📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 সংযম ও ধৈর্য পানাহার

📄 সংযম ও ধৈর্য পানাহার


উমর বিন সালেহ তুরসূসী ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'কোন্ জিনিস দ্বারা হৃদয় নরম হয়?' তিনি উত্তরে বললেন, 'বেটা, হালাল খাওয়া দ্বারা।' অতঃপর তিনি বিশ্ব বিন হারেসকেও এই প্রশ্ন করেন। তিনি উত্তরে বলেন, 'জেনে রাখ, আল্লাহর যিক্র (স্মরণেই) চিত্ত প্রশান্ত হয়।' (সূরা রা'দ ২৮-আয়াত)

তুরসূসী বললেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম আহমদ)কে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'হালাল পানাহার।' বিশ্র বললেন, 'উনি আসলটাই উল্লেখ করেছেন।' অতঃপর তুরসূসী আব্দুল অহহাব আল্-অরাক্ব এর নিকট উপস্থিত হয়ে ঐ একই প্রশ্ন করলে তিনিও বিশ্ব-এর মত উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'হালাল খাওয়া।' অরাক্ব বললেন, 'উনি মূলের কথাই বলেছেন।'

হ্যাঁ, আজ সেই মূল উপাদানই প্রায় মানুষের নিকট হতে হারিয়ে গেছে। তাই তো হৃদয়ে কোমলতা নেই, প্রশান্তি নেই, নেই অন্তরে-অন্তরে সংযোগ।

সাঈদ বিন মুসাইয়িব বলেন, 'অধিকাধিক নামায রোযা করাই ইবাদত নয়। ইবাদত তো আল্লাহর (দ্বীনের) ব্যাপারে চিন্তা-ফিক্স করা এবং তাঁর হারামকৃত বস্তু হতে সংযত হওয়া।' তাই তো হযরত আয়েশা (রাঃ) সংযমকে দ্বীনের সবচেয়ে বড় অংশ বলতেন।

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বলেন, 'ষাট কোটি দিরহাম দান করার চেয়ে সন্ধিগ্ধ একটি দিরহাম গ্রহণ না করাটা আমার নিকট অধিক প্রিয়।'

এক ব্যক্তি হযরত ঈসা (আঃ) এর নিকট অসিয়ত চাইলে তিনি বললেন, 'তোমার রুটি কোথা হতে আসছে তা লক্ষ্য রেখো।'

ফুযাইল বলেন, 'যে ব্যক্তি জানে যে, তার উদরে কি প্রবেশ করছে সে আল্লাহর নিকট সত্যবাদী বলে পরিচিত হবে। সুতরাং তোমার আহার কোথা হতে আসছে তা দেখ, হে মিসকীন!'

আবু আব্দুল্লাহ সাজী বলেন, 'পাঁচটি বিষয় মুমিনের অবশ্যই জানা উচিত; আল্লাহর মা'রেফাত, হকের মা'রেফাত (ন্যায় ও সত্যকে চেনা), আল্লাহর জন্য আমলে ইখলাস (বিশুদ্ধচিত্ততা ও একনিষ্ঠতা রাখা), সুন্নাহ অনুযায়ী সকল আমল (কর্ম) সম্পাদন এবং হালাল রুযী ভক্ষণ।

সুতরাং সে যদি আল্লাহকে চেনে কিন্তু হক না চেনে তাহলে আল্লাহর মা'রেফাত তার কাজ দেবে না। যদি উভয়কেই চেনে কিন্তু আমলে ইখলাস না রাখে তবে মা'রেফাত দ্বারা উপকৃত হবে না। আবার এসব জেনে যদি সুন্নাহ অনুযায়ী কর্ম না করে তবে তাতেও তার কোন লাভ নেই। আর যদি সে তাও করে থাকে কিন্তু তার খাদ্য যদি হালাল না হয় তাহলে ঐ পাঁচের জ্ঞান তার কোন উপকারে আসবে না। পক্ষান্তরে যদি তার খাদ্য হালাল হয় তাহলে তাতে তার হৃদয় স্বচ্ছ হয়; যার দ্বারা ইহ-পরকালের বিষয় তার গোচরীভূত হয়। অন্যথা যদি তার খাদ্য (হারام ও হালালে) সন্ধিগ্ধ হয় তবে ঐ খাদ্যানুসারে সমস্ত বিষয় তার নিকট সন্দেহযুক্ত হয়ে তালগোল খায়। আর খাদ্য যদি হারাম হয় তাহলে দুনিয়া আখেরাতের সমস্ত বিষয় তার নিকট তিমিরাচ্ছন্ন পরিদৃষ্ট হয়। যদিও লোকে তাকে চক্ষুষ্মান বলে তবুও প্রকৃতপক্ষে-সে অন্ধ; যেপর্যন্ত সে তওবা না করেছে।

সুফিয়ান বলেন, 'প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার খাদ্যে তুমি এই ভয় কর যে, তা তোমার হৃদয়কে বিকৃত করে ফেলতে পারে তার দাওয়াতে উপস্থিত হয়ো না।'

ফুযাইল বলেন, 'আল্লাহর কতক বান্দা আছেন যাঁদের কারণে তিনি অন্যান্য বান্দা ও সকল জনপদকে জীবিত রাখেন। তাঁরা হলেন, আসহাবে সুন্নাহ (যাঁরা সুন্নাহ বা হাদীস অনুযায়ী আমল করেন)। যে ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে, তার পেটে হালাল হতে আহার্য প্রবেশ করেছে সে 'হিযবুল্লাহ' (আল্লাহর দল)তে শামিল হয়ে যাবে। আর এগুণ হল আহলে সুন্নাহর।'

হযরত উমর (রাঃ) বলেন, 'রাতের শেষাংশে গোঁ-গোঁ (করে ইবাদত) করাই দ্বীন নয়। দ্বীন তো সংযমে।'

আহার্যে হারাম যাতে অনুপ্রবেশ না করে যায় তার জন্য আবু ওয়াইল নিজের ছেলে ইয়াহয়্যার নিকট থেকেও কিছু গ্রহণ করতেন না। কারণ, ইয়াহয়্যা কাযী (বিচারপতি) ছিলেন। তাই তিনি আশঙ্কা করতেন যে হয়তো বা তাঁর মালে ঘুষ ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটেছে!

হাসান বলেন, 'শ্রেষ্ঠ ইল্ম হল সংযমশীলতা।'

সালেহ বিন মেহরান বলেন, 'যদি কোন আলেমকে দেখ যে সে সংযমী (পরহেযগার) নয় তাহলে তার নিকট ইল্ম গ্রহণ করো না।'

আবু হাম্স নিসাপুরী বলেন, 'প্রভুর প্রতি বান্দার উৎকৃষ্ট অসীলাহ হল সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষিতা, সকল কর্মে সুন্নাহর অনুবর্তী হওয়া এবং হালাল পথে জীবিকা অনুসন্ধান করা।'

সহল বিন আব্দুল্লাহ তস্তরী বলেন, 'আমাদের মূল ছয়টি; আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ, রসূল ﷺ এর সুন্নাহর অনুসরণ, হালাল ভক্ষণ, কাউকে কষ্ট দান থেকে (নিজেকে ও অপরকে) নিবৃত্তকরণ, পাপ থেকে দূর হওন এবং সকলের অধিকার প্রদান।'

পানাহার হালাল হলেও পরিমিতি আহার করা উচিত। এ বিষয়েও পূর্ববর্তী ওলামাগণ আমল করে গেছেন এবং আমাদের তা করতে উপদেশের মূল্যবান উপহার দিয়ে গেছেন।

ইবনে জামাআহ (রঃ) বলেন, 'মনোযোগ ও উপলব্ধি অর্জন এবং ক্লান্তি ও বিরক্তি দূরীকরণে বড় সহায়ক বিষয়সমূহের অন্যতম হল, স্বল্প পরিমাণ হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা।

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'ষোল বছর থেকে আমি খেয়ে পরিতৃপ্ত নই। যেহেতু অধিক খাদ্য ভক্ষণ অধিক পানি পান করতে বাধ্য করে এবং এ সবের আধিক্য অতিনিদ্রা, মেধাহীনতা, স্মৃতিশক্তি-স্বল্পতা, ইন্দ্রিয়-স্তব্ধতা ও দৈহিক আলস্য সৃষ্টি করে। তা ছাড়া পেটপূর্ণ ভোজন শরীয়তের দৃষ্টিতেও অপছন্দনীয়; যা শারীরিক ব্যাধি আনয়ন করে। যেমন বলা হয়, (দেহের শত্রু ভুঁড়ি) 'অধিকাংশ ব্যাধিই পানীয় অথবা খাদ্য থেকেই সৃষ্টি হয়।'

প্রসিদ্ধ ওলামা, আয়েম্মা ও আউলিয়াগণের কেউই অতিভোজনে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের কেউই বেশী খাওয়াকে পছন্দ করতেন না। অতিভোজনকারী প্রশসার্হও নয়। অতিভোজন দ্বারা প্রশংসা করা হয় জ্ঞানহীন চতুস্পদ জন্তুদের; যাদেরকে কঠিন কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়। আর সুস্থ মেধাকে নিকৃষ্ট পরিমাণের আহার গ্রহণ করে বিক্ষিপ্ত ও অচল করা আদৌ উচিত নয়- যার শেষ পরিণতি সকলের নিকট বিদিত।

যদি অতি পান-ভোজনের অন্য কিছু ক্ষতি না হয়ে কেবল এই হত, যা বারবার অধিকাধিক শৌচাগারে যাতায়াত করে হয় তাহলে এতটুকু ক্ষতির হাত হতে বাঁচার জন্য জ্ঞানীর উচিত তা থেকে দূরে থাকা।

যে ব্যক্তি অতি পানভোজনের ও নিদ্রার সাথে ইল্মের সাফল্য এবং তাতে অভিষ্টলাভের আশা করে সে এমন বস্তুলাভের আশা করে যা বাস্তবে অসম্ভব। (তাযকিরাতুস সা-মে' অলমুতাকাল্লিম ৭৪ পৃঃ)

ইবনে কুদামাহ (রঃ) বলেন, 'উদরপরায়ণতা বৃহৎ সর্বনাশী বস্তুসমূহের অন্যতম। যার কারণে হযরত আদম (আঃ)কে বেহেশ্ হতে বহিষ্কার করা হয়েছিল। উদর-পরায়ণতায় যৌন-কামোদ্রেক অধিক হয় ও ধন-সম্পদের আকাংখা বৃদ্ধি পায়। এবং আরো বহু সংখ্যক বিপত্তি এসবের অনুবর্তী হয় এই পেটুকতায়।'

উক্কা রাসেবী বলেন, 'হাসানের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, 'এস (খানা খাই)।' আমি বললাম, 'আমি খেয়েছি, আর পারব না খেতে।' তিনি বললেন, 'সুবহা-নাল্লাহ! মুসলিম কি এত খায় যে, পরে আর খেতেই পারে না?'

অবশ্য ভোজনে যা ন্যায় তা হল মধ্যপন্থা; পরিমিত আহার। খাওয়ার ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকা সত্ত্বেও অপরিতৃপ্তভাবে হাত তুলে নেওয়া। এই ন্যায়ভক্ষণে শরীর সুস্থ থাকে এবং বহু রোগের প্রতিকার হয়। সুতরাং ক্ষুধা লাগলে খাওয়া উচিত এবং সামান্য ক্ষুধা ও ইচ্ছা থাকতে খাওয়া বন্ধ করা উচিত।

পক্ষান্তরে প্রতিনিয়ত মাত্রাধিক স্বল্পাহারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন, এক সম্প্রদায় স্বল্প খেয়ে শরীরকে শক্তিহীন করে ফরয আদায়ে অক্ষম ও অলস হয়ে থাকে, আর তাদের এ মূর্খতায় মনে করে যে, তা করা ফযীলত; অথচ এমনটা নয়। যিনি ক্ষুধার প্রশংসা করেছেন তিনি ঐ মধ্যপন্থা মিতাহারের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। (মুখতাসারু মিনহাজিল কাসেদীন ১৬৩ পৃঃ)

মোটকথা হল ইন্দ্রিয়দমন ও প্রবৃত্তিকে সংযম করে চলা সকল অবস্থায় আবশ্যক। এই ইন্দ্রিয়দমন আল্লাহর পথের পথিকদের নিদর্শন।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'নবী ﷺ ইন্দ্রিয় সংযমকে একটি মাত্র বাক্যে একত্রীভূত করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের (শ্রেষ্ঠতার) অন্যতম হল, অনর্থক বিষয়কে পরিত্যাগ করা। (মুঅত্তা মালেক ২/৪৭০, শরহুসসুন্নাহ ১৪/৩২১, মিশকাত ৩/১৩৬১) যা বাজে কথা বলা, বাজে দেখা, বাজে শোনা, নিরর্থক গ্রহণ করা, অনর্থক চলা, ফালতু চিন্তা করা এবং ব্যাপকভাবে সর্বপ্রকার গুপ্ত ও প্রকট অপ্রয়োজনীয় কর্মাদি বর্জন করাকে বুঝায়। সুতরাং এই বাক্যটুকুই সংযমের জন্য যথেষ্ট।

ইব্রাহীম বিন আদহম বলেন, 'সংযম-প্রত্যেক সন্ধিগ্ধ বস্তু পরিহার এবং অনর্থক ও অতিরিক্ত সকল বিষয় ত্যাগ করাকে বলে।' (মাদারিজুস সালেকীন ২/২১)

এই সংযমশীলতার মূল হল সন্দিগ্ধ বস্তু-বিষয়কে বর্জন করা। অর্থাৎ যে বিষয় বা কর্ম করা বৈধ না অবৈধ এবং যে বস্তু খাওয়া হালাল না হারাম এই নিয়ে মনে সংশয় সৃষ্টি হয় তা ত্যাগ করার নামই সংযম। এরই প্রতি ইঙ্গিত করে এবং সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তুকে পরিহার করার উপর অনুপ্রাণিত করে আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন, “হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর উভয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তু। যে ব্যক্তি কোন সন্ধিগ্ধ পাপকে বর্জন করবে সে তো (সন্দেহহীন) স্পষ্ট পাপকে অধিকরূপে বর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধিগ্ধ কিছু করার দুঃসাহস করবে সে ব্যক্তি অদূরেই স্পষ্ট পাপেও আপতিত হয়ে যাবে। পাপ আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি। যে ঐ চারণভূমির ধারে-পাশে চরবে সে অদূরে সম্ভবতঃ তার ভিতরেও চরতে শুরু করে দেবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) বলেন, 'উক্ত হাদীসে আহকামকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কোন বস্তু বা বিষয়কে করতে স্পষ্ট ভাষায় আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং তা ত্যাগ করার উপর ধমক এসেছে। অথবা কোন বস্ত বা বিষয় ত্যাগ করতে সুস্পষ্ট আদেশ এসেছে এবং তা করার উপর ধমক এসেছে। অথবা কোন বস্তু বা বিষয়কে করা বা না করার উপর কোন আদেশ বা ধমক আসেনি। তাহলে প্রথম বিষয়টি হবে স্পষ্ট হালাল ও দ্বিতীয়টি স্পষ্ট হারাম। স্পষ্ট অর্থাৎ, তা হালাল অথবা হারাম এ কথা বর্ণনার প্রয়োজন হবে না। বরং প্রত্যেকেই জানতে ও চিনতে সক্ষম হবে। আর তৃতীয়টি হল সন্দিগ্ধ। যেহেতু তা অস্পষ্ট; তা হালাল না হারাম পরিষ্কার জানা যায় না। আর যার অবস্থা এই হবে তা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। যেহেতু বস্তু যদি প্রকৃতপক্ষে হারাম হয়েই থাকে তাহলে হারামের অনুসরণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে তা যদি হালাল হয়ে থাকে তাহলে এই নিয়তে ত্যাগ করার উপর সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে।' (ফতহুল বারী ৪/৩৪১)

রসূল ﷺ বলেন, “ইবাদতের মাহাত্ম্য অপেক্ষা ইলমের মর্যাদা উত্তম। এবং দ্বীনের মূল হল সংযমশীলতা। (সহীহুল জামে' ৪২১৪নং)

সুতরাং আলেম ও তালেবে ইলমের উচিত, জীবনের সকল ক্ষেত্র ও বিষয়ে সংযমশীলতা অবলম্বন করা। পানাহার, পোষাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় সকল কিছুতে মিতাচারী হওয়া। যাতে হৃদয় জ্যোতির্ময় হবে এবং ইল্ম, তার নূর ও ফল গ্রহণের জন্য তা উপযুক্ত ও অনুকূল হবে।

তালেবে ইলমের জন্য সংযমশীলতার উচ্চস্থান অধিকার করতে যত্নবান হওয়া উচিত। কোন বিষয়ে কোন রকমের অনুমতি বা 'ফাঁক' অনুসন্ধান করে কোন কোন সন্দিগ্ধ বিষয়ে নিজেকে ফেলা উচিত নয়। বরং স্বচ্ছ হৃদয়ে নবুয়ত ও সাহাবাগণের জ্ঞান-জ্যোতি প্রতিবিম্বিত করাই হল যথোচিত। শ্রেষ্ঠ আদর্শ রসূল ﷺ একদা একটি পড়ে থাকা খেজুর পেয়েছিলেন, খেতে গেয়ে তিনি এই ভয়ে খাননি যে, হয়তো বা তা সদকার খেজুর হতে পারে এবং সদকা খাওয়া তাঁর জন্য বৈধ নয়। (বুখারী)

তাই হারাম নয় কিন্তু হারাম হওয়ার আশঙ্কা আছে-এমন কোন বস্তু ভক্ষণ বা গ্রহণ করতে তালেবে ইল্মকে রসূল ﷺ এর অনুকরণ করা উচিত। যেহেতু আলেম ও তালেবে ইল্ম সমাজের আদর্শ ও নমুনা। সমাজ তাদের অনুসরণ করে চলে। সুতরাং তারা যদি সংযমশীলতার সহিত না চলে তবে আর কারা চলবে? (তাযকিরাতুস সামে' অলমুতাকাল্লিম ৭৫ পৃঃ)

তদনুরূপ তালেবে ইলমের উচিত অধিকাধিক আল্লাহর যিক্র করা। যেহেতু তাঁর যিরে মনে শান্তি আসে; যেমন পূর্বে আলোচিত হয়েছে। কারণ, যিক্র নির্জনতা ও অভাবের সাথী। দুঃখ ও অত্যাচারের মুখে সান্ত্বনা। তালেবে ইল্ম তো ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহর মা'রেফাত পায়।

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 তালেবে ইলমের মহাবর

📄 তালেবে ইলমের মহাবর


তাই তার অভিমুখ হয় আল্লাহরই প্রতি। তাঁরই তুষ্টিতে তার তৃপ্তি হয়, তাঁরই প্রেমে হৃদয় ভরে, তাঁরই যিরে রসনা আর্দ্র রাখে, তাঁরই মা'রেফাতে প্রফুল্ল ও সদানন্দ থাকে। তাঁর যিক্রে এমন জান্নাত পায় তা যদি কোন রাজা জানতে পারে তাহলে তা অধিকার করার জন্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে।

ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'পৃথিবীতেই এক জান্নাত আছে। যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করে না সে পরকালের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।'

তিনি আরো বলতেন, 'আমাকে আমার শত্রুরা কি করবে? আমার বক্ষে আমার জান্নাত ও তার উদ্যান রয়েছে। আমি কোথাও গেলে তা আমার সাথেই যায়, আমার নিকট থেকে পৃথক হয় না। আমার বন্দীদশা (আল্লাহর সহিত) নিভৃত আলাপ; আমার হত্যা শাহাদত (শহীদী মরণ)। আমার দেশ থেকে আমার বহিষ্কার আমার জন্য পর্যটন। (আল ওয়া-বিলুস সুইয়্যেব)

ইসলামী সংগ্রাম ও বিপ্লবের মুখে অত্যাচারের মোহানায় আল্লাহর যিক্রও তালেবে ইলমের বড় হাতিয়ার ও সঙ্গী।

তালেবে ইল্মের মযহাব কুরআন ও সহীহ হাদীসের মযহাব। কোন তকলীদের শৃঙ্খলে পা বেঁধে জ্ঞান অন্বেষণ করলে সঠিক জ্ঞান ধরা দেয় না। কোন বিতর্কিত বিষয়ে মীমাংসা ও সঠিক মত পেতে অন্ধ পক্ষপাতিত্ব বাধা সৃষ্টি করে। মুক্ত ও উদার মনে যে কুরআন ও হাদীস বুঝতে চেষ্টা করে তার জন্য সমস্ত পথ আলোকিত হয়ে যায়। এত পথের মাঝে সঠিক পথ, হক ও রাজপথের সন্ধান মিলে যায়। তাই তালেবে ইল্মের পথ হক চেনা। হক দেখে ব্যক্তি চেনা। কোন ব্যক্তি দেখে হক চেনা নয়। এর জন্য তার আদর্শ হচ্ছেন নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ, তাঁর বরণীয়, অনুকরনীয় এবং মাননীয় তিনিই। তাঁর নির্দেশ পেলে আর কার নির্দেশের প্রয়োজন? তাঁর ও তাঁর সাহাবাবর্গের মযহাব মানলে আর কার মযহাব মান্য? বিশিষ্ট তাবেয়ীন, ইমাম আবু হানীফা, মালেক শাফেয়ী, আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) দের যে মযহাব ছিল সে মযহাব অপেক্ষা আর কোন্ মযহাব শ্রেষ্ঠ?

ইবনুল কাইয়্যেম বলেন.....কিন্তু কেবল রসুল ﷺ কে অনুসরণ করা, তাঁকেই বিচার-ভার অর্পণ করা এবং তা সন্ধান ও উপলব্ধি করার জন্য আত্মার সকল শক্তিকে ব্যয় করা, তাঁর বাণীর উপরে সকল মানুষের রায় ও অভিমতকে পেশ করে বিচার করা, তাঁর পরিপন্থী সকল কথাকে প্রত্যাখ্যান করা, তাঁর কথার অনুসারী সকল কথাকে গ্রহণ ও মান্য করা, আর যে কথা ও অভিমত ওহীর সূর্যালোকে উদ্ভাসিত এবং সত্য ও শুদ্ধ বলে প্রমাণিত সে কথা ও অভিমত ব্যতীত অন্য কারো কথা ও অভিমতের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা-এমন কাজ মনে পরিকল্পনা করতেও ওদের কাউকে তুমি দেখবে না এটা কারো উদ্দেশ্য ও অভীষ্ট হওয়া তো দূরের কথা। অথচ ঐ কাজের কাজী ছাড়া কেউ মুক্তি পাবে না।

কোথায় রহমত এমন অভাগা বান্দার জন্য যে ইল্ম অন্বেষণ করে, এতে তার সমস্ত শক্তিকে ঢেলে দেয়, তার যাবতীয় সময় ও অবসরকে নিঃশেষ করে, লোকেরা যে ভোগ-বিলাসে আছে তার উপর সে ইল্মকেই প্রাধান্য দেয়, কিন্তু তার ও রসূল ﷺ এর মাঝের পথ অবরুদ্ধ। তার হৃদয় রসূল প্রেরণকারী আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা এবং তাঁর তওহীদ, তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তন, তাঁর উপর আস্থা ও ভরসা, তাঁর প্রেম ও তাঁর সাক্ষাতের খুশী হতে দূরীকৃত ও প্রতিহত।'

মোট কথা হে তালেবে ইল্ম! 'তুমি তোমার শায়খ, ওস্তাদ, মুআল্লিম, মুরাব্বী, মুআদ্দিব (পীর, মুরশীদ, রাহবার, পথের দিশারী ও গুরু) কর একমাত্র রসূলুল্লাহ ﷺ কে। আর তাবলীগ (তাঁর নিকট হতে পৌঁছানো ও বহন) ছাড়া অন্য বিষয়ে সমস্ত মাধ্যম ও বাহনকে তোমার এবং তাঁর মধ্য হতে হটিয়ে দাও - যেমন তুমি তোমার ও আল্লাহর মাঝে তাঁর দাসত্ব ও ইবাদতে সমস্ত মাধ্যম ও অসীলাকে দূর করে থাক। তাঁর নির্দেশ, নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁর রিসালত (শরীয়ত) তোমার প্রতি পৌছানো ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কোন মাধ্যম প্রতিষ্ঠা করো না।'

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'এই জন্যই ওলামাগণ এবিষয়ে একমত যে, হক জানা গেলে তার বিপরীতে কারো অন্ধানুকরণ বৈধ নয়।'

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'একান্তভাবে ত্রুটিহীন নবী ﷺ এর অনুসরণ করা এই যে, তিনি যা আনয়ন করেছেন তার উপরে তুমি কারো কথা বা রায়কে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেবে না; তাতে সে যেই হোক না কেন। বরং প্রথমতঃ তুমি হাদীসের শুদ্ধতা দেখবে। (অনুরূপ অন্য কোন সহীহ হাদীস কর্তৃক তা মনসুখ কিনা তা দেখবে) অতঃপর হাদীস শুদ্ধ হলে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করবে। এতে যদি রসূলের আদর্শ তোমার নিকট স্পষ্ট হয়ে যায় তবে তা'হতে বিমুখ হয়ো না' এবং অন্য কারো আদর্শ গ্রহণ করো না; যদিও প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সকল মানুষ তোমার বিরোধিতা করে। আল্লাহর আশ্রয় যে, সকল উম্মত তাদের নবীর আনীত বিষয়ের অন্যাথাচরণে একমত হবে। (এটা অসম্ভব।) বরং উম্মতের মধ্যে এমন কেউ থাকবেই, যে নবী ﷺ এর ঐ আদর্শের সপক্ষে বলেছে; যদিও তুমি তাকে না জেনেছ। অতএব ঐ সুন্নাহর সপক্ষে মতাবলম্বী সম্পর্কে তোমার অজ্ঞানতাকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে দলীল ও যুক্তি মনে করো না। বরং স্পষ্ট (আল্লাহ ও তাঁর রসূলের) উক্তি যা বলে সেই মত-ই অবলম্বন কর এবং দুর্বলতা প্রকাশ করো না। আর জেনে রেখো যে, নিশ্চিতভাবে এ বিষয়ের কেউ না কেউ মতাবলম্বী আছেই। কিন্তু তোমার নিকট সে খবর পৌঁছেনি। তবে হ্যাঁ, সাথে সাথে ওলামাদের মর্যাদা, তাঁদের সহিত সম্প্রীতি, প্রগাঢ় শ্রদ্ধাপূর্ণ সুধারণা, দ্বীন সংরক্ষণ ও সুবিন্যাসে তাঁদের আমানত ও ইজতিহাদ (সুপ্রচেষ্টা) ইত্যাদির কথা বিস্মৃত হয়ো না; যেহেতু তাঁরা (ভুল করলেও) একটি সওয়াব ও ক্ষমা অথবা (সঠিক করলে) দু'টি সওয়াবের অধিকারী। কিন্তু তা হলেও একথা জরুরী নয় যে, তুমি (কুরআন ও সুন্নাহর) স্পষ্ট উক্তিকে বাতিল ও নাকচ করে দেবে আর তার উপর ওদের কারো কথাকে প্রাধান্য দেবে - এই যুক্তি ও সন্দেহে যে, 'তুমি এ বিষয়ে তার চেয়ে অধিক জানো না।' যদি তাই হয় তাহলে (তোমার পূর্বে) যে ঐ স্পষ্ট উক্তির সপক্ষে মতাবলম্বী সেও তোমার চেয়ে অধিক জানে। তবে তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে (যে স্পষ্ট উক্তি বা সহীহ হাদীসের সপক্ষে বলে) তার মত গ্রহণ কর না কেন? সুতরাং যে ব্যক্তি ওলামাদের উক্তিসমূহকে কুরআন ও সুন্নাহর উপর পেশ করে বিচার ও তুলনা করে এবং কুরআন ও হাদীসের উক্তি দ্বারা অন্যান্য উক্তিসমূহকে ওজন করে, অতঃপর যা কিতাব ও সুন্নাহর উক্তির প্রতিকূল হয় তা বর্জন করে ও তার বিরোধিতা করে সে ব্যক্তি ওলামাদের উক্তিসমূহকে নগণ্য করে ফেলছে এবং তাঁদের প্রতি অন্যায় আচরণ করছে তা বলা যায় না। বরং একাজে সে তাঁদেরই অনুসরণ করে; যেহেতু তাঁরা সকলেই এ কথার (কুরআন হাদীসের উক্তি তাঁদের উক্তির প্রতিকূল হলে তাঁদের উক্তি প্রত্যাখ্যান করে কুরআন ও সুন্নাহর উক্তিকে সর্বান্তঃকরণে মেনে নেওয়ার) নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অতএব প্রকৃতপক্ষে তাঁদের অনুসারী হল সেই ব্যক্তিই যে তাঁদের সকল নির্দেশকে মান্য করে; সে ব্যক্তি নয়, যে তাঁদের আদেশ অমান্য করে। তাই সেই বিষয়ে তাঁদের বিরোধিতা করা যে বিষয়ে স্পষ্ট উক্তি তাঁদের উক্তির প্রতিকূল, তাঁদের ব্যাপক নীতিতে বিরোধিতা করা অপেক্ষা সহজত্তর; যে নীতি মান্য করতে তাঁরা আদেশ দিয়ে গেছেন এবং তার প্রতি সকলকে আহ্বান করে গেছেন। আর তা এই যে, তাঁদের উক্তির উপর (কুরআন ও সুন্নাহর) স্পষ্ট উক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে। এখান হতে কোন আলেমের প্রত্যেক উক্তির তকলীদ করার মাঝে এবং তাঁর বুঝ ও উপলদ্ধি দ্বারা সাহায্য গ্রহণ করা ও তাঁর ইলমের আলোক দ্বারা জ্ঞান আলোকিত করার মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

তকলীদ যে করে সে তার মুকাল্লাদ (অনুকৃত) ইমাম বা আলেমের কথাকে নির্বিচারে, চোখ বুজে এবং কিতাব ও সুন্নাহ থেকে তার দলীল ও সমর্থন না খুঁজেই গ্রহণ করে। বরং তাঁর কথাকে রশির মত করে গ্রীবাদেশে 'ক্বিলাদাহ' (বেড়ি বা হার) বানিয়ে পরে নেয়। এর জন্যই একাজকে ‘তকলীদ' (অন্ধানুকরণ) বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাঁর সমঝ ও উপলব্ধি দ্বারা উপকৃত হয় এবং রসূল ﷺ এর মূল আদর্শে পৌঁছনোর উদ্দেশ্যে তাঁর ইলমের আলোকে জ্ঞান আলোকিত করে সে ব্যক্তি তো তাঁদেরকে (ইমাম বা ওলামাগণকে) প্রথম (ও মূল) দিশারীর প্রতি পৌঁছনোর জন্য দিগ্দর্শীর পর্যায়ে রাখে। অতঃপর যখনই সে প্রকৃত দিশারীর নিকট পৌঁছে যায় তখনই সে প্রথম দিশারীর পথ প্রদর্শন পেয়ে অন্যান্য দিদিশারী থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যায়। (অর্থাৎ, তাঁদের দিগ্দর্শনের প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতা আর অবশিষ্ট থাকে না।) যেমন যে ব্যক্তি কেবলা জানার জন্য তারকা দ্বারা তা নিরূপণ করে। অতঃপর যখন (সে কেবলার সন্ধান পেয়ে যায় বা) তা প্রত্যক্ষ দর্শন করে তখন আর তারকা দেখা বা তা দিয়ে কেবলা অবধারণ করার কোন অর্থ থাকে না।'

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'সমস্ত মানুষ এ বিষয়ে একমত যে, যার নিকট আল্লাহর রসূলের সুন্নাহ (আদর্শ ও নীতি) অভিব্যক্ত হয় তার জন্য বৈধ নয় যে, সে তা কারো কথায় প্রত্যাখ্যান করে।'

সুতরাং তালেবে ইল্ম যখন শরীয়তের সমস্ত আহকামের দলীলাদি জেনে নেবে, হাদীস সহীহ বা যয়ীফ হওয়া সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করে নেবে, নাসেখ-মনসূখ (রহিত-অরহিত) বিষয়ে অভিজ্ঞতার্জন করে নেবে, দলীলের নির্দিষ্ট- অনির্দিষ্ট, ব্যাপক-সীমিত প্রভৃতি বিষয়ে পরিচিতি লাভ করবে, আরবী ভাষাজ্ঞান এবং ফিহ্নের মৌলনীতিসমূহ আয়ত্ত করে নেবে এবং দলীল থেকে শরয়ী নির্দেশ নিরূপণ করতে পারবে তখন সে কোন বিষয়ে কারো অন্ধানুকরণ করবে না। কিন্তু সকল বিষয়ে যদি সম্পূর্ণ জ্ঞানলাভ সম্ভব না হয় তাহলে যে বিষয়ে জ্ঞানলাভ অসম্ভব সে বিষয়ে কোন ইমাম বা আলেমের দলীল অনুধাধন ও পর্যালোচনা করে তাঁর অনুকরণ বা অনুসরণ করবে।

পক্ষান্তরে মুকাল্লিদ (অনুকরণকারী) যদি মুর্খ হয়, নিজে নিজে শরীয়তের নির্দেশ জানতে যদি অক্ষম হয় তাহলে তার জন্য তকলীদ ফরয। যেমন আল্লাহ বলেন,

فسئلوا أهل الذكر إن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ

অর্থাৎ, তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। (সূরা আম্বিয়া ৭ আয়াত) কিন্তু তকলীদ তাঁর করবে যিনি ইল্ম ও তাকওয়ায় সব চেয়ে বড় হবেন।

আবার আলেম বা তালেবে ইল্ম হলেও তার জন্য তকলীদ তখন বৈধ যখন তার সামনে অকস্মাৎ কোন সমস্যা এসে যায় এবং সত্বর তার সমাধান প্রয়োজন হয়। আর তার নিকট এমন সময় বা অবকাশ থাকে না যে, যাতে সে দলীল ইত্যাদির অনুসন্ধান করে।

পরম্ভ সকল বিষয়েই কোন নির্দিষ্ট মযহাবের তকলীদ করা ওয়াজেব নয়। এ ব্যাপারে ইজমা' (সর্ববাদিসম্মতি) তো হয়নি বরং অনেকে তা বৈধ বললেও সঠিক মতে তা হারাম। যেহেতু প্রত্যেক আদেশ ও নিষেধে কোন অনবীর আনুগত্য মোটেই বৈধ নয়। অবশ্য কোন বিশেষ অবোধ্য সমস্যায় কোন ইমামের সমাধান নেওয়া দূষনীয় নয়।

আবার এমন ব্যক্তি যে কোন মযহাবকে মানে কিন্তু স্বার্থের খাতিরে 'আইনে ফাঁক' খোঁজার উদ্দেশ্যে বিনা কোন ওযরে, অন্য কোন আলেমের ফতোয়া না নিয়ে অথবা নিজে কোন শরয়ী দলীল থেকে তা নিরুপণ না করে ঐ মযহাবের প্রতিকূল কোন কাজ করে তবে সে মানসতার পূজারী ও গোনাহগার। কিন্তু যদি তার নিকট দলীল দ্বারা অথবা অপেক্ষাকৃত কোন কিতাব ও সুন্নাহর শ্রেষ্ঠতর অভিজ্ঞ ও পরহেযগার আলেমের ফতোয়া দ্বারা তার মযহাবের বিপরীত কিছু স্পষ্ট হয়ে যায় তাহলে মযহাবের সমাধান ছেড়ে এই আলেমের সমাধান গ্রহণ করা বৈধ, বরং সেটাই হল ওয়াজেব।

যে ব্যক্তি অপরের ফতোয়া নকল করে তার তকলীদ করে ফতোয়া দেয় তবে প্রয়োজনে তার ফতোয়াও মানা যায়; যদি পূর্বোক্তের মত (অনুকৃত) মুজতাহিদ আলেম বর্তমানে বা নিকটে না থাকেন।

পক্ষান্তরে ফতোয়া দেওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে যা পূরণ না হলে ফতোয়া দেওয়া হারামঃ-

১- মুফতী যেন শরীয়তের সমাধান ও নির্দেশকে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে অথবা প্রবল ধারণার সাথে জানেন।
২- তিনি যেন প্রশ্ন ও সমস্যার পূর্ণ ধারণা ও বাস্তব কল্পনা করতে পারেন।
৩- ফতোয়া দেবার সময় তাঁর মন ও মস্তিষ্ক যেন সুস্থ, শান্ত ও স্থির থাকে।

আবার ফতোয়া দেওয়া তখনই ওয়াজেব হয় যখন জিজ্ঞাসিত সমস্যা বাস্তবে সংঘটিত হয়, নতুবা কোন কল্পিত বিষয়ে ফতোয়া দেওয়া ওয়াজেব নয়। অবশ্য শিখার জন্য কেউ জানতে চাইলে ইল্ম গোপন করা বৈধ নয়।

যদি জানা যায় যে, জিজ্ঞাসকের ফতোয়া জিজ্ঞাসার মাধ্যমে মুফতীকে অপদস্থ করা, তাঁর বিদ্যার দৌড় জানা বা পদস্খলন ঘটানো, অথবা 'আইনে ফাঁক' খোঁজা বা নিজের মনের মত ফতোয়া খোঁজা অথবা এঁর ফতোয়া জেনে অন্য মুফতীর ভিন্নতর ফতোয়া নিয়ে বাচ-বিচার ও সমালোচনা করা এবং 'আলেম যত ফতোয়া তত' বলে আলেম সমাজের বদনাম করা ইত্যাদি নোংরা ও অসৎ উদ্দেশ্য হয় তাহলে তাকে ফতোয়া দেওয়া ওয়াজেব নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে জায়েয নয়।

যেমন তখনও ফতোয়া দেওয়া উচিত নয় যখন জানা যায় যে, ফতোয়া দিলে এই ফতোয়ার কারণে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ বিপত্তি ও ক্ষতির সৃষ্টি হবে। তখন দুই বিপত্তির ক্ষুদ্রটিকে স্বীকার করে বৃহৎটিকে সংঘটিত হতে না দেওয়ার জন্য ফতোয়া দানে বিরত হওয়া ওয়াজেব।

তদনুরূপ জিজ্ঞাসকের উচিত ও অবশ্যকর্তব্য এই যে, তার ঐ ফতোয়া জিজ্ঞাসায় যেন সেই অনুযায়ী আমল করা উদ্দেশ্য হয়। আর এর পশ্চাতে 'ফাঁক খোঁজা' বা মুফতীর বিদ্যা মাপা ইত্যাদি অসৎ উদ্দেশ্য যেন না হয়।

দ্বিতীয়তঃ এমন মুফতীর নিকট ফতোয়া জিজ্ঞাসা করবে যিনি ফতোয়া দানের উপযুক্ত, এবং তার প্রবল ধারণামতে তিনিই যোগ্যতম ও অভিজ্ঞতম আলেম। যিনি তাকওয়া ও আমলে অন্যান্য থেকে শ্রেষ্ঠ। নচেৎ 'এর-ওর' নিকট থেকে ফতোয়া নিয়ে আমল করা যথেষ্ট নয়। যেহেতু না জানলে আল্লাহ আহলে ইল্মকে জিজ্ঞাসা করতে বলেছেন। আর আহলে ইল্ম কে তা এ পুস্তিকার বহু স্থানে আলোচিত হয়েছে।

আবার ফতোয়া দানে খেয়ালখুশীর বশবর্তিতা, কিতাব ও সুন্নাহর মত ব্যতীত কোন ভিন্নমতের পক্ষপাতিত্ব এবং চূড়ান্ত সমাধান ছেড়ে নিজের অথবা ওস্তাদের অথবা জিজ্ঞাসকের মনমত ফতোয়া দেওয়া বৈধ নয়। যেমন দু'টি বিতর্কিত বিষয়ের একটি চূড়ান্ত জেনেও এরূপ বলা বৈধ নয় যে, 'এটাও ঠিক ওটাও ঠিক।' বরং যেটাই সঠিক ও শুদ্ধ প্রমাণসিদ্ধ সেটাই ব্যক্ত করা উচিত ও জরুরী। আবার অল্প বিদ্যায় ফতোয়া দেওয়া উচিত নয়। সুহনূন বিন সাঈদ বলেন, 'যার ইল্ম কম সেই বেশী ফতোয়া দেওয়ার জন্য শীঘ্রতা করে। তার নিকট কিছু ইল্ম হলে (দু'চারটি বিরল কিতাব পত্র পাঠ করে) ভাবে প্রকৃত ইল্ম ও হক তারই নিকট। আর এর ফলে প্রকৃত মুফতী ও আলেমদের বিরোধিতা শুরু করে। যেহেতু 'অল্প জলে পুঁটি মাছ ফফর্ করে।' (জামে' ২/১৬৫)

আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগত তালেবে ইল্মের নির্দিষ্ট পরিচয়ের কোন রঙ নেই। ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) অনুগত বান্দার লক্ষণ উল্লেখ করে বলেন, 'সে কোন নির্দিষ্ট (দলীয়) নামের বাঁধনে নিজেকে বাঁধে না, কোন পরিকল্পনা বা প্রতীকের ফাঁদে সে ফাঁসে না, কোন নির্দিষ্ট নাম বা পরিচ্ছদে সে সুপরিচিত হয় না এবং মনগড়া কল্পিত পদ্ধতি ও নীতিও সে মানে না। বরং যখন সে জিজ্ঞাসিত হয় যে, 'তোমার গুরু কে?' তখন বলে, 'রসূল।' 'তোমার নীতি কি?' বলে, 'অনুসরণ।' 'তোমার পরিচ্ছদ কি?' বলে, 'সংযম (তাকওয়া)।' 'তোমার মযহাব কি?' বলে, '(কুরআন ও) সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা।' 'তোমার উদ্দেশ্য কি?' বলে, 'আল্লাহর সন্তুষ্টি।' 'তোমরা খানকাহ কোথায়?' বলে, 'মসজিদ।' 'তোমার বংশ কি?' বলে, 'ইসলাম----।'

শায়খ বকর আবু যায়দ তালেবে ইল্মকে সম্বোধন করে অসিয়ত করে বলেন, 'ইসলাম (আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ) ও সালাম (শান্তি) ছাড়া মুসলিমদের আর কোন নিদর্শন নেই। অতএব হে তালেব ইল্ম! আল্লাহ তোমার মধ্যে ও তোমার ইলমে বর্কত দান করুন। ইল্ম সন্ধান কর। আমল অন্বেষণ কর এবং আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান কর সলফের পথ ও পদ্ধতিমতে। কোন জামাআতে (দলে বা সংগঠনে) প্রবেশ করো না। তা করলে প্রশস্ততা থেকে তুমি সঙ্কীর্ণ খাঁচায় বন্ধ হয়ে যাবে। ইসলামের পুরোটাই তোমার জন্য চলার পথ ও জীবন-পদ্ধতি এবং সমগ্র মুসলিমরাই এক জামাআত। আর আল্লাহর হাত জামাআতের উপর। যেহেতু ইসলামে কোন দলাদলি নেই। আমি তোমার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি যে, তুমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন বাতিল ফির্কা, জামাআত; মষহাক এবং অতিরঞ্জনকারী দলের মাঝে দৌড়ে না যাও, তার উপর তুমি তোমার সম্প্রীতি ও বিদ্বেষের বুনিয়াদ না রাখ। সুতরাং তুমি রাজপথের তালেবে ইল্ম হও, সুন্নাহর অনুসারী হও, সলফের (সাহাবাবৃন্দের) পদাঙ্কানুসরণ কর, সজ্ঞানে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান কর। মানীদের মান ও অগ্রগামিতা স্বীকার কর। জেনে রেখ, অভিনব গঠন ও গতিভিত্তিক দলাদলি যা সলফের যুগে পরিচিত ছিল না তা ইল্মের পথে প্রধান প্রধান প্রতিবন্ধকসমূহের অন্যতম এবং জামাআত ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ। যেহেতু এই দলাদলিই ইসলামী সংহতির রজ্জুকে কত ক্ষীণ করে ফেলেছে এবং এরই কারণে মুসলিম সমাজে কত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে! অতএব আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হন তুমি বিভিন্ন দল ও ফিকা থেকে সাবধান হও; যার চক্রান্ত ও দুরভিসন্ধি সুস্পষ্ট। এ সমস্ত দল তো গৃহছাদে সংযুক্ত পানি নিকাশের পাইপের মত; যা ঘোলা পানি সমূহকে (নিজের মধ্যে একত্রে) জমা করে এবং নিরর্থক বর্জন করে। তবে হ্যাঁ, তোমার প্রতিপালক যার প্রতি করুণা করেছেন ফলে সে নবী ও তাঁর সাহাবাবৃন্দের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।' (তাসনীফুন্নাস)

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টতা

📄 পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও শিষ্টতা


তালেবে ইল্মের উপর ওয়াজেব বিদআত ও কুসংস্কার হতে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং সর্বাবস্থায় রসূল ﷺ এর আদর্শ-অলঙ্কারে নিজেকে অলঙ্কৃত করা। অযু, গোসল তথা দেহ, লেবাস এবং বাসস্থানের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি যথাসাধ্য খেয়াল ও চেষ্টা রাখা।

আব্দুল মালেক মায়মুনী বলেন, 'আমি জানি না যে, আমি আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) অপেক্ষা অধিকতর পোশাকে পরিচ্ছন্ন, গোঁপ, চুল ও অতিরিক্ত লোম প্রভৃতি পরিষ্কার রাখতে নিজের প্রতি যত্নবান এবং পরিধানে পবিত্র ও শুভ্র আর অন্য কাউকে দেখেছি।'

যেহেতু ইমাম আহমদ (রঃ) সুন্নাহর সাথে চলতেন এবং সুন্নাহর সাথে থামতেন। তিনি বলেন, 'আমি এমন কোন হাদীস লিখিনি যার উপর আমি আমল করিনি। এমন কি আমার নিকট এক হাদীস এল যে, “নবী ﷺ (দূষিত রক্ত বের করার জন্য) শৃঙ্গ লাগালেন এবং (শৃঙ্গ-ওয়ালা) আবূ তাইবাকে এক দীনার দিলেন।” তখন আমিও শুঙ্গ লাগিয়ে শুঙ্গ-ওয়ালাকে এক দীনার দিলাম।

পরিছন্নতার এ উদ্দেশ্য নয় যে, তাতে অতিরঞ্জন, বিলাসিতা ও গর্ব করা হবে। বরং উদ্দেশ্য মধ্যপন্থা। রসূল ﷺ বলেন, “পরিচ্ছদে বিনতি ঈমানের এক অংশ।” (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ ৩৪১ নং)

আবু আব্দুল্লাহ আলবুশাঞ্জী বলেন, 'উক্ত হাদীসের অর্থ, পরিধান ও শয্যায় বিলাসহীন (মামুলী ধরনের) বস্ত্র ব্যবহার ঈমানের মধ্যে গণ্য। আর তা হচ্ছে লেবাস ও বিছানায় বিনয় প্রকাশ করা; অর্থাৎ তাতে অধিক মূল্যবান এমন বস্ত্র ব্যবহার না করা যা সংসার-অনুরাগী মানুষদের লেবাস।' (আল জামে' লিআখলাকির রাবী অসসামে' ১/১৫৪)

খতীব (রঃ) বলেন, 'ক্রীড়া-কৌতুক, রঙ-তামাশা, জনসমক্ষে নির্বুদ্ধিতা, অট্টহাসি, হা-হা ধ্বনি, অদ্ভুত ও আনখা কথা এবং অধিকরূপে ও সর্বদা মজাক-ঠাট্টা ও উপহাস দ্বারা প্রগল্ভতা প্রকাশ করে ধৃষ্ট হওয়া থেকে দূরে থাকা ওয়াজেব। স্বল্প ও বিরল হাসিই হাসা বৈধ যা আদবের সীমা এবং ইলমের আদর্শ-বহির্ভূত না হয়। পক্ষান্তরে নিরবচ্ছিন্ন, অশ্লীল, নির্বুদ্ধিতাব্যঞ্জক, ক্রোধ সঞ্চারক এবং বিবাদ-বিপত্তি আনয়নকারী হাসি-তামাশা নিন্দিত। অতিশয় হাসি-মজাক মানুষের মর্যাদা হ্রাস করে এবং চক্ষুলজ্জা ও শালীনতা দূর করে দেয়।'

ইমাম মালেক (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইল্ম অন্বেষণ করে তার মধ্যে মর্যাদাশালী ব্যক্তিত্ব, গাম্ভির্য এবং আল্লাহভীতি থাকা আবশ্যক। আর সে যেন বিগত ওলামাদের আদর্শের অনুসারী হয়।'

সাঈদ বিন আমের বলেন, 'আমরা হিশাম দাস্তাওয়ায়ীর নিকট ছিলাম। এমন সময় আমাদের মধ্যে একজন (কোন কথায়) হেসে উঠল। হিশাম তাকে বললেন, 'হাসছ, অথচ তুমি হাদীস অনুসন্ধান করছ?!'

আব্দুর রহমান বিন মাহদী বলেন, 'হিশাম দাস্তাওয়ায়ীর নিকট এক ব্যক্তি হাসলে তিনি তাকে বললেন, 'হে যুবক! তুমি ইল্ম অন্বেষণ করছ আর হাসছ?!' লোকটি বলল, 'আল্লাহই কি হাসান না ও কাঁদান না?' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি কাঁদ।' (আলজামে' লিআখলাকির রাবী ১/১৫৬)

মোটকথা, সুন্নাহর অনুসরণ, সুন্দর বেশভূষা এবং দেহ ও পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদের পরিচ্ছন্নতা দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন সকল মুসলিমের জন্য বাঞ্ছিত। কিন্তু তা তালেবে ইলমের নিকট হতে অধিক তাকীদরূপে প্রার্থিত। যেহেতু ইল্ম তাকে শালীনতা ও মর্যাদাবোধের প্রতি দিগ্গ্‌দর্শন করে।

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “সে ব্যক্তি বেহেশ্ প্রবেশ করবে না যে ব্যক্তির হৃদয়ে অণুপরিমাণও অহংকার থাকবে।” এক ব্যক্তি বলল, '(হে আল্লাহর রসূল!) মানুষ তো এটা পছন্দ করে যে, তার পরিধেয় বস্ত্র এবং জুতা সুন্দর হোক।' তিনি বললেন, “আল্লাহ তো সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার তো ন্যায়কে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করার নাম।” (মুসলিম)

রসূলুল্লাহ ﷺ সুগন্ধি ভালোবাসতেন এবং যত্ন করে তা নির্দিষ্ট পাত্রে জমা রাখতেন। (মুখতাসারু শামায়িলিত্ তিরমিযী, আলবানী ১১৭ পৃঃ) দুর্গন্ধযুক্ত বস্তুকে অতিশয় ঘৃণা করতেন। কাঁচা পিঁয়াজ, রসূন ও কুরাসের উগ্র গন্ধকে নিতান্ত মন্দবাসতেন। যার জন্য যারা এসব ভক্ষণ করে তাদের মসজিদ প্রবেশ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। (মুসলিম)

তাই তালেবে ইল্মকেও এমন দুর্গন্ধময় বস্তু ব্যবহার না করা উচিত, যাতে অপর লোকে কষ্ট পায় এবং কাঁচা পিঁয়াজ, রসূন অপেক্ষাও নিকৃষ্টতর দুর্গন্ধযুক্ত ও ঘৃণিত বস্তু যেমন, বিড়ি, সিগারেট, তামাক, খইনি, গুল, গোরাকু, জর্দা প্রভৃতি থেকেও বহু সুদূরে থাকা ওয়াজেব। যেহেতু এগুলি তো এমনিতেই হারাম, তাহলে তালেবে ইল্মের ক্ষেত্রে কি তা সহজে অনুমেয়।

যেমন, নবী ﷺ ৪০ দিনের পূর্বে-পূর্বেই গোঁফ ছাঁটতে, নখ কাটতে, বগল ও নাভির নিম্নাংশের লোম ফেলতে নির্দেশ দিয়েছেন, দাঁতন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন ইত্যাদি। সুতরাং তালেবে ইল্মকে সেই সব সুন্নাহর অনুসরণ করে বাহ্যিক পরিছন্নতা অর্জন করা আবশ্যক। যেহেতু তারাই নবুয়তের ইল্ম-সন্ধানী। অতএব তাদেরকেই নবী ﷺ এর সুন্নাহর অধিক অনুবর্তী হওয়া উচিত।

পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা মানুষকে সজীব, সতেজ ও তরোতাজা করে এবং হৃদয়-মনে এনে দেয় আনন্দ, উল্লাস ও স্ফুর্তির আমেজ। সুতরাং নিয়মিতভাবে নিজের বাড়িতে পড়ার কক্ষ, খাবার রুম, শোবার জায়গা এবং তদনুরূপ স্কুল বা মাদ্রাসাতেও নিজের সকল প্রকার অবস্থানক্ষেত্র, নিজের পরিধেয় কাপড়-চোপড়, দেহ-মন প্রভৃতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা তালেবের কর্তব্য। যেমন নিজের বই-পত্র ভালোভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে ওযু-গোসল করা উচিত। ভোরের তাজা হাওয়া খাওয়ার সাথে একটু শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করার ফলে সারা দিন শরীর ও মনটা স্বচ্ছ, নির্মল ও জড়তাহীন থাকে। ফলে পাঠেও মন বসে ভালো। এইভাবে পরিচ্ছন্নতার সাথে প্রত্যহ একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা ও দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী চললে 'ইলম খুব সহজে রপ্ত হয়।

অনুরূপভাবে তালেবে ইল্মের জন্য আবশ্যক, সর্বপ্রকার নোংরা আচরণ, অশ্লীল ব্যবহার ও গুণ হতে স্বীয় আত্মকে শুদ্ধ ও পবিত্র রাখা। যেহেতু ইল্ম অন্তরের ইবাদত, গুপ্ত নামায এবং বাতেনী নৈকট্য। বাহ্যিক অঙ্গসমূহের কৃত নামায যেরূপ অপবিত্রতা ও নোংরামী থেকে বাহ্যিক দেহকে পবিত্র না করে গ্রহণযোগ্য হয় না, ঠিক তদ্রূপই গুপ্ত ইবাদত এবং ইলম দ্বারা হৃদয়ের আবাদ অসদাচরণ ও দুষ্ট পাপগুণ হতে অভ্যন্তরকে পবিত্র ও পরিষ্কার না করে শুদ্ধ হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنِ نَجَسٌ অর্থাৎ, মুশরিকরা তো অপবিত্র। (সূরা তওবা ২৮- আয়াত) এই বাণী এ বাস্তবের প্রতিই ইঙ্গিত করে যে, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা কেবল বাহ্যিক ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সহিতও সম্পৃক্ত। তাই তো মুশরিকের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র ও পরিষ্কার হতে পারে এবং তার দেহ ধৌত হতে পারে; কিন্তু মূলতঃ সে অপবিত্র। তার অভ্যন্তর নোংরামীতে পরিপূর্ণ। আর অপবিত্রতা তাকে বলা হয় যা থেকে হৃদয় দূরে থাকতে চায় এবং যা হতে বাঁচা হয়। বাহ্যিক অপবিত্রতার চেয়ে আভ্যন্তরিক অপবিত্রতা অধিক মারাত্মক যা ভবিষ্যতে ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী করে। তাই এই অপবিত্রতা থেকে সাবধানতা অধিক যত্ন পাবার যোগ্য।

ইবনে উমর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদা জিবরীল (আঃ) রসূল ﷺ এর নিকট আসার ওয়াদা দিয়ে আসতে বিলম্ব করলেন। শেষ পর্যন্ত রসূল ﷺ এর পক্ষে (এ প্রতীক্ষা) কঠিন হয়ে উঠল। তিনি (গৃহ হতে) বের হয়ে গেলেন। (বাইরে) জিবরীল (আঃ) তাঁর সহিত সাক্ষাৎ করলেন। তিনি (বিলম্ব হওয়ার) অভিযোগ জানালে জিবরীল (আঃ) বললেন, 'আমরা সে ঘরে প্রবেশ করি না যে ঘরে কুকুর বা মূর্তি (ছবি) থাকে।' (বুখারী)

আবু হামেদ গাযালী (রাঃ) বলেন, 'হৃদয় এক গৃহ; যা ফিরিশা ও তাঁদের প্রভাব অবতরণের স্থান এবং তাঁদের বাসস্থান। আর নিকৃষ্ট গুণ যেমন, ক্রোধ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, হিংসা, অহংকার, গর্ব ইত্যাদি ঘেউ-ঘেউকারী কুকুরদল। তাহলে তাতে ফিরিস্তা কেমন করে প্রবেশ করবে যদি তা কুকুরদলে পরিপূর্ণ হয়?' (ইহয়াউ উলুমিদ্ দীন ১/৪৩)

ইবনে জামাআহ বলেন, 'তালেবে ইলমের উচিত, তার হৃদয়কে প্রত্যেক প্রতারণা, নোংরামী, বিদ্বেষ, হিংসা, কুবিশ্বাস এবং কুচরিত্রতা থেকে পবিত্র করা; যাতে করে তা'ই গ্রন্থণ ও হিফয করা, সূক্ষা মর্মার্থ এবং নিগূঢ় তন্ত্রের রহস্য উদ্‌ঘাটন করার জন্য যথাযোগ্য হয়ে উঠে। যেহেতু ইল্ম হল-যেমন কিছু ওলামা বলেন,- 'গুপ্ত নামায, আন্তরিক ইবাদত এবং বাতেনী নৈকট্য।'

ইল্মের জন্য অন্তরকে যদি বিশুদ্ধ করা যায় তবে ইল্ম বৃদ্ধি পায় এবং তার বর্কত প্রকাশিত হয়। যেমন কোন জমিকে যদি চাষের জন্য ঘাস, আগাছা ইত্যাদি থেকে পরিষ্কার করে উপযুক্ত করা হয় তবে তার ফল-ফসল বৃদ্ধিলাভ করে থাকে। রসূল ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, দেহের মধ্যে একটি পিন্ড আছে; যা সংশোধিত হলে সারা দেহ সংশোধিত হয় এবং তা বিকারগ্রস্ত হলে সারা দেহ বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। জেনে রেখো, তা হল হৃৎপিন্ড (বা হৃদয়)। (বুখারী ও মুসলিম)

সাহল বলেন, 'সেই হৃদয়ে (ইলমী) নূর প্রবেশ করা অসম্ভব যে হৃদয়ে এমন বস্তু অবশিষ্ট থাকে যা আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অপছন্দ করেন।' (তাযকিরাতুস সা-মে' ৬৭ পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইল্মের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা একান্ত আবশ্যক। তওবা ও অনুশোচনার সাথে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে পাপ ও অন্যথাচরণ হতে প্রত্যাবর্তন করা নিতান্ত জরুরী। যেহেতু পাপ ও অবাধ্যতায় এমন কুপ্রভাব আছে যাতে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হতে হয় অথবা তার বর্কত উঠে যায়।

ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'পাপাচরণের নিকৃষ্ট ও নিন্দিত প্রভাব আছে, যা অন্তর ও দেহের পক্ষে ইহ-পরকালে এতই অপকারী যে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তন্মধ্যে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হওয়া অন্যতম। যেহেতু ইল্ম একপ্রকার নূর (জ্যোতি) যা আল্লাহ তাআলা মানুষের হৃদয়ে প্রক্ষেপ করে থাকেন। আর পাপাচরণ ঐ জ্যোতিকে নির্বাপিত করে ফেলে।'

একদা ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালেকের সম্মুখে পড়তে বসলে ইমাম মালেক তাঁর সজাগ বুদ্ধিমত্তা, মেধার ঔজ্জ্বল্য এবং উপলব্ধির পরিপূর্ণতা দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, 'আমি দেখছি যে, আল্লাহ তোমার হৃদয়ে নূর প্রক্ষিপ্ত করেছেন। অতএব তা পাপাচরণের অন্ধকার দ্বারা নিভিয়ে দিও না।'

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,

شكوت إ وكيع سوء حفظي + فأرش - د إ ترك ا ع - اصي

وأخـ ـ بأن الع ـ لم نور + ونور الله لا يهـ ـ دى لع ـ اصي

'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম আল্লাহর তরফ হতে আসা অনুগ্রহ বা) নূর। আর আল্লাহর (অনুগ্রহ বা) নূর কোন পাপিষ্ঠকে দেওয়া হয় না।' (আল জওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (কুঃ ১৩/১১)

তিনি আরো বলেন,

كلا بَل رَانِ عَلَى قُلُوبِهِمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

অর্থাৎ, কক্ষনো না। ওদের কৃতকর্মের ফলেই ওদের হৃদয়ে জং ধরে গেছে। (কুঃ ৮৩/১৪)

ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জালা' হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক খ্রীষ্টান সুবদন কিশোরের প্রতি তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় আবূ আব্দুল্লাহ বালখী আমার নিকট বেয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কেন দাঁড়িয়ে আছ এখানে?' আমি বললাম, 'চাচাজী! আপনি কি ঐ রূপ দেখছেন না? কিভাবে ওকে অগ্নিদগ্ধ করা হবে?' তা শুনে তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধে মেরে বললেন, 'এর প্রতিফল তুমি পাবেই, যদিও কিছু বিলম্বে।' তিনি বলেন, 'আমি তার প্রতিফল ৪০ বছর পর পেলাম; আমাকে কুরআন ভুলিয়ে দেওয়া হল।'

আবু আইয়ান বলেন, আমি আমার ওস্তায আবুবকর দাক্কাকের সহিত ছিলাম। ইতিমধ্যে এক কিশোর পার হয়ে যাচ্ছিল। আমি তার দিকে তাকিয়ে ফেললাম। আমার ওস্তায আমাকে ওর প্রতি তাকিয়ে থাকতে দেখলে তিনি আমাকে বললেন, 'বেটা! এর প্রতিফল তুমি পাবে -যদিও কিছু পরে।' অতঃপর আমি ২০ বছর ধরে লক্ষ্য করেও ঐ প্রতিফল বুঝতে পারলাম না। একদা রাত্রিকালে ঐ কথা চিন্তা করে ঘুমিয়েছি। সকালে জাগ্রত হয়ে দেখি আমাকে কুরআন বিস্মৃত করা হয়েছে। (তালবীসে ইবলীস ৩১০ পৃঃ)

এ তো সুদর্শন কিশোর দেখার প্রতিফল। তাহলে সুবদনা ও সুদর্শনা কিশোরী ও যুবতী দেখলে এবং তাদের সহিত অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করলে তার প্রতিফল কি?

মনের মণিকোঠা যদি বাজে চিন্তা, যৌন ও অশ্লীল কল্পনা এবং কোন অবৈধ নারী-প্রেমের মৃদু পরশ থেকে মুক্ত ও পবিত্র না হয় তাহলে সফলতার আশা নেই। প্রেমের আবেগে পড়ে ধৃৎল হবে জীবনের বহু মূল্যবান সময়; অবাস্তৰ কল্পনাবিহারে নষ্ট হবে সুন্দর ও স্বচ্ছ স্মৃতি ও বুঝশক্তি।

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 বিরহ ও বিরাগ

📄 বিরহ ও বিরাগ


আর কামনার দহন ও কামড়ে নিপীড়িত হবে সুস্বাস্থ্য। ফলে উপর-পড়া ঐ সতীনের ঈর্ষায় ইল্ম যে তালেবের নিকট থেকে 'খোলা তালাক' নিয়ে বিদায় নেবে তা বলাই বাহুল্য।

আবু হামেদ বলেন, যদি তুমি বল যে, 'কত অসৎচরিত্রের তালেবে ইল্ম ইল্ম অর্জন করেছে। (পাক্কা আলেম হয়েছে) তাহলে?' কিন্তু প্রকৃত উপকারী, পরকালে ফলপ্রদ এবং সৌভাগ্য আনয়নকারী ইল্ম থেকে তারা বহু দূরে। যেহেতু এই ইলমের অগ্রভাগে সেই মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হবে যাতে তালেবে ইল্ম পাপাচরণকে সর্বনাশী ও সর্বহারী হলাহল জানবে। অথচ তুমি কি দেখেছ যে, প্রাণহারী গরল জানা সত্ত্বেও কেউ তা ভক্ষণ করছে? তুমি যা ঐ শ্রেণীর আলেমদের নিকট থেকে শুনে থাক তাতো মুখের কথামাত্র যা ওরা কখনো তাদের জিহ্বা দ্বারা শোভন করে প্রকাশ করে থাকে আবার কখনো তাদের অন্তর দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। আর তা ইল্মের কোন অংশই নয়।

ইবনে মাসউদ বলেন, 'অধিক রেওয়ায়েত (বর্ণনা করা)ই ইল্ম নয়। ইল্ম তো এক জ্যোতি যা হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত হয়।' অনেকে বলেন, ইল্ম তো আল্লাহভীতির নাম। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে থাকে।” (সূরা ফাতির ২৮) সম্ভবতঃ তাঁরা ইলমের বিশেষ সুফলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই জন্যই কিছু গবেষক উলামা বলেন, কিছু উলামার এই উক্তি, 'আমরা গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখলাম; কিন্তু ইল্ম আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে হতে অস্বীকার করল' এর অর্থ; ইল্ম আমাদের হৃদয়ে আসতে অসম্মত হল এবং অস্বীকার করল। ফলে তার প্রকৃতত্ব আমাদের নিকট উদ্‌ঘাটিত হল না। আমরা যা অর্জন করলাম তা হলো, শুধু তার বাক্য এবং শব্দাবলী। (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ১/৪৯)

সুতরাং তালেবে ইলমের উচিত ভিতর-বাহিরকে পরিষ্কার করা। যা কিছু শিখবে তার আদর্শকে নিজের উপর সর্বাগ্রে কার্যকর করা। এতে তার হৃদয়ে ইলমের আলো উদ্ভাসিত হবে; জ্ঞানপুষ্প বিকশিত হবে এবং হিকমত ও প্রজ্ঞার খনিদ্বার উন্মুক্ত হবে। আর তা হল আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ বিতরণ করে থাকেন এবং তিনি মহান অনুগ্রহশীল।

ইলমের পথ এমন এক পথ; যে পথে চলতে ধৈর্য চাই, বিসর্জন চাই, চাই বিভিন্ন অভ্যাস, আচার-আচরণ বর্জন করা, বহু সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং বহু বাধা-বিপত্তি উল্লংঘন করার ক্ষমতা। ইলমের পথ এমন পথ, যে পথে চিরাচরিত প্রথা ও লৌকিকতা চুরমার হয়ে যায়। বাপ-দাদার পালিত আচার অনুষ্ঠানকে সমাধিস্থ করতে হয়। গুপ্ত ও প্রকাশ্য পাপের প্রতিবন্ধকসমূহকে ডিঙিয়ে চলতে হয়। শির্ক, বিদআত ও গোনাহর অবরোধ ভেঙ্গে আল্লাহর নৈকট্যের প্রতি ধাবিত হতে হয়। তওহীদ দ্বারা শির্কের বেড়া ভেঙ্গে, সুন্নাহ দ্বারা বিদআতের বাঁধ ভেঙ্গে এবং শুদ্ধ তওবা দ্বারা গোনাহ ও পাপাচরণের বেষ্টন ভেদ করে অগ্রসর হতে হয়।

সেই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় যা আল্লাহ ও তাঁর রসূল ব্যতীত অন্যের সাথে হৃদয়কে আবিষ্ট করে। পার্থিব সুখ-সম্ভোগ, কামনা-বাসনা, নেতৃত্ব ও গদি-লোভ, মানুষের সহিত গাঢ় সংস্রব প্রভৃতি পশ্চাতে ত্যাগ করে আসতে হয়। তবেই সে পথে চলা সহজ হয়। তবেই পাওয়া যায় প্রিয়তম ইলমের সাক্ষাৎ ও তার মিলন-স্বাদ। সকল প্রিয়তমের বিরহে ব্যথিত হলে, সকল প্রিয় বস্তু বিরাগভাজন হলে তবেই ইলম তার অভিমান ছেড়ে নিজ মিলন দেয়। নচেৎ ঈর্ষার সাথে দূর হতেই সালাম দিয়ে প্রস্থান করে।

ইল্ম-প্রেমী তালেবে ইল্মের নিকট ইল্ম ছাড়া অন্যকিছু প্রিয় নয়। তাইতো প্রিয়র উদ্দেশ্যে সকল কিছুকে উৎসর্গ করে। পার্থিব ভোগ-বিলাস, স্ত্রী-সংসর্গ সুখ, পিতামাতার স্নেহছায়া, সন্তান-সন্ততির মায়া-মমতা ভাই বন্ধুদের সাহচর্য প্রভৃতি অনায়াসে ত্যাগ করে ইলমের প্রেম বহাল রাখে। কারণ, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ তো মাত্র কয়দিনের। সব নিঃশেষ হয়ে যাবে নিশ্বাস বন্ধ হলেই। আজকের যে সাথী কাল তো সে আমার সাথে থেকে কোন উপকার করবে না। অতএব সবকিছু মিছা মায়া মরীচিকা।

ইমাম আহমদ (রঃ) বলেন, 'যখন মরণের উল্লেখ করা হয় তখন পার্থিব সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। দুনিয়া তো কয়দিনের খাওয়া-পরার নাম মাত্র।'

আশআস বিন রবী' বলেন, আমাকে শো'বা বললেন, 'তুমি তোমার ব্যবসা ধরে থাকলে, ফলে তুমিই সফল ও কৃতার্থ হলে। আর আমি হাদীস (শিক্ষা) ধরে থাকলাম, ফলে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00