📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বাহ্যতঃ দ্বীনী শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসার সাধন হলেও প্রকৃত তালেবে ইলম ও রব্বানী আলেমের অভাব বেড়ে চলছে। বেড়ে চলেছে দ্বীনি শিক্ষার সমস্যা এবং কদরও। আলেম-উলামার মানও দিনের দিন হ্রাস হয়ে চলেছে। মান বাড়ছে সেই সব শিক্ষার যার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায়, যাতে আছে অধিক অর্থোপার্জনের উপায়। তাই যারা ইলমী মাদ্রাসার ছাত্র তাদেরও অধিকাংশ 'তালেবে ইলম' নয় বরং 'তালেবে মাল'।

যে জিনিসে মানুষের প্রয়োজন অধিক সেই জিনিসের মান ও মূল্য অধিক। যে সমাজে আলেমের প্রয়োজন নেই, আলেমের যথা মানের কর্ম নেই, চাকুরী নেই, যে সমাজে আলেমের প্রয়োজন আছে বলে লোকেরা অনুভবও করে না সে সমাজে আলেমের মূল্য কোথা হতে কে দেবে? কোথা হতে সচ্ছল ও সুন্দর হবে আলেমদের অর্থনৈতিক অবস্থা? যে দেশের লোক কাপড় পরে না, পরতে চায় না, পরার প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না, অথবা পরলেও ময়লা কাপড় ধোয়ার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না অথবা কাপড় ধোয়ার জন্য ধোপার প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না সে দেশে ধোপাদের অর্থনৈতিক মান কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা অনুমেয়।

বলাই বাহুল্য যে, এ কারণেই আলেমগণ অধিকাংশই গরীব। তালেবে ইলমরাও অধিকাংশ গরীবদের সন্তান। আর এজন্যই অনেকে এই দ্বীনী বিদ্যাকে 'ফকীরীবিদ্যা' বলে অভিহিত করে!

মাদ্রাসাগুলোতে আলেমের মত আলেম তৈরী না হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। কথায় বলে, 'কলম কালি মন, লিখে তিনজন।' দ্বীন শিখতে এসে যদি মন মানসিকতা ঠিক না থাকে, মনের ভিতরে যদি পেটের চিন্তা থাকে, সংসার ভার থাকে, পিতা-মাতা বা অন্যান্যের ভরণ পোষণের উপায় নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে, সমাজের অবজ্ঞা ও ঘৃণার অনুভূতি থাকে, আত্মীয়-স্বজনের তিরস্কার ও ভর্ৎসনা থাকে তবে লিখা-পড়ার অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য হলেও যে-ইলম আয়ত্ব করা সহজ নয় তাও অনুমেয়। বিশেষ করে যে শিশু বা অবোধ মনে তখনো আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বদ্ধমূল হয় না; দ্বীনী সংগ্রাম তথা দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের উৎসাহ-উদ্দীপনা তার মনে সৎসাহস যোগায় না। বিশেষ আগ্রহের সাথে সহযোগীতা করে না বহু ওস্তাদ ও অভিভাবকদের দল, সে সব ফুলের কুঁড়ি অথবা ফুটন্ত কুসুম দেখতে দেখতে ঝলসে যায়।

আলেমের হাতিয়ার হল কিতাব। যিনি আলেম অথচ তাঁর কিতাব নেই তিনি অনেকটাই পঙ্গু। কিন্তু ঐ দারিদ্রের কারণেই বহু আলেম ও তালেবে ইল্ম নিম আলেম থেকে যান। আগ্রহ, উদ্যম ও চেষ্টা সত্ত্বেও জ্ঞানভান্ডার সুরক্ষিত রাখতে তাঁরা সক্ষম হন না।

মানুষ তিক্তময় বহু জিনিষের স্বাদ গ্রহণ করে থাকে, কিন্তু দারিদ্রের মত অধিকতম তিক্ত স্বাদ হয়তো আর কিছু গ্রহণ করে না। শৈশবে ও কৈশরে যারা আমার মত ঈদের সকালে বিগলিত অশ্রুধারার অবাধ গতি রোধ করতে পারেনি, যারা অর্থাভাবে হাত না পেতে ক্ষুধা চাপা রেখে অনেক সময় শুষ্ক বমন দমন করতে পারেনি, দুঃসময়ে অতি প্রয়োজনে ঋণ করতে গিয়ে যারা ধনপতিদের নেতিবাচক জবাবে আঘাত খেয়ে চোখের পানিতে ফেরার পথ দেখতে পায়নি, যারা সামর্থ্যবান আত্মীয় ও ওস্তাদদের সাহায্য ও সহযোগিতায় একান্ত নিরাশ হয়ে মুষড়ে পড়েছে তারা জানে এ দরিদ্রতার তিক্ততা। অবশ্য রুজির মালিকের উপর যার পূর্ণ ভরসা থাকে সে কোনদিন লাঞ্ছিত হয় না। ধৈর্য ও সূৈর্যের সাথে আল্লাহর ফরয পালনে (ইলম্ শিক্ষায়) নিবেদিত-প্রাণ থাকে। আল্লাহর নিকট অভাবের অভিযোগ করলে তিনিই সাহায্যের দায়িত্ব নেন।

একটি সুপ্রসিদ্ধ ইংরেজী পত্রিকায় প্রশ্নোত্তরমূলক প্রতিযোগিতার আসরে এক প্রশ্ন ছিল, 'জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিক্ষা কিসের উপর নির্ভরশীল?' এর সঠিক উত্তরদাতার জন্য মূল্যবান পুরস্কারও ঘোষিত ছিল। অতঃপর সঠিক উত্তরদাতা হিসাবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন এক প্রসিদ্ধ মহিলা সাহিত্যক। তাঁর উত্তর ছিল, 'জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি প্রতিভা উৎসাহ দানের উপর নির্ভরশীল।'

নতুন শিক্ষার্থীর হৃদয়-মনে সংকোচের বিহ্বলতা থাকা স্বাভাবিক। উৎসাহদানে দূরীভূত হয় সকল প্রকার বিহ্বলতা ও জড়তা। সৎসাহস প্রাপ্ত হলে ভীরুও জেগে উঠে। কেউ উদ্দীপনা দিলে অলস অকর্মণ্যও কাজে মনোবল পায়। তাই আমি, আপনি-ও-তাঁর প্রত্যেকেরই উচিত শিক্ষার্থী ও প্রতিভাধরকে উৎসাহিত করা। আপনি যদি শিক্ষিত না হন এবং শিক্ষার্থীও না হন তবুও কোন শিক্ষার্থীকে উৎসাহদাতা হতে যেন ভুল করবেন না। কারণ, উৎসাহদানে প্রতিভাধরের প্রতিভার প্রতিভাত ঘটে। পক্ষান্তরে ব্যঙ্গ, উপহাস, অবহেলা ও উপেক্ষার কারণে প্রতিভার কুঁড়ি ফোটার আগেই ঝরে যায়।

এই পুস্তিকার অবতারণায় আমি সেই সকল মুকুলিত প্রতিভাধর তথা সকল শিক্ষার্থী ও তালেবে-ইলমকে এই বলে উৎসাহিত করতে প্রয়াস পেয়েছি যে,

“কুসুম কোরকে থেকো না বন্দী, থেকো না আর,
মধুর গন্ধে গন্ধবহ দিকে দিকে আজ কর প্রচার।”

পক্ষান্তরে কোন দ্বীনশিক্ষার্থী তালেবে-ইল্মকে কোন প্রকারে ইলমের পথে বাধা দেওয়ার অর্থ হল শয়তানকে খুশী ও জয়যুক্ত করা। কারণ, ইলম্ হল শয়তানের বিরুদ্ধে লড়বার হাতিয়ার। অতএব উক্ত নিরস্ত্রীকরণের অর্থই হল শয়তানকে দ্বীনের বিরুদ্ধে সহায়তা করা। সুতরাং আপনি মৌমাছি হয়ে যদি মধু বিতরণ না-ও করতে পারেন তবে যেন দয়া করে কাউকে হুল ফুঁড়বেন না।

আমার নিজস্ব ইলমী পরিসর স্বল্প ও সীমিত হলেও আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় বহু হতাশার অন্ধকারে ঘুর্ণায়মান তালেবে ইল্ম, ইলমের পথে লক্ষ্যহীন ভাবে বহু চলার পথিক এবং ব্যর্থতা ও নিরাশায় হারিয়ে যাওয়া বহু দ্বীনী ছাত্র আশার আলো পাবে বলে আমি মনে করি। যেমন বহু ছাত্র তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবনে উদ্যম ও উৎসাহ পাবে, সলফে সালেহীনগণের ইল্মী পথের সন্ধান পাবে। আর -ইনশাআল্লাহ- পরিবর্তন আসবে তাদের নিয়তে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি-বিধান ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ও নিয়তে এই ইল্ম শিক্ষা করেছে বা করছে।

আল্লাহ প্রত্যেক আলেম, তালেবে ইল্ম ও তার অভিভাবকের নিয়তকে সৎ করুন। প্রত্যেক মুসলিমকে দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করার ফরয ও দায়িত্ব পালনে প্রেরণা দান করুন। আর সেই তওফীক দেন যাতে আমাদেরকে হাশর ময়দানে অন্ধ হয়ে না উঠতে হয়। আল্লাহুম্মা আমীন।

বিনীত-
আব্দুল হামীদ আল-ফায়যী
আল মাজমাআহ
সউদী আরব
মুহারাম ১৪১৪ হিঃ

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ইলমের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব

📄 ইলমের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব


ইসলাম এক সর্বাঙ্গ-সুন্দর পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। ইসলামের তরবিয়তও সর্বব্যাপী। জীবনের কোন দিকটাই ইসলাম উপেক্ষা করেনি। মানুষ যাতে সর্বাঙ্গসুন্দর 'মানুষ' হয়ে গড়ে উঠে তা ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। তাই, মানুষের দৈহিক উন্নতি সাধন এবং তার স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামে রয়েছে দৈহিক তরবিয়ত। মানুষের ভাষা ও ভাবকে সুন্দররূপে প্রকাশ ও সংশোধনকল্পে ইসলামে রয়েছে ভদ্রতা ও সভ্যতার তরবিয়ত। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে সঠিক ও উন্নত করার উদ্দেশ্যে রয়েছে মননশীলতার তরবিয়ত। বিশ্বের সাথে পরিচয় লাভ করার মানসে বিভিন্ন তত্ত্ব ও তথ্যের মাধ্যমে রয়েছে বৈজ্ঞানিক তরবিয়ত। জীবিকা অর্জনের বিভিন্ন পথনির্দেশের মাঝে রয়েছে পেশাদারী ও শিল্পিক তরবিয়ত। সমাজের অধিকার ও ব্যবহার সম্পর্কীয় নানা আইন-কানুনের পরিচয়দানের মাধ্যমে রয়েছে সামাজিক তরবিয়ত। বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় রাখতে এবং জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে রয়েছে মানবতার তরবিয়ত। মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাবকে সুন্দর ও নির্মলরূপে গড়তে উদ্বুদ্ধকরণের মাঝে রয়েছে চারিত্রিক তরবিয়ত। রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা সঠিকরূপে বজায় রাখতে নির্দেশদানের মাধ্যমে রয়েছে রাজনৈতিক তরবিয়ত। প্রভু ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক দৃঢ় করতে রয়েছে আধ্যাত্মিক তরবিয়ত। মোট কথা ইসলামে রয়েছে সর্ব প্রকার কল্যাণকর ও চিরন্তন তরবিয়ত।

এ সকল তরবিয়তের সর্বশীর্ষে রয়েছে ইল্ম ও শিক্ষা। শিক্ষা হল তরবিয়ত ও ইবাদতের প্রথম ধাপ। তাই বিনা ইলমে ইবাদত করলে অনেক ক্ষেত্রে ইবাদত বিদআতে পর্যবসিত হয়ে যায়। তাছাড়া সর্বাগ্রে যে ইল্ম জরুরী তার প্রতি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে কুরাআনে মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতে, আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ

অর্থাৎ- “সুতরাং জান যে, তিনি ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং তোমার ও বিশ্বাসী নারী-পুরুষদের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।” (সূরা মুহাম্মাদ ১৯ আয়াত) অবশ্য উক্ত আয়াতে একথারও স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, যে বিষয় ও জ্ঞান সর্বাগ্রে শিক্ষনীয় তা হল তওহীদ ও আল্লাহ বিষয়ক জ্ঞান। আর এই জ্ঞান তথা শরীয়তের জ্ঞান শিক্ষাই, হল প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয। (বাইহাকী, তারারানী প্রভৃতি.. সহীহুল জামে': ৩৯১৩ নং) কারণ অন্যান্য শিক্ষা না শিখলে বান্দার এমন কিছু আসে যায় না। কিন্তু এ শিক্ষা না শিখলে পরকালে তার মুক্তি নেই। আর ইহকালেও সমগ্র মানবমন্ডলীর জন্য মুক্তি ও শান্তির পথ এ শিক্ষা ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।

মানুষ মারা গেলে তার জন্য আর কোন করণীয় আমল নেই, ইবাদত নেই। মধ্যজগতে সমগ্র নেকী ও সওয়াবের পথ বন্ধ থাকে। অবশ্য সে যদি জীবিতকালে কোন সাকায়ে জারিয়া করে থাকে অথবা কোন ফলপ্রসূ ইল্ম ছেড়ে যায় অথবা তার জন্য দুআকারী নেক সন্তান ছেড়ে যায় তাহলে এসকল বিষয়ের সওয়াব ও উপকার সে সেই মধ্যজগৎ থেকেও লাভ করতে পারে। (মুসলিম, আবুদাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, সঃ জামে' ৭৯৩ নং) যেমন নেক সন্তান গড়তেও প্রয়োজন হয় ঐ কালজয়ী ইল্ম ও শিক্ষার।

এই সেই শিক্ষা, যার অন্বেষণের পথে চললে বেহেশের পথে চলা হয়। আল্লাহ এমন শিক্ষার্থীর জন্য বেহেশের পথ আসান করে দেন। (মুসলিম, মিশকাত ২০৪)

এই সেই শিক্ষা, যার তালেবের জন্য ফিরিশাবর্গ নিজেদের ডানা বিছিয়ে থাকেন। তালেবে ইলমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন; সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহায়তা করেন।

এই সেই জ্ঞান, যার জ্ঞানীর জন্য সমগ্র বিশ্বাবাসী (আকাশ ও পৃথিবীর সকল প্রকার বাসিন্দা) এমনকি পানির মাছ এবং গর্তের পিপড়াও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে।

এই সেই শিক্ষা, যার শিক্ষিত ব্যক্তি আবেদ (অধিক নফল ইবাদতকারী) ব্যক্তি অপেক্ষা সেইরূপ শ্রেষ্ঠ যেরূপ রাত্রের আকাশে সমগ্র তারকামন্ডলী অপেক্ষা পূর্ণিমার চন্দ্র শ্রেষ্ঠ। বরং একজন সাধারণ সাহাবীর তুলনায় আল্লাহর রসূল এর মান যেমন উচ্চে ঠিক তেমনিই আবেদের তুলনায় একজন আলেমের মান অনুরূপ উচ্চে। কারণ, আলেমরা হলেন আম্বিয়ার ওয়ারেস। সেই ইল্মের ওয়ারেস যাতে রয়েছে জাতির জীবন। (আবু দাউদ ৩৬৪১, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ২২৩, দারেমী, মিশকাত ২১২-২১৩ নং)

তা ছাড়া প্রকৃত অবস্থা এই যে, আদর্শ মুসলিম হওয়ার গৌরব ও অধিকার যাঁরা লাভ করেছেন তাঁরা হলেন ঐ ইলমের অধিকারী খাঁটি আলেমরাই। ঐ ইল্ম বিষয়ে অজ্ঞ থেকে আসল মুসলিম হওয়ার দাবী করার কথা ভ্রান্ত নচেৎ মেকী। একথার সাক্ষ্য দিয়ে কুরআন বলে,

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

অর্থাৎ- আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে উলামাগণই তাঁকে ভয় করে থাকে। (সূরা ফাত্বির ২৮ আয়াত)

এই সেই ইল্ম, যদ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের মর্যাদা সুউন্নত করে থাকেন। (সূরা মুজাদালাহ ১১ আয়াত)

অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়, সমান নয় অন্ধকার ও আলো, ছায়া ও রৌদ্র। আর সমান নয় জীবিত ও মৃত।” (সূরা ফাত্বির ১৯-২২ আয়াত) “যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? বোধ-শক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।” (সূরা যুমার ৯ আয়াত)

এই সেই ইল্ম, যে ইলমের আলেমগণ সেই কথার সাক্ষি দেন; যে কথার সাক্ষি দেন স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশাগণ। (সূরা আ-লি ইমরান ১৮- আয়াত)

এই সেই জ্ঞান, যে জ্ঞান বিষয়ে কেউ জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর যদি সে তা গোপন করে তবে কিয়ামতের দিন তার নাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২২৩নং)

এই সেই বাঞ্ছিত ইল্ম, যা কেউ সংরক্ষণ ও প্রচার করলে তার মুখ উজ্জ্বল ও শ্রীবৃদ্ধি হয়। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২৩০ নং)

এই সেই জ্ঞানভান্ডার যার উপর হিংসা করা বৈধ। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ২০২ নং)

এই সেই নির্দেশমালা, যা না হলে মানুষ ভ্রষ্ট হয়ে যায়। বিভ্রান্তির ঘন অন্ধকারে শান্তির পথ খুঁজে পায় না। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২০৬ নং)

এমন ইল্ম যার পেটে নেই সে হতভাগা বৈ কি?

এই সেই ইল্ম যার প্রশংসায় জনৈক আরবী কবি বলেন,

أخ ـ و العـ ـ لم حي خــالد بعـ ـ د موته وأوص - الهت التراب رميم

وذو ا هل ميت وهو ماش على الثرى يظن من الأحياء وهو ع ـ د

অর্থাৎ- ইলমের অধিকারী ব্যক্তি হল চির জীবিত, মরণের পরও সে অমর। পক্ষান্তরে ইল্মহীন (মূর্খ) ব্যক্তি মাটির উপর চলাফেরা করলেও সে আসলে মৃত, তাকে জীবিত মনে করা হলেও আসলে সে অন্তর্হিত। (সিয়ার আ'লামিন নুবালা ১৯/৫৩৩, টীকা নং ২)

رأيت العـ ـ لم صاحبه شريف وإن ولـ ـ دته آبـ ـ ـاء لـ ـ ئام

ولي ـ س يزال يرفعه إ أن يعظ - م قدره القوم الكرام

ويتبع ـ ونه كــل أمــر كراعي الضأن تتبعه السوام

و مـ ـ ل ق - وله كل أفق ومن يَكُ ع ا ا فهو الإمام

فلولا العلم ما سعدت نفوس ولا عُرف الال ولا ا رام

ومصباح يضيء به الظلام هوا - ادي الدليل إ ا عا

كـ ـ ذاك عن الرسول أتى عليه من الله التحية والس - لام

অর্থাৎ, আমি দেখেছি যে, ইলমের অধিকারী ব্যক্তি হলেন সম্ভ্রান্ত। যদিও তাঁর পিতামাতা নীচ বংশের হন। ইল্ম সর্বদা তাকে মর্যাদায় উন্নীত করতে থাকে। পরিশেষে সম্ভ্রান্ত সম্প্রদায়ও তাঁর মর্যাদা উচ্চ করে থাকেন। তাঁরা তাঁর প্রত্যেক বিষয়ে অনুসরণ করে থাকেন; যেমন মেষপাল তার রাখালের অনুসরণ করে থাকে। তাঁর বাণী ও বক্তব্য দিগদিগন্তে ছড়িয়ে যায়। আর যিনি আলেম হন তিনিই ইমাম হন। যদি ইল্ম না হত তাহলে আত্ম সুখী হতো না এবং হালাল-হারাম চেনাও সম্ভবপর হতো না। ইল্মের বদৌলতেই লাঞ্ছনা থেকে নিষ্কৃতি আছে, আর মূর্খতায় আছে অপমান ও অসম্মান। আলেম হন উন্নয়ন পথের পথপ্রদর্শক ও দিদিশারী এবং তিনিই হন অন্ধকার মোচনকারী প্রদীপ। যে ইল্ম রসূল হতে আগত। তাঁর উপর আল্লাহর তরফ হতে দরূদ ও সালাম বর্ষণ হোক। (জামিউ বায়ানিল ইল্মি অফাযলিহ ১/৫৪)

এই সেই ইল্ম, যে ইল্ম সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,

إلا ا ديث و علم الفقه الدين كل العلوم سوى القرآن مشغلة

وما سوى ذاك وسواس الش - يطان العل ـ م ما كان فيه: قال حدثنا

অর্থাৎ, কুরআন, হাদীস এবং দ্বীনের ইলমে ফিক্‌হ্ন ছাড়া যাবতীয় ইল্ম হল নিরর্থক। আসল ইল্ম হল সেই ইল্ম যাতে 'ক্বালা হাদ্দাসানা' বলা হয়। এ ছাড়া বাকী সর্বপ্রকার ইল্ম হল শয়তানের কুমন্ত্রণা। (আলবিদায়াহ অগ্নিহায়াহ ১০/২৫৪)

অতএব হে তালেবে ইল্ম! এই ইল্ম নিয়ে তুমি ধন্য হও। গৌরব অর্জন কর ইহকালে ও পরকালে উক্ত ইলমের অধিকারী হয়ে। এই ইলমের পথে তোমাকে জানাই শত 'খোশ আমদেদ।' তোমাকে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করতে কবি বলেন,

إن ا مال ال العلم والأدب
ليس ا مال بأثواب تزيننا

বহুমূল্য পরিচ্ছদ, রতন ভূষণ,
নরের মাহাত্ম্য নারে করিতে বর্ধন।
জ্ঞান-পরিচ্ছদ আর ধর্ম অলংকার,
করে মাত্র মানুষের মহত্ত্ব বিস্তার।'

এ ছাড়া প্রিয় হাবীব এর আরো কয়েকটি প্রেরণাদায়ক উপদেশ মনে রেখো; তিনি বলেন, “আল্লাহ যার জন্য কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।” (বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, সহীহ তারগীব ৬৪ নং)

“(নফল) ইবাদত অপেক্ষা ইলমের মর্যাদা অধিক।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব, সহীহ তারগীব ৬৫ নং)

“দুনিয়া ও তন্মধ্যস্থিত সকল জিনিসই অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর যিক্র ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়, আলেম ও তালেবে ইল্ম (অভিশপ্ত) নয়।” (তিরমিযী ইবনে মাজাহ, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৭০ নং)

“যে ব্যক্তি কেবলমাত্র কিছু শিখা বা শিখানোর উদ্দেশ্যেই মসজিদে যায় সে ব্যক্তির জন্য পূর্ণ একটি হজ্জ পালন করার সমপরিমাণ সওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।” (ত্বাবারানীর কাবীর, হাকেম ১/৯১, সহীহ তারগীব ৮১নং)

“যে ব্যক্তি কোন কল্যাণের প্রতি মানুষকে নির্দেশ দেয় সে ব্যক্তি ঐ কল্যাণ সম্পাদনকারীর ন্যায় সওয়াব অর্জন করে।” (মুসলিম, আবুদাউদ, তিরমিযী প্রমুখ, সহীহ তারগীব ১১০ নং)

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 আদর্শ আলেম কে?

📄 আদর্শ আলেম কে?


ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আলেম তিনিই যিনি আল্লাহকে ভয় করেন।' অতঃপর তিনি তাঁর এই বাণী পাঠ করেন যার অর্থ, “আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে।” (সূরা ফাতের ২৮)

সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ বলেন, 'আলেম তিনি নন যিনি অসৎ থেকে সৎকে চিনতে পারেন বা জানেন, বরং আলেম তিনিই যিনি সৎ জানেন অতঃপর তার অনুসরণ করেন।'

যায়েদ বিন আসলাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি যাকে ইচ্ছা বহু মর্যাদায় উন্নত করি।” অর্থাৎ, ইল্ম দ্বারা। যেমন তিনি আরো বলেন, “আমি কতক নবীকে কতক নবীর উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছি।” অর্থাৎ ইল্ম দ্বারা।' (সূরা আনআম ৮-৩ ও সূরা ইসরা ৫৫)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يرفع اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে ইল্ম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন।” (সূরা মুজাদিলাহ ১১ আয়াত)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ভাষ্যে বলেন, 'মুমিন (বিশ্বাসী)দের মধ্যে যাঁদেরকে ইল্ম দান করা হয়েছে তাঁদেরকে -যাঁদেরকে ইল্ম দান করা হয়নি তাঁদের উপর -আল্লাহ তাআলা মর্যাদায় উন্নত করবেন।'

এক মহিলা শা'বীকে সম্বোধন করে 'হে আলেম!' বললে তিনি বললেন, 'আলেম তো তিনিই যিনি আল্লাহকে ভয় করেন।'

মসরূক বলেন, 'ইল্মের দিক থেকে মানুষের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে সে আল্লাহকে ভয় করে এবং মূর্খতার দিক দিয়ে মানুষের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে নিজের আমল দ্বারা গর্বিত হয়।'

সওরী বলেন, 'ওলামাগণ বিনষ্ট হলে কে তাঁদের সংশোধন করবে? আর তাঁদের বিনষ্ট; দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া বা বিষয়াসক্ত হওয়া। ডাক্তার যদি নিজের দেহে রোগ টেনে আনে তাহলে সে অপরের চিকিৎসা কি রূপে করবে?'

ফুযাইল বিন ইয়ায (রঃ) বলেন, 'আখেরাতের আলেম, যাঁর ইল্ম গুপ্ত। আর দুনিয়ার আলেম, যাঁর জ্ঞান বিক্ষিপ্ত। অতএব তোমরা আখেরাতের আলেমের অনুসরণ কর, আর দুনিয়ার আলেমের নিকট বসা থেকে সাবধান থাক। যেহেতু সে তার প্রতারণা, বাহ্যিক আড়ম্বর, বাকচাতুর্য ও বিনা আমলে ঝুটা ইলমের দাবী দ্বারা তোমাদেরকে বিঘ্নে নিপতিত করবে। আর আলেম তিনিই যিনি সত্যবাদী---।'

কিছু উলামা বলেন, 'অসৎ প্রকৃতির উলামা মানুষের পক্ষে ইবলীস অপেক্ষা অধিকতর ক্ষতিকর। যেহেতু ইবলীস যখন কোন মুমিনকে প্ররোচনা দেয় তখন সে জানতে পারে যে সে (শয়তান) তার প্রকাশ্য ভ্রষ্টকারী শত্রু। তাই তারপর সে গোনাহ থেকে সত্বর তওবা করে এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। পক্ষান্তরে অসৎ প্রকৃতির ওলামা বাতিল ও অন্যায়ভাবে মানুষকে ফতোয়া দান করে থাকে, কৃত্রিমতা, বিতর্ক ও বাক্চাতুরি দ্বারা নিজের প্রকৃতি ও খেয়াল-খুশী অনুযায়ী শরীয়তের অনুশাসনে সংযোজন ও অতিরঞ্জন করে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন উলামাদের অনুসরণ করে সে কর্ম ও আমলে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়। পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পন্ড হয় অথচ তারা মনে করে যে, তারা নাকি সৎকর্ম করছে।

অতত্রব শত সাবধান এমন আলেম হওয়া থেকে, এমন আলেমের অনুসরণ জালে পতিত হওয়া এবং অন্ধভাবে তাতে আবদ্ধ হওয়া থেকে। উচিত হল, এমন আলেম হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং তাদের অনুসরণ ও অনুগমন থেকে নিজেকে বহু দূরে রাখা। আর সেই আলেমদের অনুসরণ ও সাহচর্য নির্বাচন-ও-অবলম্বন করা যাঁরা প্রকৃতপক্ষে আদর্শ আলেম, সৎ ও সত্য আলেম।

সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন, 'ইল্ম এজন্যই শিক্ষা করা হয় যাতে তার মাধ্যমে আল্লাহর ভীতি অর্জন করা যায়। ইল্মকে অন্যান্য থেকে শ্রেষ্ঠত্ব এই জন্য দান করা হয়েছে যে, তার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করা হয়।'

বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'ইল্ম অনুসন্ধান করা বিষয়াসক্তি হতে পলায়ন করার প্রতি নির্দেশ করে, বিষয়-লালসার প্রতি নয়। বলা হত যে, সর্বাপেক্ষা উচ্চ মর্যাদার আলেম তিনিই, যিনি তাঁর দ্বীন নিয়ে দুনিয়া হতে পলায়ন করেন এবং খেয়াল-খুশীর উপর যাঁকে পরিচালিত করা সহজ নয়।’

আলেম যদি তার ইলম্ অনুসারে আমল না করেন তবে নিশ্চয় তিনি ঘৃণার্হ, আল্লাহর নিকটেও শাস্তিযোগ্য। কথিত আছে যে, আল্লাহ হযরত দাউদ (আঃ) এর প্রতি প্রত্যাদেশ করে বললেন, 'হে দাউদ! তুমি আমার ও তোমার মাঝে কোন দুনিয়াদার বিষয়াসক্ত লোভী আলেমকে উপস্থিত করো না, নচেৎ সে তোমাকে আমার প্রেমের পথে প্রতিহত করবে। কারণ ওরা আমার ভক্ত বান্দাদের পথে দস্যুদলের মত। আমি ওদেরকে ন্যূনতম শাস্তি এই প্রদান করব যে, ওদের হৃদয় হতে মুনাজাতের মিষ্টতা ছিনিয়ে নেব।' (জামেউ বায়ানিল ইলমি অফাযলিহ ১/১৯৩)

ফুযাইল বিন ইয়ায ও আসাদ বিন ফুরাত হতে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, 'আমাদের নিকট পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিন মূর্তিপূজকদের পূর্বে ফাসেক কুরআন পাঠকারী ক্বারী ও আলেমদের হিসাব গ্রহণ করা হবে।' ফুযাইল বলেন, 'যেহেতু যে জানে, সে তার মত নয় যে জানে না।'

আবুল আলিয়াহ বলেন, 'মানুষের উপর এমন এক যুগ আসবে যখন কুরআন হতে তাদের হৃদয় পতিত হয়ে যাবে। তার কোন মাধুর্য ও স্বাদ তারা পাবে না। যা করতে তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তা না করে তারা (অলস আশাবাদী হয়ে) বলবে, 'আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান।' আর যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে তা করে তারা বলবে, 'আমাদেরকে আল্লাহ মাফ করে দেবেন, আমরা তো আল্লাহর সহিত কিছুকে শরীক করিনি!' তাদের সমস্ত বিষয়ই লালসাময় হবে, যার সহিত কোন সততা থাকবে না। তারা নেকড়ের মনের উপর মেষের চর্ম পরিধান করবে। ধর্মে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হবে সেই ব্যক্তি যে হবে তোষণকারী।'

নবী কে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, "(সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হল) 'উলামা, যখন তারা বিনষ্ট ও কর্তব্যচ্যুত হয়ে যায়।"

📘 দ্বীনি শিক্ষার নৈতিকতা > 📄 ইখলাস

📄 ইখলাস


আহলে ইল্ম, আলেম, মুদারিস বা তালেবে ইল্মের উচিত, তিনি যে বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে তাঁর সর্বকাজ করবেন তা যেন পুরো ইখলাসপূর্ণ হয়। এই ইল্মের গোড়ায় নিয়ত রাখবেন যে, তিনি এর দ্বারায় একমাত্র আল্লাহর তুষ্টি বিধান চান, এই ইবাদতের দ্বারা অন্যান্য ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করে তাঁর সামীপ্য চান। যে ইবাদত (ইন্ন তলব করা) সবচেয়ে বড়, পূর্ণতাপ্রাপ্ত, মঙ্গলময় ও উপকারী। সকল প্রকার ছোট ও বড় কাজে এই অমূল্য ও মযবুত বুনিয়াদের কথা স্মরণ রাখবেন। শিক্ষা ও শিক্ষকতার সময়, বাহাস ও মুনাযারার সময়, লিখন ও বক্তৃতার সময়, ওয়ায ও নসীহত করার সময়, হিফ্য ও আলোচনা করার সময়, ইলমী মজলিসে বসার সময়, অথবা তার প্রতি পদার্পণের সময়, কিতাব অথবা অন্যান্য ইলমের উপকরণ ক্রয় করার সময়, তাঁর অন্তস্তলে যেন একমাত্র আল্লাহর জন্য ইখলাস বিদ্যমান থাকে। নেকী ও সওয়াব হাসিলের নিয়ত থাকে। যাতে সকল প্রকার ব্যাপৃতি ও ব্যস্ততা আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে পরিণত হয়। আল্লাহ ও তাঁর জান্নাতের জন্য বিচরণ হয় এবং প্রিয় নবী এর এই বাণীর দৃষ্টান্ত হয়, “যে ব্যক্তি এমন পথে চলে যাতে সে ইল্ম অন্বেষণ করে। আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের প্রতি চলার পথ সহজ করে দেন। (মুসলিম)

বিচরণ অথবা আচরণের পথ; সকল পথই আহলে ইল্মগণ যাতে ইল্মের খাতিরে চলেন-তা এই হাদীসে উদ্দিষ্ট হয়েছে।

পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইলম তলব করা এক ভয়ঙ্কর বিপদ, যা একপ্রকার শির্ক। তাই সাবধান! যাতে ঐ ইল্ম অর্জন কোন মন্দ উদ্দেশ্যে; গর্ববোধ, বিতর্কপ্রীতি, লোক প্রদর্শন, সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন, নেতৃত্ব ও পদলাভ, সম্পদ ও অর্থোপার্জন, কোন সম্ভ্রান্তাকে বিবাহ করা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে না হয়, কারণ এই লক্ষ্য তাঁদের হতে পারে না যাঁরা প্রকৃত আহলে ইল্ম ও উলামা। আর যাঁরা ঐসব উদ্দেশ্যের কোন এক কারণে ইল্ম অর্জন ও বিতরণ করে থাকেন তাঁদের জন্য আখেরাতের কোন অংশ নেই।

ইমাম নাসাঈ আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত করেছেন যে, 'এক ব্যক্তি নবী এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'এমন এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কি, যে সওয়াব ও খ্যাতিলাভের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে? তার জন্য কি?' উত্তরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি বললেন, “যে কর্ম আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ হয় এবং যদ্দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করা হয় তা ছাড়া তিনি কোন কর্মকে কবুল (গ্রহণ) করেন না।' (নাসাঈ ২/৫৯)

ইমাম আবুদাউদ আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! এক ব্যক্তি জিহাদ করতে চায়, কিন্তু সে তাতে পার্থিব কোন স্বার্থ কামনা করে।' রসূল বললেন, “তার জন্য কোন সওয়াব নেই।” লোকটি ঐ একই কথা তিনবার ফিরিয়ে বলল। নবী প্রত্যেক বারেই উত্তরে বললেন, “তার জন্য কোন সওয়াব নেই।”

রসূল বলেন, “এই উম্মতকে অভ্যুদয়, দেশসমূহে ক্ষমতা, স্থিতি, বিজয়লাভ এবং দ্বীনের মধ্যে সুউচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ দাও। আর তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরকালের কর্মকে মাধ্যম করে ইহকাল দুনিয়ার উদ্দেশ্যে কোন কর্ম করবে তার জন্য পরকালের কোন অংশ নেই। (মুসনাদে আহমদ ৫/১৩৪)

তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আমি সকল অংশীদার অপেক্ষা অধিক শির্ক (অংশীদারী) হতে বেপরোয়া। অতএব যে ব্যক্তি আমার জন্য কোন এমন আমল করবে যাতে সে আমি ভিন্ন অন্য কাউকে অংশী করবে আমি তার থেকে সম্পর্কহীন। আর সে আমল তার জন্য হবে যাকে সে শরীক করেছে।” (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)

যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ আশা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” (সূরা কাহফ ১১০ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন, “তারা কেবল একনিষ্ঠভাবে বিশুদ্ধ-চিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতেই আদিষ্ট হয়েছিল।” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৫ আয়াত)

সুতরাং প্রত্যেক ইবাদত ও আমলের ইচ্ছা, উদ্দেশ্যে ও সংকল্পে ইখলাস বা আল্লাহরই জন্য বিশুদ্ধচিত্ততা একান্ত আবশ্যক। ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'যেরূপ তিনি একক উপাস্য, তিনি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। ঠিক তদনুরূপই ইবাদত ও উপাসনা শরীকবিহীনভাবে একমাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। অতএব যেমন তিনি তাঁর উপাস্যত্বে একক ঠিক তেমনই তাঁকে তাঁর ইবাদতে একক মানা সকলের জন্য ওয়াজেব। তাই নেক আমল বা সৎকর্ম সেই আমল বা কর্মকে বলে যা লোকপ্রদর্শন থেকে বিশুদ্ধ এবং সুন্নাহর অনুবর্তী হয়।'

উপরোক্ত দুটি শর্তই গ্রহণযোগ্য আমলের দুই স্তম্ভ। আমল সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়া একান্ত আবশ্যক। আর তা সঠিক তখনই হবে যখন সুন্নাহর নির্দেশিত রীতি-নীতি ও পদ্ধতির অনুসারে তা করা হবে। যেমন আল্লাহ তাআলার এই বাণী “সে যেন সৎকর্ম করে” তে এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর বিশুদ্ধ তখন হবে যখন আমল প্রকাশ্য ও গুপ্ত শির্কের ভেজাল থেকে নির্মল ও খাঁটি হবে। যার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, “এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকেও (যেন) শরীক না করে।” (তাইসীরুল আযীযিল হামীদ ৫২৫ পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইল্মের উচিত। তার নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে ইল্ম সন্ধানে শুদ্ধ ও সৎ করা। আর ইল্ম অন্বেষণে সৎ বা নেক নিয়ত তখন হয় যখন তাতে আল্লাহর সন্তষ্টি কামনা করা হয় এবং তার (ইল্ম) দ্বারা আমল করা, শরীয়তকে জীবন্ত ও সংস্কার করা, নিজের অন্তঃকরণকে জ্যোতির্ময় করা, নিজের অভ্যন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, সমাজের মূর্খতা দূরীভূত করা, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর প্রস্তুত রাখা জান্নাতের অধিকারী হওয়া ইত্যাদির আশা পোষণ করা হয়।

অর্থাৎ, এই ইল্ম অনুসন্ধানে পার্থিব কোন স্বার্থলাভ, পদ, মর্যাদা, খ্যাতি, যশ ও অর্থলাভ, সমকালীন ওলামাদের সহিত পরস্পর গর্ব ও বড়াই করা, মানুষের নিকট সম্মান পাওয়া, বিভিন্ন বৈঠকে ও জালসায় আমন্ত্রিত হওয়ার লালসা প্রভৃতি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য না হয়। নচেৎ নিকৃষ্টতর বস্তুকে উৎকৃষ্টতর বস্তুর পরিবর্তে বিনিমিয় করে নেওয়া হবে।

বলা বাহুল্য, এই নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে সৎরূপে নিশ্চিত ও স্থির রাখা খুবই কঠিন কাজ। সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন, 'নিয়ত অপেক্ষা কোন কঠিনতর বস্তুর উপর আমি সাধনা করিনি।'

সহল (রঃ)কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আত্মর উপর সবচেয়ে কঠিন বস্তু কি? বললেন, 'ইখলাস।'

ইউসুফ বিন হুসাইন বলেন, 'দুনিয়ার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু ইখলাস। আমি আমার অন্তর থেকে রিয়া (লোকপ্রদর্শন) দূর করার উপর কত প্রচেষ্টা ও প্রযত্ন করি তবুও তা যেন অন্য এক রঙে উদ্গত হয়।'

আবু সুলাইমান বলেন, 'বান্দা যখন কর্মে ইখলাস আনয়ন করে তখন তার নিকট হতে সকল প্ররোচনা এবং লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্য দূরীভূত হয়ে যায়।'

আল হিরাবী বলেন, 'ইখলাস প্রত্যেক ভেজাল হতে আলেমের জন্য নির্মলতা।'

ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, 'অর্থাৎ মুখলিসের আমল আত্মার কামনার সর্বপ্রকার ভেজাল থেকে পবিত্র ও বিশুদ্ধ হয়; সৃষ্টির হৃদয়ে সুন্দর ও সুশোভিত হতে চাওয়া, তাদের প্রশংসা কামনা করা এবং দুর্নাম থেকে বাঁচার উদ্দেশ্য রাখা, তাদের সম্মান ও ভক্তি লুটার আকাঙ্খা করা, তাদের মাল, খিদমত বা সেবা অথবা প্রেম ও ভালবাসার আশা করা, তাদের মাধ্যমে নিজের কার্যসিদ্ধি করার ইচ্ছা পোষণ করা ইত্যাদি ব্যাধি ও ভেজাল থেকে তার আমল ও কর্ম মুক্ত ও পরিশুদ্ধ হয়। যার সমষ্টি উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ছাড়া অন্য কিছু কামনা হয় না।

মুত্বারিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত করে সকালে আত্মপ্রশংসা অনুভব হওয়া অপেক্ষা সারা রাত্রি নিদ্রায় অতিবাহিত করে সকালে লাঞ্ছিত হওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয়।'

আবু ইউসুফ (রঃ) বলেন, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের আমল দ্বারা আল্লাহকে চাও। যেহেতু যখনই আমি কোন মজলিসে বসে বিনীত হওয়ার উদ্দেশ্য রাখি তখনই আমি তাদের সর্বোপরি না হয়ে উঠি না। আর যখনই আমি কোন মজলিসে বসে তাদের সর্বোপরি হওয়ার উদ্দেশ্য রাখি তখনই আমি অপমানিত হয়ে উঠি।'

ইলল্মও ইবাদতসমূহের অন্যতম ইবাদত। তাতে উদ্দেশ্য বা নিয়ত বিশুদ্ধ ও সৎ হলে তা গ্রহণ করা হয়, পবিত্র করা হয় এবং তার প্রাচুর্য বৃদ্ধি পায়। আর যদি তার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি-বিধান ব্যতীত অন্য কিছু উদ্দেশ্য হয় তাহলে তা বিফল হয়, নষ্ট হয়ে যায় এবং তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্ভবতঃ অন্যান্য উদ্দেশ্যও সফল বা পূরণ হয় না। ফলে তার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ এবং প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়। (তাযকিরাতুস সামে' অল মুতাকাল্লিম ৬৮-পৃঃ)

উপরোক্ত উক্তিসমূহকে একত্রিত করে রসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীস, যাতে তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে কিয়ামতে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির মীমাংসা করা হবে সে হল এমন ব্যক্তি, যে শহীদ হয়েছে। তাকে আনা হবে, আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তার নিকট পরিচিত করবেন। লোকটি তা চিনে নেবে। আল্লাহ বলবেন, 'তুমি তাতে কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'আমি আপনার পথে লড়াই লড়ে শহীদ হয়েছি।' তিনি বলবেন, 'মিথ্যা বললে তুমি। বরং তুমি এই জন্যই লড়াই লড়েছ যাতে তোমাকে বীর দুঃসাহসিক বলা হয়। আর তা বলাও হয়েছে।' অতঃপর তাকে তার মুখমন্ডলের উপর ছেঁচড়ে আকর্ষণ করে দোযখে নিক্ষিপ্ত করতে আদেশ করা হবে।

দ্বিতীয় এমন ব্যক্তি যে ইল্ম শিখেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আনা হবে। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তার নিকট পরিচিত করবেন, সে তা চিনতে পারবে। তিনি বলবেন, 'ওতে কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'আমি ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে তা শিক্ষা দিয়েছি, আর তোমার উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করেছি।' বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বললে। বরং তুমি এ জন্যই ইল্ম শিক্ষা করেছিলে যে, তোমাকে 'আলেম' বলা হবে, আর কুরআন পাঠ করেছিলে যাতে তোমাকে 'ক্বারী' বলা হবে। আর তা তো বলাও হয়েছে।' অতঃপর তাকে তার মুখমন্ডল হেঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে আদেশ দেওয়া হবে।

তৃতীয় এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ প্রাশ্যস্ত দান করেছেন এবং সমস্ত প্রকার সম্পদ তাকে প্রদান করেছেন। তাকে আনা হবে। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহকে তাঁকে চিনাবেন, সে চিনে নেবে। বলবেন, 'তাতে তুমি কি আমল করেছ?' সে বলবে, 'যে পথে আপনি দান করা পছন্দ করেন আমি প্রত্যেক সেই পথেই আপনার উদ্দেশ্যে দান করেছি।' তিনি বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বললে। বরং তুমি এরূপ করেছ, যাতে তোমাকে 'দানশীল' বলা হয়, আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তাকে তার মুখ ছেঁচরে টেনে নিয়ে গিয়ে দোযখে নিক্ষেপ করতে আদেশ করা হবে।” (মুসলিম)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00