📄 বদর যুদ্ধের পূর্বে পরিচালিত অভিযান
মদিনায় নিজের অবস্থান দৃঢ় করার পর রাসূল ﷺ সক্রিয় প্রতিরোধের ধাপ আরও তীব্রতর করে তোলেন। সামরিক অভিযানের জন্য ছোট ছোট সেনাদল পাঠানো শুরু করেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে তিনি এমন আটটি অভিযানে সেনাদল পাঠিয়েছিলেন; যার মধ্যে চারটিতে রাসূল ﷺ নিজে শরিক হয়েছিলেন আর চারটিতে বিভিন্নজনকে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন। পরিভাষায় যেসব অভিযানে রাসূল ﷺ শরিক হয়েছিলেন, সেগুলোকে ‘গাজওয়া’ আর যেসব অভিযানে তিনি স্বয়ং শরিক হননি, সেগুলোকে ‘সারিয়্যা’ বলা হয়।
এ সময়ে মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। অর্থাৎ, এখন যে পদক্ষেপ (initiative) নেওয়া হয়েছে, তা রাসূল ﷺ-এর পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আমাদের কিছু সিরাতগ্রন্থে যাটিয়েছেন। কারণ, সিরাতগ্রন্থগুলো পাশ্চাত্যে মিডিয়াগুলো প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে যে, ইসলাম আজকাল পশ্চিমা মিডিয়াগুলো প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে যে, ইসলাম একটি রক্তপিপাসু ধর্ম, তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইসলাম সন্ত্রাসবাদের সবক শেখায় ইত্যাদি। একইভাবে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিম বিশ্বের ওপর নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন প্রাচ্যবিদরা ইসলামের বিরুদ্ধে এমন বিষাক্ত অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছে। তো এসবের বিপরীতে আমাদের লেখকরা নমনীয় হয়ে ও জবাবদিহির (Apologetic) বলেন, ‘না না, রাসূল ﷺ নিজে থেকে কোনো যুদ্ধ শুরু করেননি। তিনি তো নিজের প্রতিরক্ষায় লড়েছেন মাত্র’। অথচ তাদের এসব কথা শতভাগ মিথ্যা।
মক্কার অবস্থানে পূর্বেই রাসূল ﷺ-ই কম্পন সৃষ্টি করেছিলেন, যেমনিভাবে হিজরতের পর মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (Active Resistance) আর সর্বশেষ সশস্ত্র পদক্ষেপ (Armed Conflict)-এর সূচনা তিনিই করেছেন।
কবির ভাষায়—
وہ بجلی کا کڑکا تھا یا صوتِ ہادی ‘
عرب کی زمیں جس نے ساری ہلا دی!
তা বজ্রধ্বনি ছিল নাকি পথপ্রদর্শকের (রাসূল ﷺ) আওয়াজ,
আরবের পুরো ভূমিকে প্রকম্পিত করে দিয়েছিল তাঁর কাজ।
বদর যুদ্ধের পূর্বে একবছরের সময়কালে রাসূল ﷺ যে আটটি অভিযান পরিচালনা করেছেন, এর পেছনে থাকা দুটি উদ্দেশ্য বোঝা যায়। আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে প্রথম উদ্দেশ্য ছিল, মক্কার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Blockade) আরোপ করা। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য, কুরাইশদের অন্যদের থেকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন (Isolation Or Political Containment) করে ফেলা।
কুরাইশদের কাফেলাগুলো যে রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করত, রাসূল ﷺ সেগুলো অবরোধ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে দেন। এর দ্বারা তিনি কুরাইশদের এই বার্তা দেন যে, ‘এখন এখানে আমার কর্তৃত্ব চলছে। তোমাদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোও আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকবে না। মক্কা থেকে শামে যেতে হতো বদর হয়ে। বদরের অবস্থান মক্কা থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে। আর মদিনা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৯০ মাইল। কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলো আটকানোর রাসূল ﷺ সেনাদল কয়েকবার ছোট ছোট সেনাদল পাঠান। নিজেও একবার একটি বড়ো সেনাদল নিয়ে যান এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন একটি কাফেলার পিছু নেন; কিন্তু তারা ডানপাশে পালিয়ে যায়।
এমনিভাবে মক্কা থেকে ইয়েমেনগামী কাফেলার পথ ধরে এবং সেদিকেও রাসূল ﷺ একটি সেনাদল পাঠান। এরপর অবস্থা এমন হয় যে, রাসূল ﷺ যেখানেই যান, সেখানকার গোত্রগুলো তাঁর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। হয়তো তারা আগে থেকেই কুরাইশদের মিত্র ছিল, এখন রাসূল ﷺ-এর মিত্র হয়ে গেছে অথবা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ‘আমরা কুরাইশদের বিরুদ্ধে আপনাকে সাহায্য করব, আর না আপনার বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করব। যাই হোক, এই দুই ধরনের কুরাইশদের শক্তি ও প্রতিপত্তিকে ভণ্ডি পড়ে যায়। আর রাসূল ﷺ-ও উপর্যুক্ত দুটি উদ্দেশ্য (অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ) হাসিল সফল হন।
প্রত্যেক জাতির মধ্যে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ের ভাষায় তাদের বর্তমান তাদের স্বভাবের লোকে (Hawks) এবং এর সরল স্বভাবের লোকে (Doves) বলা হয়ে থাকে। মক্কাতেও এই ধরনের মানুষের উপস্থিতি ছিল। গরল, রণগ্রাম ও উগ্র স্বভাবের লোকদের মধ্যে আবু জাহল ও উতবা ইবনে আবু মুয়িত উল্লেখযোগ্য। বিপরীতে সরল, সহনশীল ও নরম স্বভাবের লোকদের মধ্যে উতবা ইবনে রাবিয়া ও হাকিম ইবনে হিজাম উল্লেখযোগ্য। প্রথম শ্রেণির লোকদের কথা ছিল, ‘অনেক হয়েছে! চলো, এবার মদিনায় আক্রমণ করে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের ছিন্নমূল করে দিই’। বিপরীতে শান্তিব্রত শ্রেণি আক্রমণাত্মক কোনো পদক্ষেপের পক্ষে ছিল না।
উতবা ইবনে রবিয়া ছিল বিচক্ষণ মানুষ। রাসূল ﷺ-এর হিজরতের পর সে কুরাইশের লোকদের বলেছিল, ‘দেখো, মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীরা এখান থেকে চলে গেছে (তাদের ভাষায়, আপদ দূর হয়েছে); এখন মদিনায় গিয়েও মুহাম্মাদ আরাম করে তো বসে থাকবে না; বরং নিজের ধর্মের প্রচার করবে। এতে আরবরা তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাবে এবং আরবদের সঙ্গে তার کشمکش (সংঘাত) শুরু হবে।
এরপর আরবের অবশিষ্ট ভূমি যদি মুহাম্মাদ বিজয় করতে সক্ষম হয়, এতে আমাদের ক্ষতি কী? সে তো আমাদেরই কুরাইশি ভাই। তাঁর বিজয় অর্থাৎ আমাদের বিজয়। আর বিজয়ে আমাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যদি আরবরা হাতে মুহাম্মাদ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে যা তোমরা কামনা করছ সেটাই তো হয়ে যাবে; তাও আবার তোমাদের তরবারিকে নিজেদের ভাইদের রক্তে রঞ্জিত করা ছাড়াই। আমাদের ভাই—সে তো নাকি? উসমান কে? উসমান তো বনু উমাইয়ারই একজন নাকি? হামজা কে? আবদুল্লাহ মুত্তালিবেরই তো ছেলে। মুহাম্মাদ কে? আবদুল মুত্তালিবেরই পোতা। তোমায় মুহাম্মাদ আর আরবদের তাদের নিজেদের মধ্যে লড়তে দাও। যদি মুহাম্মাদের বিজয় হয়, তবে সমগ্র আরবে আমাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।’
আসলেই সমগ্র আরবে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খিলাফতে রাশেদার পর সাম্রাজ্যের যুগসেই উমাইয়াদের যুগই ছিল। যাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—বনু উমাইয়া বা বনু আব্বাস—তারা তো আরবেরই ছিল। উতবা এমন গভীর ভাবসম্পন্ন কিন্তু কুরাইশ নেতারা জ্ঞানগর্ভ কথা কর্ণপাত করেনি।
সরল ও নরম স্বভাবের শ্রেণিটার মক্কায় বেশ ভালো প্রভাব ছিল; কিন্তু যখন দুটি ঘটনা ঘটে, যা কল্পনাতীতভাবে গরম ও যুদ্ধবাজ শ্রেণির পাল্লা ভারি করে দেয়। আর এই সরল শ্রেণির লোকেরাও একেবারে চুপসে যায়।
প্রথম ঘটনা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন কাফেলার পিছু নিয়েছিলেন; কিন্তু তারা ডানপাশে বেঁচে যেতে সক্ষম হয়—তারা বিপুল পরিমাণে ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে শামে থেকে ফিরছিল।
আবু সুফিয়ান কুরাইশদের কাছে এ বলে দূত পাঠায় যে, ‘আমি আশঙ্কা করছি, মুহাম্মাদের সঙ্গীরা আমাদের কাফেলার ওপর আক্রমণ করবে এবং লুট করে সবকিছু নিয়ে যাবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব, আমাদের সাহায্যার্থে সেনাবাহিনী পাঠাও’। আবু সুফিয়ানের পাঠানো দূত হস্তদন্ত হয়ে মক্কায় পৌঁছাতে সাহায্য চেয়ে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে সবাইকে বলে, ‘তোমাদের গোত্র, পরিবার ও সম্পদ, সবকিছু মক্কার মধ্যে রয়েছে। তাই এখনই সাহায্যের জন্য তোমাদের রওনা হওয়া উচিত’।
অন্যদিকে দ্বিতীয় যে ঘটনাটি ঘটে তা হচ্ছে, রাসূল ﷺ বারাআজেলনের ছোটো একটি দল তায়েফ ও মক্কা মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে পাঠিয়েছিলেন। আর তাদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেখানে অবস্থান করে মক্কাবাসীর গতিবিধির ওপর নজর রাখো এবং সব সময় করে মক্কাবাসীর গতিবিধির ওপর নজর রাখো এবং সব সময় আমাদের অবহিত করতে থাকো। কিন্তু সেখানে এমন এক পরিস্থিতির তৈরি হয় যে, মক্কার একটি কাফেলার সঙ্গে মুসলিমদের মুখোমুখি হয়ে যায়। একপর্যায়ে এক মুশরিক মারা যায়। মুসলিম দুজন মুশরিক মুসলিমরা বন্দি করে। আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুসলিম দুজন মুশরিককে মুসলিমরা বন্দি করে। আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুসলিমরা কাফেলাটি থেকে প্রাপ্ত বেশুমার গনিমতের সম্পদ নিয়ে রাসূল ﷺ-এর দরবারে হাজির হয়। তাদের এমন কাজে রাসূল ﷺ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। কারণ, তাদের কোনো রকমের সংঘর্ষে জড়ানোর জন্য পাঠানো হয়নি। এখন আর কী করার? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। যে মুশরিক মুসলিমদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, যে মুশরিক মুসলিমদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, সে মক্কায় পৌঁছে গিয়ে তাদের আহত কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে পুরো ঘটনা মক্কায় পৌঁছে সে লোকদের বলবে থাকে, দেখো সবাই! মুহাম্মাদের অনুসারীরা আমার এ কী দশা করেছে, তারা আমাদের লোককদেরও মেরে ফেলেছে!
এই দুটি সংবাদ একই সময়ে মক্কায় পৌঁছায়। একটি উত্তর থেকে, আরেকটি দক্ষিণ থেকে। হিজরতের পর তখনও পর্যন্ত মুশরিকরা আর কোনো মুসলিমকে হত্যা করেনি। হিজরতের আগে সুমাইয়া ও ইয়াসার রা.-কে আবু জাহল শহিদ করেছিল ঠিক, কিন্তু হিজরতের পর মক্কাবাসীর তরফ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
📄 বিপ্লবী কর্মসূচিতে চূড়ান্ত প্রতিরোধের ধাপ
উপরে বর্ণিত দুটি ঘটনার কারণে কুরাইশের সরল ও সহনশীল শ্রেণির লোকেরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। যার ফলে বদর যুদ্ধের মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের কর্মসূচিতে ষষ্ঠ ধাপ অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রতিরোধের সূচনা হয়ে যায়। এটা রাসূল ﷺ এবং কুরাইশদের মধ্যে দু-তরফা যুদ্ধ ছিল, যা প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত জারি থাকে এবং অষ্টম হিজরিতে হক ও বাতিলের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বদর যুদ্ধে কুরাইশের ৭০ জন নিহত হয়, যার মধ্যে কুরাইশদের বড়ো বড়ো নেতাও ছিল। ১৪ জন মুসলিম শহিদ হন। উহুদ যুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কয়েকজন সাহাবির ভুলের কারণে ৭০ জন সাহাবিকে শহিদ হতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমার রচিত গ্রন্থ ‘মানহাজে ইনকিলাবে নববি’ পড়তে পারেন। এখানে আমার আগের আলোচনাগুলোতে সিরাতের রং দিচ্ছি মাত্র। অন্য ভাষায়, সিরাত আলোচনা করছি না; বরং সিরাতের ফলসাফা বা দর্শন আলোচনা করছি।
মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে রাসূল ﷺ-এর ছয় বছরের দীর্ঘকালীন যুদ্ধের ধারা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান থেকে শুরু হয় এবং অষ্টম হিজরির ১০ রমজান মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এই সময়ে মুসলিমদের বহু চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। বিভিন্ন যুদ্ধে সহস্রাধিক সাহাবি শাহাদাতবরণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে রাসূল ﷺ নিজেও আহত হন। তাঁর দাঁত মুবারক শহিদ হয়। তরবারির আঘাতে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া জুড়ে তাঁর কপালের হাড়ে গেঁথে যায়। এক সাহাবি নিজের দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে সেগুলোকে বের করার চেষ্টা করলে তাঁরও দাঁত ভেঙে যায়; কিন্তু কড়াগুলো বের হয়নি। পর কোনোভাবে সেগুলো বের করা হলে রাসূল ﷺ-এর শরীর থেকে রক্তের ফোয়ারা বের হয় যে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। অন্যদিকে সবার মধ্যে প্রচার হয়ে যায়, রাসূল ﷺ শহিদ হয়ে গেছেন।
যে ৭০ জন সাহাবি শহিদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে হামজা রা.-ও ছিলেন। রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে হামজা রা.-এর কয়েক ধরনের সম্পর্ক ছিল। তিনি রাসূল ﷺ-এর চাচা ছিলেন, খালাতো ভাই ছিলেন এবং দুধভাইও ছিলেন। আরবরা দুধভাইকে নিজের সহোদরের মতোই মর্যাদা দিত। আবার তিনি রাসূল ﷺ-এর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুও ছিলেন। ময়দানে যখন তাঁর লাশ পাওয়া যায়, সেটার অবস্থা ছিল গা শিউরে উঠার মতো! নাক-কান কাটা ছিল, বুক চিরে কলিজা চিবানো হয়েছিল! তো, এখানে এসে আপনাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ঘরে বসে বিপ্লব সংঘটিত ও সংঘটিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ কোরবানির পথ পাড়ি দিতে হয়।
রাসূল ﷺ সশস্ত্র আন্দোলনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এর জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাই ছয় বছরের এই সশস্ত্র আন্দোলন মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় পূর্ণতা পায়। সর্বোপরি إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا (সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিদূরিত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা তো বিতাড়িত হয়ে থাকে)—এর প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূল ﷺ আরও যেসব যুদ্ধে লড়েছেন, মিলিটারির পরিভাষায় সেগুলোকে মপিং আপ অপারেশন¹² (Mopping-up Operation) বলা যায়। যার মাধ্যমে বিরোধীশক্তিকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা উদ্দেশ্য ছিল; নতুবা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই কিন্তু আরবে তাঁর বিপ্লবের পূর্ণতা ঘটেছিল।
টিকাঃ
১২. যুদ্ধ শেষে শত্রুবাহিনীর শক্তি সমূলে উৎপাটন করার জন্য যে অভিযান পরিচালনা করা হয় তাকে ‘মপিং-আপ অপারেশন’ বলে।
📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবের প্রসার
এখন আমরা দুটি বিষয় সম্পর্কে করতে চাই। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, রাসূল ﷺ হুদাইবিয়ার সন্ধির আগে না কোনো যুদ্ধার্থী বা দাঈকে আরবের বাইরে দাওয়াতি কাজে পাঠিয়েছেন, আর না কোনো পয়গাম বা পত্র কোনো শাসকের নামে প্রেরণ করেছেন। দশ বছর পর্যন্ত দাওয়াতের সব কাজ মক্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এরপর তায়েফের সফর গেছেন। ইনকিলাব বা বিপ্লবের যে কর্মসূচি—এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সূচনালগ্নে তা একটা প্রসার লাভ করে না। মদিনার অথবা তাবেলিগের কাজ যেমন তরমুজ বা শশার মাচার মতো জমিনে ছড়িয়ে পড়ে, বিপ্লবের কার্যক্রম তেমন ছড়ায় না। বিপ্লবী কর্মসূচি এক জায়গায় নিজের শেকড় মজবুত করে প্রথমে সেখানে নিজের শেকড় মজবুত করে প্রথমে সেখানে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই কলি আগাছের চারাগাছ হয়ে পরিণত হয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই চারাগাছটি সুশোভিত এক মজবুত বৃক্ষে পরিণত হয়।
রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের কর্মসূচি ও প্রয়াস মদিনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল বিপ্লবী চরিত্রের। -এর কাছে ধনসম্পদও কোনো কিছু ছিল না। তখন খাদিজা রা.-এর খেদমতে পেশ করা হয়েছিল। তিনি চাইলে তখনও কায়সার-কিসরা ও রোম-পারস্যের সম্রাটের কাছে এই বার্তা পাঠাতে পারতেন যে, ‘আমি আল্লাহর রাসূল। তোমরা আমার ওপর ঈমান আনো!’—কিন্তু তিনি তেমনটা করেননি। হিজরতের পর মদিনায় গিয়ে তিনি বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করেন; তখনও আরবের কোথাও কোনো দাওয়াতি বা প্রতিনিধি দল তিনি তখন পাঠাননি, যখন হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়ে গিয়েছিল এবং রাসূল ﷺ-কে কুরাইশরা একপ্রকার বিরোধীশক্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কুরআন এই সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে অভিহিত করেছে। এই সন্ধি সম্পন্ন হওয়ার পর কিসরা, হিরাক্লিয়াস, মুকাউকিস, নাজ্জাশি এবং জাবালাতুল গাসসানির আরবদের সীমান্তে বসবাসরত গোত্রগুলোর অমুসলিম নেতাদের কাছে দূতম মারফত দাওয়াত ও বার্তা পাঠান।
রাসূল ﷺ-এর দাওয়াতি বার্তার প্রতিক্রিয়ায় রাজা-বাদশাহদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের আচরণ সামনে আসে। গাসসানের শাসক—যে কিনা হিরাক্লিয়াসের অনুগত ছিল—রাসূল ﷺ-এর পাঠানো দূত কিনা সাহাবি হাসির ইবনে উমাইর রা.-কে শহিদ করে দেয়। যার কিসাস নিতে রাসূল ﷺ সেনাবাহিনী পাঠান। আর এতে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এভাবেই ধারাবাহিকতায় তখন থেকে রাসূল ﷺ-এর বর্তমানে তাসদিবে ইনকিলাব বা বিপ্লবের প্রসারের (Exporting of Revolution) সূচনা হয়ে যায়। আরেকটি সহজ করে বললে, রাসূল ﷺ-এর জীবনকালেই শুধু আরবের মধ্যেই বিপ্লব পূর্ণতা লাভ করেনি; বরং তাঁর হাতে আরবের বাইরেও বিপ্লবের সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি আর জিম্মাদারির সাথে তাঁদের কাঁধে অর্পণ করে যান।
📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবী দর্শন এবং আজকের প্রেক্ষাপট
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, পানি অনেক বয়ে গেছে। যুগ অনেক বদলে গেছে। অবস্থা ও পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। তাই এখনকার সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে যুগিও কি বিপ্লব সংগঠিত করার নববি রূপরেখার ওপর হুবহু আমল করা হবে, নাকি তাতে ইজতিহাদের প্রয়োজন হবে?
আমার মনে হয়, আমরা বিপ্লবের যে প্রধান ছয়টি ধাপের কথা আলোচনা করেছি, তন্মধ্যে প্রথম পাঁচটি ধাপে পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, আমাদের বিপ্লবের দর্শন আজও সেই তাওহীদের দর্শনই। আজও আমাদের সেই ঈমানেরই দাওয়াত দিতে হবে, যার মূল উৎস—কুরআন। আপনি যদি এমন কিছু ভাবেন যে আমরা মুসলিম, আমাদের মধ্যে ঈমান তো আছেই। এমন কিছু ভেবে থাকলে আপনাকে আমি বলব—না, আপনার এমন ভাবনা যথার্থ ও যথেষ্ট নয়। কারণ, ইসলাম এক জিনিস আর ঈমান আরেক জিনিস। আমরা মুসলমান; কারণ, আমাদের জন্ম মুসলিম পরিবারে। আমাদের মাতা-পিতা মুসলমান। কিন্তু ঈমান-জ্ঞান ও মন-মননে নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। তাওহিদ, আখিরাত ও রিসালাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসসমৃদ্ধ ঈমান আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন।
কবির ভাষায়—
یقیں پیدا کر اے ناداں یقیں سے ہاتھ آتی ہے
وہ درویشی کہ جس کے سامنے جھکتی ہے فغفوری!
দৃঢ়বিশ্বাস তৈরি করো হে নাদান!
বিশ্বাসেরই তো অর্জন হয় দরবেশি,
যার সামনে নত হয় চীনা বাদশাহ ফাগফুরি!
রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের মাধ্যম ছিল কুরআন। আজও এই কুরআনই আমাদের বিপ্লবের মাধ্যম। তাই আমাদের ‘রুহুল কুরআন’ তথা কুরআনের রূহকে ব্যাপক করতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। আমার মতে, কুরআনের সাদৃশ্য হচ্ছে চুম্বকের মতো, যা সৎচরিত্র ও অধিকারী লোকদের নিজের দিকে আকর্ষণ করে। যাদের চরিত্রে বিপথে গেছে, তাদের ওপর কুরআনে কোনো প্রভাব ফেলবে না; বরং কুরআনের চুম্বক তাদের আকর্ষণ করবে, কাঠের টুকরাকে আকর্ষণ করে না। এ জন্যই সমাজে কুরআনি চুম্বকের প্রসার করা খুবই জরুরি।
আলহামদুলিল্লাহ! আমি চল্লিশ বছর ধরে এই শহরে (লাহোরে) কুরআনের দাওয়াত ও প্রসারের চেষ্টা করছি। আমাকে তো কেউ কেউ কুরআনের দাওয়াত প্রসারের ‘কায়্যেল’¹⁰ অভিধায়ও ডেকে থাকেন। আমিও আনন্দের সঙ্গে এই উপাধি কবুল করেছি। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, আমি নিজের মধ্যে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা ও মিষ্টতা অনুভব করি—
نامہ چه فراموش کرده ایم – الااللہ دوست کہ تکرار می کنیم
যা কিছু পড়েছি, ধারণ করেছি ভুলে গেছি সব,
তবে ভুলিনি বন্ধুর কথা, হয় দিবানিশি অনুভব।
মেডিকেলে পড়াশোনা করেছিলাম, কিন্তু সবকিছু ভুলেছি। তবে হ্যাঁ, কুরআন হচ্ছে বন্ধুর কথা—আল্লাহর কালাম। আমি সব সময় এর আলোচনাও করি। যাই হোক, আমাদের প্রথম কাজ হবে এটি। এরপর যারা এই চুম্বকের আকর্ষিত হবে, তাদের বাইয়াতবদ্ধ করে সংগঠিত করা হবে। রাসূল ﷺ-এর বাইয়াতের আদলে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন। এর বুনিয়াদ দুনিয়াবি কোনো সংগঠনের রীতিনীতিতে হবে না। এটি দু-তিন বছরের কোনো অস্থায়ী সংগঠনের মতো হবে না। এমনকি এতে আমির নির্বাচিত করারও অবকাশ থাকবে না; বরং যে দায়িত্বে পেশ করা হবে, সবাইকেই পেশ করা হবে এবং আরও আগে একত্রিত হয়েছে, তার হাতে নিজেদের এই অঙ্গীকারের সঙ্গে রাখতে হবে যে, যতদিন আপনি শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে থাকবেন, আমরা আপনাকে মেনে চলব। নিজেদের পরামর্শ পেশ করব, কিন্তু সিদ্ধান্ত আপনারই হবে।
যারা এ অঙ্গীকার করে দাঈর কাছে সমবেত হবে, আবার তাদের তারবিয়াত করা হবে। কুরআনকে গ্রথিত করা হবে তাদের হৃদয়ের গভীরে। আল্লাহর রাস্তায় জান ও ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর রাস্তায় দান করা)-এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হবে। মনে রাখবেন, ইনفاق (দান) নিফাক (মুনাফিকি, কপটতা, দ্বিমুখীতা)-কে ধীরে ধীরে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়।
এর সঙ্গে সবরের (Passive Resistance) ধাপও শুরু হয়ে যাবে। এ যুগে সবরের ধরন কেমন হবে? আমরা এখনও প্রশাসনের জন্য আশঙ্কার কারণ নই। মক্কার তখনকার ছোটো একটি আবাদিতে তো একশো-দেড়শো হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল; কিন্তু এখনকার পনেরো কোটি আবাদির মধ্যে দু-চার হাজার মানুষ যদি এমন হয়, তাতে তেমন কিছু যায় আসে না। তাই তাদের ওপর প্রশাসনের দিক থেকে কোনো বাধা বা চাপও আসবে না। তবে হ্যাঁ, তাদের শরিয়তের বিধিবিধানের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে পরীক্ষা দিতে হবে। তাদের মুখে দাড়ি রাখতে হবে, তখন লোকেরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে। কারণ, এতে করে যেখানে নাস্তায় আগে তারা ডিম-পরোটা খেত, এখন আর সেটা খেতে পারবে না। হয়তো শুকনো রুটিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এর দৃশ্যের কথাই সূরা তাগাবুনে আল্লাহ তুলে ধরেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ
হে মুমিনরা, নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানসন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের दुश्मन। অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। ( সূরা তাগাবুন : ১৪)
নিজের ঘরে নারীদের আপনি শরিয় পর্দায় করাবেন—তো দেখবেন, পুরো সমাজ একযোগে রুখে বসবে। এ তো চলছে সবরের ধাপ। আল্লাহ করুন—সে ধাপও দ্রুত আসুক যে, আমাদের সঙ্গে এত এত লোক একত্রিত হয়ে যাবে, যা দেখে কায়েমি শক্তি আতঙ্কিত হয়ে উঠবে এবং এটা ভাবতে বাধ্য হবে যে, এরা তো অচিরেই প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার জন্য আশঙ্কার কারণ হতে পারে। এরপর তারা বিচূর্ণ করার চেষ্টা করবে। আর আমরাও ধীরে ধীরে সফল বিপ্লবের ধাপগুলো অতিক্রম করতে শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১০. যে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা বেশি বেশি বলেন, তাকে সে বিষয়ের ‘কায়্যেল’ বলা হয়।