📄 আদর্শ আলেম কে?
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আলেম তিনিই যিনি আল্লাহকে ভয় করেন।' অতঃপর তিনি তাঁর এই বাণী পাঠ করেন যার অর্থ, “আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে।” (সূরা ফাতের ২৮)
সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ বলেন, 'আলেম তিনি নন যিনি অসৎ থেকে সৎকে চিনতে পারেন বা জানেন, বরং আলেম তিনিই যিনি সৎ জানেন অতঃপর তার অনুসরণ করেন।'
যায়েদ বিন আসলাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি যাকে ইচ্ছা বহু মর্যাদায় উন্নত করি।” অর্থাৎ, ইল্ম দ্বারা। যেমন তিনি আরো বলেন, “আমি কতক নবীকে কতক নবীর উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছি।” অর্থাৎ ইল্ম দ্বারা।' (সূরা আনআম ৮-৩ ও সূরা ইসরা ৫৫)
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يرفع اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে ইল্ম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন।” (সূরা মুজাদিলাহ ১১ আয়াত)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ভাষ্যে বলেন, 'মুমিন (বিশ্বাসী)দের মধ্যে যাঁদেরকে ইল্ম দান করা হয়েছে তাঁদেরকে -যাঁদেরকে ইল্ম দান করা হয়নি তাঁদের উপর -আল্লাহ তাআলা মর্যাদায় উন্নত করবেন।'
এক মহিলা শা'বীকে সম্বোধন করে 'হে আলেম!' বললে তিনি বললেন, 'আলেম তো তিনিই যিনি আল্লাহকে ভয় করেন।'
মসরূক বলেন, 'ইল্মের দিক থেকে মানুষের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে সে আল্লাহকে ভয় করে এবং মূর্খতার দিক দিয়ে মানুষের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে নিজের আমল দ্বারা গর্বিত হয়।'
সওরী বলেন, 'ওলামাগণ বিনষ্ট হলে কে তাঁদের সংশোধন করবে? আর তাঁদের বিনষ্ট; দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া বা বিষয়াসক্ত হওয়া। ডাক্তার যদি নিজের দেহে রোগ টেনে আনে তাহলে সে অপরের চিকিৎসা কি রূপে করবে?'
ফুযাইল বিন ইয়ায (রঃ) বলেন, 'আখেরাতের আলেম, যাঁর ইল্ম গুপ্ত। আর দুনিয়ার আলেম, যাঁর জ্ঞান বিক্ষিপ্ত। অতএব তোমরা আখেরাতের আলেমের অনুসরণ কর, আর দুনিয়ার আলেমের নিকট বসা থেকে সাবধান থাক। যেহেতু সে তার প্রতারণা, বাহ্যিক আড়ম্বর, বাকচাতুর্য ও বিনা আমলে ঝুটা ইলমের দাবী দ্বারা তোমাদেরকে বিঘ্নে নিপতিত করবে। আর আলেম তিনিই যিনি সত্যবাদী---।'
কিছু উলামা বলেন, 'অসৎ প্রকৃতির উলামা মানুষের পক্ষে ইবলীস অপেক্ষা অধিকতর ক্ষতিকর। যেহেতু ইবলীস যখন কোন মুমিনকে প্ররোচনা দেয় তখন সে জানতে পারে যে সে (শয়তান) তার প্রকাশ্য ভ্রষ্টকারী শত্রু। তাই তারপর সে গোনাহ থেকে সত্বর তওবা করে এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। পক্ষান্তরে অসৎ প্রকৃতির ওলামা বাতিল ও অন্যায়ভাবে মানুষকে ফতোয়া দান করে থাকে, কৃত্রিমতা, বিতর্ক ও বাক্চাতুরি দ্বারা নিজের প্রকৃতি ও খেয়াল-খুশী অনুযায়ী শরীয়তের অনুশাসনে সংযোজন ও অতিরঞ্জন করে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন উলামাদের অনুসরণ করে সে কর্ম ও আমলে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়। পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পন্ড হয় অথচ তারা মনে করে যে, তারা নাকি সৎকর্ম করছে।
অতত্রব শত সাবধান এমন আলেম হওয়া থেকে, এমন আলেমের অনুসরণ জালে পতিত হওয়া এবং অন্ধভাবে তাতে আবদ্ধ হওয়া থেকে। উচিত হল, এমন আলেম হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং তাদের অনুসরণ ও অনুগমন থেকে নিজেকে বহু দূরে রাখা। আর সেই আলেমদের অনুসরণ ও সাহচর্য নির্বাচন-ও-অবলম্বন করা যাঁরা প্রকৃতপক্ষে আদর্শ আলেম, সৎ ও সত্য আলেম।
সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন, 'ইল্ম এজন্যই শিক্ষা করা হয় যাতে তার মাধ্যমে আল্লাহর ভীতি অর্জন করা যায়। ইল্মকে অন্যান্য থেকে শ্রেষ্ঠত্ব এই জন্য দান করা হয়েছে যে, তার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করা হয়।'
বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'ইল্ম অনুসন্ধান করা বিষয়াসক্তি হতে পলায়ন করার প্রতি নির্দেশ করে, বিষয়-লালসার প্রতি নয়। বলা হত যে, সর্বাপেক্ষা উচ্চ মর্যাদার আলেম তিনিই, যিনি তাঁর দ্বীন নিয়ে দুনিয়া হতে পলায়ন করেন এবং খেয়াল-খুশীর উপর যাঁকে পরিচালিত করা সহজ নয়।’
আলেম যদি তার ইলম্ অনুসারে আমল না করেন তবে নিশ্চয় তিনি ঘৃণার্হ, আল্লাহর নিকটেও শাস্তিযোগ্য। কথিত আছে যে, আল্লাহ হযরত দাউদ (আঃ) এর প্রতি প্রত্যাদেশ করে বললেন, 'হে দাউদ! তুমি আমার ও তোমার মাঝে কোন দুনিয়াদার বিষয়াসক্ত লোভী আলেমকে উপস্থিত করো না, নচেৎ সে তোমাকে আমার প্রেমের পথে প্রতিহত করবে। কারণ ওরা আমার ভক্ত বান্দাদের পথে দস্যুদলের মত। আমি ওদেরকে ন্যূনতম শাস্তি এই প্রদান করব যে, ওদের হৃদয় হতে মুনাজাতের মিষ্টতা ছিনিয়ে নেব।' (জামেউ বায়ানিল ইলমি অফাযলিহ ১/১৯৩)
ফুযাইল বিন ইয়ায ও আসাদ বিন ফুরাত হতে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, 'আমাদের নিকট পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিন মূর্তিপূজকদের পূর্বে ফাসেক কুরআন পাঠকারী ক্বারী ও আলেমদের হিসাব গ্রহণ করা হবে।' ফুযাইল বলেন, 'যেহেতু যে জানে, সে তার মত নয় যে জানে না।'
আবুল আলিয়াহ বলেন, 'মানুষের উপর এমন এক যুগ আসবে যখন কুরআন হতে তাদের হৃদয় পতিত হয়ে যাবে। তার কোন মাধুর্য ও স্বাদ তারা পাবে না। যা করতে তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তা না করে তারা (অলস আশাবাদী হয়ে) বলবে, 'আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান।' আর যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে তা করে তারা বলবে, 'আমাদেরকে আল্লাহ মাফ করে দেবেন, আমরা তো আল্লাহর সহিত কিছুকে শরীক করিনি!' তাদের সমস্ত বিষয়ই লালসাময় হবে, যার সহিত কোন সততা থাকবে না। তারা নেকড়ের মনের উপর মেষের চর্ম পরিধান করবে। ধর্মে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হবে সেই ব্যক্তি যে হবে তোষণকারী।'
নবী কে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, "(সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হল) 'উলামা, যখন তারা বিনষ্ট ও কর্তব্যচ্যুত হয়ে যায়।"
📄 ইখলাস
আহলে ইল্ম, আলেম, মুদারিস বা তালেবে ইল্মের উচিত, তিনি যে বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে তাঁর সর্বকাজ করবেন তা যেন পুরো ইখলাসপূর্ণ হয়। এই ইল্মের গোড়ায় নিয়ত রাখবেন যে, তিনি এর দ্বারায় একমাত্র আল্লাহর তুষ্টি বিধান চান, এই ইবাদতের দ্বারা অন্যান্য ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করে তাঁর সামীপ্য চান। যে ইবাদত (ইন্ন তলব করা) সবচেয়ে বড়, পূর্ণতাপ্রাপ্ত, মঙ্গলময় ও উপকারী। সকল প্রকার ছোট ও বড় কাজে এই অমূল্য ও মযবুত বুনিয়াদের কথা স্মরণ রাখবেন। শিক্ষা ও শিক্ষকতার সময়, বাহাস ও মুনাযারার সময়, লিখন ও বক্তৃতার সময়, ওয়ায ও নসীহত করার সময়, হিফ্য ও আলোচনা করার সময়, ইলমী মজলিসে বসার সময়, অথবা তার প্রতি পদার্পণের সময়, কিতাব অথবা অন্যান্য ইলমের উপকরণ ক্রয় করার সময়, তাঁর অন্তস্তলে যেন একমাত্র আল্লাহর জন্য ইখলাস বিদ্যমান থাকে। নেকী ও সওয়াব হাসিলের নিয়ত থাকে। যাতে সকল প্রকার ব্যাপৃতি ও ব্যস্ততা আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে পরিণত হয়। আল্লাহ ও তাঁর জান্নাতের জন্য বিচরণ হয় এবং প্রিয় নবী এর এই বাণীর দৃষ্টান্ত হয়, “যে ব্যক্তি এমন পথে চলে যাতে সে ইল্ম অন্বেষণ করে। আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের প্রতি চলার পথ সহজ করে দেন। (মুসলিম)
বিচরণ অথবা আচরণের পথ; সকল পথই আহলে ইল্মগণ যাতে ইল্মের খাতিরে চলেন-তা এই হাদীসে উদ্দিষ্ট হয়েছে।
পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইলম তলব করা এক ভয়ঙ্কর বিপদ, যা একপ্রকার শির্ক। তাই সাবধান! যাতে ঐ ইল্ম অর্জন কোন মন্দ উদ্দেশ্যে; গর্ববোধ, বিতর্কপ্রীতি, লোক প্রদর্শন, সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন, নেতৃত্ব ও পদলাভ, সম্পদ ও অর্থোপার্জন, কোন সম্ভ্রান্তাকে বিবাহ করা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে না হয়, কারণ এই লক্ষ্য তাঁদের হতে পারে না যাঁরা প্রকৃত আহলে ইল্ম ও উলামা। আর যাঁরা ঐসব উদ্দেশ্যের কোন এক কারণে ইল্ম অর্জন ও বিতরণ করে থাকেন তাঁদের জন্য আখেরাতের কোন অংশ নেই।
ইমাম নাসাঈ আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত করেছেন যে, 'এক ব্যক্তি নবী এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'এমন এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কি, যে সওয়াব ও খ্যাতিলাভের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে? তার জন্য কি?' উত্তরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি বললেন, “যে কর্ম আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ হয় এবং যদ্দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করা হয় তা ছাড়া তিনি কোন কর্মকে কবুল (গ্রহণ) করেন না।' (নাসাঈ ২/৫৯)
ইমাম আবুদাউদ আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! এক ব্যক্তি জিহাদ করতে চায়, কিন্তু সে তাতে পার্থিব কোন স্বার্থ কামনা করে।' রসূল বললেন, “তার জন্য কোন সওয়াব নেই।” লোকটি ঐ একই কথা তিনবার ফিরিয়ে বলল। নবী প্রত্যেক বারেই উত্তরে বললেন, “তার জন্য কোন সওয়াব নেই।”
রসূল বলেন, “এই উম্মতকে অভ্যুদয়, দেশসমূহে ক্ষমতা, স্থিতি, বিজয়লাভ এবং দ্বীনের মধ্যে সুউচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ দাও। আর তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরকালের কর্মকে মাধ্যম করে ইহকাল দুনিয়ার উদ্দেশ্যে কোন কর্ম করবে তার জন্য পরকালের কোন অংশ নেই। (মুসনাদে আহমদ ৫/১৩৪)
তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আমি সকল অংশীদার অপেক্ষা অধিক শির্ক (অংশীদারী) হতে বেপরোয়া। অতএব যে ব্যক্তি আমার জন্য কোন এমন আমল করবে যাতে সে আমি ভিন্ন অন্য কাউকে অংশী করবে আমি তার থেকে সম্পর্কহীন। আর সে আমল তার জন্য হবে যাকে সে শরীক করেছে।” (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ আশা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” (সূরা কাহফ ১১০ আয়াত)
তিনি অন্যত্র বলেন, “তারা কেবল একনিষ্ঠভাবে বিশুদ্ধ-চিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতেই আদিষ্ট হয়েছিল।” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৫ আয়াত)
সুতরাং প্রত্যেক ইবাদত ও আমলের ইচ্ছা, উদ্দেশ্যে ও সংকল্পে ইখলাস বা আল্লাহরই জন্য বিশুদ্ধচিত্ততা একান্ত আবশ্যক। ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'যেরূপ তিনি একক উপাস্য, তিনি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। ঠিক তদনুরূপই ইবাদত ও উপাসনা শরীকবিহীনভাবে একমাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। অতএব যেমন তিনি তাঁর উপাস্যত্বে একক ঠিক তেমনই তাঁকে তাঁর ইবাদতে একক মানা সকলের জন্য ওয়াজেব। তাই নেক আমল বা সৎকর্ম সেই আমল বা কর্মকে বলে যা লোকপ্রদর্শন থেকে বিশুদ্ধ এবং সুন্নাহর অনুবর্তী হয়।'
উপরোক্ত দুটি শর্তই গ্রহণযোগ্য আমলের দুই স্তম্ভ। আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়া একান্ত আবশ্যক। আর তা সঠিক তখনই হবে যখন সুন্নাহর নির্দেশিত রীতি-নীতি ও পদ্ধতির অনুসারে তা করা হবে। যেমন আল্লাহ তাআলার এই বাণী “সে যেন সৎকর্ম করে” তে এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর বিশুদ্ধ তখন হবে যখন আমল প্রকাশ্য ও গুপ্ত শির্কের ভেজাল থেকে নির্মল ও খাঁটি হবে। যার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, “এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকেও (যেন) শরীক না করে।” (তাইসীরুল আযীযিল হামীদ ৫২৫ পৃঃ)
সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত। তার নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে ইল্ম সন্ধানে শুদ্ধ ও সৎ করা। আর ইল্ম অন্বেষণে সৎ বা নেক নিয়ত তখন হয় যখন তাতে আল্লাহর সন্তষ্টি কামনা করা হয় এবং তার (ইল্ম) দ্বারা আমল করা, শরীয়তকে জীবন্ত ও সংস্কার করা, নিজের অন্তঃকরণকে জ্যোতির্ময় করা, নিজের অভ্যন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, সমাজের মূর্খতা দূরীভূত করা, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর প্রস্তুত রাখা জান্নাতের অধিকারী হওয়া ইত্যাদির আশা পোষণ করা হয়।
অর্থাৎ, এই ইল্ম অনুসন্ধানে পার্থিব কোন স্বার্থলাভ, পদ, মর্যাদা, খ্যাতি, যশ ও অর্থলাভ, সমকালীন ওলামাদের সহিত পরস্পর গর্ব ও বড়াই করা, মানুষের নিকট সম্মান পাওয়া, বিভিন্ন বৈঠকে ও জালসায় আমন্ত্রিত হওয়ার লালসা প্রভৃতি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য না হয়। নচেৎ নিকৃষ্টতর বস্তুকে উৎকৃষ্টতর বস্তুর পরিবর্তে বিনিমিয় করে নেওয়া হবে।
বলা বাহুল্য, এই নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে সৎরূপে নিশ্চিত ও স্থির রাখা খুবই কঠিন কাজ। সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন, 'নিয়ত অপেক্ষা কোন কঠিনতর বস্তুর উপর আমি সাধনা করিনি।'
সহল (রঃ)কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আত্মর উপর সবচেয়ে কঠিন বস্তু কি? বললেন, 'ইখলাস।'
ইউসুফ বিন হুসাইন বলেন, 'দুনিয়ার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু ইখলাস। আমি আমার অন্তর থেকে রিয়া (লোকপ্রদর্শন) দূর করার উপর কত প্রচেষ্টা ও প্রযত্ন করি তবুও তা যেন অন্য এক রঙে উদ্গত হয়।'
আবু সুলাইমান বলেন, 'বান্দা যখন কর্মে ইখলাস আনয়ন করে তখন তার নিকট হতে সকল প্ররোচনা এবং লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্য দূরীভূত হয়ে যায়।'
আল হিরাবী বলেন, 'ইখলাস প্রত্যেক ভেজাল হতে আলেমের জন্য নির্মলতা।'
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, 'অর্থাৎ মুখলিসের আমল আত্মার কামনার সর্বপ্রকার ভেজাল থেকে পবিত্র ও বিশুদ্ধ হয়; সৃষ্টির হৃদয়ে সুন্দর ও সুশোভিত হতে চাওয়া, তাদের প্রশংসা কামনা করা এবং দুর্নাম থেকে বাঁচার উদ্দেশ্য রাখা, তাদের সম্মান ও ভক্তি লুটার আকাঙ্খা করা, তাদের মাল, খিদমত বা সেবা অথবা প্রেম ও ভালবাসার আশা করা, তাদের মাধ্যমে নিজের কার্যসিদ্ধি করার ইচ্ছা পোষণ করা ইত্যাদি ব্যাধি ও ভেজাল থেকে তার আমল ও কর্ম মুক্ত ও পরিশুদ্ধ হয়। যার সমষ্টি উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ছাড়া অন্য কিছু কামনা হয় না।
মুত্বারিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত করে সকালে আত্মপ্রশংসা অনুভব হওয়া অপেক্ষা সারা রাত্রি নিদ্রায় অতিবাহিত করে সকালে লাঞ্ছিত হওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয়।'
আবু ইউসুফ (রঃ) বলেন, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের আমল দ্বারা আল্লাহকে চাও। যেহেতু যখনই আমি কোন মজলিসে বসে বিনীত হওয়ার উদ্দেশ্য রাখি তখনই আমি তাদের সর্বোপরি না হয়ে উঠি না। আর যখনই আমি কোন মজলিসে বসে তাদের সর্বোপরি হওয়ার উদ্দেশ্য রাখি তখনই আমি অপমানিত হয়ে উঠি।'
ইলল্মও ইবাদতসমূহের অন্যতম ইবাদত। তাতে উদ্দেশ্য বা নিয়ত বিশুদ্ধ ও সৎ হলে তা গ্রহণ করা হয়, পবিত্র করা হয় এবং তার প্রাচুর্য বৃদ্ধি পায়। আর যদি তার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি-বিধান ব্যতীত অন্য কিছু উদ্দেশ্য হয় তাহলে তা বিফল হয়, নষ্ট হয়ে যায় এবং তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্ভবতঃ অন্যান্য উদ্দেশ্যও সফল বা পূরণ হয় না। ফলে তার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ এবং প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়। (তাযকিরাতুস সামে' অল মুতাকাল্লিম ৬৮-পৃঃ)
উপরোক্ত উক্তিসমূহকে একত্রিত করে রসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীস, যাতে তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে কিয়ামতে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির মীমাংসা করা হবে সে হল এমন ব্যক্তি, যে শহীদ হয়েছে। তাকে আনা হবে, আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তার নিকট পরিচিত করবেন। লোকটি তা চিনে নেবে। আল্লাহ বলবেন, 'তুমি তাতে কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'আমি আপনার পথে লড়াই লড়ে শহীদ হয়েছি।' তিনি বলবেন, 'মিথ্যা বললে তুমি। বরং তুমি এই জন্যই লড়াই লড়েছ যাতে তোমাকে বীর দুঃসাহসিক বলা হয়। আর তা বলাও হয়েছে।' অতঃপর তাকে তার মুখমন্ডলের উপর ছেঁচড়ে আকর্ষণ করে দোযখে নিক্ষিপ্ত করতে আদেশ করা হবে।
দ্বিতীয় এমন ব্যক্তি যে ইল্ম শিখেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আনা হবে। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তার নিকট পরিচিত করবেন, সে তা চিনতে পারবে। তিনি বলবেন, 'ওতে কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'আমি ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে তা শিক্ষা দিয়েছি, আর তোমার উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করেছি।' বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বললে। বরং তুমি এ জন্যই ইল্ম শিক্ষা করেছিলে যে, তোমাকে 'আলেম' বলা হবে, আর কুরআন পাঠ করেছিলে যাতে তোমাকে 'ক্বারী' বলা হবে। আর তা তো বলাও হয়েছে।' অতঃপর তাকে তার মুখমন্ডল হেঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে আদেশ দেওয়া হবে।
তৃতীয় এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রাশ্যস্ত দান করেছেন এবং সমস্ত প্রকার সম্পদ তাকে প্রদান করেছেন। তাকে আনা হবে। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তাঁকে চিনাবেন, সে চিনে নেবে। বলবেন, 'তাতে তুমি কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'যে পথে আপনি দান করা পছন্দ করেন আমি প্রত্যেক সেই পথেই আপনার উদ্দেশ্যে দান করেছি।' তিনি বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বললে। বরং তুমি এরূপ করেছ, যাতে তোমাকে 'দানশীল' বলা হয়, আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তাকে তার মুখ ছেঁচরে টেনে নিয়ে গিয়ে দোযখে নিক্ষেপ করতে আদেশ করা হবে।” (মুসলিম)
📄 বিষয়াসক্তি
পূর্বে একাধিকবার আলোচিত হয়েছে যে, দ্বীনকে ফাঁদ বানিয়ে দুনিয়া শিকার করা বা দ্বীনকে পার্থিব কোন সম্পদ উপার্জনের অসীলা ও মাধ্যম করা কোন তালেবে ইল্ম বা আলেমের জন্য বৈধ নয়। যেমন কোন সাধারণ মানুষের জন্যও দ্বীনকে জাল বানিয়ে কোন স্বার্থের মাছ শিকার করা অবৈধ। ইল্ম শিক্ষা করা দ্বীনের অংশ। তাই একেও কোন স্বার্থের বাহন করা আদৌ উচিত নয়। নবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন এমন ইল্ম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি তা সে কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)
ইবনে রজব এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এই হাদীসের পটভূমিকা এই যে, -আর আল্লাহই অধিক জানেন- পৃথিবীতে ত্বরান্বিত এক জান্নাত আছে এবং তা হচ্ছে আল্লাহর মা'রেফাত (পরিচিতি); তাঁর ভালোবাসা, তাঁর যিক্রে নিরুদ্বেগ অর্জন, তাঁর সাক্ষাতের বাসনা, তাঁর ভীতি, আনুগত্য ইত্যাদি। ফলপ্রসূ ইল্ম এর প্রতি নির্দেশ করে। অতএব যার ইল্ম পৃথিবীর এই ত্বরান্বিত বেহেশ্বে প্রবেশ করতে নির্দেশ করে সে পরকালের বেহেশে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি পৃথিবীর এই জান্নাতের সৌরভ পায় না সে ব্যক্তি পরকালের জান্নাতের সৌরভ-ঘ্রাণ পাবে না। এই জন্যই আখেরাতে সবচেয়ে অধিক শাস্তিযোগ্য হবে সেই আলেম যার ইল্ম দ্বারা আল্লাহ তাকে উপকৃত করেননি এবং সেই হবে কিয়ামতের দিন অধিকতম আক্ষেপকারী। যেহেতু তার নিকট এমন যন্ত্র ছিল যার সাহায্যে সে সর্বাপেক্ষা সুউচ্চ মর্যাদা ও উন্নত স্থানে পৌঁছতে পারত, কিন্তু সে তা (তাতে ব্যবহার না করে) কেবলমাত্র সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট, তুচ্ছ এবং নগণ্য বিষয়ে ব্যবহার করেছে। সুতরাং সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় হয়েছে যে ব্যক্তির নিকট মূল্যবান উৎকৃষ্ট মণি-মুক্তা ছিল কিন্তু তা বিষ্ঠা বা কোন মূল্যহীন নোংরা বস্তুর বিনিময়ে বিক্রয় করে ফেলেছে। এই অবস্থা তার, যে নিজের ইল্ম দ্বারা পার্থিব সম্পদ অন্বেষণ করে।'
পূর্বে উল্লেখিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)
এই হাল তাঁদেরও যারা দ্বীনকে বাহন করে কোন তাগুতের সংসদের সভ্য অথবা কোন পদস্থ নেতা হওয়ার আকাঙ্খা পোষণ করে থাকেন।
অনুরূপ সেই 'ক্বারী' ও হাফেযের দল; যাঁরা কেবল মাত্র অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে ক্বিরআত ও হিফ্য করেন এবং অপরকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। যেহেতু হাদীসে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।” (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং)
তদনুরূপ ঐ প্রকার ভারাটে ক্বারী ও হাফেয যাঁরা কুরআন কারীমের অর্থ বোঝেন না, কুরআন প্রচারের উদ্দেশ্যে কাউকে তা বুঝাতেও পারেন না, ইবাদতের নিয়তে পাঠও করেন না অথচ কোন ডাক এলে খতম পড়ার জন্য 'হায়ার' যেতে কুণ্ঠাবোধ না করে গর্ববোধ করেন। যেমন সেই দ্বীনি বক্তারও এই অবস্থা, যিনি বক্তৃতাকে ভাড়া খাটিয়ে সমাজের অর্থ লুটে বেড়ান। যার অন্তঃসারশূন্য বক্তৃতায় না কোন ইখলাস থাকে, না দ্বীন প্রচারের নিয়ত। অপরকে সৎকার্যের আদেশ দেন, কিন্তু তাঁর নিজের জীবনে পূর্ণ দ্বীন বাস্তব করেন না। কথায় আস্ফালন ও মাধুর্য থাকলেও কর্মে তিনি যত্নবান নয়।
যেমন সেই মুদারিস যিনি বহু ছাত্রকে দস্ দিয়ে ফারেগ করেছেন কিন্তু নিজের কোন ছেলে-মেয়েকে পূর্ণ মুসলিম করতে চেষ্টা করেন নি। কেউ সঠিকমত পড়ছে বা শিখছে কিনা তা তাঁর চিন্তার বিষয় নয়, বরং তাঁর চিন্তার বিষয় হল, মাসের ৩০ তারীখ আর কয় দিন পর?!
এমন লেখকদের কথাও বলা যায়। যাঁরা দ্বীন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে পাঠকের দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সেই লিখায় প্রকৃত প্রাণ থাকে না যার দ্বারা কাল কিয়ামতে তাঁদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। বরং এমন কিছু লিখে থাকেন যার পরিণামে কাল তাঁদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। কারো বা উদ্দেশ্য থাকে, লেখার ময়দানে প্রতিযোগিতা, অথবা ভাষার বহর, অথবা সাহিত্যিক রচনাশৈলী ও প্রতিভা প্রদর্শন, অর্থোপার্জন বা খ্যাতি লুণ্ঠন, অথবা কারো সম্ভ্রম অপহরণ ইত্যাদি। এঁদের জন্য আখেরাতে কি কোন অংশ আছে? আর এঁদের দ্বারায় কি সমাজ উপকৃত হবে?
পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ তাঁর আদর্শ নবীকে সম্বোধন করে বলেন,
قل مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ
অর্থাৎ, বল, আমি উপদেশের উপর তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না এবং আমি লৌকিকতাকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা স্বা-দ ৮-৬ আয়াত)
আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী বলেন, “তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তদ্দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তদ্দ্বারা দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলায়ত করবে।’ (আবু উবাইদ, হাকেম)
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'কি করবে তোমরা-যখন তোমাদেরকে এমন ফিতনা গ্রাস করবে, যাতে শিশু প্রতিপালিত হবে এবং বড় বৃদ্ধ হবে। (অর্থাৎ ঐ ফিতনা সকলের আচরণ ও অভ্যাসে পরিণত হবে।) যখন অভিনব রচিত (বিআতকে) সুন্নাহরূপে গ্রহণ ও ধারণ করা হবে; যার উপরে মানুষ চলবে। যদি তার কিছু অপসারণ করা হয় তো বলা হবে, 'সুন্নাহ অপসৃত হয়ে গেল।' বলা হল, 'এরূপ কখন হবে? হে আবু আব্দুর রহমান!' বললেন, 'যখন তোমাদের ক্বারীর সংখ্যা বেশী হবে, ফকীহ (প্রকৃত জ্ঞানী ও তত্ত্ববিদ আলেম) কম হবে, তোমাদের আমানতদার অল্প হয়ে যাবে, আখেরাতের কর্ম দ্বারা দুনিয়া সন্ধান করা হবে এবং দ্বীনী ইল্ম আমল ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা হবে।'
বর্তমান যুগে সেই ফিতনা প্রতীয়মান। আলেমে-আলেমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতর্ক, বিবাদ, কখনো বা দলাদলি ও হানাহানি দৃশ্যমান হয় এই ফিতনার কারণেই। যার কারণে সমাজের বুকে আলেমের মানও কমে গেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'যদি ইল্ম বহনকারীরা যথার্থরূপে নিষ্ঠার সাথে তা বহন করত তাহলে আল্লাহ, তাঁর ফিরিশামন্ডলী এবং সৎ লোকেরা তাদেরকে ভালোবাসতেন। আর লোকেরাও তাদেরকে সমীহ ও ভয় করত।' কিন্তু তারা ইল্ল্ফ দ্বারা পার্থিব স্বার্থ সন্ধান করেছে। যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে ঘৃণ্য করেছেন এবং তারা লোকেদের নিকট অবজ্ঞা ও অসম্মানের পাত্র হয়ে গেছে।'
মায়মুন বিন মিহরান বলেন, 'হে কুরআন ওয়ালারা! তোমরা কুরআনকে বেসাতিরূপে গ্রহণ করো না; যার দ্বারা দুনিয়াতে লাভ ও স্বার্থ খুঁজে বেড়াবে। বরং দুনিয়া দ্বারা দুনিয়াকে এবং আখেরাত দ্বারা আখেরাতকে অন্বেষণ কর। কেউ তো বিতর্ক করার জন্য কুরআন শিক্ষা করে, কেউ বা লোকে তার দিকে ইঙ্গিত করবে (প্রসিদ্ধ হবে) এই লোভে শিক্ষা করে। আর সেই ব্যক্তি উত্তম যে তা শিক্ষা করে এবং তাতে আল্লাহর আনুগত্য করে।'
বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'পূর্বের উলামাগণ তিন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। সত্যবাদিতা, হালালখোরী এবং পার্থিব বিষয়ের প্রতি অতিশয় বিরাগ। আর আজ আমি ওদের একজনের মধ্যেও এই সব গুণের একটাও দেখতে পাইনা। তাহলে তাদেরকে কি করে গ্রাহ্য করব বা কি করে তাদেরকে দেখে হাসিমুখে সাক্ষাত করব? কেমন করে তারা ইলমের দাবী করে অথচ তারা পার্থিব বিষয়ের উপর একে অপরের ঈর্ষা ও হিংসা করে। আমীর ও নেতৃবর্গের নিকট সমশ্রেণীর ওলামার নিন্দা ও গীবত করে। এসব এই জন্য করে যাতে তাদের অবৈধ অর্থ নিয়ে অপরদের প্রতি ঝুঁকে না যায়। ধিক্ তোমাদের প্রতি হে ওলামাদল! তোমরা যে আম্বিয়ার উত্তরাধিকারী! তাঁরা তো তোমাদেরকে ইল্মের ওয়ারেস বানিয়েছেন। যা তোমরা বহন করেছ, কিন্তু তার উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করেছ। তোমাদের ইল্মকে এক পেশা বানিয়ে নিয়েছ। যার দ্বারা তোমরা রুজী-রুটী কামাচ্ছ। তোমরা কি সে ভয় কর না যে, তোমাদের উপরেই প্রথম দোযখের অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে?'
এক অন্ধ ব্যক্তি সুফিয়ান সওরীর সাহচর্যে বসত। রমযান মাস এলে গ্রামাঞ্চলে বের হয়ে যেত। সেখানে লোকেদের ইমামতি করে বস্ত্রাহার উপার্জন করত। একদা সুফিয়ান তাকে বললেন, 'কিয়ামতের দিন আহলে কুরআনকে কিরাআতের বিনিময়ে প্রতিদান দেওয়া হবে আর এই রকম লোকের জন্য বলা হবে, তুমি তোমার প্রতিদান পৃথিবীতেই সত্বর নিয়ে ফেলেছ।' অন্ধ লোকটি বলল, 'আপনি আমার জন্য একথা বলছেন? অথচ আমি আপনার সহচর?' বললেন, 'আমি ভয় করছি যে, কিয়ামতে আমাকে বলা হবে, এতো তোমার সহচর ছিল, কেন ওকে উপদেশ দাওনি?'
শরীক যখন কুফার কাথী (বিচারপতি) নিযুক্ত হলেন তখন সুফিয়ান সওরী তাঁর সহিত সাক্ষাৎ করে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! ইসলাম, ফিক্ ও কল্যাণের (দ্বীনী ইলমের) পর কাযী পেশা (বিচারকার্য) গ্রহণ করলেন এবং কাযী বনে গেলেন?' শরীক তাঁকে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! লোকদের জন্য কাযীও তো আবশ্যক।' একথা শুনে সুফিয়ান তাঁকে বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! লোকদের জন্য পুলিশও তো আবশ্যক, (তা হলেন না কেন?)'
📄 ওলামা ও শাসকগোষ্ঠী
কতক উলামা আছেন যাঁরা ইল্মকে ধনী ও শাসকগোষ্ঠীর নৈকট্যলাভের এবং তাদের নিকট হতে কিছু অর্থ ও স্বার্থ-সিদ্ধিলাভের অস্ত্র স্বরূপ ব্যবহার করেন। যা কোন আলেমের জন্য নেহাতই নিকৃষ্ট ও নীচ আচরণ। এতে ওদের নিকট ইলমের কদর নষ্ট হয় এবং আলেমদের মান-মর্যাদাও ধূলিসাত হয়। তাই এ বিষয়ে বহু সলফে সালেহীন উলামা সমাজকে সচেতন করে বহু উপদেশ প্রদান করে গেছেন।
জা'ফর সাদেক বলেন, 'ফকীহগণ রসূলগণের আমানতদার ও বিশ্বস্ত (প্রতিনিধি); যতক্ষণ তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর দরজায় না আসে।'
সুফিয়ান বলেন, 'কোন বান্দা হতে যখন আল্লাহর প্রয়োজন থাকে না তখন তিনি তাকে শাসকগোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দেন। যখন কোন ক্বারীকে কোন নেতার দুয়ারে ধরনা দিতে দেখবে তখন জেনো যে, সে চোর! আর তাকে যদি ধনবানদের দরজায় পড়ে থাকতে দেখ তাহলে জেনো যে, সে কপট।'
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'শাকসগোষ্ঠীর দুয়ারে উটের আস্তাবলের মত বহু ফিতনা আছে। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার আত্মা আছে, তোমরা যে পরিমাণ অর্থ তাদের নিকট হতে গ্রহণ করবে তার সমপরিমাণ অথবা তার দ্বিগুণ পরিমাণ দ্বীন ওরা তোমাদের নিকট থেকে বিনষ্ট করে ফেলবে।'
ফযাইল বিন ইয়ায সুফিয়ান বিন উয়াইনাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, 'তোমরা উলামার দল দেশের প্রদীপ ছিলে, তোমাদের দ্বারা সব আলোকিত হত, কিন্তু এখন তোমরা নিজেরাই আঁধারে পরিণত হয়ে গেছ। তোমরা সেই তারকাপুঞ্জ ছিলে যাদের দ্বারা পথ চেনা যেত, কিন্তু আজ তোমরা নিজেরাই গোলক-ধাঁধা বনে গেছ। তোমাদের কেউ কি আল্লাহকে লজ্জা করে না - যখন সে ঐ আমীরদের নিকট উপস্থিত হয়ে ওদের মাল গ্রহণ করে? অথচ সে জানে যে, ওরা তা কোথা হতে সংগ্রহ করেছে। অতঃপর মিহরাবে এসে নিজের পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলে, 'আমাকে অমুক হতে অমুক হাদীস বর্ণনা করেছে----!'
ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, 'ইবলীসের গুপ্তপ্রতারণার মধ্যে এক প্রকার প্রতারণা হচ্ছে, আমীর ও শাসকগোষ্ঠীর সহিত ওলামাদের সংস্রব ও মিলা-মিশা রাখা, তাদের তোষামদ করা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের অসৎ কাজে বাধা না দেওয়া। কখনো বা তাদেরকে এমন কাজের অনুমতি খুঁজে দেয় যে কাজে ওদের জন্য কোন অনুমতী থাকে না; যাতে ওদের নিকট তারা কিছু পার্থিব সম্পদ ও স্বার্থ উদ্ধার ও উপভোগ করতে পায়। ফলে এর দ্বারা তিন প্রকার লোক তিনভাবে ফাসাদ ও বিপত্তিতে আপতিত হয়;
প্রথমতঃ আমীর বলে, 'যদি আমি সঠিকতার উপর না হতাম তাহলে অমুক আলেম (ফকীহ) আমাকে বাধা দিতেন। আমি সৎ ও সঠিক না হলে উনি আমার মাল খেতেন কেন?'
দ্বিতীয়তঃ জনসাধারণ; তারা বলে, 'আমাদের আমীর, তার সম্পদ ও কর্মে কোন ত্রুটি নেই। যেহেতু অমুক আলেম তো দেখছি অহরহ উনার কাছে যান ও খান।'
তৃতীয়তঃ ঐ আলেম; যিনি এই কর্মের ফলে নিজের দ্বীনকে নষ্ট করেন।