📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টতা

📄 পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টতা


তালেবে ইল্মের উপর ওয়াজেব বিদআত ও কুসংস্কার হতে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং সর্বাবস্থায় রসূল ﷺ এর আদর্শ-অলঙ্কারে নিজেকে অলঙ্কৃত করা। অযু, গোসল তথা দেহ, লেবাস এবং বাসস্থানের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি যথাসাধ্য খেয়াল ও চেষ্টা রাখা।

আব্দুল মালেক মায়মুনী বলেন, 'আমি জানি না যে, আমি আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) অপেক্ষা অধিকতর পোশাকে পরিচ্ছন্ন, গোঁপ, চুল ও অতিরিক্ত লোম প্রভৃতি পরিষ্কার রাখতে নিজের প্রতি যত্নবান এবং পরিধানে পবিত্র ও শুভ্র আর অন্য কাউকে দেখেছি।'

যেহেতু ইমাম আহমদ (রঃ) সুন্নাহর সাথে চলতেন এবং সুন্নাহর সাথে থামতেন। তিনি বলেন, 'আমি এমন কোন হাদীস লিখিনি যার উপর আমি আমল করিনি। এমন কি আমার নিকট এক হাদীস এল যে, “নবী ﷺ (দূষিত রক্ত বের করার জন্য) শৃঙ্গ লাগালেন এবং (শৃঙ্গ-ওয়ালা) আবূ তাইবাকে এক দীনার দিলেন।” তখন আমিও শুঙ্গ লাগিয়ে শুঙ্গ-ওয়ালাকে এক দীনার দিলাম।

পরিছন্নতার এ উদ্দেশ্য নয় যে, তাতে অতিরঞ্জন, বিলাসিতা ও গর্ব করা হবে। বরং উদ্দেশ্য মধ্যপন্থা। রসূল ﷺ বলেন, “পরিচ্ছদে বিনতি ঈমানের এক অংশ।” (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ ৩৪১ নং)

আবু আব্দুল্লাহ আলবুশাঞ্জী বলেন, 'উক্ত হাদীসের অর্থ, পরিধান ও শয্যায় বিলাসহীন (মামুলী ধরনের) বস্ত্র ব্যবহার ঈমানের মধ্যে গণ্য। আর তা হচ্ছে লেবাস ও বিছানায় বিনয় প্রকাশ করা; অর্থাৎ তাতে অধিক মূল্যবান এমন বস্ত্র ব্যবহার না করা যা সংসার-অনুরাগী মানুষদের লেবাস।' (আল জামে' লিআখলাকির রাবী অসসামে' ১/১৫৪)

খতীব (রঃ) বলেন, 'ক্রীড়া-কৌতুক, রঙ-তামাশা, জনসমক্ষে নির্বুদ্ধিতা, অট্টহাসি, হা-হা ধ্বনি, অদ্ভুত ও আনখা কথা এবং অধিকরূপে ও সর্বদা মজাক-ঠাট্টা ও উপহাস দ্বারা প্রগল্ভতা প্রকাশ করে ধৃষ্ট হওয়া থেকে দূরে থাকা ওয়াজেব। স্বল্প ও বিরল হাসিই হাসা বৈধ যা আদবের সীমা এবং ইলমের আদর্শ-বহির্ভূত না হয়। পক্ষান্তরে নিরবচ্ছিন্ন, অশ্লীল, নির্বুদ্ধিতাব্যঞ্জক, ক্রোধ সঞ্চারক এবং বিবাদ-বিপত্তি আনয়নকারী হাসি-তামাশা নিন্দিত। অতিশয় হাসি-মজাক মানুষের মর্যাদা হ্রাস করে এবং চক্ষুলজ্জা ও শালীনতা দূর করে দেয়।'

ইমাম মালেক (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইল্ম অন্বেষণ করে তার মধ্যে মর্যাদাশালী ব্যক্তিত্ব, গাম্ভির্য এবং আল্লাহভীতি থাকা আবশ্যক। আর সে যেন বিগত ওলামাদের আদর্শের অনুসারী হয়।'

সাঈদ বিন আমের বলেন, 'আমরা হিশাম দাস্তাওয়ায়ীর নিকট ছিলাম। এমন সময় আমাদের মধ্যে একজন (কোন কথায়) হেসে উঠল। হিশাম তাকে বললেন, 'হাসছ, অথচ তুমি হাদীস অনুসন্ধান করছ?!'

আব্দুর রহমান বিন মাহদী বলেন, 'হিশাম দাস্তাওয়ায়ীর নিকট এক ব্যক্তি হাসলে তিনি তাকে বললেন, 'হে যুবক! তুমি ইল্ম অন্বেষণ করছ আর হাসছ?!' লোকটি বলল, 'আল্লাহই কি হাসান না ও কাঁদান না?' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি কাঁদ।' (আলজামে' লিআখলাকির রাবী ১/১৫৬)

মোটকথা, সুন্নাহর অনুসরণ, সুন্দর বেশভূষা এবং দেহ ও পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদের পরিচ্ছন্নতা দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন সকল মুসলিমের জন্য বাঞ্ছিত। কিন্তু তা তালেবে ইলমের নিকট হতে অধিক তাকীদরূপে প্রার্থিত। যেহেতু ইল্ম তাকে শালীনতা ও মর্যাদাবোধের প্রতি দিগ্গ্‌দর্শন করে।

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “সে ব্যক্তি বেহেশ্ প্রবেশ করবে না যে ব্যক্তির হৃদয়ে অণুপরিমাণও অহংকার থাকবে।” এক ব্যক্তি বলল, '(হে আল্লাহর রসূল!) মানুষ তো এটা পছন্দ করে যে, তার পরিধেয় বস্ত্র এবং জুতা সুন্দর হোক।' তিনি বললেন, “আল্লাহ তো সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার তো ন্যায়কে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করার নাম।” (মুসলিম)

রসূলুল্লাহ ﷺ সুগন্ধি ভালোবাসতেন এবং যত্ন করে তা নির্দিষ্ট পাত্রে জমা রাখতেন। (মুখতাসারু শামায়িলিত্ তিরমিযী, আলবানী ১১৭ পৃঃ) দুর্গন্ধযুক্ত বস্তুকে অতিশয় ঘৃণা করতেন। কাঁচা পিঁয়াজ, রসূন ও কুরাসের উগ্র গন্ধকে নিতান্ত মন্দবাসতেন। যার জন্য যারা এসব ভক্ষণ করে তাদের মসজিদ প্রবেশ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। (মুসলিম)

তাই তালেবে ইল্মকেও এমন দুর্গন্ধময় বস্তু ব্যবহার না করা উচিত, যাতে অপর লোকে কষ্ট পায় এবং কাঁচা পিঁয়াজ, রসূন অপেক্ষাও নিকৃষ্টতর দুর্গন্ধযুক্ত ও ঘৃণিত বস্তু যেমন, বিড়ি, সিগারেট, তামাক, খইনি, গুল, গোরাকু, জর্দা প্রভৃতি থেকেও বহু সুদূরে থাকা ওয়াজেব। যেহেতু এগুলি তো এমনিতেই হারাম, তাহলে তালেবে ইল্মের ক্ষেত্রে কি তা সহজে অনুমেয়।

যেমন, নবী ﷺ ৪০ দিনের পূর্বে-পূর্বেই গোঁফ ছাঁটতে, নখ কাটতে, বগল ও নাভির নিম্নাংশের লোম ফেলতে নির্দেশ দিয়েছেন, দাঁতন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন ইত্যাদি। সুতরাং তালেবে ইল্মকে সেই সব সুন্নাহর অনুসরণ করে বাহ্যিক পরিছন্নতা অর্জন করা আবশ্যক। যেহেতু তারাই নবুয়তের ইল্ম-সন্ধানী। অতএব তাদেরকেই নবী ﷺ এর সুন্নাহর অধিক অনুবর্তী হওয়া উচিত।

পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা মানুষকে সজীব, সতেজ ও তরোতাজা করে এবং হৃদয়-মনে এনে দেয় আনন্দ, উল্লাস ও স্ফুর্তির আমেজ। সুতরাং নিয়মিতভাবে নিজের বাড়িতে পড়ার কক্ষ, খাবার রুম, শোবার জায়গা এবং তদনুরূপ স্কুল বা মাদ্রাসাতেও নিজের সকল প্রকার অবস্থানক্ষেত্র, নিজের পরিধেয় কাপড়-চোপড়, দেহ-মন প্রভৃতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা তালেবের কর্তব্য। যেমন নিজের বই-পত্র ভালোভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে ওযু-গোসল করা উচিত। ভোরের তাজা হাওয়া খাওয়ার সাথে একটু শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করার ফলে সারা দিন শরীর ও মনটা স্বচ্ছ, নির্মল ও জড়তাহীন থাকে। ফলে পাঠেও মন বসে ভালো। এইভাবে পরিচ্ছন্নতার সাথে প্রত্যহ একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা ও দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী চললে 'ইলম খুব সহজে রপ্ত হয়।

অনুরূপভাবে তালেবে ইল্মের জন্য আবশ্যক, সর্বপ্রকার নোংরা আচরণ, অশ্লীল ব্যবহার ও গুণ হতে স্বীয় আত্মকে শুদ্ধ ও পবিত্র রাখা। যেহেতু ইল্ম অন্তরের ইবাদত, গুপ্ত নামায এবং বাতেনী নৈকট্য। বাহ্যিক অঙ্গসমূহের কৃত নামায যেরূপ অপবিত্রতা ও নোংরামী থেকে বাহ্যিক দেহকে পবিত্র না করে গ্রহণযোগ্য হয় না, ঠিক তদ্রূপই গুপ্ত ইবাদত এবং ইলম দ্বারা হৃদয়ের আবাদ অসদাচরণ ও দুষ্ট পাপগুণ হতে অভ্যন্তরকে পবিত্র ও পরিষ্কার না করে শুদ্ধ হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنِ نَجَسٌ অর্থাৎ, মুশরিকরা তো অপবিত্র। (সূরা তওবা ২৮- আয়াত) এই বাণী এ বাস্তবের প্রতিই ইঙ্গিত করে যে, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা কেবল বাহ্যিক ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সহিতও সম্পৃক্ত। তাই তো মুশরিকের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র ও পরিষ্কার হতে পারে এবং তার দেহ ধৌত হতে পারে; কিন্তু মূলতঃ সে অপবিত্র। তার অভ্যন্তর নোংরামীতে পরিপূর্ণ। আর অপবিত্রতা তাকে বলা হয় যা থেকে হৃদয় দূরে থাকতে চায় এবং যা হতে বাঁচা হয়। বাহ্যিক অপবিত্রতার চেয়ে আভ্যন্তরিক অপবিত্রতা অধিক মারাত্মক যা ভবিষ্যতে ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী করে। তাই এই অপবিত্রতা থেকে সাবধানতা অধিক যত্ন পাবার যোগ্য।

ইবনে উমর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদা জিবরীল (আঃ) রসূল ﷺ এর নিকট আসার ওয়াদা দিয়ে আসতে বিলম্ব করলেন। শেষ পর্যন্ত রসূল ﷺ এর পক্ষে (এ প্রতীক্ষা) কঠিন হয়ে উঠল। তিনি (গৃহ হতে) বের হয়ে গেলেন। (বাইরে) জিবরীল (আঃ) তাঁর সহিত সাক্ষাৎ করলেন। তিনি (বিলম্ব হওয়ার) অভিযোগ জানালে জিবরীল (আঃ) বললেন, 'আমরা সে ঘরে প্রবেশ করি না যে ঘরে কুকুর বা মূর্তি (ছবি) থাকে।' (বুখারী)

আবু হামেদ গাযালী (রাঃ) বলেন, 'হৃদয় এক গৃহ; যা ফিরিশা ও তাঁদের প্রভাব অবতরণের স্থান এবং তাঁদের বাসস্থান। আর নিকৃষ্ট গুণ যেমন, ক্রোধ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, হিংসা, অহংকার, গর্ব ইত্যাদি ঘেউ-ঘেউকারী কুকুরদল। তাহলে তাতে ফিরিস্তা কেমন করে প্রবেশ করবে যদি তা কুকুরদলে পরিপূর্ণ হয়?' (ইহয়াউ উলুমিদ্ দীন ১/৪৩)

ইবনে জামাআহ বলেন, 'তালেবে ইলমের উচিত, তার হৃদয়কে প্রত্যেক প্রতারণা, নোংরামী, বিদ্বেষ, হিংসা, কুবিশ্বাস এবং কুচরিত্রতা থেকে পবিত্র করা; যাতে করে তা'ই গ্রন্থণ ও হিফয করা, সূক্ষা মর্মার্থ এবং নিগূঢ় তন্ত্রের রহস্য উদ্‌ঘাটন করার জন্য যথাযোগ্য হয়ে উঠে। যেহেতু ইল্ম হল-যেমন কিছু ওলামা বলেন,- 'গুপ্ত নামায, আন্তরিক ইবাদত এবং বাতেনী নৈকট্য।'

ইল্মের জন্য অন্তরকে যদি বিশুদ্ধ করা যায় তবে ইল্ম বৃদ্ধি পায় এবং তার বর্কত প্রকাশিত হয়। যেমন কোন জমিকে যদি চাষের জন্য ঘাস, আগাছা ইত্যাদি থেকে পরিষ্কার করে উপযুক্ত করা হয় তবে তার ফল-ফসল বৃদ্ধিলাভ করে থাকে। রসূল ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, দেহের মধ্যে একটি পিন্ড আছে; যা সংশোধিত হলে সারা দেহ সংশোধিত হয় এবং তা বিকারগ্রস্ত হলে সারা দেহ বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। জেনে রেখো, তা হল হৃৎপিন্ড (বা হৃদয়)। (বুখারী ও মুসলিম)

সাহল বলেন, 'সেই হৃদয়ে (ইলমী) নূর প্রবেশ করা অসম্ভব যে হৃদয়ে এমন বস্তু অবশিষ্ট থাকে যা আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অপছন্দ করেন।' (তাযকিরাতুস সা-মে' ৬৭ পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইল্মের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা একান্ত আবশ্যক। তওবা ও অনুশোচনার সাথে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে পাপ ও অন্যথাচরণ হতে প্রত্যাবর্তন করা নিতান্ত জরুরী। যেহেতু পাপ ও অবাধ্যতায় এমন কুপ্রভাব আছে যাতে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হতে হয় অথবা তার বর্কত উঠে যায়।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'পাপাচরণের নিকৃষ্ট ও নিন্দিত প্রভাব আছে, যা অন্তর ও দেহের পক্ষে ইহ-পরকালে এতই অপকারী যে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তন্মধ্যে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হওয়া অন্যতম। যেহেতু ইল্ম একপ্রকার নূর (জ্যোতি) যা আল্লাহ তাআলা মানুষের হৃদয়ে প্রক্ষেপ করে থাকেন। আর পাপাচরণ ঐ জ্যোতিকে নির্বাপিত করে ফেলে।'

একদা ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালেকের সম্মুখে পড়তে বসলে ইমাম মালেক তাঁর সজাগ বুদ্ধিমত্তা, মেধার ঔজ্জ্বল্য এবং উপলব্ধির পরিপূর্ণতা দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, 'আমি দেখছি যে, আল্লাহ তোমার হৃদয়ে নূর প্রক্ষিপ্ত করেছেন। অতএব তা পাপাচরণের অন্ধকার দ্বারা নিভিয়ে দিও না।'

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,

شكوت إ وكيع سوء حفظي + فأرش - د إ ترك ا ع - اصي

وأخـ ـ بأن الع ـ لم نور + ونور الله لا يهـ ـ دى لع ـ اصي

'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম আল্লাহর তরফ হতে আসা অনুগ্রহ বা) নূর। আর আল্লাহর (অনুগ্রহ বা) নূর কোন পাপিষ্ঠকে দেওয়া হয় না।' (আল জওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (কুঃ ১৩/১১)

তিনি আরো বলেন,

كلا بَل رَانِ عَلَى قُلُوبِهِمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

অর্থাৎ, কক্ষনো না। ওদের কৃতকর্মের ফলেই ওদের হৃদয়ে জং ধরে গেছে। (কুঃ ৮৩/১৪)

ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জালা' হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক খ্রীষ্টান সুবদন কিশোরের প্রতি তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় আবূ আব্দুল্লাহ বালখী আমার নিকট বেয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কেন দাঁড়িয়ে আছ এখানে?' আমি বললাম, 'চাচাজী! আপনি কি ঐ রূপ দেখছেন না? কিভাবে ওকে অগ্নিদগ্ধ করা হবে?' তা শুনে তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধে মেরে বললেন, 'এর প্রতিফল তুমি পাবেই, যদিও কিছু বিলম্বে।' তিনি বলেন, 'আমি তার প্রতিফল ৪০ বছর পর পেলাম; আমাকে কুরআন ভুলিয়ে দেওয়া হল।'

আবু আইয়ান বলেন, আমি আমার ওস্তায আবুবকর দাক্কাকের সহিত ছিলাম। ইতিমধ্যে এক কিশোর পার হয়ে যাচ্ছিল। আমি তার দিকে তাকিয়ে ফেললাম। আমার ওস্তায আমাকে ওর প্রতি তাকিয়ে থাকতে দেখলে তিনি আমাকে বললেন, 'বেটা! এর প্রতিফল তুমি পাবে -যদিও কিছু পরে।' অতঃপর আমি ২০ বছর ধরে লক্ষ্য করেও ঐ প্রতিফল বুঝতে পারলাম না। একদা রাত্রিকালে ঐ কথা চিন্তা করে ঘুমিয়েছি। সকালে জাগ্রত হয়ে দেখি আমাকে কুরআন বিস্মৃত করা হয়েছে। (তালবীসে ইবলীস ৩১০ পৃঃ)

এ তো সুদর্শন কিশোর দেখার প্রতিফল। তাহলে সুবদনা ও সুদর্শনা কিশোরী ও যুবতী দেখলে এবং তাদের সহিত অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করলে তার প্রতিফল কি?

মনের মণিকোঠা যদি বাজে চিন্তা, যৌন ও অশ্লীল কল্পনা এবং কোন অবৈধ নারী-প্রেমের মৃদু পরশ থেকে মুক্ত ও পবিত্র না হয় তাহলে সফলতার আশা নেই। প্রেমের আবেগে পড়ে ধৃৎল হবে জীবনের বহু মূল্যবান সময়; অবাস্তৰ কল্পনাবিহারে নষ্ট হবে সুন্দর ও স্বচ্ছ স্মৃতি ও বুঝশক্তি।

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 বিরহ ও বিরাগ

📄 বিরহ ও বিরাগ


আর কামনার দহন ও কামড়ে নিপীড়িত হবে সুস্বাস্থ্য। ফলে উপর-পড়া ঐ সতীনের ঈর্ষায় ইল্ম যে তালেবের নিকট থেকে 'খোলা তালাক' নিয়ে বিদায় নেবে তা বলাই বাহুল্য।

আবু হামেদ বলেন, যদি তুমি বল যে, 'কত অসৎচরিত্রের তালেবে ইল্ম ইল্ম অর্জন করেছে। (পাক্কা আলেম হয়েছে) তাহলে?' কিন্তু প্রকৃত উপকারী, পরকালে ফলপ্রদ এবং সৌভাগ্য আনয়নকারী ইল্ম থেকে তারা বহু দূরে। যেহেতু এই ইলমের অগ্রভাগে সেই মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হবে যাতে তালেবে ইল্ম পাপাচরণকে সর্বনাশী ও সর্বহারী হলাহল জানবে। অথচ তুমি কি দেখেছ যে, প্রাণহারী গরল জানা সত্ত্বেও কেউ তা ভক্ষণ করছে? তুমি যা ঐ শ্রেণীর আলেমদের নিকট থেকে শুনে থাক তাতো মুখের কথামাত্র যা ওরা কখনো তাদের জিহ্বা দ্বারা শোভন করে প্রকাশ করে থাকে আবার কখনো তাদের অন্তর দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। আর তা ইল্মের কোন অংশই নয়।

ইবনে মাসউদ বলেন, 'অধিক রেওয়ায়েত (বর্ণনা করা)ই ইল্ম নয়। ইল্ম তো এক জ্যোতি যা হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত হয়।' অনেকে বলেন, ইল্ম তো আল্লাহভীতির নাম। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে থাকে।” (সূরা ফাতির ২৮) সম্ভবতঃ তাঁরা ইলমের বিশেষ সুফলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই জন্যই কিছু গবেষক উলামা বলেন, কিছু উলামার এই উক্তি, 'আমরা গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখলাম; কিন্তু ইল্ম আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে হতে অস্বীকার করল' এর অর্থ; ইল্ম আমাদের হৃদয়ে আসতে অসম্মত হল এবং অস্বীকার করল। ফলে তার প্রকৃতত্ব আমাদের নিকট উদ্‌ঘাটিত হল না। আমরা যা অর্জন করলাম তা হলো, শুধু তার বাক্য এবং শব্দাবলী। (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ১/৪৯)

সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত ভিতর-বাহিরকে পরিষ্কার করা। যা কিছু শিখবে তার আদর্শকে নিজের উপর সর্বাগ্রে কার্যকর করা। এতে তার হৃদয়ে ইলমের আলো উদ্ভাসিত হবে; জ্ঞানপুষ্প বিকশিত হবে এবং হিকমত ও প্রজ্ঞার খনিদ্বার উন্মুক্ত হবে। আর তা হল আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ বিতরণ করে থাকেন এবং তিনি মহান অনুগ্রহশীল।

ইলমের পথ এমন এক পথ; যে পথে চলতে ধৈর্য চাই, বিসর্জন চাই, চাই বিভিন্ন অভ্যাস, আচার-আচরণ বর্জন করা, বহু সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং বহু বাধা-বিপত্তি উল্লংঘন করার ক্ষমতা। ইলমের পথ এমন পথ, যে পথে চিরাচরিত প্রথা ও লৌকিকতা চুরমার হয়ে যায়। বাপ-দাদার পালিত আচার অনুষ্ঠানকে সমাধিস্থ করতে হয়। গুপ্ত ও প্রকাশ্য পাপের প্রতিবন্ধকসমূহকে ডিঙিয়ে চলতে হয়। শির্ক, বিদআত ও গোনাহর অবরোধ ভেঙ্গে আল্লাহর নৈকট্যের প্রতি ধাবিত হতে হয়। তওহীদ দ্বারা শির্কের বেড়া ভেঙ্গে, সুন্নাহ দ্বারা বিদআতের বাঁধ ভেঙ্গে এবং শুদ্ধ তওবা দ্বারা গোনাহ ও পাপাচরণের বেষ্টন ভেদ করে অগ্রসর হতে হয়।

সেই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় যা আল্লাহ ও তাঁর রসূল ব্যতীত অন্যের সাথে হৃদয়কে আবিষ্ট করে। পার্থিব সুখ-সম্ভোগ, কামনা-বাসনা, নেতৃত্ব ও গদি-লোভ, মানুষের সহিত গাঢ় সংস্রব প্রভৃতি পশ্চাতে ত্যাগ করে আসতে হয়। তবেই সে পথে চলা সহজ হয়। তবেই পাওয়া যায় প্রিয়তম ইলমের সাক্ষাৎ ও তার মিলন-স্বাদ। সকল প্রিয়তমের বিরহে ব্যথিত হলে, সকল প্রিয় বস্তু বিরাগভাজন হলে তবেই ইলম তার অভিমান ছেড়ে নিজ মিলন দেয়। নচেৎ ঈর্ষার সাথে দূর হতেই সালাম দিয়ে প্রস্থান করে।

ইল্ম-প্রেমী তালেবে ইল্মের নিকট ইল্ম ছাড়া অন্যকিছু প্রিয় নয়। তাইতো প্রিয়র উদ্দেশ্যে সকল কিছুকে উৎসর্গ করে। পার্থিব ভোগ-বিলাস, স্ত্রী-সংসর্গ সুখ, পিতামাতার স্নেহছায়া, সন্তান-সন্ততির মায়া-মমতা ভাই বন্ধুদের সাহচর্য প্রভৃতি অনায়াসে ত্যাগ করে ইলমের প্রেম বহাল রাখে। কারণ, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ তো মাত্র কয়দিনের। সব নিঃশেষ হয়ে যাবে নিশ্বাস বন্ধ হলেই। আজকের যে সাথী কাল তো সে আমার সাথে থেকে কোন উপকার করবে না। অতএব সবকিছু মিছা মায়া মরীচিকা।

ইমাম আহমদ (রঃ) বলেন, 'যখন মরণের উল্লেখ করা হয় তখন পার্থিব সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। দুনিয়া তো কয়দিনের খাওয়া-পরার নাম মাত্র।'

আশআস বিন রবী' বলেন, আমাকে শো'বা বললেন, 'তুমি তোমার ব্যবসা ধরে থাকলে, ফলে তুমিই সফল ও কৃতার্থ হলে। আর আমি হাদীস (শিক্ষা) ধরে থাকলাম, ফলে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।'

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 স্বল্প ভোজন, শয়ন ও কথন

📄 স্বল্প ভোজন, শয়ন ও কথন


পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, তালেবে ইলমের উচিত, হালাল রুজী হতে পরিমিত আহার করা; যে অভ্যাস রসূল ﷺ ও তাঁর অনুসারীদের।

তদনুরূপ পরিমিত নিদ্রা যাওয়া। শরীর ও মস্তিষ্কের ক্ষতি না হলে তালেবে ইল্ম যথাসম্ভব কম ঘুমাবে। দিবা-রাত্রে আট ঘন্টার অধিক এবং ছয় ঘণ্টার কম অবশ্যই নিদ্রিত থাকবে না; নচেৎ ইল্ম যাবে অথবা সুস্থতা। যেমন দ্বিপ্রহরের সময় একটু বিশ্রাম ব্যতীত দিবা-নিদ্রাও এক কামজ দোষ। দ্বিপ্রহরের বিশ্রামের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে প্রিয় নবী ﷺ বলেন, “তোমরা দুপুর বেলায় একটু ঘুমিয়ে বিশ্রাম নাও। কারণ, শয়তানরা ঐ সময় বিশ্রাম নেয় না।” (সহীহুল জামে' ৪৪৩১নং)

হাসান বিন যিয়াদ (রঃ) ফিহ্ন শিক্ষা করতে শুরু করলেন, তখন তাঁর বয়স আশি বছর। (ইন্ন শিক্ষার সময়) তিনি চল্লিশ বছর বিছানায় রাত্রি কাটাননি।

যুবাইর বিন আবী বকর বলেন, 'একদা আমার ভাগ্নী আমার স্ত্রীকে বলল, আমার মামা মামীর পক্ষে কত ভালো মানুষ; মামীর উপর সতীন আনেনি, আর কোন দাসীও ক্রয় করেনি। তা শুনে স্ত্রী তাকে বলল, 'আল্লাহর কসম, এই বইগুলো আমার পক্ষে তিনটে সতীনের চেয়েও অধিক কঠিন!' (আল-জামে' লিআখলাকির রাবী আদাবিস সামে’ ১/৯৯)

মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানী (রঃ) রাত্রিকালে ঘুমাতেন না। নিজের পাশে সর্বদা খাতা-পত্র রেখে নিতেন। যখন একটি বিষয় দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যেতেন তখন তা ছেড়ে অন্য বিষয় দেখতে শুরু করতেন। নিজের কাছে এক গ্লাস পানিও রাখতেন। নিদ্রা এলে পানি দ্বারা দূর করতেন। তিনি বলতেন, 'নিদ্রা উষ্ণতা থেকে সৃষ্টি হয় তাই তা শীতল পানি দ্বারা দূর করা উচিত।' (তা'লীমুল মুতাআল্লিম ২৩ পৃঃ)

রসূল ﷺ বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন শয়তান তার মস্তকের শেষাংশে তিনটা গিরা বেঁধে দেয়। প্রত্যেক গিরার স্থানে বলে, 'তোমার জন্য এখনও লম্বা রাত বাকী, ঘুমাও।' সুতরাং সে যদি উঠে আল্লাহর যিক্র করে তাহলে একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর যদি অযু করে তবে আরও একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর যদি সে নামায পড়ে তাহলে তার অপর গিরাটিও খুলে যায়। তখন সে সস্ফূর্তির সহিত সুস্থ মনে সকালে উঠে। নচেৎ অসুস্থ মনে অলসতার সহিত সকাল করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

যে ব্যক্তি সারা রাত্রি নিদ্রায় কাটায় এবং নামাযের জন্য উঠে না সে ব্যক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শয়তান তার কানে প্রস্রাব করে দেয়।”

আল্লাহ জাল্লা শানুহ মুত্তাকী ও সৎলোকদের প্রশংসা করে বলেন, “তারা রাত্রের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করত এবং রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা যারিয়াত ১৭-১৮- আয়াত)

স্থুলকথা এই যে, অতিনিদ্রা তালেবে ইলমের গুণ নয়। অবকাশ এলে ঘুমিয়ে আশা মিটানো তার স্বভাব নয়। তার গুণ ও স্বভাব তো সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইল্মের আশায় প্রযত্ন ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মুমিন পারলৌকিক কল্যাণ পেয়ে কোনদিন তৃপ্ত হয় না। যত কল্যাণ, যত পুণ্য সে পায় তত তার পাওয়ার আকাংখা আরো বৃদ্ধি হতে থাকে। পরিশেষে সে জান্নাতে গিয়ে শেষবারের মত তৃপ্তিলাভ করবে।

অনুরূপভাবে তালেবে ইল্মের আর এক সদ্‌গুণ হল, অল্প কথা বলা। নবী ﷺ সকল মুসলিমের উদ্দেশ্যেই বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন উত্তম কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরাং গপে বা বখাটে হওয়া কোন মুসলিমের সদ্‌গুণ নয়; যা একজন তালেবে ইল্মের যে হতেই পারে না তা অনুমেয়।

ইবনে আবুল বার বলেন, 'আলেমের ফিতনার মধ্যে এটাও একটি যে, তার নিকট শ্রবণ অপেক্ষা' ধচন প্রিয়তর 'হয়া' এ 'কথা ইয়াযীদ বিন আবী 'হাবীধ হতে বর্ণিতা

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 উচিত সংঘ

📄 উচিত সংঘ


ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,

س - لام ء - لى الـ ـ دنيا إذا يكن ا + صديق صدوق صادق الوعد منصفا

অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

সমাজে মিলেমিশে একত্রে বাস করা মানুষের নৈতিক ও প্রাকৃতিক গুণ। পাড়া-প্রতিবেশীর লোক, ভাই-বন্ধু ইত্যাদির সহিত মিশতে হয়। বন্ধুদের মধ্যে কেউ হয় জানী (প্রাণের), কেউ হয় নানী (খাবার-দাবারের) এবং কেউ হয় জবানী (মুখের) বন্ধু ও সাথী। এই তিন প্রকার সাথীদের মধ্য থেকে তালেবে ইল্মকে এমন সাথী নির্বাচিত করতে হয়, যার কারণে নিরর্থক তার সময় নষ্ট না হয় অথবা প্রভাবে সঙ্গ-দোষে সেও দূষিত না হয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞানী, মেধাবী, নিষ্ঠাবান ও উপকারী বন্ধু নির্বাচন করে নিজের ইল্ম ও আমলে বৃদ্ধি সাধন করা উচিত। এমন সঙ্গী থেকে দূরে থাকা উচিত, যার দ্বারায় তার জ্ঞান, মান, প্রাণ, ধন ও ঈমানের কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। মৃত হৃদয়ের সঙ্গী থেকে নিঃসঙ্গ থাকা বহু উত্তম।

ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, 'যার হৃদয় মৃত সে তোমার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে, অতএব যথাসম্ভব তার নিকট থেকে দূরে থেকে নিজের মনকে শান্তি দাও। যেহেতু সে উপস্থিত হলেই তুমি আতঙ্কিত হয়ে থাক। অতএব ঐ প্রকার ব্যক্তি দ্বারা মসীবতে পড়লে তুমি ওকে তোমার বাহ্যিক ব্যবহার দাও, হৃদয় নিয়ে ওর নিকট থেকে পলায়ন কর এবং অভ্যন্তর নিয়ে ওর কাছ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও। ওকে নিয়ে তুমি ঐ জিনিস থেকে ব্যস্ত হয়ে যেওনা যা তোমার জন্য শ্রেষ্টতম।

জেনে রেখো, সেই ব্যক্তিকে নিয়ে নিবিষ্ট হওয়াতে শত আফশোষ হবে; যে ব্যক্তির সহিত নিবিষ্টতা কেবল আল্লাহ তাআলা হতে তোমার প্রাপ্য অংশ থেকে তোমার জন্য বঞ্চনা ডেকে আনে। তাঁর নিকট থেকে তোমাকে দূরে ঠেলে দেয়, অযথা তোমার সময় নষ্ট করে, সংকল্পকে দুর্বল করে এবং চিন্তাকে বিভিন্নমুখী করে ফেলে। এমন লোকের পাল্লায় যদি তুমি ফেঁসেই থাক আর তাকে তোমার প্রয়োজনও থাকে তাহলে তার মধ্যেই আল্লাহর কাজ করে যাও এবং যথাসম্ভব তার উপর সওয়াবের আশা রাখ। তার মধ্যেই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির প্রতি নৈকট্য লাভ কর। তার সহিত তোমার সমাবেশকে এমন ব্যবসা বানাও যাতে তুমি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হও। আর তুমি তার পক্ষে এমন ব্যক্তির মত হও, যে কোন পথে চলতে থাকে, এমন সময় এক ব্যক্তি তার সামনে এসে তাকে চলা থেকে থামিয়ে দেয়। অতঃপর তুমি চেষ্টা কর ওকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলতে। যাতে তুমি ওকে বহন কর এবং ও যেন তোমাকে বহন না করে। তাতে যদি সে অস্বীকার করে ও তোমার সাথে পথ চলতে যদি তার আগ্রহ না থাকে তবে তুমি তার নিকট থেমে যেও না। বরং তাকে বর্জন কর এবং তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না। যেহেতু সে তোমার পথ অবরোধকারী (লুটেরা); তাতে সে যেই হোক না কেন। অতএব তুমি তোমার হৃদয় নিয়ে অব্যাহতি লাভ কর। তোমার দিন ও রাত্রি ব্যয় করতে কার্পণ্য কর। আর গন্তব্যস্থলে পৌঁছবার পূর্বেই যেন তোমার পথিমধ্যে সূর্য অস্তমিত না হয়ে যায়, নচেৎ তুমি ধৃত হবে।' (আল-ওয়া বিলুস সাইয়েব ৪৫ পৃঃ, আদাবু ত্বালেবিল ইল্ম ১১২-১১৩পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত, অপ্রয়োজনীয় ও অপকারী সংস্রব ত্যাগ করা এবং সেই সকল সম্পর্কও বর্জন করা যাতে তার দ্বীন ও দুনিয়ায় ক্ষতি হয়। বিশেষ করে নারী জাতির কুহকে না ফাঁসা, যার ফিতনা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিতনা এবং যার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জ্ঞানী জ্ঞানহারা, মানী মান হারা এবং কতলোক প্রাণহারা হয়। তারুণ্যের প্রারম্ভে সঙ্গতার খোঁজ হলে খোদাভীতির সহিত তালেবে ইল্মকে এমন সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন এবং ইল্ম-প্রদীপের পার্শ্ববর্তী বেষ্টনী কাঁচে কালিমা না পড়ে যায়। তদনুরূপ এমন সাথীও গ্রহণ করবে না যার খেল-তামাশাই অধিক এবং জ্ঞান-বুদ্ধি-ভিত্তিক কর্মকান্ড অল্প। যেহেতু মানুষের মন এক প্রকার চোর এবং তো. চুরিও হয় অতিসত্বর।

অনর্থক সংস্রবের তো কোন লাভই নেই। যাতে নিরর্থক আয়ু ক্ষয় হয়, অর্থ ব্যয় হয়, মানহীন সঙ্গতায় মানও যায় এবং দ্বীনহীন সাহচর্যে দ্বীন হারানোরও আশঙ্কা থাকে। সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত, এমন ব্যক্তির সহিত সংস্রব রাখা যাকে সে উপকৃত করতে পারবে অথবা তার নিকট হতে নিজে উপকৃত হবে। আর যদি এমন কোন ব্যক্তির অযাচিত সংস্রবে পড়েই যায়; যার সহিত বৃথা সময় নষ্ট হয়, না তাকে উপকৃত করতে পারে, না নিজেকে এবং তার ইলমী চলার পথে সে যদি কোন সহায়তা না করতে পারে; বরং বাদ সাধে তাহলে কুপ্রবৃত্তির ঝোঁকে না পড়ে সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার পূর্বেই ধীরে ধীরে তার সংসর্গ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নচেৎ (বিশেষ করে নারী-প্রেম) বিষয় যখন গভীরতায় পৌঁছে যায় তখন তা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং যখন 'তুলে ফেলা থেকে ঠেলে ফেলা সহজ' তখনই উচিত ব্যবস্থা নেওয়া জ্ঞানীর কাজ।

কোন সাথীর যদি একান্তই প্রয়োজন হয় তাহলে এমন সাথী হওয়া উচিত, যে হবে সৎ, দ্বীনদার, মুত্তাকী, পরহেযগার, বুদ্ধিমান, কল্যাণ-প্রিয়, যার মন্দ খুবই কম, যে সহ্যশীল ও সদ্ভাব-প্রিয়, কথায় কথায় যে তর্ক করে না, যে ভুলে গেলে স্মরণ করায়, স্মরণ করলে সাহায্য করে, প্রয়োজনে প্রবোধ দান করে, কথার আঘাত পড়লে সবর করে, ভুল ধরিয়ে দিলে ভুল স্বীকার করে, বন্ধুত্বের সাথে সমীহও রাখে ইত্যাদি। (তাযকিরাতুস সামে' ৮-৩পৃঃ)

ইব্রাহীম বিন আদহমকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি লোকেদের সহিত মিশেন না কেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'কারণ যদি আমি আমার চেয়ে নিচু মানের লোকের সঙ্গে মিশি তাহলে সে তার মূর্খতায় আমাকে কষ্ট দেয়। যদি আমি আমার চেয়ে নিচুমানের লোকের সহিত মিশতে যাই তাহলে সে অহংকার দেখায়। আর যদি আমি সমতুল কোন ব্যক্তির সহিত মিশি তাহলে সে আমার প্রতি হিংসা করে। তাই আমি তাঁর (আল্লাহর) সঙ্গতায় নিরত থাকি যাঁর সঙ্গতায় কোন বিরক্তি নেই, যাঁর মিলনের কোন ছিন্নতা নেই এবং যার সংসর্গে কোন আতঙ্ক নেই।'

জনৈক জ্ঞানী বলেন, 'খবরদার! কোন অহংকারীর সাথী হয়ো না। কারণ, যদি সে তোমার নিকট কোন ভালো দেখে তবে সে তা নিজের নামের সাথে জোড়ার চেষ্টা করবে আর যদি তার নিজের তরফ থেকে কোন মন্দ ব্যক্ত হয়ে পড়ে তবে তা তোমার নামের সাথে জুড়ে দেবে।'

মানুষ চার প্রকারের; প্রথমজনঃ জানে এবং সে জানে যে, সে জানে। তার সাথী হও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর। দ্বিতীয়জনঃ জানে এবং সে জানে না যে, সে জানে। সে বিস্মৃত তাকে স্মরণ করাও। তৃতীয়জনঃ জানে না এবং সে জানে যে, সে জানে না। সে অনুসন্ধানী, সে তোমার সাহচর্য চাইলে তা দাও এবং তাকে শিক্ষা দাও। আর চতুর্থজনঃ জানে না এবং জানে না যে, সে জানে না। এমন ব্যক্তি মূর্খ, তাকে বর্জন কর।

সাথী নির্বাচন করা এবং সংস্রব রাখার সময় কথাগুলি সস্মরণে রাখলে তালেবে ইল্মকে সত্যিই বিপদে পড়তে হয় না। প্রয়োজন ও কাল-পাত্র বিচার করে সঙ্গী নির্বাচন করা উচিত, নচেৎ তালেবে ইল্মের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হল কিতাব।

ইবনে কুদামাহ (রঃ) বলেন, 'জেনে রেখো যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই বন্ধুত্বের যোগ্য নয়। বন্ধুত্ব গড়ার জন্য এমন কতক আচরণ, গুণ ও বৈশিষ্ট্য বন্ধুর মধ্যে থাকা উচিত, যার ফলে বন্ধুত্বে আগ্রহ বাড়ে। তুমি যাকে সঙ্গী ও বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে তার মধ্যে নিম্নের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকা উচিতঃ-

সে যেন বুদ্ধিমান ও চরিত্রবান হয়। ফাসেক, বিদআতী এবং অর্থলোভী না হয়। যেহেতু জ্ঞান তো মানুষের মূলধন, আহম্মক ও নির্বোধের বন্ধুত্বে কোন কল্যাণ নেই। কারণ সে তোমাকে উপকার করতে চাইলেও অপকার করে বসে থাকবে। (প্রশংসা কুড়াবার উদ্দেশ্যে ভক্তির আতিশয্যে ক্ষতি সাধন করেও ভুলের কথা বলতে গেলে বলবে, 'ভালোর কাল নেই।') জ্ঞানী বলতে সেই বন্ধুকে বুঝাতে চাচ্ছি যে সমস্ত বিষয়কে যথার্থভাবে যথোপযুক্তরূপে নিজে নিজেই বুঝে, নচেৎ তাকে বুঝিয়ে দিলে অবশ্যই বুঝে যায়।

অনুরূপভাবে সদাচরণ তো একান্ত আবশ্যক। যেহেতু জ্ঞানী হলেও অনেকে ক্রোধ বা কামনার বশবর্তী হয়ে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে থাকে। এমন জ্ঞানী বন্ধুর সাহচর্যেও কোন ফল নেই।

ফাসেক যে, সে তো আল্লাহকে ভয় করে না, আর যার বুকে আল্লাহর ভীতি নেই তার বিপত্তি হতে কোন নিরাপত্তা নেই এবং তার উপর আস্থা রাখাও যায় না।

বিদআতীর সংস্রবও বিপজ্জনক। যেহেতু তার মনেও বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটার আশঙ্কা থাকে। অর্থলোভী, দুনিয়াদার এবং স্বার্থপর ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্বও হানিকর। যেহেতু সে স্বার্থের খাতিরে অসময়ে সরে পড়তেও পারে অথবা স্বার্থলোভে বন্ধুর বন্ধুত্বে ছুরি-চালাতেও পারে।

হযরত উমর (রাঃ) বলেন, 'তোমরা সত্যবাদীদের সাহচর্য গ্রহণ কর, তাদের ছায়া ও সংস্পর্শে জীবন-যাপন কর। যেহেতু তাঁরা সুখের সময়ের সৌন্দর্য এবং দুঃখের সময়ের হাতিয়ার। নিজের ভাই-এর প্রতি সুধারণা রাখ যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তার নিকট এমন কাণ্ড লক্ষ্য করেছ যাতে তুমি ক্ষুব্ধ হও। শত্রু হতে দূরে থাক। আমানতদার ব্যতীত সকল বন্ধু থেকেও সাবধান থাক। আর আমানতদার সেই, যে আল্লাহকে ভয় করে। অপকর্মকারীদের বন্ধু হয়ো না। নচেৎ তুমিও অপকর্ম শিখে নেবে। তাকে তোমার ভেদ ও রহস্য জানাও না। আর তোমার সর্ববিষয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ কর যারা আল্লাহকে ভয় করে।'

ইয়াহয়্যা বিন মুআয বলেন, 'নিকৃষ্ট বন্ধু সে, যাকে দুআর জন্য আবেদন জানাতে হয়, এক তরফাভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে যার সহিত চলতে হয় অথবা কোন কাজে বা ভুলে তার নিকট অজুহাত দেখাতে হয় বা ক্ষমাপ্রার্থী হতে হয়।'

বন্ধুর উপর বন্ধুর অনেক অধিকারও আছে। যেমন, যাচিত ও অযাচিতভাবে তার প্রয়োজন মিটানো, তার দোষ-ত্রুটি গোপন করা, সৎকাজে সতর্ক করা, মন্দ কাজে বাধা দেওয়া। কথায় কথায় বিতর্ক না করা, নিজেকে বড় না ভাবা, বড়াই প্রকাশ না করা, তার দুঃখে দুঃখী হওয়া, তার সহিত সদ্ব্যবহার করা, সর্বদা হিতসাধনের চেষ্টা করা, তার সপক্ষে (ন্যায্যতার সাথে) সহায়তা ও প্রতিরক্ষা করা, ইল্ম ও উপহার দিয়ে সাহায্য করা, কোন দোষ দেখলে গোপনে উপদেশ দেওয়া, তার জন্য দুআ করা, প্রেম ও বন্ধুত্বকে চিরন্তন করা, বন্ধুত্বে স্বার্থ না রাখা, তার বন্ধুত্বে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য রাখা, কোন কঠিন কাজের ভার বা দায়িত্ব না দেওয়া ইত্যাদি।

সেই বন্ধু উত্তম, যে কাছে এলেও যেমন একাকী থাকা যায় ঠিক তেমনিই তার সামনেও থাকা যায়। যার উপস্থিতিতে কোন কুণ্ঠা ও শঙ্কা নেই। অলসের বন্ধুত্ব গ্রহণ করলে নিজেকে অলস করার ভয় থাকে, তাই তার থেকে দূরে থাকাই উত্তম।

বন্ধুর মধ্যে যে সবগুণই বর্তমান থাকবে তা অসম্ভব। তবুও যার অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গলের পরিমাণ অধিক বেশী সেই বন্ধু হলেও যথেষ্ট।

নবী ﷺ বলেন, “অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত, যেমন এক কামার; যার নিকট বসলে দুর্গন্ধ ও ধুঁয়া লাগে এবং আগুনের ফিনিক দ্বারা কাপড় পুড়ে থাকে। আর সৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত, যেমন কোন আতরওয়ালা; যার নিকট বসলে সুগন্ধ পাওয়া যায়। সে আতর উপহার দেয় অথবা তা ক্রয় করা যায়।” (আবু দাউদ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00