📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবের প্রসার
এখন আমরা দুটি বিষয় সম্পর্কে করতে চাই। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, রাসূল ﷺ হুদাইবিয়ার সন্ধির আগে না কোনো যুদ্ধার্থী বা দাঈকে আরবের বাইরে দাওয়াতি কাজে পাঠিয়েছেন, আর না কোনো পয়গাম বা পত্র কোনো শাসকের নামে প্রেরণ করেছেন। দশ বছর পর্যন্ত দাওয়াতের সব কাজ মক্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এরপর তায়েফের সফর গেছেন। ইনকিলাব বা বিপ্লবের যে কর্মসূচি—এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সূচনালগ্নে তা একটা প্রসার লাভ করে না। মদিনার অথবা তাবেলিগের কাজ যেমন তরমুজ বা শশার মাচার মতো জমিনে ছড়িয়ে পড়ে, বিপ্লবের কার্যক্রম তেমন ছড়ায় না। বিপ্লবী কর্মসূচি এক জায়গায় নিজের শেকড় মজবুত করে প্রথমে সেখানে নিজের শেকড় মজবুত করে প্রথমে সেখানে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই কলি আগাছের চারাগাছ হয়ে পরিণত হয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই চারাগাছটি সুশোভিত এক মজবুত বৃক্ষে পরিণত হয়।
রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের কর্মসূচি ও প্রয়াস মদিনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল বিপ্লবী চরিত্রের। -এর কাছে ধনসম্পদও কোনো কিছু ছিল না। তখন খাদিজা রা.-এর খেদমতে পেশ করা হয়েছিল। তিনি চাইলে তখনও কায়সার-কিসরা ও রোম-পারস্যের সম্রাটের কাছে এই বার্তা পাঠাতে পারতেন যে, ‘আমি আল্লাহর রাসূল। তোমরা আমার ওপর ঈমান আনো!’—কিন্তু তিনি তেমনটা করেননি। হিজরতের পর মদিনায় গিয়ে তিনি বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করেন; তখনও আরবের কোথাও কোনো দাওয়াতি বা প্রতিনিধি দল তিনি তখন পাঠাননি, যখন হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়ে গিয়েছিল এবং রাসূল ﷺ-কে কুরাইশরা একপ্রকার বিরোধীশক্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কুরআন এই সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে অভিহিত করেছে। এই সন্ধি সম্পন্ন হওয়ার পর কিসরা, হিরাক্লিয়াস, মুকাউকিস, নাজ্জাশি এবং জাবালাতুল গাসসানির আরবদের সীমান্তে বসবাসরত গোত্রগুলোর অমুসলিম নেতাদের কাছে দূতম মারফত দাওয়াত ও বার্তা পাঠান।
রাসূল ﷺ-এর দাওয়াতি বার্তার প্রতিক্রিয়ায় রাজা-বাদশাহদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের আচরণ সামনে আসে। গাসসানের শাসক—যে কিনা হিরাক্লিয়াসের অনুগত ছিল—রাসূল ﷺ-এর পাঠানো দূত কিনা সাহাবি হাসির ইবনে উমাইর রা.-কে শহিদ করে দেয়। যার কিসাস নিতে রাসূল ﷺ সেনাবাহিনী পাঠান। আর এতে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এভাবেই ধারাবাহিকতায় তখন থেকে রাসূল ﷺ-এর বর্তমানে তাসদিবে ইনকিলাব বা বিপ্লবের প্রসারের (Exporting of Revolution) সূচনা হয়ে যায়। আরেকটি সহজ করে বললে, রাসূল ﷺ-এর জীবনকালেই শুধু আরবের মধ্যেই বিপ্লব পূর্ণতা লাভ করেনি; বরং তাঁর হাতে আরবের বাইরেও বিপ্লবের সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি আর জিম্মাদারির সাথে তাঁদের কাঁধে অর্পণ করে যান।
📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবী দর্শন এবং আজকের প্রেক্ষাপট
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, পানি অনেক বয়ে গেছে। যুগ অনেক বদলে গেছে। অবস্থা ও পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। তাই এখনকার সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে যুগিও কি বিপ্লব সংগঠিত করার নববি রূপরেখার ওপর হুবহু আমল করা হবে, নাকি তাতে ইজতিহাদের প্রয়োজন হবে?
আমার মনে হয়, আমরা বিপ্লবের যে প্রধান ছয়টি ধাপের কথা আলোচনা করেছি, তন্মধ্যে প্রথম পাঁচটি ধাপে পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, আমাদের বিপ্লবের দর্শন আজও সেই তাওহীদের দর্শনই। আজও আমাদের সেই ঈমানেরই দাওয়াত দিতে হবে, যার মূল উৎস—কুরআন। আপনি যদি এমন কিছু ভাবেন যে আমরা মুসলিম, আমাদের মধ্যে ঈমান তো আছেই। এমন কিছু ভেবে থাকলে আপনাকে আমি বলব—না, আপনার এমন ভাবনা যথার্থ ও যথেষ্ট নয়। কারণ, ইসলাম এক জিনিস আর ঈমান আরেক জিনিস। আমরা মুসলমান; কারণ, আমাদের জন্ম মুসলিম পরিবারে। আমাদের মাতা-পিতা মুসলমান। কিন্তু ঈমান-জ্ঞান ও মন-মননে নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। তাওহিদ, আখিরাত ও রিসালাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসসমৃদ্ধ ঈমান আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন।
কবির ভাষায়—
یقیں پیدا کر اے ناداں یقیں سے ہاتھ آتی ہے
وہ درویشی کہ جس کے سامنے جھکتی ہے فغفوری!
দৃঢ়বিশ্বাস তৈরি করো হে নাদান!
বিশ্বাসেরই তো অর্জন হয় দরবেশি,
যার সামনে নত হয় চীনা বাদশাহ ফাগফুরি!
রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের মাধ্যম ছিল কুরআন। আজও এই কুরআনই আমাদের বিপ্লবের মাধ্যম। তাই আমাদের ‘রুহুল কুরআন’ তথা কুরআনের রূহকে ব্যাপক করতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। আমার মতে, কুরআনের সাদৃশ্য হচ্ছে চুম্বকের মতো, যা সৎচরিত্র ও অধিকারী লোকদের নিজের দিকে আকর্ষণ করে। যাদের চরিত্রে বিপথে গেছে, তাদের ওপর কুরআনে কোনো প্রভাব ফেলবে না; বরং কুরআনের চুম্বক তাদের আকর্ষণ করবে, কাঠের টুকরাকে আকর্ষণ করে না। এ জন্যই সমাজে কুরআনি চুম্বকের প্রসার করা খুবই জরুরি।
আলহামদুলিল্লাহ! আমি চল্লিশ বছর ধরে এই শহরে (লাহোরে) কুরআনের দাওয়াত ও প্রসারের চেষ্টা করছি। আমাকে তো কেউ কেউ কুরআনের দাওয়াত প্রসারের ‘কায়্যেল’¹⁰ অভিধায়ও ডেকে থাকেন। আমিও আনন্দের সঙ্গে এই উপাধি কবুল করেছি। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, আমি নিজের মধ্যে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা ও মিষ্টতা অনুভব করি—
نامہ چه فراموش کرده ایم – الااللہ دوست کہ تکرار می کنیم
যা কিছু পড়েছি, ধারণ করেছি ভুলে গেছি সব,
তবে ভুলিনি বন্ধুর কথা, হয় দিবানিশি অনুভব।
মেডিকেলে পড়াশোনা করেছিলাম, কিন্তু সবকিছু ভুলেছি। তবে হ্যাঁ, কুরআন হচ্ছে বন্ধুর কথা—আল্লাহর কালাম। আমি সব সময় এর আলোচনাও করি। যাই হোক, আমাদের প্রথম কাজ হবে এটি। এরপর যারা এই চুম্বকের আকর্ষিত হবে, তাদের বাইয়াতবদ্ধ করে সংগঠিত করা হবে। রাসূল ﷺ-এর বাইয়াতের আদলে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন। এর বুনিয়াদ দুনিয়াবি কোনো সংগঠনের রীতিনীতিতে হবে না। এটি দু-তিন বছরের কোনো অস্থায়ী সংগঠনের মতো হবে না। এমনকি এতে আমির নির্বাচিত করারও অবকাশ থাকবে না; বরং যে দায়িত্বে পেশ করা হবে, সবাইকেই পেশ করা হবে এবং আরও আগে একত্রিত হয়েছে, তার হাতে নিজেদের এই অঙ্গীকারের সঙ্গে রাখতে হবে যে, যতদিন আপনি শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে থাকবেন, আমরা আপনাকে মেনে চলব। নিজেদের পরামর্শ পেশ করব, কিন্তু সিদ্ধান্ত আপনারই হবে।
যারা এ অঙ্গীকার করে দাঈর কাছে সমবেত হবে, আবার তাদের তারবিয়াত করা হবে। কুরআনকে গ্রথিত করা হবে তাদের হৃদয়ের গভীরে। আল্লাহর রাস্তায় জান ও ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর রাস্তায় দান করা)-এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হবে। মনে রাখবেন, ইনفاق (দান) নিফাক (মুনাফিকি, কপটতা, দ্বিমুখীতা)-কে ধীরে ধীরে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়।
এর সঙ্গে সবরের (Passive Resistance) ধাপও শুরু হয়ে যাবে। এ যুগে সবরের ধরন কেমন হবে? আমরা এখনও প্রশাসনের জন্য আশঙ্কার কারণ নই। মক্কার তখনকার ছোটো একটি আবাদিতে তো একশো-দেড়শো হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল; কিন্তু এখনকার পনেরো কোটি আবাদির মধ্যে দু-চার হাজার মানুষ যদি এমন হয়, তাতে তেমন কিছু যায় আসে না। তাই তাদের ওপর প্রশাসনের দিক থেকে কোনো বাধা বা চাপও আসবে না। তবে হ্যাঁ, তাদের শরিয়তের বিধিবিধানের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে পরীক্ষা দিতে হবে। তাদের মুখে দাড়ি রাখতে হবে, তখন লোকেরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে। কারণ, এতে করে যেখানে নাস্তায় আগে তারা ডিম-পরোটা খেত, এখন আর সেটা খেতে পারবে না। হয়তো শুকনো রুটিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এর দৃশ্যের কথাই সূরা তাগাবুনে আল্লাহ তুলে ধরেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ
হে মুমিনরা, নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানসন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের दुश्मन। অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। ( সূরা তাগাবুন : ১৪)
নিজের ঘরে নারীদের আপনি শরিয় পর্দায় করাবেন—তো দেখবেন, পুরো সমাজ একযোগে রুখে বসবে। এ তো চলছে সবরের ধাপ। আল্লাহ করুন—সে ধাপও দ্রুত আসুক যে, আমাদের সঙ্গে এত এত লোক একত্রিত হয়ে যাবে, যা দেখে কায়েমি শক্তি আতঙ্কিত হয়ে উঠবে এবং এটা ভাবতে বাধ্য হবে যে, এরা তো অচিরেই প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার জন্য আশঙ্কার কারণ হতে পারে। এরপর তারা বিচূর্ণ করার চেষ্টা করবে। আর আমরাও ধীরে ধীরে সফল বিপ্লবের ধাপগুলো অতিক্রম করতে শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১০. যে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা বেশি বেশি বলেন, তাকে সে বিষয়ের ‘কায়্যেল’ বলা হয়।
📄 বর্তমান যুগে পদক্ষেপ গ্রহণের ধরন
আমার মনে হয়, বর্তমান যুগে বিপ্লবের জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি। যদি আমি উত্তেজিত হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিই, তবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, নাকি এয়ারফোর্সের বিরুদ্ধে? আমাদের আগের সরকারগুলো কি বেলুচিস্তানে দু-দুবার এয়ারফোর্স ব্যবহার করেনি? এয়ারফোর্সের মাধ্যমে হাফেজ আল আসাদ একদিনে হাজারো ইখওয়ান-কর্মীকে শহিদ করে দেয়নি? তাদের অফিস ও কেন্দ্রগুলো বোম্বিং করে ধ্বংস করে দেয়নি? তাহলে বোঝা গেল, বর্তমান যুগে মোকাবিলা অসম পর্যায়ের (unequal) হয়ে যায়। তবে যেখানে সম্ভব ‘দ্বি-তরফা যুদ্ধ’-ও হতে পারে। পাহাড় অধ্যুষিত দেশে গেরিলা যুদ্ধও হতে পারে। এসব পদ্ধতি হারাম নয়। দ্বীন ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল ﷺ জিহাদ করেছেন। তো, আমরাও দ্বীন ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করতে পারি।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মাযহাব মতে, মুসলমান শাসক যদি ফাসিক হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে। প্রথমে জবানবন্দিতে ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে থেকে নিষেধ) করা হবে। যদি তাতে কোনো ফায়দা না হয়, তাহলে অস্ত্র তুলে নিয়ে ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ করা যেতে পারে। বলছিলাম, যুদ্ধ যদিও জায়েয, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আমলে আনা অনেক কঠিন। এখনকার শাসকদের বিরুদ্ধে ‘এক তরফা যুদ্ধ’-ই সবচেয়ে উপযোগী পদক্ষেপ।
আজকের দিনে যদি কোনো সরকারের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলন চলে, তো স্পষ্টতই তা থামানোর চেষ্টা করা হবে। শুরুর দিকে সেনাবাহিনী সরকারের আদেশ মানবে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে; কিন্তু একটা সময় এসে সেনারা এ বলে থেমে যাবে যে, ‘না, স্বদেশিদের ওপর আমরা আর একটি গুলিও ছুড়তে পারব না’। দেখুন, আপনার দেশের সেনাবাহিনী কোনো জবরদখলকারী বাহিনী নয়; এটি জাতীয় বাহিনী। আর যারা তাদের সামনে আন্দোলনের জন্য দাঁড়িয়েছে তারাও তো ভিনদেশি নয়। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগে¹⁴ জেনারেল ডায়ার¹⁵ হাজারো মানুষকে হত্যা করেছিল, এতে তার দুঃখ কীসের? সে তো ইংরেজ। আর যাদের সে হত্যা করেছে, তারা ছিল হিন্দুস্তানি মুসলমান, হিন্দু বা শিখ। মনে রাখবেন, নিজের জাতিকে বা নিজের দেশের মানুষকে মারা এত সহজ নয়। একটা সময় পর্যন্ত তো নির্দেশ বাস্তবায়ন করে যায়; তারপর এমন এক পর্যায় আসে, যখন সেনা-কর্মকর্তারা এরূপ পাশবিক নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
যেমন, লাহোরে ব্রিগেডিয়ার মুহাম্মাদ আশরাফ গোন্দল—আল্লাহ তাকে উত্তম বদলা দান করুন—এ বলে অস্বীকার করেছিলেন যে, আমি লোকদের ওপর আর গুলি চালাতে পারব না। তাকে দেখে আরও দুজন ব্রিগেডিয়ারও একই পথে বেছে নেন। এতে ভুট্টো সাহেবও যা বোঝার বুঝে নেন। দুদিন আগে রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি নিজের হাত তুলে বলেছিলেন, ‘আমার চেয়ার অনেক মজবুত’। আমার চোখে আজও সেই দৃশ্য ভাসে। কিন্তু যখন লাহোর থেকে সেনাদের ব্যাপারে সংবাদ আসে, তখন তার সেই চেয়ারই প্রকম্পিত হয়। বাধ্য হয়ে তিনি পিএনএ-র (Pakistan National Alliance) কাছে আলোচনার বার্তা পাঠান। সে যাই হোক, ইসলামি বিপ্লবের জন্য কিন্তু প্রাণের কোরবানি দিতেই হবে; তা ছাড়া বিপ্লব সংঘটিত হবে না।
বর্তমান যুগে আমাদের সামনে ইরানিদের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তারা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে বিপ্লব সংঘটিত করে দেখিয়েছে। যদিও ইরানি বিপ্লবকে আমি সঠিক ইসলামি বিপ্লব মনে করি না। সত্যি বলতে, আমার কাছে তা আসল ও সফল বিপ্লবও নয়। কারণ, আসল বিপ্লব সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে না; বরং তা নিজের সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ভুলে গেলে চলবে না, ‘তাসদিরে ইনকিলাব’ (Export of Revolution) একটি আসল ও সফল বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বৈশিষ্ট্যও বটে। কাশ্মীরিদের উদ্যম ও কোরবানি দেখে আমার নিজের প্রাণ উৎসর্গ করছে। কাশ্মীরিদের উদ্যম ও কোরবানি দেখে আমি মসজিদে দারুস সালাম, আগে গিয়েতে ‘ইরানি বিপ্লব কি ইসলামি বিপ্লব’—বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলাম। তারপর ‘মানহাজে ইনকিলাবে নববি’ বিষয়ে ১১টি ধারাবাহিক বক্তব্য দিয়েছিলাম; সেখানে সবিস্তার রূপ আপনাদের সামনে পেশ করলাম। এখানে প্রদত্ত সেই ১১টি বক্তব্য ‘মানহাজে ইনকিলাবে নববি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিতও হয়েছে। আপনাদের কারও যদি এ বিষয়ে আরও জানার আগ্রহ থাকে, তবে গ্রন্থটি পড়তে পারেন।
যুগের একটি পথই খোলা আছে আর তা হচ্ছে, ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দুঃখের বিষয়, যারা এর ইচ্ছা রাখে, তারা লালন করে—তাদের সামনে যেহেতু কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচি নেই; এজন্য তারা এদিক-ওদিক হাতড়ে যেতে থাকে। আমি রাসূল ﷺ-এর সিরাত থেকে আহরণ করে আপনাদের সামনে বিপ্লবের এমন কর্মসূচি পেশ করেছি, যা অনুসরণ করলে সফলতার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। নতুবা আপনার ইখলাস তার জায়গায় পড়ে থাকবে; কিন্তু সফলতার দেখা মিলবে না।
টিকাঃ
১৪. Jallianwala Bagh
১৫. Reginald Edward Harry Dyer
📄 যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বর্তমান যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, বিপ্লবের তরিকা নির্ণয় করতে পারা এবং সুস্পষ্টভাবে তা বুঝতে পারা। বর্তমান যুগের মুসলমানদের মধ্যে জযবার কোনো কমতি নেই। হাজারো মানুষ নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। পৃথিবী দেখেছে; অথচ কাশ্মীরিদের ব্যাপারে বলা হয়, তারা তো লড়াই জাতিই নয়। এখন দেখুন, তাদের মধ্যে ক্রমাগত লড়াইয়ের জযবা ও মানসিকতা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান থেকে সেখানে গিয়ে কত মানুষ যে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছে, তার হিসাব করাও তো মুশকিল। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এসব ইসলামি বিপ্লবের বিপ্লবী তরিকা বা কর্মসূচি নয়। এসব করে কোনো সফলতা আসবে না। এসব তরিকা অবলম্বন করে আপনি শুধু নিজের ক্ষোভই মেটাতে পারবেন; এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।
দেখুন, আফ্রিকায় গিয়ে আমেরিকার দুটি দূতাবাস হামলায় আক্রমণ করে উড়িয়ে দেওয়া হলো; কিন্তু একই সঙ্গে সেখানকার অধিবাসী দুজন আফ্রিকানও মারা গেল। ফায়দা কী হলো? শুধু এতটুকু কাজ হলো যে, আপনার ক্ষোভ মিটেছে। তো, সহজ ভাষায় বললে, এসব ভেলকিবাজি ছাড়া কিছুই নয়।
তেমন করে কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়লাভিত হওয়া অসম্ভব। এর পেছনে আছে। আমি মানি, বিপ্লবের জন্য মুহাম্মাদি तरিকা ও কর্মসূচি তো গোলদ। ইসলামি আপনিই বলুন, আরবে নির্বাচন করতে হবে। পারবেন? কুরআন তো বলে—
إِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
আর যদি আপনি পৃথিবীর বেশিরভাগ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। ( সূরা আনআম : ১১৬)
নির্বাচনে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সংখ্যালঘ্যতার ব্যাপার থাকে। আমি এর চেয়েও আরও বহু পরের উদাহরণ দিচ্ছি। বলুন তো, আয়াতুল্লাহ খামিনি কি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না! আল্লাহ ওয়ান্তে নিজেদের আর প্রতারিত করবেন না। আজ পুরো মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর আজাব থেকে কেবল এ সুরতে মুক্তি লাভ করতে পারবে যে, অন্ততপক্ষে কোনো একটি রাষ্ট্র প্রকৃতার্থে দ্বীন কায়েম করে পুরো পৃথিবীকে দেখিয়ে আহ্বান করবে, দেখো সবাই, এ হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম। ইসলামের বরকত দেখো সবাই। ইসলামের কল্যাণ দেখে যাও সবাই। এখানে সমতা ও ভ্রাতৃত্ব দেখে যাও। এখানের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দেখে যাও। যদি আমরা এমনটা করতে না পারি, তবে আল্লাহর আজাব আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে। কবির ভাষায়—‘আর কিছুদিন পর তো শূন্যলোক থেকেও রক্ত ঝরবে!’
দিন দিন আজাব বাড়তে থাকবে; কমবে না। আর বিশ্ব সবচেয়ে বেশি এ আজাবের শিকার হবে। কারণ, আল্লাহ তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছেন। তাদের মধ্যেই রাসূল ﷺ-কে পাঠিয়েছেন। ‘এ মহান মর্যাদা তো তারাই পেয়েছে, যারা এ (নবির জাতি হওয়ার) মাহাত্ম্য লাভ করেছে।’ আরেকটা কারণ হচ্ছে, তাদের ভাষায় আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ কিতাব নাজিল করেছেন। আমরা তো চাটাই-চুম্বাও মুখস্থ করেছি, আরবদের তো আর ফারসি কুরআনও বুঝেছি, কিন্তু তাদের তো এটা মাতৃভাষা ছিল।
যাই হোক, আমাদের দেশের স্থায়িত্ব ও কল্যাণ এতেই রয়েছে যে, এখানে ইসলামি বিপ্লব আসবে, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে; এটিই তার টিকে থাকার কারণ। নতুবা আমাদের দেশের অবস্থা তো এখন পুরোপুরি ভঙ্গুর অবস্থার ওপর ওয়াফাকিয়ার শেষ রুকুতে তুলে ধরা হয়েছে। যখন কেউ মুমূর্ষু অবস্থায় থাকে আর তার পাশে আত্মীয়স্বজন দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, সে বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু তারা তখন অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের কিছুই করার থাকে না। তাদের অবস্থার কুরআন এভাবে চিত্রিত করেছে যে—
فَلَوْلَا إِن كُنتُمْ غَيْرَ مَدِينِينَ تَرْجِعُونَهَا إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
তোমরা যদি কর্মজীবনে না হও, তাহলে তোমরা ওটা (রূহ) ফিরিয়ে দাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো। ( সূরা ওয়াকিয়া : ৮৬-৮৭)
একইভাবে আমিও বলছি, আমাদের দেশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় দেখবেন, আপনার অট্টালিকা আর আপনার কলকারখানার আর আপনার থাকবে না; অন্য কেউ এর মালিক হবে। ‘অস্থিতিশীলতার অবস্থা দেখে; একেবারে বিরান খণ্ডভূমিতে পরিণত হবে!’ যদি এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে পাকিস্তানের ধ্বংস আর এখন কি অধিকার থাকবে না। আমি ‘বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ইসলাম ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ’—প্রসঙ্গে দুটি বক্তব্য দিয়েছিলাম: [১] বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের ভবিষ্যৎ। [২] পাকিস্তানে কি ধ্বংস হতে চলেছে? আর এখনও কি কোনো পথ খোলা আছে?
যুগের একটি পথই খোলা আছে আর তা হচ্ছে, ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দুঃখের বিষয়, যারা এর ইচ্ছা রাখে, তারা লালন করে—তাদের সামনে যেহেতু কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচি নেই; এজন্য তারা এদিক-ওদিক হাতড়ে যেতে থাকে। আমি রাসূল ﷺ-এর সিরাত থেকে আহরণ করে আপনাদের সামনে বিপ্লবের এমন কর্মসূচি পেশ করেছি, যা অনুসরণ করলে সফলতার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। নতুবা আপনার ইখলাস তার জায়গায় পড়ে থাকবে; কিন্তু সফলতার দেখা মিলবে না।
আমার যা কিছু বলার ছিল—আল্লাহর ইচ্ছায় তা বলতে পেরেছি। সবশেষে আমি নিজের জন্য, আপনাদের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।