📄 আমাদের কতিপয় ব্যক্তিগত দুর্বলতা সমূহ
দা'য়ীকে সর্বপ্রথম দেখতে হবে নিজের দোষত্রুটির দিকে
মানুষ স্বভাবগতভাবেই ভুল-ত্রুটির সাথে যুক্ত কেননা ভাল ও মন্দের কার্যকারণ সদাসর্বদা তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। সে সব সময় উত্থানপতন ও সঠিক পথে থাকা এবং বক্রতায় পতিত হওয়ার মাঝে রয়েছে কখনো এদিক প্রবল হয় আবার কখনো আরেক দিক প্রবল আকার ধারণ করে। "সেই মুক্তি পেল যে একে পরিশুদ্ধ করল আর সে ব্যর্থ হল যে একে কলুষিত করল"। (সূরা লাইল: ৯-১০) একথার দিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, "অন্তঃকরণের ওপর ফিতনা ভর করে চাটাই বা মাদুরের এক একটি লতার মত। যে অন্তর এর একটি গ্রহণ করবে তাতে একটি কাল দাগ পড়বে আর যে অন্তঃকরণ একে অপছন্দ করবে তাতে একটি সাদা দাগ পড়বে এভাবেই একটি অন্তর সাদা পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। ফিতনা এ অন্তরের কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যতদিন আকাশ জমিন প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর অন্যটি হয়ে যাবে কালো অন্ধকারের ন্যায় যা না বুঝবে ভালকে ভাল হিসেবে আর মন্দকে খারাপ হিসেবে।" মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যে থাকে যতক্ষণ সে তার ভুল বুঝতে পেরে তা সংশোধনের কাজ করে। কেননা প্রতিটি বনি আদমই ভুলকারী আর উত্তম ভুলকারী হল তাওবাকারী। কিন্তু যাদের মধ্যে ভুলের ব্যাপারে কোনই অনুভূতি নেই আমরা এখানে তাদের ব্যাপারে কোন আলোচনা করতে চাইনা... এটা সাধারণ লোকজনের ক্ষেত্রে। কিন্তু বিশেষ লোকদের ক্ষেত্রে তারা যেন নিজেদের সংশোধনের বিষয়ের প্রতি শুধুমাত্র খেয়াল না রাখেন বরং নিজেদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করেন, গুনাহ থেকে নিজেদের পবিত্র করে মহান প্রভুর সাথে সম্পর্ক গভীর করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন যেন তাঁর ও নিজের মধ্যে কোন আড়াল বা অন্তরায় না থাকে।
এটিই ছিল প্রথম যুগের সেরা মানুষদের অবস্থা যারা পরকালের পথ চিনেছিলেন এবং সেই লম্বা পথের পাথেয় সংগ্রহ করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, "তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর। আর উত্তম পাথেয় হল আল্লাহ ভীতি (তাকওয়া)। হে জ্ঞানবানরা! তোমরা আমাকেই ভয় কর।" (সূরা বাকারা: ১৯৭)
একজন দীনের দা'য়ীকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে, গুনাহ থেকে মুক্ত হতে হবে যেন সে লোকদের জন্য হেদায়েত দানকারী এবং উত্তম অনুকরণীয় আদর্শবান হতে পারে। কোন ছোটখাট ত্রুটিকেও যেন অবজ্ঞা না করা হয়। কেননা ছোটখাট পাপের পথ ধরেই বড় পাপে পড়ে মানুষ। গুনাহ কে তুচ্ছজ্ঞান করলে গুনাহতে লিপ্ত হবার সমূহ আশংকা থাকে আর নিষিদ্ধ এলাকার পাশে ঘুরাফেরা করলে তাতে পতিত হবার আশংকা রয়েছে। দোষত্রুটি জানার অনেক মাধ্যম রয়েছে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলঃ
প্রথমত: আমলকারী আলেম ও সৎ দা'য়ীদের মজলিসে বসার জন্য আপ্রান চেষ্টা করতে হবে এবং তাদের সাথে চলে নিজের গোপন দোষত্রুটির ব্যাপারে এঁদের পরামর্শ গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। এ পথের অনুসরণ করার ব্যাপারে নবী করীম (সা.) থেকে অনেকগুলো হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যখন তোমরা জান্নাতের টুকরার পাশ দিয়ে যাবে তখন তা থেকে কিছু আরোহন করে নিও। তারা বললেন জান্নাতের বাগিচা কোনটি? তিনি বললেন, ইলমের মজলিস।” আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, লোকমান হাকীম তার ছেলেকে বলেন, হে বৎস! তুমি আলেম ওলামাদের মজলিসে বসবে, জ্ঞানীদের নিকট থেকে হিকমতের কথা শুনবে। মহান আল্লাহ হিকমতের আলোতে মৃত অন্তরকে পুনর্জীবিত করেন যেমন বৃষ্টির পানিতে মাটি পুনর্জীবিত হয়ে থাকে।” ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। বলা হয়, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কোন মজলিস সবচেয়ে কল্যাণকর? তিনি বললেন, "যাদের দেখলে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ হবে, যাদের কথা তোমাদের জ্ঞানের পরিধিকে বৃদ্ধি করবে এবং যার আমল তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে।"
দ্বিতীয়: একজন দীনদার পরহেজগার, সত্যবাদী ভাইকে সাথী বানিয়ে নিবে যে তাকে তার ভুল ধরিয়ে দিবে, বিপদে সাহায্য করবে, ভুলে গেলে স্মরণ করিয়ে দিবে। আর এটি হল ইসলামী ভ্রাতৃত্বেরই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, "তুমি কেবল দীনদার ব্যক্তির সঙ্গ গ্রহণ করবে, আর তোমার খাবার যেন খোদাভীরু লোকেই কেবল খায়।” হযরত উমর ফারুক (রা.) এর মর্যাদা অনেক বেশী এবং তিনি এ দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের অন্যতম। এরপরও তিনি সর্বদা বলতেন, "আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন যে আমার ভুল ধরিয়ে দেয়।" তিনি রাসূলের (সা.) গোপন তথ্য জানা বিশিষ্ট সাহাবী হুজায়ফা (রা.) কে জিজ্ঞেস করতেন, রাসূল (সা.) কি আমার নাম মুনাফিকদের নামের তালিকায় বলেছেন বা আমার মাঝে কি মুনাফেকীর কোন কিছু রয়েছে।”
তৃতীয়ত: অন্যের দোষ দেখে নিজের দোষ-ত্রুটি জেনে তা দূর করবে। লোকদের মধ্যে যা কিছু খারাপ দেখবে নিজেকে তা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) কে বলা হয়েছিল, আপনাকে কে আদব-কায়দা (শিষ্টাচার) শিক্ষা দিয়েছে? তিনি বলেন, কেউ শিক্ষা দেয়নি। আমি অজ্ঞের অজ্ঞতার কদর্যতা দেখে তা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি।"
এ হল একজন দা'য়ীর নিজের দোষত্রুটি জানার মাধ্যম, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করার কৌশল। এরপর আসবে কাজের পালা, নিজেকে সংশোধনের দোষত্রুটির চিকিৎসা কার্যক্রম গুনাহ থেকে মুক্ত হবার ও দোষত্রুটির চিকিৎসার একটি মাত্র পথ তা হল প্রথমেই খালেস নিয়তে তাওবা করতে হবে এবং গোপন প্রকাশ্য সব ধরণের পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। এমনকি শরীয়তের সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলের (সা.) এই বাণীর ওপর আমল করেঃ "যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত কাজ থেকে বেঁচে থাকল সে তার দীনকে, ইজ্জতকে মুক্ত রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়ে লিপ্ত হল সে হারামে লিপ্ত হল।" দা'য়ী ভাইকে সদাসর্বদা চিন্তা করতে যেন সবসময় আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে নফল ইবাদতের মাঝে নিমগ্ন রাখে বিশেষ করে রাতে তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়ায়।” আর রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়ুন এটি আপনার জন্য নফল (অতিরিক্ত) স্বরূপ। আশা করা যায় আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত স্থানে) প্রেরণ করবেন।" (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৭৯) ইবরাহীম ইবনে আদহামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পরহেজগারীতা কিভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করবে? তিনি বলেন, তুমি সকল মানুষকে সমান মনে করবে। নিজের গুনাহর কথা স্মরণ করে অন্যের দোষখোঁজা থেকে বিরত থাকবে। তোমাকে নিমগ্ন অন্তর নিয়ে ভাল কথা বলতে হবে মহা পরাক্রান্ত আল্লাহর কাছে। তুমি তোমার গুনাহর ব্যাপারে চিন্তা কর এবং তোমার প্রভুর কাছে তাওবা কর তাহলেই তোমার অন্তঃকরণে পরহেজগারীতা স্থায়ী হবে। আর কোন চাওয়া-পাওয়া ও লোভ-লালসা একমাত্র আল্লাহর কাছেই করবে।"
ইবাদতের কল্যাণকর দিকই হল তা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে পূর্ণতার দরজায় পৌঁছে দেয় এবং রবের নৈকট্যলাভ হয়। এ অর্থই ব্যক্ত হয়েছে কুরআনের এ আয়াতে "নিশ্চয় নামায অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত : ৩৯) নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, "যদি তোমাদের কারো বাড়ীর কাছে নদী থাকে যাতে সে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে তাহলে তার শরীরে কোন ময়লা থাকতে পারে? তারা বললেন, না, কোন ময়লা থাকতে পারে না। তিনি বললেন এভাবেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায। আল্লাহপাক এর দ্বারা গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।" আমরা মহান আল্লাহর নিকট দু'আ করি তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর আনুগত্য করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে গুনাহ থেকে হেফাযত করেন। আর আমাদের সেই সব লোকদের মধ্যে শামিল করেন যারা কুরআন-হাদীসের উপর উত্তম আমল করেন।
ইসলামের দা'য়ী ও অহংকারের ব্যাধি
ইসলামের দা'য়ীদেরকে শয়তান বেশী বেশী বিভ্রান্ত করার জন্য সদা তৎপর অন্যান্য লোকদের তুলনায়। কারণ সাধারণ লোকজন তো শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে তার অনুসারী হয়ে পড়েছে। "সে তাদেরকে ওয়াদা দেয় এবং লোভ লালসায় মোহাবিষ্ট করে। আর শয়তান তো তাদেরকে যে ওয়াদা দেয় তা ধাপ্পাবাজি বৈ কিছু নয়।” (সূরা নিসা: ১২০)
দা'য়ীরা সাধারণ লোকজন থেকে তুলনামূলকভাবে অন্তরের ব্যাধিতে বেশী বেশী আক্রান্ত হয়। কারণ তাদের অন্তঃকরণতো মরে গেছে এবং তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। "আল্লাহ তাদের অন্তরে, চোখের ওপরে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং কানের ওপরে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে বিরাট শান্তি”। (সূরা বাকারা: ৭) আর একারণেই দা'য়ীর জন্য ক্ষতিকর বিষয়ে সদাসর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যেন শয়তান তাকে গোমরাহীর পথে না নিয়ে যেতে পারে সে যেন এ থেকে বাঁচার উপকরণ গ্রহণ করে। তাকে এসব স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য আমার এ লেখনি। মহান আল্লাহ বলেন, "আর আপনি স্মরণ করিয়ে দিন। কেননা সৎ উপদেশে মুমিনরা উপকৃত হবেন।" (সূরা যারিয়াত: ৫৫)
অহংকার
ইসলামের দা'য়ীদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ও কঠিন ব্যাধি হল অহংকার। দা'য়ী যেসব ক্ষেত্রে কাজ করে থাকে সেখানে এই ব্যাধি বৃদ্ধি পাবার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এজন্য রাসূল (সা.) যিনি ছিলেন সর্বোত্তম বিনয়ী মানুষ বেশীর ভাগ সময়েই দু'আ করে বলতেন, "হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অহংকার থেকে পানাহ চাই।" কুরআন মজীদে অনেক স্থানে ইবলিস শয়তানের ঘটনা উল্লেখ করে তার অহংকারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে যার কারণে তাকে অপমানিত লাঞ্ছিত করে দুনিয়ায় নামিয়ে দেয়া হয়ে। সে যখন বলেছিল, "আমি আদমের চেয়ে উত্তম। তাকে মাটি থেকে তৈরী করেছেন আর আমাকে তৈরী করেছেন আগুন থেকে।” (সূরা আরাফ: ১২)
অহংকারের কারণ- দা'য়ীর জন্য অহংকার যেমন এক মারাত্মক ব্যাধি তেমনি এর কারণও অনেক তার মধ্যে রয়েছে:
ইলমের ধোকা
দা'য়ীর নিজের ইলম বা জ্ঞানের ব্যাপারে ধোঁকায় পড়া। দা'য়ী এই রোগজীবাণু দ্বারা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হতে পারেন, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, বক্তৃতা, শিক্ষাদান এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন সার্টিফিকেট ও ডিগ্রী অর্জন যা মানুষকে খ্যাতি ও যশ এনে দিতে পারে বা মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। এসব তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করতে পারে। নবী করীম (সা.) এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এই বলে, "যে ব্যক্তি জ্ঞান শিক্ষা করল আলেমদের সাথে বিতর্ক করার জন্য, সাধারণকে চমক দেখাবার জন্য এবং লোকদের দৃষ্টি তার দিকে আকৃষ্ট করার জন্য আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।" অতএব দা'য়ীকে সতর্ক থাকতে হবে যেন এই ব্যাধি তাকে আক্রমণ করতে না পারে। মহান আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান দান করেছেন তার দ্বারা তিনি মানুষকে হেদায়েতের বক্তব্য ও আলোচনা পেশ করতে পারছেন আল্লাহর দরগাহে শুকরিয়া আদায় করবে। "যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে নিয়ামত আরো বাড়িয়ে দিব আর যদি কুফরী কর (অকৃতজ্ঞ হও) জেনে রেখ আমার শান্তি বড়ই কঠিন। (সূরা ইবরাহীমঃ ৭)
আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আলামতের অন্যতম হল নিজের মধ্যে আল্লাহ ভীতি বৃদ্ধি পাওয়া এবং তাঁর আনুগত্যের পানে ধাবিত হওয়া, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা এবং তার নিকটে বিনয়ী ও নম্র হওয়া। প্রতিটি আলোচনা বা, লিখনী কিংবা বক্তব্যের পর আত্মসমালোচনা করা যে তার মধ্যে অহংকারের কোন বীজ অংকুরিত হল কিনা। তাকে স্মরণ করতে হবে যে আল্লাহ তা'আলা সেই আমলই কবুল করবেন যা একমাত্র খালেসভাবে তাঁরই উদ্দেশ্যে করা হবে। মহান আল্লাহ তাঁর নবীর জবানীতে বলে, "অহংকার হল আমার চাদর আর বড়ত্ব হল আমার পরিধেয় বস্ত্র। যে ব্যক্তি এনিয়ে আমার সাথে টানাটানি করবে আমি তাকে ধ্বংস করব।"
দীনদারীর ধোঁকা
আরেক ধরনের ধোঁকা রয়েছে দা'য়ীর জন্য যার নাম হল দীনদারী। এতে সেসব লোকই বেশী আক্রান্ত হয় যারা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। এর দ্বারা সেসব লোকও আক্রান্ত হয় যাদের মাঝে দীনের প্রবৃদ্ধি ও প্রস্তুতির বিকাশ স্বাভাবিকভাবে ঘটেনি বা যারা স্বাভাবিকভাবে পর্যায়ক্রমে দীনের প্র্যাকটিস করেন না। ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বনের জন্য উৎসাহিত করেছে। বাড়াবাড়ি না করার জন্য রাসূল (সা.) অনেক হাদীসে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "যে কেউ এই দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে সে ভেঙ্গে পড়বে”। অন্যত্র বলেন, "দ্বীনের কার্যক্রম সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়া এক কঠিন কাজ। সুতরাং তোমরা নম্রতার সাথে অবিচলভাবে তা আঞ্জাম দিয়ে যাবে।" অন্য হাদীসে তিনি বলেন, "সাবধান! বাড়াবাড়িকারীরা ধ্বংস হল।” এসবের উদ্দেশ্য হল শয়তানের চোরাগলির পথ রুদ্ধ করে দেয়া। আর একারণেই আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় আমল হল যা সর্বদা (নিয়মিত) করা হয় যদিও তা পরিমানে কম হয়।
সঠিক দ্বীনদারী হল নিজেকে পরিশুদ্ধ (তাজাকিয়াতুন নাফস) করার কার্যকারণ। যার দ্বারা দ্বীনদার ব্যক্তি কামলিয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে, ইবাদতের দিক দিয়ে কামলিয়াতে পৌঁছতে পারে এবং মানবিক লোভলালসা থেকে মুক্ত হতে পারে। এজন্য দা'য়ীকে চিন্তা করতে হবে যেন তার সব কাজকর্ম একমাত্র খালেস ভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন হয়, তা দ্বীনদারী যেন তার মধ্যে বিনয়ী ভাবের প্রবৃদ্ধি ঘটায় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। বর্ণিত হয়েছে যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে একলোক ছিল যার অপকর্মের কারণে তার নাম হয়েছিল বনী ইসরাঈলের বদকার। পক্ষান্তরে আরেকজন ছিল যার ইবাদতের কারণে নাম হয়েছিল বনী ইসরাঈলের আবেদ। তার মাথার ওপর রোদের সময় মেঘ ছায়া করে রাখত। বদকার সেখান দিয়ে যাবার সময় মনে মনে বলল, আমি হলাম বনী ইসরাঈলের নিকৃষ্ট লোক আর এ হল উত্তম আবেদ লোক। যদি আমি তার নিকটে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি তাহলে যদি দয়াবান আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেন এই মনে করে সে আবেদের ওখানে বসে পড়ে। আবেদ মনে মনে বলেন, আমি হলাম বনী ইসরাঈলের আবেদ আর এ হল আমাদের মধ্যে বদকার লোক। সে কিভাবে আমার এখানে বসতে পারে? এই মনে করে সে তার দিক থেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং তাকে বলল তুমি আমার এখান থেকে চলে যাও। তখন মহান আল্লাহ সে সময়কার নবীর নিকট ওহী প্রেরণ করেন, "যাও তুমি তাদের দুই জনকে নতুন করে আমল শুরু করতে বল। আমি বদকারকে ক্ষমা করে দিয়েছি, আর আবেদের আমলকে নষ্ট করে দিয়েছি এবং আবেদের ওপর থেকে মেঘখন্ড সরিয়ে নিয়ে তা বদকারের ওপর দিয়ে দিয়েছি"।
ব্যক্তিত্বের ধোঁকা
এখানে আরেক ধরনের ধোঁকা রয়েছে যাকে ব্যক্তিত্বের ধোঁকা বলা যায় তা করে মানুষ নিজেকে নিয়ে। নিজের পোশাক আশাক, চেহারা সুরত ইত্যাদি নিয়ে অহংকার-গর্ব করে বা এধরনের বিষয়নিয়ে আত্মঅহংকার বোধ করে থাকে। সুন্দর বাড়ি সুঠাম গঠন দেহের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক, বিরাট পাগড়ী, সেরওয়ানী, জুব্বা বা এধরনের বাহ্যিক বিষয়াদি নিয়ে শয়তান খেলা করে মনের মাঝে অহংকার সৃষ্টি করে বিশেষ করে অন্যরা যদি এ নিয়ে তার তারিফ বা প্রশংসা করে। আর এখানেই রাসূলের (সা.) সেই বাণী প্রযোজ্য তুমি তোমার ভাইয়ের পিঠ ভেঙ্গে দিলে।
এখানে দায়ী ভাইদের খেয়াল রাখতে হবে যে, বাহ্যিক বিষয়াদি অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর কোন প্রভাব ফেলেনা। মূলত এসব হল মূল্যহীন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সত্যিকারই বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও ধনসম্পদের দিকে দৃষ্টি দিবেন না। কিন্তু তিনি দেখবেন তোমাদের আমল ও নিয়তের দিকে”। (মুসলিম) কতইনা উত্তম হয় যদি বাহ্যিক সুন্দরের সাথে সাথে অভ্যন্তরীন সৌন্দর্যও উত্তম ও ভাল হয়। দায়ীকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে যেন শয়তান তার বাহ্যিক বিষয়ে তাকে ধোকায় ফেলতে না পারে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারার দিকে চেয়ে অহংকার আসলে সাথে সাথে মনে করতে হবে, এটা শয়তানের চক্রান্ত অসওয়াসা দায়ীকে চিন্তা করতে হবে, এই শরীরে চামড়ার নিচে কি রয়েছে? সেখানেতো রয়েছে রক্ত হাড় হাড্ডি পেটের মধ্যে নাড়ি ভুড়ি পোকা কৃমি, পায়খানা আবর্জনা ইত্যাদি নোংরা অপবিত্র জিনিস, তা হলে কেন এত অহংকার, কিসের এত বড়াই? মানুষ ধ্বংস হোক সে কত অকৃতজ্ঞ তিনি তাকে কি বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? শুক্র থেকে তাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে সুপরিমিত করেছেন। অতঃপর তার পথ সহজ করেছেন। অতঃপর তার মৃত্যু ঘটান ও কবরস্থ করেন তাকে। এরপর যখন ইচ্ছা করবেন তখন তাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। সে কৃতজ্ঞ হয়নি, তিনি তাকে যা আদেশ করেছেন সে তা পূর্ণ করেনি। (সূরা আবাসাঃ১৭-২২) এরপর আরো একটু পিছনে গিয়ে চিন্তা করে দেখতে হবে এইতো কিছু দিন পূর্বেও সে ছিল রক্তপিন্ড। এরপর আল্লাহ এতে তার মাংস-पेशी, হাড়-গোড়, অন্তঃকরণ, চোখ-কান ইত্যাদি দিয়ে তাকে মানুষ হিসাবে কোন পথে ও প্রক্রিয়ায় তাকে ভূমিষ্ট করালেন? চিন্তা করতে হবে আর বুঝতে হবে এই হাড় মাংসের শরীরের তেমন মূল্য নেই যেমন মূল্য আছে নৈতিকতার অন্তর পরিশুদ্ধকরণের এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকার।
দায়ীর আল্লাহর আনুগত্যকরণ
দা'য়ীর সদাসর্বদা এমন কাজ করতে হবে যা তার নফসকেও সঠিক করে। সে যেন নফসের পর্যবেক্ষণে কোন রকমের গাফিলতি বা শৈথিল্য না দেখায়। কেননা শয়তান ও নাফসে আম্মারা তাকে ওয়াসওয়াসা দিতে সদা তৎপর যা গণনা করে শেষ করা যাবেনা। বুদ্ধিমান সেই যে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে যায়। আর আহাম্মক হল সেই ব্যক্তি যে প্রবৃত্তির অনুসরন করে আর আল্লাহর কাছে বন্দী থাকে। এ অর্থেই হযরত উমর (রা.) এর এই ওসিয়াত: নিজেদের হিসাব কর, (আল্লাহর কাছে) হিসাব দেয়ার পূর্বেই, একে পরিমাপ কর তাকে মাপার আগেই। আর মহাবিচারের পূর্বেই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর। দায়ীর চারিপাশে জাহেলিয়াতের ছড়াছড়ি ও চাপ রয়েছে সে নিজেকে একাকী বোধ করবে, সমাজে নিজেকে একঘরে মনে হবে যেন সবাই তার থেকে বয়কট করেছে। বর্তমান সভ্যতার অধিকাংশ উপকরণই তার চরিত্র বিধ্বংসী, অশ্লীলতা ও ফাহেশা প্রচার প্রসারে লিপ্ত। এজন্য তাকে এসব পঙ্কিলতা ও তার জীবাণু হতে যেন নিজের নফসকে হেফাজত করে। জাহেলিয়াতের বিধ্বংসী আঘাত থেকে নিজেকে হেফাজত করতে হবে। তাকে এজন্য বিভিন্নভাবে নিজের আত্মসমালোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এব্যাপারে আমাদের প্রস্তাবনা হলঃ
১. রাত্রি জাগরণ (কিয়ামুল লাইল) হল ঈমানী শক্তি উৎপাদানকারী এক পরিক্ষিত আমল। এটি যেন না ছুটে যায়। এব্যাপারেই মহান আল্লাহর এ বাণীর ইঙ্গিত লক্ষ করা যায়ঃ "নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রিতে উঠা প্রবৃত্তি দমনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনূকূলে," (মুজাম্মিল: ৬) আপনি কি রাত্রে নফল ইবাদতের জন্য উঠেছেন যেন মহান আল্লাহ আপনাকে প্রশংসিত স্থানে উঠাতে পারেন? নাকি আপনি ছিলেন গাফেল ঘুমন্তদের অন্তর্ভুক্ত? সে সময় যখন রাতের শেষ তৃতীয়ংশে মহান প্রভূ দুনিয়ার আসমানে নেমে এসে ডাক দিতে থাকেন, কেউ কি ক্ষমা প্রার্থনা করছ, আমি তাকে ক্ষমা করি, কে আমাকে ডাকছে তার ডাকে আমি সাড়া দিব। কে আমার কাছে প্রাথনা করছে, আমি তাকে দান করি।
এর পর চিন্তা করুন আপনি সেই লোকদের দলে কিনা যারা রাতে খুব কমই ঘুমায়। যে ব্যক্তি রাতের প্রান্তে উঠে দাড়িয়ে ইবাদতে মগ্ন থাকে পরকালে ভয় করে আর তার প্রভূর রহমতের আশা করে। বলুন কখনো কি সমান হতে পারে যারা জানে আর যারা জানে না। জ্ঞানীরাই (আল্লাহকে) স্মরন করে থাকে।
সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন তোমরা কিয়ামুল লাইল (রাতে জেগে ইবাদত) করবে। কেননা এটি তোমাদের পূর্বেকার নেককার লোকদের অভ্যাস, তোমাদের প্রভূর নৈকট্য লাভকারী গুনাহ মাফকারী, ভুলের প্রায়শ্চিতকারী এবং শরীর থেকে রোগব্যাধি তাড়াবার হাতুড়ী স্বরূপ। (হাকেম)
হে ভাই আপনি কি জানেন যে রাতদিন আল্লাহর ফিরিশতারা আমাদের পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা ফজর ও আসর নামাযের সময় একাত্রিত হয়। অতঃপর তারা আসমানে চলে যায় তখন আল্লাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন তিনি তাদের অবস্থা ভালভাবেই অবগত, তোমরা আমার বান্দাদেরকে কিভাবে ছেড়ে এলে? তখন তারা বলবেন, ছেড়ে এলাম তখন তারা নামায পড়ছিল এবং যখন গিয়াছিলাম তখন তারা নামায পড়ছিল। আপনি কি ফযরের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করেছেন তাহলে আপনি সেই লোকদের দলভুক্ত হলেন যাদের ব্যাপারে নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি ফযরের নামায আদায় করল সে আল্লাহর জিম্মাদারীতে চলে গেল সুতরাং হে আদম সন্তান যেন আল্লাহ তার জিম্মা সম্পর্কে তোমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করেন।" আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, "মুনাফিকদের নিকট সবচেয়ে কঠিন নামায হল ফজর ও এশার নামায। যদি তারা এর মর্যাদা জানতো তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসতো। আমার ইচ্ছা হয় যে আমি নামাযের আদেশ দেই এবং একজনকে নামাযে ইমামতি করতে বলি এরপর আমি কিছু লোক নিয়ে যাই, যাদের সাথে কাঠের লাকড়ির বোঝা থাকবে যারা নামাযে হাজির হয়নি তাদের ঘর বাড়ী জ্বালিয়ে দেয়।” (বুখারী, মুসলিম)
হে ভাই দৈনিক আপনার অন্তঃকরণকে কুরআনের অমীয় সুধা পান করানো অতীব জরুরী কেননা এর দ্বারা মন তরতাজা হয় ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়। আর মুমিনদের অন্তঃকরণই হল তরতাজা যা কুরআনের জন্য উন্মুখ ও উন্মুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় মুমিন তারাই যাদের অন্তঃকরণ কেঁপে উঠে quando আল্লাহর স্মরণ করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়....। (সূরা আনফালঃ ২) আপনি কি ফজর নামাযের পর নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করেন। নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আপনার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরেছে? নাকি আপনি সেই লোকদের দলভুক্ত যাদের আশা আকাংখার ফিরিস্তী অনেক লম্বা যার ফলে তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে যা এমন পাথরের ন্যায় হে ভাই! আপনি কি মহান আল্লাহর এই বানী শুনেন নি" নিশ্চয় ফরজের সময়ের কুরআন পাঠ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াবে"। এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী "যার পেটের মধ্যে কুরআনের কোন অংশ নেই তা বিরান বাড়ীর মত"। এবং রাসূলের এ বাণী- “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে সে নবুওয়তের সিড়ি বেয়ে উঠতে থাকল তবে তার নিকট ওহী নাযিল হয় না"। কুরআনে ধারককে রাগ করলে চলবেনা কেউ যদি জেনেই তার সাথে বিতর্ক করে আর কেউ যদি না জেনেই অজ্ঞের মত বিতর্কে লিপ্ত হয় যেহেতু তার পেটের মধ্যে কুরআনের জ্ঞান রয়েছে। এরপর আপনি ভুলে যাবেননা কুরআন পাঠের সময় আপনাকে মনে করতে হবে যেন তা প্রথমবারই আপনার ওপর নাযিল হচ্ছে।
আপনি যখন খাবার খেতে বসছেন তখন কি একটু চিন্তা করেছেন? কেন আপনি খেতে যাচ্ছেন? এই নিয়ামত আল্লাহ কিভাবে আপনার জন্য তৈরী করালেন যা আপনার ক্ষুধা মিটাবে! আপনাকে তার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে সাহায্য করবে এবং তাঁর পথে জিহাদে শরীক হতে শক্তি যোগাবে? আপনি কি চিন্তা করেছেন কোন উৎস থেকে আপনার এই খাদ্য দ্রব্য এসবকি হালাল পন্থায় উপার্জিত? না এতে হারামের কোন অংশ রয়েছে।
আপনি যখন বাড়ী থেকে বের হবেন আপনাকে মনে রাখতে হবে ইসলাম হল আমলের (কর্মের) ধর্ম অলসতার ধর্ম নয়, প্রচেষ্টার ধর্ম বেকারের দ্বীন নয়। একজন মুসলমান হিসেবে জমিনের বুকে ছড়িয়ে পড়ে জীবন জীবিকা জিহাদ কিছু সময় ব্যয় করবেন নিষ্টার সাথে আন্তরিকতার সাথে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন যে তোমাদের কেউ যখন কোন কাজ করে তখন যেন তা ভালভাবে করে"। আপনি কি আপনার টাকাপয়সাকে গরীব দুঃখীদের দান সাদকা করেন। যাকাত আদায় করে পুত পবিত্র করেছেন? মিকদাদ ইবনে মাদীকারেব (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "নিজের হস্তার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার আর কেউ খেতে পারে না।” (বুখারী)
আপনি যে রাস্তা দিয়ে চলেছেন যে সব মানুষের সাথে মোলাকাত করেছেন সেসব ক্ষেত্রে কি আল্লাহকে হাজির নাজির মনে করেছেন?
আপনার চোখে হারাম কিছু পড়লে সাথে সাথে চোখ নিম্নমুখী করেছেন বা চোখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? কারণ প্রথম দৃষ্টি আপনার আর পরেরটি শয়তানের। কোন নামী দামী সুন্দরী মহিলা আপনাকে কুপ্রস্তাব দিলে আপনি কি তাকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন, আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর আপনি মনে মনে এই বাণী আওড়িয়েছেন, “হে প্রভু তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করে। তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সূরা ইউসুফ: ৩৩) আপনি কি আপনার লেনদেন ব্যবসা বানিজ্যে হালালকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
আপনার দ্বারা এমন কোন আচরণ কি ঘটেছে যা শরিয়তের খেলাফ?
আপনি কি সবসময়, আল্লাহকে হাজির নাজির মনে করে কর্মসম্পাদন করেন? সন্দেহযুক্ত কাজ থেকে দূরে থাকেন? সেই মুত্তাকীদের দলভুক্ত হতে সচেষ্ট যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন "বান্দা তখন মুক্তাকীর মর্যাদায় পৌঁছতে পারবেন, যতক্ষন না সে সন্দেহযুক্ত বিষয় পরিত্যাগ করে সর্তকতা স্বরূপ।”
৭. আপনি নিজেকে জিজ্ঞস করুন, আপনার কাজ কর্মের পরিসর ও পরিবেশ থেকে কতুটুকু ফায়েদা হয়েছে। আপনার বন্ধু-বান্ধব কি আপনার মধ্যে ইসলামী প্রভাব অনুভব করে? আপনি কি তাদের খোঁজ খবর নেন? আপনি কি তাদের ইসলামের পথে আকৃষ্ট করার জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা রাখেন? আপনি স্মরণ করুন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এই বাণীঃ "তোমার দ্বারা যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন তাহলে সেটা যে সবের ওপর দিয়ে সূর্যউদিত হল ও অস্ত গেল সেসব থেকেও উত্তম হবে।" হে ভাই আপনার কাজ ছাড়াও কি কোন সময় আছে? থাকলে আপনি তা দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করুন। কেননা সময় হল ছুরির মত এর দ্বারা আপনি কোন কিছু না কাটলে সেই আপনাকে কেটে ছাড়বে। আর দাওয়াতের সওয়াব আপনার জন্য অবধারিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কাউকে হেদায়েতের দিকে আহবান করল, তারা তার আমল করলে সে তাদের মতই সওয়াব পাবে অথচ তাদের কোন নেকী কম দেয়া হবে না। আর যে কেউ কাউকে গোমরাহীর দিকে ডাকল। তার ওপর আমলকারীদের মত তাকে গুনাহ চাপান হবে অথচ তাদের গুনাহও কম করা হবেনা। (মুসলিম)
৮. আপনি ইসলামী সংস্কৃতি ও সাধারণ সাংস্কৃতিক জ্ঞানের পরিধি বাড়াবার জন্য কতটুকু সময় ব্যয় করেছেন....। আপনি যে সমাজে বসবাস করছেন সেখানে বিভিন্নমনা সংস্কৃতি বিরাজমান বিভিন্ন চিন্তাধারা ও মতাদর্শ রয়েছে। আপনাকে এসব সম্পর্কে জানতে হবে এর বিশ্লেষণ করতে হবে, এর সমাধান বের করতে হবে এবং এর সংশোধন করতে হবে।
আজ সারা দিনে ইসলাম সম্পর্কে কতটুকু পড়েছেন? যতটুকু সাধারণ জ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পড়েছেন তাতে কি আপনার কিছু ফায়দা হয়েছে?
ইবনে আব্দুল বার তার কিতাবুল ইলম নামক গ্রন্থে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'তোমরা জ্ঞান শিক্ষালাভ কর। কারণ এর শিক্ষা আল্লাহ ভীক্তিত্ব পয়দা করে। এর অন্বেষণ করা ইবাদত এবং এর পর্যালোচনা করা আল্লাহর তাসবীহ পাঠের সমতুল্য। এর গবেষণা করা জিহাদের শামিল। অজ্ঞকে তা শিক্ষাদান করা সদকা তুল্য এবং এটি পরিবার পরিজনকে শিক্ষা দেয়া আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম। কারণ এর দ্বারা হালাল হারাম সনাক্ত করা যাবে, জান্নাতের পথে পৌঁছা সম্ভব হবে, এই জ্ঞান দ্বারাই আল্লাহ এক জাতিকে সম্মানিত করবেন এবং অন্য জাতিকে লাঞ্ছিত করবেন। এটা একাকীত্বের বন্ধু ও সান্তনার বাহন। শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র তাদেরকে কল্যাণের সন্ধানদাতা মনে করা হবে এবং তাদের মতামতই সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া হবে।
৯. এবার আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনি ফী সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে কোরবান করার জন্য কতটুকু প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন? বিভিন্ন ধরণের দায়-দায়িত্ব আপনার এপথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। আপনি কি এসব ঝেড়ে ফেলে আপনার রবের পথে এগিয়ে আসতে পারবেন? অকাল মৃত্যুর ভয় একটি বাঁধা জিহাদের পথে। আপনি এ ভীতিকে তাড়াতে পেরেছেন?
ব্যক্তি স্বার্থ আল্লাহর পথে, দাওযাতের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক। আপনি এ বাঁধা দূর করতে সক্ষম হয়েছেন? আপনার স্ত্রী, সন্তান সন্ততি, পরিবার পরিজন আল্লাহর পথে দীনের পথে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারে। আপনি এ ব্যাপারে কতটা তৎপর?
আবু আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনঃ "তোমরা জেনে রেখ জান্নাত তরবারীর ছায়ার নিচে রয়েছে।” (বুখারী, মুসলীম)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করল জিহাদের কোন চিহ্ন ব্যতিরেকে, সে যখন সাক্ষাত করবে তখন তার শরীরে একটি চিত্র থাকবে।” (তিরমিযী)
১০. পরিশেষে আপনি কি আপনার শরীরের ব্যাপারে চিন্তা করে দেখেছেন এর ওপর হক রয়েছে। একে শক্তিমান রাখার প্রয়োজন রয়েছে যেন জিহাদের ধকলে সফরের ক্লান্তি বহনে সক্ষম থাকে। আপনাকে স্মরণ রাখতে হবে। সবল মুমিন আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় দুর্বল মুমিন হতে, সকালে কিছুক্ষণ কি সাধারণ ব্যায়াম হাঁটাহাঁটি করেছেন বা
- শুটিং, সাঁতার, ঘোড়ায় চড়া, গাড়ী চালনা এ সব শিখেছেন?
- শরীরের জন্য ক্ষতিকর রাত্রি জাগরণ, ধুমপান ইত্যাদি থেকে বিরত রয়েছেন কি?
আসুন আল্লাহর সৈনিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিন।
ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শরীয়তের সীমারেখা
ইসলামের সাথে যারাই সংশ্লিষ্ট রয়েছে তাদের প্রতিটি বিষয়ে জানার অধিকার রাখে ইসলাম। তারা কি ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে মানে কি-না? এর নিকট জীবন-ফয়সালা চায় কি না? এমনকি বিষয়টিকে ঈমানের পর্যায়ে নিতে ইসলাম কুণ্ঠিত হয়নি। "আপনার প্রভূর কসম! সেই ব্যক্তি ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোন রকমের সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নিবে।" (সূরা নিসা: ৬৫)
দা'য়ী কখনো কখনো এক খারাপ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, নিজের মনের কাছে ফয়সালা নেয়া আর ইসলামের মূল নীতি অস্বীকার করে প্রকারান্তরে কুফরী নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে ইসলামী শরিয়তের সাথে দ্বিমুখী আচরণ করতে থাকে। এটা কোন মুমিনের গুনাবলী বা বৈশিষ্ট্যই হতে পারে না আর না কোন দা'য়ীর। মহান আল্লাহ বলেন, "কোন মুমিন পুরুষ ও কোন মুমিন নারীকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে, সে বিষয়ে নিজস্ব স্বাধীন মত অবলম্বনে তাদের কোনো অধিকার নেই।" (সূরা আহযাব: ৩৬)
এভাবেই একজন মুসলমানকে ইসলামের সাথে আচরণ করতে হবে সে হবে এর অনুসারী, খাদেম, একনিষ্ঠ সৈনিক, খাঁটি বন্ধু ও অভিভাবক।
ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা
"ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালাবাসা। বিষয়টি সম্পর্কে অনেক আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে। আমি এ বিষয়ে নতুন কোনকিছু যোগ করতে চাইনা। আমি চাই এ ব্যাপারে শরীয়তের সীমারেখা স্পষ্ট করতে যেন বিষয়টি নিয়ে কেউ বিভ্রান্তিতে না পড়েন। এই পবিত্র বন্ধনটি যেন তার নির্মলতা, পবিত্রতা ও স্বচ্ছলতা বজায় রাখতে পারে সে জন্যই এ বিষয়ে আলোকপাত করছি।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ভ্রাতৃত্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্রাতৃত্ব হল আকীদা নিঃসৃত এমন এক বন্ধন যা এক মুসলমানকে অপর মুসলমানের সাথে মজবুত ভাবে বেঁধে দেয়। এটি এক আল্লাহ প্রদত্ত বন্ধন (রাবেতা রব্বানিয়া) যা অন্তঃকরণসমূহে মজবুতী সৃষ্টি করে। আর এটি হচ্ছে ঈমানের মজবুত বন্ধন যেমনটি জানিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এ বাণীতে: "ঈমানের মজবুত বন্ধন হল আল্লাহর উদ্দেশ্যেই কাউকে ভালবাসা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যেই কাউকে ঘৃনা করা।"
ভ্রাতৃত্ব ইসলামের একটি মৌলিক উপাদান যার ওপর ভিত্তি করে ইসলামী সমাজ গড়ে উঠে এবং মুসলমানদের পরস্পারিক সম্পর্ক বা বন্ধনের সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র মদীনাতে প্রতিষ্ঠা করেন তখন দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল এই ভাতৃত্ব। ইসলামী আকীদা বিশ্বাসের পরপরই যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মসজিদে নববী তৈরী করার সময়।
একারণেই ইসলাম ভালবাসার বন্ধনকে মুসলমানদের মাঝে মজবুত করেছে এবং পরস্পরকে ভালবাসার কারণে পরকালে উত্তম প্রতিদানের ব্যবস্থা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: "কোন দু'জন পরস্পরকে যদি আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসে তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের একে অপরকে ভালবাসার চাইতেও অধিক ভালবাসেন।" তিনি আরো বলেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের চারিপাশে কিছু লোককে চেয়ারে বসতে দেয়া হবে যাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জল হবে। সকল মানুষ ভীত হলেও তারা ভয় পাবে না। সকলে ভয়ে কাঁপতে থাকলে তারা কাঁপবে না। তারা হল আল্লাহর বন্ধু, যাদের কোন ভয় ও দুঃশ্চিন্তা নেই বলা হলঃ তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যারা একে অপরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালাবাসত তারাই।"
ইসলামে ভ্রাতৃত্বকে যে মর্যাদা দিয়েছে এর পেছনে অনেক উদ্দেশ্য লক্ষ্য রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হল:
এক. ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্রাতৃত্ব হল আল্লাহর আনুগত্যে তাঁকে স্মরণ করতে এবং পরস্পরকে হকের ব্যাপারে ধৈর্য্য ধারণ করার একটি মাধ্যম। এজন্য একজন মুসলমানকে তার সঙ্গী-সাথী ও ভাই নির্বাচনে ভাল লোককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: "আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে একজন ভাল বন্ধু জুটিয়ে দেন। যদি সে ভুলে যায় তাহলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আর যদি সে নিজে স্মরণ করে তাহলে তাকে সহায়তা করে।"
ঈসা (আ.) বলেন, এমন লোকের সাথে উঠাবসা কর যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হবে, আর তার কথায় তোমাদের ইলম বৃদ্ধিপাবে এবং তার আমল তোমাদেরকে পরকালের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।"
দুই. ভ্রাতৃত্ব আবার এমন এক মাধ্যম (অসিলা) যা দ্বারা অন্যান্য ভাইয়েরা দুঃসময়ে প্রয়োজন মিটাবে, জীবনের কষ্ট-দুঃখ মোকাবিলা করবে এবং সংকট মুহুর্তে একে অপরের সহযোগিতা করবে। মানুষ একাই জীবনের সব বোঝা, দায়িত্ব অনেক সময় বহন করতে পারে না। এজন্য তার একজন সহযোগীর প্রয়োজন পড়ে যে তাকে কাজে সহযোগিতা করবে, উৎসাহ যোগাবে, একে অপরের পরিপূরক হবে পূর্ণ উদ্দেশ্যে কাজ করবে। এবিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আমি তোমার ভাইয়ের দ্বারা তোমার বাহুকে শক্তিশালী করব।" মুসা (আ.) এর উপর যখন নবুওয়াতের দায়িত্ব দেয়া হল তখন তিনি তাঁর রবের নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যেন তার ভাই হারুনকে এ ব্যাপারে সহযোগী বানিয়ে দেন যেন সে তাকে দাওয়াতের কাজে সাহায্য করতে পারে। তিনি দু'আ করেছিলেন "আমার পরিবার থেকে হারুনকে আমার মন্ত্রী (সহকারী) বানিয়ে দিন, সে আমার ভাই। তার দ্বারা আমি নিজেকে শক্তিশালী করব এবং আমার কাজে শরীক হবে যেন আপনার বেশী বেশী প্রশংসা করতে পারি এবং বেশী বেশী আপনাকে স্মরণ করতে পারি। নিশ্চয় আপনি আমাদেরকে দেখছেন।"
ভ্রাতৃত্বের এই নির্মল বন্ধনে যেন শয়তানের কোন কু-মন্ত্রণা এসে বাসা বাঁধতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এই বন্ধন যেন একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হয় এখানে যেন পার্থিব কোন বিষয় এসে না দাঁড়ায়। আর সেটি যেন দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধক হয়ে না উঠে। নিজেদের ব্যাপারে স্পষ্টবাদী হতে হবে, মনের মধ্যে কোন কিছু তা যতই নগণ্য হোক না কেন, গোপন করা ঠিক হবে না। কারণ ছোট ব্যাপার থেকেই বড় বড় ঘটনার সূত্রপাত ঘটে থাকে।
📄 একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন
বর্তমান যুগে ইসলামী কর্মকান্ডের অনেক পন্থা ও পদ্ধতি অব্যাহতভাবে চালু রয়েছে। যার ফলে আশংকা করা হয় যে, এর দ্বারা হয়তো ইসলামী কর্মকান্ডের সঠিক চিত্র কলুষিত ও বিকৃত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী শক্তির ক্ষয় ও বাকযুদ্ধ এবং সংকীর্ণ দলীয় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। আমি বলছি না যে, এর দ্বারা ইসলামের খিদমত হচ্ছে না। খিদমত তো অবশ্যই হচ্ছে কিন্তু এমনটি যেন না হয় যে, ইসলামী কর্মকান্ড সম্পর্কে এবং এর ভিন্নতা দেখে শত্রুরা আমাদের মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঘৃণার ভাব ছড়াতে সফল হয়। আর ইসলামপন্থীদের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। ইসলাম তো তার অনুসারীদের মাঝে ঐক্য ও সম্প্রীতি চায় এবং তাদেরকে জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে এই দুনিয়ার বুকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যা বিশ্বব্যাপী মানুষকে হেদায়াতের পথে নিয়ে আসবে।
একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা
বিশ্বব্যাপী একক ইসলামী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের কথা সকলেই অনুভব করেন। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত লক্ষ্য করা যায় না। ইসলামপন্থীদেরকে এ ব্যাপারে সকলেই কম বেশী তাগিদ দিয়ে থাকেন যে গোটা দুনিয়া ব্যাপী একই উদ্দেশ্য-লক্ষ্যকে নিয়ে যেহেতু আমরা সকলেই কাজ করছি। সেহেতু আমাদেরকে একই কাতারে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বের জাহেলিয়াতের মোকাবেলা করা উচিত। আবেগ তাড়িত হয়ে নয় বরং বাস্তবতার নিরিখেই অত্যন্ত ধীর-স্থির ভাবে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে আমাদেরকে কাজ করতে হবে যেন আমরা বিশ্বের তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে অত্যাচারিত-নিপীড়িতদের পক্ষে এবং আর্তমানবতার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে পারি। আর এ কাজটি করতে গেলে জাহেলিয়াতের সাথে যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব ঘটবে, বিশ্বব্যাপী একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে এর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদেরকে লড়তে হবে।
আরও একটি বিষয় হলো ইসলামী কর্মকান্ড তথা ইসলামী আন্দোলন যে সব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে বাস্তবে তা আন্তর্জাতিক সংগঠনেরই চ্যালেঞ্জ। যেমন ইহুদী জায়নবাদ, মাসুনিয়া, খ্রিষ্টান মিশনারী, যাদের অর্থবল জনবল ও প্রভাব প্রতিপত্তিকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সব আন্তর্জাতিক ইসলামী বিরোধী চক্রান্তকারীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন: "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।" (সূরা আনফালঃ ৬০)
ইসলামী কর্মকান্ডের বর্তমান কিছু অভিজ্ঞতা
একক বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের জন্য যেসব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন সে সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমি বর্তমান ইসলামী কর্মকান্ডের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করতে চাই যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগতে পারে।
১. ওয়াজ ও নসিহত-এর পন্থা (তাবলীগি পদ্ধতি): এই পদ্ধতি যারা দাওয়াতের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করছেন তারা ব্যক্তিগত ভাবে বা জামায়াতবদ্ধভাবে বিশেষ নির্দিষ্ট সময়ে দৈনিক বা সাপ্তাহিক কিংবা মাস অথবা বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন। তাবলীগ জামায়াতের সাথে জড়িত লোকজন এত উৎসাহ উদ্দীপনা ও নিষ্ঠার সাথে দাওয়াত দিয়েও এমন কোন শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হননি যা জাহেলিয়াতের সয়লাবের মুখে একটু হলেও দাঁড়াতে পারে। তারা বর্তমানে যে পদ্ধতিতে কাজ করছেন এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও কোন ফল বয়ে আনতে পারবে না। কারণ-
ক. এই পদ্ধতির ফলে এমন কোন সংগঠন গড়ে উঠছে না, যা বাতিলের মোকাবেলায় কিছু বলে বা করে, এবং ভবিষ্যতে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার মত কোন কর্মসূচীও তাদের হাতে নাই।
খ. এই পদ্ধতির কর্মক্ষেত্র শুধুমাত্র মসজিদ এবং যারা মসজিদে আসে এসব লোকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ বলা চলে। সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা মোটেও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
গ. এই পদ্ধতির মাধ্যমে চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ আজ আসছে তার কোন জবাব বা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
ঘ. এই পদ্ধতিতে এমন কোন পরিকল্পনা নেই, যা দ্বারা যে বীজ বপন করা হচ্ছে তার ফসল নিজ ঘরে তুলে নিয়ে আসা যায়। এ মতেরই প্রবক্তাদের মধ্যে গণ্য করা যায় 'তাহের আল জাযায়েরী' এবং 'জামাল উদ্দিন আফগানী' প্রমুখ।
ওয়াজ নসীহতের পদ্ধতির বন্ধ্যাত্বের দিকে ইঙ্গিত করে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর আমীর ওস্তাদ আবুল আলা মওদুদী (রহ.) বলেন- ওয়াজ নসীহত দিয়ে খৃষ্টান মিশনারীদের পদ্ধতিতে দাওয়াত প্রদান এবং এ লক্ষ্যে হাজার হাজার বই পুস্তক বিতরণ ও সকাল বিকাল লাখ লাখ লোক এ কাজের দাওয়াত দিলেও কোন ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
ইসলাম যে সর্বযুগে সর্বস্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা তা বক্তৃতা ও লিখনীর মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব হবে না বরং তা বাস্তবে অনুসারীদের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
২. শক্তি ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ: বর্তমান যুগে ইসলামী কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন। যেমন এদের মধ্যে শহীদ আহমাদ শাহ বেরলভী (ভারত) তিনি তার অনুসারীদেরকে সমবেত করে অস্ত্র হাতে নিয়ে জিহাদের ঝান্ডা তুলে ধরেন এবং ভারতের উত্তরাঞ্চলে (বর্তমান পেশাওয়ার শহরের নিকটবর্তী) ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেন। কিন্তু সে সময়ে ইংরেজরা অত্যন্ত ধূর্ততা ও শঠতার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং মুসলিম নামধারী কিছু নেতার যোগসাজসে এই আন্দোলনের উপর চরম আঘাত হানে। এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহমাদ বেরলভী এবং তার হাজার হাজার অনুসারী নিহত হয় এবং শত্রু পক্ষেরও হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়। এটি ১২৪৬ হিজরীর ঘটনা। এখানেই এই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এপথেরই আরেকটি প্রচেষ্টা হলো 'শেখ ইজ্জুদ্দিন আল-কাস্সাম'-এর। তিনি ফিলিস্তীনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝান্ডা তুলেন। তিনি তার অনুসারীদেরকে জিহাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের আরও কয়েকজন প্রচেষ্টা চালান যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'নওয়াব সাফাভী'। কিন্তু তার এ আন্দোলনও তারই স্বদেশীয় কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্রের ফলে শেষ হয়ে যায়। তিনি ও তার অনুসারীরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৫৬ সালে শাহাদাৎ বরণ করেন।
ইসলামী কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে অস্ত্র বা শক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শহীদ হাসানুল বান্না বলেন- অনেকেই প্রশ্ন করেন ইখওয়ানুল মুসলিমীন কি তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শক্তি বা অস্ত্রের ব্যবহার করবে? আর ইখওয়ান কি রাজনৈতিক বা সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে? আমি এসব প্রশ্নকারীদেরকে কোন দ্বিধা-দ্বন্দে রাখতে চাই না। আমি পরিস্কার বলতে চাই যে, শক্তি ইসলামের একটি শ্লোগান। কুরআন পাকে বলা হয়েছে- "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।” (সূরা আনফালঃ ৬০)
কিন্তু ইখওয়ানুল মুসলিমীন অত্যন্ত গভীরভাবে এ আয়াতটি পর্যালোচনা করেছে। এর উদ্দেশ্য কি? তারা জানে যে, শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আকীদা ও ঈমানী শক্তি। এ শক্তির পরেই হচ্ছে অন্যান্য শক্তি। কোন দলকে ততক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী বলা যাবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান ও আকীদায় শক্তিশালী হয়। কারো ঈমান যদি মজবুত না থাকে তাহলে সে অস্ত্র হাতে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না। এজন্য ইখওয়ান অস্ত্রের শক্তিতে বিশ্বাস করে না, তারা বিশ্বাসী ঈমান ও আকীদার অস্ত্রে ও শক্তিতে।
৩. চিন্তার প্রসার ঘটানো (হিজবুত তাহরীর-এর অভিজ্ঞতা): হিজবুত তাহরীর মনে করে যে, ইসলামী চিন্তার প্রসার সবার মাঝে ঘটাতে হবে। চিন্তার জগতে বিপ্লব ঘটাতে হবে, বাতিলী চিন্তা ভাবনাকে উপড়িয়ে ফেলতে হবে। এজন্য হিজবুত তাহরীর বেশ কিছু প্রচার-প্রকাশনা করেছে। তারা চিন্তা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করছে। ইসলামী চিন্তা চেতনাকে সমুন্নত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইসলামী মনীষীরা হিজবুত তাহরীর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ তাদের উৎপত্তি, লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই মনে করেন এদের চিন্তার ক্ষেত্রে কোন পরিপক্কতা নেই। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। এদের বেশ কিছু প্রকাশনা দেখে যে কেউ মনে করতে পারেন যে এদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট নয়।
কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজবুত তাহরীরের কিছু কিছু ভালো দিক যেমন রয়েছে তেমনি কিছু খারাপ দিকও আছে। এটি সাধারণ জনগণের মাঝে তেমন কোন সাড়া ফেলতে পারেনি। এটি ইসলাম সম্পর্কে জনগণের মাঝে কোন ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারেনি। যার ফলে এটিকে একটি বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন বলে ধর্তব্যের মধ্যে আনা যেতে পারে না। হিজবুত তাহরীরের ব্যাপারে কতিপয় প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়-
(১) এটি মারাত্মক ভুল যে, কোন সংগঠন শুধুমাত্র চিন্তার উপরে নির্ভর করে কাজ করবে। চিন্তার পরিশুদ্ধি কখনও কোন কাজে আসতে পারে না যতক্ষণ না তা বাস্তবে প্রয়োগ হয়। তারা যেমন ইখওয়ানকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে, তেমনি ইখওয়ান তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে যে, তারা একমাত্র চিন্তা বা বাস্তবতা বিবর্জিত প্রোগ্রাম গ্রহণ করে কাজ করছে।
রাসূল (সা.) এর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি চিন্তার পরিশুদ্ধির সাথে সাথে বাস্তব জীবনে এর প্রশিক্ষণ দিতেন। তাদেরকে চারিত্রিক এবং আত্মিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জিহাদী মনোভাব নিয়ে গড়ে তুলেছেন।
২) হিজবুত তাহরীরের আরেকটি ভুল হলো তারা চিন্তার পরিশুদ্ধির সাথে সাথে একলাফে ক্ষমতার মসনদে যেতে চায়। এর অর্থ হলো যে ব্রীজ তৈরি করতে গিয়ে নিচে কোন ভিত্তি না দিয়েই উপরে বালু সিমেন্ট ঢালা। বাতিল কি এত সহজেই আমাদেরকে ছাড় দিবে? এটি খুব হাস্যকর হয়েছে যে, একটি গোষ্ঠী হঠাৎ করে হিজবুত তাহরীর দল ঘোষণার পরে পত্র-পত্রিকায় কিছু বিবৃতি দিয়ে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অন্যান্য দলের মত নেমে পড়ে। অথচ তাদের কোন কর্মী বা নেতাই তৈরী হয়নি।
৩) হিজবুত তাহরীরের আরেকটি বিরাট ভুল হলো যে, তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন শক্তির কাছে তাদের ভাষায় 'সাহায্য সহযোগিতা চায়'। যেমন তারা সিরিয়ার কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছে। তারা আবার ইরাকের কাছেও একবার সাহায্য চেয়েছে। সাহায্য চেয়ে বা অন্য কোন শক্তির উপর ভরসা করে ইসলামী বিপ্লব সাধন হতে পারে না। এর অর্থ হলো ইসলামী বিপ্লব একপ্রান্তে আর ছাইয়ের গাদার আরেক প্রান্ত থেকে যেনো কেউ তাতে ফুঁ দিচ্ছে।
আমি এখানে একটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করতে চাই যে, শুধু চিন্তার পরিশুদ্ধি দিয়ে বা আবেগ তাড়িত হয়ে ইসলাম কায়েম হবে না। শহীদ সাইয়েদ কুতুব এ বিষয়টিকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার লিখিত 'পথের মাইলস্টোন' নামক গ্রন্থে "কেউ কেউ মনে করেন যে, যেহেতু মানুষ ইসলাম পছন্দ করে এবং লোকজন ইসলামী ব্যক্তিত্বকে ভালো জানে সেজন্য অতি দ্রুত বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে উল্টিয়ে দিয়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি এসব অতি উৎসাহী ভাইদেরকে বলতে চাই, ইসলামের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত একদল লোক তৈরী না হবে, একটি সমাজ তৈরী না হবে যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে গ্রহণ করতে আদৌ রাজী নয় এরকম লোক ছাড়া ইসলাম কায়েম করা যাবে না।"
আমি এ বলে বিষয়টি ইতি টানতে চাই যে, লোকজন তৈরী না করে ইসলামের অনুসারী সমাজ এবং মর্দে মুজাহিদ তৈরী না হওয়া পর্যন্ত শুধু চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধি নিয়ে এসে অন্ততঃ ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। যেমনটি আজকে হিজবুত তাহরীরের অভিজ্ঞতার আলোকে ফুটে উঠেছে।
৪. গভীর ঈমান এবং অব্যাহত কর্মতৎপরতা (ইখওয়ানুল মুসলিমীনের অভিজ্ঞতা): ইখওয়ানুল মুসলিমীন সংগঠনটি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই একটি পরিকল্পিত সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসানুল বান্না তার প্রথম দিনের বক্তব্যেই তুলে ধরেন। "হে ভাইয়েরা! আমরা এই দাওয়াতের মিরাসকে যুগের পর যুগ ধরে চালিয়ে যেতে চাই। যেন এই দাওয়াতের আলোকে অন্ধকার বিদূরিত হয়। মহান আল্লাহ যেন আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার জন্য এবং নতুন করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপনাদেরকে তৈরী করার সুযোগ দেন এবং তিনি এটিকে কবুল করেন।
আমরা এই লক্ষ্যের জন্য কিভাবে কাজ করবো? বক্তৃতা বিবৃতি, বই-পুস্তক, আলোচনা সভা ইত্যাদি করে রোগ চিত্রিত করে তার সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দায়ীদেরকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে, যে লক্ষ্যে আমাদের সবার দৃষ্টি ভঙ্গি থাকবে: ১. মজবুত ঈমান ২. সূক্ষ্ম সংগঠন পদ্ধতি ৩. অব্যাহত কর্মতৎপরতা।
হে আমার ভাইয়েরা! আপনারা কোন জনকল্যাণমূলক সংগঠনের লোক নন আবার কোন রাজনৈতিক দলেরও নন, যাদের বিশেষ কোন লক্ষ্য রয়েছে। বরং আপনারা হলেন এক নতুন আত্মা, এক চলমান শক্তি। যা এই উম্মতের অন্তঃকরণে সঞ্চারিত হবে এবং একে কুরআন দ্বারা জীবন্ত করবে। এটি একটি নতুন আলোকবর্তিকা যা সমস্ত অন্ধকারকে বিদূরিত করবে এবং এটি একজন দায়ীর কন্ঠস্বর যা রাসূলের সত্য দাওয়াতকে নতুনভাবে উচ্চকিত করবে। আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, মানুষ যখন এই দাওয়াতের কাজকে ছেড়ে দিয়েছিল, আমরা তখন এই দাওয়াতের দায়িত্বকে নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছি।
আপনাদেরকে যদি বলা হয়, আপনারা কিসের দাওয়াত দিচ্ছেন? আপনারা তাদেরকে বলুন, আমরা ইসলামের সেই দাওয়াত দিচ্ছি, যে দাওয়াত নিয়ে রাসূল (সা.) এসেছিলেন। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা- এটাও দাওয়াতের একটি অংশ। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, এটাতো রাজনীতি, তাহলে আপনারা বলুন, এটাই ইসলাম। আমরা এধরনের বিভাজনে বিশ্বাস করি না।
যদি আপনাদেরকে বলা হয় যে, আপনারা তো হলেন বিপ্লবী! আপনারা জবাব দিন- আমরা ইসলামের দাওয়াতদানকারী, আমরা ইসলাম নিয়েই গর্বিত। কেউ যদি আমাদেরকে বাধা দেয়, আমরা ধৈর্য্যের সাথে মোকাবেলা করবো, যারা বাধা দিবে তারাই অত্যাচারী।
তারা যদি বলে, তোমরাও বিভিন্ন লোক এবং সংগঠনের সাহায্য নিয়ে এসব করছো? তাহলে তাদেরকে আল্লাহর দেওয়া জবাব দিন "তোমাদের প্রতি সালাম, আমরা জাহেলদের সাথে ঝগড়া করতে চাই না"।
পূর্বের বক্তব্য থেকে একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে, ইখওয়ানুল মুসলিমীনের আন্দোলন ও সংগঠন অন্যান্য আন্দোলন ও সংগঠন থেকে ভিন্নতর। এ সংগঠন যেমন ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে তেমনি বাস্তব জীবনে ইসলামকে প্রয়োগ করার জন্য তার কর্মীদেরকে নির্দেশ দেয়। তাদেরকে সংগঠিত করে ইসলামের পথে সর্বোচ্চ কুরবানী করার জন্য যোগ্য কর্মীবাহিনী হিসাবে গড়ে তুলে। আর এটিকে আমরা বলতে পারি, ইসলামের দাওয়াতকে প্রচার ও প্রসার করার এক অব্যাহত সংগ্রাম। এটি একটি ফরয কাজ। অন্যান্য ফরয যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, ভালো কাজ করা, মন্দকাজ পরিত্যাগ করা ইত্যাদির মতই এটিও একটি ফরয কাজ। এটি এক চলমান সংগ্রাম। যে ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা হালকা ভাবে বা ভারী ভাবে বেরিয়ে পড় এবং সংগ্রাম কর তোমাদের মাল এবং জান দ্বারা আল্লাহর পথে। (সূরা তওবা-) শহীদ ইমাম হাসানুল বান্না তার বিভিন্ন বক্তব্যে অব্যাহত ভাবে ইসলামের জন্য জান মাল দিয়ে সংগ্রাম করার আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। তিনি ১৩৫৭ হিজরীতে ইখওয়ানের পঞ্চম সম্মেলনে বলেন- হে আমার ভাইয়েরা! আজকে আমাদের ভাইদেরকে ঈমান ও আকীদার বলে বলিয়ান হয়ে ইসলামী সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় তিনশতাধিক পুস্তক-পুস্তিকা ও বিবৃতি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্যই হলো মনমানসিকতার দিক দিয়ে এবং কর্মক্ষেত্রে ইসলামের জন্য মুজাহিদ হিসাবে নিজেদেরকে তৈরী করা। আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি যে, রাসূলের বাণীঃ "বারো হাজার (মুসলিম সেনা) কখনো সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হবে না।"
ইসলামী আন্দোলন, প্রতিঘাত ও অত্রাঞ্চলের অবস্থা: এটি আশা করা হয়েছিল যে, ইখওয়ানুল মুসলিমীন যেভাবে সর্বক্ষেত্রে সফলতা লাভ করছে, সে তার কাংখিত লক্ষ্যে খুব দ্রুতই পৌঁছে যাবে। আর এজন্য ইসলাম বিরোধী শক্তিবা একে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রথম কাজটি হলো ১৯৪৮ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা ইমাম হাসানুল বান্নাকে শহীদ করে দেওয়া। এরপরে এর বড় বড় বিভিন্ন নেতাদেরকে শহীদ করে দেওয়া হয় এবং অব্যাহতভাবে ইখওয়ানের উপরে জেল-জুলুম- নির্যাতন চলতে থাকে।
এসব জুলুম নির্যাতনের ফলশ্রুতিতে এই আন্দোলনের কার্যক্রম গুটিয়ে পড়ে। আন্দোলনের উপরে রাজনৈতিক নিপীড়ন শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা এবং দেশে ইসলামী কার্যক্রম অনেকটাই গুটিয়ে যায়। মানুষের মৌলিক অধিকারকে বিশেষ করে ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের মৌলিক অধিকার পর্যন্ত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ইসলামপন্থীরা এতকিছু নির্যাতনের পরেও জনগণের মাঝে ইসলামের জন্য, ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য দরদী মানুষ তৈরী করতে সাফল্য পেয়েছেন এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত বাতিলের মোকাবেলায় অটল পাহাড়ের মত অবিচল থেকে ইখওয়ানের লোকজন কাজ করে যাচ্ছেন।
একক ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যাবলী
ইসলামী আন্দোলন বর্তমান যুগে যদি তাদের যে প্রধান লক্ষ্য- ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন এবং নতুন করে ইসলামী জীবনধারা চালু করা এ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু বাতিলের সাথে টক্কর দিয়ে গোটা দুনিয়াব্যাপী ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি করতে এই বিংশ শতাব্দীতেও সফল হয়েছে। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো:
এটি এক বিপ্লবী সংগঠন:
ইসলামী আন্দোলনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি বিপ্লবধর্মী। ইসলামের পথই হলো, তার কর্মপন্থাই হলো বিপ্লবী কর্মপন্থা। আর এটি তার কর্মচঞ্চলতার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে বিপ্লব এনে দেয়। এই বিপ্লবী মনোভাবের কারণেই ইসলাম যেকোন সংকট মোকাবেলায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনে নিজেদেরকে সেভাবে সংগঠিত করতে পারছে। প্রথম যে ইসলামী রাষ্ট্র রাসূল (সা.) করেছিলেন সেটিও কিন্তু مسلمانوں দীর্ঘ আন্দোলনের বিপ্লবেরই ফসল। রুশ ও ভল্টেয়ারের আন্দোলনের তৎপরতার ফলেই ফরাসী বিপ্লব সাধিত হয়েছে। মার্কস ও লেনিনের যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এটিও ভলটিয়ারের চিন্তা-চেতনারই ফসল। আমি একথা এজন্য উল্লেখ করছি, যে কোন সংগঠনের মধ্যে যদি বিপ্লবী মনোভাব না থাকে তাহলে তা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না।
নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত নয়: বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোন স্থানকেন্দ্রিক নয়। বরং এর কাজ সর্বত্র ব্যাপ্ত। রাসূলের যুগে হিজরতের অর্থইতো হলো ইসলামী কর্মকান্ড কোন বিশেষ কেন্দ্র বা স্থানকে ঘিরে চলছে না। বরং এর অর্থ হলো পৃথিবীর সর্বত্রই এর কাজ চলবে। কোন জায়গাতে বাধা পড়লে কাজ অন্য জায়গাতে ছড়িয়ে ফেলতে হবে। আর এ জন্যই ইসলামী কর্মকান্ডের বর্তমান যুগে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে যে, বিশ্বের সর্বত্র ইসলামের কাজ চলবে। কোন ব্যক্তি বা স্থানকে কেন্দ্র করে ইসলামের কাজ নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসলাম তার দাওয়াত ও কল্যাণ সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত করেছে।
সু-চিন্তিত অভিমত: ইসলামী আন্দোলন সু-চিন্তিত ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে আগাবে। এখানে আবেগের কোন স্থান নেই। ইসলামী দাওয়াতের এই বৈশিষ্ট্যটি এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইসলাম জাহেলিয়াতের দর্শনকে তার নিজস্ব দর্শন ও জ্ঞান দিয়েই মোকাবেলা করবে, আবেগ দিয়ে নয়।
জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্য: ইসলামী আন্দোলন মানবতার সভ্যতা ও কল্যাণে জ্ঞানগত দিক দিয়েই তার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে জ্ঞানের বিষয়টিকে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য ইসলাম বা ইসলামী আন্দোলন যেই সমাজের মধ্যে কাজ করে সেখানে দাওয়াতের ক্ষেত্রে জনগণের মানসিক, রাজনৈতিক এবং পারপার্শ্বিক যুক্তিভিত্তিক সমাধান পেশ করেছে।
আধ্যাত্মিকতা: ইসলামী আন্দোলন বিশেষভাবে নির্ভর করে খোদায়ী প্রশিক্ষণের উপরে। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, তার মন-মানসিকতায় আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলে। সে তার চিন্তার ক্ষেত্রে, সভ্যতার ক্ষেত্রে, জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে, আল্লাহর বিধানকে মাথায় রাখে। সে যেকোন কাজ করতে গেলে প্রথমেই চিন্তা করে, এটি হালাল না হারাম? এটি কি শরীয়ত সম্মত? কাজটি কি সমাজের জন্য কল্যাণকর ইত্যাদি ইত্যাদি। ইসলামী আন্দোলন এই খোদায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই তার কর্মী বাহিনীকে এমনভাবে তৈরী করে যে, তারা বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পিছপা হয় না। আর এটিই হলো মহান আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর ব্যাখ্যা: "আর তোমাদের সাধ্যানুযায়ী অস্ত্রাদি দ্বারা এবং তোমাদের প্রতিপালিত অশ্বাদি দ্বারা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ (কাফিরদের মোকাবিলায়)। যা দ্বারা তোমরা ভীতির মধ্যে রাখতে পার তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদেরকে।" (সূরা আনফালঃ ৬০)