অনাসক্ত হবে। সুতরাং ইল্মই এই বৃহৎ দরজা উন্মুক্ত করে যা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্দেশের রহস্য।' (মিফতাহু দা-রিস সাআদাহ ১/৮-৬, আদাবু তালেবিল ইল্ম ১২৩-১২৬পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত যে, সে এমন ইল্ম নির্বাচন করবে যা ইহ-পরকালের জন্য তার অধিক প্রয়োজন ও উপকারী। সুতরাং আল্লাহ, আয্যা অজাল তাঁর নাম ও গুণাবলী এবং কর্মাবলীর ইল্ম সর্বাগ্রে অর্জন করবে। তা আয়ত্ত হলে এই উম্মাহর অগ্রগণ্য সলফের সমঝে কিতাব ও সুন্নাহর ইল্ম অর্জন করতে মনোযোগী হবে। যাতে রসূল ﷺ কর্তৃক প্রদত্ত ও বর্ণিত শিক্ষা গ্রহণ তার জন্য বিশুদ্ধ, সঠিক ও সহজ হয়ে যাবে।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) আরো বলেন, 'রসূল ﷺ হতে ইল্ম গ্রহণ করা দুই প্রকার; কোন মাধ্যমের সাহায্য না নিয়ে সরাসরি গ্রহণ এবং মাধ্যমের সাহায্যে গ্রহণ। সরাসরি ইল্ম গ্রহণ তো তাঁদের ভাগ্যে ছিল যাঁরা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন এবং অভীষ্ট বস্তু অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে উম্মতের কারো আর সে আশা নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে তাঁদের সরল পথের অনুসারী, তাঁদের নিখুঁত নীতির অনুবর্তী। আর সেই ব্যক্তি পশ্চাদ্গামী যে তাঁদের পথ হতে ডানে-বামে সরে যায়। এই ব্যক্তিই পথচ্যুত এবং ধ্বংস ও ভ্রষ্টতার মরুভূমিতে নিরুদ্দেশ।

কোন্ এমন গুণ বা উত্তম কর্ম আছে যার গুণাধার বা কর্তা তাঁরা ছিলেন না? এমন কোন্ কল্যাণ ও সত্যের পরিকল্পনা আছে যার তাঁরা অধিকারী ছিলেন না? আল্লাহর শপথ! তাঁরা সঞ্জীবনী নির্ঝর হতে সুমিষ্ট ও নির্মল পানি সরাসরি পান করেছেন। ইসলামের ভিত্তিসমূহকে এমন সুদৃঢ় করে গেছেন যাতে আর কারোর জন্য কোন দ্বিরুক্তির সুযোগ নেই। কুরআন ও ঈমান দ্বারা ইনসাফ করে মানুষের চিত্তজয় করে গেছেন। তরবারি ও বর্শা দ্বারা জিহাদ করে বহু দেশ জয় করে গেছেন। অতঃপর তাঁরা তাঁদের তাবেঈন (অনুসারীবর্গ) পর্যন্ত (সেই ইল্ম ও আমানত) বিশুদ্ধ ও নির্মল অবস্থায় (আমানতের সাথে) পৌঁছে দিয়েছেন; যা তাঁরা নবুয়তের আলোকবর্তিকার তাক হতে গ্রহণ করেছিলেন। যাতে তাঁদের সনদ (বর্ণনাসূত্র) ছিল, নবী ﷺ হতে, তিনি জিবরীল (আঃ) হতে এবং তিনি রব্বুল আলামীন হতে; যা বিশুদ্ধ সুউচ্চ সনদ ছিল। তাঁরা বিদায়ের পূর্বে বলে যান, 'এটা আমাদের প্রতি নবী ﷺ এর প্রতিশ্রুতি যদ্বারা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করলাম। আর এটা আমাদের প্রতিপালকের অসিয়ত ও অধ্যাদেশ এবং আমাদের উপর তাঁর ফরয (অবশ্যকর্তব্য); যা তোমাদের জন্যও অধ্যাদেশ ও ফরয।'

সুতরাং একনিষ্ঠ অনুসারী (তাবেঈন)গণ তাঁদের সুদৃঢ় নিখুঁত নীতির উপর পরিচালিত হলেন। সরল পথের উপর তাঁদের পদাঙ্কানুসরণ করলেন। অতঃপর 'তাঁদের 'অনুবর্তী (তাবে-তাবেঈন)গণ এই সত্যপথেরই' অনুগামী হলেন। সত্য কথা এবং প্রশংসিত ন্যায্য পথের দিশা পেলেন। তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তীগণের তুলনায় সেইরূপই ছিলেন যেরূপ অনুপম সত্যবাদী ঘোষণা করেছেন, “এদের বৃহৎ দলটি হবে অগ্রগামীদের মধ্য হতে; আর এদের কিছু লোক পশ্চাদ্গামীদের মধ্যেও থাকবে।” (সূরা ওয়াকিয়াহ ১৩-১৪আয়াত)

অতঃপর চতুর্থ শতাব্দীর ইমামগণের আবির্ভাব হল। যে শতাব্দীও এক বর্ণনামতে শ্রেষ্ঠ শতাব্দী; যেমন আবুসাঈদ, ইবনে মসউদ, আবু হুরাইরা, আয়েশা এবং ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) এর হাদীস হতে শুদ্ধ প্রমাণিত। তাঁরাও তাঁদের পূর্ববর্তীগণের পদরেখা দেখে উক্ত পথেই পরিচালিত হলেন। তাঁদের জ্ঞানালোকের তাক হতে সেই জ্ঞান আহরণ করলেন। যাঁদের অন্তর ও বক্ষ আল্লাহর দ্বীনের উপর কারো রায়, অন্ধানুকরণ অথবা কিয়াসকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হতে বহু ঊর্ধ্বে। যার ফলে তাদের সুপ্রশংসার পতাকা বিশ্বজাহানে উড্ডীন হয়েছে। আর আল্লাহ পাক তাঁদের জিহ্বায় সত্যবাদিতা দান করেছিলেন।

অতঃপর তাঁদের পদাঙ্কানুসরণ করে তাঁদের অনুগামীদের অগগ্রামী দল পরিচালিত হলেন। তাঁদের দলভুক্ত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তিবর্গ তাঁদেরই নীতির উপর চলমান হলেন। কোনও ব্যক্তি বিশেষের অন্যায় পক্ষপাতিত্ব হতে দূরে থেকে, দলীল ও প্রমাণের সহিত থেমে, হক ও ন্যায়ের সাথে চলতেন; যেদিকে তার বাহন চলত। সঠিকের সাথে কুচ করতেন; যেখানে তার শিবির কুচ করত। দলীল যখন তার যাদুক্রিয়ার সহিত তাঁদের নিকট স্পষ্ট হত তখন তাঁরা একাকী ও দলেদলে সেদিকেই উড়ে যেতেন। রসূল ﷺ (শুদ্ধ হাদীস) যখন তাঁদেরকে কোন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতেন তখন বিনা কোন কৈফিয়তে তাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতেন। তাঁদের হৃদয় ও বক্ষে (কিতাব ও সুন্নাহর) স্পষ্ট উক্তি এত মহান ও সম্মানিত ছিল যে, তার উপর তাঁরা আর কারো কথাকে প্রাধান্য দিতেন না, অথবা আর কারো রায় বা কিয়াসকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন না।' (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন ১/৫)

মোটকথা তালেবে ইলমের উচিত, কুরআন ও সুন্নাহর ইল্মসমূহের প্রতি তার সকল সামর্থ্য, মনোযোগ ও হিম্মতকে ব্যয় করা। যেহেতু এই দুয়ের ইল্মই প্রকৃত ও সত্য ইল্ম এবং উভয় ব্যতীত অন্য কিছুকে না জানা এমন মূর্খতা যাতে কোন (পারলৌকিক) ক্ষতি নেই।

ইলমের খনি ও তার প্রধান হল, আল্লাহ আয্যা অজাল্লার কিতাব এবং দ্বিতীয় ওহী 'রসূল ﷺ এর সুন্নাহ।' সুতয়াৎ 'এই' দুয়ের উপর যত্নবান হওয়া 'তালেবে ইলমেয় একান্ত কর্তব্য।

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ওস্তায নির্বাচন

📄 ওস্তায নির্বাচন


এই দুয়ের পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে আনুষঙ্গিক ও সহায়ক অন্যান্য ইল্ম শিক্ষা করা।

আসমায়ী বলেন, 'যে তালেবে ইল্ম ঠিকমত নহু (আরবী ব্যাকরণ) না শিখে, তার উপর আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয় যে, (হাদীস পড়ার সময়) আল্লাহর নবী ﷺ এর এই কথায় সে শামিল হয়ে যাবে, “যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যা বলে সে নিজের ঠিকানা ও বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৯/১৭৮)

আব্বাস বিন মুগীরাহ বলেন, আব্দুল আযীয দারাঅর্দী কিছু লোকসহ আমার পিতার নিকট এলেন একটি কিতাব পড়ে শুনাতে। দারাঅর্দী তাদের সকলের জন্য পড়তে লাগলেন। কিন্তু তাঁর ভাষা খুব অশুদ্ধ ছিল। পড়তে পড়তে মারাত্মক-মারাত্মক ভুল পড়ছিলেন তিনি। তখন আমার পিতা তাঁকে বললেন, 'খুব হয়েছে দারাঅর্দী! এসবে (ইলমে) ধ্যান দেওয়ার পূর্বে তোমার জন্য অধিক প্রয়োজন ছিল নিজ ভাষা শুদ্ধ করা।' (ঐ৮/৩৬৮)

তদনুরূপ তালেবে ইল্মের উচিত, তার মাতৃভাষাতেও দক্ষতা লাভ করা। নচেৎ অমার্জিত ও অশুদ্ধ ভাষায় দাওয়াতি কাজ প্রতিহত হতে পারে। মানতেক ফালসাফায় অধিক মনোযোগ না দিয়ে যুগোপযোগী সাধারণ জ্ঞান (বিজ্ঞান, ভুগোল, ইংরাজী, অংক প্রভৃতি) শিক্ষার প্রবণতা রাখবে। সর্ব বিষয়ে পারদর্শিতা যদিও সম্ভব নয় তবুও আসল (কিতাব ও সুন্নাহর) ইল্ম যথাযথভাবে শিক্ষা করে সাধারণ জ্ঞান কিছু কিছু করে শিখতে পারলে দাওয়াতে অবশ্যই সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। যেমন বিদেশী ভাষা শিখলে বিদেশে দাওয়াত-কর্মে অংশ গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করবে।

অনুরূপভাবে তালেবে ইলমের কর্তব্য, তার উপযুক্ত শিক্ষক ও ওস্তায নির্বাচনে ভাবনা-চিন্তা করা। অতএব সেই ওস্তাযের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করবে যিনি হবেন অধিক জ্ঞানী, অভিজ্ঞ, পরহেযগার এবং বয়স্ক। যেমন আবু হানীফা (রঃ) চিন্তা-ভাবনা করার পর হাম্মাদ বিন সুলাইমানকে ওস্তাযরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যাঁর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'আমি তাঁকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ধৈর্যশীল ও সহ্যশীল শায়খরূপে পেয়েছিলাম। তাঁর নিকট দৃঢ়ভাবে স্থায়ী ছিলাম তাই আমি উদ্গত হয়েছি।' (তা'লীমুল মুতাআল্লিম ১২পৃঃ)

ইবনে জামাআহ বলেন, 'তালেবে ইল্মকে সর্বাগ্রে ভাবনা-চিন্তা করে এবং আল্লাহর নিকট ইস্তেখারা করে দেখা উচিত যে, সে কার নিকট হতে ইল্ম গ্রহণ করবে এবং সদাচরণ, আদব ও শিষ্টতা কার নিকট হতে শিক্ষা করবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে তাকে এমন ওস্তায গ্রহণ করা উচিত, যাঁর যোগ্যতা পরিপূর্ণ হয়েছে, স্নেহ-বাৎসল্য বাস্তবায়িত হয়েছে, শালীনতা অভিব্যক্ত হয়েছে, নৈতিক পবিত্রতা সুপরিচিত হয়েছে এবং সংযমশীলতা প্রসিদ্ধ হয়েছে। যিনি শিক্ষাদানে উত্তম শিক্ষক ও পাঠ্যবিষয় বুঝতে সুদক্ষ। তালেবে ইল্ম তাঁর নিকট তার ইল্ম বৃদ্ধির আশা ও আগ্রহ যেন না রাখে যাঁর দ্বীন, সংযমশীলতা, পরহেযগারী এবং সচ্চরিত্রতায় কমি রয়েছে।'

ইবনে সীরীন বলেন, 'এই ইল্ম তো দ্বীন। অতএব তোমরা কার নিকট হতে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ তা লক্ষ্য করো।' (মুসলিম, মুকাদ্দামাহ)

কেবল প্রসিদ্ধ ওলামাদের নিকট হতেই শিক্ষা গ্রহণ সীমাবদ্ধ হওয়া এবং অপ্রসিদ্ধ যোগ্য ওলামাদের নিকট শিক্ষা ত্যাগ করা হতে সাবধান হওয়া উচিত। যেহেতু গাযালী প্রভৃতি ওলামাগণ এরূপ করাকে ইলমে অহংকার প্রকাশ করার মধ্যে গণ্য করছেন এবং তা একপ্রকার আহাম্মকী বলে আখ্যায়ন করেছেন। কারণ, হিকমত ও জ্ঞান মুমিনের হারিয়ে যাওয়া বস্তু, যেখানেই পায় সেখান হতেই সে তা কুড়িয়ে নেয়। যেখানেই তা লাভ করার সুযোগ পায় সেখানেই গনীমত জেনে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। যেই তার অনুগ্রহ করতে চায় তারই নিকট হতে তা সাদরে গ্রহণ করে। যেহেতু সে তো মূর্খতা থেকে পলায়ন করতে চায়; যেমন বাঘ হতে পলায়ন করা হয়। আর বাঘের কবল হতে যে মুক্তির পথ দেখায় পলায়নকারী তাকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করে না; তাতে সে যেই হোক না কেন।

সুতরাং এই অপ্রসিদ্ধ আলেমের নিকট যদি বর্কতের (তাকওয়া ও ইলমে প্রাচুর্যের) আশা থাকে তাহলে তাঁর দ্বারা উপকার ব্যাপক হয়। তাঁর তরফ থেকে প্রশিক্ষণ পরিপক্ক হয়। আর যদি পুর্বগামী ও পরগামী ওলামাদের অবস্থা সমীক্ষা করে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ উপকৃত তিনিই হয়েছেন এবং সফলতা তিনিই লাভ করেছেন যাঁর শায়খ বা ওস্তায খুব পরহেযগার ছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদের জন্য তাঁর বাৎসল্য ও হিতাকাংখায় তিনি উজ্জ্বল আদর্শ ছিলেন। অনুরূপভাবে যদি লিখিত বই-পুস্তকের উপর সমীক্ষা চালানো যায় তাহলে দেখা যাবে যে অধিক মুত্তাকী ও বিষয়-বিরাগী আলেমের লিখিত গ্রন্থই অধিক উপকারী এবং সেই গ্রন্থ অধ্যয়নেই অধিক সাফল্য বর্তমান।

তালেবে ইলমের আরো চেষ্টা করা উচিত, যাতে তার ওস্তায শরীয়তের ইমে পরিপূর্ণ অবহিত হন। সমসাময়িক অন্যান্য আস্থাভাজন ওলামাদের সহিত যেন তাঁর অধিকাধিক যোগাযোগ, ইল্মী-আলোচনা এবং দীর্ঘ বৈঠক হয়। তিনি যেন সরাসরি কিতাব থেকে গৃহীত ইলমের আলেম না হন; যিনি সুদক্ষ ওলামাদের সাহচর্যে সুপরিচিত নন।

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি কিতাব সমূহের উদর হতেই ফিক্‌হ গ্রহণ করবে সে আহকাম বিনষ্ট করে ফেলবে।' আর অনেকে বলেছেন যে, 'কিতাব বা কাগজকে ওস্তায করা খুব বড় আপদ। অর্থাৎ যারা কেবল কিতাব থেকেই ইল্ম শিখতে চায় তারা ওলামাদের বালাই।' (তাযকিরাতুস সামে’ ৮৫পৃঃ)

ইব্রাহীম বলেন, 'ওঁরা যখন কারো নিকট ইল্ম গ্রহণ করতে আসতেন তখন তাঁর বেশভূষা, নামায এবং অন্যান্য অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করতেন। অতঃপর তাঁর নিকট ইলম গ্রহণ করতেন।'

সওরী বলেন, 'যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর নিকট কিছু শোনে আল্লাহ সেই শোনাতে তাকে উপকৃত করবেন না। আর যে ব্যক্তি তার সহিত মুসাফাহা করল সে ইসলামকে ধ্বংস করল।'

মালেক বিন আনাস বলেন, 'চার ব্যক্তি হতে ইলম গ্রহণ করা হবে না; বাকী অন্যান্য হতে গ্রহণ করা হবে; নির্বুদ্ধিতা প্রকাশকারী নির্বোধের নিকট হতে ইলম গ্রহণ করোনা; যদিও সে সবচেয়ে অধিক বর্ণনাকারী হয়। মিথ্যুকের নিকট থেকে ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষের সহিত ব্যবহারে কথাবার্তায় মিথ্যা বলে থাকে -যখন তাকে পরীক্ষা করে দেখা যাবে যে সে সত্যই মিথ্যা বলে; যদিও সে রসূল ﷺ এর উপর মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত নয়। কোন প্রবৃত্তি পূজারীর নিকটেও ইলম গ্রহণ করো না; যে মানুষকে তার প্রবৃত্তি (বিদআত) এর প্রতি আহ্বান করে। আর সেই শায়খ হতে ইল্ম গ্রহণ করো না যার অবদান ও ইবাদত আছে, কিন্তু কি বয়ান করে তা সে নিজেই জানে না। (আল-জামে' লিআখলাকির রাবী ১/১৩৯)

শত সাবধান সেই আলেম, মুদারিস ও ওস্তায হতে যার হৃদয় মরিচায় কালো হয়ে আছে। ফলে তার চিন্তাশক্তি, বোধ ও উপলব্ধি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার কারণে সে হক ও ন্যায় গ্রহণ করে না এবং বাতিল ও অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করে না। যার মূলে রয়েছে ঔদাস্য ও প্রবৃত্তি পূজা; যা অন্তজ্যোতিকে নিষ্প্রভ করে এবং তার হৃদয়ের দৃষ্টি-শক্তিকে অন্ধ করে দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি নিজেকে ওদেরই সংসর্গে রাখবে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় নিজেদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে ওদের থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। আর যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে উদাসীন করে দিয়েছি, যে তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না।” (সূরা কাহফ ২৮ আয়াত)

সুতরাং কোন তালেবে ইল্ম বা কোনও সাধারণ ব্যক্তি যখন কারো অনুসরণ করতে চাইবে তখন তাকে লক্ষ্য করা উচিত যে, সে অনুসরণীয় ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণকারী অথবা তাঁর সারণে উদাসীনদের মধ্যে গণ্য? তার জীবনে প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশীর আধিপত্য বর্তমান অথবা ওহীর? যদি তার জীবনে খেয়ালখুশী ও মানসতাই আধিপত্য বিস্তার করে থাকে এবং সে উদাসীন হয় তবে তার কর্ম সীমালঙ্ঘিত ও বিনষ্ট। যে এমন গুণের গুণী তার অনুসরণ ও আনুগত্য করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অতএব ওস্তায যদি এরূপই হয়ে থাকেন তবে তাঁর থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত এবং তাঁকে নিজের অনুসরণীয় ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা ও স্থিরীকৃত না করাই কর্তব্য। পক্ষান্তরে যদি তাঁকে আল্লাহর স্মরণ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং সৎকর্মে জাগ্রত, তৎপর ও সীমাবদ্ধ পায়, আর তাঁর কর্তব্যে দূরদর্শী ও পারদর্শী পায় তাহলে তাঁরই পিছু ধরা উচিত। যেহেতু মৃত ও জীবিতের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে আল্লাহর যিক্র। যে আল্লাহকে স্মরণ করে সে জীবিত এবং যে করে না সে মৃত। আর মৃতের নিকট কি কিছু শিখা যায়? (আল ওয়াবিলুস স্বইয়্যেব ৩৭ পৃঃ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00