📄 ওলামা ও শাসকগোষ্ঠী
কতক উলামা আছেন যাঁরা ইল্মকে ধনী ও শাসকগোষ্ঠীর নৈকট্যলাভের এবং তাদের নিকট হতে কিছু অর্থ ও স্বার্থ-সিদ্ধিলাভের অস্ত্র স্বরূপ ব্যবহার করেন। যা কোন আলেমের জন্য নেহাতই নিকৃষ্ট ও নীচ আচরণ। এতে ওদের নিকট ইলমের কদর নষ্ট হয় এবং আলেমদের মান-মর্যাদাও ধূলিসাত হয়। তাই এ বিষয়ে বহু সলফে সালেহীন উলামা সমাজকে সচেতন করে বহু উপদেশ প্রদান করে গেছেন।
জা'ফর সাদেক বলেন, 'ফকীহগণ রসূলগণের আমানতদার ও বিশ্বস্ত (প্রতিনিধি); যতক্ষণ তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর দরজায় না আসে।'
সুফিয়ান বলেন, 'কোন বান্দা হতে যখন আল্লাহর প্রয়োজন থাকে না তখন তিনি তাকে শাসকগোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দেন। যখন কোন ক্বারীকে কোন নেতার দুয়ারে ধরনা দিতে দেখবে তখন জেনো যে, সে চোর! আর তাকে যদি ধনবানদের দরজায় পড়ে থাকতে দেখ তাহলে জেনো যে, সে কপট।'
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'শাকসগোষ্ঠীর দুয়ারে উটের আস্তাবলের মত বহু ফিতনা আছে। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার আত্মা আছে, তোমরা যে পরিমাণ অর্থ তাদের নিকট হতে গ্রহণ করবে তার সমপরিমাণ অথবা তার দ্বিগুণ পরিমাণ দ্বীন ওরা তোমাদের নিকট থেকে বিনষ্ট করে ফেলবে।'
ফযাইল বিন ইয়ায সুফিয়ান বিন উয়াইনাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, 'তোমরা উলামার দল দেশের প্রদীপ ছিলে, তোমাদের দ্বারা সব আলোকিত হত, কিন্তু এখন তোমরা নিজেরাই আঁধারে পরিণত হয়ে গেছ। তোমরা সেই তারকাপুঞ্জ ছিলে যাদের দ্বারা পথ চেনা যেত, কিন্তু আজ তোমরা নিজেরাই গোলক-ধাঁধা বনে গেছ। তোমাদের কেউ কি আল্লাহকে লজ্জা করে না - যখন সে ঐ আমীরদের নিকট উপস্থিত হয়ে ওদের মাল গ্রহণ করে? অথচ সে জানে যে, ওরা তা কোথা হতে সংগ্রহ করেছে। অতঃপর মিহরাবে এসে নিজের পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলে, 'আমাকে অমুক হতে অমুক হাদীস বর্ণনা করেছে----!'
ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'ইবলীসের গুপ্তপ্রতারণার মধ্যে এক প্রকার প্রতারণা হচ্ছে, আমীর ও শাসকগোষ্ঠীর সহিত ওলামাদের সংস্রব ও মিলা-মিশা রাখা, তাদের তোষামদ করা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের অসৎ কাজে বাধা না দেওয়া। কখনো বা তাদেরকে এমন কাজের অনুমতি খুঁজে দেয় যে কাজে ওদের জন্য কোন অনুমতী থাকে না; যাতে ওদের নিকট তারা কিছু পার্থিব সম্পদ ও স্বার্থ উদ্ধার ও উপভোগ করতে পায়। ফলে এর দ্বারা তিন প্রকার লোক তিনভাবে ফাসাদ ও বিপত্তিতে আপতিত হয়;
প্রথমতঃ আমীর বলে, 'যদি আমি সঠিকতার উপর না হতাম তাহলে অমুক আলেম (ফকীহ) আমাকে বাধা দিতেন। আমি সৎ ও সঠিক না হলে উনি আমার মাল খেতেন কেন?'
দ্বিতীয়তঃ জনসাধারণ; তারা বলে, 'আমাদের আমীর, তার সম্পদ ও কর্মে কোন ত্রুটি নেই। যেহেতু অমুক আলেম তো দেখছি অহরহ উনার কাছে যান ও খান।'
তৃতীয়তঃ ঐ আলেম; যিনি এই কর্মের ফলে নিজের দ্বীনকে নষ্ট করেন।
📄 পদ ও খ্যাতি
আলেমদের একটি সম্প্রদায়ের হৃদয়ে পদলোভ এবং প্রসিদ্ধি-লালসা উপচীয়মান থাকে। গুপ্ত আত্মশ্লাঘায় নিজেকেই ঘোষিত পদের যোগ্যতম সভ্য মনে করেন অথচ তিনি সেরূপ নাও হতে পারেন। যশস্কাম মানসে নিজস্ব ক্ষমতার বাইরেও প্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটাতে চান, চান বসন্তের সকল প্রস্ফুটিত পুষ্পরাজীর সৌরভ কেবল তাঁরই পুষ্প হতে সারা বিশ্বে বিতরিত হোক। তাই তিনি সর্বদা পদ, নেতৃত্ব, সর্দারী ইত্যাদির সন্ধানে ফেরেন।
এমন শ্রেণীর পদ-লোভী আলেমদের প্রসঙ্গে নবী ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন সৃষ্টির মধ্য হতে সর্বপ্রথম যার উপর অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে সে হল এমন ক্বারী বা আলেম যে কুরআন পড়ে বা ইল্ম শিখে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে 'ক্বারী' বা 'আলেম' বলা হোক। যাকে তার মুখ ছেঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে আদেশ দেওয়া হবে। অনুরূপ ঐ প্রকার দানশীল ও যোদ্ধাকে শাস্তি দেওয়া হবে। (মুসলিম) যারা নাম ও যশ লাভের উদ্দেশ্যে নিজেদের সামর্থ্য ব্যয় করেছে।
এমন লোকদের স্বাভাবিক আচরণ এও যে, তাঁরা কোন সমবায় সংস্থা বা সংগঠনে সংযুক্ত থাকলে মনে মনে তার পরিচালনাভার কামনা করেন। নির্বাচনের সময় সে কামনায় সফলকাম না হলে ক্ষুব্ধ হয়ে সে সংস্থা বা সংগঠন সত্বর পরিত্যাগ করে বসেন। যার ফলে যে কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বিঘ্নিত ও বিপর্যস্ত হতে বাধ্য হয়। কখনো বা বিরোধী পক্ষে গিয়ে মিলিত হলে বিপত্তি আরো বর্ধমান দেখা যায়। তাই তো এমন লালসা বড় নোংরা, বিশেষ করে একজন আলেমের ক্ষেত্রে।
কাসেম বিন উসমান বলেন, 'পদ-লালসা প্রত্যেক ধ্বংসের মূল।'
নবী ﷺ বলেন, “ছাগলের পালে ছাড়া ক্ষুধার্ত দুই নেকড়ের চেয়েও মানুষের সম্পদ-লোভ এবং দ্বীনী মর্যাদা-লালসা অধিক অনিষ্টকারী।” (তিরমিযী, আহমদ, নাসাঈ)
সওরী বলেন, 'নেতৃত্বের মত কোন বিষয়ে অধিকতর স্বল্প বিরাগ আমি কারো মাঝে দেখিনি। তুমি মানুষকে দেখবে যে, সে পান-ভোজনে, সম্পদে ও পরিচ্ছদে অনাসক্ত। কিন্তু নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এলে সেই মানুষকেই তার উপর প্রতিযোগিতায় প্রযত্নবান হতে এবং বিদ্বেষ প্রকাশ করতে দেখবে।'
ইবরাহীম বিন আদহাম বলেন, 'যে ব্যক্তি খ্যাতি পছন্দ করে সে আল্লাহকে সত্য জানে না।'
মুহাম্মাদ বিন আলা' বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে সে এও ভালোবাসে যে, তাকে যেন লোকে না চেনে।'
ফুযাইল বলেন, 'যে ব্যক্তিই নেতৃত্ব পছন্দ করে সেই ব্যক্তিই অপরের প্রতি হিংসা করে, বিদ্রোহ করে, অপরের ত্রুটি ও ছিদ্র অন্বেষণ করে এবং অন্য কাউকে 'ভালো বলে উল্লেখ করাকে অপছন্দ করে।'
সুফিয়ান বলেন, 'যে ব্যক্তি নেতৃত্ব চায় তার উচিত তার মস্তককে 'শিংলড়াই'-এর জন্য প্রস্তুত রাখা।' অর্থাৎ সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য মানুষের উপর অত্যাচার, হিংসা ও বিদ্রোহের জন্য তৈরী হয়ে বাওরা।
📄 ইলম অনুযায়ী আমল
বিশ্ব বলেন, 'যে ব্যক্তি প্রসিদ্ধি চায় তার নিকট তাওয়া আসতে পারে না।'
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'নেতৃত্ব-লোভ প্রত্যেক বিদ্রোহ ও অত্যাচারের মূল।'
মন্দ সঞ্চার ও সঞ্চয়কারী লোভ ছয়টি; বিষয়াক্তি, নেতৃত্ব-লোভ, যশ-লালসা, উদরপূর্তি, অতি নিদ্রা ও আরাম-প্রিয়তা বা বিলাসিতা।
সুফিয়ান সওরী বলেন, '(ইন্ন শিক্ষার পর) কোন আলেম যদি সত্বর নেতৃত্ব অথবা পদ গ্রহণ করে তবে তার বহু ইল্মের ক্ষতি হয়। কিন্তু যখন শিক্ষা করে আর শিক্ষাই করে তখন সে (প্রকৃত যোগ্যতায়) পৌঁছে যায়। (হুলয়্যাহ ৭/৮১)
একটি প্রবাদে আছে, 'যার থাকতে বলদ বোহায়না হাল, তার দুঃখ সর্বকাল।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি অস্ত্রের ভান্ডার মজুদ রেখেও আত্মরক্ষা করতে অলস বা অসমর্থ সে ব্যক্তির ধ্বংস সত্যই প্রহসনজনক। ইল্মের উপকরণ বুকে রেখে মুখে তা বিচ্ছুরিত করে কর্মে রূপায়ন না করা আলেমের জন্য সত্যই ধিক্কারজনক।
কথিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর সহচরবৃন্দের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে বনী ইসরাঈল! অন্ধের জন্য সূর্যালোক উপকারী নয়, কারণ সে দেখতে পায় না। আর আলেমের জন্য ইল্মের আতিশয্য উপকারী নয়, যদি সে তার উপর আমল না করে। যে তালেবে ইল্ম কেবল লেচার দেওয়ার জন্য ইল্ম অন্বেষণ করে এবং আমল করার জন্য তা শিক্ষা করে না সে কি করে আহলে ইলমের মধ্যে গণ্য হতে পারে?'
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'হে ইল্মের বাহকদল! তোমরা ইল্ম অনুসারে আমল কর। যেহেতু আলেম তো সেই ব্যক্তি যে তার ইল্ম দ্বারা আমল করে, যার কর্ম তার ইল্মের অনুবর্তী হয়। অদূর ভবিষ্যতে কিছু সম্প্রদায় এমন হবে যারা ইল্ম বহন করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠদেশের নিচে অতিক্রম করবে না। তাদের আমল ইলমের বিপরীত হবে এবং অভ্যন্তর বাহ্যিক রূপের অন্যথা হবে। জামাআত-জামআত হয়ে বসবে, আর পরস্পর আত্মগর্ব প্রকাশ করবে। এমনকি অনেকে তার সহচরের উপর রাগান্বিত হবে যদি সে তাকে ছেড়ে অন্য কারো সাহচর্যে গিয়ে বসে। ঐসব লোকদের আমল ঐসব মজলিস থেকে আল্লাহর প্রতি উত্থিত হবে না।'
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অহংকারী, মানসপূজারী এবং আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে বিমুখদল ইল্ম অর্জন করে; কিন্তু তারা বুঝে না। যেহেতু তারা মনমত চলে এবং অহংকারের ফলে যা শিখেছে তার প্রতি আমল ত্যাগ করে; ফলে সমঝ-বুঝ এবং জ্ঞান ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়। কারণ, ইল্ম অহংকারীর পরিপন্থী, যেমন পানির স্রোত উঁচু স্থানের প্রতিকূল।
কিন্তু যারা তাঁদের প্রভুকে ভয় করে তারা তাদের ইল্ম অনুযায়ী আমল করে থাকে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে ইল্ম ও জ্ঞান দান করে থাকেন। যেহেতু যে ব্যক্তি তার ইল্ম অনুসারে আমল করে আল্লাহ তাকে আরো অজানা ইলমের অধিকারী করেন।'
মালেক বিন দীনার বলেন, 'বান্দা যখন আমল করার উদ্দেশ্যে ইল্ম অনুসন্ধান করে তখন ইল্ম বর্ধনশীল হয়। আর যখন সে আমল ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তখন ঐ ইল্ম তার দুষ্কর্ম, অহংকার এবং জনসাধারণের প্রতি অবজ্ঞা বৃদ্ধি করে।' বরং এমন অনেক বান্দা তো অহংকারবশে সলফে সালেহীন ও ইমামগণকেও অবজ্ঞা করতে শুরু করে।
হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, 'তুমি তোমার কর্ম ও আমল দ্বারা লোককে নসীহত ও ওয়ায কর, আর কেবল তোমার কথা (বক্তৃতা) দ্বারা ওদেরকে ওয়ায করো না।'
তিনি আরো বলেন, 'মানুষ যখন ইল্ম শিখতে শুরু করে তখনই সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণে, নয়নে, রসনায়, হস্তে, নামাযে এবং অন্যান্য পার্থিব বিষয়ে তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মানুষ যদি কোন ইল্মের দুয়ারে পৌঁছে তার উপর আমল করে তবে তা তার জন্য পৃথিবী ও তন্মধ্যস্থিত সকল বস্তু অপেক্ষা অধিক উত্তম।' (জামে' ১/৬০)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের কর্ম দ্বারা লোককে উপদেশ দেয় সেই হেদায়াতকারী (পথপ্রদর্শক) রূপে পরিচিত হয়।'
যুন্নুন মিস্ত্রী বলেন, 'তুমি তার সাহচর্যে বস যার কর্ম-গুণ তোমার সহিত কথা বলে এবং তার নিকট বসো না যার জিভ তোমাকে কথা বলে। আর বলা হয় যে, 'ওয়াযকারী (বক্তা)র যাকাতের নিসাব হল, প্রথমে নিজেকেই সেই ওয়াযমত প্রস্তুত করা, তাহলে যার নেসাব নেই সে যাকাত দিবে কেমন করে?'
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'তুমি তার মত হয়োনা যে বিনা আমলে পারলৌকিক সুখের আশা করে এবং দীর্ঘ বাসনা হেতু তওবায় বিলম্ব করে। দুনিয়া প্রসঙ্গে বৈরাগীর মত কথা বলে অথচ কর্ম করে দুনিয়াদারের ন্যায়। পার্থিব সম্পদ পেলেও তুষ্ট হয় না, না পেলে বিষয় তৃষ্ণা মিটে না, মানুষকে তা উপদেশ দেয় যা সে নিজে করে না, নেক লোকদের ভালোবাসে কিন্তু তাদের মত আমল করে না। মন্দ লোকদের ঘৃণাবাসে কিন্তু সে তাদেরই অন্যতম। অধিক পাপের জন্য মরণকে ভয় করলেও যার জন্য মরণকে ভয় হয় তাতেই সে অবিচল থাকে।'
তিনি আরো বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে জনসাধারণের ইমাম মনে করে তার উচিত, অপরকে শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে নিজেকে শিক্ষা দেওয়া এবং মুখ দ্বারা আদব দেওয়ার পূর্বে সদাচরণ ও সচ্চরিত্র দ্বারা আদব দেওয়া।'
জুনাইদ (রঃ) বলেন, 'জেনে রেখো যে, সর্বাপেক্ষা সহজভাবে যা ভক্তদের হৃদয় আকৃষ্ট করে, উদাসীনদের অন্তরকে এবং পশ্চাদ্গামীদের মনকে সতর্ক করে তা হল, সেই কর্ম ও আমল যা সকল কথার সত্যায়ন ও বাস্তবায়ন করে। সেটা কি ভালো মনে হবে ভাই যে, একজন আহ্বানকারী কোন কর্মের প্রতি আহ্বান করবে অথচ তার উপর নিজের কোন চিহ্ন বা নিদর্শন থাকবে না? তার নিকট হতে ঐ কর্মে আদর্শ, সৌন্দর্য ও প্রভাব অভিব্যক্ত হবে না! তার বক্তৃতা বাস্তবায়নকল্পে নিজে আমল করবে না এবং ঐ বচন অনুসারে কোন কর্ম করবে না। সে তো মিথ্যুক যে পার্থিব বিষয়ের প্রতি অনাসক্তির বুলি ঝাড়ে অথচ তার কর্মে বিষয়াসক্তের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। বর্জন করতে আদেশ করে কিন্তু সে নিজে গ্রহণকারী হয়, শ্রম ও চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করে কিন্তু সে নিজে অলস ও নিরুদ্যম হয়। যাদের আচরণ এইরূপ হয় তাদের নীতিকথার শ্রোতা খুবই কম তাদের নিকট থেকে নীতি গ্রহণ করে থাকে। তাদের কর্ম দেখে শ্রোতাদের হৃদয় বীতস্পৃহ হয়। তারা সেই ব্যক্তির জন্য দলীল হয় যে তার মানস-পূজার জন্য 'তাবীল' (দূর ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য)কে হেতু করে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার আখেরাতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয় তার পথ সুগমকারীরূপে নিরূপিত হয়। তুমি কি শোননি? আল্লাহ তাআলা শাইখুল আম্বিয়া, তাঁর অন্যতম মহান রসূল এবং তাঁর অন্যতম বড় ওলী শোয়াইব (আঃ) এর সুগুণ বর্ণনা করে বলেন, যা তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি তার বিপরীত করতে চাইনা যা করতে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ করছি।” (সূরা হুদ ৮৮- আয়াত) অর্থাৎ আমি যা করতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি তা আমি নিজেও করি না।
আল্লাহ আআলা বলেন, “কি আশ্চর্য! তোমরা নিজেদেরকে বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না?” (সূরা বাক্বারাহ ৪৪)
তিনি অন্যত্রে বলেন, “হে ঈমাদারগণ! তোমরা যা কর না তা বল কেন? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক।” (সূরা সাফফ ২ আয়াত)
•• জনৈক আরবী কবি বলেন;
يا أيـ ـ ـها الــ رجل ا ـ ـ لم غه + هـ ـ لا لن ـ فسك كان ذا الت - عليم
تصف الدواء لذي السقام وذي + الض كي ما يصح به وأنت سقيم
اب ـ دأ بن ـ فسك فا ـ ها عن غيها + فإذا انت - هت عنه فأنت حكـ ـ يم
فهناك يقب ـ ل ما تقـ ـ ول ويقتدى + بالفع - ل منك وينف - ع التعـ ـ ليم
لا تنــه عن خـ ـ لق وتــاً مثل ـه + عار عليك إذا فعلت عظ ـ يم
অর্থাৎ, হে অপরকে শিক্ষাদাতা শিক্ষক! আপনি নিজের জন্য কেন শিক্ষক হন না? অসুস্থ ও ব্যাধিগ্রস্তের আরোগ্যলাভের জন্য আপনি ঔষধ (ব্যবস্থাপত্র) দান করেন অথচ আপনি নিজেই সেই রোগী! প্রথমে আপনি নিজেকে অসদাচারণ থেকে বাঁচান। অতঃপর (অপরকে বাঁচান তবেই) আপনি প্রকৃত প্রজ্ঞাবান। তখনই আপনার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং আপনার কর্ম অনুসরণযোগ্য হবে, আর শিক্ষাও হবে উপকারী। যে পাপ আপনি নিজে করেন তা হতে অপরকে নিষেধ করবেন না। যদি তা করেন তবে তা হবে আপনার জন্য বড় লজ্জাকর বিষয়।
ইয়াহুদ জাতিকে তওরাত দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তারা তার উপর আমল করেনি। যার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা তাদের উপমা বর্ণনা করে বলেন, “যাদেরকে তওরাত-বিধান দেওয়া হলে তা অনুসরণ (আমল) করেনি তাদের উপমা সেই গর্দভ যে পুস্তক বহন করে। কত নিকৃষ্ট সে সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা জানে!” (সূরা জুমুআহ ৫ আয়াত)
ওদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন, “যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, 'তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ (বর্ণনা) করবে এবং তা গোপন করবে না। এরপরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে এবং স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট।” (সূরা আ-লে ইমরান ১৮৭ আয়াত)
“পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে” এর ব্যাখ্যায় মালেক বিন মিগওয়াল বলেন, 'তারা ঐ কিতাবের উপর আমল ত্যাগ করে।'
আল্লাহ তাআলা জনৈক আমলত্যাগী বড় আলেমের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “(হে নবী!) তুমি ওদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও যাকে আমি নিদর্শনাবলী (কিতাবের জ্ঞান) দান করেছিলাম, অতঃপর সে তার (নৈতিকতার গভী) থেকে বের হয়ে যায় ফলে শয়তান 'তার পিছনে লাগে এবং সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর আমি ইচ্ছা করলে এ দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয় এবং নিজ কামনা-বাসনার অনুসরণ করে। তার অবস্থা কুকুরের মত; যাকে তুমি কষ্ট দিলে সে জিব বার করে হাঁপাতে লাগে এবং কষ্ট না দিলেও সে জিব বার করে হাঁপায়। যে সম্প্রদায় আমার আয়াত (নিদর্শনসমূহকে) প্রত্যাখ্যান করে তাদের অবস্থাও ঐরূপ।” (সূরা আ'রাফ ১৭৫ আয়াত)
হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর সহচরবৃন্দকে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদেরকে এজন্য শিক্ষা দিচ্ছি না যে তোমরা কেবল (তা শুনে) আশ্চর্যান্বিত হবে। বরং এজন্য শিক্ষা দিচ্ছি যে, তোমরা তার উপর আমল (কর্ম) করবে।
সুতরাং ইল্ম প্রচার করাই প্রজ্ঞা নয় বরং তার উপর আমল করাই হল প্রকৃত প্রজ্ঞা।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'কুরআন অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা এবং তার উপর আমল করা। সুতরাং এর হিফ্যকারী (হাফেয) এর যদি সে সংকল্প না হয় তাহলে সে আহলে ইল্ম ও দ্বীন হতে পারবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) “যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছি তারা তা যথাযথভাবে তেলাঅত (পাঠ) করে” (সূরা বাক্বারাহ, ১২১ আয়াত) আল্লাহ তাআলা এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ তারা তা যথার্থরূপে পাঠ করে এবং যথাযথভাবে তার অনুসরণ করে।' (ইবনে কাসীর ১/২০৫)
সুতরাং টিয়াপাখীর মত ঠোঁটস্থকারী পাকা পাকা হাফেয এবং মনমুগ্ধকারী কোকিলকণ্ঠে ক্বিরাআতকারী বড় বড় ক্বারী হয়ে বা তৈরী করে সমাজের কি উপকার হতে পারে যদি তার প্রাণ ও আসলত্ব আর কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য সকলের নিকট গুল থেকে যায়? চিনি বহনকারী যদি না বোঝে যে চিনি মিষ্টি না তেঁতো তবে এমন মুটিয়ার প্রতি শত ধিক্।
অনুষ্ঠানে শ্রোতামন্ডলীর মন-মোহিত করার উদ্দেশ্যেই যদি তেলাঅত হবে তবে তার নির্দেশানুসারে আমল করে বিশ্ববাসীকে মোহিত করার সময় কখন? শুধুমাত্র প্রসূতি প্রসব করা, ব্যাধির জ্বালা এবং জিনের উৎপীড়ন বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই কুরআন পাঠ করা এবং তাবীয বানিয়ে গলায়, বাজুতে বা কোমরে বাঁধা হলে পৃথিবীতে অরাজকতা ও দুঃশাসনের উৎপীড়ন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কখন অধ্যয়ন হবে? কুরআনী ললিতসূরের শব্দে মাথা হিলিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতেই জীবন অতিবাহিত করলে তার নির্দেশরে রাস্তবে রূপ দান করে সমাজের বুনিয়াদ হিলিয়ে পৃথিবীকে বিস্মিত করার সময় কখন? রূহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে মৃতের নামে কুরআনখানী হলে পরিবেশ সংস্কারের উদ্দেশ্যে জীবিতদেরকে আর কখন কুরআনের মূল বক্তব্য শোনানো হবে? ভুয়ো তা'যীমের উদ্দেশ্যে জুজদানে বেঁধে 'বড়চীজ' বলে চুমু খেয়ে বাড়ির উঁচু তাকে তুলে রাখলে তা যথার্থ অধ্যয়ন করে তার অর্থসহ তেলাঅত করতে পেরে কুরআনী জীবন ও পরিবেশ গড়ে আর কখন আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে উন্নত হতে পারব? অথচ আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর অবতীর্ণ জীবন-ব্যবস্থা অনুসারে নিজেদের (জীবন, আচরণ ও রাষ্ট্র) পরিচালনা করে না তারা কাফের।” (সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াত)
আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতি যে কিতাব প্রত্যাদেশ করা হয় তা তেলাঅত কর এবং যথার্থভাবে নামায পড়, নিশ্চয় নামায অশ্লীলতা ও অসৎকর্ম থেকে (মানুষকে) বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবুত ৪৫ আয়াত)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন, 'কিতাব তেলাঅত করা, অর্থাৎ আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করা।' অনুরূপ অন্যান্য ওলামারাও একই কথা বলেছেন যে, তেলাঅত শুধু ইবাদতের নিয়তেই করা যথেষ্ট নয়। যা যথেষ্ট তা হল তা বুঝা, আমল করা এবং সেই আমলের অন্যতম আমল কুরআন তেলাঅত করা।
মহান আল্লাহ আরো বলেন, “এই কল্যাণময় গ্রন্থ যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা স্বাদ ২৯ আয়াত)
হাসান বাসরী বলেন, 'আল্লাহর কসম! কুরআনের অক্ষর ও শব্দ সংরক্ষণ করে এবং ওর দন্ডবিধি বা বিধানসমূহ বিনষ্ট করে (আমল না করে) 'অনুধাবন' হয় না। ওদের কেউ বলবে, আমি গোটা কুরআন পড়েছি; (অথবা মাসে ২/৩ বার খতম করি) কিন্তু ওদের জীবন ও চরিত্রে কুরআনের কোন চিহ্ন ও প্রভাব দেখা যায় না!' (ফারাইদুল ফাওয়াইদ ১২৭পৃঃ)
কুরআনী ইল্ম যে সহজ নয়, অন্য কথায় কেবল হিফ্য ও ক্বিরাআত করাই যে ইলমের শেষ উদ্দেশ্য নয় তা ইবনে উমর (রাঃ) এর কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, 'আমরা এই উম্মতের প্রথম ও পুরোগামী। রসূল ﷺ এর শ্রেষ্ঠ ও সত্তম সাহাবী কুরআনের কেবল একটি সূরা বা তদ্রূপ কিছু যথার্থরূপে প্রতিষ্ঠা করতেন। কুরআন তাঁদের উপর ভারী ছিল। কিন্তু তাঁদেরকে ইল্ম ও আমল দান করা হয়েছিল। আর এই উম্মতের শেষভাগের মানুষদের উপর কুরআন এমন হাল্কা হয়ে যাবে যে, শিশু ও অনারব তা পাঠ করবে। কিন্তু তা কিছুমাত্রাও উপলব্ধি করবে না অথবা তার কিছুও পালন করবে না।'
📄 সংযম ও ধৈর্য পানাহার
উমর বিন সালেহ তুরসূসী ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, 'কোন্ জিনিস দ্বারা হৃদয় নরম হয়?' তিনি উত্তরে বললেন, 'বেটা, হালাল খাওয়া দ্বারা।' অতঃপর তিনি বিশ্ব বিন হারেসকেও এই প্রশ্ন করেন। তিনি উত্তরে বলেন, 'জেনে রাখ, আল্লাহর যিক্র (স্মরণেই) চিত্ত প্রশান্ত হয়।' (সূরা রা'দ ২৮-আয়াত)
তুরসূসী বললেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম আহমদ)কে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'হালাল পানাহার।' বিশ্র বললেন, 'উনি আসলটাই উল্লেখ করেছেন।' অতঃপর তুরসূসী আব্দুল অহহাব আল্-অরাক্ব এর নিকট উপস্থিত হয়ে ঐ একই প্রশ্ন করলে তিনিও বিশ্ব-এর মত উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'হালাল খাওয়া।' অরাক্ব বললেন, 'উনি মূলের কথাই বলেছেন।'
হ্যাঁ, আজ সেই মূল উপাদানই প্রায় মানুষের নিকট হতে হারিয়ে গেছে। তাই তো হৃদয়ে কোমলতা নেই, প্রশান্তি নেই, নেই অন্তরে-অন্তরে সংযোগ।
সাঈদ বিন মুসাইয়িব বলেন, 'অধিকাধিক নামায রোযা করাই ইবাদত নয়। ইবাদত তো আল্লাহর (দ্বীনের) ব্যাপারে চিন্তা-ফিক্স করা এবং তাঁর হারামকৃত বস্তু হতে সংযত হওয়া।' তাই তো হযরত আয়েশা (রাঃ) সংযমকে দ্বীনের সবচেয়ে বড় অংশ বলতেন।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বলেন, 'ষাট কোটি দিরহাম দান করার চেয়ে সন্ধিগ্ধ একটি দিরহাম গ্রহণ না করাটা আমার নিকট অধিক প্রিয়।'
এক ব্যক্তি হযরত ঈসা (আঃ) এর নিকট অসিয়ত চাইলে তিনি বললেন, 'তোমার রুটি কোথা হতে আসছে তা লক্ষ্য রেখো।'
ফুযাইল বলেন, 'যে ব্যক্তি জানে যে, তার উদরে কি প্রবেশ করছে সে আল্লাহর নিকট সত্যবাদী বলে পরিচিত হবে। সুতরাং তোমার আহার কোথা হতে আসছে তা দেখ, হে মিসকীন!'
আবু আব্দুল্লাহ সাজী বলেন, 'পাঁচটি বিষয় মুমিনের অবশ্যই জানা উচিত; আল্লাহর মা'রেফাত, হকের মা'রেফাত (ন্যায় ও সত্যকে চেনা), আল্লাহর জন্য আমলে ইখলাস (বিশুদ্ধচিত্ততা ও একনিষ্ঠতা রাখা), সুন্নাহ অনুযায়ী সকল আমল (কর্ম) সম্পাদন এবং হালাল রুযী ভক্ষণ।
সুতরাং সে যদি আল্লাহকে চেনে কিন্তু হক না চেনে তাহলে আল্লাহর মা'রেফাত তার কাজ দেবে না। যদি উভয়কেই চেনে কিন্তু আমলে ইখলাস না রাখে তবে মা'রেফাত দ্বারা উপকৃত হবে না। আবার এসব জেনে যদি সুন্নাহ অনুযায়ী কর্ম না করে তবে তাতেও তার কোন লাভ নেই। আর যদি সে তাও করে থাকে কিন্তু তার খাদ্য যদি হালাল না হয় তাহলে ঐ পাঁচের জ্ঞান তার কোন উপকারে আসবে না। পক্ষান্তরে যদি তার খাদ্য হালাল হয় তাহলে তাতে তার হৃদয় স্বচ্ছ হয়; যার দ্বারা ইহ-পরকালের বিষয় তার গোচরীভূত হয়। অন্যথা যদি তার খাদ্য (হারام ও হালালে) সন্ধিগ্ধ হয় তবে ঐ খাদ্যানুসারে সমস্ত বিষয় তার নিকট সন্দেহযুক্ত হয়ে তালগোল খায়। আর খাদ্য যদি হারাম হয় তাহলে দুনিয়া আখেরাতের সমস্ত বিষয় তার নিকট তিমিরাচ্ছন্ন পরিদৃষ্ট হয়। যদিও লোকে তাকে চক্ষুষ্মান বলে তবুও প্রকৃতপক্ষে-সে অন্ধ; যেপর্যন্ত সে তওবা না করেছে।
সুফিয়ান বলেন, 'প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার খাদ্যে তুমি এই ভয় কর যে, তা তোমার হৃদয়কে বিকৃত করে ফেলতে পারে তার দাওয়াতে উপস্থিত হয়ো না।'
ফুযাইল বলেন, 'আল্লাহর কতক বান্দা আছেন যাঁদের কারণে তিনি অন্যান্য বান্দা ও সকল জনপদকে জীবিত রাখেন। তাঁরা হলেন, আসহাবে সুন্নাহ (যাঁরা সুন্নাহ বা হাদীস অনুযায়ী আমল করেন)। যে ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে, তার পেটে হালাল হতে আহার্য প্রবেশ করেছে সে 'হিযবুল্লাহ' (আল্লাহর দল)তে শামিল হয়ে যাবে। আর এগুণ হল আহলে সুন্নাহর।'
হযরত উমর (রাঃ) বলেন, 'রাতের শেষাংশে গোঁ-গোঁ (করে ইবাদত) করাই দ্বীন নয়। দ্বীন তো সংযমে।'
আহার্যে হারাম যাতে অনুপ্রবেশ না করে যায় তার জন্য আবু ওয়াইল নিজের ছেলে ইয়াহয়্যার নিকট থেকেও কিছু গ্রহণ করতেন না। কারণ, ইয়াহয়্যা কাযী (বিচারপতি) ছিলেন। তাই তিনি আশঙ্কা করতেন যে হয়তো বা তাঁর মালে ঘুষ ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটেছে!
হাসান বলেন, 'শ্রেষ্ঠ ইল্ম হল সংযমশীলতা।'
সালেহ বিন মেহরান বলেন, 'যদি কোন আলেমকে দেখ যে সে সংযমী (পরহেযগার) নয় তাহলে তার নিকট ইল্ম গ্রহণ করো না।'
আবু হাম্স নিসাপুরী বলেন, 'প্রভুর প্রতি বান্দার উৎকৃষ্ট অসীলাহ হল সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষিতা, সকল কর্মে সুন্নাহর অনুবর্তী হওয়া এবং হালাল পথে জীবিকা অনুসন্ধান করা।'
সহল বিন আব্দুল্লাহ তস্তরী বলেন, 'আমাদের মূল ছয়টি; আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ, রসূল ﷺ এর সুন্নাহর অনুসরণ, হালাল ভক্ষণ, কাউকে কষ্ট দান থেকে (নিজেকে ও অপরকে) নিবৃত্তকরণ, পাপ থেকে দূর হওন এবং সকলের অধিকার প্রদান।'
পানাহার হালাল হলেও পরিমিতি আহার করা উচিত। এ বিষয়েও পূর্ববর্তী ওলামাগণ আমল করে গেছেন এবং আমাদের তা করতে উপদেশের মূল্যবান উপহার দিয়ে গেছেন।
ইবনে জামাআহ (রঃ) বলেন, 'মনোযোগ ও উপলব্ধি অর্জন এবং ক্লান্তি ও বিরক্তি দূরীকরণে বড় সহায়ক বিষয়সমূহের অন্যতম হল, স্বল্প পরিমাণ হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'ষোল বছর থেকে আমি খেয়ে পরিতৃপ্ত নই। যেহেতু অধিক খাদ্য ভক্ষণ অধিক পানি পান করতে বাধ্য করে এবং এ সবের আধিক্য অতিনিদ্রা, মেধাহীনতা, স্মৃতিশক্তি-স্বল্পতা, ইন্দ্রিয়-স্তব্ধতা ও দৈহিক আলস্য সৃষ্টি করে। তা ছাড়া পেটপূর্ণ ভোজন শরীয়তের দৃষ্টিতেও অপছন্দনীয়; যা শারীরিক ব্যাধি আনয়ন করে। যেমন বলা হয়, (দেহের শত্রু ভুঁড়ি) 'অধিকাংশ ব্যাধিই পানীয় অথবা খাদ্য থেকেই সৃষ্টি হয়।'
প্রসিদ্ধ ওলামা, আয়েম্মা ও আউলিয়াগণের কেউই অতিভোজনে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের কেউই বেশী খাওয়াকে পছন্দ করতেন না। অতিভোজনকারী প্রশসার্হও নয়। অতিভোজন দ্বারা প্রশংসা করা হয় জ্ঞানহীন চতুস্পদ জন্তুদের; যাদেরকে কঠিন কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়। আর সুস্থ মেধাকে নিকৃষ্ট পরিমাণের আহার গ্রহণ করে বিক্ষিপ্ত ও অচল করা আদৌ উচিত নয়- যার শেষ পরিণতি সকলের নিকট বিদিত।
যদি অতি পান-ভোজনের অন্য কিছু ক্ষতি না হয়ে কেবল এই হত, যা বারবার অধিকাধিক শৌচাগারে যাতায়াত করে হয় তাহলে এতটুকু ক্ষতির হাত হতে বাঁচার জন্য জ্ঞানীর উচিত তা থেকে দূরে থাকা।
যে ব্যক্তি অতি পানভোজনের ও নিদ্রার সাথে ইল্মের সাফল্য এবং তাতে অভিষ্টলাভের আশা করে সে এমন বস্তুলাভের আশা করে যা বাস্তবে অসম্ভব। (তাযকিরাতুস সা-মে' অলমুতাকাল্লিম ৭৪ পৃঃ)
ইবনে কুদামাহ (রঃ) বলেন, 'উদরপরায়ণতা বৃহৎ সর্বনাশী বস্তুসমূহের অন্যতম। যার কারণে হযরত আদম (আঃ)কে বেহেশ্ হতে বহিষ্কার করা হয়েছিল। উদর-পরায়ণতায় যৌন-কামোদ্রেক অধিক হয় ও ধন-সম্পদের আকাংখা বৃদ্ধি পায়। এবং আরো বহু সংখ্যক বিপত্তি এসবের অনুবর্তী হয় এই পেটুকতায়।'
উক্কা রাসেবী বলেন, 'হাসানের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, 'এস (খানা খাই)।' আমি বললাম, 'আমি খেয়েছি, আর পারব না খেতে।' তিনি বললেন, 'সুবহা-নাল্লাহ! মুসলিম কি এত খায় যে, পরে আর খেতেই পারে না?'
অবশ্য ভোজনে যা ন্যায় তা হল মধ্যপন্থা; পরিমিত আহার। খাওয়ার ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকা সত্ত্বেও অপরিতৃপ্তভাবে হাত তুলে নেওয়া। এই ন্যায়ভক্ষণে শরীর সুস্থ থাকে এবং বহু রোগের প্রতিকার হয়। সুতরাং ক্ষুধা লাগলে খাওয়া উচিত এবং সামান্য ক্ষুধা ও ইচ্ছা থাকতে খাওয়া বন্ধ করা উচিত।
পক্ষান্তরে প্রতিনিয়ত মাত্রাধিক স্বল্পাহারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন, এক সম্প্রদায় স্বল্প খেয়ে শরীরকে শক্তিহীন করে ফরয আদায়ে অক্ষম ও অলস হয়ে থাকে, আর তাদের এ মূর্খতায় মনে করে যে, তা করা ফযীলত; অথচ এমনটা নয়। যিনি ক্ষুধার প্রশংসা করেছেন তিনি ঐ মধ্যপন্থা মিতাহারের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। (মুখতাসারু মিনহাজিল কাসেদীন ১৬৩ পৃঃ)
মোটকথা হল ইন্দ্রিয়দমন ও প্রবৃত্তিকে সংযম করে চলা সকল অবস্থায় আবশ্যক। এই ইন্দ্রিয়দমন আল্লাহর পথের পথিকদের নিদর্শন।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'নবী ﷺ ইন্দ্রিয় সংযমকে একটি মাত্র বাক্যে একত্রীভূত করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের (শ্রেষ্ঠতার) অন্যতম হল, অনর্থক বিষয়কে পরিত্যাগ করা। (মুঅত্তা মালেক ২/৪৭০, শরহুসসুন্নাহ ১৪/৩২১, মিশকাত ৩/১৩৬১) যা বাজে কথা বলা, বাজে দেখা, বাজে শোনা, নিরর্থক গ্রহণ করা, অনর্থক চলা, ফালতু চিন্তা করা এবং ব্যাপকভাবে সর্বপ্রকার গুপ্ত ও প্রকট অপ্রয়োজনীয় কর্মাদি বর্জন করাকে বুঝায়। সুতরাং এই বাক্যটুকুই সংযমের জন্য যথেষ্ট।
ইব্রাহীম বিন আদহম বলেন, 'সংযম-প্রত্যেক সন্ধিগ্ধ বস্তু পরিহার এবং অনর্থক ও অতিরিক্ত সকল বিষয় ত্যাগ করাকে বলে।' (মাদারিজুস সালেকীন ২/২১)
এই সংযমশীলতার মূল হল সন্দিগ্ধ বস্তু-বিষয়কে বর্জন করা। অর্থাৎ যে বিষয় বা কর্ম করা বৈধ না অবৈধ এবং যে বস্তু খাওয়া হালাল না হারাম এই নিয়ে মনে সংশয় সৃষ্টি হয় তা ত্যাগ করার নামই সংযম। এরই প্রতি ইঙ্গিত করে এবং সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তুকে পরিহার করার উপর অনুপ্রাণিত করে আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন, “হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর উভয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্ধিগ্ধ বিষয়-বস্তু। যে ব্যক্তি কোন সন্ধিগ্ধ পাপকে বর্জন করবে সে তো (সন্দেহহীন) স্পষ্ট পাপকে অধিকরূপে বর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধিগ্ধ কিছু করার দুঃসাহস করবে সে ব্যক্তি অদূরেই স্পষ্ট পাপেও আপতিত হয়ে যাবে। পাপ আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি। যে ঐ চারণভূমির ধারে-পাশে চরবে সে অদূরে সম্ভবতঃ তার ভিতরেও চরতে শুরু করে দেবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) বলেন, 'উক্ত হাদীসে আহকামকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কোন বস্তু বা বিষয়কে করতে স্পষ্ট ভাষায় আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং তা ত্যাগ করার উপর ধমক এসেছে। অথবা কোন বস্ত বা বিষয় ত্যাগ করতে সুস্পষ্ট আদেশ এসেছে এবং তা করার উপর ধমক এসেছে। অথবা কোন বস্তু বা বিষয়কে করা বা না করার উপর কোন আদেশ বা ধমক আসেনি। তাহলে প্রথম বিষয়টি হবে স্পষ্ট হালাল ও দ্বিতীয়টি স্পষ্ট হারাম। স্পষ্ট অর্থাৎ, তা হালাল অথবা হারাম এ কথা বর্ণনার প্রয়োজন হবে না। বরং প্রত্যেকেই জানতে ও চিনতে সক্ষম হবে। আর তৃতীয়টি হল সন্দিগ্ধ। যেহেতু তা অস্পষ্ট; তা হালাল না হারাম পরিষ্কার জানা যায় না। আর যার অবস্থা এই হবে তা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। যেহেতু বস্তু যদি প্রকৃতপক্ষে হারাম হয়েই থাকে তাহলে হারামের অনুসরণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে তা যদি হালাল হয়ে থাকে তাহলে এই নিয়তে ত্যাগ করার উপর সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে।' (ফতহুল বারী ৪/৩৪১)
রসূল ﷺ বলেন, “ইবাদতের মাহাত্ম্য অপেক্ষা ইলমের মর্যাদা উত্তম। এবং দ্বীনের মূল হল সংযমশীলতা। (সহীহুল জামে' ৪২১৪নং)
সুতরাং আলেম ও তালেবে ইলমের উচিত, জীবনের সকল ক্ষেত্র ও বিষয়ে সংযমশীলতা অবলম্বন করা। পানাহার, পোষাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় সকল কিছুতে মিতাচারী হওয়া। যাতে হৃদয় জ্যোতির্ময় হবে এবং ইল্ম, তার নূর ও ফল গ্রহণের জন্য তা উপযুক্ত ও অনুকূল হবে।
তালেবে ইলমের জন্য সংযমশীলতার উচ্চস্থান অধিকার করতে যত্নবান হওয়া উচিত। কোন বিষয়ে কোন রকমের অনুমতি বা 'ফাঁক' অনুসন্ধান করে কোন কোন সন্দিগ্ধ বিষয়ে নিজেকে ফেলা উচিত নয়। বরং স্বচ্ছ হৃদয়ে নবুয়ত ও সাহাবাগণের জ্ঞান-জ্যোতি প্রতিবিম্বিত করাই হল যথোচিত। শ্রেষ্ঠ আদর্শ রসূল ﷺ একদা একটি পড়ে থাকা খেজুর পেয়েছিলেন, খেতে গেয়ে তিনি এই ভয়ে খাননি যে, হয়তো বা তা সদকার খেজুর হতে পারে এবং সদকা খাওয়া তাঁর জন্য বৈধ নয়। (বুখারী)
তাই হারাম নয় কিন্তু হারাম হওয়ার আশঙ্কা আছে-এমন কোন বস্তু ভক্ষণ বা গ্রহণ করতে তালেবে ইল্মকে রসূল ﷺ এর অনুকরণ করা উচিত। যেহেতু আলেম ও তালেবে ইল্ম সমাজের আদর্শ ও নমুনা। সমাজ তাদের অনুসরণ করে চলে। সুতরাং তারা যদি সংযমশীলতার সহিত না চলে তবে আর কারা চলবে? (তাযকিরাতুস সামে' অলমুতাকাল্লিম ৭৫ পৃঃ)
তদনুরূপ তালেবে ইলমের উচিত অধিকাধিক আল্লাহর যিক্র করা। যেহেতু তাঁর যিরে মনে শান্তি আসে; যেমন পূর্বে আলোচিত হয়েছে। কারণ, যিক্র নির্জনতা ও অভাবের সাথী। দুঃখ ও অত্যাচারের মুখে সান্ত্বনা। তালেবে ইল্ম তো ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহর মা'রেফাত পায়।