📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 তারবিয়াত

📄 তারবিয়াত


তৃতীয় ধাপ হচ্ছে, কর্মীদের তারবিয়াত। এই ধাপে সংগঠনের কর্মীরা বিপ্লবের যে দর্শন লালন করে, নিজেদের মন ও মনন থেকে কুফরের বিপ্লবের জন্য তা-বিচ্যুত হতে দেবে না। কারণ, এ দর্শনই তো বিপ্লবের জন্য চালিয়ে যাওয়ার যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টার ভিত্তি। এই আদর্শ সামগ্রিক মননে সমুজ্জ্বল থাকলে কাজের প্রেরণা ও উদ্দীপনা জাগ্রত থাকবে। আর যখনই তা ঝিমিয়ে পড়বে, কাজের আগ্রহও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
একইসঙ্গে কর্মীদের ‘শোনো ও মানো’—মূলনীতিতে অভ্যস্ত বানাতে হবে। এ কাজ খুব সহজ নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির। কবির ভাষায়—
خم ہیں تسلیم خم کی جو عادت پڑی
بے نیازی تری عادت ہی سہی
আমরাও নিজেদের সমর্পিত করার অভ্যাস গড়ে তুলব। হোক না—কারও প্রতি অমুখাপেক্ষিতা তোমার স্বভাবেরই অংশ।
কিন্তু মানার অভ্যাস তৈরি করা সহজ কোনো কাজ নয়। এতে আমিষ বাধা সাথে; বরং আমিষ থেকেও আগে বেড়ে চলা অহংকার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সফল বিপ্লবের জন্য তারবিয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আন্দোলনের কর্মীদের ভেতর জানমাল থেকে শুরু করে সবকিছু উৎসর্গ করার জয়বা ও মানসিকতা তৈরি করা। এ ছাড়া বিপ্লব সংঘটিত করা সম্ভব নয়। আল্লামা ইকবালের ভাষায়—
تو بچا بچا کے نہ رکھ اسے ترا آئنہ ہے وہ آئنہ
کہ شکستہ ہو تو عزیز تر ہے نگاہ آئنہ ساز میں!
এত যত্ন করে রেখো না, এ তো তোমার আয়না, অন্য কিছু নয়। তাও আবার এমন আয়না—ভেঙে গেলে পরে আয়নার কারিগরই সবচেয়ে বেশি খুশি হয়।
জানমাল উৎসর্গ করার জয়বা ও মানসিকতা—এটি বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিপ্লবের মাধ্যমে যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান—তাতে যদি আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতার দিকটিতেও সর্বোচ্চ লক্ষণীয় হয়, তাহলে কর্মীদের আধ্যাত্মিক তারবিয়াতও দিতে হবে। কারণ, কর্মীদের মধ্যে যদি আধ্যাত্মিকতা না থাকে, তবে বিপ্লবের মধ্যে আভিজাত্য ও পরিপক্বতা কোত্থেকে আসবে?

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 সবর

📄 সবর


৪. সবর (Passive Resistance)
এই ধাপটি বলার ক্ষেত্রে তো তার নম্বর আসে; কিন্তু বাস্তবে এর সূচনা প্রথম ধাপের সঙ্গেই হয়ে যায়। সবর বা ধৈর্যের অর্থ হচ্ছে— সংগঠনের কর্মীরা নিজেদের অবস্থানে ওপর অবিচল থাকবে, কোনো অবস্থাতেই পিছু হটবে না। বিশেষ করে, যখন কঠোরতা ও নির্যাতনের ঝড় নেমে আসবে, তখন সবরের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে; কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।
এর পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য যৌক্তিক (logical)। প্রথম কথা হচ্ছে, সমাজে বিরাজ বিরোধ (conflict) সৃষ্টিকারী হচ্ছে এই বিপ্লবীরা; নতুবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তো স্বাভাবিকই ছিল। ধনী-গরিব সবার উপস্থিতি ছিল। গরিবরা তাদের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল। ধনীরা আরাম-আয়েশে মত্ত ছিল আর গরিবরা নিজেদের জীবনধারণা সচল রাখার মেহনতে ব্যস্ত ছিল। তারা সবকিছুকে নিজেদের ‘তাকদির’ মনে করত আর বলত, আল্লাহই তো আমাদের গরিব বানিয়েছেন! এ জন্যই হয়তো মার্কস বলেছিল, ‘ধর্ম হচ্ছে জনসাধারণের জন্য আফিম’। ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই মূলত তারা নিজেদের অবস্থার সন্তুষ্ট থাকে; বিপ্লবের কথা চিন্তাও আসে না। শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা তো দূরের কথা।
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, একটি শান্ত-সরবহীন পুকুরে আপনি নিক্ষেপ করলেন; এতে কী হবে? পুকুরের পানিতে সৃষ্টি হবে কম্পন। ঠিক একইভাবে ইসলামি বিপ্লবের প্রচারার্থীরাও আগে থেকে চলে আসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। আর প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে যে গোলন্দ আছে, তারা কোনোরকম রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বলতে শুরু করে। শাসনব্যবস্থার শোষণমূলক (exploitative), সাধারণ মানুষ এটা তাদের মুখেই শুনতে পায়। তো বলা যায়, বিপ্লবের প্রচারীরা ইসলামি আন্দোলনে এই কর্মপন্থার মূলত জনসাধারণের মধ্যে একটি বৈষম্য (discrimination) তৈরি করে। তারাই জনগণের একটি অংশকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিয়ে যায়।
তাহলে আগের কথাগুলো থেকে আবার বলুন, পাথর কারা মেরেছে? বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীরা! এখন পাথর যখন পুকুরে পড়বে, তো সমাজকে যে তরঙ্গ তৈরি হয়, এ তো পড়বে, তরঙ্গ তো হবেই। তো সমাজে যে তরঙ্গ তৈরি হয়, এ তো বিপ্লবের দিকে দাওয়াতর স্বভাবগত প্রতিক্রিয়া। তবে হ্যাঁ, এই প্রতিক্রিয়ার রূপান্তরও কিন্তু বিভিন্ন পর্যায় (stages) হয়ে থাকে। তন্মধ্যে দুটি পর্যায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম পর্যায়ে আমি শক্তি বিপ্লবের দিকে আহ্বানকারীরা অর্থাৎ দিকে দাওয়াতকে কমসংখ্যক বিবেচিত করে কোনো কোনোকে তার ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতিবৃত্তিকভাবে প্রচার শুরু করে; তার ওই মিথ্যা ও ভিত্তিহীনভাবে পর্যন্ত তাকে দায়িত্বকে, আক্রমণ ও নিপীড়নের (persecution) শিকার হতে হয়। কায়েমি শক্তি প্রথমে দিকে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া মৌখিকভাবে এই আক্রমণ করে যে, ‘আরে! শক্তি প্রয়োগ ছাড়া এটা তো পাগল, অপ্রকৃতিস্থ। আমাদের চলমান ব্যবস্থার ওপর আপত্তি করছে। শাসন বা সমাজব্যবস্থা তো শতাব্দীর থেকে চলে আসছে।
আমাদের বাপ-দাদারাও এই ব্যবস্থার প্রতি অনুগত ছিল। আর এই পাগল কিনা সেই ব্যবস্থাকে গলদ বলছে! নিশ্চয় একে কোনো জিন-ভূতে ধরেছে।'
বাস্তবিকভাবে এটা তাদের একটা কূটকৌশল। যার আশ্রয় নিয়ে তারা ইচ্ছাকৃত নিগ্রহ করে চেষ্টা করে। কারণ, একজন দাইর যদি ইচ্ছাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তাকে দিয়ে ময়দানে আর কোনো কাজ হবে না। একটি বৃক্ষের শিকড়ই যখন কেটে দেওয়া হয়, তখন পুরো বৃক্ষ তো এমনিতেই ছিন্নমূল হয়ে যায়।
কিন্তু এই পর্যায়ে যদি অটুট মনোবলে সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে যান, নিজের ওপর আরোপিত সব আপত্তি ও অপবাদ সহ্য করে যান, কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নেন আর একইসঙ্গে বিরোধীপক্ষের প্রতাপকে যে দায়িত্ব তো দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে, প্রসারিত হচ্ছে; তখন শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের রিঅ্যাকশন। অর্থাৎ, তারা আগের অবস্থা থেকে অগ্রসর হয়ে এবার দাইদের শারীরিকভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের নিশানা বানায়। এই দফায় কিন্তু তাদের শিকার শুধু আন্দোলনের আহ্বায়কই হন না; বরং আন্দোলনের সব সদস্য, কর্মী ও সমর্থকরাও হন। বিশেষ করে, নিঃস্ব দুর্বল জনসাধারণ এবং উচ্চবিত্ত ঘরানার যুবকরা তাদের শিকারের পরিণত হয়। আন্দোলনের সমর্থকদের ধরে ধরে মাখনের মতো রাখা হয়, ক্ষুধার্ত রাখা হয়, কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, হত্যা করা হয়; এমনকি ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে হাজারে হাজারে কর্মীদের শহিদ পর্যন্ত করে দেওয়া হয়।

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 সক্রিয় প্রতিরোধ

📄 সক্রিয় প্রতিরোধ


বিপ্লবের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতার পঞ্চম ধাপটি হচ্ছে, ‘সক্রিয় প্রতিরোধ’। এটি ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের জন্য খুবই নাজুক একটি বিষয়। আর যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের জন্য মেধা ও যোগ্যতার পরীক্ষার ব্যাপার। এই ধাপটির জন্য সঠিক সময় বাছাই করতে পারা খুবই জরুরি। যদি প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যান, তাহলে আপনাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পরও যদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেরি হয়, তাহলে সুযোগ হারাবেন।
তাহলে বোঝা গেল, যদি আপনি সুযোগ হারান, তাহলেও ব্যর্থ হবেন। আবার যদি সঠিক সময়ের আগেই পদক্ষেপ নিয়ে বসেন, তাহলেও ব্যর্থ হবেন। মূলত, প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত তখনই নিতে হবে, যখন ইসলামি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ অনুভব করবেন যে, এখন আমাদের প্রস্তুতি যথেষ্ট! এই ‘যথেষ্ট’-এর রূপ একেক অবস্থায় একেক রকম হবে। যেমন দেখুন, ছোট্টো একটি দেশ—যার জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কোটির মতো, সেখানে ইসলামি বিপ্লবের জন্য ৫০ হাজার লোক প্রস্তুত থাকলে সেটাই ‘যথেষ্ট’ বলে সাব্যস্ত হবে। বিপরীতে ১৫ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৩-৪ লক্ষের মতো প্রশিক্ষপ্রাপ্ত কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে।
এরপরের কথা হচ্ছে, শুধু এ সংখ্যক কর্মী প্রস্তুত হলেই হবে না; তাদের ডিসিপ্লিনের অনুগামী বানাতে হবে। ‘Listen and Obey’ মূলনীতির কাছে নিজেদের ইচ্ছাকে বিলীন করতে শেখাতে হবে; যাতে যখনই তাদের প্রতি ওপর থেকে নির্দেশ আসবে, সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে যাবে। আর যখন থামতে বলা হবে, কোনোরকম আপত্তি না ভেবেই থেমে যাবে। তাদের অবস্থা এমন হলে চলবে না যে, প্রথমে তো নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য কাজেই নামতে চাইবে না আর যখন নেমে পড়বে, আর থামার নাম নেবে না।
মালাকুনদে সুফি মুহাম্মদ সাহেবের নেতৃত্বে যে ‘তাহরিকে নাফাযে শরিয়তে মুহাম্মদি’ বা ইসলামি শরিয়ত প্রতিষ্ঠা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে আমার (নেতৃস্থানীয়) নির্দেশই দেননি; কিন্তু কর্মীরা মাঠে নেমে পড়েছে। এরপর কী হয়েছিল? কুল্লিয়্যতে উঠতে না পেরে কর্মীরা পাহাড়ে মোর্চা বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। আমির যখন ওপর থেকে কর্মীদের পাহাড় থেকে নেমে আসার নির্দেশ দেন, তখন তারা বলতে শুরু করে—‘মৌলভি কায়েমি শক্তির কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে’। এ থেকে বোঝা যায়, এটি সুশৃঙ্খল কোনো সংগঠন ছিল না। কর্মীদের মধ্যে ছিল না ডিসিপ্লিন; বরং এটি একটি আকস্মিক উত্থান বা জনসমাগম মাত্র—যার মূল চালিকাশক্তি ছিল মানুষের জযবা।
৪. মাওলানা সুফি মুহাম্মদ : পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ ইসলামি আন্দোলন ‘মালাকুন্দ ডিভিশন’-এর আমির এবং ‘তাহরিকে নাফাযে শরিয়তে মুহাম্মদি’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার আগে তিনি জামায়াতে ইসলামি পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ২০০১ সালে আমেরিকা আফগানে হামলা করে, তিনি তখন প্রায় ১০ হাজার সাথিসহ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কাবুলের পতন হলে তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন। এরপর ২০০৯ সালে তাঁর ও জামাতা মাওলানা ফজলুল্লাহর ছাত্র আরও আবারও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। তা শান্ত করার জন্য পাকিস্তান সরকার সুফি মুহাম্মদকে সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে তাকে মুক্তি দেয় এবং তাঁর দাবি মেনে সেখানে ইসলামি আদালত পুনরায় চালু করে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে যায়। এর ফলে ২০০৯ সালে সুফি মুহাম্মদকে আবারও বন্দি করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে অপ্রত্যাশিত কারণে পেশাওয়ার হাইকোর্ট তাকে জামিনে মুক্তি দেয়। ২০১৯ সালের ১১ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। —অনুবাদক
এই ধাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্দোলনের কর্মীরা নিজেদের জানমাল থেকে শুরু করে সবকিছু কুরবানি করার জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে। মনে রাখবেন, কুরবানি করার বিষয়গুলো মোলাকাতের পূর্ণতা পাবে, কেবল যখন উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো আন্দোলনের ধৈর্যধারণের (Passive Resistance) ধাপ থেকে সক্রিয় প্রতিরোধের (Active Resistance) ধাপে উন্নীত হতে পারবে; এর আগে? প্রশ্নই আসে না!
এবার আসুন, সক্রিয় প্রতিরোধ (Active Resistance)-এর ব্যাপারে আরও সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করি। এর জন্যও আমি বাইরের উদাহরণ দেবো; আপাতত রাসূল ﷺ-এর সিরাত থেকে কোনো উদাহরণ দেবো না। কারণ, আগেই বলেছি—প্রথমে আপনাদের সামনে আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করে একটি খসড়া আলোচনা পেশ করব। তারপর সেই আলোচনাটি সিরাতুন নবি ﷺ-এর রঙে সাজিয়ে দেবো। পাশাপাশি আপনাদের এটাও মনে রাখতে হবে, আমার মতে—সফল বিপ্লবের রূপরেখা জানার ও বোঝার জন্য সিরাতুন নবি ছাড়া বিকল্প কোনো মাধ্যম নেই এবং তা হতেই পারে না।
সক্রিয় প্রতিরোধ (Active Resistance) হচ্ছে, আপনি কায়েমি শক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না জানিয়ে চলমান ব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট রঙকে অচল করে দিন। যেমন দেখুন, গান্ধি ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথমে ‘স্বদেশি’ করার বা ‘না’ স্লোগান তুলেছিলেন। অর্থাৎ, আমরা বাড়াবাড়ি করব না, হাতাহাতিও যাব না। আমার আমার ব্রিটেনের কলকারখানায় বানানো কাপড়ও পরব না; বরং নিজেদের চরকায় সুতো কেটে সেই সুতোয় পোশাক বানিয়ে পরব। চরকাতে তারা নিজেদের ‘জাতীয় নিশান’ বানিয়ে ফেলল। একটু খেয়াল করে তো দেখুন! এই আধুনিক বিংশ শতাব্দীতে একটি জাতি নিজেদের জাতীয় নিশান বানিয়েছে চরকাকে।
বিষয়টি বুঝে থাকলে এবার বলুন, তারা কি ব্রিটিশ প্রশাসনের দিকে সরাসরি কোনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে কিংবা তাদের কোনো ক্ষতি করেছে? তারা কারও জানমালের কোনো ক্ষতি করেনি, তারপরও প্রশাসনের কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেছে। কারণ, ভারতীয়রা এমন সিদ্ধান্তে ম্যানচেস্টারের কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ হতে শুরু করে। ওদিকে সময়ে ভারতে ইংরেজদের উৎপাদিত কাপড়ের অনেক বড়ো বাজার ছিল। ব্রিটেন থেকে অনেক গরম কাপড় ও মসলমানের চাহিদা ছিল; কিন্তু গান্ধির বয়কট আন্দোলনের পর সেখানে শুধু কাপড়ই বিক্রি হতে লাগল।৫
এটি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধের (Active Resistance) এর প্রথম পদক্ষেপ। এর দ্বারা ইংরেজরা বুঝে গিয়েছিল, এবার কিন্তু একটা হতে যাচ্ছে। ইংরেজবিরোধী এই আন্দোলনের দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল—‘আমরা বাড়াবাড়ি করব না, মারামারি করব না; কিন্তু ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত নিয়মও মানব না’। এর উদাহরণ দেখুন, পরমাণু সমুদ্র লবণ উৎপাদন করত। ভারতীয়রা সিদ্ধান্ত নেয়, তারা পরমাণু সমুদ্র থেকে লবণ আহরণ করবে। এতে কিন্তু তারা কারও সঙ্গে বাড়াবাড়ি করছে না ঠিক; কিন্তু পরোক্ষভাবে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত ‘করণীতি’-কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কারণ, তদানীন্তন সময়ে লবণের ওপর ইংরেজরা অনির্দিষ্ট কর আরোপ করেছিল। ভারতীয়রা এই পদক্ষেপের ফল হয়, তাদের পিঠের ওপর লাঠির আঘাত পড়ে। বড়ো বড়ো নেতাদের মাথা ফাটে। অনেককে কারাবন্দি করা হয়; কিন্তু গান্ধি আন্দোলনের কর্মীরা কোনো বাড়াবাড়ি তোয়াক্কা করেনি। কোনো ধরনের প্রতিরোধও জানায়নি। কারও জানমালের ক্ষতিও করেনি।

টিকাঃ
৫. দেশে তৈরি একধরনের মোটা কাপড়।

📘 দীন কায়েমের নববী রূপরেখা > 📄 চূড়ান্ত পদক্ষেপ

📄 চূড়ান্ত পদক্ষেপ


সক্রিয় প্রতিরোধের ষষ্ঠ ও শেষ ধাপ হচ্ছে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। অর্থাৎ, বর্তমান কায়েমি শক্তি ও তার সদস্যদের সঙ্গে ইসলামি আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মীরা চূড়ান্ত দফায় যাবে। কারণ, যখনই আপনি সক্রিয় প্রতিরোধ শুরু করবেন, তখনই পরিস্থিতি এমন হবে—যেন আপনি পুরো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপকদের চ্যালেঞ্জ করে বসেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী শক্তি ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের পুরোপুরিভাবে মূলোৎপাটন করতে লেগে লাগবে। ঠিক তখনই কিন্তু ইসলামি আন্দোলন এ চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে। তবে হ্যাঁ, সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হলেই কিন্তু ইসলামি আন্দোলনের সফলতার মুখ দেখবে। জালিমরা যদি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। সাংগঠনিক বিপ্লবের জন্য চিত্রকলা প্রস্তুত নেওয়া হয়ে থাকে, সদস্য ও কর্মীদের তারবিয়াতও প্রত্যাশিত মানের হয়ে থাকে, সঠিক সময়ে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়ে থাকে, তাহলে এই আন্দোলন সফলকাম হবে। বিপরীতে যদি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়, কর্মীদের সংখ্যা ‘যথেষ্ট’-এর কোঠায় পৌঁছানোর আগেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কর্মীদের যথাযথ তারবিয়াত না দিয়ে আর Listen and Obey-এর কাছে পুরোপুরি সমর্পণ করার মানসিকতা তৈরি হওয়ার আগেই ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এর অনিবার্য পরিণতি যা হবে—তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন এই আন্দোলন খুব বাজেভাবে ব্যর্থ হবে।
তাহলে বোঝা গেল, চূড়ান্ত পদক্ষেপের যে ধাপ রয়েছে, এই ধাপ সম্পন্ন হলে সরাসরি ক্ষমতার আলাপ হবে। এই চূড়ান্ত পদক্ষেপের কয়েকটি ধরন হতে পারে—যা আমি পরে আলোচনা করব।
বিপ্লবের কার্যকর রূপরেখা পেশ করতে গিয়ে এ যাবৎ আমরা যা কিছু আলোচনা করেছি, তা যদি আপনি কাব্যিকাকারে বুঝতে চান, তবে আল্লামা ইকবালের একটি ফারসি কবিতা থেকে বুঝে নিতে পারেন—
گفتند جہاں ما آیا بہ تو می سازد؟
گفتم کہ نمی سازد, گفتند کہ برہم زن!
এই চরণে ইকবাল নিজের একটি কথোপকথন পেশ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইকবাল, তোমার কাছে কি পৃথিবীকে আমি যেভাবে সাজিয়েছি, তুমি নিজেকে তাতে মানিয়ে নিতে পেরেছ? পছন্দ হয়েছে তোমার?’ উত্তরে আমি বললাম, ‘না, আমার পছন্দ হয়নি। কারণ, এখানে জুলুমের জয়জয়কার। গরিবরা নিষ্পেষিত হচ্ছে। এখানে মজুরদের লাল রক্ত থেকে शराबِ ناب (খাঁটি মদ) তৈরি করে পুঁজিবাদীরা তা পান করে।’
خواجہ از خون رگ مزدور سازد لعل ناب
از جفائے دہ خدایاں کشت دہقاناں خراب
انقلاب! انقلاب! اے انقلاب!
পুঁজিবাদীরা মজুরদের রক্ত থেকে शराबِ ناب (খাঁটি মদ) নিংড়ায়। জমিদার জুলুমের জাতাকলে নিষ্পেষিত করে চাষির খেতের সোনালি ফসল নষ্ট করে। তার বাঁশী তথা-নারী পশু থাকে। যেখানে থেকে অশ্রুর নির্ঝর ছাড়া আর কিছুই হয় না।
ইকবালের মারাত্মক অভিযোগগুলো শুনে এ পর্যায়ে তিনি ইনকিলাবের স্লোগান তোলেন। তো, এরপরের অবস্থা বর্ণনা ইকবালের ভাষায়ই শুনুন, ‘যখন আমি বললাম, তোমার এই পৃথিবী আমার পছন্দ হয়নি প্রভু! এটা আমার জন্য বসারযোগ্য নয়।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আরহাম জান!’ অর্থাৎ ‘একে চুরমার-চুরমার করে দাও! বিধ্বস্ত করে দাও। ইনকিলাব ঘটিয়ে দাও! বিপ্লব ঘটিয়ে দাও!’
এখন এই বিপ্লবের পন্থা ও ধাপ কী হবে? ইকবাল দুটি চরণে তা-ও বলে দিয়েছেন। প্রথম চরণে চারটি আর দ্বিতীয় চরণে দুটি ধাপ—
با نشہ درویشی در ساز و دما دم زن!
چوں پختہ شوی خود را بر سلطنت جم زن!
অর্থাৎ, প্রথমে দরবেশি-জীবন ধারণ করো। নিজের কাজে মগ্ন থাকো। দাওয়াত-তাবলিগে ব্যস্ত থাকো। কেউ পাগল বলুক বা গালি দিক—প্রতিউত্তরে শুধু ধৈর্য ধারণ করো। এটাই দরবেশি-জীবন। গৌতম বুদ্ধ যেমনটা করেছিলেন, তা-ও কোনো প্রতিক্রিয়া আসছে না। এরপর যখন প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে—সংখ্যা যথেষ্ট হয়ে যাবে, তারবিয়াত-প্রশিক্ষণ যথার্থ মান নিশ্চিত করবে, নিজেদের জানমাল সব সবকিছু কুরবানি করার মানসিকতা তৈরি হয়ে যাবে, তাহলে এবার তোমরা ‘সালতানাতে জম’ অর্থাৎ ফাসিবাদী শক্তি, নিপীড়ক শাসক প্রভৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংঘর্ষে যাও, লড়াই করো। এই লড়াই ছাড়া কিন্তু কখনও বিপ্লব আসবে না। শুধু ওয়াজ করে বিপ্লব হয় না। জানের কুরবানি পেশ করতে হবে, রক্তের বিনিয়োগ করতে হবে। মনে রাখবেন, ঠান্ডা ঠান্ডা কাজে আর যাই হোক—কখনও বিপ্লব সংঘটিত হয় না, হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00