📄 ইনকিলাবের অর্থ
ভূমিকা হিসেবে যে আলাপটি করেছি, এরপর যেটা প্রয়োজন, ইনকিলাব (ইসলামি বিপ্লব) কাকে বলে। ইনকিলাবের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে—বদল, পরিবর্তন, বিদ্রোহ ও বিপ্লব। শব্দটিকে আমরা অন্য যেকোনো শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে পারি। যেমন— ইলমি ইনকিলাব (জ্ঞানবিপ্লব), সাকাফাতি ইনকিলাব (সাংস্কৃতিক বিপ্লব), ফৌজি ইনকিলাব (সেনাবিদ্রোহ) প্রভৃতি। তবে ইনকিলাবের পারিভাষিক অর্থে এসব ব্যবহারের কোনো অবকাশ নেই। কারণ, পারিভাষিক অর্থে ইনকিলাব হচ্ছে—কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থার কোনোটিতে অথবা সবগুলোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা।
বর্তমান সময়ে মানবজীবনকে দুটো ভাগে বিভক্ত মনে করা হয়। তন্মধ্যে এক ভাগ ব্যক্তিগত জীবনকেন্দ্রিক, আরেক ভাগ সমাজকেন্দ্রিক। প্রথম ভাগের সম্পর্ক ধর্মের সঙ্গে; যা আকিদা-বিশ্বাস (Dogmas), ইবাদত (Rituals) ও সামাজিক রীতিনীতিকে (Social Customs) شامل করে। বিশ্বব্যবস্থার এই ভাগ অর্থাৎ ধর্মকেন্দ্রিক ভাগে কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় কোনোরকম হস্তক্ষেপ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে সবাই স্বাধীন। যার যেমন ইচ্ছা ধর্মবিশ্বাস লালন করবে। কারও ইচ্ছা হলে এক প্রভুতে বিশ্বাস রাখবে। কারও ইচ্ছা হলে শত প্রভুতে বিশ্বাসী হবে। আবার কারও মন চাইলে কোনো প্রভুতেই বিশ্বাস রাখবে না।
একইভাবে যার যেভাবে ইচ্ছা ইবাদত-বন্দেগি-উপাসনা করবে। কারও ইচ্ছা হলে নির্জনে উপাস্য করবে, ধ্যানমগ্ন হবে। যার ইচ্ছা অতিমাত্রায় পূজা করবে। কেউ কেউ চাইলে অদৃশ্য প্রভুর ইবাদত করবে।
একইভাবে ইবাদতের রীতিনীতিতেও স্বাধীনতা রয়েছে। কারও ইচ্ছা হলে সে রোজ রাখবে, নামায পড়বে। কারও ইচ্ছা হলে সে মন্দিরে যাবে অথবা চার্চে যাবে। মোটকথা, এ ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উলটো বলা যায়, ব্যাপক স্বাধীনতা রয়েছে। তারপর সামাজিক প্রথা বা উৎসবে বিষয়ে এসে যাক। এ ক্ষেত্রেও কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। যেমন, বিয়ের ক্ষেত্রে—কেউ ইজাব-কবুলের তারিখায় বিয়ে পড়াক অথবা আগুনের পাশে চক্কর কাটার পর কারও কোনো সমস্যা নেই। যত ব্যক্তির ক্ষেত্রে; কেউ মরদেহ মাটিতে দাফন দিক অথবা জ্বালিয়ে দিক, এতেও কোনো বিধিনিষেধ নেই।
জীবনের দ্বিতীয় ভাগটি সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতি অর্থাৎ সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে; যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক রীতিনীতি ও বিধানকে (The Politico-Socio-Economic System) شامل করে। ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এর নাম হচ্ছে সেক্যুলারিজম। এখানে একটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে করছি যে, তাত্ত্বিকভাবে সেক্যুলারিজমের অর্থ কিন্তু ধর্মহীনতা নয়; বরং এটি ‘সর্বধর্ম-বিশ্বাসী’, আবার কোনো ধর্মেই বিশ্বাসী নয়—এমন একটি সংবিধান বা কায়দা-কানুনের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম কখনো কোনো ধর্মকে পেরোয়ি করে হয় না; আবার সব সময় সব ধর্ম মন জুগিয়েও চলা হয়। সেক্যুলারিজমে সব ধর্মই গ্রহণযোগ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও কিন্তু বলেছিলেন, ‘We are ready to embrace Islam.’ একটি ধর্ম হিসেবে ইসলাম নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
আরও স্পষ্ট করে বললে তাদের কথা হচ্ছে, মুসলমানরা আমেরিকায় এসে সিনাগগ ও চার্চ ইত্যাদি ক্রয় করে সেগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে, এতে আমরা কোনো আপত্তি করছি না। এখানে এসে তারা বিশ্বাসমূলক খ্রিস্টধর্মাবলম্বী আমেরিকানদেরকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও ধর্মান্তরিত করে মুসলমান বানিয়ে ফেলছে, এতেও আমরা কোনো অভিযোগ তুলছি না।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, কেন তারা আপত্তি বা অভিযোগ করছে না? কারণ, শুধু একটি ধর্ম হিসেবে ইসলামের সঙ্গে তাদের কোনো লড়াই নেই, কিন্তু একটি শাসনব্যবস্থা (The politico-Socio-Economic System) হিসেবে ইসলামকে তারা বিলকুল বরদাশত করতে পারে না। ইসলামের এ রূপটিকেই তারা ফান্ডামেন্টালিজম বলে অভিহিত করে। আর যেহেতু কিছু ফান্ডামেন্টালিস্ট লোক তাদের অনুসৃত কর্মপন্থার ওপর সন্ত্রাসবাদ দাবি লেগে গেছে, তাই তারা ফান্ডামেন্টালিজমকে সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কখনো তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তো, কখনো ‘মৌলবাদ’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে; তবে বাস্তবে এসব যুদ্ধ হচ্ছে ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এসব যুদ্ধ ইসলামের আকিদা, ইবাদত ও অন্যান্য রীতিনীতির বিরুদ্ধে নয়; বরং এসব যুদ্ধ ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
আধুনিক বিশ্বের পরিভাষায় ইনকিলাব (বিপ্লব) এই সামাজিক- রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনাকে বলে। ধর্মীয় ময়দানে কোনো বড়ো পরিবর্তন আনাকে ইনকিলাব বলা যায় না। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভালোভাবে বুঝে নিন! মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় পরিবর্তন ঘটেছিল ৩০০ খ্রিস্টাব্দে, যখন কুসতুনতুনে আজম (Constantine the Great) খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং তার সঙ্গে পুরো সাম্রাজ্যও খ্রিস্টধর্মের অনুসারী হয়ে গিয়েছিল। মানবসভ্যতার ধর্মে ইতিহাসে এত বড়ো পরিবর্তন (conversion) আর কখনও হয়নি। রোমান সাম্রাজ্য তখন তিন- তিনটি মহাদেশ—অর্থাৎ পুরো উত্তর আফ্রিকা, পুরো পূর্ব ইউরোপ ও পুরো পশ্চিম এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এত বড়ো ধর্মীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, কিন্তু কখনও একে বিপ্লবের ইতিহাসে স্থান দেওয়া হয়নি। কারণ, এই ধর্মীয় পরিবর্তনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ইনকিলাব বা বিপ্লব (Revolution) বলা সেই পরিবর্তনকে, যা কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকেন্দ্রিক হবে এবং তা মৌলিক ধরনের ও বুনিয়াদি পর্যায়ের হবে।
📄 পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের একমাত্র নজির : নববি বিপ্লব
এখন আমরা পৃথিবীব্যাখ্যাত কয়েকটি বিপ্লব নিয়ে পর্যালোচনা করব। আর মধ্যে ‘ফরাসি বিপ্লব’ খুবই প্রসিদ্ধ এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তা আসলেই বিপ্লব ছিল; কিন্তু শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছিল। সেখানে ধর্ম আগেরও খ্রিস্টবাদ ছিল, পরেও তা-ই। সামাজিক কোনো পালাবদলের হাওয়া লাগেনি। অতএব, বোঝা গেল, ফরাসি বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছিল।
আরেকটি বিখ্যাত বিপ্লব হচ্ছে রাশিয়ার ‘বলশেভিক বিপ্লব’, যা ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল। এই বিপ্লবের মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। ব্যক্তি মালিকানার বিলুপ্তি ঘটিয়ে সবার-অন্ন সবার সব সম্পদে মালিক হয়ে যায় রাষ্ট্র। ভালো করে মনে রাখুন, এই দুটি হচ্ছে বিপ্লব। বিপরীতে রোমান সাম্রাজ্যজুড়ে সমগ্র সময়ে খ্রিস্টধর্মাবলম্বী হয়ে যাওয়াটা বিপ্লব নয়।
এবার আসুন, আমরা মুহাম্মদ ﷺ-কর্তৃক সংঘটিত ইনকিলাব বা বিপ্লবকে পর্যালোচনা করে দেখি। প্রথমে আমরা দেখব, রাসূল ﷺ আসলেই কোনো বিপ্লব করেছিলেন, নাকি আমরা কেবল ভক্তি ও ভালোবাসা থেকে এমনটা দাবি করে থাকি?
বিপ্লবতো হচ্ছে, রাসূল ﷺ মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো বিপ্লব করেছিলেন। এই দাবিটি আমরা মুখের বুলিতে নয়; বরং বিশ্লেষণ ও গভীর গবেষণার (Cold Analysis) দিয়ে প্রমাণ করতে চাই। বিষয়টি উপস্থাপনা করতে আমরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাক্ষ্য পেশ করব। কারণ, বলা হয়—الفضل ما شهدت به الأعداء— অর্থাৎ ‘প্রকৃত সম্মান হচ্ছে তা, যা দুশমনও স্বীকার করে নেয়।’ বড় ও অসাধারণ তো সে সবকিছুই প্রশংসা করে; প্রকৃত প্রশংসাতো হচ্ছে, যার স্বীকারোক্তি স্বয়ং স্ট্রেট ফরওয়ার্ড দুশমন সালাহুদ্দিন আইয়ুবির প্রশংসা করে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, আসলেই সালাহুদ্দিন আইয়ুবি প্রশংসার যোগ্য মহান সেনায়ক ও সুলতান ছিলেন।
এম. এন. রায় ছিলেন একজন বাঙালি হিন্দু। তিনি ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিস্ট অর্গানাইজেশনের গুরুত্বপূর্ণ সভ্য ছিলেন। ১৯২০ সালে লাহোরের ব্র্যাডল হল-এ (Bradlaugh Hall) ‘ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা’ (The Historical Role of Islam) শিরোনামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন—
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো বিপ্লব সংঘটিত করেছেন মুহাম্মদ ﷺ।
এখানে আপনাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ভদ্রলোক কিন্তু মুসলিম নন; তিনি বাঙালি হিন্দু এবং কট্টর কমিউনিস্ট। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে এটা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো বিপ্লব সংঘটিত করেছেন মুহাম্মদ ﷺ। এ তো বললাম ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ—অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে ২০ বছর পরের কথা। আবার ভালো শুনুন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ—অর্থাৎ শতাব্দীর সমাপ্তি থেকে ২০ বছর আগের কথা বলি। আমেরিকান গবেষক ড. মাইকেল এইচ. হার্ট (Michael H. Hart) ‘দ্য হান্ড্রেড’ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি মানবসভ্যতার ৫ হাজার বছরের ইতিহাস থেকে এমন ১০০ জন মনীষীকে নির্বাচন (selection) করে তাদের জীবনী বিন্যস্ত (gradation) করেছেন, যারা মানবসভ্যতার গতি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন।
এই বিন্যাসে মাইকেল এইচ. হার্ট প্রথমেই রেখেছেন মুহাম্মদ ﷺ -এর নাম। লেখক একজন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। আমার জানামতে, তিনি এখনও জীবিত আছেন এবং নিউইয়র্কের ম্যানহাটন (Manhattan) শহরে বসবাস করছেন।³ তার রচিত এই গ্রন্থটি পুরো পৃথিবীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও প্রসারলাভ করেছিল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রকাশের পরপরই গ্রন্থটি খুব দ্রুতই দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, বিশেষ করে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে এটি গায়েব করে দিয়েছিল। কারণ, সেই গ্রন্থের কাছে যিনি খ্রিস্ট প্রভু হওয়ার একমাত্র সন্তান)-কে তৃতীয় নম্বরে রেখেছেন আর মুহাম্মদ ﷺ-কে রেখেছেন প্রথম নম্বরে। খ্রিস্টানবিশ্ব এটা মেনে নিতে পারেনি; পারেনি বরদাশত করতে। মুহাম্মদ ﷺ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন—
My choice of Muhammad to lead the list of the world's most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels.
বিশ্বসেরা সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় আমার মুহাম্মদ-কে পছন্দের বিষয়টি কিছু পাঠককে বিস্মিত করতে পারে এবং অন্যদের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ধর্মীয় ও জাগতিক—উভয় দিক বিবেচনায় মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ব্যক্তি ছিলেন।
ড. মাইকেল এইচ. হার্টের মতে, মানবজাতির দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক দিকে আছে। একটি ধর্ম, আধ্যাত্ম-চরিত্র ও আধ্যাত্মিকতার দিক। আরেকটি সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজের দিক। এ দুটি দিক থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল (Supremely Successful) ও প্রভাবশালী ব্যক্তি শুধু এবং শুধুই একজন আর তিনি হচ্ছেন—মুহাম্মদ ﷺ।
যাদের সাধারণ মনীষী বা অনুপ্রেরণীয় ব্যক্তি মনে করা হয়, তাদের মধ্যে কোনো একদিকে ঝুঁকে পড়ে। যেমন, ইবাদত-বন্দেগি ও কৃচ্ছ্রবৃত্তি দমনে গৌতম বুদ্ধকে মনে করা হয়। চারিত্রিক পবিত্রতা শিক্ষাদানে মাসিহ আ.-কে মহৎ মনে করা হয়। রাষ্ট্র, শাসন ও রাজনীতিতে এই দুজনের কোনো অবদান ছিল না। অপরদিকে দেশ দখল আলেকজান্ডার (Alexander the Great)-কে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। এমনিভাবে আতিলা (Attila), চেঙ্গিস খান ও দ্য গ্রেট আকবরও নিজ নিজ জায়গায় শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। তারা অনেক শাসক ও বিজেতা হয়েছে; কিন্তু আধ্যাত্ম-চরিত্র ও আধ্যাত্মিকতার বিবেচনা কোনো অবদান ছিল? এসব ক্ষেত্রে অবদান তো দূরের কথা, বহু ক্ষেত্রে তাদের কর্মকাণ্ড আরও বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। সভ্যতার ইতিহাসের সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কেবল একজন ব্যক্তিই মহৎ, প্রভাবশালী ও সফলতম আর তিনিই হচ্ছেন—মুহাম্মদ ﷺ।
অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাক্ষ্যসমূহের মধ্যে তৃতীয় যে সাক্ষ্যটির কথা আমি প্রায় বলে থাকি, সেটি হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের। অবশ্য, তার A Concise History of the World গ্রন্থের যে বাক্যটির উদ্ধৃতি আমি দিয়ে থাকি, নতুন সংস্করণে সেটি মুছে দেওয়া হয়েছে। মূলত কোনো দুশমনের জবানে এরচেয়ে বড়ো প্রশংসা আর হতেই পারে না। কারণ, হারবার্ট জর্জ ওয়েলসের আদতে রাসূল ﷺ-এর নিকটতম দুশমনদের একজন। রাসূল ﷺ-এর শানে সে সালমান রুশদি ও তসলিমা নাসরিনের চেয়েও জঘন্য ভাষা ব্যবহার করেছিল। কিন্তু যখন সে রাসূল ﷺ-এর বিদায় হজ্জের ভাষণের নিম্নোক্ত বাক্যগুলোর ব্যাপারে আলোচনা করে, তখন তাকেও হাঁটু গেড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রশংসা করতে হয়েছে। সে ভাষণে রাসূল ﷺ বলেছিলেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى
হে মানবসকল—মনে রেখো, তোমাদের সকলের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতাও এক। মনে রেখো, কোনো আরব অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে না, আর কোনো অনারব আরবের ওপর। কোনো উজ্জ্বল বর্ণের মানুষ কালো বর্ণের মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে না আর কোনো কালো বর্ণের মানুষ সাদা বর্ণের মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে না। (মুসনাদে আহমাদ : ২২৯৭৮)
হারবার্ট জর্জ ওয়েলস যদিও খ্রিস্টধর্মাবলম্বী; কিন্তু বিদায় হজ্জের ভাষণের কথা বলার পর সে এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে—
যদিও ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতার নীতিকথা পৃথিবীতে বহুকাল আগেও অনেক দেওয়া হয়েছিল এবং এমন উপদেশমূলক কথা আমরা মাসিহের উপদেশমালাতেও প্রচুর পেয়ে থাকি। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে, মুহাম্মদই এমন মনীষী, যিনি মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এই মূলনীতির ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তাহলে দুশমনদের সাক্ষ্য দ্বারাও প্রমাণিত হয়ে গেল, যে বিপ্লব মুহাম্মদ ﷺ সংঘটিত করেছিলেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ও সফলতম বিপ্লব ছিল। মুহাম্মদ ﷺ-এর বিপ্লবের সঙ্গে ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের তুলনা করে দেখুন, তাহলে আপনিও বুঝতে পারবেন, ফরাসি বিপ্লবে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে; আর রুশ বিপ্লবে শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু মুহাম্মদ ﷺ-এর সংঘটিত বিপ্লবে সবকিছু আমূল বদলে গেছে। ধর্ম, বিশ্বাস, প্রথা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সবকিছু বদলে গেছে—একইভাবে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কোনো কিছুই তার আগের অবস্থার ওপর বহাল থাকেনি।
যে জাতির শিক্ষিত মানুষেরা পুরো গোনা যেত, সে জাতিকেই তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে পুরো পৃথিবীর নেতৃত্বে আসনে সমাসীন করেন। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন নতুন শাখা আবিষ্কার করে। হিন্দুস্থান থেকে গ্রিস পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারকে একত্রিত করে এবং তা আরও উন্নত (develop) করে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করে।
তাহলে প্রথমে এ বিষয়টি প্রমাণিত হলো যে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল, সমৃদ্ধ ও অনেক গভীর চেতনা ধারণকারী (Most Profound) বিপ্লব ছিল মুহাম্মদ ﷺ-এর সংঘটিত বিপ্লব। অন্য কোনো বিপ্লবের সঙ্গে যার তুলনাই হয় না। কারণ, অন্য যত বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, সব ছিল আংশিক বিপ্লব। এ ছাড়াও সেগুলোরจุดُনিটিতে গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখবেন, বিপ্লবের বীজ বপন করেছিল এক শ্রেণি আর বিপ্লব ঘটিয়েছে অন্য শ্রেণি। বিপ্লবের চিন্তা প্রসার করেছিল কিছু মানুষ আর বিপ্লব ঘটিয়েছে অন্য কিছু মানুষ। কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস Das Capital রচনা করেছে জার্মানি ও ব্রিটেনে বসে; কিন্তু জার্মানি বা ব্রিটেনের কোনো একটি গ্রামেও মার্কসিস্ট বিপ্লব হয়নি। বরং তা রাশিয়ায় গিয়ে বলশেভিক ও ম্যানশেভিকদের হাতে হয়েছে। আর ঠিক তখনই ফ্রন্টে লেনিনের আবির্ভাব ঘটেছে। বিপ্লব সংঘটিত করার ক্ষেত্রে না কার্ল মার্কসের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে আর না এঙ্গেলসের।
বোঝা গেল, বিপ্লবের বীজ বুননকারী বা চিন্তা প্রসারকারী ছিল এক শ্রেণি আর বিপ্লবের সংঘটক ছিল অন্য শ্রেণি। এমনিভাবে ভলতেয়ার (Voltaire) ও রুশোর (Jean-Jacques Rousseau) মতো আরও বহু লেখক ছিল, যারা স্বাধীনতার আর গণতন্ত্রের চিন্তা ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। তারা লেখালেখি করে জানানোর দিন চিন্তা ও পদ্ধতি; কিন্তু ময়দানে এসে নেতৃত্ব দিতে পারত না। এ কারণেই ফরাসি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয় সমাজের বখাটে কিছু লোক। ফলে ফরাসি বিপ্লব প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক বিপ্লবে পরিণত হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না।
এবার আসুন, ভিন্ন এক দৃশ্য (contrast) দেখা যাক! রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বিপ্লব, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যার নেতৃত্বের बागडोर ছিল একজনের হাতেই। একজন ব্যক্তিই এই সময় মরার পথে পথে ইসলামে প্রচারণার (Street Preaching) চালাচ্ছেন, আলিগলি বিতরণ করে দাওয়াতও দিচ্ছেন, তাবলিগ করছেন। কেউ তাকে পাগল বলছে, কেউ উন্মাদ বলছে আবার কেউ কবি বলে ঠাট্টা করছে; তিনি সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছেন। কখনও মুখ ফিরিয়েও দেখছেন না, কিন্তু বরং কথা! আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সেই একই ব্যক্তিই আবার বদর যুদ্ধে নেতৃত্বের হাতে মুসলিমবাহিনীকে পরিচালনা করছেন!
বলুন তো, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কারও নজির আছে? আমি আবারও ড. মাইকেল এইচ. হার্টের সেই বাক্যটি উদ্ধৃত করব যে, He is the only, the only person। কোথায় আলিগলি বিতরণ করে দাওয়াতও কাজ করা একজন দাই আর কোথায় সেনাবাহিনীরা নেতৃত্ব দেওয়া একজন সেনানায়ক! কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়? এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট দিয়ে রাখি আপনাদের। গত শতাব্দীর বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড জে. টয়েনবি (Arnold J. Toynbee) রাসূল ﷺ-এর ব্যাপারে বিখ্যাত একটি মন্তব্য করেছে—
Muhammad failed as a prophet, but succeeded as a statesman.
অর্থাৎ, মুহাম্মদ একজন নবি হিসেবে ব্যর্থ হয়েছেন; তবে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল হয়েছেন।
টয়েনবির এ মন্তব্যের ব্যাখ্যায় ব্রিটিশ প্রফেসর মন্টগোমেরি ওয়াট (W. Montgomery Watt) দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন : ‘Muhammad at Mecca ও Muhammad at Madina। দ্বিতীয় বই অর্থাৎ ‘মুহাম্মদ অ্যাট মাদিনা’-য় বাহ্যিকভাবে তিনি রাসূল ﷺ-এর জন্য প্রশংসাসূচক যত বাক্য ব্যবহার করা যায়, দ্বিধা ছাড়াই করে ফেলেছেন; কিন্তু এসব কথার আড়ালে তিনি একটি বৈপরীত্য দেখানোর চেষ্টা করছেন— তা হচ্ছে, মক্কার মুহাম্মাদের চিন্তাধারা ও কর্মপন্থা একরকম ছিল আর মদিনার মুহাম্মাদের সবকিছু অন্যরকম ছিল। অর্থাৎ দুজনের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। রাসূল ﷺ-এর শানে মন্টগোমেরির বাহ্য প্রশংসাবাক্যে প্রভাবিত হয়ে মারহাম জিয়াউল হক তাঁকে বাহ্যিক সিরাত কনফারেন্সে প্রধান আলোচক হিসেবে দাওয়াতও দিয়েছিলেন। তার চিন্তাধারা ছিল না, মন্টগোমেরি কোন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সিরাতুন নবিতে এই বৈপরীত্য দেখানোর চেষ্টা করছেন—মক্কার মুহাম্মদ আর মদিনার মুহাম্মদ দুজন আলাদা আলাদা ব্যক্তি; তাদের চিন্তাধারাও সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আসলে এরা যখন রাসূল ﷺ-এর মক্কার জীবনধারা নিয়ে গবেষণা করে, তখন যদিও তারা তাঁকে নবি বা রাসূল মানে না; কিন্তু এটা অবস্থা মানে যে, তার জীবনধারা নবিদের জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। যেমন, ঈসা আলাইহিস সালাম পথে পথে দাওয়াতের কাজে বিচরণ করতেন, তেমনিভাবে মুহাম্মদ ﷺ-কেও দাওয়াতি কাজে মক্কার অলিতে-গলিতে ঘুরতে দেখা গেছে। যেমন, ঈসা আলাইহিস সালামকে বলা হয়েছে, তিনি সবর করেছেন; তেমনিভাবে মুহাম্মদ ﷺ-ও সহ্য করেছেন, প্রতিউত্তরে কাউকে কিছু বলেননি। তো তাদের মতে, নবিদের সঙ্গে অনেক কিছুতে মুহাম্মদ ﷺ-এর সামঞ্জস্য থাকলেও এক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন (নাউজুবিল্লাহ)। কারণ, প্রায় আলোচনার জন্য তাকে মক্কা থেকে পালাতে হয়েছে। তারা আসলে হিজরতকেই flight (পালানো) বলে অভিহিত করে; অথচ ফ্লাইট হয়ে থাকে ভয়ের কারণে। বিপরীতে হিজরতের পেছনে কোনো ভয়-ভীতি কাজ করেনি; বরং তা ছিল হিজরতের দাওয়াতের কর্মপন্থাই (strategy) অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল—দাওয়াতের কাজকে বিস্তৃত করার জন্য ভিন্ন স্থান ও ক্ষেত্র তৈরি করা।
যাই হোক, প্রতিবাদীরা হিজরতের পর মদিনার সময়কালে একজন নতুন মুহাম্মদ ﷺ-কে আবিষ্কার করেছে। যিনি একাধারে যুগের সবচেয়ে বড়ো রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, একটি রাষ্ট্রের অধিকর্তা হিসেবে সামনে এসেছেন, একইসঙ্গে নিজের বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা আরও দেখতে পেয়েছে, মদিনায় এসে তিনি স্থানীয় ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি করছেন। নিজের ব্যবস্থাপনা-যোগ্যতা, রাষ্ট্র পরিচালনা-দক্ষতা (Statesmanship) ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অন্যান্য দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করছেন। তাদের কাছে এসব কিছু রাসূল ﷺ-এর পবিত্র জীবনের বৈপরীত্যপূর্ণ বিষয় মনে হয়েছে।
আপনাদের সামনে মন্টগোমেরির বিখ্যাত কথাটির উদ্ধৃতি এটা বোঝার জন্য দিয়েছি যে, রাসূল ﷺ-এর জীবনটিতে আসলেই বৈপরীত্যপূর্ণ বিষয় আছে। আর সেই বৈপরীত্যটি এদিকে থেকে যে, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই এমন ব্যক্তি, যিনি নিজেই বিপ্লবের সূচনা করেছেন, নিজেই তা সফলতার শেষ মঞ্জিল পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। ইতিহাসে আর কোনো বিপ্লব তার প্রভাব তার জীবদ্দশায় পূর্ণতা পায়নি; বরং বিপ্লবের চিন্তা বপন করেছেন একজন, তার লাভ পাঁচ-দশ যাওয়ার পর হয়তো কোনো তার সেই চিন্তা প্রভাবিত হয়ে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। রাসূল ﷺ-এর বিপ্লব সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অতুলনীয় যে, তিনি নিজের জীবনের ২০ বছরের মধ্যে বিপ্লবের শুরু থেকে শেষ—সব ধাপ ও স্তর সফলভাবে পরিচালনা করেছেন।
অতএব, বর্তমান সময়ে কেউ যদি পূর্ণাঙ্গ ইনকিলাবের সঙ্গে বিপ্লবের সঠিক রূপরেখা আয়ত্ত করতে চায়, তাহলে সে কেবল রাসূল ﷺ-এর সিরাতেই সামগ্রিকভাবে এর দিকনির্দেশনা পাবে। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন প্রমুখের জীবনী থেকে কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে না। তো, সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সফল বিপ্লবের পথ ও পন্থা জানার জন্য বর্তমানে পৃথিবীর সামনে কেবল একটি সোর্সই আছে, আর তা হচ্ছে—রাসূল ﷺ-এর পবিত্র সিরাত।
এর ওপর ভিত্তি করেই বলছি, ইসলামি বিপ্লবের যে রূপরেখা আমি আপনাদের সামনে পেশ করতে যাচ্ছি, এর জন্য আমার সোর্স হচ্ছে শুধুই রাসূল ﷺ-এর সিরাত। আমি ধর্মীয় পরিভাষা—দ্বীন, ইসলাম, ঈমান, জিহাদ প্রভৃতি ব্যবহার করা ছাড়াই আধুনিক যুগের পরিভাষা ব্যবহার করে আপনাদের সামনে বিপ্লবের ধাপ-পর্যায়গুলো তুলে ধরতে চাই। এর কারণ হচ্ছে, অধঃপতনের এ যুগে পরিভাষাগুলো এত বেশি ধর্মীয়কেন্দ্রিক হয়ে গেছে, নয়তো এত বেশি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন যখন আমরা কোনো পরিভাষা ব্যবহার করব, তখন ঠিক সেই অর্থগুলোই মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকবে। তাই সেসব পরিভাষা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে যদি আধুনিক পরিভাষায় আলোচনা করি, তাহলে বিপ্লবের যে রূপরেখা আমি পেশ করতে যাচ্ছি—আপনাদের পক্ষে তা বোঝোটা তুলনামূলক অধিক সহজ হবে। এই রূপরেখা উপস্থাপনে পর আমরা চেষ্টা করব তা কুরআন-হাদিসের পরিভাষায় এবং রাসূল ﷺ-এর সিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির সমন্বয়ে উপস্থাপন করতে।
টিকাঃ
৩. ড. ইসরার আহমাদ এ বক্তব্যটি ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে দিয়েছিলেন। —অনুবাদক
📄 ইসলামি বিপ্লব ও তার সাংগঠনিক বুনিয়াদ
আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর ওপর যারা ঈমান এনেছেন, তিনি তাদের সংগঠিত করে তারবিয়াত প্রদান করেছেন। এই সংগঠনের প্রথম বুনিয়াদ ছিল, যারা এটা মেনে নিয়েছে যে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর নবি। তিনি যা কিছু বলছেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বলছেন; কারণ, তা তাঁর ওপর ওহি হয়েছে। এ কথা মেনে নেওয়ার পর তাদের পক্ষে রাসূল ﷺ-এর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করা কীভাবে সম্ভব? পৃথিবীতে আপনি এর চেয়ে মজবুত ও সুশৃঙ্খল সংগঠনের কথা কল্পনাও করতে পারবেন না, যে সংগঠন নবুয়্যাতের বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কথাটি ভালোভাবে হৃদয়ে গেঁথে নিন!
বর্তমান যুগেও আপনি এর উদাহরণ পাবেন যে, সত্য নবুয়্যাত তো নবুয়্যাতই; সংগঠনের অনেক বড়ো বুনিয়াদ—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না; এমনকি মিথ্যা নবুয়্যাতও পর্যন্ত বড়ো বুনিয়াদের ভূমিকা রাখে। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানির মিথ্যা নবুয়্যাতের ওপর যে গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকে কেন্দ্র করেও যে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে, তাদের কথাই ভাবুন না! কোথায় থেকে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে, তাদের লাহোরি ফিরকা—কোথায় পৌঁছে গেছে এরা। বিপরীতে তাদের লাহোরি ফিরকা—যারা গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকে নবি মানেি, তাদের অবস্থা দেখুন! ধীরে ধীরে বিক্ষিপ্ত হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
তাহলে বোঝা গেল, পৃথিবীতে সবচেয়ে মজবুত ও শক্তিশালী কোনো সংগঠন যদি হতে পারে, তবে তা কেবল নবুয়্যাতের বুনিয়াদের ওপরই হওয়া সম্ভব। এ কারণেই রাসূল ﷺ-এর সত্য ও শেষ নবি হওয়ার বুনিয়াদের ওপর যে সংগঠনটি তৈরি হয়েছিল, তা পৃথিবীর সবচেয়ে মজবুত, শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল সংগঠন ছিল। যার ব্যাপারে কুরআনেও বলা হয়েছে—
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গে যারা আছেন। (সূরা ফাতহ : ২৯)
এই সংগঠনের কেউ রাসূল ﷺ-কে সংগঠনের আমির করেনি; বরং রাসূল ﷺ নবি ও দাঈ হওয়ার কারণে নিজেই আমির ও প্রধান ছিলেন। তাঁর সাহাবিরা سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا (শুনলাম ও মেনে নিলাম)-এর জলজ্যান্ত অনুগামী ছিলেন। তারপর রাসূল ﷺ অনাগতদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য যদি তাদের এই বিপ্লবের পথ ধরে হাঁটতে হয়, তাহলে কীভাবে তারা সংগঠন বানাবে সেটা বোঝাতে—বাইয়াতের কাজ শুরু করেন।
উবাদা ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিস পেশ করছি, যা ইমাম বুখারি ও মুসলিম দুজনেই বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক থেকে এর চেয়ে বিশুদ্ধ হাদিস প্রমাণের জন্য আসতে পারে না। তিনি বলেন, بَايَعْنَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ وَالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَعَلَى أَثَرَةٍ عَلَيْنَا، وَعَلَى أَنْ لَا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ، وَعَلَى أَنْ نَقُولَ بِالْحَقِّ أَيْنَمَا كُنَّا، لَا نَخَافُ فِي اللَّهِ لَوْمَةَ لَائِمٍ ‘আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করি ‘শোনা ও আনুগত্য করার ওপর’ অনুকূল ও প্রতিকূল উভয় অবস্থায়’, ‘তিনি আমাদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দিলেও’। আমরা আরও বাইয়াত গ্রহণ করি যে, ‘যেখানে থাকব, অবশ্যই আমরা সত্য বলব। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরোয়া করব না’। আমাদের কাছে যে বিষয়টি সঠিক মনে হবে, আমরা তা দ্বিধাহীনচিত্তে বলে দেবো। লোকদের ভয়ে মুখ বন্ধ করে বসে থাকব না। এটা ছিল সংগঠনের দ্বিতীয় বুনিয়াদ।
পাঠক! এবার আপনারাই ভেবে দেখুন, আসলেই কি রাসূল ﷺ-এর জন্য সাহাবিদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণের আদৌ প্রয়োজন ছিল? তাঁর সব আদেশ মানার জন্য ঈমান আনাই কি যথেষ্ট ছিল না? কুরআনের ভাষায়—
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ
আমরা সব রাসূলকে এ উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে, মানুষ আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আনুগত্য করবে। ( সূরা নিসা : ৬৪)
এরপরও রাসূল ﷺ বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। এর পেছনের উদ্দেশ্য কী? এর পেছনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অনাগতদের দিকনির্দেশনা দেওয়া। তাদের দৃষ্টি তৈরি করে দেওয়া।
গাজওয়ায়ে বদরের আগে রাসূল ﷺ একটি পরামর্শসভার আয়োজন করেছিলেন। পরামর্শের বিষয় ছিল, উত্তর দিক থেকে কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী কাফেলা আসছে, যার সুরক্ষায় নিয়োজিত আছে মাত্র ৪০-৫০ জন অস্ত্রধারী। অন্যদিকে দক্ষিণ থেকে একটি বিশাল এক বাহিনী ধেয়ে আসছে। আর আল্লাহ তায়ালাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, উত্তর-দক্ষিণ থেকে ধেয়ে আসা দল দুটির মধ্যে যেকোনো একটির ওপর তোমাদের অবশ্যই বিজয় দান করবেন।
উপস্থিত সাহাবিদের কাছে পরামর্শ চেয়ে রাসূল ﷺ বলেন, ‘আবার তোমরা পরামর্শ দাও, আমাদের কোনদিকে যাওয়া উচিত? উপস্থিত কেউ কেউ উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ব্যবসায়ী কাফেলার দিকে চলুন! সামান্য কিছু যুদ্ধাস্ত্র আছে, তাদের ওপর হামলা করে সহজেই কাবু করে ফেলব। এতে গনিমত হিসেবে আমাদের হাতে অনেক কিছু এসে যাবে। যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রও আমরা পেয়ে যাব; যার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছি।’
তাদের কথা শোনার পরও রাসূল ﷺ আবারও পরামর্শ তলব করেন। সাহাবিগণ বুঝে যান, রাসূল ﷺ-এর ইচ্ছা ভিন্ন কিছু। বিষয়টি বুঝতে পেরে সাদ রা. প্রথমে নিজেরদের মধ্য থেকে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন; কিন্তু রাসূল ﷺ তাতে বিশেষ আগ্রহ দেখালেন না। এতে সাহাবিরা অনুভব করতে পারছিলেন, রাসূল ﷺ বিশেষ কোনো কিছুর অপেক্ষা করছেন।
মুহাজিরদের মধ্য থেকে মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা. দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার আদেশ করুন! আমাদের মূসা আ.-এর সঙ্গীদের মতো পাবেন না, যারা মূসা আ.-কে বলেছিল, “হে মূসা! আপনি আর আপনার প্রতিপালক গিয়ে যুদ্ধ করুন। এখানে বসে আছি”। হতে পারে, আল্লাহ আমাদের মাধ্যমে আপনাকে প্রশান্তি দান করবেন।’
মিকদাদ রা.-এর কথা শেষ হলেও রাসূল ﷺ-কে দেখে মনে হলো, তিনি যেন অন্য কিছুর অপেক্ষায় আছেন! এরই মধ্যে সাআদ ইবনে মুআজ রা. বুঝে যান—রাসূল ﷺ মূলত বিশেষভাবে আনসারদের মতামত জানতে অপেক্ষা করছেন। কারণ, বাইয়াতে আকাবায় দ্বিতীয় আনসারার বাইয়াত গ্রহণের সময় এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে, কুরাইশরা যদি রাসূল ﷺ-এর পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে মদিনার ওপর আক্রমণ করে বসে—তখন আমরা সেটার তাঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করব, যেভাবে নিজেদের পরিবার-পরিজনের করে থাকি। এখনকার অবস্থা ভিন্ন—কুরাইশরা তখন মদিনার ওপর আক্রমণ করেনি। এখন রাসূল ﷺ নিজে মদিনা থেকে বের হয়ে যুদ্ধ করতে চাচ্ছিলেন।
বাইয়াতে আকাবায় দ্বিতীয় মজলিসে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে কুরাইশরা মদিনার ওপর আক্রমণ করলে আনসাররা তাদের প্রতিরোধে যুদ্ধ করা বাধ্য ছিল; কিন্তু মদিনা থেকে বের হয়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে তো তারা বাধ্য নয়। এ জন্যই মূলত রাসূল ﷺ বিশেষভাবে আনসারদের মতামত ও সমর্থনের অপেক্ষা করছিলেন।
বিষয়টি যখন সাআদ রা. বুঝতে পারেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, সম্ভব, যতদূর আন্দাজ করতে পারছি, আপনি বিশেষভাবে আমাদের মতামত জানতে চাচ্ছেন?’
সামনের কথাটি সবাই খেয়াল করে শুনবেন। সাআদ রা. কত-না উত্তম বাক্য ব্যবহার করে নিজেদের কথা ব্যক্ত করেছেন! তিনি বলেছেন—آمَنَّا بِكَ، وَصَدَّقْنَاكَ ‘আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনাকে সমর্থন করেছি’। তো আমরা যেহেতু আপনাকে আল্লাহর নবি ও রাসূল হিসেবে মেনে নিয়েছি, এখন আর আমাদের এখতিয়ার কোথায়? আপনি যে আদেশই দেবেন, তা আমাদের মাথার ওপর! যেখানে ইচ্ছা আমাদের নিয়ে যাবেন, আল্লাহর শপথ! যদি আপনি যোদ্ধাসহ সমুদ্রে ঝাঁপ দিতেও বলেন, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই আমরা ঝাঁপ দেবো।
অতএব, রাসূল ﷺ-এর তখন কারও বাইয়াত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল না। তিনি আল্লাহর নবি ও রাসূল হওয়ার কারণে এমনিতেই অনুসরণীয় ছিলেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও সাহাবিদের তিনি কেন বাইয়াতবদ্ধ করেছেন? নবি হওয়ার পরও তিনি সাহাবিদের বাইয়াত নিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে মুসলমানদের কোনো সংগঠন বানানোর প্রয়োজন হলে, তারা ইংরেজ, রুশ বা জার্মানদের থেকে নিয়মনীতি ধার করতে না শুরু করে; বরং সেই নিয়মনীতিকেই সংগঠনের বুনিয়াদ বানায়, যা তিনি ﷺ রেখে গেছেন।
📄 বিপ্লবী সংগঠন ও তারবিয়াতের নববি পদ্ধতি
তারবিয়াতের জন্য চারটি বিষয় সবিশেষ লক্ষণীয়, যার ব্যাপারে আমি তারবিয়াত প্রসঙ্গে আগের আলোচনায় মোটামুটি আভাস দিয়েছি। এখানে আরও কিছুটা বিস্তারিত বলছি।
প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, বিপ্লবের যে দর্শন—সব সময় তা মন ও মননে ধারণ করতে হবে। রাসূল ﷺ-এর বিপ্লবী দর্শন ও চিন্তাধারার মূল উৎস ছিল কুরআন। সেই ধারাবাহিকতায় আজও যে ইসলামি আন্দোলন পরিচালিত হবে, তারও মূল উৎস হবে এ কুরআনই। ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে কুরআন পাঠ করতে হবে এবং এই পাঠ অব্যাহত রাখতে হবে, যেন বিপ্লবের দর্শন ও সব সময় চর্চিত হতে থাকে। এর জন্য কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনারও ব্যবস্থা করা যায়, যাকে পরিভাষায় ‘মুজাকারা’ বলে। কর্মীরা একসঙ্গে বা ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বসবে। তারপর কুরআন পড়বে, শিখবে ও শেখাবে। এর সবচেয়ে বড়ো ফায়দা এটাই যে, তাদের ভেতরে লালন করা বিপ্লবী দর্শন ও সর্বদা সতেজ এবং জাগরূক থাকবে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, ‘শোনা এবং মানা’। এক্ষেত্রে কর্মীদের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা হলো, তাদের কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়, তারপরও কোনো প্রতিরোধ করা যাবে না। দেখুন, একজন ব্যক্তি যখন বুঝতে পারছে—এরা আমাকে হত্যা করবে, তখন বেচারি দিশেহারা (desperate) হয়ে প্রথমে দু-চারজনকে মেরে তারপর নিজে মরবে। একটা বিড়ালকেও দেখুন না! যখন কোনো বিড়ালকে কোণঠাসা (corner) করে ফেলবেন আর বিড়ালটিও বুঝতে পারবে, এখন তার জন্য হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই, তখন সে সোজা আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠিক এখানে বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ অবস্থায় প্রতিরোধের কোনো সুযোগ নেই।
সায়্যিদ শাবাব ইবনে আরত রা.-কে আগুনের অঙ্গার বিছিয়ে তাতে শুইয়ে দেওয়া হয়। এই কঠিন প্রতিরোধ করা ছাড়াই তা সইতে থাকেন। পিঠের চামড়া জ্বলে যায়। চর্বি গলে যায়। বিগলিত চর্বিতে অঙ্গার পর্যন্ত নিভে যায়। একটু ভেবে দেখুন তো! আপনি যদি দেখতেন আপনার বাপকে আগুনে ঝলসে দেওয়া হচ্ছে, তখন আপনি কী করতেন? নিশ্চয় দু-চারজনকে মেরেই ফেলতেন? কিন্তু ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের তারবিয়াতের এই অধ্যায়ে এসবের অনুমতি নেই। এ পর্যায়ে কোনো প্রতিরোধ চলবে না। আমার মতে, শোনা ও মানার ক্ষেত্রে এরচেয়ে ওজনদার ও কঠিন আর কোনো রূপ হতেই পারে না।
তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, নিজের জানমাল ও সন্তানসন্ততি থেকে শুরু করে নিজের সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার মানসিকতা থাকতে হবে। এমনিতেই পৃথিবীতে বিপ্লবী চিন্তাধারা থেকে সংগঠিত দলগুলো লোকেরা এসব উৎসর্গ করে থাকে। কমিউনিস্ট বিপ্লব কখনও সংগঠিত হতো না, যদি লোকেরা জানমাল উৎসর্গ না করত, সব ধরনের দুঃখ সইতে মাথা পেতে না নিত। বিপরীতে মুসলমানদের জন্য এরচেয়ে বড়ো দর্শন আর কী হতে পারে?
আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জানমালের কোরবানি পেশ করা তো সহজ, অন্যদের পক্ষে তা কল্পনা করাও কঠিন। কারণ, মুসলিমরা পরকালের জীবনে বিশ্বাসী। তাদের কাছে পরকালের জীবনই আসল জীবন। তারা যদি আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সবকিছু কোরবানি করে দেয়, এতে তাদের লোকসানের কোনো চিন্তা নেই। তাদের তো বিশ্বাসই হচ্ছে এমন যে, ‘পৃথিবীতে আমি যা কিছু কোরবানি পেশ করব, আখিরাতে তার অনেক গুণ সওয়াব পাব, হাজার গুণ বেশি পাব। সুতরাং এতে লোকসানের তো প্রশ্নই আসে না!’
পরকালে একজন ব্যক্তির পুরস্কার যখন এত মজবুত হবে, সে আল্লাহর রাস্তায় নিজের সবকিছু উৎসর্গ করার প্রতি তত বেশি তৎপর হবে। কারণ, আমার জানা মতে, পৃথিবীতে যা কিছুই খরচ করব, পরকালের জীবনে আমি তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি লাভ করব; এরপরও যদি আমি নিজের প্রিয়গুলো আল্লাহর রাস্তায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উৎসর্গ না করি, তাহলে আমার চেয়ে বেশি বোকা ও হতভাগা আর কে হতে পারে? ব্যাপক অর্থে পৃথিবীতে এমন কোনো দর্শন নেই যা পরকালের এমন মুনাফা দেয়; কিন্তু আল্লাহর বান্দার পক্ষে পড়ে আছে—যা আমাকে সওয়াবের এমন মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তো এরপরও আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে এত বেশি কার্পণ্য কেন? যেমনটা নবি ﷺ বলেছেন, ‘জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না।’
পৃথিবীতে কিছু সংস্করণ করা যাবে না। এখানে পোকামাকড়ের লিন্স নিচু করা যাবে। পূর্ব-পশ্চিমেরও নষ্ট করতে পারবে না, স্থির আমারও নেই। আর তোমাদের একটি পরামর্শ দিয়ে যাই, যা তোমাদের কাজে আসবে। মনে রাখবে—যেখানে তোমাদের সম্পদ হবে, তোমাদের মন-দিলও সেখানে পড়ে থাকবে।
তোমরা যদি পৃথিবীতে ধনসম্পদ সঞ্চয় করো, তাহলে তোমাদের মন ও দিল এখানে আঁটকে পড়ে থাকবে। যখন ফেরেশতারা জান কবজ করতে আসবে, তখন হতাশা আর আফসোস ছাড়া কিছুই থাকবে না। হাদিসে এসেছে, ফেরেশতারা এমনভাবে জান কবজ করবে, যেভাবে গরম সিক থেকে ভেজা চামড়া টেন বের করা হয়। এর বিপরীতে আপনার সম্পদ যদি আল্লাহর ব্যাংকে জমা হয়, তাহলে আপনার অন্তরও সেখানে লেগে থাকবে। মৃত্যুর সময় যখন আপনার অগ্রদূতের মতো ফেরেশতারা আসবে, তখন আপনার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি লেগে থাকবে। কবির ভাষায়—
نشان مرد مومن با تو گویم – چو مرگ آید تبسم بر لب اوست
একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় বলছি তোমায় আমি, ঠোঁটে মুচকি হাসি রেখেই শেষ হয় তার জিন্দেগানি।
দেখুন, বিষয়টি বোঝার জন্য আরও সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন তো, আপনি যদি টাকা সুইস ব্যাংকে জমা রেখে আসেন, তখন আপনার তো কোনো আফসোস হবে না, ‘হায় দেশে কেন এলাম?’ দেশ থেকে আপনার কোনো মোহ থাকবে না। আপনার কোনো অর্থমন্ত্রী না থাকে, কোনো দেশীয় মানুষও থাকে আর এরই মধ্যে আপনাকে বলা হয়, ‘যাও, দেশ থেকে বেরিয়ে যাও!’, তখন নিশ্চয় আপনি অনেক খুশি হবেন। এটা মূলত পরকালের প্রতি বিশ্বাসেরই ফল, যা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও মুমিনদের মুখে হাসি আনে; তাই তো তারা ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়া, বসনিয়া ও আফগানিস্তানে মুসলমানদের জানের কোরবানি দেখেও বলে, ‘মুসলমানদের এমন হাল যে, তারা নিজের জানের কোরবানি পেশ করতে পর্যন্ত কোনো পরোয়া করে না!’ এসব যে পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসেরই আলামত—এতে সন্দেহ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
যখন মাওলানা মওদুদী রহ.-কে মৃত্যুর সাজা শোনানো হচ্ছিল, তখন আমি ইসলামি জমিয়তে তালাবার প্রধান দায়িত্বশীল ছিলাম। ‘আজম’-দৃঢ় প্রত্যয়, অটুট মনোবল ও অবিচলতা নিয়ে রচিত কবিতাটি ছাপিয়ে আমি মাওলানার কাছে কারাগারে পাঠিয়েছিলাম—
وہ وقت آیا کہ ہم کو قدرت ہماری سعی و عمل کا پھل دے
بتا رہی ہے یہ ظلمت شب کہ صبح نزدیک آ رہی ہے
ابھی کہیں امتحان باقی، فلاکتوں کے نشان باقی
قدم نہ پیچھے ہٹیں کہ قیمت ابھی پہلی آ رہی ہے
سپاہیوں سے حزیں نہ ہونا، فسوں سے اندوہ گیں نہ ہونا
اندوہ پردے میں زندگی کی نئی سحر جگمگا رہی ہے
ریش اہل نظر سے کہ دو کہ وہ آزمائش پہ جی نہ ہاریں
جسے سمجھتے تھے آزمایش وہی تو بیگانگی رہی ہے!
সে সময়ও আসবে, কুদরত আমাদের মেহনতের ফল দেবে।
লোকেরা বলছে, প্রভাত নিকটবর্তী, এ রাতের তমসাও বিদূরিত হবে।
এখনও বাকি আছে কিছু ইমতিহান, বাকি দুর্ভাগ্যের বহু নিশান,
পিছু হটবে না হে মুসাফির, বাকি আজও কিছু নিয়তির দাস্তান।
বিচলিত হবে না আঁধারে, হবে না হতাশার ভারে কৃষ্ণকায়,
আওয়াজ দিচ্ছে, রাতের কালো এ পর্দার আড়ালেই আছে জীবনের প্রভাত।
তার বলছে, যুগসচেতন সেই নেতাকে বলে দাও, বিপদে যেন তারাভ্রান্ত না হয়,
কারণ, যাকে এতদিন পরীক্ষা ভাবত, তা-ই হচ্ছে জীবনের এক কঠিন সময়।
এটি রইস আমরহার কবিতা। রইসের আসল নগর’ (যুগসচেতনতা)—এর ছন্দেও আমি একটি ছন্দ করেছিলাম।
রাসূল ﷺ-এর মেহনতে আধ্যাত্মিক তারবিয়াতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আধ্যাত্মিকতা তৈরির সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হচ্ছে কুরআন। এর মাধ্যমে কুরআনকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তার মাধ্যমে বিপ্লবীদের হৃদয়ে আগুন প্রজ্বলিত করা হয়েছিল। এরই সঙ্গে তাহাজ্জুদের মাধ্যমে তাদের আত্মিক বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করারও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ আরও প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছিল এবং তাহাজ্জুদে কুরআনকে নিজেদের হৃদয়ের গভীরে স্থান দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন—
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِّصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
হে বস্ত্রাবৃত! রাতে ইবাদতের জন্য দাঁড়ান; তবে কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক বা তার চেয়ে কিছুটা কম। অথবা তার চেয়ে একটু বাড়ান। আর সময় আপনি তারতিলের সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত করুন। নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি এক অতি ওজনদার বাণীর ভারি নাযিল করছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাত্রিজাগরণ আত্মসংযমের জন্য অধিকতর প্রবল এবং জবানের জন্য খুব উপযোগী। (সূরা মুযযাম্মিল : ১-৬)
কুরআন তো এমনিতেই নূর, যা অন্তরের যাবতীয় অন্ধকার দূর করে তা আলোকিত করার শক্তি রাখে। আর রাত্রিজাগরণ প্রবৃত্তিকে দমন করার ক্ষেত্রে খুবই প্রভাবক সাব্যস্ত হয়। তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধির জন্য তৃতীয় যে বিষয়টি খুব উৎসাহিত করা হয়েছে তা হলো, আল্লাহর রাস্তায় ধনসম্পদ ব্যয় করা।
তারবিয়াত প্রসঙ্গে এতক্ষণ যা কিছু বলেছি, এগুলো ছিল রাসূল ﷺ-এর তারবিয়াত প্রদানের তরিকা। আমাদের এখানে পরবর্তী সময়ে তারবিয়াতের যে তরিকা অস্তিত্বে এসেছে, তাতে তারবিয়াত ও খানকাকেন্দ্রিক যে তরিকা অনুসৃত রীতিনীতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাদের সেই মুরাকাবা, চিল্লা ও জিকিরের নিয়মনীতি কিছুটা ভিন্নতর। আমি সেই তরিকার কথা বলছি না। আমি সুলুকে মুহাম্মাদির কথা বলছি। বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য যেই তারবিয়াত প্রয়োজন, সেই তারবিয়াতের কথা বলছি, যা রাসূল ﷺ তাঁর প্রিয় সাহাবিদের প্রদান করেছিলেন। প্রিয় পাঠক! মোটাদাগে আমি সেই তারবিয়াতের মূল উপাদানগুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।
টিকাঃ
৭. ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে, সুস্পষ্ট উচ্চারণে, অর্থের দিকে মনোযোগী হয়ে কুরআন পড়াকে ‘তারতিল’ বলে।