📄 বিষয়াসক্তি
পূর্বে একাধিকবার আলোচিত হয়েছে যে, দ্বীনকে ফাঁদ বানিয়ে দুনিয়া শিকার করা বা দ্বীনকে পার্থিব কোন সম্পদ উপার্জনের অসীলা ও মাধ্যম করা কোন তালেবে ইল্ম বা আলেমের জন্য বৈধ নয়। যেমন কোন সাধারণ মানুষের জন্যও দ্বীনকে জাল বানিয়ে কোন স্বার্থের মাছ শিকার করা অবৈধ। ইল্ম শিক্ষা করা দ্বীনের অংশ। তাই একেও কোন স্বার্থের বাহন করা আদৌ উচিত নয়। নবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন এমন ইল্ম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি তা সে কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)
ইবনে রজব এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এই হাদীসের পটভূমিকা এই যে, -আর আল্লাহই অধিক জানেন- পৃথিবীতে ত্বরান্বিত এক জান্নাত আছে এবং তা হচ্ছে আল্লাহর মা'রেফাত (পরিচিতি); তাঁর ভালোবাসা, তাঁর যিক্রে নিরুদ্বেগ অর্জন, তাঁর সাক্ষাতের বাসনা, তাঁর ভীতি, আনুগত্য ইত্যাদি। ফলপ্রসূ ইল্ম এর প্রতি নির্দেশ করে। অতএব যার ইল্ম পৃথিবীর এই ত্বরান্বিত বেহেশ্বে প্রবেশ করতে নির্দেশ করে সে পরকালের বেহেশে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি পৃথিবীর এই জান্নাতের সৌরভ পায় না সে ব্যক্তি পরকালের জান্নাতের সৌরভ-ঘ্রাণ পাবে না। এই জন্যই আখেরাতে সবচেয়ে অধিক শাস্তিযোগ্য হবে সেই আলেম যার ইল্ম দ্বারা আল্লাহ তাকে উপকৃত করেননি এবং সেই হবে কিয়ামতের দিন অধিকতম আক্ষেপকারী। যেহেতু তার নিকট এমন যন্ত্র ছিল যার সাহায্যে সে সর্বাপেক্ষা সুউচ্চ মর্যাদা ও উন্নত স্থানে পৌঁছতে পারত, কিন্তু সে তা (তাতে ব্যবহার না করে) কেবলমাত্র সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট, তুচ্ছ এবং নগণ্য বিষয়ে ব্যবহার করেছে। সুতরাং সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় হয়েছে যে ব্যক্তির নিকট মূল্যবান উৎকৃষ্ট মণি-মুক্তা ছিল কিন্তু তা বিষ্ঠা বা কোন মূল্যহীন নোংরা বস্তুর বিনিময়ে বিক্রয় করে ফেলেছে। এই অবস্থা তার, যে নিজের ইল্ম দ্বারা পার্থিব সম্পদ অন্বেষণ করে।'
পূর্বে উল্লেখিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)
এই হাল তাঁদেরও যারা দ্বীনকে বাহন করে কোন তাগুতের সংসদের সভ্য অথবা কোন পদস্থ নেতা হওয়ার আকাঙ্খা পোষণ করে থাকেন।
অনুরূপ সেই 'ক্বারী' ও হাফেযের দল; যাঁরা কেবল মাত্র অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে ক্বিরআত ও হিফ্য করেন এবং অপরকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। যেহেতু হাদীসে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।” (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং)
তদনুরূপ ঐ প্রকার ভারাটে ক্বারী ও হাফেয যাঁরা কুরআন কারীমের অর্থ বোঝেন না, কুরআন প্রচারের উদ্দেশ্যে কাউকে তা বুঝাতেও পারেন না, ইবাদতের নিয়তে পাঠও করেন না অথচ কোন ডাক এলে খতম পড়ার জন্য 'হায়ার' যেতে কুণ্ঠাবোধ না করে গর্ববোধ করেন। যেমন সেই দ্বীনি বক্তারও এই অবস্থা, যিনি বক্তৃতাকে ভাড়া খাটিয়ে সমাজের অর্থ লুটে বেড়ান। যার অন্তঃসারশূন্য বক্তৃতায় না কোন ইখলাস থাকে, না দ্বীন প্রচারের নিয়ত। অপরকে সৎকার্যের আদেশ দেন, কিন্তু তাঁর নিজের জীবনে পূর্ণ দ্বীন বাস্তব করেন না। কথায় আস্ফালন ও মাধুর্য থাকলেও কর্মে তিনি যত্নবান নয়।
যেমন সেই মুদারিস যিনি বহু ছাত্রকে দস্ দিয়ে ফারেগ করেছেন কিন্তু নিজের কোন ছেলে-মেয়েকে পূর্ণ মুসলিম করতে চেষ্টা করেন নি। কেউ সঠিকমত পড়ছে বা শিখছে কিনা তা তাঁর চিন্তার বিষয় নয়, বরং তাঁর চিন্তার বিষয় হল, মাসের ৩০ তারীখ আর কয় দিন পর?!
এমন লেখকদের কথাও বলা যায়। যাঁরা দ্বীন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে পাঠকের দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সেই লিখায় প্রকৃত প্রাণ থাকে না যার দ্বারা কাল কিয়ামতে তাঁদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। বরং এমন কিছু লিখে থাকেন যার পরিণামে কাল তাঁদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। কারো বা উদ্দেশ্য থাকে, লেখার ময়দানে প্রতিযোগিতা, অথবা ভাষার বহর, অথবা সাহিত্যিক রচনাশৈলী ও প্রতিভা প্রদর্শন, অর্থোপার্জন বা খ্যাতি লুণ্ঠন, অথবা কারো সম্ভ্রম অপহরণ ইত্যাদি। এঁদের জন্য আখেরাতে কি কোন অংশ আছে? আর এঁদের দ্বারায় কি সমাজ উপকৃত হবে?
পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ তাঁর আদর্শ নবীকে সম্বোধন করে বলেন,
قل مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ
অর্থাৎ, বল, আমি উপদেশের উপর তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না এবং আমি লৌকিকতাকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা স্বা-দ ৮-৬ আয়াত)
আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী বলেন, “তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তদ্দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তদ্দ্বারা দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলায়ত করবে।’ (আবু উবাইদ, হাকেম)
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'কি করবে তোমরা-যখন তোমাদেরকে এমন ফিতনা গ্রাস করবে, যাতে শিশু প্রতিপালিত হবে এবং বড় বৃদ্ধ হবে। (অর্থাৎ ঐ ফিতনা সকলের আচরণ ও অভ্যাসে পরিণত হবে।) যখন অভিনব রচিত (বিআতকে) সুন্নাহরূপে গ্রহণ ও ধারণ করা হবে; যার উপরে মানুষ চলবে। যদি তার কিছু অপসারণ করা হয় তো বলা হবে, 'সুন্নাহ অপসৃত হয়ে গেল।' বলা হল, 'এরূপ কখন হবে? হে আবু আব্দুর রহমান!' বললেন, 'যখন তোমাদের ক্বারীর সংখ্যা বেশী হবে, ফকীহ (প্রকৃত জ্ঞানী ও তত্ত্ববিদ আলেম) কম হবে, তোমাদের আমানতদার অল্প হয়ে যাবে, আখেরাতের কর্ম দ্বারা দুনিয়া সন্ধান করা হবে এবং দ্বীনী ইল্ম আমল ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা হবে।'
বর্তমান যুগে সেই ফিতনা প্রতীয়মান। আলেমে-আলেমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতর্ক, বিবাদ, কখনো বা দলাদলি ও হানাহানি দৃশ্যমান হয় এই ফিতনার কারণেই। যার কারণে সমাজের বুকে আলেমের মানও কমে গেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'যদি ইল্ম বহনকারীরা যথার্থরূপে নিষ্ঠার সাথে তা বহন করত তাহলে আল্লাহ, তাঁর ফিরিশামন্ডলী এবং সৎ লোকেরা তাদেরকে ভালোবাসতেন। আর লোকেরাও তাদেরকে সমীহ ও ভয় করত।' কিন্তু তারা ইল্ল্ফ দ্বারা পার্থিব স্বার্থ সন্ধান করেছে। যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে ঘৃণ্য করেছেন এবং তারা লোকেদের নিকট অবজ্ঞা ও অসম্মানের পাত্র হয়ে গেছে।'
মায়মুন বিন মিহরান বলেন, 'হে কুরআন ওয়ালারা! তোমরা কুরআনকে বেসাতিরূপে গ্রহণ করো না; যার দ্বারা দুনিয়াতে লাভ ও স্বার্থ খুঁজে বেড়াবে। বরং দুনিয়া দ্বারা দুনিয়াকে এবং আখেরাত দ্বারা আখেরাতকে অন্বেষণ কর। কেউ তো বিতর্ক করার জন্য কুরআন শিক্ষা করে, কেউ বা লোকে তার দিকে ইঙ্গিত করবে (প্রসিদ্ধ হবে) এই লোভে শিক্ষা করে। আর সেই ব্যক্তি উত্তম যে তা শিক্ষা করে এবং তাতে আল্লাহর আনুগত্য করে।'
বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'পূর্বের উলামাগণ তিন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। সত্যবাদিতা, হালালখোরী এবং পার্থিব বিষয়ের প্রতি অতিশয় বিরাগ। আর আজ আমি ওদের একজনের মধ্যেও এই সব গুণের একটাও দেখতে পাইনা। তাহলে তাদেরকে কি করে গ্রাহ্য করব বা কি করে তাদেরকে দেখে হাসিমুখে সাক্ষাত করব? কেমন করে তারা ইলমের দাবী করে অথচ তারা পার্থিব বিষয়ের উপর একে অপরের ঈর্ষা ও হিংসা করে। আমীর ও নেতৃবর্গের নিকট সমশ্রেণীর ওলামার নিন্দা ও গীবত করে। এসব এই জন্য করে যাতে তাদের অবৈধ অর্থ নিয়ে অপরদের প্রতি ঝুঁকে না যায়। ধিক্ তোমাদের প্রতি হে ওলামাদল! তোমরা যে আম্বিয়ার উত্তরাধিকারী! তাঁরা তো তোমাদেরকে ইল্মের ওয়ারেস বানিয়েছেন। যা তোমরা বহন করেছ, কিন্তু তার উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করেছ। তোমাদের ইল্মকে এক পেশা বানিয়ে নিয়েছ। যার দ্বারা তোমরা রুজী-রুটী কামাচ্ছ। তোমরা কি সে ভয় কর না যে, তোমাদের উপরেই প্রথম দোযখের অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে?'
এক অন্ধ ব্যক্তি সুফিয়ান সওরীর সাহচর্যে বসত। রমযান মাস এলে গ্রামাঞ্চলে বের হয়ে যেত। সেখানে লোকেদের ইমামতি করে বস্ত্রাহার উপার্জন করত। একদা সুফিয়ান তাকে বললেন, 'কিয়ামতের দিন আহলে কুরআনকে কিরাআতের বিনিময়ে প্রতিদান দেওয়া হবে আর এই রকম লোকের জন্য বলা হবে, তুমি তোমার প্রতিদান পৃথিবীতেই সত্বর নিয়ে ফেলেছ।' অন্ধ লোকটি বলল, 'আপনি আমার জন্য একথা বলছেন? অথচ আমি আপনার সহচর?' বললেন, 'আমি ভয় করছি যে, কিয়ামতে আমাকে বলা হবে, এতো তোমার সহচর ছিল, কেন ওকে উপদেশ দাওনি?'
শরীক যখন কুফার কাথী (বিচারপতি) নিযুক্ত হলেন তখন সুফিয়ান সওরী তাঁর সহিত সাক্ষাৎ করে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! ইসলাম, ফিক্ ও কল্যাণের (দ্বীনী ইলমের) পর কাযী পেশা (বিচারকার্য) গ্রহণ করলেন এবং কাযী বনে গেলেন?' শরীক তাঁকে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! লোকদের জন্য কাযীও তো আবশ্যক।' একথা শুনে সুফিয়ান তাঁকে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! লোকদের জন্য পুলিশও তো আবশ্যক, (তা হলেন না কেন?)'
📄 ওলামা ও শাসকগোষ্ঠী
কতক উলামা আছেন যাঁরা ইল্মকে ধনী ও শাসকগোষ্ঠীর নৈকট্যলাভের এবং তাদের নিকট হতে কিছু অর্থ ও স্বার্থ-সিদ্ধিলাভের অস্ত্র স্বরূপ ব্যবহার করেন। যা কোন আলেমের জন্য নেহাতই নিকৃষ্ট ও নীচ আচরণ। এতে ওদের নিকট ইলমের কদর নষ্ট হয় এবং আলেমদের মান-মর্যাদাও ধূলিসাত হয়। তাই এ বিষয়ে বহু সলফে সালেহীন উলামা সমাজকে সচেতন করে বহু উপদেশ প্রদান করে গেছেন।
জা'ফর সাদেক বলেন, 'ফকীহগণ রসূলগণের আমানতদার ও বিশ্বস্ত (প্রতিনিধি); যতক্ষণ তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর দরজায় না আসে।'
সুফিয়ান বলেন, 'কোন বান্দা হতে যখন আল্লাহর প্রয়োজন থাকে না তখন তিনি তাকে শাসকগোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দেন। যখন কোন ক্বারীকে কোন নেতার দুয়ারে ধরনা দিতে দেখবে তখন জেনো যে, সে চোর! আর তাকে যদি ধনবানদের দরজায় পড়ে থাকতে দেখ তাহলে জেনো যে, সে কপট।'
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'শাকসগোষ্ঠীর দুয়ারে উটের আস্তাবলের মত বহু ফিতনা আছে। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার আত্মা আছে, তোমরা যে পরিমাণ অর্থ তাদের নিকট হতে গ্রহণ করবে তার সমপরিমাণ অথবা তার দ্বিগুণ পরিমাণ দ্বীন ওরা তোমাদের নিকট থেকে বিনষ্ট করে ফেলবে।'
ফযাইল বিন ইয়ায সুফিয়ান বিন উয়াইনাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, 'তোমরা উলামার দল দেশের প্রদীপ ছিলে, তোমাদের দ্বারা সব আলোকিত হত, কিন্তু এখন তোমরা নিজেরাই আঁধারে পরিণত হয়ে গেছ। তোমরা সেই তারকাপুঞ্জ ছিলে যাদের দ্বারা পথ চেনা যেত, কিন্তু আজ তোমরা নিজেরাই গোলক-ধাঁধা বনে গেছ। তোমাদের কেউ কি আল্লাহকে লজ্জা করে না - যখন সে ঐ আমীরদের নিকট উপস্থিত হয়ে ওদের মাল গ্রহণ করে? অথচ সে জানে যে, ওরা তা কোথা হতে সংগ্রহ করেছে। অতঃপর মিহরাবে এসে নিজের পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলে, 'আমাকে অমুক হতে অমুক হাদীস বর্ণনা করেছে----!'
ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'ইবলীসের গুপ্তপ্রতারণার মধ্যে এক প্রকার প্রতারণা হচ্ছে, আমীর ও শাসকগোষ্ঠীর সহিত ওলামাদের সংস্রব ও মিলা-মিশা রাখা, তাদের তোষামদ করা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের অসৎ কাজে বাধা না দেওয়া। কখনো বা তাদেরকে এমন কাজের অনুমতি খুঁজে দেয় যে কাজে ওদের জন্য কোন অনুমতী থাকে না; যাতে ওদের নিকট তারা কিছু পার্থিব সম্পদ ও স্বার্থ উদ্ধার ও উপভোগ করতে পায়। ফলে এর দ্বারা তিন প্রকার লোক তিনভাবে ফাসাদ ও বিপত্তিতে আপতিত হয়;
প্রথমতঃ আমীর বলে, 'যদি আমি সঠিকতার উপর না হতাম তাহলে অমুক আলেম (ফকীহ) আমাকে বাধা দিতেন। আমি সৎ ও সঠিক না হলে উনি আমার মাল খেতেন কেন?'
দ্বিতীয়তঃ জনসাধারণ; তারা বলে, 'আমাদের আমীর, তার সম্পদ ও কর্মে কোন ত্রুটি নেই। যেহেতু অমুক আলেম তো দেখছি অহরহ উনার কাছে যান ও খান।'
তৃতীয়তঃ ঐ আলেম; যিনি এই কর্মের ফলে নিজের দ্বীনকে নষ্ট করেন।
📄 পদ ও খ্যাতি
আলেমদের একটি সম্প্রদায়ের হৃদয়ে পদলোভ এবং প্রসিদ্ধি-লালসা উপচীয়মান থাকে। গুপ্ত আত্মশ্লাঘায় নিজেকেই ঘোষিত পদের যোগ্যতম সভ্য মনে করেন অথচ তিনি সেরূপ নাও হতে পারেন। যশস্কাম মানসে নিজস্ব ক্ষমতার বাইরেও প্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটাতে চান, চান বসন্তের সকল প্রস্ফুটিত পুষ্পরাজীর সৌরভ কেবল তাঁরই পুষ্প হতে সারা বিশ্বে বিতরিত হোক। তাই তিনি সর্বদা পদ, নেতৃত্ব, সর্দারী ইত্যাদির সন্ধানে ফেরেন।
এমন শ্রেণীর পদ-লোভী আলেমদের প্রসঙ্গে নবী ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন সৃষ্টির মধ্য হতে সর্বপ্রথম যার উপর অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে সে হল এমন ক্বারী বা আলেম যে কুরআন পড়ে বা ইল্ম শিখে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে 'ক্বারী' বা 'আলেম' বলা হোক। যাকে তার মুখ ছেঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে আদেশ দেওয়া হবে। অনুরূপ ঐ প্রকার দানশীল ও যোদ্ধাকে শাস্তি দেওয়া হবে। (মুসলিম) যারা নাম ও যশ লাভের উদ্দেশ্যে নিজেদের সামর্থ্য ব্যয় করেছে।
এমন লোকদের স্বাভাবিক আচরণ এও যে, তাঁরা কোন সমবায় সংস্থা বা সংগঠনে সংযুক্ত থাকলে মনে মনে তার পরিচালনাভার কামনা করেন। নির্বাচনের সময় সে কামনায় সফলকাম না হলে ক্ষুব্ধ হয়ে সে সংস্থা বা সংগঠন সত্বর পরিত্যাগ করে বসেন। যার ফলে যে কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বিঘ্নিত ও বিপর্যস্ত হতে বাধ্য হয়। কখনো বা বিরোধী পক্ষে গিয়ে মিলিত হলে বিপত্তি আরো বর্ধমান দেখা যায়। তাই তো এমন লালসা বড় নোংরা, বিশেষ করে একজন আলেমের ক্ষেত্রে।
কাসেম বিন উসমান বলেন, 'পদ-লালসা প্রত্যেক ধ্বংসের মূল।'
নবী ﷺ বলেন, “ছাগলের পালে ছাড়া ক্ষুধার্ত দুই নেকড়ের চেয়েও মানুষের সম্পদ-লোভ এবং দ্বীনী মর্যাদা-লালসা অধিক অনিষ্টকারী।” (তিরমিযী, আহমদ, নাসাঈ)
সওরী বলেন, 'নেতৃত্বের মত কোন বিষয়ে অধিকতর স্বল্প বিরাগ আমি কারো মাঝে দেখিনি। তুমি মানুষকে দেখবে যে, সে পান-ভোজনে, সম্পদে ও পরিচ্ছদে অনাসক্ত। কিন্তু নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এলে সেই মানুষকেই তার উপর প্রতিযোগিতায় প্রযত্নবান হতে এবং বিদ্বেষ প্রকাশ করতে দেখবে।'
ইবরাহীম বিন আদহাম বলেন, 'যে ব্যক্তি খ্যাতি পছন্দ করে সে আল্লাহকে সত্য জানে না।'
মুহাম্মাদ বিন আলা' বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে সে এও ভালোবাসে যে, তাকে যেন লোকে না চেনে।'
ফুযাইল বলেন, 'যে ব্যক্তিই নেতৃত্ব পছন্দ করে সেই ব্যক্তিই অপরের প্রতি হিংসা করে, বিদ্রোহ করে, অপরের ত্রুটি ও ছিদ্র অন্বেষণ করে এবং অন্য কাউকে 'ভালো বলে উল্লেখ করাকে অপছন্দ করে।'
সুফিয়ান বলেন, 'যে ব্যক্তি নেতৃত্ব চায় তার উচিত তার মস্তককে 'শিংলড়াই'-এর জন্য প্রস্তুত রাখা।' অর্থাৎ সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য মানুষের উপর অত্যাচার, হিংসা ও বিদ্রোহের জন্য তৈরী হয়ে বাওরা।
📄 ইলম অনুযায়ী আমল
বিশ্ব বলেন, 'যে ব্যক্তি প্রসিদ্ধি চায় তার নিকট তাওয়া আসতে পারে না।'
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'নেতৃত্ব-লোভ প্রত্যেক বিদ্রোহ ও অত্যাচারের মূল।'
মন্দ সঞ্চার ও সঞ্চয়কারী লোভ ছয়টি; বিষয়াক্তি, নেতৃত্ব-লোভ, যশ-লালসা, উদরপূর্তি, অতি নিদ্রা ও আরাম-প্রিয়তা বা বিলাসিতা।
সুফিয়ান সওরী বলেন, '(ইন্ন শিক্ষার পর) কোন আলেম যদি সত্বর নেতৃত্ব অথবা পদ গ্রহণ করে তবে তার বহু ইল্মের ক্ষতি হয়। কিন্তু যখন শিক্ষা করে আর শিক্ষাই করে তখন সে (প্রকৃত যোগ্যতায়) পৌঁছে যায়। (হুলয়্যাহ ৭/৮১)
একটি প্রবাদে আছে, 'যার থাকতে বলদ বোহায়না হাল, তার দুঃখ সর্বকাল।' অর্থাৎ যে ব্যক্তি অস্ত্রের ভান্ডার মজুদ রেখেও আত্মরক্ষা করতে অলস বা অসমর্থ সে ব্যক্তির ধ্বংস সত্যই প্রহসনজনক। ইল্মের উপকরণ বুকে রেখে মুখে তা বিচ্ছুরিত করে কর্মে রূপায়ন না করা আলেমের জন্য সত্যই ধিক্কারজনক।
কথিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর সহচরবৃন্দের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে বনী ইসরাঈল! অন্ধের জন্য সূর্যালোক উপকারী নয়, কারণ সে দেখতে পায় না। আর আলেমের জন্য ইল্মের আতিশয্য উপকারী নয়, যদি সে তার উপর আমল না করে। যে তালেবে ইল্ম কেবল লেচার দেওয়ার জন্য ইল্ম অন্বেষণ করে এবং আমল করার জন্য তা শিক্ষা করে না সে কি করে আহলে ইলমের মধ্যে গণ্য হতে পারে?'
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'হে ইল্মের বাহকদল! তোমরা ইল্ম অনুসারে আমল কর। যেহেতু আলেম তো সেই ব্যক্তি যে তার ইল্ম দ্বারা আমল করে, যার কর্ম তার ইল্মের অনুবর্তী হয়। অদূর ভবিষ্যতে কিছু সম্প্রদায় এমন হবে যারা ইল্ম বহন করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠদেশের নিচে অতিক্রম করবে না। তাদের আমল ইলমের বিপরীত হবে এবং অভ্যন্তর বাহ্যিক রূপের অন্যথা হবে। জামাআত-জামআত হয়ে বসবে, আর পরস্পর আত্মগর্ব প্রকাশ করবে। এমনকি অনেকে তার সহচরের উপর রাগান্বিত হবে যদি সে তাকে ছেড়ে অন্য কারো সাহচর্যে গিয়ে বসে। ঐসব লোকদের আমল ঐসব মজলিস থেকে আল্লাহর প্রতি উত্থিত হবে না।'
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অহংকারী, মানসপূজারী এবং আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে বিমুখদল ইল্ম অর্জন করে; কিন্তু তারা বুঝে না। যেহেতু তারা মনমত চলে এবং অহংকারের ফলে যা শিখেছে তার প্রতি আমল ত্যাগ করে; ফলে সমঝ-বুঝ এবং জ্ঞান ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়। কারণ, ইল্ম অহংকারীর পরিপন্থী, যেমন পানির স্রোত উঁচু স্থানের প্রতিকূল।
কিন্তু যারা তাঁদের প্রভুকে ভয় করে তারা তাদের ইল্ম অনুযায়ী আমল করে থাকে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে ইল্ম ও জ্ঞান দান করে থাকেন। যেহেতু যে ব্যক্তি তার ইল্ম অনুসারে আমল করে আল্লাহ তাকে আরো অজানা ইলমের অধিকারী করেন।'
মালেক বিন দীনার বলেন, 'বান্দা যখন আমল করার উদ্দেশ্যে ইল্ম অনুসন্ধান করে তখন ইল্ম বর্ধনশীল হয়। আর যখন সে আমল ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তখন ঐ ইল্ম তার দুষ্কর্ম, অহংকার এবং জনসাধারণের প্রতি অবজ্ঞা বৃদ্ধি করে।' বরং এমন অনেক বান্দা তো অহংকারবশে সলফে সালেহীন ও ইমামগণকেও অবজ্ঞা করতে শুরু করে।
হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, 'তুমি তোমার কর্ম ও আমল দ্বারা লোককে নসীহত ও ওয়ায কর, আর কেবল তোমার কথা (বক্তৃতা) দ্বারা ওদেরকে ওয়ায করো না।'
তিনি আরো বলেন, 'মানুষ যখন ইল্ম শিখতে শুরু করে তখনই সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণে, নয়নে, রসনায়, হস্তে, নামাযে এবং অন্যান্য পার্থিব বিষয়ে তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মানুষ যদি কোন ইল্মের দুয়ারে পৌঁছে তার উপর আমল করে তবে তা তার জন্য পৃথিবী ও তন্মধ্যস্থিত সকল বস্তু অপেক্ষা অধিক উত্তম।' (জামে' ১/৬০)
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজের কর্ম দ্বারা লোককে উপদেশ দেয় সেই হেদায়াতকারী (পথপ্রদর্শক) রূপে পরিচিত হয়।'
যুন্নুন মিস্ত্রী বলেন, 'তুমি তার সাহচর্যে বস যার কর্ম-গুণ তোমার সহিত কথা বলে এবং তার নিকট বসো না যার জিভ তোমাকে কথা বলে। আর বলা হয় যে, 'ওয়াযকারী (বক্তা)র যাকাতের নিসাব হল, প্রথমে নিজেকেই সেই ওয়াযমত প্রস্তুত করা, তাহলে যার নেসাব নেই সে যাকাত দিবে কেমন করে?'
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, 'তুমি তার মত হয়োনা যে বিনা আমলে পারলৌকিক সুখের আশা করে এবং দীর্ঘ বাসনা হেতু তওবায় বিলম্ব করে। দুনিয়া প্রসঙ্গে বৈরাগীর মত কথা বলে অথচ কর্ম করে দুনিয়াদারের ন্যায়। পার্থিব সম্পদ পেলেও তুষ্ট হয় না, না পেলে বিষয় তৃষ্ণা মিটে না, মানুষকে তা উপদেশ দেয় যা সে নিজে করে না, নেক লোকদের ভালোবাসে কিন্তু তাদের মত আমল করে না। মন্দ লোকদের ঘৃণাবাসে কিন্তু সে তাদেরই অন্যতম। অধিক পাপের জন্য মরণকে ভয় করলেও যার জন্য মরণকে ভয় হয় তাতেই সে অবিচল থাকে।'
তিনি আরো বলেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে জনসাধারণের ইমাম মনে করে তার উচিত, অপরকে শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে নিজেকে শিক্ষা দেওয়া এবং মুখ দ্বারা আদব দেওয়ার পূর্বে সদাচরণ ও সচ্চরিত্র দ্বারা আদব দেওয়া।'
জুনাইদ (রঃ) বলেন, 'জেনে রেখো যে, সর্বাপেক্ষা সহজভাবে যা ভক্তদের হৃদয় আকৃষ্ট করে, উদাসীনদের অন্তরকে এবং পশ্চাদ্গামীদের মনকে সতর্ক করে তা হল, সেই কর্ম ও আমল যা সকল কথার সত্যায়ন ও বাস্তবায়ন করে। সেটা কি ভালো মনে হবে ভাই যে, একজন আহ্বানকারী কোন কর্মের প্রতি আহ্বান করবে অথচ তার উপর নিজের কোন চিহ্ন বা নিদর্শন থাকবে না? তার নিকট হতে ঐ কর্মে আদর্শ, সৌন্দর্য ও প্রভাব অভিব্যক্ত হবে না! তার বক্তৃতা বাস্তবায়নকল্পে নিজে আমল করবে না এবং ঐ বচন অনুসারে কোন কর্ম করবে না। সে তো মিথ্যুক যে পার্থিব বিষয়ের প্রতি অনাসক্তির বুলি ঝাড়ে অথচ তার কর্মে বিষয়াসক্তের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। বর্জন করতে আদেশ করে কিন্তু সে নিজে গ্রহণকারী হয়, শ্রম ও চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করে কিন্তু সে নিজে অলস ও নিরুদ্যম হয়। যাদের আচরণ এইরূপ হয় তাদের নীতিকথার শ্রোতা খুবই কম তাদের নিকট থেকে নীতি গ্রহণ করে থাকে। তাদের কর্ম দেখে শ্রোতাদের হৃদয় বীতস্পৃহ হয়। তারা সেই ব্যক্তির জন্য দলীল হয় যে তার মানস-পূজার জন্য 'তাবীল' (দূর ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য)কে হেতু করে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার আখেরাতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয় তার পথ সুগমকারীরূপে নিরূপিত হয়। তুমি কি শোননি? আল্লাহ তাআলা শাইখুল আম্বিয়া, তাঁর অন্যতম মহান রসূল এবং তাঁর অন্যতম বড় ওলী শোয়াইব (আঃ) এর সুগুণ বর্ণনা করে বলেন, যা তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি তার বিপরীত করতে চাইনা যা করতে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ করছি।” (সূরা হুদ ৮৮- আয়াত) অর্থাৎ আমি যা করতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি তা আমি নিজেও করি না।
আল্লাহ আআলা বলেন, “কি আশ্চর্য! তোমরা নিজেদেরকে বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না?” (সূরা বাক্বারাহ ৪৪)
তিনি অন্যত্রে বলেন, “হে ঈমাদারগণ! তোমরা যা কর না তা বল কেন? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক।” (সূরা সাফফ ২ আয়াত)
•• জনৈক আরবী কবি বলেন;
يا أيـ ـ ـها الــ رجل ا ـ ـ لم غه + هـ ـ لا لن ـ فسك كان ذا الت - عليم
تصف الدواء لذي السقام وذي + الض كي ما يصح به وأنت سقيم
اب ـ دأ بن ـ فسك فا ـ ها عن غيها + فإذا انت - هت عنه فأنت حكـ ـ يم
فهناك يقب ـ ل ما تقـ ـ ول ويقتدى + بالفع - ل منك وينف - ع التعـ ـ ليم
لا تنــه عن خـ ـ لق وتــاً مثل ـه + عار عليك إذا فعلت عظ ـ يم
অর্থাৎ, হে অপরকে শিক্ষাদাতা শিক্ষক! আপনি নিজের জন্য কেন শিক্ষক হন না? অসুস্থ ও ব্যাধিগ্রস্তের আরোগ্যলাভের জন্য আপনি ঔষধ (ব্যবস্থাপত্র) দান করেন অথচ আপনি নিজেই সেই রোগী! প্রথমে আপনি নিজেকে অসদাচারণ থেকে বাঁচান। অতঃপর (অপরকে বাঁচান তবেই) আপনি প্রকৃত প্রজ্ঞাবান। তখনই আপনার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং আপনার কর্ম অনুসরণযোগ্য হবে, আর শিক্ষাও হবে উপকারী। যে পাপ আপনি নিজে করেন তা হতে অপরকে নিষেধ করবেন না। যদি তা করেন তবে তা হবে আপনার জন্য বড় লজ্জাকর বিষয়।
ইয়াহুদ জাতিকে তওরাত দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তারা তার উপর আমল করেনি। যার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা তাদের উপমা বর্ণনা করে বলেন, “যাদেরকে তওরাত-বিধান দেওয়া হলে তা অনুসরণ (আমল) করেনি তাদের উপমা সেই গর্দভ যে পুস্তক বহন করে। কত নিকৃষ্ট সে সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা জানে!” (সূরা জুমুআহ ৫ আয়াত)
ওদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন, “যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, 'তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ (বর্ণনা) করবে এবং তা গোপন করবে না। এরপরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে এবং স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট।” (সূরা আ-লে ইমরান ১৮৭ আয়াত)
“পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে” এর ব্যাখ্যায় মালেক বিন মিগওয়াল বলেন, 'তারা ঐ কিতাবের উপর আমল ত্যাগ করে।'
আল্লাহ তাআলা জনৈক আমলত্যাগী বড় আলেমের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “(হে নবী!) তুমি ওদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও যাকে আমি নিদর্শনাবলী (কিতাবের জ্ঞান) দান করেছিলাম, অতঃপর সে তার (নৈতিকতার গভী) থেকে বের হয়ে যায় ফলে শয়তান 'তার পিছনে লাগে এবং সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর আমি ইচ্ছা করলে এ দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয় এবং নিজ কামনা-বাসনার অনুসরণ করে। তার অবস্থা কুকুরের মত; যাকে তুমি কষ্ট দিলে সে জিব বার করে হাঁপাতে লাগে এবং কষ্ট না দিলেও সে জিব বার করে হাঁপায়। যে সম্প্রদায় আমার আয়াত (নিদর্শনসমূহকে) প্রত্যাখ্যান করে তাদের অবস্থাও ঐরূপ।” (সূরা আ'রাফ ১৭৫ আয়াত)
হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর সহচরবৃন্দকে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদেরকে এজন্য শিক্ষা দিচ্ছি না যে তোমরা কেবল (তা শুনে) আশ্চর্যান্বিত হবে। বরং এজন্য শিক্ষা দিচ্ছি যে, তোমরা তার উপর আমল (কর্ম) করবে।
সুতরাং ইল্ম প্রচার করাই প্রজ্ঞা নয় বরং তার উপর আমল করাই হল প্রকৃত প্রজ্ঞা।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, 'কুরআন অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা এবং তার উপর আমল করা। সুতরাং এর হিফ্যকারী (হাফেয) এর যদি সে সংকল্প না হয় তাহলে সে আহলে ইল্ম ও দ্বীন হতে পারবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) “যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছি তারা তা যথাযথভাবে তেলাঅত (পাঠ) করে” (সূরা বাক্বারাহ, ১২১ আয়াত) আল্লাহ তাআলা এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ তারা তা যথার্থরূপে পাঠ করে এবং যথাযথভাবে তার অনুসরণ করে।' (ইবনে কাসীর ১/২০৫)
সুতরাং টিয়াপাখীর মত ঠোঁটস্থকারী পাকা পাকা হাফেয এবং মনমুগ্ধকারী কোকিলকণ্ঠে ক্বিরাআতকারী বড় বড় ক্বারী হয়ে বা তৈরী করে সমাজের কি উপকার হতে পারে যদি তার প্রাণ ও আসলত্ব আর কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য সকলের নিকট গুল থেকে যায়? চিনি বহনকারী যদি না বোঝে যে চিনি মিষ্টি না তেঁতো তবে এমন মুটিয়ার প্রতি শত ধিক্।
অনুষ্ঠানে শ্রোতামন্ডলীর মন-মোহিত করার উদ্দেশ্যেই যদি তেলাঅত হবে তবে তার নির্দেশানুসারে আমল করে বিশ্ববাসীকে মোহিত করার সময় কখন? শুধুমাত্র প্রসূতি প্রসব করা, ব্যাধির জ্বালা এবং জিনের উৎপীড়ন বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই কুরআন পাঠ করা এবং তাবীয বানিয়ে গলায়, বাজুতে বা কোমরে বাঁধা হলে পৃথিবীতে অরাজকতা ও দুঃশাসনের উৎপীড়ন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কখন অধ্যয়ন হবে? কুরআনী ললিতসূরের শব্দে মাথা হিলিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতেই জীবন অতিবাহিত করলে তার নির্দেশরে রাস্তবে রূপ দান করে সমাজের বুনিয়াদ হিলিয়ে পৃথিবীকে বিস্মিত করার সময় কখন? রূহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে মৃতের নামে কুরআনখানী হলে পরিবেশ সংস্কারের উদ্দেশ্যে জীবিতদেরকে আর কখন কুরআনের মূল বক্তব্য শোনানো হবে? ভুয়ো তা'যীমের উদ্দেশ্যে জুজদানে বেঁধে 'বড়চীজ' বলে চুমু খেয়ে বাড়ির উঁচু তাকে তুলে রাখলে তা যথার্থ অধ্যয়ন করে তার অর্থসহ তেলাঅত করতে পেরে কুরআনী জীবন ও পরিবেশ গড়ে আর কখন আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে উন্নত হতে পারব? অথচ আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর অবতীর্ণ জীবন-ব্যবস্থা অনুসারে নিজেদের (জীবন, আচরণ ও রাষ্ট্র) পরিচালনা করে না তারা কাফের।” (সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াত)
আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতি যে কিতাব প্রত্যাদেশ করা হয় তা তেলাঅত কর এবং যথার্থভাবে নামায পড়, নিশ্চয় নামায অশ্লীলতা ও অসৎকর্ম থেকে (মানুষকে) বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবুত ৪৫ আয়াত)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেন, 'কিতাব তেলাঅত করা, অর্থাৎ আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করা।' অনুরূপ অন্যান্য ওলামারাও একই কথা বলেছেন যে, তেলাঅত শুধু ইবাদতের নিয়তেই করা যথেষ্ট নয়। যা যথেষ্ট তা হল তা বুঝা, আমল করা এবং সেই আমলের অন্যতম আমল কুরআন তেলাঅত করা।
মহান আল্লাহ আরো বলেন, “এই কল্যাণময় গ্রন্থ যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা স্বাদ ২৯ আয়াত)
হাসান বাসরী বলেন, 'আল্লাহর কসম! কুরআনের অক্ষর ও শব্দ সংরক্ষণ করে এবং ওর দন্ডবিধি বা বিধানসমূহ বিনষ্ট করে (আমল না করে) 'অনুধাবন' হয় না। ওদের কেউ বলবে, আমি গোটা কুরআন পড়েছি; (অথবা মাসে ২/৩ বার খতম করি) কিন্তু ওদের জীবন ও চরিত্রে কুরআনের কোন চিহ্ন ও প্রভাব দেখা যায় না!' (ফারাইদুল ফাওয়াইদ ১২৭পৃঃ)
কুরআনী ইল্ম যে সহজ নয়, অন্য কথায় কেবল হিফ্য ও ক্বিরাআত করাই যে ইলমের শেষ উদ্দেশ্য নয় তা ইবনে উমর (রাঃ) এর কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, 'আমরা এই উম্মতের প্রথম ও পুরোগামী। রসূল ﷺ এর শ্রেষ্ঠ ও সত্তম সাহাবী কুরআনের কেবল একটি সূরা বা তদ্রূপ কিছু যথার্থরূপে প্রতিষ্ঠা করতেন। কুরআন তাঁদের উপর ভারী ছিল। কিন্তু তাঁদেরকে ইল্ম ও আমল দান করা হয়েছিল। আর এই উম্মতের শেষভাগের মানুষদের উপর কুরআন এমন হাল্কা হয়ে যাবে যে, শিশু ও অনারব তা পাঠ করবে। কিন্তু তা কিছুমাত্রাও উপলব্ধি করবে না অথবা তার কিছুও পালন করবে না।'