📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন

📄 একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন


বর্তমান যুগে ইসলামী কর্মকান্ডের অনেক পন্থা ও পদ্ধতি অব্যাহতভাবে চালু রয়েছে। যার ফলে আশংকা করা হয় যে, এর দ্বারা হয়তো ইসলামী কর্মকান্ডের সঠিক চিত্র কলুষিত ও বিকৃত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী শক্তির ক্ষয় ও বাকযুদ্ধ এবং সংকীর্ণ দলীয় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। আমি বলছি না যে, এর দ্বারা ইসলামের খিদমত হচ্ছে না। খিদমত তো অবশ্যই হচ্ছে কিন্তু এমনটি যেন না হয় যে, ইসলামী কর্মকান্ড সম্পর্কে এবং এর ভিন্নতা দেখে শত্রুরা আমাদের মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঘৃণার ভাব ছড়াতে সফল হয়। আর ইসলামপন্থীদের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। ইসলাম তো তার অনুসারীদের মাঝে ঐক্য ও সম্প্রীতি চায় এবং তাদেরকে জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে এই দুনিয়ার বুকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যা বিশ্বব্যাপী মানুষকে হেদায়াতের পথে নিয়ে আসবে।

একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা
বিশ্বব্যাপী একক ইসলামী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের কথা সকলেই অনুভব করেন। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত লক্ষ্য করা যায় না। ইসলামপন্থীদেরকে এ ব্যাপারে সকলেই কম বেশী তাগিদ দিয়ে থাকেন যে গোটা দুনিয়া ব্যাপী একই উদ্দেশ্য-লক্ষ্যকে নিয়ে যেহেতু আমরা সকলেই কাজ করছি। সেহেতু আমাদেরকে একই কাতারে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বের জাহেলিয়াতের মোকাবেলা করা উচিত। আবেগ তাড়িত হয়ে নয় বরং বাস্তবতার নিরিখেই অত্যন্ত ধীর-স্থির ভাবে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে আমাদেরকে কাজ করতে হবে যেন আমরা বিশ্বের তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে অত্যাচারিত-নিপীড়িতদের পক্ষে এবং আর্তমানবতার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে পারি। আর এ কাজটি করতে গেলে জাহেলিয়াতের সাথে যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব ঘটবে, বিশ্বব্যাপী একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে এর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদেরকে লড়তে হবে।

আরও একটি বিষয় হলো ইসলামী কর্মকান্ড তথা ইসলামী আন্দোলন যে সব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে বাস্তবে তা আন্তর্জাতিক সংগঠনেরই চ্যালেঞ্জ। যেমন ইহুদী জায়নবাদ, মাসুনিয়া, খ্রিষ্টান মিশনারী, যাদের অর্থবল জনবল ও প্রভাব প্রতিপত্তিকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সব আন্তর্জাতিক ইসলামী বিরোধী চক্রান্তকারীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন: "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।" (সূরা আনফালঃ ৬০)

ইসলামী কর্মকান্ডের বর্তমান কিছু অভিজ্ঞতা
একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের জন্য যেসব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন সে সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমি বর্তমান ইসলামী কর্মকান্ডের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করতে চাই যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগতে পারে।

১. ওয়াজ ও নসিহত-এর পন্থা (তাবলীগি পদ্ধতি): এই পদ্ধতি যারা দাওয়াতের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করছেন তারা ব্যক্তিগত ভাবে বা জামায়াতবদ্ধভাবে বিশেষ নির্দিষ্ট সময়ে দৈনিক বা সাপ্তাহিক কিংবা মাস অথবা বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন। তাবলীগ জামায়াতের সাথে জড়িত লোকজন এত উৎসাহ উদ্দীপনা ও নিষ্ঠার সাথে দাওয়াত দিয়েও এমন কোন শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হননি যা জাহেলিয়াতের সয়লাবের মুখে একটু হলেও দাঁড়াতে পারে। তারা বর্তমানে যে পদ্ধতিতে কাজ করছেন এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও কোন ফল বয়ে আনতে পারবে না। কারণ-
ক. এই পদ্ধতির ফলে এমন কোন সংগঠন গড়ে উঠছে না, যা বাতিলের মোকাবেলায় কিছু বলে বা করে, এবং ভবিষ্যতে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার মত কোন কর্মসূচীও তাদের হাতে নাই।
খ. এই পদ্ধতির কর্মক্ষেত্র শুধুমাত্র মসজিদ এবং যারা মসজিদে আসে এসব লোকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ বলা চলে। সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা মোটেও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
গ. এই পদ্ধতির মাধ্যমে চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ আজ আসছে তার কোন জবাব বা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
ঘ. এই পদ্ধতিতে এমন কোন পরিকল্পনা নেই, যা দ্বারা যে বীজ বপন করা হচ্ছে তার ফসল নিজ ঘরে তুলে নিয়ে আসা যায়। এ মতেরই প্রবক্তাদের মধ্যে গণ্য করা যায় 'তাহের আল জাযায়েরী' এবং 'জামাল উদ্দিন আফগানী' প্রমুখ।

ওয়াজ নসীহতের পদ্ধতির বন্ধ্যাত্বের দিকে ইঙ্গিত করে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর আমীর ওস্তাদ আবুল আলা মওদুদী (রহ.) বলেন- ওয়াজ নসীহত দিয়ে খৃষ্টান মিশনারীদের পদ্ধতিতে দাওয়াত প্রদান এবং এ লক্ষ্যে হাজার হাজার বই পুস্তক বিতরণ ও সকাল বিকাল লাখ লাখ লোক এ কাজের দাওয়াত দিলেও কোন ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

ইসলাম যে সর্বযুগে সর্বস্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা তা বক্তৃতা ও লিখনীর মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব হবে না বরং তা বাস্তবে অনুসারীদের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে।

২. শক্তি ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ: বর্তমান যুগে ইসলামী কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন। যেমন এদের মধ্যে শহীদ আহমাদ শাহ বেরলভী (ভারত) তিনি তার অনুসারীদেরকে সমবেত করে অস্ত্র হাতে নিয়ে জিহাদের ঝান্ডা তুলে ধরেন এবং ভারতের উত্তরাঞ্চলে (বর্তমান পেশাওয়ার শহরের নিকটবর্তী) ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেন। কিন্তু সে সময়ে ইংরেজরা অত্যন্ত ধূর্ততা ও শঠতার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং মুসলিম নামধারী কিছু নেতার যোগসাজসে এই আন্দোলনের উপর চরম আঘাত হানে। এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহমাদ বেরলভী এবং তার হাজার হাজার অনুসারী নিহত হয় এবং শত্রু পক্ষেরও হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়। এটি ১২৪৬ হিজরীর ঘটনা। এখানেই এই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এপথেরই আরেকটি প্রচেষ্টা হলো 'শেখ ইজ্জুদ্দিন আল-কাস্সাম'-এর। তিনি ফিলিস্তীনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝান্ডা তুলেন। তিনি তার অনুসারীদেরকে জিহাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের আরও কয়েকজন প্রচেষ্টা চালান যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'নওয়াব সাফাভী'। কিন্তু তার এ আন্দোলনও তারই স্বদেশীয় কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্রের ফলে শেষ হয়ে যায়। তিনি ও তার অনুসারীরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৫৬ সালে শাহাদাৎ বরণ করেন।

ইসলামী কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে অস্ত্র বা শক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শহীদ হাসানুল বান্না বলেন- অনেকেই প্রশ্ন করেন ইখওয়ানুল মুসলিমীন কি তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শক্তি বা অস্ত্রের ব্যবহার করবে? আর ইখওয়ান কি রাজনৈতিক বা সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে? আমি এসব প্রশ্নকারীদেরকে কোন দ্বিধা-দ্বন্দে রাখতে চাই না। আমি পরিস্কার বলতে চাই যে, শক্তি ইসলামের একটি শ্লোগান। কুরআন পাকে বলা হয়েছে- "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।” (সূরা আনফালঃ ৬০)

কিন্তু ইখওয়ানুল মুসলিমীন অত্যন্ত গভীরভাবে এ আয়াতটি পর্যালোচনা করেছে। এর উদ্দেশ্য কি? তারা জানে যে, শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আকীদা ও ঈমানী শক্তি। এ শক্তির পরেই হচ্ছে অন্যান্য শক্তি। কোন দলকে ততক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী বলা যাবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান ও আকীদায় শক্তিশালী হয়। কারো ঈমান যদি মজবুত না থাকে তাহলে সে অস্ত্র হাতে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না। এজন্য ইখওয়ান অস্ত্রের শক্তিতে বিশ্বাস করে না, তারা বিশ্বাসী ঈমান ও আকীদার অস্ত্রে ও শক্তিতে।

৩. চিন্তার প্রসার ঘটানো (হিজবুত তাহরীর-এর অভিজ্ঞতা): হিজবুত তাহরীর মনে করে যে, ইসলামী চিন্তার প্রসার সবার মাঝে ঘটাতে হবে। চিন্তার জগতে বিপ্লব ঘটাতে হবে, বাতিলী চিন্তা ভাবনাকে উপড়িয়ে ফেলতে হবে। এজন্য হিজবুত তাহরীর বেশ কিছু প্রচার-প্রকাশনা করেছে। তারা চিন্তা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করছে। ইসলামী চিন্তা চেতনাকে সমুন্নত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইসলামী মনীষীরা হিজবুত তাহরীর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ তাদের উৎপত্তি, লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই মনে করেন এদের চিন্তার ক্ষেত্রে কোন পরিপক্কতা নেই। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। এদের বেশ কিছু প্রকাশনা দেখে যে কেউ মনে করতে পারেন যে এদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট নয়।

কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজবুত তাহরীরের কিছু কিছু ভালো দিক যেমন রয়েছে তেমনি কিছু খারাপ দিকও আছে। এটি সাধারণ জনগণের মাঝে তেমন কোন সাড়া ফেলতে পারেনি। এটি ইসলাম সম্পর্কে জনগণের মাঝে কোন ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারেনি। যার ফলে এটিকে একটি বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন বলে ধর্তব্যের মধ্যে আনা যেতে পারে না। হিজবুত তাহরীরের ব্যাপারে কতিপয় প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়-

(১) এটি মারাত্মক ভুল যে, কোন সংগঠন শুধুমাত্র চিন্তার উপরে নির্ভর করে কাজ করবে। চিন্তার পরিশুদ্ধি কখনও কোন কাজে আসতে পারে না যতক্ষণ না তা বাস্তবে প্রয়োগ হয়। তারা যেমন ইখওয়ানকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে, তেমনি ইখওয়ান তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে যে, তারা একমাত্র চিন্তা বা বাস্তবতা বিবর্জিত প্রোগ্রাম গ্রহণ করে কাজ করছে।
রাসূল (সা.) এর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি চিন্তার পরিশুদ্ধির সাথে সাথে বাস্তব জীবনে এর প্রশিক্ষণ দিতেন। তাদেরকে চারিত্রিক এবং আত্মিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জিহাদী মনোভাব নিয়ে গড়ে তুলেছেন।

২) হিজবুত তাহরীরের আরেকটি ভুল হলো তারা চিন্তার পরিশুদ্ধির সাথে সাথে একলাফে ক্ষমতার মসনদে যেতে চায়। এর অর্থ হলো যে ব্রীজ তৈরি করতে গিয়ে নিচে কোন ভিত্তি না দিয়েই উপরে বালু সিমেন্ট ঢালা। বাতিল কি এত সহজেই আমাদেরকে ছাড় দিবে? এটি খুব হাস্যকর হয়েছে যে, একটি গোষ্ঠী হঠাৎ করে হিজবুত তাহরীর দল ঘোষণার পরে পত্র-পত্রিকায় কিছু বিবৃতি দিয়ে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অন্যান্য দলের মত নেমে পড়ে। অথচ তাদের কোন কর্মী বা নেতাই তৈরী হয়নি।

৩) হিজবুত তাহরীরের আরেকটি বিরাট ভুল হলো যে, তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন শক্তির কাছে তাদের ভাষায় 'সাহায্য সহযোগিতা চায়'। যেমন তারা সিরিয়ার কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছে। তারা আবার ইরাকের কাছেও একবার সাহায্য চেয়েছে। সাহায্য চেয়ে বা অন্য কোন শক্তির উপর ভরসা করে ইসলামী বিপ্লব সাধন হতে পারে না। এর অর্থ হলো ইসলামী বিপ্লব একপ্রান্তে আর ছাইয়ের গাদার আরেক প্রান্ত থেকে যেনো কেউ তাতে ফুঁ দিচ্ছে।

আমি এখানে একটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করতে চাই যে, শুধু চিন্তার পরিশুদ্ধি দিয়ে বা আবেগ তাড়িত হয়ে ইসলাম কায়েম হবে না। শহীদ সাইয়েদ কুতুব এ বিষয়টিকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার লিখিত 'পথের মাইলস্টোন' নামক গ্রন্থে "কেউ কেউ মনে করেন যে, যেহেতু মানুষ ইসলাম পছন্দ করে এবং লোকজন ইসলামী ব্যক্তিত্বকে ভালো জানে সেজন্য অতি দ্রুত বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে উল্টিয়ে দিয়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি এসব অতি উৎসাহী ভাইদেরকে বলতে চাই, ইসলামের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত একদল লোক তৈরী না হবে, একটি সমাজ তৈরী না হবে যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে গ্রহণ করতে আদৌ রাজী নয় এরকম লোক ছাড়া ইসলাম কায়েম করা যাবে না।"

আমি এ বলে বিষয়টি ইতি টানতে চাই যে, লোকজন তৈরী না করে ইসলামের অনুসারী সমাজ এবং মর্দে মুজাহিদ তৈরী না হওয়া পর্যন্ত শুধু চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধি নিয়ে এসে অন্ততঃ ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। যেমনটি আজকে হিজবুত তাহরীরের অভিজ্ঞতার আলোকে ফুটে উঠেছে।

৪. গভীর ঈমান এবং অব্যাহত কর্মতৎপরতা (ইখওয়ানুল মুসলিমীনের অভিজ্ঞতা): ইখওয়ানুল মুসলিমীন সংগঠনটি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই একটি পরিকল্পিত সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসানুল বান্না তার প্রথম দিনের বক্তব্যেই তুলে ধরেন। "হে ভাইয়েরা! আমরা এই দাওয়াতের মিরাসকে যুগের পর যুগ ধরে চালিয়ে যেতে চাই। যেন এই দাওয়াতের আলোকে অন্ধকার বিদূরিত হয়। মহান আল্লাহ যেন আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার জন্য এবং নতুন করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপনাদেরকে তৈরী করার সুযোগ দেন এবং তিনি এটিকে কবুল করেন।

আমরা এই লক্ষ্যের জন্য কিভাবে কাজ করবো? বক্তৃতা বিবৃতি, বই-পুস্তক, আলোচনা সভা ইত্যাদি করে রোগ চিত্রিত করে তার সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দায়ীদেরকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে, যে লক্ষ্যে আমাদের সবার দৃষ্টি ভঙ্গি থাকবে: ১. মজবুত ঈমান ২. সূক্ষ্ম সংগঠন পদ্ধতি ৩. অব্যাহত কর্মতৎপরতা।

হে আমার ভাইয়েরা! আপনারা কোন জনকল্যাণমূলক সংগঠনের লোক নন আবার কোন রাজনৈতিক দলেরও নন, যাদের বিশেষ কোন লক্ষ্য রয়েছে। বরং আপনারা হলেন এক নতুন আত্মা, এক চলমান শক্তি। যা এই উম্মতের অন্তঃকরণে সঞ্চারিত হবে এবং একে কুরআন দ্বারা জীবন্ত করবে। এটি একটি নতুন আলোকবর্তিকা যা সমস্ত অন্ধকারকে বিদূরিত করবে এবং এটি একজন দায়ীর কন্ঠস্বর যা রাসূলের সত্য দাওয়াতকে নতুনভাবে উচ্চকিত করবে। আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, মানুষ যখন এই দাওয়াতের কাজকে ছেড়ে দিয়েছিল, আমরা তখন এই দাওয়াতের দায়িত্বকে নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছি।

আপনাদেরকে যদি বলা হয়, আপনারা কিসের দাওয়াত দিচ্ছেন? আপনারা তাদেরকে বলুন, আমরা ইসলামের সেই দাওয়াত দিচ্ছি, যে দাওয়াত নিয়ে রাসূল (সা.) এসেছিলেন। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা- এটাও দাওয়াতের একটি অংশ। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, এটাতো রাজনীতি, তাহলে আপনারা বলুন, এটাই ইসলাম। আমরা এধরনের বিভাজনে বিশ্বাস করি না।

যদি আপনাদেরকে বলা হয় যে, আপনারা তো হলেন বিপ্লবী! আপনারা জবাব দিন- আমরা ইসলামের দাওয়াতদানকারী, আমরা ইসলাম নিয়েই গর্বিত। কেউ যদি আমাদেরকে বাধা দেয়, আমরা ধৈর্য্যের সাথে মোকাবেলা করবো, যারা বাধা দিবে তারাই অত্যাচারী।

তারা যদি বলে, তোমরাও বিভিন্ন লোক এবং সংগঠনের সাহায্য নিয়ে এসব করছো? তাহলে তাদেরকে আল্লাহর দেওয়া জবাব দিন "তোমাদের প্রতি সালাম, আমরা জাহেলদের সাথে ঝগড়া করতে চাই না"।
পূর্বের বক্তব্য থেকে একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে, ইখওয়ানুল মুসলিমীনের আন্দোলন ও সংগঠন অন্যান্য আন্দোলন ও সংগঠন থেকে ভিন্নতর। এ সংগঠন যেমন ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে তেমনি বাস্তব জীবনে ইসলামকে প্রয়োগ করার জন্য তার কর্মীদেরকে নির্দেশ দেয়। তাদেরকে সংগঠিত করে ইসলামের পথে সর্বোচ্চ কুরবানী করার জন্য যোগ্য কর্মীবাহিনী হিসাবে গড়ে তুলে। আর এটিকে আমরা বলতে পারি, ইসলামের দাওয়াতকে প্রচার ও প্রসার করার এক অব্যাহত সংগ্রাম। এটি একটি ফরয কাজ। অন্যান্য ফরয যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, ভালো কাজ করা, মন্দকাজ পরিত্যাগ করা ইত্যাদির মতই এটিও একটি ফরয কাজ। এটি এক চলমান সংগ্রাম। যে ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা হালকা ভাবে বা ভারী ভাবে বেরিয়ে পড় এবং সংগ্রাম কর তোমাদের মাল এবং জান দ্বারা আল্লাহর পথে। (সূরা তওবা-) শহীদ ইমাম হাসানুল বান্না তার বিভিন্ন বক্তব্যে অব্যাহত ভাবে ইসলামের জন্য জান মাল দিয়ে সংগ্রাম করার আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। তিনি ১৩৫৭ হিজরীতে ইখওয়ানের পঞ্চম সম্মেলনে বলেন- হে আমার ভাইয়েরা! আজকে আমাদের ভাইদেরকে ঈমান ও আকীদার বলে বলিয়ান হয়ে ইসলামী সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় তিনশতাধিক পুস্তক-পুস্তিকা ও বিবৃতি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্যই হলো মনমানসিকতার দিক দিয়ে এবং কর্মক্ষেত্রে ইসলামের জন্য মুজাহিদ হিসাবে নিজেদেরকে তৈরী করা। আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি যে, রাসূলের বাণীঃ "বারো হাজার (মুসলিম সেনা) কখনো সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হবে না।"

ইসলামী আন্দোলন, প্রতিঘাত ও অত্রাঞ্চলের অবস্থা: এটি আশা করা হয়েছিল যে, ইখওয়ানুল মুসলিমীন যেভাবে সর্বক্ষেত্রে সফলতা লাভ করছে, সে তার কাংখিত লক্ষ্যে খুব দ্রুতই পৌঁছে যাবে। আর এজন্য ইসলাম বিরোধী শক্তিবা একে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রথম কাজটি হলো ১৯৪৮ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম হাসানুল বান্নাকে শহীদ করে দেওয়া। এরপরে এর বড় বড় বিভিন্ন নেতাদেরকে শহীদ করে দেওয়া হয় এবং অব্যাহতভাবে ইখওয়ানের উপরে জেল-জুলুম- নির্যাতন চলতে থাকে।

এসব জুলুম নির্যাতনের ফলশ্রুতিতে এই আন্দোলনের কার্যক্রম গুটিয়ে পড়ে। আন্দোলনের উপরে রাজনৈতিক নিপীড়ন শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা এবং দেশে ইসলামী কার্যক্রম অনেকটাই গুটিয়ে যায়। মানুষের মৌলিক অধিকারকে বিশেষ করে ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের মৌলিক অধিকার পর্যন্ত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ইসলামপন্থীরা এতকিছু নির্যাতনের পরেও জনগণের মাঝে ইসলামের জন্য, ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য দরদী মানুষ তৈরী করতে সাফল্য পেয়েছেন এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত বাতিলের মোকাবেলায় অটল পাহাড়ের মত অবিচল থেকে ইখওয়ানের লোকজন কাজ করে যাচ্ছেন।

একক ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যাবলী
ইসলামী আন্দোলন বর্তমান যুগে যদি তাদের যে প্রধান লক্ষ্য- ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন এবং নতুন করে ইসলামী জীবনধারা চালু করা এ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু বাতিলের সাথে টক্কর দিয়ে গোটা দুনিয়াব্যাপী ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি করতে এই বিংশ শতাব্দীতেও সফল হয়েছে। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো:

এটি এক বিপ্লবী সংগঠন:
ইসলামী আন্দোলনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি বিপ্লবধর্মী। ইসলামের পথই হলো, তার কর্মপন্থাই হলো বিপ্লবী কর্মপন্থা। আর এটি তার কর্মচঞ্চলতার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে বিপ্লব এনে দেয়। এই বিপ্লবী মনোভাবের কারণেই ইসলাম যেকোন সংকট মোকাবেলায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনে নিজেদেরকে সেভাবে সংগঠিত করতে পারছে। প্রথম যে ইসলামী রাষ্ট্র রাসূল (সা.) করেছিলেন সেটিও কিন্তু مسلمانوں দীর্ঘ আন্দোলনের বিপ্লবেরই ফসল। রুশ ও ভল্টেয়ারের আন্দোলনের তৎপরতার ফলেই ফরাসী বিপ্লব সাধিত হয়েছে। মার্কস ও লেনিনের যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এটিও ভলটিয়ারের চিন্তা-চেতনারই ফসল। আমি একথা এজন্য উল্লেখ করছি, যে কোন সংগঠনের মধ্যে যদি বিপ্লবী মনোভাব না থাকে তাহলে তা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না।

নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত নয়: বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোন স্থানকেন্দ্রিক নয়। বরং এর কাজ সর্বত্র ব্যাপ্ত। রাসূলের যুগে হিজরতের অর্থইতো হলো ইসলামী কর্মকান্ড কোন বিশেষ কেন্দ্র বা স্থানকে ঘিরে চলছে না। বরং এর অর্থ হলো পৃথিবীর সর্বত্রই এর কাজ চলবে। কোন জায়গাতে বাধা পড়লে কাজ অন্য জায়গাতে ছড়িয়ে ফেলতে হবে। আর এ জন্যই ইসলামী কর্মকান্ডের বর্তমান যুগে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে যে, বিশ্বের সর্বত্র ইসলামের কাজ চলবে। কোন ব্যক্তি বা স্থানকে কেন্দ্র করে ইসলামের কাজ নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসলাম তার দাওয়াত ও কল্যাণ সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত করেছে।
সু-চিন্তিত অভিমত: ইসলামী আন্দোলন সু-চিন্তিত ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে আগাবে। এখানে আবেগের কোন স্থান নেই। ইসলামী দাওয়াতের এই বৈশিষ্ট্যটি এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইসলাম জাহেলিয়াতের দর্শনকে তার নিজস্ব দর্শন ও জ্ঞান দিয়েই মোকাবেলা করবে, আবেগ দিয়ে নয়।

জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্য: ইসলামী আন্দোলন মানবতার সভ্যতা ও কল্যাণে জ্ঞানগত দিক দিয়েই তার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে জ্ঞানের বিষয়টিকে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য ইসলাম বা ইসলামী আন্দোলন যেই সমাজের মধ্যে কাজ করে সেখানে দাওয়াতের ক্ষেত্রে জনগণের মানসিক, রাজনৈতিক এবং পারপার্শ্বিক যুক্তিভিত্তিক সমাধান পেশ করেছে।

আধ্যাত্মিকতা: ইসলামী আন্দোলন বিশেষভাবে নির্ভর করে খোদায়ী প্রশিক্ষণের উপরে। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, তার মন-মানসিকতায় আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলে। সে তার চিন্তার ক্ষেত্রে, সভ্যতার ক্ষেত্রে, জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে, আল্লাহর বিধানকে মাথায় রাখে। সে যেকোন কাজ করতে গেলে প্রথমেই চিন্তা করে, এটি হালাল না হারাম? এটি কি শরীয়ত সম্মত? কাজটি কি সমাজের জন্য কল্যাণকর ইত্যাদি ইত্যাদি। ইসলামী আন্দোলন এই খোদায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই তার কর্মী বাহিনীকে এমনভাবে তৈরী করে যে, তারা বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পিছপা হয় না। আর এটিই হলো মহান আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর ব্যাখ্যা: "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।" (সূরা আনফালঃ ৬০)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00