📄 বিপ্লবী দর্শন
একটি পূর্ণাঙ্গ ও সফল বিপ্লব সাধনের জন্য অবশ্যপালনীয় হয় থেকে সাতটি ধাপ থাকে। এখানে ধারাবাহিকভাবে সেগুলো আমরা উল্লেখ করছি :
১. বিপ্লবী দর্শন
প্রতিটি বিপ্লবের জন্য প্রথম ধাপে এমন একটি বিপ্লবী চিন্তাধারা বা দর্শনের প্রয়োজন, যা তার আগে থেকে চলে আসা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সিস্টেম (Politico-Socio-Economic System)-কে একেবারে গোড়া থেকে উৎপাটন করবে। এখন কোনো বিপ্লবী দর্শন বা চিন্তাধারা বিপ্লবী কি না, সেটা কীভাবে বুঝবেন? সে দর্শন বা চিন্তাধারা বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার গোড়ায় যতক্ষণ না দেবে, ততক্ষণ—তা কোনো বিপ্লবী দর্শন নয়; বরং তা শুধুই সাধারণ উপদেশমাত্র (Sermon)। এর বেশি কিছু নয়।
এখন সেই দর্শন বা চিন্তাধারা যদি নতুন হয়, তাহলে বিষয়টি কিছুটা সহজ। তারা নিজেদের পরিভাষা নিজেরাই তৈরি করবে এবং সে সব পরিভাষা অর্থও নিজেরা ঠিক করবে। কিন্তু যদি সেই দর্শন বা চিন্তাধারা পুরোনো হয়, তাহলে তার আধুনিকায়ন করতে হবে এবং যুগোপযোগী নতুন পরিভাষা ব্যবহার করে তা জ্ঞানের পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করতে হবে। তারপর সেই দর্শনের ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। সর্বোপরি তার প্রসারে আধুনিক সব গণমাধ্যমের সহযোগিতা নিতে হবে। অতীতে অসময়ে শুধু খুতবার আদলে-গলিফে খুতবা দেওয়ার মাধ্যমে লোকদের সামনে পেশ করার পর তাদের সামনে কোনো কিছু উপস্থাপন করা যেত; কিন্তু এখন যুগ বদলে গেছে। এখন সভা-সমাবেশ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লবী চিন্তাধারা ও দর্শনের প্রসারে প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ আধুনিক যুগের যত মাধ্যম আছে, সবকিছুই ব্যবহার করতে হবে। সবকিছুর কাছে লাগাতে হবে।
📄 সংগঠন
দ্বিতীয় ধাপে সে দর্শন ও চিন্তাধারা যারা গ্রহণ করে নেবে, তাদের একটি সংগঠনে একত্রিত করা হবে। সংগঠনের জন্যও দুটি শর্ত আছে :
প্রথমত, সংগঠনে লাগবে দৃঢ় নিয়মানুবর্তিতা ও মজবুত শৃঙ্খলা (discipline)। কারণ, যখন আপনারা আগে থেকে চলে আসা ব্যবস্থার মোকাবিলা নামবেন, তখন আগের ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা সেই ব্যবস্থার সুরক্ষায় নিশ্চিত করতে উলটো আপনাদের দমনের উদ্যত লাগবে। ঠিক তখনই তাদের মোকাবিলায় আপনাদের একটি সামরিক ডিসিপ্লিনের প্রয়োজন হবে। শুধু আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে কোনো মিলিটি—তোলা সম্ভব হবে না; বরং এখানে ‘Listen and Obey’-এর মূলনীতি—একটি সুবিন্যস্ত সুশৃঙ্খল বাহিনীর প্রয়োজন হবে। যাদের অবস্থা এমন, ‘Theirs not to reason why? Theirs but to do and die!’—অর্থাৎ তারা (ইসলামি আন্দোলনের কর্মীরা) আদর্শবান নেতাদের নির্দেশের পেছনে কারণ খুঁজতে যাবে না; বরং নেতার নির্দেশ মানা এবং এর জন্য প্রয়োজনে নিজের প্রাণও বিলিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের প্রতি বিশ্বস্ততা ও ত্যাগ-কুরবানির ওপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক পদমর্যাদা নির্ধারিত হবে। এই বিবেচনায় নয় যে, কেউ প্রধানের পদমর্যাদা অধিকারী আর কেউ অধস্তন। যদি হয় সে পদমর্যাদার অধিকারী হবে না। যদি অবস্থা এমনই হয়, তাহলে এটা কোনো বিপ্লবী সংগঠন বলে গণ্য হবে না।
কারণ, একটি বিপ্লবী সংগঠনে তো সবার মর্যাদা নির্ধারিত হয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও আন্দোলনের প্রতি তার বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে শুধু এবং সদস্যদের ত্যাগ-কুরবানি দেখা হয়। আন্দোলনের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততায় মজবুত হবে। যার ভিত্তিতে একজন অত্যন্ত যেমন কোনো কমিউনিস্ট পার্টিতে পদমর্যাদায় অনেক ওপরে চলে যেতে পারে, আবার একজন ব্রাহ্মণও নিচে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
📄 তারবিয়াত
তৃতীয় ধাপ হচ্ছে, কর্মীদের তারবিয়াত। এই ধাপে সংগঠনের কর্মীরা বিপ্লবের যে দর্শন লালন করে, নিজেদের মন ও মনন থেকে কুফরের বিপ্লবের জন্য তা-বিচ্যুত হতে দেবে না। কারণ, এ দর্শনই তো বিপ্লবের জন্য চালিয়ে যাওয়ার যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টার ভিত্তি। এই আদর্শ সামগ্রিক মননে সমুজ্জ্বল থাকলে কাজের প্রেরণা ও উদ্দীপনা জাগ্রত থাকবে। আর যখনই তা ঝিমিয়ে পড়বে, কাজের আগ্রহও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
একইসঙ্গে কর্মীদের ‘শোনো ও মানো’—মূলনীতিতে অভ্যস্ত বানাতে হবে। এ কাজ খুব সহজ নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির। কবির ভাষায়—
خم ہیں تسلیم خم کی جو عادت پڑی
بے نیازی تری عادت ہی سہی
আমরাও নিজেদের সমর্পিত করার অভ্যাস গড়ে তুলব। হোক না—কারও প্রতি অমুখাপেক্ষিতা তোমার স্বভাবেরই অংশ।
কিন্তু মানার অভ্যাস তৈরি করা সহজ কোনো কাজ নয়। এতে আমিষ বাধা সাথে; বরং আমিষ থেকেও আগে বেড়ে চলা অহংকার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সফল বিপ্লবের জন্য তারবিয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আন্দোলনের কর্মীদের ভেতর জানমাল থেকে শুরু করে সবকিছু উৎসর্গ করার জয়বা ও মানসিকতা তৈরি করা। এ ছাড়া বিপ্লব সংঘটিত করা সম্ভব নয়। আল্লামা ইকবালের ভাষায়—
تو بچا بچا کے نہ رکھ اسے ترا آئنہ ہے وہ آئنہ
کہ شکستہ ہو تو عزیز تر ہے نگاہ آئنہ ساز میں!
এত যত্ন করে রেখো না, এ তো তোমার আয়না, অন্য কিছু নয়। তাও আবার এমন আয়না—ভেঙে গেলে পরে আয়নার কারিগরই সবচেয়ে বেশি খুশি হয়।
জানমাল উৎসর্গ করার জয়বা ও মানসিকতা—এটি বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিপ্লবের মাধ্যমে যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান—তাতে যদি আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতার দিকটিতেও সর্বোচ্চ লক্ষণীয় হয়, তাহলে কর্মীদের আধ্যাত্মিক তারবিয়াতও দিতে হবে। কারণ, কর্মীদের মধ্যে যদি আধ্যাত্মিকতা না থাকে, তবে বিপ্লবের মধ্যে আভিজাত্য ও পরিপক্বতা কোত্থেকে আসবে?
📄 সবর
৪. সবর (Passive Resistance)
এই ধাপটি বলার ক্ষেত্রে তো তার নম্বর আসে; কিন্তু বাস্তবে এর সূচনা প্রথম ধাপের সঙ্গেই হয়ে যায়। সবর বা ধৈর্যের অর্থ হচ্ছে— সংগঠনের কর্মীরা নিজেদের অবস্থানে ওপর অবিচল থাকবে, কোনো অবস্থাতেই পিছু হটবে না। বিশেষ করে, যখন কঠোরতা ও নির্যাতনের ঝড় নেমে আসবে, তখন সবরের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে; কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।
এর পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য যৌক্তিক (logical)। প্রথম কথা হচ্ছে, সমাজে বিরাজ বিরোধ (conflict) সৃষ্টিকারী হচ্ছে এই বিপ্লবীরা; নতুবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তো স্বাভাবিকই ছিল। ধনী-গরিব সবার উপস্থিতি ছিল। গরিবরা তাদের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল। ধনীরা আরাম-আয়েশে মত্ত ছিল আর গরিবরা নিজেদের জীবনধারণা সচল রাখার মেহনতে ব্যস্ত ছিল। তারা সবকিছুকে নিজেদের ‘তাকদির’ মনে করত আর বলত, আল্লাহই তো আমাদের গরিব বানিয়েছেন! এ জন্যই হয়তো মার্কস বলেছিল, ‘ধর্ম হচ্ছে জনসাধারণের জন্য আফিম’। ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই মূলত তারা নিজেদের অবস্থার সন্তুষ্ট থাকে; বিপ্লবের কথা চিন্তাও আসে না। শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা তো দূরের কথা।
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, একটি শান্ত-সরবহীন পুকুরে আপনি নিক্ষেপ করলেন; এতে কী হবে? পুকুরের পানিতে সৃষ্টি হবে কম্পন। ঠিক একইভাবে ইসলামি বিপ্লবের প্রচারার্থীরাও আগে থেকে চলে আসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। আর প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে যে গোলন্দ আছে, তারা কোনোরকম রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বলতে শুরু করে। শাসনব্যবস্থার শোষণমূলক (exploitative), সাধারণ মানুষ এটা তাদের মুখেই শুনতে পায়। তো বলা যায়, বিপ্লবের প্রচারীরা ইসলামি আন্দোলনে এই কর্মপন্থার মূলত জনসাধারণের মধ্যে একটি বৈষম্য (discrimination) তৈরি করে। তারাই জনগণের একটি অংশকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিয়ে যায়।
তাহলে আগের কথাগুলো থেকে আবার বলুন, পাথর কারা মেরেছে? বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীরা! এখন পাথর যখন পুকুরে পড়বে, তো সমাজকে যে তরঙ্গ তৈরি হয়, এ তো পড়বে, তরঙ্গ তো হবেই। তো সমাজে যে তরঙ্গ তৈরি হয়, এ তো বিপ্লবের দিকে দাওয়াতর স্বভাবগত প্রতিক্রিয়া। তবে হ্যাঁ, এই প্রতিক্রিয়ার রূপান্তরও কিন্তু বিভিন্ন পর্যায় (stages) হয়ে থাকে। তন্মধ্যে দুটি পর্যায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম পর্যায়ে আমি শক্তি বিপ্লবের দিকে আহ্বানকারীরা অর্থাৎ দিকে দাওয়াতকে কমসংখ্যক বিবেচিত করে কোনো কোনোকে তার ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতিবৃত্তিকভাবে প্রচার শুরু করে; তার ওই মিথ্যা ও ভিত্তিহীনভাবে পর্যন্ত তাকে দায়িত্বকে, আক্রমণ ও নিপীড়নের (persecution) শিকার হতে হয়। কায়েমি শক্তি প্রথমে দিকে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া মৌখিকভাবে এই আক্রমণ করে যে, ‘আরে! শক্তি প্রয়োগ ছাড়া এটা তো পাগল, অপ্রকৃতিস্থ। আমাদের চলমান ব্যবস্থার ওপর আপত্তি করছে। শাসন বা সমাজব্যবস্থা তো শতাব্দীর থেকে চলে আসছে।
আমাদের বাপ-দাদারাও এই ব্যবস্থার প্রতি অনুগত ছিল। আর এই পাগল কিনা সেই ব্যবস্থাকে গলদ বলছে! নিশ্চয় একে কোনো জিন-ভূতে ধরেছে।'
বাস্তবিকভাবে এটা তাদের একটা কূটকৌশল। যার আশ্রয় নিয়ে তারা ইচ্ছাকৃত নিগ্রহ করে চেষ্টা করে। কারণ, একজন দাইর যদি ইচ্ছাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তাকে দিয়ে ময়দানে আর কোনো কাজ হবে না। একটি বৃক্ষের শিকড়ই যখন কেটে দেওয়া হয়, তখন পুরো বৃক্ষ তো এমনিতেই ছিন্নমূল হয়ে যায়।
কিন্তু এই পর্যায়ে যদি অটুট মনোবলে সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে যান, নিজের ওপর আরোপিত সব আপত্তি ও অপবাদ সহ্য করে যান, কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নেন আর একইসঙ্গে বিরোধীপক্ষের প্রতাপকে যে দায়িত্ব তো দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে, প্রসারিত হচ্ছে; তখন শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের রিঅ্যাকশন। অর্থাৎ, তারা আগের অবস্থা থেকে অগ্রসর হয়ে এবার দাইদের শারীরিকভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের নিশানা বানায়। এই দফায় কিন্তু তাদের শিকার শুধু আন্দোলনের আহ্বায়কই হন না; বরং আন্দোলনের সব সদস্য, কর্মী ও সমর্থকরাও হন। বিশেষ করে, নিঃস্ব দুর্বল জনসাধারণ এবং উচ্চবিত্ত ঘরানার যুবকরা তাদের শিকারের পরিণত হয়। আন্দোলনের সমর্থকদের ধরে ধরে মাখনের মতো রাখা হয়, ক্ষুধার্ত রাখা হয়, কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, হত্যা করা হয়; এমনকি ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে হাজারে হাজারে কর্মীদের শহিদ পর্যন্ত করে দেওয়া হয়।