📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ
বাস্তবতা হলো আমরা ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে আমাদের সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদক্ষেপ বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য দলগত সংগঠনের থেকে অবশ্যই আলাদা বৈশিষ্ট্যে ধারণ করতে হবে।
দলগত ও মানবিক দিক
আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই গতানুগতিক আন্দোলনের কলুষতায় কলুষিত। অনেক ক্ষেত্রেই সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলামী কর্মকান্ডকে ব্যাপকতার ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে বা পরিচালিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইসলাম কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী নয়। ইসলাম সবার জন্য এবং সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। সে মুসলিম অমুসলিম কালো সাদা কারোর মধ্যে পার্থক্য করে না। কল্যাণ ও ভালোর জন্য সবাইকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে কিন্তু গতানুগতিক দলগুলি তাদের সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টি থেকে বের হয়ে আসতে পারে না।
মুসলিম দায়ীকে সবার জন্য কাজ করতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের সুমহান আদর্শ সবার নিকট পৌঁছে দিবে। সে ক্ষেত্রে শুধু লক্ষ্য রাখবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। যেমনটি নবী করীম (সা.) বলেছেনঃ "হে আল্লাহ আপনি যদি আমার উপর ক্রোধান্বিত না হন। তাহলে আমি কোন কিছুতেই পরওয়ানা করি না"। এটি তখন বলেছিলেন যখন কাফেররা তাদের উপর বিভিন্নভাবে চড়াও হচ্ছিল। আর একথাটি মহান আল্লাহ তার বাণীতে এভাবে চিত্রিত করেছেন। "আর আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসাবে উপস্থাপন করেছি। যেন তোমরা মানুষের উপর সাক্ষ্য হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত কর। আর রাসূল তোমাদের উপরে সাক্ষী হন"।
ইসলামী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ইসলামের দু'টি বিষয়ের বৈশিষ্ট্য
১. দায়ীর দৃষ্টি ও উদ্দেশ্য লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যার কারণে সে কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয় না। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি রাসূলের নিকটে এসে বললেন হে আল্লাহর রসূল আমার অবস্থান হলো, আমি একদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। আবার এর দ্বারা আমি সমাজে আমার অবস্থান তৈরী করে নিতে চাই। রাসূল তার কোন জওয়াব দিলেন না। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ নাযিল করলেন "সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে সে যেন নেক আমল এবং তার রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহাফ: ১১০)
২. বাস্তবায়নের মাধ্যম সঠিক ও বৈধ হওয়া। যা ইসলামে দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম এমন কোন কর্ম মাধ্যমকে সমর্থন করে না, যা অবৈধ। কিন্তু অন্যান্য সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দলীয় ফোরামগুলো উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্য যে কোন অনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরওয়ানা করে না, তাদের সূত্র হলো উদ্দেশ্য হাসিলে সবকিছুই বৈধ। কিন্তু ইসলাম এটিকে সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম মানবতার ধর্ম নৈতিকতার ধর্ম। এখানে অমানবিক অনৈতিক কোন কিছুর স্থান নেই।
আকীদাগত ও ব্যক্তিগত দিক
ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আকীদার বিষয়টি বিশেষ প্রণীধানযোগ্য ব্যক্তির চাইতে আকীদাহ বড়। এ জন্য ব্যক্তিত্ত্বের জীবাণু যেন ইসলামী আন্দোলনে আক্রান্ত না হয়। এ জন্য ইসলাম তার অনুসারীদের মাঝে আকীদার শক্ত ভিত্তি রচনা করেছে। যে কোন কাজে আকীদার বিষয়টিকে ব্যক্তির উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা ও ভাই বোনদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিও না যদি তারা ঈমানের উপরে কুফরীকে প্রাধান্য দেয়। যে তাদেরকে তোমাদের মধ্যে থেকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে, তারাই হবে জালেম।” (সূরা তওবা: ২৩)
এ জন্য ইসলামে আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। লক্ষ্য করুন রাসূলের স্ত্রী উম্মে হাবীবা তিনি তার মুশরিক পিতাকে রাসূলের বিছানায় বসতে দেননি। তিনি তাকে ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, এটা আল্লাহর রসূলের বিছানা আর আপনি মুশরিক অপবিত্র, আপনি আমার পিতা হলেও আপনাকে এখানে বসতে দিতে পারি না রসূলের অনুমতি ছাড়া। আবার দেখুন মুসআব ইবনে উমাইর তিনি তার অমুসলিম মাকে বললেন, যিনি তার ছেলে মোহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ না করলে না খেয়ে মারা যাবেন বলে কসম খেয়েছে। তাকে বললেন, আল্লাহর শপথ হে আম্মা আপনার যদি একশতটা জীবন থাকত আর আপনি একটি একটি করে জীবন হারাতে থাকতেন। তবুও আমি মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করবো না। এর ফলে তার মা হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি, এই আকীদাগত দৃষ্টিভঙ্গি তার অনুসারীদের দাওয়াত ও কর্মক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলে। এখানে তারা আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না। বদরের যুদ্ধে পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে, লড়াই করেছে এই আকীদাগত বিশ্বাসের কারণে। আবু বকর ছিলেন মুসলমানদের আর তার ছেলে আব্দুর রহমান মুশরিকদের দলে। উদবা ইবনে রাবিয়া সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদরে প্রথম মল্ল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আর তার ছেলে ছিল আবু হুযাইফা একজন মদ্দে মুজাহিদ। যখন তার পিতার লাশকে বদরে একটি গর্তে ফেলা হচ্ছিল। তখন তার দু'চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। রাসূল বললেন, আবু হুযাইফা তোমার চোখে পানি কেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি আমার পিতার পরিণতির জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আমার পিতার মতো একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের বিপক্ষে ব্যবহার করার ফলে কি করুণ পরিণতির সম্মুখীন হল। অথচ সে তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের পথে ব্যয় করতে পারতো, কল্যাণের পথে নিজেকে ধন্য করতে পারতো।
ব্যক্তি স্বার্থ ও সমতা
ইসলামের আকীদাগত বিশ্বাস হল, সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করবে। প্রকাশ্যে ও গোপনে, সুখে ও দুঃখে, সর্বাবস্থায় একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরওয়াস্তে কাজ করবে। সে আজকে ইবাদত কালকে গাফিলত, আজকে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল কালকে সমাজের জন্য কাজ, এই দর্শনে বিশ্বাস করে না। মহান আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল আপনি বলে দিন। হে কাফেরগণ তোমরা যার ইবাদত কর। আমি তার ইবাদত করি না। আর আমি যার ইবাদত করি তোমরা তার ইবাদত করতে প্রস্তুত নও। আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন। আর তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম"। একবার উতবা ইবনে রাবিয়া রাসূলের নিকটে এসে টাকা-পয়সা, নারী, রাজত্ব ইত্যাদির লোভ দেখায় যেন রাসূল তার দ্বীনের দাওয়াত থেকে ফিরে আসেন। রাসূল দৃঢ়তার সাথে জওয়াব দেন, "আমি তো তোমাদের টাকা পয়সা সহায় সম্পদ মান সম্মানের জন্য আসি নাই। আল্লাহ আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমাকে দিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি তোমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেই। এবং জাহান্নাম থেকে সতর্ক করি। যদি তোমরা এটিকে কবুল কর। তাহলে ইহকালে পরকালে মঙ্গল পাবে। আর যদি এটাকে প্রত্যাখ্যান কর। তাহলে আমি ধৈর্য ধারণ করে থাকবো। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের মাঝে ফায়সালা করেন"। ইসলামের এই আকীদা বিশ্বাসের প্রভাব মুসলমানদের উপরে সুদূরপ্রসারী তারা সবকিছুতেই বিজয়ে, বিপদে, দুঃখে, কষ্টে, আল্লাহর রহমত ও করুণা পরীক্ষা ও মুসিবত বলেই দৃঢ় বিশ্বাস করে। তাদেরকে শয়তান কোন ক্ষেত্রেই ধোঁকা বা নিরাশায় ফেলতে পারে না। “নিশ্চয়ই আপনার প্রভূ মানুষের উপরে অতীব করুণাময় কিন্তু তাদের অধিকাংশই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না"।
📄 ইসলামী আন্দোলন পূর্ণতা ও ভঙ্গুরতার মাঝে
বিগত অর্ধশতাব্দীর ইসলামী কর্মকান্ডের দিকে নজর দিলে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে এক ভয়াবহ চিত্র। আন্দোলনের যে প্রচেষ্টা হয়েছে তা সব কিছুর পূর্ণতা লাভের পূর্বে অর্থাৎ ইসলামী সমাজ গঠনের পূর্বেই থেমে গেছে। পূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়নি। ইসলামী সমাজ গঠন ও নতুন করে ইসলামী জীবন যাপন করতে পারার সুযোগ ও সুস্পষ্ট আশা জাগার পরও কোন একটি দেশেও এই আন্দোলন পূর্ণতা বা সফলতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি বা বলা যায় তাকে পূর্ণতা লাভের সুযোগ না দিয়ে, আন্দোলন তথা ইসলামী কর্মকান্ডকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। অনেক দেশেই ইসলামী আন্দোলন ভয়ানকভাবে পিছিয়ে গেছে অন্যান্য জড়বাদী আন্দোলনের দাপটের কাছে। জড়বাদী চিন্তা ধারার এসব আন্দোলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে সাধারণভাবে যুদ্ধ শুরু করে ইসলামের বিরুদ্ধে এবং বিশেষভাবে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে। তাদের প্রধান কাজ ইসলামের কাজকে বাধাগ্রস্ত করা। এ অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ গুলোতে সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যণীয়। এসব দেশে আন্দোলনকে খতম করতে জাহেলী মতাদর্শের লোকেরা খড়গহস্ত।
কারণ অনুসন্ধান
ইসলামী কর্মকান্ডে জড়িত লোকজন এই পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেউ কেউ মনে করেন, এটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কেননা ভাল কাজের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং খারাপ কাজের ব্যাপকতা বেড়েছে বিশেষ করে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হয় ইসলাম আখেরী জামানায় অপরিচিত হতে চলেছে। এব্যাপারে তারা রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে উদ্ধৃতি দেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন, এমন এক সময় আসবে যখন দ্বীনের ব্যাপারে ধৈর্য্যধারণকারীর অবস্থা হবে তপ্ত অঙ্গারকে হাতের তালুতে ধরে রাখার মত। আরো বর্ণিত হয়েছে, সর্বোত্তম যুগ হল আমার যুগ, এরপর যারা এর পরে আসছে অতঃপর যারা এর পরে আসছে আর শেষেরগুলো হবে নিকৃষ্ট। কেউ কেউ কারণ হিসেবে মনে করেন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটা শুরু হয়েছে ইসলামী খেলাফতের পতনের কারণে। মুসলিম বিশ্ব আজ আন্তর্জাতিক যায়নবাদ ও পরাশক্তির চক্রান্তে পর্যুদস্ত। এরা নৈতিকতা ধ্বংস করতে এবং ইসলামী কর্মকান্ডকে সর্বাত্মকভাবে বাধাদানে তৎপর। এছাড়াও জাতীয়তাবাদ আঞ্চলিকতাবাদের বিষবাষ্প ছড়ানোতে তৎপর। আর কেউ কেউ মনে করেন বর্তমান ইসলামী কর্মকান্ড ও আন্দোলন যে প্রযুক্তি ও কর্মপদ্ধতি ব্যবহার করছে তা বর্তমান জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় খুবই অপ্রতুল ও কাংখিত ফলভাবের জন্য যথেষ্ট নয়।
পর্যালোচনা
বর্তমান ইসলামী দাওয়াত পূর্ণতা লাভ ও ক্ষয়িষ্ণুতার কারণ অনুসন্ধান করতে যেসব অভিমত পাওয়া গেছে সেগুলো অবশ্যই কারণ। তবে তা শেষ নয়, আরো কারণ রয়েছে আর সেসব কারণও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করছি। যারা মনে করেন যে, বর্তমান অবস্থাটা অতি স্বাভাবিক কেননা আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে খোদাদ্রোহী শক্তি ও শয়তানেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যদিও নবী রাসূলদের যুগে এসব শক্তি ছিল, কিন্তু তারা বর্তমানে যে শক্তির দাপট দেখাচ্ছে তা আগের চেয়ে অনেক বেশী। আর এর ফলে সত্যপন্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, একবার সত্যকে একদিন বলা হয়েছিল, "বাতিলের আক্রমনের সময় কোথায় ছিলেন আপনি? সত্য বলেছিলো আমি বাতিলের মূলোৎপাটন করছিলাম। এটি বাস্তব সত্য যে, বাতিল তখনই জয়যুক্ত হয় যখন সত্যপন্থীরা বিভিন্ন গাফিলতিতে নিমজ্জিত থাকে। তাদের দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং সংগ্রামের ময়দান থেকে দূরে থাকে।
এ মতের প্রবক্তারা বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। যদি তারা মনে করেন যে, অবস্থা পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। তাহলে আমাদের মতে তারা ময়দান শত্রুর জন্য ছেড়ে দিচ্ছেন। তাদের মধ্য থেকে উৎসাহ উদ্দীপনা বিদায় নিতে বাধ্য। তারাতো সদাসর্বদা নিরাশাতেই থাকবেন। আর এ কারণে তাদের দ্বারা বা এ মতের প্রবক্তারা কোনদিন ইসলামের বিজয় নিয়ে আসতে পারবে না। কারণ বিজয়ী হতে হলে অব্যাহত সংগ্রাম করতে হবে। জানপ্রাণ দিয়ে বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে তাহলেই শান্তি আসবে। এ অর্থে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে তারা আল্লাহর পথে মরবে এবং মারবে"। (সূরা তওবা-১১১)
কেউ কেউ মনে করেন যে, আমাদের বর্তমান অবস্থা পরিস্থিতির স্বীকার। কারণ বর্তমান দিনকাল ভাল নয়। আমি এ মতের সাথেও ঐক্যমত পোষণ করতে পারছি না। কারণ সময় পরিস্থিতি এসবই আমাদের কর্মকাণ্ড দূরদর্শিতা পরাজয় ব্যর্থতার উপর নির্ভরশীল। যদি আমাদের লক্ষ্য স্থির থাকে, পথ চলা অব্যাহত থাকে, তাহলে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ বা কোরবাণী দিলে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে পারি। রাসূল (সা.) বলেছেনঃ আল্লাহর পণ্য অত্যন্ত দামী আর আল্লাহর পণ্য হচ্ছে জান্নাত। যারা বাতিলের তুফান দেখে মনে করেন যে ইসলামী আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে, তাদের এ ধারণা ভুল। বরং এক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। দাওয়াতকে সর্বত্র পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছি। এবং বাতিল যেভাবে দ্রুত তার কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত করতে পেরেছে, আমরা তা পারিনি।
তাহলে উপায় কি?
উপায় হচ্ছে আমাদের নিজেদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের নেতা ও কর্মীদের মাঝে চিন্তার পার্থক্য রয়েছে। আমাদের মধ্যে আনুগত্যের অভাব রয়েছে। কর্মী ও কর্মী বাহিনীর মধ্যে দায়িত্বানুভূতির অভাব রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর করতে হবে। নিজেদের মধ্যে সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য ও মজবুতী গড়ে তুলতে হবে। এই সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সুচিকিৎসার পাশাপাশি সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে।
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে- মুসলিম ব্যক্তিত্ব গঠন করা হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের নিমিত্তে যদি সুনাগরিক গড়ে না উঠে তাহলে ভালো রাষ্ট্র বা দেশ কিভাবে গঠন হবে? জাহেলিয়াতের সয়লাবকে দলিত মথিত করে এমন মর্দে মুজাহিদ গঠন করতে হবে যারা দুনিয়ার কোন শক্তির কাছে, লোভ-লালসার কাছে, বর্তমানে জাহেলিয়াতের কাছে মাথা নত করবে না। ইসলামী ব্যক্তিত্বের বিশেষ গুণাবলী হলোঃ
১। জাহেলিয়াতের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম ইত্যাদি থেকে মুক্ত হতে হবে।
২। ইসলাম ও তার বিধি বিধানকে আঁকড়ে ধরতে হবে। জীবনের লক্ষ্যই হবে ইসলাম। তার চলাফেরা উঠাবসা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে ইসলাম।
৩। তার মূল উদ্দেশ্য হবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম বা জিহাদ।
তার জীবন দর্শন হবে ইসলামের জন্য সবকিছু কোরবানী দেওয়া। নিজে ঈমানী জজবা নিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় অকুতোভয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।
৪। প্রশিক্ষণের দাবীঃ প্রশিক্ষণকে ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার জন্য এর কিছু আনুষঙ্গিক দাবী বা আকাঙ্ক্ষা প্রয়োজন। একজন মুসলিম মর্দে মুজাহিদ তৈরী করতে গেলে যেসব জিনিস দরকার তাহলোঃ
প্রথমত: নির্ভুল কর্মসূচি
মুসলিম ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সঠিক কর্মসূচি প্রণয়ন করা অতীব জরুরী। সঠিক কর্মসূচি না পেলে কর্মীদের সামনে অগ্রসর করা সুকঠিন হয়ে পড়বে। হযরত উমরের সময় মুসলিম বাহিনী মিসর দখল করতে গিয়ে দীর্ঘদিন বাঁধার মুখে পড়ে। বিজয় আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত উমর মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনে আসের কাছে একটি পত্র লিখেন তাতে উল্লেখ করেন, অতঃপর আমি আশ্চর্য হচ্ছি মিসর বিজয়ে বিলম্ব হওয়ায়। আপনারাতো অনেকদিন ধরে যুদ্ধ করছেন। আমার মনে হয় আপনাদের শত্রুরা যেমন দুনিয়াকে ভালবাসছে, আপনারাও সেরকম দুনিয়ার ভালবাসায় মগ্ন। আল্লাহ তা'আলা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতিকে সাহায্য দিবেন না, যতক্ষণ না তাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ হয়। হযরত উমর পারস্যে নিযুক্ত মুসলিম সেনাপতি সা'দ ইবনে মুয়াজের কাছে পত্রে লিখেন, আমি আপনাকে এবং আপনার সাথে যেসব মুসলিম সৈন্য রয়েছে তাদেরকে প্রতিটি অবস্থায়, খোদাভীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা খোদাভীতি হলো মুসলমানদের এক অব্যর্থ অস্ত্র। খোদাভীতির দ্বারা শত্রুর উপর বিজয়ী হওয়া যাবে। আপনারা সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত থাকবেন। কারণ কেউ পাপিষ্ঠ হলে আল্লাহর সাহায্য শত্রুর দিকে চলে যায়। আমরা যদি তাদের মতো পাপ করি। তাহলে তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়? তখন তো জনবল ও অস্ত্রবলে অধিকতর শক্তিশালী শত্রুরাই জয়ী হবে। আমরা অস্ত্র বলে বিজয়ী হইনা। বিজয়ী হই ঈমানের বলে।
দ্বিতীয়ত: অনুকরণীয় আদর্শ
এটি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে সফল করার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষককে শুধু জ্ঞানী গুণী ও ভাল বক্তা হলেই চলবে না। এসবের উপরে দরকার তাকে হতে হবে ইলম অনুযায়ী আলমকারী মুত্তাকী আলেম। যদি তার আমল ইলমের বিপরীত হয়, তাহলে হেদায়াত বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। তার প্রশিক্ষণের কোন প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপর পড়বে না। মালিক ইবনে দিনার বলেন যদি আলেম তার ইলম মতো আমল না করে। তাহলে তার এই ইলেম বা ওয়াজ অন্তঃ করণের উপর পড়বে না। যেমন-পাথরের ভিতরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে না।
তৃতীয়ত: নেক পরিবেশ
ইসলামী প্রশিক্ষণ সফল হওয়ার ক্ষেত্রে নেক পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। ইসলামের কথা আমরা যতই শিক্ষা দেই পাশে যদি অনৈসলামিক পরিবেশ থাকে তাহলে এই শিক্ষা শিক্ষার্থীদের উপর ভাল প্রভাব ফেলতে পারে না। শিক্ষা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নেক পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। কারণ জাহেলিয়াত তার প্রভাব বিস্তারের জন্য সর্বত্র তার থাবাকে বিস্তার করে রেখেছে। এক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষা বা প্রশিক্ষণকে যদি তার থাবা থেকে মুক্ত না রাখতে পারি, তাহলে সব প্রশিক্ষণ বিফলে যাবে। আমাদের নিম্নোক্ত কিছু বিষয়কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে যে, এসব কারণেই আমাদের অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলনের বিপর্যয় ঘটে।
এগুলো আমাদের অনেকের নিকটই সুস্পষ্ট নয়। যেমনঃ
১। আমাদের সঠিক পথের ব্যাপারটি অনেকের কাছে পরিষ্কার নয় যে, কিভাবে ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।
২। সুচিন্তিত পদক্ষেপের অভাব যে যেভাবে পারে সেভাবেই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইসলামপন্থীদের মাঝে চিন্তার অনৈক্য অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।
৩। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিশেষ অভাবের কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়া। দেখা যায় কোন ক্ষেত্রে যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা দরকার সেখানেই সিদ্ধান্ত আসে সবার পরে।
৪। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় মূল দাওয়াতের কাজকে এড়িয়ে চলা। মনে রাখতে হবে, আমরা যতই রাজনীতি করি আমাদের মূল কাজ হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলীগ।
৫। ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন বা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রণয়ন না করা।
৬। আন্দোলন পরিচালনার জন্য কার্যকর সংগঠনের বিশেষ অভাব আর যে কারণে কিছু প্রশ্ন আসে। যেমন- নেতৃত্ব কি যৌথভাবে না একক? শূরা কি বাধ্যতামূলক না বাধ্যতামূলক নয়? আমাদের কর্মকান্ড গোপনে চলবে না প্রকাশ্যে ইত্যাদি।
৭। সহিংস আক্রমন প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় উদাসীনতা।
এসব প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট হওয়া দরকার। এসবের ভিতরে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলে আমাদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ থেকে যাবে। ইসলামী আন্দোলকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সর্বশক্তি নিয়োগ করে সামনে অগ্রসর হতে হবে।
সকল মানুষকে পুনরায় আল্লাহর দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে
সব মানুষকে আল্লাহর বান্দা হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত সকল ভাইদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আমরা সকল মানুষকে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আবদ্ধ করবো। আর এ কাজটি করা ততক্ষণ পর্যন্ত করা সম্ভব হবে না যতক্ষণ না ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো যাবে। কারণ মুখের কথায় কোন নিয়ম-নীতি বা দুনিয়া চলে না। সরকারের একটি নির্দেশ সবকিছুকে ওলটপালট করে দিতে পারে। যেমন- ধরুন কোন দেশ স্বাধীন করার সময় দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ স্বাধীন করলো এদের অধিকাংশ মুসলমান কিন্তু যেহেতু তারা ইসলামকে সামনে রাখে না, তাই ইসলাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পৌঁছতে পারেনা। সেখানে আসে জনগণের শাসন বা প্রজাতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদী বিধিবিধান।
প্রকৃত সংগ্রামী দার্শনিক নয়
এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার যে, ইসলামী আন্দোলন হলো একটি ঘাঁটি বা ক্যান্টনমেন্টের মতো যেখানে মুসলিম যোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে তার সাংস্কৃতিক হউক বা সামাজিক সর্বত্র ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেখানে তারা বাতিলের মোকাবিলায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করবে। এর জন্য তাদের যা-ই উৎসর্গ করা প্রয়োজন পড়ে করবে। যদি তাদের মধ্যে যোগ্যতা এবং পূর্ণ প্রস্তুতি থাকে তাহলে অবশ্যই বাতিলকে পরাভূত করতে পারবে। সমাজে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে তা দার্শনিকের মতো বসে বসে দেখবেনা বা বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত থাকবে না। বরং ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মর্দে মুজাহিদের মতো এগিয়ে আসবে।
📄 ইসলামী ব্যক্তিত্বকে কলুষিত করার অপচেষ্টা
ইসলামী ব্যক্তিত্ব
এটা সবার জানা যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যেভাবে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল এবং ছিল বর্তমানে আমাদের মাঝে সে ধরনের ব্যক্তিত্ব নেই এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক নেই। এরপরও কিছু ইসলামী ব্যক্তিত্ব রয়েছে। যারা ইসলামকে নিজেদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। যাদেরকে দেখলে নেক বলে মনে হয়। যেমন রাসূল (সা.) বলেছেন, ঈমান কোন কামনা বাসনা বা পোশাক বা পরিচ্ছদের নাম নয়। বরং ঈমান হলো যা অন্তরে গাঁথা হয়েছে এবং বাস্তবে আমলে পরিণত হয়েছে। (আল-হাদীস)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি ইসলামী রঙে নিজেকে রঞ্জিত করবে সেই হচ্ছে ইসলামী ব্যক্তিত্ব। যাকে দুনিয়া কোন বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারবে না। কারণ আল্লাহ বলেনঃ "দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী তার কাজ করবে আখেরাতের জন্য যেটা হচ্ছে চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই দুনিয়ার জীবন খেলতামাশা ও নিজেদের মধ্যে গর্ব অহংকারের বিষয়। ধন-সম্পদ ও ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে। যেমন বৃষ্টি দেখে কৃষকরা আনন্দে লাফিয়ে উঠে। এরপরে দেখা যায় এই বৃষ্টি পড়ে জ্বলন্ত আগুন এসে ধ্বংস করে দেয়। তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি। আর যারা মুমিন তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা। দুনিয়ার জীবনতো ধোঁকা প্রতারণার সামগ্রী।" আমরা লক্ষ্য করে দেখতে পাই যে, ইসলামী ব্যক্তিত্ব বিকৃতির করার কিছু উপমা লক্ষ্য করা যায়। ইসলামী ব্যক্তিত্ব পূর্বে যে রকম ছিল বর্তমানে তেমন নেই। তাদের মধ্যে পরহেজগারীতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। দুনিয়ার প্রতি টান লক্ষ্য করা যায়। দুনিয়াপ্রীতি লক্ষ্য করা যায়।
ইসলামী ব্যক্তিত্বের বিকৃতির উপসর্গসমূহ
এ যুগে ইসলামী ব্যক্তিত্বের বিকৃতির প্রধান উপসর্গগুলো নিম্নরূপ:
সাধারণভাবে পরহেজগারীর দুর্বলতা
প্রাথমিক যুগে ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিল আল্লাহর ভয় ও আল্লাহর স্মরণে প্রবলভাবে উজ্জীবিত এবং নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে সর্বতোভাবে সংযত থাকতে অভ্যস্ত। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই উক্তির অনুসরণ করতেন, "সন্দেহযুক্ত সবকিছু পরিহার কর এবং সন্দেহমুক্ত জিনিস গ্রহণ কর।" অপর যে হাদীসটি অনুসরণ করতেন তা হলঃ "বান্দা ততক্ষণ যথার্থ মুত্তাকী হতে পারবে না, যতক্ষণ অবৈধ জিনিস থেকে পরহেজ করতে গিয়ে সন্দেহযুক্ত জিনিসও বর্জন না করে।” আবুল্লাহ ইবনে দিনার বর্ণনা করেন, একদিন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সাথে মক্কার দিকে বের হলাম। পথিমধ্যে আমরা এক জায়গায় যাত্রা বিরতি করলাম। সহসা সেখানে পাহাড় থেকে একজন রাখাল তার মেষপালসহ এল। উমর (রা.) তাকে বললেনঃ হে রাখাল, তোমরা পাল থেকে একটা মেষ আমার কাছে বিক্রি কর। সে বললো, আমি একজন ক্রীতদাস মাত্র। তিনি বললেনঃ তোমার মনিবকে বলবে, একটা মেষকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। রাখাল বললো, তাহলে আল্লাহর চোখ ফাকি দিয়ে আমি কোথায় যাবো? তখন উমর (রা.) কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর রাখালকে নিয়ে তার মনিবের কাছে গেলেন একং তাকে ক্রয় করে স্বাধীন করে দিলেন। তারপর বললেনঃ “তোমার এই উক্তিই তোমাকে দুনিয়ার গোলামী থেকে মুক্ত করলো। আশা করি ওটা তোমাকে আখেরাতের আযাব থেকেও মুক্ত করবে।”
দুনিয়ার লোভ-লালসা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া
আগে একজন মুসলমান দুনিয়াকে একটা মশামাছির সমতুল্যও মনে করতো না। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ “এ পৃথিবী খেল-তামাশা ব্যতীত কিছু নয়...।” আর রাসূল (সা.) বলেছেনঃ “যার আখেরাতে কোনো বাসস্থান নেই, দুনিয়াতে সে সখের বাসস্থান খোঁজে। আর যার কোনো বুদ্ধি নেই সে এর জন্য সঞ্চয় করে।” বস্তুতঃ দুনিয়ার প্রতি অবজ্ঞাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদেরকে অজেয় বীরে পরিণত করেছিল এবং গোটা পৃথিবীকে তাদের পদানত করেছিল। এজন্য তাদের শত্রুরা বলতো, “মুসলমানরা এমন এক জাতি, যাদের নিকট জীবনের চেয়ে মৃত্যু অধিক প্রিয় এবং দাপট ও জৌলুসের চেয়ে বিনয় ও সহজ জীবন অধিক প্রিয়।”
জীবন ও জীবিকা হারানো ও তা থেকে বঞ্চনার ভীতি
প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা হক কথা বলতে গিয়ে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করতো না। আল্লাহর কাজে কারো নিন্দা ও সমালোচনার তোয়াক্কা করতো না। সত্য বলতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে জীবন ও জীবিকার ভয়ে পিছপা হতো না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ "তোমাদের কেউ যখন কোনো সত্য উপলদ্ধি করতে পারে, তখন সে যেন কেবল মানুষের ভয়ে তা বলা থেকে বিরত না হয়। কেননা এটা তাকে কোনো জীবিকা থেকে বঞ্চিত করবে না এবং মৃত্যু বা মুসিবতেরও নিকটবর্তী করবে না।” "কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে জাপটে ধরবে। সে বলবে, কি ব্যাপার তোমাকে তো আমি চিনি না। তুমি আমাকে জাপটে ধরেছ কেন? সে বলবে, তুমি দুনিয়ায় আমাকে অন্যায় কাজ করতে দেখতে অথচ নিষেধ করতেনা কেন? জবাব দাও।"
ব্যক্তিত্ব বিকৃতির কারণ সমূহ
১. ত্রুটিপূর্ণ কর্মসূচি
ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের সুনিপুণ কর্মসূচির প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়।
জ্ঞানের ভিন্নতা ও নির্দেশনার ভিন্নতা প্রশিক্ষণ ও মন-গঠনে বিশেষ মৌলিক ভূমিকা পালন করে। খারাপ নির্বাচন উপকারের পরিবর্তে ক্ষতিকর হতে পারে।
নবী করীম (সা.) বলেছেনঃ "জ্ঞানের মধ্যে কতিপয় অজ্ঞতাও রয়েছে।" একথার দিকেই ঈসা (আ.) ইঙ্গিত করে বলেন, "গাছের মধ্যে অধিকাংশ গাছই ফল দেয় কিন্তু অনেক ফলই খাওয়া যায় না। তদ্রুপ অনেক জ্ঞানও উপকারী হয় না।"
বর্ণিত আছে যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট এসে প্রার্থনা করে যেন তাকে জ্ঞানের বিরল বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়া হয়। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করেন জ্ঞানের মূল বিষয়ে তুমি কি করেছো? সে বলল, জ্ঞানের মূল কি? তিনি বললেনঃ তুমি কি মহান প্রভূকে জেনেছো? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন সে ব্যাপারে কি করেছো? সে বলল, আল্লাহ ইচ্ছায় যতটুকু সম্ভব। রাসূল তাকে বললেন, মৃত্যুকে জেনেছো? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ ব্যাপারে কি প্রস্তুতি নিয়েছো? সে বলল, আল্লাহর ইচ্ছায় যতটুকু সম্ভব। তিনি বললেন, যাও ঐ ব্যাপারে যথাযথ কর্মসম্পাদন করে তারপর এসো তখন তোমাকে জ্ঞানের বিরল বিষয়ে শিক্ষা দিব।” নবী করীমকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন আমলটি উত্তম? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, মহান আল্লাহর ব্যাপারে জ্ঞান রাখা। বলা হল, আপনি কোন জ্ঞানের কথা বলেন? তিনি বললেন, মহান আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান। তাঁকে বলা হল, আমরা প্রশ্ন করছি আমল সম্পর্কে আর আপনি উত্তর দিচ্ছেন জ্ঞান সম্পর্কে? তখন রাসূল (সা.) বললেন, কম আমলই আল্লাহর জ্ঞান সহকারে উপকারী হবে আর আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে বেশী আমলও উপকারে আসবে না।"
ইমাম গাজ্জালী তাঁর এইয়াউল উলুম গ্রন্থে বলেন, আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান হল অন্ধকারে দেখার জন্য আলো স্বরূপ এবং বান্দার শরীরের শক্তি স্বরূপ। এর দ্বারা দুর্বলতা দূর করে বান্দা নেককার বান্দাদের মর্যাদায় সুউচ্চে পৌঁছে যায়। এই জ্ঞান নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা রোযার সমতুল্য... এর চর্চা করা রাত্রি জেগে ইবাদত করার মত সওয়াবের কাজ। এর দ্বারাই আল্লাহর আনুগত্য করা হয় এবং তাঁর বন্দেগী করা যায়। এই জ্ঞান দ্বারাই তাঁর একত্ববাদের প্রমাণ মেলে এবং তার প্রশংসা করা যায় এং এর দ্বারা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা যায় আর হালাল হারাম চেনা যায়। এই জ্ঞানই হল আমলের পথ নির্দেশক এ ইলমের দ্বারা ভাগ্যবানরাই উপকৃত হয় আর হতভাগারা বঞ্চিত থাকে।
২. ত্রুটিপূর্ণ উদ্দেশ্য
উদ্দেশ্য সঠিক হওয়া প্রশিক্ষণের কাংক্ষিত ফল লাভের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ। যদি ইসলামকে শেখার উদ্দেশ্য হয় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা, অহংকার করা, মানুষকে তাক লাগানো বা চমৎকৃত করা তাহলে কাংক্ষিত ফল লাভ হবে না এবং এই জ্ঞান তার বাহকের জন্য গুনাহের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। নবী করীম (সা.) পানাহ চেয়েছেন "এমন অন্তঃকরণ থেকে, যা আল্লাহকে ভয় করে না এবং এমন দু'আ হতে যা শুনা হয় না।" রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার নিকট যে দিন এমনটি হয় যে, জ্ঞানের দ্বারা আমি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হইনি, সেই দিনের সূর্যোদয়ে কোনই কল্যাণ নেই।” তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণ করলো, আলেমদের সাথে বিতর্ক করার জন্য, বোকাদেরকে চমক দেখাবার জন্য এবং জনগণকে তার দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তিনি অন্যত্র বলেছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে অথবা সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে তালাশ করে তাহলে সে যেন জাহান্নামে নিজের জায়গা ঠিক করে নেয়।
৩. ত্রুটিযুক্ত প্রশিক্ষণ
ইসলামী ব্যক্তিত্বের বিকৃতির পিছনে তৃতীয় কারণ হল উত্তম অনুকরণীয় আদর্শের অভাব এবং ত্রুটিযুক্ত প্রশিক্ষণ। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এটি বিরাট ভুল যে, যে কেউ কিছু ভাল কথা বলতে পারলে বা আলোচনা করতে পারলেই মনে করা হয় যে তিনি বোধ হয় উপযুক্ত প্রশিক্ষক হতে পারবেন এবং তাকে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেয়া যায়। প্রশিক্ষণ সফল হবার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় রয়েছে যেগুলো প্রশিক্ষকের ব্যক্তিত্বের মাঝে থাকা অতীব জরুরী। সুতরাং শুধুমাত্র জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, তেমনিভাবে আলোচনা করতে পারাটাই যথেষ্ট হবে না, কেননা আগাগোড়া প্রশিক্ষককে হতে হবে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব যাদেরকে সে শিক্ষা দিবে, তাদের জন্য। আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) বলেন, "যে ব্যক্তি নিজেকে লোকদের নেতা হবার জন্য দাঁড় করাবে সে যেন অন্যদেরকে শিক্ষা দেয়ার পূর্বে নিজেই শিক্ষা গ্রহণ করে, নিজের জীবন চরিত্রকে আগে সংশোধন করে নেয় নিজের জিহ্বাকে সংযত করার পূর্বেই। লোকজনকে শিক্ষা দেয়ার পূর্বেই নিজেকে শিক্ষিত ও পরিমার্জিত করতে হবে।" প্রশিক্ষকই জানবেন কিভাবে শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দিবেন এবং কতটুকু উপদেশ ও পাঠদান করবেন যা তারা শুনবে ও শিখতে পারবে, তার দায়িত্ব কিন্তু তাদেরকে শুধু শুনানোই নয় যা তারা মুখস্ত করবে বা অজানা বিষয়কে ব্যাখ্যা করে দিবে বরং তার দায়িত্ব হল তাদের অন্তঃকরনে কল্যাণের বীজ বপন করবে যেমন স্বর্ণকার স্বর্ণকে গলিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের অলংকার তৈরী করে।
প্রশিক্ষক বা মুরুব্বী তার বাহ্যিক প্রভাব দ্বারাই প্রভাবিত করবে জিহ্বার প্রভাবের পূর্বেই। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, (এমন এক সময় আসবে যখন মানুষের অন্তঃকরণের মিষ্টতা লবণাক্ততায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে সেদিন আলেমের ইলম কোন উপকারে আসবেনা এবং তার ছাত্রও উপকৃত হবে না। আলেমগণ হবে শুষ্ক ময়দানের মত বৃষ্টি নামলেও সেখানে কোন ফসল উৎপাদন হবে না। এটা হবে সে সময় যখন জ্ঞানবানদের অন্তঃকরণ দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং তারা একে পরকালের ওপর প্রাধান্য দিবে, সে সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর থেকে হিকমত বা প্রজ্ঞাকে উঠিয়ে নিবেন এবং হেদায়েতের প্রদীপ নিভিয়ে দিবেন। আপনি সে সময়কার কোন আলেমের সাথে দেখা করলে সে আপনাকে বলবে যে, সে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করে অথচ তার বাহ্যিক চাল চলনেই ফুটে উঠবে আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী ও অবাধ্যতা। সেদিনের বক্তব্য কাজে আসবে না অন্তঃকরণে নম্রতা থাকবে না। সেই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই।
এর একমাত্র কারণ হল আলেমগণ জ্ঞান শিখেছেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে আর ছাত্ররাও শিখছে ভিন্ন উদ্দেশ্য লক্ষ্যে। আল্লাহর সন্তুষ্টি কারো উদ্দেশ্য নয়। মোট কথা ইসলামী আন্দোলন বা সংগঠন যখন কোন সিলেবাস প্রণয়ন করবে, প্রশিক্ষক নিয়োগ দিবে তখন অবশ্যই এমন সব বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সকলের উদ্দেশ্য লক্ষ্য যেন সঠিক হয়। এদেরকে যথাসম্ভব জাহেলী সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে মন-মানসকিতার দিক থেকে যেন তারা ইসলামী ব্যক্তিত্ব নিয়ে জন্মলাভ করতে পারে। এটি ইসলাম চায়।
📄 আমাদের কতিপয় সাংগঠনিক দুর্বলতা
অপরিহার্য শুরা
শুরা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার উপর ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। অতীতে ও বর্তমানে অনেক লেখক গবেষক এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় ভুল ধারণায় পতিত হয়েছেন দীন ও শরীয়তের মূলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শুরার অর্থ বুঝতে। বরং কতিপয় গবেষক শুরা বলতে গণতন্ত্রের সমর্থক বা সংস্থাকে বুঝাতে চেয়েছেন কিন্তু বাস্তবে ইসলামী শুরা কখনো হুবহু গণতন্ত্র নয়। অনেক দিক থেকে শুরা গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন ও এর বিরোধী। গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি গ্রীক শব্দ। এর অর্থ হল জনগণের শাসন ও সর্বময় ক্ষমতা। এতে জনগণ ক্ষমতার উৎস। তারাই আইন প্রণেতা এবং সংবিধান রচনাকারী। আর ইসলামী শুরা হল ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ করা শরিয়তের কোন বিধানের ব্যাখায় বা প্রয়োগে কিংবা কোন বিষয়ে গবেষণা/ইজতিহাদের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তের আলোকে ও এর সীমারেখার মধ্যে থেকে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় (কায়েদা ও উসূল মেনে)।
ডেমোক্রেসীতে জনগণ নিজেই নিজেদের পরিচালিত করবে নিজেদের তৈরী আইন দ্বারা। ইসলামে জনগণ পরিচালিত হবে নাযিলকৃত বিধানের আলোকে যাকে পরিবর্তন করা বা সংশোধন করা যাবে না কোন অবস্থাতেই। ডেমোক্রেসিতে অধিকাংশের মতামতই কোন বিধান চালু করতে বা রহিত করতে যথেষ্ট তা ভুল বা সঠিক যা-ই হোক না কেন। পক্ষান্তরে শুরাতে শর্ত করা হয়েছে বিষয়টি শরিয়ত সম্মত কিনা। এর পক্ষে জন সমর্থন আছে কিনা তা বিবেচ্য নয়। ইসলামী শুরাতে বিষয়টির মৌলিকত্ব তা কেমন এর ওপর ভিত্তি করে সঠিক দিকে বা প্রান্তে পৌঁছার প্রচেষ্টা। যদিও তা একজন মাত্র লোকই সমর্থন করে থাকে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে।
নীতিগতভাবে শুরা:
নীতিগতভাবে শুরা ইসলামী বিধানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। এটি অপরিহার্য ও কুরআনী নির্দেশনার ও নবুওয়তের যুগের বাস্তবায়িত ঐতিহাসিক পন্থা। মহান আল্লাহ বলেন, "আপনি তাদের সাথে কর্মের ব্যাপারে পরামর্শ (শুরা) করুন। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালবাসেন।" (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯) তিনি অন্যত্র বলেন, "তাদের কর্মকান্ড পরিচালিত হবে নিজেদের মাঝে শুরার (পরামর্শের) ভিত্তিতে।” (সূরা শুরাঃ ৩৮)
নবী করীম (সা.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, "কোন দল কোন ব্যাপারে শুরায় (পরামর্শে) বসলে অবশ্যই সঠিক পথের দিশা পাবে।” তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি ইস্তে খারা করবে সে লজ্জিত হবেনা, আর যে হিসাব করে চলবে (মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে) সে দারিদ্রতায় পতিত হবে না"। এজন্যই মুসলমানেরা একমত হয়েছে, যে বিষয়ে কুরআন হাদীস থেকে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা নেই বা স্থায়ী শরয়ী কোন দলীল বা ভিত্তি নেই সে বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না সে ব্যাপারে শুরা বা পরামর্শ করতে হবে।
ইসলামী শুরা কোন তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি বাস্তব এবং প্রায়োগিক নীতিমালা যা ইসলামের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।
শুরার প্রয়োগ
ইসলামে শুরা একটি বিধিবিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা বলে গণ্য হলেও এর প্রয়োগের স্থান ও মাত্রা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিষয়টি আলোচনার দাবী রাখে। মতপার্থক্যটি হল শুরা একটি মূলনীতি হলেও কীভাবে তার বাস্তবায়িত হবে যেন এর ফলাফল বাধ্যতামূলক হয়ে থাকে। এ বিষয়টির সঠিক জবাব পেতে হলে আমাদেরকে ইসলামের নেতৃত্বের ধরণ ও পরিচালনার বিষয়টি সর্বপ্রথম বুঝতে হবে, আমীর বা নেতা কি ব্যক্তি না একটি গোষ্ঠী আর নেতৃত্ব কি ব্যক্তিকেন্দ্রিক না গোষ্ঠী কেন্দ্রিক?
ইসলামে নেতৃত্ব হল ব্যক্তি কেন্দ্রিক
ইসলামী বিধানে নেতা হলেন উম্মতের বিষয়াদি পরিচালনার ক্ষেত্রে একক কর্তৃত্বের অধিকারী যদিও তিনি শুরা এবং আলেম ওলামা ও বুদ্ধিজীবীদের মতামত জানতে বাধ্য। কিন্তু তিনি অধিকাংশের মত গ্রহণে বাধ্য নন...। শুরার সীমানার ব্যাখ্যা অতি স্পষ্ট। এতে নেতার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তাকেই বৈধতা দেয়া হয়েছে অধিকাংশের দিকে নয় স্পষ্ট বলা হয়েছে, “কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করুন। আর যখন কোন ব্যাপারে আপনি দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন তখন একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করুন"।
ইসলামে নেতৃত্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলতে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বুঝায়নি। নেতা যদিও ব্যক্তি হিসাবে নির্দেশ দানের ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তিনি শরীয়তের বিধি বিধান দ্বারা পরিবেষ্টিত। তিনি শরীয়তের আলোকেই আগে পরে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত ও হুকুম দিবেন। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের ডিক্টেটর তার ইচ্ছা ও মর্জি মোতাবেক নির্দেশ দিয়ে থাকে, তার সামনে কোন বিধি নিষেধ বা নিয়ম-নীতি থাকে না। ইসলামে নেতার অবস্থান হল উম্মতের প্রতিনিধি হিসেবে, তাদের ওপর কর্তৃত্বকারী হিসেবে নয়। তিনি হলেন আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নকারী, তাদেরকে নিগৃহীতকারী নন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া বিধি-বিধান উম্মতের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন করবেন, আর এজন্যই তাঁর আনুগত্য করা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি যদি শরীয়ত থেকে ও তার সীমারেখা থেকে দূরে চলে যান তাহলে তার আনুগত্য করা যাবে না বরং তার বিরোধীতা করা ও তাকে পদচ্যুত করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।
হযরত আবু বকর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব পাবার পর তাঁর বক্তব্যে বলেন, হে লোক সকল! আমি আপনাদের ওপর দায়িত্বশীল নিযুক্ত হয়েছি আর আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। যদি আমি ভাল করি তাহলে আমাকে সহায়তা করবেন। আর যদি খারাপ করি তাহলে আমাকে শোধরে দিবেন। সত্যবাদীতাই হল আমানতদারী আর মিথ্যা হল খিয়ানত। আপনাদের মধ্যে দুর্বলতম ব্যক্তি হলেন আমার কাছে শক্তিমান, যতক্ষণ না আমি তার হক আদায় করে দেই আর আপনাদের মাঝে শক্তিশালী ব্যক্তিটি আমার নিকট দুর্বল যতক্ষণ না আমি তার থেকে হক আদায় করে নেব। আপনাদেরকে জিহাদে সাড়া দিতে হবে কেননা কোন জাতি জিহাদ পরিত্যাগ করলে আল্লাহ তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করব ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা আমার আনুগত্য করবেন। আর যখন আমি তাঁর না ফরমানী করব তখন আমার ওপর আপনাদের আনুগত্য নেই। নামাযের জন্য দন্ডায়মান হোন আপনাদের ওপর আল্লাহ রহম করুন।"
উমর ইবনে আব্দুল আযীয খিলাফতের দায়িত্ব পাবার পর স্পষ্ট করে বলে দেন যে, তার কাজ হবে রাষ্ট্রে আইনের প্রয়োগ, নতুন কোন আইন রচনা নয়। তিনি বলেন, "হে লোক সকল! কুরআনের পরে আর কোন কিতাব নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) এরপর কোন নবী নেই। আমি আপনাদের মধ্যে কোন উত্তম আইন প্রণেতা বা কাযী নই কিন্তু আমি হলাম বাস্তবায়নকারী। আমি নতুন কিছু করব না আমি শুধু অনুসরণকারী মাত্র। আমি আপনাদের ওপর কোন কঠিন বোঝা চাপাতে আসিনি। জালেম শাসক থেকে পলায়নকারী জালেম বা অবাধ্য নয়...। জেনে রাখুন সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য নয়।"
এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নেতার প্রতি বাইয়াত করা হয় এজন্য যে তিনি আল্লাহর কুরআন এবং রাসূল (সা.) এর হাদীস এর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন। এর দ্বারাই প্রতীয়মান হয় যে ইসলামে নেতৃত্ব হবে ব্যক্তি কেন্দ্রিক কোন দল বা গোষ্ঠীর হাতে আবদ্ধ নয় বরং তা মুক্ত ও একক।
যৌথ নেতৃত্বের অপকারিতা সমূহ
যৌথ নেতৃত্ব বলতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে কতিপয় লোকের দ্বারা গঠিত গোষ্ঠী বা লোকের হাতে। যা অধিকাংশ লোক সমর্থন করবে কিংবা কতিপয় লোকের মধ্যে প্রথমে নির্বাহী দায়িত্বশীল কর্তৃক নেতৃত্ব পরিচালিত হবে।
যৌথ নেতৃত্বের পক্ষে যারা মতামত ব্যক্ত করেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলঃ
১. মুসলিম জামায়াত ব্যক্তি স্বৈরতন্ত্র থেকে হেফাজতে থাকবে।
২. ভুলের পরিমাণ কম হবে ব্যক্তি কেন্দ্রিক নেতৃত্ব হলে (তাদের আশংকায়) ভুলত্রুটি বেশী হবে।
৩. সর্বগুণে গুণান্বিত নেতার অভাব রয়েছে যিনি এই স্পর্শকাতর স্থানে পরিপূর্ণভাবে বসতে ও চালাতে সক্ষম হবেন।
এছাড়া এরা কুরআন হাদীস এবং ঐতিহাসিক কিছু ঘটনাবলীর দ্বারা তাদের মতের স্বপক্ষে দলীল পেশ করার চেষ্টা করে থাকেন যা ইসলামের নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্যের সাথে মোটেই সামঞ্জস্যশীল নয়।
যৌথ নেতৃত্বের খারাপ বা মন্দ হবার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে এটি ইসলাম সম্মত নয় এবং শরীয়তের সাথে এর কোন সংশ্রব নেই। ইতিহাসও একথার সাক্ষ্য বহন করে। এছাড়াও এর অনেক দোষত্রুটি ও ক্ষতিকর বিষয় রয়েছে উদাহরণ স্বরূপ এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করছি:
(ক) যৌথ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হল এটি দায়িত্বশীলতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং দায়িত্বশীলতা নেতার ঘাড় থেকে একটি গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়।
(খ) ইসলামে নেতার দায়িত্ব কোন গতানুগতিক বা অলংকারপূর্ণ দায়িত্ব নয়। বরং তা হল একটি চালিকা শক্তি যা মুসলিম উম্মাহকে সামনে এগিয়ে নিবে তাদেরকে আগে বাড়াবে পক্ষান্তরে যৌথ নেতৃত্বে দায়িত্ব হয়ে পড়ে গতানুগতিক ও অলংকার স্বরূপ...।
(গ) যৌথ নেতৃত্ব আনুগত্যের ব্যাপারটির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে আনুগত্য হল এক ব্যক্তির জন্য তিনি হলেন আমীর বা নেতা এটা কোন গোষ্ঠী বা জামায়াতের জন্য নয়। আর আমীরে অবাধ্যতাই বা কিভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়ে দাঁড়াবে যৌথ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে?
(ঘ) যৌথ নেতৃত্বের ক্ষতিকারক দিক হল এটি সময় ও শক্তির অপচয় করে এবং চলার গতিকে স্তব্ধ ও অচল করে দেয়। কেননা ছোট বড় সব ব্যাপারে কোন গোষ্ঠীর মতামতের ওপর নির্ভর করলে কর্মকান্ডে স্থবিরতা আসতে বাধ্য পক্ষান্তরে ব্যক্তি কেন্দ্রিক নেতৃত্বের সুফল হল তিনি তাৎক্ষনিক যেকোন নির্দেশ দানে সক্ষম যার ফলে অতিসহজেই যে কোন কর্ম সম্পাদন হতে পাওে। মহান আল্লাহই অধিক অবগত।
শুরার ফলাফল বাধ্যতামূলক নয়
আমীর বা নেতার ক্ষমতা ব্যাপক যেমনটি ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি যা ইচ্ছা তাই করবেন। কেউ কেউ এমন ধারণা করতে পারে। এর সঠিক জবাব জানার জন্য আমাদেরকে জানতে হবে এ সম্পর্কিত অভিমত এবং নেতা কিভাবে কাজ করবেন।
এ ব্যাপারে তিনটি অভিমত পাওয়া যায়ঃ
এক. যে বিষয়ে শরীয়তের স্পষ্ট দলিল রয়েছে সে ক্ষেত্রে নেতার কোনই এখতিয়ার নেই তা বাস্তবায়ন করা ছাড়া।
দুই. বিষয়টি শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কিত কিন্তু মতপার্থক্য রযেছে। এক্ষেত্রে নেতার কাজ হবে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ফয়সালা করা, তখন তিনি মুজতাহিদ গবেষক এবং আলেমদের অভিমত গ্রহণ করতে পারেন।
তিন. সময়ের প্রয়োজনে জরুরী কোন বিষয়ে যেমন রাজনৈতিক অভিমত বা সিদ্ধান্ত প্রদান করা বা নতুন কোন বিষয়ে দিক নির্দেশনা প্রদান এক্ষেত্রে নেতা সঠিক দিকটি চিন্তা করে পরামর্শ নিতে পারেন এবং এক্ষেত্রে অধিকাংশের দিকে দৃষ্টি দেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। রাসূল (সা.) বদর প্রান্তরের দিকে বের হয়েছিলেন মদীনা থেকে তখন অধিকাংশ মুসলমানেরা তা পছন্দ করেননি। "তারা সত্যের ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক করছিল তা স্পষ্ট হওয়ার পরও। যেন তারা দেখছিল যে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা হচ্ছে।" (সূরা আনফালঃ ৬) তিনি বদর প্রান্তরে সৈন্যদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন হুবাব ইবনে মুনজির এর অভিমত গ্রহণ করে, এক্ষেত্রে তিনি অন্য কারো মতামত গ্রহণ করেননি। তিনি সাদ ইবনে মুয়াযের অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে বদরের রণাঙ্গনে নিজের জন্য উচ্চ আসন (যুদ্ধ পরিচালনার জন্য) তৈরী করেছিলেন। তিনি বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে হযরত আবুবকরের (রা.) মতামত গ্রহণ করেন।
তিনি আবু লুবাবাকে মদীনার দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেন এবং ইবনে উম্মে মাকতুমকে নামাযের ইমামতির দায়িত্ব অর্পন করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহুদের যুদ্ধে মদিনা থেকে বের হয়ে শত্রুদের সাথে মোকাবিলা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যদিও মুসলমানেরা তাদের পূর্বমত থেকে ফিরে এসেছিল। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে যে বিখ্যাত উক্তি করেন তা হলোঃ "কোন নবীর পক্ষে এটা সম্ভব নয় যে উম্মতের জন্য যুদ্ধপোষাকে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধ না করেই তা খুলে ফেলে।" মুসলমানেরা নবুওতের যুগের পর হতে এ পন্থাকেই অনুসরণ করে চলেছেন। সেনাপতি বা নেতা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন, প্রতিনিধি দল প্রেরণ করতেন, আঞ্চলিক শাসক নিয়োগ করতেন এবং পদচ্যুত করতেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন করতেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন এসবে অধিকাংশের বা কমসংখ্যকের মতামতের ওপর ভিত্তি করে করতেন না। তিনি পরামর্শ বা অভিমত গ্রহণ করে যেটাকে ভাল মনে করতেন সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিতেন।
আবু বকর (রা.) সিরিয়ায় সেনা প্রেরণ করেন বড় বড় সাহাবাদের বিরোধীতা সত্ত্বেও এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উমর ফারুক (রা.)। যিনি বলেছিলেন, "আপনি কিভাবে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করছেন? আরবরা তো আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে"। তখন আবু বকর (রা.) বলেন, "আল্লাহর কসম! যদি কুকুররা মদীনার মেয়েদের পায়ের নুপুর নিয়ে খেলা করে তবুও আমি সেই সৈন্য প্রেরণে দ্বিধা করব না যা নবী করীম প্রেরণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।” হযরত আবু বকর (রা.) যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেন তখন তাঁকে উমর (রা.) সহ অন্যান্যরা বলেছিলেন "যদি আরবরা যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাহলে আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন।" তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ আমার হাতে তরবারী রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।" তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কাদেরকে সাথে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন? তিনি বলেছিলেন, আমি একাই লড়বো যতক্ষণ না আমার মাথা কাটা পড়ে।
আমরা এখানে ইতিহাসের পাতা থেকে মাত্র গুটিকতক সাক্ষ্য প্রমাণ উল্লেখ করেছি। এ ধরনের অগণিত দলিল প্রমাণ রয়েছে যা দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, আমীর বা নেতাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তার হাতেই একক কর্তৃত্ব আর এ পন্থাই সঠিক। তিনি যে কোন ব্যাপারে যথা সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে উম্মতের সার্বিক কল্যাণে কর্মকান্ড পরিচালনা করবেন।
নেতৃত্বের গুণাবলী ও আনুগত্যের দর্শন
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইসলাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রসঙ্গে বলেছে, নেতার আনুগত্য করা, আল্লাহর আনুগত্যের শামিল এবং তাঁর অবাধ্যতা আল্লাহর অবাধ্যতা। যে নেতার এমন মর্যাদা তিনি কেমন হবেন? তিনি সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী, সম্মানী বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেই কি শুধু তার আনগত্য করতে হবে? আর তা না হলে বিরোধিতা করা কিংবা যৌথ নেতৃত্ব কায়েম করতে হবে কি? এ ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?
এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার। নেতার আনুগত্য করা ওয়াজিব, তিনি যে ধরনেরই হোন না কেন? তিনি সমাজের যত নিম্ন শ্রেণীর লোক হোন না কেন, অধিকাংশের ভোটে তিনি যখন নির্বাচিত হবেন, তার আনুগত্য করতে হবে। এ ব্যাপারে নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন : “তোমরা শ্রবণ কর এবং আনুগত্য কর যদিও তোমাদের ওপর কোন হাবশী ক্রীতদাসকে আমীর নিয়োগ করা হয় যার মাথার চুল কিসমিসের দানার মত।” তিনি আরও বলেন, “মুসলমানের রক্ত পরস্পরের জন্য পরিপূরক তাদের একের জিম্মায় অন্যরা অগ্রগামী হবে, তারা অন্যদের ব্যাপারে নিজেরা হবে একতাবদ্ধ হাতের মত।”
ইসলামের ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ রয়েছে। ওসামা বিন যায়েদকে মুসলিম বাহিনীর সেনানায়ক নিয়োগ এর একটি উত্তম উদাহরণ অথচ সেখানে ছিল তার চেয়ে বয়সে, বিদ্যা-বুদ্ধি ও মান-সম্মানে তার চেয়ে বড় অনেকেই। তার আনুগত্য করতে এসব কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তার আদেশ মানতে কোন মুসলিম সামান্যও কুণ্ঠিত হননি। আনুগত্য হল ইসলামের জন্য, আনুগত্য ভাল কাজের জন্য এখানে দেখা হবে না নেতার দিকে বরং নজর দেয়া হবে হকের দিকে।
মোট কথা শুরা হল ইসলামী বিধি-বিধানের একটি মৌলিক গুণাবলীর বিষয়। ইসলামী শরীয়তের এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলীর অন্যতম। শুরার প্রয়োজন পড়বে না, শরীয়তের সেসব বিষয়ে যে ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে। শুরা হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা চিন্তা-গবেষণার বিষয়ে, সে ক্ষেত্রেও নেতা অধিকাংশ বা কমসংখ্যক লোকের মতামতের মধ্যে যা উম্মতের জন্য কল্যাণকর মনে করবেন তাই গ্রহণ করবেন। কারণ ইসলামে নেতৃত্ব হল একক। বলা যায় ব্যক্তির হাতে (আমীরের হাতে) কোন গ্রুপ বা গোষ্ঠীর হাতে নয় যৌথ নেতৃত্বও নয়।