📄 বিপ্লবী কর্মসূচিতে সক্রিয় প্রতিরোধের ধাপ
সবরের ধাপ অতিক্রম করার পর সক্রিয় প্রতিরোধ (Active Resistance)-এর ধাপ আসে। আগেই বলেছি, ইসলামি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের জন্য এই ধাপে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুবই নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। রাসূল ﷺ-এর ক্ষেত্রে এই ধাপে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা মোতাবেক ছিল; তাই ভুলের কোনো শঙ্কা ছিল না। কিন্তু ভবিষ্যতে যে আন্দোলনগুলো এগোবে আর এ ধাপে রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন, তাদের সেই সিদ্ধান্ত কিছু ভুলেরও আশঙ্কা থাকবে। নিয়ত ভালো; কিন্তু ভুল হয়েছে—এমতাবস্থায় পার্থিব জীবনে অসফল হলেও পরকালের জীবনে সফলতা নিশ্চিত।
‘তাহরিকে শহিদাইন’ উনিশ শতকের সবচেয়ে বড়ো বিপ্লবী আন্দোলন ছিল। এই আন্দোলনের আসহাব সায়্যিদ আহমাদ বেরলভি রহ.-এর ভুল হয়েছে, তিনি সঠিক সময়ের আগেই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গিয়ে শরিয় আইন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি নিজের হিজরতকে রাসূল ﷺ-এর হিজরতের ওপর অনুমান করে বুঝেছেন যে, যেভাবে হিজরতের পর রাসূল ﷺ শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, একইভাবে রায়বেরেলি থেকে হিজরত করে আমিও তো এখানে চলে এসেছি; সুতরাং এখন শরিয়ত বিধিবিধান জারি করা উচিত। অথচ তিনি এই বিষয়টি খেয়াল করেননি যে, রাসূল ﷺ তো খোদ মাদিনাবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে গিয়েছিলেন, আর তাকে তো কেউ নিজেদের অঞ্চলে এসে শরিয়ত কায়েম করার আহ্বান জানায়নি। এজন্য করণীয় ছিল, কিছু সময় দিয়ে স্থানীয় লোকদের মন-মস্তিষ্ক তৈরি করা। শরিয়তের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা পোক্ত করা। তাদের অন্তরের ঈমান ও শরিয়তের প্রতি ভালোবাসাকে বদ্ধমূল করে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরা পালন করার আগ্রহ প্রকাশপূর্বক গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
সায়্যিদ আহমাদ শহিদ রহ.-এর ভুল হয়েছে; কিন্তু যেহেতু এই ভুল পূর্ণ ইখলাস, একনিষ্ঠতা ও ভালো নিয়তের সঙ্গেই হয়েছে, তাই তিনি আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান পাবেন; যদিও পৃথিবীতে তাদের আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। একই কথা সায়্যিদ মওদুদী ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনিও এক্ষেত্রে ভুল করেছেন। অথচ হিন্দুস্তানে হয়-সাত বছর পর্যন্ত যেই কর্মসূচি তিনি অনুসরণ করেছিলেন, পাকিস্তানে এসে তা পরিবর্তন করেন; অথচ তখনও তা পরিবর্তনের সময় আসেনি। আর এই অবস্থায় তিনি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন যে, হতে পারে নির্বাচনে আমাদের ভোট দেবে এবং নির্বাচনে বিজয়ী হলে আমাদের সরকার সক্ষম হব। যখন সরকার আমাদের হবে, তখন পুরো শাসনব্যবস্থা আর সংবিধানই বদলে দেবো। শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আনা লাগবে। প্রচারমাধ্যমে যেহেতু আমাদের হাত থাকবে, পুরো জাতিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংশোধন করব। তাদের তারবিয়াত প্রদান করব।
বাহ্যিকভাবে এই চিন্তা অনেক আকর্ষণীয় ছিল, যদি নির্বাচনের গলায় ঘণ্টা লাগানো যায়। তো, নির্বাচনের মাধ্যমে সফলতা লাভ করার মরীচিকা যখন তাঁর সামনে আসে, তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত হন। কারণ, এখনও তো এখানকার পরিবেশ পুরোপুরি প্রতিকূলে যায়নি। সবে হাতেগোনা কিছু লোক তাদের দাওয়াত সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এবার আপনিই বলুন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট তারা কীভাবে লাভ করতে পারে? যাই হোক, এমন ভুল হয়ে থাকে। আর এসব ভুলের ফলে আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়; কিন্তু ভুল যদি সৎ ও ভালো নিয়ত থেকে হয়ে থাকে, তাহলে পরকালের প্রতিদান ও সফলতায় কোনো কমতি হবে না।
📄 মদিনায় গৃহীত প্রাথমিক পদক্ষেপ
রাসূল ﷺ হিজরত করে মদিনায় এলেন। তখন আউস ও খাজরাজ গোত্রের প্রায় সংখ্যা দেড়শো লোক ঈমান এনেছিল। অন্যদিকে মক্কা থেকে প্রায় দেড়শোর মতো মুসলিমও ইমানি পরীক্ষা ও মুশরিকদের ভয়াবহ সব নির্যাতন অতিক্রম করে মদিনায় এসেছিলেন। এমন ঘোর পরিস্থিতিতে নবি ﷺ কী দারুণ নির্দেশনা দিয়ে কাজে লাগানোর ব্যাপারে কবি কী দারুণ বলেছেন—
تو خاک میں مل اور آگ میں جل ‘ جب خشت بنے تب کام چلے
ان نام دلوں کے عنصر پر بنیاد نہ رکھ تعمیر نہ کر!
তুমি মাটিতেই মেশো কিংবা আগুনে পুড়ো, ইট হলে তবে তোমার কাজে,
পোক্ত হয়নি—এমন ইটের ওপর কখনও ভিত্তি নির্মাণ কোরো না যে।
এই পরিস্থিতিতে রাসূল ﷺ হিজরতের পর প্রতিরোধের (Active Resistance) সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু ছয় মাসে তিনি নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে কাজ করেন।
প্রথমত, মসজিদে নববি নির্মাণ করেন তিনি, যা ছিল একাধারে ইবাদতগাহ, খানকা ও শিক্ষাকেন্দ্র, পার্লামেন্ট ও পরামর্শকেন্দ্র। এই মসজিদ গভর্নমেন্ট হাউসটার মর্যাদাও রাখত। এখানেই প্রতিনিধি দলগুলোর আগমন হতো। সহজ কথায়, মুসলমানদের একটি কেন্দ্র অস্তিত্বে লাভ করেছিল।
দ্বিতীয়ত, রাসূল ﷺ মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ‘ভ্রাতৃত্বের বন্ধন’ তৈরি করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রত্যেক মুহাজিরকেই আনসারার ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে মদিনার আনসাররা তাদের মুহাজির ভাইদের নিজেদের ঘরে, দোকানে ও উপার্জনের মাধ্যম ছিল, তাতেও শরিক বানিয়ে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রত্যেক আনসারির দুজন স্ত্রী থাকলে একজন মুহাজির ভাইকে তালাক দিয়ে তার সঙ্গে বিবাহ দিত। আনসারার এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে এমন দৃষ্টান্তও কায়েম হয়—আনসাররা নিজেদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের মাঝখানে দেয়াল নির্মাণ করে অর্ধেক তার মুহাজির ভাইকে দান করেন। তারপর নিজে অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক মুহাজির ভাইকে দেন। এমনকি এক আনসারির দুজন স্ত্রী ছিল— তখনও পর্যন্ত পর্দার বিধান নাজিল হয়নি। তিনি নিজের মুহাজির ভাইকে নিয়ে যান। বলেন, ‘এ হচ্ছে আমার দুজন স্ত্রী। এদের যাকে তোমার পছন্দ হয়, ইশারায় বলো আমাকে। আমি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, তুমি বিয়ে করে নিয়ো। আল্লাহর নবি তোমাকে আমার ভাই বানিয়ে দিয়েছেন; তো এটা আমি বরদাশত করতে পারব না যে, আমার দু-জন স্ত্রী থাকবে আর আমার কোনো ঘর-সংসার থাকবে না!’ এ ছিল আনসারি-মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন!
হিজরতের ছয় মাসের মধ্যে রাসূল ﷺ তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেন তা হচ্ছে, মদিনার স্থানীয় ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরোধচুক্তি সম্পন্ন করেন। আল্লামা জে. টেয়নবি ও মন্টগেমরি ওয়াট রাসূল ﷺ-এর দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্র পরিচালন-দক্ষতার (Statesmanship) অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ সাধুবাদ জানিয়েছেন।
মদিনায় ইহুদিদের তিনটি গোত্র আবাদ ছিল। বনু কাইনুকা⁹, বনু নাজির¹⁰ ও বনু কুরাইজা¹¹। যারা স্ট্র্যাটেজিকভাবে অনেক ভালো পজিশনে ছিল। মদিনার বাইরে তাদের ঘাঁটি ও দুর্গ ছিল।
রাসূল ﷺ ‘মিসাকে মদিনা’ নামে তাদের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষামূলক-চুক্তি করেন। বর্তমান সময়ে অনেক আলেমকে দেখা যায়, তারা মিসাকে মদিনা বা মদিনা-চুক্তিকে ইসলামিক রাষ্ট্রের সংবিধান বলে অভিহিত করে; অথচ এটি ছিল প্রচলিত প্রতিরক্ষার একটি চুক্তি মাত্র (Joint Defence Pact)। এতে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, যদি মক্কার মুশরিকরা মদিনার ওপর আক্রমণ করে বসে, তাহলে মুসলিমদের সঙ্গে ইহুদিরাও তা প্রতিরোধ করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর অবস্থান আরও সংহত হয়।
টিকাঃ
৯. বনু কাইনুকা : খ্রিষ্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দীতে মদিনায় বসবাস গাড়ি তিনটি বিখ্যাত ইহুদি গোত্রের একটি। মদিনায় রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে যে প্রতিরোধ চুক্তি করেছিলেন, বদর যুদ্ধের পর তারা তা ভঙ্গ করে। প্রথমে বনু কাইনুকাকে নির্বাসিত করা হয়। এরা গিয়ে খায়বারে বসতি স্থাপন করে। সেখানে পুরো গোত্রের পুরুষদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার দরুন পরবর্তী সময়ে খায়বার থেকে তাদের নারী-সন্তানসহ বহিষ্কার করা হয়। -অনুবাদক
১০. বনু নাজির : ইহুদিদের একটি ইহুদি গোত্র, যারা পিতৃপুরুষদের ভূমি ত্যাগ করে মদিনার উত্তর-পূর্বে বু’আছান উপত্যকায় আবাদ হয়েছিল। উহুদ যুদ্ধের পর এরা মদিনার ভেতর এবং এর আশপাশের মক্কার মুশরিকদের প্ররোচনায় পড়ে এরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূল ﷺ মক্কা থেকে হিজরত সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূল ﷺ মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসার পর ইহুদিদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন, তারা তা ভঙ্গ করে। তারা রাসূল ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল ﷺ তাদের মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করে দেন; কিন্তু তারা তা আমলে নেয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। ৫ ম হিজরিতে তাদেরকে মদিনা থেকে নির্বাসিত করা হয়। তখন কিছু ইহুদি শামে চলে যায় আর কিছু খায়বারে গিয়ে বসবাস শুরু করে। -অনুবাদক
১১. বনু কুরাইজা : মদিনার বিখ্যাত ও প্রাচীন ইহুদি গোত্র, যারা তাদের নিজেদের ভূমি শামে ছেড়ে মদিনার পূর্বে অবস্থিত মাহাজুর উপত্যকায় এসে আবাস গেড়েছিল। ৫ ম হিজরিতে রাসূল ﷺ বনু নাজিরকে যখন নির্বাসিত করেন, তখন বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ না করলেও খন্দকের যুদ্ধের সময় তারা শুধু চুক্তিই ভঙ্গ করেনি; বরং মুশরিকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। খন্দক যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী তাদের অবরোধ করে, যা পুরো এক মাস অব্যাহত থাকে। অবশেষে তারা দুর্গের দরজা খুলে দেয়, সাআদ ইবনে মুআজ রা. তাদের জন্য যে ফয়সালা দেবেন, তা তারা মাথা পেতে নেবে। সাআদ রা. তাদের ব্যাপারে ফয়সালা করেন। সাআদ রা. তাওরাতের বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বনু কুরাইজার সকল যোদ্ধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর তাদের ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। -অনুবাদক
📄 বদর যুদ্ধের পূর্বে পরিচালিত অভিযান
মদিনায় নিজের অবস্থান দৃঢ় করার পর রাসূল ﷺ সক্রিয় প্রতিরোধের ধাপ আরও তীব্রতর করে তোলেন। সামরিক অভিযানের জন্য ছোট ছোট সেনাদল পাঠানো শুরু করেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে তিনি এমন আটটি অভিযানে সেনাদল পাঠিয়েছিলেন; যার মধ্যে চারটিতে রাসূল ﷺ নিজে শরিক হয়েছিলেন আর চারটিতে বিভিন্নজনকে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন। পরিভাষায় যেসব অভিযানে রাসূল ﷺ শরিক হয়েছিলেন, সেগুলোকে ‘গাজওয়া’ আর যেসব অভিযানে তিনি স্বয়ং শরিক হননি, সেগুলোকে ‘সারিয়্যা’ বলা হয়।
এ সময়ে মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। অর্থাৎ, এখন যে পদক্ষেপ (initiative) নেওয়া হয়েছে, তা রাসূল ﷺ-এর পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আমাদের কিছু সিরাতগ্রন্থে যাটিয়েছেন। কারণ, সিরাতগ্রন্থগুলো পাশ্চাত্যে মিডিয়াগুলো প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে যে, ইসলাম আজকাল পশ্চিমা মিডিয়াগুলো প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে যে, ইসলাম একটি রক্তপিপাসু ধর্ম, তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইসলাম সন্ত্রাসবাদের সবক শেখায় ইত্যাদি। একইভাবে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিম বিশ্বের ওপর নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন প্রাচ্যবিদরা ইসলামের বিরুদ্ধে এমন বিষাক্ত অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছে। তো এসবের বিপরীতে আমাদের লেখকরা নমনীয় হয়ে ও জবাবদিহির (Apologetic) বলেন, ‘না না, রাসূল ﷺ নিজে থেকে কোনো যুদ্ধ শুরু করেননি। তিনি তো নিজের প্রতিরক্ষায় লড়েছেন মাত্র’। অথচ তাদের এসব কথা শতভাগ মিথ্যা।
মক্কার অবস্থানে পূর্বেই রাসূল ﷺ-ই কম্পন সৃষ্টি করেছিলেন, যেমনিভাবে হিজরতের পর মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (Active Resistance) আর সর্বশেষ সশস্ত্র পদক্ষেপ (Armed Conflict)-এর সূচনা তিনিই করেছেন।
কবির ভাষায়—
وہ بجلی کا کڑکا تھا یا صوتِ ہادی ‘
عرب کی زمیں جس نے ساری ہلا دی!
তা বজ্রধ্বনি ছিল নাকি পথপ্রদর্শকের (রাসূল ﷺ) আওয়াজ,
আরবের পুরো ভূমিকে প্রকম্পিত করে দিয়েছিল তাঁর কাজ।
বদর যুদ্ধের পূর্বে একবছরের সময়কালে রাসূল ﷺ যে আটটি অভিযান পরিচালনা করেছেন, এর পেছনে থাকা দুটি উদ্দেশ্য বোঝা যায়। আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে প্রথম উদ্দেশ্য ছিল, মক্কার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Blockade) আরোপ করা। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য, কুরাইশদের অন্যদের থেকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন (Isolation Or Political Containment) করে ফেলা।
কুরাইশদের কাফেলাগুলো যে রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করত, রাসূল ﷺ সেগুলো অবরোধ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে দেন। এর দ্বারা তিনি কুরাইশদের এই বার্তা দেন যে, ‘এখন এখানে আমার কর্তৃত্ব চলছে। তোমাদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোও আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকবে না। মক্কা থেকে শামে যেতে হতো বদর হয়ে। বদরের অবস্থান মক্কা থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে। আর মদিনা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৯০ মাইল। কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলো আটকানোর রাসূল ﷺ সেনাদল কয়েকবার ছোট ছোট সেনাদল পাঠান। নিজেও একবার একটি বড়ো সেনাদল নিয়ে যান এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন একটি কাফেলার পিছু নেন; কিন্তু তারা ডানপাশে পালিয়ে যায়।
এমনিভাবে মক্কা থেকে ইয়েমেনগামী কাফেলার পথ ধরে এবং সেদিকেও রাসূল ﷺ একটি সেনাদল পাঠান। এরপর অবস্থা এমন হয় যে, রাসূল ﷺ যেখানেই যান, সেখানকার গোত্রগুলো তাঁর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। হয়তো তারা আগে থেকেই কুরাইশদের মিত্র ছিল, এখন রাসূল ﷺ-এর মিত্র হয়ে গেছে অথবা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ‘আমরা কুরাইশদের বিরুদ্ধে আপনাকে সাহায্য করব, আর না আপনার বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করব। যাই হোক, এই দুই ধরনের কুরাইশদের শক্তি ও প্রতিপত্তিকে ভণ্ডি পড়ে যায়। আর রাসূল ﷺ-ও উপর্যুক্ত দুটি উদ্দেশ্য (অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ) হাসিল সফল হন।
প্রত্যেক জাতির মধ্যে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ের ভাষায় তাদের বর্তমান তাদের স্বভাবের লোকে (Hawks) এবং এর সরল স্বভাবের লোকে (Doves) বলা হয়ে থাকে। মক্কাতেও এই ধরনের মানুষের উপস্থিতি ছিল। গরল, রণগ্রাম ও উগ্র স্বভাবের লোকদের মধ্যে আবু জাহল ও উতবা ইবনে আবু মুয়িত উল্লেখযোগ্য। বিপরীতে সরল, সহনশীল ও নরম স্বভাবের লোকদের মধ্যে উতবা ইবনে রাবিয়া ও হাকিম ইবনে হিজাম উল্লেখযোগ্য। প্রথম শ্রেণির লোকদের কথা ছিল, ‘অনেক হয়েছে! চলো, এবার মদিনায় আক্রমণ করে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের ছিন্নমূল করে দিই’। বিপরীতে শান্তিব্রত শ্রেণি আক্রমণাত্মক কোনো পদক্ষেপের পক্ষে ছিল না।
উতবা ইবনে রবিয়া ছিল বিচক্ষণ মানুষ। রাসূল ﷺ-এর হিজরতের পর সে কুরাইশের লোকদের বলেছিল, ‘দেখো, মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীরা এখান থেকে চলে গেছে (তাদের ভাষায়, আপদ দূর হয়েছে); এখন মদিনায় গিয়েও মুহাম্মাদ আরাম করে তো বসে থাকবে না; বরং নিজের ধর্মের প্রচার করবে। এতে আরবরা তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাবে এবং আরবদের সঙ্গে তার کشمکش (সংঘাত) শুরু হবে।
এরপর আরবের অবশিষ্ট ভূমি যদি মুহাম্মাদ বিজয় করতে সক্ষম হয়, এতে আমাদের ক্ষতি কী? সে তো আমাদেরই কুরাইশি ভাই। তাঁর বিজয় অর্থাৎ আমাদের বিজয়। আর বিজয়ে আমাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যদি আরবরা হাতে মুহাম্মাদ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে যা তোমরা কামনা করছ সেটাই তো হয়ে যাবে; তাও আবার তোমাদের তরবারিকে নিজেদের ভাইদের রক্তে রঞ্জিত করা ছাড়াই। আমাদের ভাই—সে তো নাকি? উসমান কে? উসমান তো বনু উমাইয়ারই একজন নাকি? হামজা কে? আবদুল্লাহ মুত্তালিবেরই তো ছেলে। মুহাম্মাদ কে? আবদুল মুত্তালিবেরই পোতা। তোমায় মুহাম্মাদ আর আরবদের তাদের নিজেদের মধ্যে লড়তে দাও। যদি মুহাম্মাদের বিজয় হয়, তবে সমগ্র আরবে আমাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।’
আসলেই সমগ্র আরবে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খিলাফতে রাশেদার পর সাম্রাজ্যের যুগসেই উমাইয়াদের যুগই ছিল। যাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—বনু উমাইয়া বা বনু আব্বাস—তারা তো আরবেরই ছিল। উতবা এমন গভীর ভাবসম্পন্ন কিন্তু কুরাইশ নেতারা জ্ঞানগর্ভ কথা কর্ণপাত করেনি।
সরল ও নরম স্বভাবের শ্রেণিটার মক্কায় বেশ ভালো প্রভাব ছিল; কিন্তু যখন দুটি ঘটনা ঘটে, যা কল্পনাতীতভাবে গরম ও যুদ্ধবাজ শ্রেণির পাল্লা ভারি করে দেয়। আর এই সরল শ্রেণির লোকেরাও একেবারে চুপসে যায়।
প্রথম ঘটনা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন কাফেলার পিছু নিয়েছিলেন; কিন্তু তারা ডানপাশে বেঁচে যেতে সক্ষম হয়—তারা বিপুল পরিমাণে ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে শামে থেকে ফিরছিল।
আবু সুফিয়ান কুরাইশদের কাছে এ বলে দূত পাঠায় যে, ‘আমি আশঙ্কা করছি, মুহাম্মাদের সঙ্গীরা আমাদের কাফেলার ওপর আক্রমণ করবে এবং লুট করে সবকিছু নিয়ে যাবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব, আমাদের সাহায্যার্থে সেনাবাহিনী পাঠাও’। আবু সুফিয়ানের পাঠানো দূত হস্তদন্ত হয়ে মক্কায় পৌঁছাতে সাহায্য চেয়ে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে সবাইকে বলে, ‘তোমাদের গোত্র, পরিবার ও সম্পদ, সবকিছু মক্কার মধ্যে রয়েছে। তাই এখনই সাহায্যের জন্য তোমাদের রওনা হওয়া উচিত’।
অন্যদিকে দ্বিতীয় যে ঘটনাটি ঘটে তা হচ্ছে, রাসূল ﷺ বারাআজেলনের ছোটো একটি দল তায়েফ ও মক্কা মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে পাঠিয়েছিলেন। আর তাদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেখানে অবস্থান করে মক্কাবাসীর গতিবিধির ওপর নজর রাখো এবং সব সময় করে মক্কাবাসীর গতিবিধির ওপর নজর রাখো এবং সব সময় আমাদের অবহিত করতে থাকো। কিন্তু সেখানে এমন এক পরিস্থিতির তৈরি হয় যে, মক্কার একটি কাফেলার সঙ্গে মুসলিমদের মুখোমুখি হয়ে যায়। একপর্যায়ে এক মুশরিক মারা যায়। মুসলিম দুজন মুশরিক মুসলিমরা বন্দি করে। আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুসলিম দুজন মুশরিককে মুসলিমরা বন্দি করে। আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুসলিমরা কাফেলাটি থেকে প্রাপ্ত বেশুমার গনিমতের সম্পদ নিয়ে রাসূল ﷺ-এর দরবারে হাজির হয়। তাদের এমন কাজে রাসূল ﷺ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। কারণ, তাদের কোনো রকমের সংঘর্ষে জড়ানোর জন্য পাঠানো হয়নি। এখন আর কী করার? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। যে মুশরিক মুসলিমদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, যে মুশরিক মুসলিমদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, সে মক্কায় পৌঁছে গিয়ে তাদের আহত কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে পুরো ঘটনা মক্কায় পৌঁছে সে লোকদের বলবে থাকে, দেখো সবাই! মুহাম্মাদের অনুসারীরা আমার এ কী দশা করেছে, তারা আমাদের লোককদেরও মেরে ফেলেছে!
এই দুটি সংবাদ একই সময়ে মক্কায় পৌঁছায়। একটি উত্তর থেকে, আরেকটি দক্ষিণ থেকে। হিজরতের পর তখনও পর্যন্ত মুশরিকরা আর কোনো মুসলিমকে হত্যা করেনি। হিজরতের আগে সুমাইয়া ও ইয়াসার রা.-কে আবু জাহল শহিদ করেছিল ঠিক, কিন্তু হিজরতের পর মক্কাবাসীর তরফ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
📄 বিপ্লবী কর্মসূচিতে চূড়ান্ত প্রতিরোধের ধাপ
উপরে বর্ণিত দুটি ঘটনার কারণে কুরাইশের সরল ও সহনশীল শ্রেণির লোকেরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। যার ফলে বদর যুদ্ধের মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবের কর্মসূচিতে ষষ্ঠ ধাপ অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রতিরোধের সূচনা হয়ে যায়। এটা রাসূল ﷺ এবং কুরাইশদের মধ্যে দু-তরফা যুদ্ধ ছিল, যা প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত জারি থাকে এবং অষ্টম হিজরিতে হক ও বাতিলের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বদর যুদ্ধে কুরাইশের ৭০ জন নিহত হয়, যার মধ্যে কুরাইশদের বড়ো বড়ো নেতাও ছিল। ১৪ জন মুসলিম শহিদ হন। উহুদ যুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কয়েকজন সাহাবির ভুলের কারণে ৭০ জন সাহাবিকে শহিদ হতে হয়। বিস্তারিত জানতে আমার রচিত গ্রন্থ ‘মানহাজে ইনকিলাবে নববি’ পড়তে পারেন। এখানে আমার আগের আলোচনাগুলোতে সিরাতের রং দিচ্ছি মাত্র। অন্য ভাষায়, সিরাত আলোচনা করছি না; বরং সিরাতের ফলসাফা বা দর্শন আলোচনা করছি।
মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে রাসূল ﷺ-এর ছয় বছরের দীর্ঘকালীন যুদ্ধের ধারা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান থেকে শুরু হয় এবং অষ্টম হিজরির ১০ রমজান মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এই সময়ে মুসলিমদের বহু চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। বিভিন্ন যুদ্ধে সহস্রাধিক সাহাবি শাহাদাতবরণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে রাসূল ﷺ নিজেও আহত হন। তাঁর দাঁত মুবারক শহিদ হয়। তরবারির আঘাতে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া জুড়ে তাঁর কপালের হাড়ে গেঁথে যায়। এক সাহাবি নিজের দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে সেগুলোকে বের করার চেষ্টা করলে তাঁরও দাঁত ভেঙে যায়; কিন্তু কড়াগুলো বের হয়নি। পর কোনোভাবে সেগুলো বের করা হলে রাসূল ﷺ-এর শরীর থেকে রক্তের ফোয়ারা বের হয় যে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। অন্যদিকে সবার মধ্যে প্রচার হয়ে যায়, রাসূল ﷺ শহিদ হয়ে গেছেন।
যে ৭০ জন সাহাবি শহিদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে হামজা রা.-ও ছিলেন। রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে হামজা রা.-এর কয়েক ধরনের সম্পর্ক ছিল। তিনি রাসূল ﷺ-এর চাচা ছিলেন, খালাতো ভাই ছিলেন এবং দুধভাইও ছিলেন। আরবরা দুধভাইকে নিজের সহোদরের মতোই মর্যাদা দিত। আবার তিনি রাসূল ﷺ-এর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুও ছিলেন। ময়দানে যখন তাঁর লাশ পাওয়া যায়, সেটার অবস্থা ছিল গা শিউরে উঠার মতো! নাক-কান কাটা ছিল, বুক চিরে কলিজা চিবানো হয়েছিল! তো, এখানে এসে আপনাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ঘরে বসে বিপ্লব সংঘটিত ও সংঘটিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ কোরবানির পথ পাড়ি দিতে হয়।
রাসূল ﷺ সশস্ত্র আন্দোলনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এর জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাই ছয় বছরের এই সশস্ত্র আন্দোলন মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় পূর্ণতা পায়। সর্বোপরি إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا (সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিদূরিত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা তো বিতাড়িত হয়ে থাকে)—এর প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূল ﷺ আরও যেসব যুদ্ধে লড়েছেন, মিলিটারির পরিভাষায় সেগুলোকে মপিং আপ অপারেশন¹² (Mopping-up Operation) বলা যায়। যার মাধ্যমে বিরোধীশক্তিকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা উদ্দেশ্য ছিল; নতুবা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই কিন্তু আরবে তাঁর বিপ্লবের পূর্ণতা ঘটেছিল।
টিকাঃ
১২. যুদ্ধ শেষে শত্রুবাহিনীর শক্তি সমূলে উৎপাটন করার জন্য যে অভিযান পরিচালনা করা হয় তাকে ‘মপিং-আপ অপারেশন’ বলে।