📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 পূর্ণ সমতা

📄 পূর্ণ সমতা


সামাজিকভাবে তাওহিদের দাবি হচ্ছে—মালিকতাকে বঞ্চনা বা জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান। উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। এই প্রসঙ্গে হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের সাক্ষ্য তো আমরা পেশ করেছি। তিনি বলেন, “যদিও ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও স্বাধীনতার নীতিকথা পৃথিবীতে বহুকাল আগেও অনেক দেওয়া হয়েছিল এবং এমন উপদেশমূলক কথা আমরা মাসিহের উপদেশমালাতেও প্রচুর পেয়ে থাকি। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে যে, মুহাম্মদই এমন মনীষী, যিনি মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এই মূলনীতিগুলোর ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।”
মুসলিম সমাজে যদি কোনো ভেদাভেদ থেকে থাকে, তবে তা ব্যক্তির গুণের ওপর নির্ভর করে হয়। যদি আপনি ইলম হাসিল করে থাকেন, তবে আপনি সবার কাছে সম্মানিত হিসেবে বরিত হবেন। আপনি তাকওয়া অর্জন করে থাকেন, আধ্যাত্মিক মাকাম হাসিল করেন; তবে সবাই আপনাকে সম্মানের চোখে দেখবে, মর্যাদাবান জ্ঞান করবে। কারণ, ইসলামের সৌন্দর্য ও সুমহান আদর্শ হচ্ছে, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ—‘তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বড়ো মুত্তাকি, তিনিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত’। জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান। অদ্ভুত বা ব্রাহ্মণ, সাদা অথবা কালো, নারী কিংবা পুরুষ— কোনো পার্থক্য নেই। তবে হ্যাঁ, নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য শরিয়ত বলেছে, তা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। যেমন দেখুন, কোনো বিভাগের ইনচার্জ আর তার বাইরে বা ভেতরে দায়িত্ব পালন করা কর্মচারীর মধ্যে মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে কোনো পার্থক্য আছে? নেই। পদপদবি ও কাজের ধরনের দিক থেকে পার্থক্য আছে, তাই না? একইভাবে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে হোক বা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে হোক; নওব্বা মানুষ হিসেবে দুজনই সমান। মানবিক সম্মান ও অধিকারের দিক থেকে হোক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি।
আমাদের এখানে সাধারণের মধ্যে এমন সমতা দৃষ্টিকোণ হয়। সবাই একই ধরনের পোশাক পরে। বড়ো জমিদার হোক অথবা তার চাকরবাকর—উভয় শ্রেণির পোশাকই একই ধরনের হয়। এমনকি তারা তারা খাবারও একসঙ্গে বসে খায়। যার জুড়ি, আরবদের মধ্যেও সমতার এমন নজির পাওয়া যায়। লাঞ্চটাইমে দারোয়ান ও ড্রাইভার—দুজনই মিনিস্টারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার করে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, নারী-পুরুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। কুরআনের ভাষায়—
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক। (সূরা নিসা : ৩৪)
অর্থাৎ, পুরুষরা পরিবারের পরিচালকের মর্যাদাপ্রাপ্ত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ মর্যাদাবান আর নারীর কোনো মর্যাদা নেই। কারণ, এমনও হতে পারে, কোনো নারী নিজের অবদান ও কৃতিত্বের বিচারে হাজারো পুরুষকে ছাড়িয়ে মর্যাদার সর্বোচ্চ আরোহণ করতে সক্ষম হবে। আচ্ছা বলুন তো, এমন পুরুষের সংখ্যা কি আমরা গণনা করে শেষ করতে পারব, যারা মারইয়াম, আসিয়া, খাদিজা, আয়িশা, ফাতিমা রা. প্রমুখের সমান সম্মান ও মাহাত্ম্যের উচ্চতাকে এমনভাবে দেখে, যেভাবে কেউ আকাশ দেখে।
তাহলে তাওহিদের দর্শন থেকে আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক এই তিনটি প্রধানত ফল দেখতে পাই :
এক. হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য। জমিনের শাসনভারের ক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা প্রতিনিধির বেশি কিছু নয়। একে পরিভাষায় আমরা ‘খিলাফত’ বলি।
দুই. অর্থব্যবস্থায় মালিকানা বলতে যা বোঝায়, তা কেবল আল্লাহরই। বান্দার কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু তার কাছে আল্লাহর আমানত। একে আমরা ‘আমানত’ বলতে পারি।
তিন. সমাজের সব মানুষের মধ্যে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে কোনো মর্যাদাগত পার্থক্য নেই। একে পরিভাষায় ‘মুসাওয়াত’ বলা হয়। একে আমরা ‘সমতা’ বলে অভিহিত করতে পারি।
রাসূল ﷺ মক্কার অলিতে-গলিতে ঘুরেফিরে তাওহিদের এই দর্শনই প্রচার করেছেন। বলেছেন—يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا—‘হে লোকসকল! বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তবেই তোমরা সফল হবে’। দাওয়াতের প্রাথমিক ধাপে রাসূল ﷺ শুধু নিজের রিসালাতের কথাও খুব একটা বলেননি। সর্বোচ্চ জোর (emphasis) তাওহিদের ওপর দিয়েছেন। বিপ্লবী এই দর্শনের প্রচার-প্রসারে রাসূল ﷺ যে অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সব ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি তাওহিদের দাওয়াতও পেশ করেছেন। এরপর সবার নিজের বংশের (বনু হাশিম) লোকদের অপমানের জন্য ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। শুধুমাত্র তো তারা কথাই শোনেনি, কটূক্তি করে বসে। বিভিন্ন সময়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। উৎপীড়নের মধ্যে শুধু গালিই নয়; যদিও তিনি এর আগেই সমাপ্ত হয়েছিলেন।
আলি রা. দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলেরعلان, ‘যদিও আমার চোখের মধ্যে এখনও পাতলা, যদিও আমার ছোটো, দুটো তখনও শীর্ণ, কিন্তু আমি আপনাকে দাওয়াতে সাড়া দিচ্ছি।

সামাজিকভাবে তাওহীদের দাবি হচ্ছে—মালিকের বচন বা জাতিগতভাবে সকল মানুষ সমান। উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। এই প্রসঙ্গে হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের সাক্ষ্য আমি আগেই পেশ করেছি। তিনি বলেন, “যদিও ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও স্বাধীনতার নীতি কথা পৃথিবীতে বহুকাল আগেও অনেক দেওয়া হয়েছিল এবং উপদেশমূলক কথা আমরা মাসিহের উপদেশমালাতেও প্রচুর পেয়ে থাকি। কিন্তু এটা অস্বীকার্য যে, মুহাম্মাদই এমন মনীষী, যিনি মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এই মূলনীতিগুলোর ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।”

মুসলিম সমাজে যদি কোনো ভেদাভেদ থেকে থাকে, তবে তা ব্যক্তির গুণের ওপর নির্ভর করে হয়। যদি আপনি ইলম হাসিল করেন, তবে আপনি সবার কাছে সম্মানিত হিসেবে বরিত হবেন। আপনি তাকওয়া অর্জন করলে, আধ্যাত্মিক মাকাম হাসিল করলে; তবে সবাই আপনাকে সম্মানের চোখে দেখবে, মর্যাদাবান জ্ঞান করবে। কারণ, ইসলামের সৌন্দর্য ও সুমহান আদর্শ হচ্ছে, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ —‘তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বড় মুত্তাকি, তিনিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানীয়’। জাতিগতভাবে সকল মানুষ সমান। অদ্ভুত বা ব্রাহ্মণ, সাদা অথবা কালো, নারী কিংবা পুরুষ— কোনো পার্থক্য নেই। তবে হ্যাঁ, নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য শরিয়ত বলেছে, তা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। যেমন দেখুন, কোনো বিভাগের ইনচার্জ আর তার বাইরে বা অধীনে দায়িত্ব পালন করা কর্মচারীর মধ্যে মানুষ হিসেবে মৌলিকভাবে কোনো পার্থক্য আছে? নেই। পদপদবি ও কাজের ধরনের দিক থেকে পার্থক্য আছে, তাই না? এটা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে পার্থক্য। ঠিক তেমনি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি। নতুবা মানুষ হিসেবে দুজনই তৈরি সমান। মানবিক সম্মান ও অধিকারের দিক থেকে ইসলাম দুজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি।

আমাদের এখানে সাধারণত পদে আর এমন সমতা দৃশ্যমান হয়। সবাই একই ধরনের পোশাক পরে। বড় জমিদার হোক অথবা তার চাকরবাকর—উভয় শ্রেণির পোশাকই একই ধরনের হয়। এমনকি তারা খাবারও একসঙ্গে বসে খায়। যাদব গুনেছি, আরবদের মধ্যেও সমতার এমন নজির পাওয়া যায়। লাঞ্চটাইমে দারোয়ান ও ড্রাইভার—দুজনেই মিনিস্টারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার করে।

তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, নারী-পুরুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ব্যবস্থাপনার দিক থেকে। কুরআনের ভাষায়—

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক। ( সূরা নিসা : ৩৪)

অর্থাৎ, পুরুষরা পরিবারের পরিচালকের মর্যাদাপ্রাপ্ত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ মর্যাদাবান আর নারীর কোনো মর্যাদা নেই। কারণ, এমনও হতে পারে, কোনো নারী নিজের অবদান ও কৃতিত্বের বিচারে হাজারো পুরুষকে ছাড়িয়ে মর্যাদার সর্বোচ্চ আরোহণ করতে সক্ষম হবে। আচ্ছা বলুন তো, এমন পুরুষের সংখ্যা কি আমরা গণনা করে শেষ করতে পারব, যারা মারইয়াম, আসিয়া, খাদিজা, আয়িশা, ফাতিমা রা. প্রমুখের সমান সম্মান ও মাহাত্ম্যের উচ্চতাকে এমনভাবে দেখে, যেভাবে কেউ আকাশ দেখে?

তাহলে তাওহীদের দর্শন থেকে আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক এই তিনটি প্রধানতম ফল দেখতে পাই:

এক. হাকিমিয়্যাহ তথা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য। জমিনের শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা প্রতিনিধির বেশি কিছু নয়। একে পরিভাষায় আমরা ‘খিলাফত’ বলি।

দুই. ধনসম্পদের মালিকানা বলতে যা বোঝায়, তা কেবল আল্লাহরই। বান্দার কাছে যা কিছু আছে, সবকিছু তার কাছে আল্লাহর আমানত। একে আমরা ‘আমানত’ বলতে পারি।

তিন. সমাজের সব মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, জাতিগতভাবে মানুষের মধ্যে কোনো মর্যাদাগত পার্থক্য নেই। একে পরিভাষায় ‘মুসাওয়াত’ বলা হয়। একে আমরা ‘সমতা’ বলে অভিহিত করতে পারি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00