📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 বিপ্লবী সংগঠন ও তারবিয়াতের নববি পদ্ধতি

📄 বিপ্লবী সংগঠন ও তারবিয়াতের নববি পদ্ধতি


তারবিয়াতের জন্য চারটি বিষয় সবিশেষ লক্ষণীয়, যার ব্যাপারে আমি তারবিয়াত প্রসঙ্গে আগের আলোচনায় মোটামুটি আভাস দিয়েছি। এখানে আরও কিছুটা বিস্তারিত বলছি।

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, বিপ্লবের যে দর্শন—সব সময় তা মন ও মননে ধারণ করতে হবে। রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবী দর্শন ও চিন্তাধারার মূল উৎস ছিল কুরআন। সেই ধারাবাহিকতায় আজও যে ইসলামি আন্দোলন পরিচালিত হবে, তারও মূল উৎস হবে এ কুরআনই। ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে কুরআন পাঠ করতে হবে এবং এই পাঠ অব্যাহত রাখতে হবে, যেন বিপ্লবের দর্শন ও সব সময় চর্চিত হতে থাকে। এর জন্য কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনারও ব্যবস্থা করা যায়, যাকে পরিভাষায় ‘মুজাকারা’ বলে। কর্মীরা একসঙ্গে বা ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বসবে। তারপর কুরআন পড়বে, শিখবে ও শেখাবে। এর সবচেয়ে বড়ো ফায়দা এটাই যে, তাদের ভেতরে লালন করা বিপ্লবী দর্শন ও সর্বদা সতেজ এবং জাগরূক থাকবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, ‘শোনা এবং মানা’। এক্ষেত্রে কর্মীদের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা হলো, তাদের কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়, তারপরও কোনো প্রতিরোধ করা যাবে না। দেখুন, একজন ব্যক্তি যখন বুঝতে পারছে—এরা আমাকে হত্যা করবে, তখন বেচারি দিশেহারা (desperate) হয়ে প্রথমে দু-চারজনকে মেরে তারপর নিজে মরবে। একটা বিড়ালকেও দেখুন না! যখন কোনো বিড়ালকে কোণঠাসা (corner) করে ফেলবেন আর বিড়ালটিও বুঝতে পারবে, এখন তার জন্য হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই, তখন সে সোজা আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠিক এখানে বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ অবস্থায় প্রতিরোধের কোনো সুযোগ নেই।

সায়্যিদ শাবাব ইবনে আরত রা.-কে আগুনের অঙ্গার বিছিয়ে তাতে শুইয়ে দেওয়া হয়। এই কঠিন প্রতিরোধ করা ছাড়াই তা সইতে থাকেন। পিঠের চামড়া জ্বলে যায়। চর্বি গলে যায়। বিগলিত চর্বিতে অঙ্গার পর্যন্ত নিভে যায়। একটু ভেবে দেখুন তো! আপনি যদি দেখতেন আপনার বাপকে আগুনে ঝলসে দেওয়া হচ্ছে, তখন আপনি কী করতেন? নিশ্চয় দু-চারজনকে মেরেই ফেলতেন? কিন্তু ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের তারবিয়াতের এই অধ্যায়ে এসবের অনুমতি নেই। এ পর্যায়ে কোনো প্রতিরোধ চলবে না। আমার মতে, শোনা ও মানার ক্ষেত্রে এরচেয়ে ওজনদার ও কঠিন আর কোনো রূপ হতেই পারে না।

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, নিজের জানমাল ও সন্তানসন্ততি থেকে শুরু করে নিজের সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার মানসিকতা থাকতে হবে। এমনিতেই পৃথিবীতে বিপ্লবী চিন্তাধারা থেকে সংগঠিত দলগুলো লোকেরা এসব উৎসর্গ করে থাকে। কমিউনিস্ট বিপ্লব কখনও সংগঠিত হতো না, যদি লোকেরা জানমাল উৎসর্গ না করত, সব ধরনের দুঃখ সইতে মাথা পেতে না নিত। বিপরীতে মুসলমানদের জন্য এরচেয়ে বড়ো দর্শন আর কী হতে পারে?

আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জানমালের কোরবানি পেশ করা তো সহজ, অন্যদের পক্ষে তা কল্পনা করাও কঠিন। কারণ, মুসলিমরা পরকালের জীবনে বিশ্বাসী। তাদের কাছে পরকালের জীবনই আসল জীবন। তারা যদি আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সবকিছু কোরবানি করে দেয়, এতে তাদের লোকসানের কোনো চিন্তা নেই। তাদের তো বিশ্বাসই হচ্ছে এমন যে, ‘পৃথিবীতে আমি যা কিছু কোরবানি পেশ করব, আখিরাতে তার অনেক গুণ সওয়াব পাব, হাজার গুণ বেশি পাব। সুতরাং এতে লোকসানের তো প্রশ্নই আসে না!’

পরকালে একজন ব্যক্তির পুরস্কার যখন এত মজবুত হবে, সে আল্লাহর রাস্তায় নিজের সবকিছু উৎসর্গ করার প্রতি তত বেশি তৎপর হবে। কারণ, আমার জানা মতে, পৃথিবীতে যা কিছুই খরচ করব, পরকালের জীবনে আমি তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি লাভ করব; এরপরও যদি আমি নিজের প্রিয়গুলো আল্লাহর রাস্তায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উৎসর্গ না করি, তাহলে আমার চেয়ে বেশি বোকা ও হতভাগা আর কে হতে পারে? ব্যাপক অর্থে পৃথিবীতে এমন কোনো দর্শন নেই যা পরকালের এমন মুনাফা দেয়; কিন্তু আল্লাহর বান্দার পক্ষে পড়ে আছে—যা আমাকে সওয়াবের এমন মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তো এরপরও আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে এত বেশি কার্পণ্য কেন? যেমনটা নবি ﷺ বলেছেন, ‘জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না।’

পৃথিবীতে কিছু সংস্করণ করা যাবে না। এখানে পোকামাকড়ের লিন্স নিচু করা যাবে। পূর্ব-পশ্চিমেরও নষ্ট করতে পারবে না, স্থির আমারও নেই। আর তোমাদের একটি পরামর্শ দিয়ে যাই, যা তোমাদের কাজে আসবে। মনে রাখবে—যেখানে তোমাদের সম্পদ হবে, তোমাদের মন-দিলও সেখানে পড়ে থাকবে।

তোমরা যদি পৃথিবীতে ধনসম্পদ সঞ্চয় করো, তাহলে তোমাদের মন ও দিল এখানে আঁটকে পড়ে থাকবে। যখন ফেরেশতারা জান কবজ করতে আসবে, তখন হতাশা আর আফসোস ছাড়া কিছুই থাকবে না। হাদিসে এসেছে, ফেরেশতারা এমনভাবে জান কবজ করবে, যেভাবে গরম সিক থেকে ভেজা চামড়া টেন বের করা হয়। এর বিপরীতে আপনার সম্পদ যদি আল্লাহর ব্যাংকে জমা হয়, তাহলে আপনার অন্তরও সেখানে লেগে থাকবে। মৃত্যুর সময় যখন আপনার অগ্রদূতের মতো ফেরেশতারা আসবে, তখন আপনার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি লেগে থাকবে। কবির ভাষায়—

نشان مرد مومن با تو گویم – چو مرگ آید تبسم بر لب اوست

একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় বলছি তোমায় আমি, ঠোঁটে মুচকি হাসি রেখেই শেষ হয় তার জিন্দেগানি।

দেখুন, বিষয়টি বোঝার জন্য আরও সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন তো, আপনি যদি টাকা সুইস ব্যাংকে জমা রেখে আসেন, তখন আপনার তো কোনো আফসোস হবে না, ‘হায় দেশে কেন এলাম?’ দেশ থেকে আপনার কোনো মোহ থাকবে না। আপনার কোনো অর্থমন্ত্রী না থাকে, কোনো দেশীয় মানুষও থাকে আর এরই মধ্যে আপনাকে বলা হয়, ‘যাও, দেশ থেকে বেরিয়ে যাও!’, তখন নিশ্চয় আপনি অনেক খুশি হবেন। এটা মূলত পরকালের প্রতি বিশ্বাসেরই ফল, যা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মুমিনদের মুখে হাসি আনে; তাই তো তারা ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়া, বসনিয়া ও আফগানিস্তানে মুসলমানদের জানের কোরবানি দেখেও বলে, ‘মুসলমানদের এমন হাল যে, তারা নিজের জানের কোরবানি পেশ করতে পর্যন্ত কোনো পরোয়া করে না!’ এসব যে পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসেরই আলামত—এতে সন্দেহ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

যখন মাওলানা মওদুদী রহ.-কে মৃত্যুর সাজা শোনানো হচ্ছিল, তখন আমি ইসলামি জমিয়তে তালাবার প্রধান দায়িত্বশীল ছিলাম। ‘আজম’-দৃঢ় প্রত্যয়, অটুট মনোবল ও অবিচলতা নিয়ে রচিত কবিতাটি ছাপিয়ে আমি মাওলানার কাছে কারাগারে পাঠিয়েছিলাম—

وہ وقت آیا کہ ہم کو قدرت ہماری سعی و عمل کا پھل دے
بتا رہی ہے یہ ظلمت شب کہ صبح نزدیک آ رہی ہے
ابھی کہیں امتحان باقی، فلاکتوں کے نشان باقی
قدم نہ پیچھے ہٹیں کہ قیمت ابھی پہلی آ رہی ہے
سپاہیوں سے حزیں نہ ہونا، فسوں سے اندوہ گیں نہ ہونا
اندوہ پردے میں زندگی کی نئی سحر جگمگا رہی ہے
ریش اہل نظر سے کہ دو کہ وہ آزمائش پہ جی نہ ہاریں
جسے سمجھتے تھے آزمایش وہی تو بیگانگی رہی ہے!

সে সময়ও আসবে, কুদরত আমাদের মেহনতের ফল দেবে।
লোকেরা বলছে, প্রভাত নিকটবর্তী, এ রাতের তমসাও বিদূরিত হবে।
এখনও বাকি আছে কিছু ইমতিহান, বাকি দুর্ভাগ্যের বহু নিশান,
পিছু হটবে না হে মুসাফির, বাকি আজও কিছু নিয়তির দাস্তান।
বিচলিত হবে না আঁধারে, হবে না হতাশার ভারে কৃষ্ণকায়,
আওয়াজ দিচ্ছে, রাতের কালো এ পর্দার আড়ালেই আছে জীবনের প্রভাত।

তার বলছে, যুগসচেতন সেই নেতাকে বলে দাও, বিপদে যেন তারাভ্রান্ত না হয়,
কারণ, যাকে এতদিন পরীক্ষা ভাবত, তা-ই হচ্ছে জীবনের এক কঠিন সময়।

এটি রইস আমরহার কবিতা। রইসের আসল নগর’ (যুগসচেতনতা)—এর ছন্দেও আমি একটি ছন্দ করেছিলাম।

রাসূল ﷺ-এর মেহনতে আধ্যাত্মিক তারবিয়াতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আধ্যাত্মিকতা তৈরির সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হচ্ছে কুরআন। এর মাধ্যমে কুরআনকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তার মাধ্যমে বিপ্লবীদের হৃদয়ে আগুন প্রজ্বলিত করা হয়েছিল। এরই সঙ্গে তাহাজ্জুদের মাধ্যমে তাদের আত্মিক বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করারও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ আরও প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছিল এবং তাহাজ্জুদে কুরআনকে নিজেদের হৃদয়ের গভীরে স্থান দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন—

يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِّصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا

হে বস্ত্রাবৃত! রাতে ইবাদতের জন্য দাঁড়ান; তবে কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক বা তার চেয়ে কিছুটা কম। অথবা তার চেয়ে একটু বাড়ান। আর সময় আপনি তারতিলের সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত করুন। নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি এক অতি ওজনদার বাণীর ভারি নাযিল করছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাত্রিজাগরণ আত্মসংযমের জন্য অধিকতর প্রবল এবং জবানের জন্য খুব উপযোগী। (সূরা মুযযাম্মিল : ১-৬)

কুরআন তো এমনিতেই নূর, যা অন্তরের যাবতীয় অন্ধকার দূর করে তা আলোকিত করার শক্তি রাখে। আর রাত্রিজাগরণ প্রবৃত্তিকে দমন করার ক্ষেত্রে খুবই প্রভাবক সাব্যস্ত হয়। তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধির জন্য তৃতীয় যে বিষয়টি খুব উৎসাহিত করা হয়েছে তা হলো, আল্লাহর রাস্তায় ধনসম্পদ ব্যয় করা।

তারবিয়াত প্রসঙ্গে এতক্ষণ যা কিছু বলেছি, এগুলো ছিল রাসূল ﷺ-এর তারবিয়াত প্রদানের তরিকা। আমাদের এখানে পরবর্তী সময়ে তারবিয়াতের যে তরিকা অস্তিত্বে এসেছে, তাতে তারবিয়াত ও খানকাকেন্দ্রিক যে তরিকা অনুসৃত রীতিনীতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাদের সেই মুরাকাবা, চিল্লা ও জিকিরের নিয়মনীতি কিছুটা ভিন্নতর। আমি সেই তরিকার কথা বলছি না। আমি সুলুকে মুহাম্মাদির কথা বলছি। বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য যেই তারবিয়াত প্রয়োজন, সেই তারবিয়াতের কথা বলছি, যা রাসূল ﷺ তাঁর প্রিয় সাহাবিদের প্রদান করেছিলেন। প্রিয় পাঠক! মোটাদাগে আমি সেই তারবিয়াতের মূল উপাদানগুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

টিকাঃ
৭. ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে, সুস্পষ্ট উচ্চারণে, অর্থের দিকে মনোযোগী হয়ে কুরআন পড়াকে ‘তারতিল’ বলে।

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবী কর্মসূচিতে সবরের ধাপ

📄 রাসূল সা.-এর বিপ্লবী কর্মসূচিতে সবরের ধাপ


আগেই বলেছিলাম, সবরের ধাপের সূচনা হয় দাঈর ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে; যার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, দাঈর ইচ্ছাশক্তি নষ্ট করে দেওয়া। তিন বছর পর্যন্ত রাসূল ﷺ একা মক্কার মুশরিকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। প্রথমে এই আক্রমণ ধরন ছিল মৌখিক। কেউ বলছে, আরে! এ তো পাগল হয়ে গেছে! কেউ বলছে, আমাদের বাপ-দাদাদের বোকা বলছে! সেখানে গিয়ে এভাবে কয়েকদিন করে অবস্থান না করতে। আমাদের তো মনে হয়, সেখানে তার ওপর কোনো দানব আছর করেছে কিংবা তাকে জিনে ধরেছে। আবার কেউ বলছে, সে জাদুকর হয়ে গেছে, জাদুকর হয়ে গেছে। এসব ছিল রাসূল ﷺ-এর ব্যক্তিত্বহরণ (Character assassination) এবং তাঁর ইচ্ছাশক্তি নিঃশেষ করার অপচেষ্টা। মনে করবেন না যে, এসব জবানি আক্রমণে রাসূল ﷺ কষ্ট পেতেন না। কুরআন সাক্ষ্য দেয়—

وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ

হে নবি! আমি জানি, -তারা যা বলে, তাতে আপনার বক্ষ সংকুচিত হয়ে যায়। ( সূরা হিজর : ৯৭)

আমি জানি, তাদের বলা কথায় আপনি কষ্ট পান, ব্যথিত হয় আপনার হৃদয় আর এটা ভেবে আপনার বক্ষ সংকুচিত হয়ে যায় যে, একসময় যারা আমাকে আস-সাদিক (সত্যবাদী) ও আল-আমিন (পরম আমানতদার) বলে ডাকত, আজ তারাই আমাকে জাদুকর বলে মিথ্যুক বলছে! আমার ওপর মিথ্যারও প্রতারণার অপবাদ দিচ্ছে; কিন্তু এমন অবস্থায়ও রাসূল ﷺ-এর ওপর নির্দেশ ছিল—

وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا

তারা যা কিছু বলছে, এর ওপর আপনি সবর করুন। আর উত্তমভাবে তাদের পরিত্যাগ করুন। (সূরা মুযযাম্মিল : ১০)

সুন্দরভাবে আপনার কথা পরিবর্তন করে ফেলুন। তাদের ছেড়ে তাদের অন্যায়ের সঙ্গে আপোস এড়াবেন; কিন্তু তাদের থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। কারণ, হতে পারে আজ যে ব্যক্তি আপনার কথায় কর্ণপাত করছে না, কাল সে-ই আপনার কথা শোনার জন্য আগ্রহ দেখাবে।

এভাবে তিন বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। তিন বছর পর মুশরিকরা উপলব্ধি করতে পারে, এ তো পাহাড়ের মতো অটল-অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একমনে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। উল্টোটা আমাদের দায়িত্ব বাড়িয়ে চলেছে। প্রথম আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, আমাদের নতুন প্রজন্ম তার আশপাশে একত্রিত হচ্ছে। এই বনু উমাইয়ার চোখের মণি উসমান পর্যন্ত তার দলে শামিল হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড়ো আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আমাদের দাসরা তার ওপর ঈমান নিয়ে আসছে। এখন ভয়ংকর অবস্থা। দাসরা তার ওপর ঈমানের আলোতে এতই মগ্ন হয়ে পড়ছে যে, কোথাও এর বিরুদ্ধে গুঞ্জনজাত করা হচ্ছে আর সেই গুঞ্জনের দিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

উভয় আশঙ্কার দাসরা যদি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের ওপর জুলুমের প্রতিশোধ নিতে শুরু করে দেয়, তাহলে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াবে? এসব উপলব্ধি থেকেই এবার তারা শারীরিক নির্যাতনের (Physical Persecution) পথ বেছে নেয়। যারাই মুহাম্মাদ ﷺ-এর অনুসারী হচ্ছে, তাদের ওপরই নির্যাতন শুরু নেমে আসছে। নির্যাতনকে পাঠানো হচ্ছে, নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, আবার অনেককে তো শেকলবদ্ধও করে রাখা হচ্ছে। আর দাস হলে তো কথাই নেই; নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। নির্মম নির্যাতনের পাঠানো হচ্ছে এবং শেকলে বেঁধে গালিতে-গালিতে টানাটাঁড়ি করা হচ্ছে।

সুমাইয়া ও ইয়াসার রা.-এর ওপর নির্মম ও ভয়ানক নির্যাতন করে আরজু জাহল তাদের শহিদ করে দেয়। যুবক ছেলে আম্মার ইবনে ইয়াসারকে স্থূলিতে বেঁধে তার সামনে সুমাইয়া রা.-কে বর্শা বিদ্ধ করে নির্যাতন চালানো হয়। এরপরও করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন বলে—একবার হলেও বলো যে, ‘তোমাদের উপাস্য সত্য, তাহলে তোমাদের ছেড়ে দেবো’। এই কথা শুনে আবু জাহলের মুখের ওপর থুথু নিক্ষেপ করেন তারা। এরপর ক্রুদ্ধ আবু জাহল সুমাইয়া রা. এর লজ্জাস্থানে বর্শা দিয়ে আঘাত করে, যা তাঁর শরীরকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ইয়াসার রা.-এর শরীরকে চারটি ভিন্ন উটের সঙ্গে বেঁধে সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন দিকে দৌড় দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আর পুরো শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু এমন করুণ ও ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ ছিল, صَبْرًا ‘এখনও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখো!’

এর পেছনের ফলাফল বা কারণ কী, তা আমরা আগেই করেছি। এখানে আবারও তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। প্রথমত, মুসলিমদের সংখ্যা তখন কম। তখন যদি তারা কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করত, তাহলে মুশরিকরা তাদের সমূলে উপড়ে ফেলত; অথচ একটি শক্তি হয়ে আবির্ভূত হওয়ার জন্য তখনও তাদের প্রয়োজন ছিল সময়ের। দ্বিতীয়ত, এভাবে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে তারা সাধারণ জনগণের সহানুভূতি লাভ করছিল। বিলাল রা.-এর গলায় রশি দিয়ে টানাটাঁড়ি করতে বলত। যেমনটা সঙ্গীতে সময়ে আবু গরিবের বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা যখন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো দেখে বন্দিদের বিবস্ত্র করে গলায় রশি বেঁধে নির্মমভাবে টানাটাঁড়ি করতে দেখা যাচ্ছে।

বিলাল রা.-এর এমন আচরণ মক্কার অলিতে-গলিতে করা হয়েছে। রৌদ্রতপ্ত পাথুরে ভূমিতে তাকে এমনভাবে টানাটাঁড়ি করা হতো, তদানীন্তন সময়ে কোনো জানোয়ারের লাশকেও হয়তো তেমনটা করা হতো না। সাধারণ মানুষ এই দৃশ্য দেখত আর ভাবত, বিলালের সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হচ্ছে? সে কি চুরি করেছে কিংবা ডাকাতি তার মনিবের মেয়ের ইজ্জত হরণ করেছে? তারা জানত, এমন কিছুই হয়নি। বিলালের একমাত্র অপরাধ হচ্ছে, সে বলত— ‘আল্লাহ এক এবং মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর রাসূল’। এর ফায়দা ছিল ব্যাপক। কোনো ধরনের প্রচারণা না করে এমন সায়্যের মাধ্যমে তাদের ধারণা মানুষের মনে সহানুভূতি ও প্রভাব তৈরি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছিল।

এখানে একটি বিষয় কেউ কেউ করে না যে, নবুয়্যতের দশ বছর পর্যন্ত রাসূল ﷺ-এর ওপর কেউ হাত উঠাতে পারেনি। আর কারণ হচ্ছে তখন রাসূল ﷺ নিজের গোত্র বনু হাশিমের আশ্রয়ে ছিলেন। যদি বনু হাশিমের সবাই ঈমান আনেনি—তাদের মধ্যে আবু লাহাবের মতো নিকৃষ্ট दुश्मनও ছিল—কিন্তু বনু হাশিমের সরদার আবু তালিব; যিনি রাসূল ﷺ-এর সুরক্ষায় নিশ্চিত করেছিলেন। তখনকার সময়ে তাদের গোত্রের রীতি ছিল, গোত্রের সরদার যাকে নিরাপত্তা দেবে, পুরো গোত্র তা একবাক্যে মেনে নেবে। এ কারণেই মক্কার মুশরিকরা যখন বনু হাশিমকে তিন বছর পর্যন্ত ‘বয়কট’ করে রাখে তখন শুধু মুসলিমরাই নয়; বরং পুরো গোত্রই সেই অবরোধের আওতায় পড়েছিল। আর আবু তালিবের কারণে মক্কার মুশরিকদের দাবি ছিল, তিনি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করে দেন। এতে তারা সরাসরি তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পারবে। আর আবু তালিব তাদের দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

নবুয়্যতের দশম বছর আবু তালিবের মৃত্যু হয়। একই বছর খাদিজা রা.-ও ইন্তেকাল করেন। রাসূল ﷺ যখন প্রাপ্ত-পরিণত হয়ে ঘরে আসতেন, মানুষের গোলমন্দের কারণে যখন বিরক্ত হতেন, তখন নিজের নয়নাভিরাম নির্বেদনা ও মহত্ত্বের শ্রী যাদিয়ার উপস্থিত প্রশান্তি পেতেন। সেই প্রশান্তির ছায়াতলে আল্লাহ তায়ালাও তুলে নেন। অন্যদিকে আবু তালিব গোত্রগতভাবে তাঁকে দিয়ে আসছিলেন, তাঁর ছায়াও উঠে যায়। এই বছরকে রাসূল ﷺ ‘আমুল হুজন’ বা ‘দুঃখের বছর’ বলে অভিহিত করেন। আল্লাহর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাসূল ﷺ-এর গোত্রীয় সুরক্ষা শেষ হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে মূলত দারুণ নাদানওয়া মুহাম্মাদ ﷺ-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরামর্শ দেওয়া হয়, নির্দিষ্ট কেউ এ হত্যাকাণ্ডের ঘটাবে না। কারণ, তাতে করে পুরো বনু হাশিম হত্যকারীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। তাই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সব গোত্র থেকে একজন করে যুবককে নেওয়া হবে, যারা একসঙ্গে আক্রমণ করবে। তাতে এটা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে যাবে, কে তাকে হত্যা করেছে। আর এতগুলো গোত্রের মানুষের বিরুদ্ধে বনু হাশিম কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না।

মক্কার ভূমি সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে রাসূল ﷺ তায়েফ সফর করেন। সেখানকার কোনো আমির বা সরদার ঈমান আনলে প্রত্যাশা ছিল, সেখানকার কোনো আমির বা সরদার ঈমান আনলে মক্কা ছেড়ে তিনি তায়েফকেই দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র বানাবেন। মক্কা ছেড়ে তিনি তায়েফকেই দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র বানাবেন। এর সঙ্গে এমনটা ভেবেছিলেন, ঠিক সেখানে রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে এমনটা তিনদিনে যা কিছু হয়েছে, মক্কার দশ বছরেও তা হয়নি। রাসূল ﷺ-এর ওপর পাথর বর্ষণ করা হয়েছে, তাকে ভয়াবহ নির্যাতনের নিশানা বানানো হয়েছে এবং পুরো দেহ মুবারক রক্তে রঞ্জিত করা হয়েছে। এ সময় রাসূল ﷺ-এর হৃদয়ের গভীর থেকে যে ফরিয়াদ বের হয়েছিল, তা বলতেও বুক কেঁপে ওঠে—

اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي وَقِلَّةَ حِيلَتِي وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ. إِلَى مَنْ تَكِلُنِي؟ إِلَى بَعِيدٍ يَتَجَهَّمُنِي أَوْ إِلَى عَدُوٍّ مَلَّكْتَهُ أَمْرِي؟ إِنْ لَمْ يَكُنْ عَلَيَّ غَضَبُكَ فَلَا أُبَالِي أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ

হে আল্লাহ! কোথায় যাব আর কার কাছে ফরিয়াদ করব! আপনার দরবারেই ফরিয়াদ করছি নিজের শক্তি ও উপকরণের স্বল্পতার জন্য, জনসম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া নিয়ে!

হে আল্লাহ! আমাকে আপনি কাদের হাওয়ালা করছেন? আমাকে কি আপনি दुश्मনদের হাওয়ালা করে দিচ্ছেন যে—তাদের যা ইচ্ছা আমার সঙ্গে করতে পারবে?

পরওয়ারদিগার! যদি এতই আপনার সন্তুষ্টি হয়, আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হন, তাহলে আমিও সন্তুষ্ট। এসব জুলুম-নির্যাতনের আমিও কোনো পরোয়া করি না।

হে রব! আমি আপনার সত্তার নূরের আশ্রয় নিচ্ছি, যার মাধ্যমে অন্ধকার বিদূরিত হয়ে যাবে আর সবকিছু আলোকিত হয়ে যাবে।

এরচেয়ে গভীর কোনো ফরিয়াদ হতে পারে? দেখুন, রাসূল ﷺ-এর দুটি মাকাম (মর্যাদা) আছে। মাকামে আবদিয়্যাত আর মাকামে রিসালাত। অর্থাৎ একটি হচ্ছে, আল্লাহর বান্দা হওয়ার মর্যাদা। আরেকটি হচ্ছে রাসূল হওয়ার মর্যাদা। ওপরের ফরিয়াদে তাঁর মাকামে আবদিয়্যাতে প্রবলতা লাভ করেছে, যাতে فَلَا أُبَالِي—অর্থাৎ যদি এতেই আপনি আমার ওপর সন্তুষ্ট না হন, তবে আমিও কোনো পরোয়া করি না। পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

টিকাঃ
১. এই বয়কট ‘শি’বে আবু তালিব’- বা ‘শি’বে বানি হাশিম’-এর ঘটনা হিসেবে প্রসিদ্ধ। -অনুবাদক

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 বিপ্লবী কর্মসূচিতে সক্রিয় প্রতিরোধের ধাপ

📄 বিপ্লবী কর্মসূচিতে সক্রিয় প্রতিরোধের ধাপ


সবরের ধাপ অতিক্রম করার পর সক্রিয় প্রতিরোধ (Active Resistance)-এর ধাপ আসে। আগেই বলেছি, ইসলামি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের জন্য এই ধাপে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুবই নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। রাসূল ﷺ-এর ক্ষেত্রে এই ধাপে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা মোতাবেক ছিল; তাই ভুলের কোনো শঙ্কা ছিল না। কিন্তু ভবিষ্যতে যে আন্দোলনগুলো এগোবে আর এ ধাপে রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন, তাদের সেই সিদ্ধান্ত কিছু ভুলেরও আশঙ্কা থাকবে। নিয়ত ভালো; কিন্তু ভুল হয়েছে—এমতাবস্থায় পার্থিব জীবনে অসফল হলেও পরকালের জীবনে সফলতা নিশ্চিত।

‘তাহরিকে শহিদাইন’ উনিশ শতকের সবচেয়ে বড়ো বিপ্লবী আন্দোলন ছিল। এই আন্দোলনের আসহাব সায়্যিদ আহমাদ বেরলভি রহ.-এর ভুল হয়েছে, তিনি সঠিক সময়ের আগেই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গিয়ে শরিয় আইন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি নিজের হিজরতকে রাসূল ﷺ-এর হিজরতের ওপর অনুমান করে বুঝেছেন যে, যেভাবে হিজরতের পর রাসূল ﷺ শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, একইভাবে রায়বেরেলি থেকে হিজরত করে আমিও তো এখানে চলে এসেছি; সুতরাং এখন শরিয়ত বিধিবিধান জারি করা উচিত। অথচ তিনি এই বিষয়টি খেয়াল করেননি যে, রাসূল ﷺ তো খোদ মাদিনাবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে গিয়েছিলেন, আর তাকে তো কেউ নিজেদের অঞ্চলে এসে শরিয়ত কায়েম করার আহ্বান জানায়নি। এজন্য করণীয় ছিল, কিছু সময় দিয়ে স্থানীয় লোকদের মন-মস্তিষ্ক তৈরি করা। শরিয়তের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা পোক্ত করা। তাদের অন্তরের ঈমান ও শরিয়তের প্রতি ভালোবাসাকে বদ্ধমূল করে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরা পালন করার আগ্রহ প্রকাশপূর্বক গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

সায়্যিদ আহমাদ শহিদ রহ.-এর ভুল হয়েছে; কিন্তু যেহেতু এই ভুল পূর্ণ ইখলাস, একনিষ্ঠতা ও ভালো নিয়তের সঙ্গেই হয়েছে, তাই তিনি আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান পাবেন; যদিও পৃথিবীতে তাদের আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। একই কথা সায়্যিদ মওদুদী ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনিও এক্ষেত্রে ভুল করেছেন। অথচ হিন্দুস্তানে হয়-সাত বছর পর্যন্ত যেই কর্মসূচি তিনি অনুসরণ করেছিলেন, পাকিস্তানে এসে তা পরিবর্তন করেন; অথচ তখনও তা পরিবর্তনের সময় আসেনি। আর এই অবস্থায় তিনি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন যে, হতে পারে নির্বাচনে আমাদের ভোট দেবে এবং নির্বাচনে বিজয়ী হলে আমাদের সরকার সক্ষম হব। যখন সরকার আমাদের হবে, তখন পুরো শাসনব্যবস্থা আর সংবিধানই বদলে দেবো। শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আনা লাগবে। প্রচারমাধ্যমে যেহেতু আমাদের হাত থাকবে, পুরো জাতিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংশোধন করব। তাদের তারবিয়াত প্রদান করব।

বাহ্যিকভাবে এই চিন্তা অনেক আকর্ষণীয় ছিল, যদি নির্বাচনের গলায় ঘণ্টা লাগানো যায়। তো, নির্বাচনের মাধ্যমে সফলতা লাভ করার মরীচিকা যখন তাঁর সামনে আসে, তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত হন। কারণ, এখনও তো এখানকার পরিবেশ পুরোপুরি প্রতিকূলে যায়নি। সবে হাতেগোনা কিছু লোক তাদের দাওয়াত সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এবার আপনিই বলুন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট তারা কীভাবে লাভ করতে পারে? যাই হোক, এমন ভুল হয়ে থাকে। আর এসব ভুলের ফলে আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়; কিন্তু ভুল যদি সৎ ও ভালো নিয়ত থেকে হয়ে থাকে, তাহলে পরকালের প্রতিদান ও সফলতায় কোনো কমতি হবে না।

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 মদিনায় গৃহীত প্রাথমিক পদক্ষেপ

📄 মদিনায় গৃহীত প্রাথমিক পদক্ষেপ


রাসূল ﷺ হিজরত করে মদিনায় এলেন। তখন আউস ও খাজরাজ গোত্রের প্রায় সংখ্যা দেড়শো লোক ঈমান এনেছিল। অন্যদিকে মক্কা থেকে প্রায় দেড়শোর মতো মুসলিমও ইমানি পরীক্ষা ও মুশরিকদের ভয়াবহ সব নির্যাতন অতিক্রম করে মদিনায় এসেছিলেন। এমন ঘোর পরিস্থিতিতে নবি ﷺ কী দারুণ নির্দেশনা দিয়ে কাজে লাগানোর ব্যাপারে কবি কী দারুণ বলেছেন—

تو خاک میں مل اور آگ میں جل ‘ جب خشت بنے تب کام چلے
ان نام دلوں کے عنصر پر بنیاد نہ رکھ تعمیر نہ کر!

তুমি মাটিতেই মেশো কিংবা আগুনে পুড়ো, ইট হলে তবে তোমার কাজে,
পোক্ত হয়নি—এমন ইটের ওপর কখনও ভিত্তি নির্মাণ কোরো না যে।

এই পরিস্থিতিতে রাসূল ﷺ হিজরতের পর প্রতিরোধের (Active Resistance) সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু ছয় মাসে তিনি নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে কাজ করেন।

প্রথমত, মসজিদে নববি নির্মাণ করেন তিনি, যা ছিল একাধারে ইবাদতগাহ, খানকা ও শিক্ষাকেন্দ্র, পার্লামেন্ট ও পরামর্শকেন্দ্র। এই মসজিদ গভর্নমেন্ট হাউসটার মর্যাদাও রাখত। এখানেই প্রতিনিধি দলগুলোর আগমন হতো। সহজ কথায়, মুসলমানদের একটি কেন্দ্র অস্তিত্বে লাভ করেছিল।

দ্বিতীয়ত, রাসূল ﷺ মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ‘ভ্রাতৃত্বের বন্ধন’ তৈরি করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রত্যেক মুহাজিরকেই আনসারার ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে মদিনার আনসাররা তাদের মুহাজির ভাইদের নিজেদের ঘরে, দোকানে ও উপার্জনের মাধ্যম ছিল, তাতেও শরিক বানিয়ে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রত্যেক আনসারির দুজন স্ত্রী থাকলে একজন মুহাজির ভাইকে তালাক দিয়ে তার সঙ্গে বিবাহ দিত। আনসারার এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে এমন দৃষ্টান্তও কায়েম হয়—আনসাররা নিজেদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের মাঝখানে দেয়াল নির্মাণ করে অর্ধেক তার মুহাজির ভাইকে দান করেন। তারপর নিজে অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক মুহাজির ভাইকে দেন। এমনকি এক আনসারির দুজন স্ত্রী ছিল— তখনও পর্যন্ত পর্দার বিধান নাজিল হয়নি। তিনি নিজের মুহাজির ভাইকে নিয়ে যান। বলেন, ‘এ হচ্ছে আমার দুজন স্ত্রী। এদের যাকে তোমার পছন্দ হয়, ইশারায় বলো আমাকে। আমি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, তুমি বিয়ে করে নিয়ো। আল্লাহর নবি তোমাকে আমার ভাই বানিয়ে দিয়েছেন; তো এটা আমি বরদাশত করতে পারব না যে, আমার দু-জন স্ত্রী থাকবে আর আমার কোনো ঘর-সংসার থাকবে না!’ এ ছিল আনসারি-মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন!

হিজরতের ছয় মাসের মধ্যে রাসূল ﷺ তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেন তা হচ্ছে, মদিনার স্থানীয় ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরোধচুক্তি সম্পন্ন করেন। আল্লামা জে. টেয়নবি ও মন্টগেমরি ওয়াট রাসূল ﷺ-এর দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্র পরিচালন-দক্ষতার (Statesmanship) অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ সাধুবাদ জানিয়েছেন।

মদিনায় ইহুদিদের তিনটি গোত্র আবাদ ছিল। বনু কাইনুকা⁹, বনু নাজির¹⁰ ও বনু কুরাইজা¹¹। যারা স্ট্র‍্যাটেজিকভাবে অনেক ভালো পজিশনে ছিল। মদিনার বাইরে তাদের ঘাঁটি ও দুর্গ ছিল।

রাসূল ﷺ ‘মিসাকে মদিনা’ নামে তাদের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষামূলক-চুক্তি করেন। বর্তমান সময়ে অনেক আলেমকে দেখা যায়, তারা মিসাকে মদিনা বা মদিনা-চুক্তিকে ইসলামিক রাষ্ট্রের সংবিধান বলে অভিহিত করে; অথচ এটি ছিল প্রচলিত প্রতিরক্ষার একটি চুক্তি মাত্র (Joint Defence Pact)। এতে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, যদি মক্কার মুশরিকরা মদিনার ওপর আক্রমণ করে বসে, তাহলে মুসলিমদের সঙ্গে ইহুদিরাও তা প্রতিরোধ করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে রাসূল ﷺ-এর অবস্থান আরও সংহত হয়।

টিকাঃ
৯. বনু কাইনুকা : খ্রিষ্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দীতে মদিনায় বসবাস গাড়ি তিনটি বিখ্যাত ইহুদি গোত্রের একটি। মদিনায় রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে যে প্রতিরোধ চুক্তি করেছিলেন, বদর যুদ্ধের পর তারা তা ভঙ্গ করে। প্রথমে বনু কাইনুকাকে নির্বাসিত করা হয়। এরা গিয়ে খায়বারে বসতি স্থাপন করে। সেখানে পুরো গোত্রের পুরুষদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার দরুন পরবর্তী সময়ে খায়বার থেকে তাদের নারী-সন্তানসহ বহিষ্কার করা হয়। -অনুবাদক
১০. বনু নাজির : ইহুদিদের একটি ইহুদি গোত্র, যারা পিতৃপুরুষদের ভূমি ত্যাগ করে মদিনার উত্তর-পূর্বে বু’আছান উপত্যকায় আবাদ হয়েছিল। উহুদ যুদ্ধের পর এরা মদিনার ভেতর এবং এর আশপাশের মক্কার মুশরিকদের প্ররোচনায় পড়ে এরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূল ﷺ মক্কা থেকে হিজরত সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূল ﷺ মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসার পর ইহুদিদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন, তারা তা ভঙ্গ করে। তারা রাসূল ﷺ-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল ﷺ তাদের মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করে দেন; কিন্তু তারা তা আমলে নেয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। ৫ ম হিজরিতে তাদেরকে মদিনা থেকে নির্বাসিত করা হয়। তখন কিছু ইহুদি শামে চলে যায় আর কিছু খায়বারে গিয়ে বসবাস শুরু করে। -অনুবাদক
১১. বনু কুরাইজা : মদিনার বিখ্যাত ও প্রাচীন ইহুদি গোত্র, যারা তাদের নিজেদের ভূমি শামে ছেড়ে মদিনার পূর্বে অবস্থিত মাহাজুর উপত্যকায় এসে আবাস গেড়েছিল। ৫ ম হিজরিতে রাসূল ﷺ বনু নাজিরকে যখন নির্বাসিত করেন, তখন বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ না করলেও খন্দকের যুদ্ধের সময় তারা শুধু চুক্তিই ভঙ্গ করেনি; বরং মুশরিকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। খন্দক যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী তাদের অবরোধ করে, যা পুরো এক মাস অব্যাহত থাকে। অবশেষে তারা দুর্গের দরজা খুলে দেয়, সাআদ ইবনে মুআজ রা. তাদের জন্য যে ফয়সালা দেবেন, তা তারা মাথা পেতে নেবে। সাআদ রা. তাদের ব্যাপারে ফয়সালা করেন। সাআদ রা. তাওরাতের বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বনু কুরাইজার সকল যোদ্ধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর তাদের ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। -অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00