📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি

📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি


উত্তম পদ্ধতি দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি
কতিপয় কর্মকারণ রয়েছে যা দায়ীর দাওয়াতকে সফল হতে এবং কাংখিত ফললাভে অনেকাংশে সহায়তা করে তাহল উত্তম পদ্ধতি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কার্যকরণ যার মাধ্যমে দায়ী অল্পসময়ে, স্বল্প খরচে দাওয়াতের ও তাবলীগের উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম তা বক্তব্য, আলোচনা, লিখিত রচনা যাই হোক উত্তম পদ্ধতিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। দায়ীকে হতে হবে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মত যিনি বুঝেন চিকিৎসা কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কিভাবে শুরু করতে হবে অতঃপর তিনি প্রয়োজনীয় উপাদান না পাওয়ার পূর্বে শুরু করবেন না যেন তার কাজকর্ম ব্যর্থ না হয়ে যায়।

সমাজে আজ বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন বিদ্যমান এমন বক্তব্য রাখবেন যেন লোকজন আগ্রহের সাথে শুনেন এমন ভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা উপলব্ধি করতে পারেন তাদের অন্তঃকরনকে নাড়া দেয়, তাদের রোগের উপর প্রতিক্রিয়া ঘটায় তাদের সমস্যার কথা উঠে আসে। স্থান কাল পাত্র ভেদে আলোচনা উপস্থাপন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন আমাকে নির্দেশ করা হয়েছে যেন আমি লোকজনকে তাদের জ্ঞান সম্মান মোতাবেক বক্তব্য রাখি। বর্তমান সময়ে ইসলামের পক্ষে কাজ করার জন্য এমন দায়ীর বিশেষ প্রয়োজন যারা সুন্দর ভাবে চিন্তাধারা উপস্থাপন করবেন, এমন পদ্ধতিতে যাতে ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্টত্ব ফুঠে উঠে এবং লোকজন তা শুনতে, বুঝতে ও জানতে আগ্রহী হয়। আজ অনেকেই ইসলামের কথা বলে ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে তারা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশী করেছেন। এজন্য দাওয়াতের কাজ উত্তমভাবে উপস্থাপন উত্তম পদ্ধতিতে দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে।

কাঠিন্য ও কোমলতার মাঝে
মানুষের নফসে প্রকৃতিগত ভাবেই ভাল জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা রয়েছে? কেউ তার সাথে ভাল আচরণ করলে সে তাকে ভালবাসে আবার কেউ তার সাথে কর্কশ ও রুঢ় আচরণ করলে তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হয় তার ব্যাপারে ক্রোধ ও ঘৃনা জন্মে। এজন্য নরম ও মোসাহেবী করা বা তেল মালিশী করা নয় যা মুনাফিকীর নামান্তর। দায়ীকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নম্র ভদ্র ভাষা ব্যবহার করতে হবে বিশেষভাবে যদি দাওয়াত দেয়া হয় মুসলমানদেরকে। এজন্য রুঢ় কথা ও কর্কশ ভাষা কিংবা আক্রমনাত্মক কথা দাওয়াতের ক্ষেত্রে মোটেই কাম্য নয়। লক্ষ করুন মুসা ও হারুন (আ.) এর প্রতি মহান প্রভুর দাওয়াতের ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা। তৎকালীন স্বৈরাচারী ফেরাউনের নিকট দাওয়াতের সময় তাদের নরম ভাষা ও ভদ্র আচরণ করার নির্দেশ দেন। "তোমরা দুজনে যাও ফেরাউনের নিকট সে চরম অবাধ্য আচরণ করেছে। অতপর তাকে নরম কথা বলো হয়তোবা সে নসিহত গ্রহণ করবে কিংবা আল্লাহকে ভয় করবে।" (সূরা ত্বহা.....)

নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে এই নীতি গ্রহণ করার জন্য কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কঠোরতা পরিহার করে নম্রতা গ্রহণ এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের পন্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "আপনার রবের পথে আহবান করুন হিকমত ও উত্তম বাক্যের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়। নিশ্চয় আপনার রব জানেন কে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তিনি হেদায়েত প্রাপ্তদের সর্ম্পকে অধিক অবগত"। (সূরা নাহলঃ১২৫) ইবনে কাসীর এর ব্যাখ্যায় বলেন, যদি বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তাহলে হাসি মুখে যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে হবে নম্র ভদ্র ভাষায়। সূরা আলে ইমরানে নম্রতার উপকারিতা ও সহযোগী সমর্থক অর্জনে এর ভূমিকা এবং দাওয়াতের গতি সঞ্চারনে এর কার্যকারিতা কথা উল্লেখ করে নবী করীম (সা.) এর প্রতি ওহী নাজিল হয়।

"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুঢ় ও কঠিন হতেন তাহলে তারা আপনার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত”। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৯) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুণাবলীর উল্লেখ পেয়েছি। তিনি কঠোর নন। রুঢ় আচরণকারী নহেন। খামাখা হাটবাজারে ঘুরে বেড়াবেন না এবং খারাপের প্রতিদান খারাপ দিয়ে দিবেন না। বরং ক্ষমা করবেন এবং ভাল ব্যবহার করবেন। নবীর জীবন চরিত্রে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যাতে দেখা যায় তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে নম্র-ভদ্রভাবে এমন সুন্দরভাবে দাওয়াত উপস্থাপন করেছেন যা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করেছে।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এক যুবক এসে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি আমাকে যিনা (ব্যভিচার) করার অনুমতি দিবেন? একথা শুনে লোকজন চিৎকার করে উঠে। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি আমার নিকটে এসো। যুবকটি তার নিকটে এসে সামনে বসে পড়ল। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি কি এ কাজটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন মানুষেরাও তাদের মায়ের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল, না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, লোকজনও তাদের মেয়েদের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পছন্দ কর? ইবনে আউফ (রা.) বলেন, তিনি ফুফু ও খালার কথাও যোগ করেন। সে প্রত্যেক বারই জবাব দেয়: না, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। অতপর নবী করীম (সা.) তাঁর হাত যুবকটির বুকের ওপর রেখে বলেন হে আল্লাহ! আপনি এর বক্ষকে পবিত্র করুন। এর লজ্জাস্থানকে হেফাযাত করুন। এরপর থেকে যুবকটির নিকট এর চেয়ে অর্থাৎ যিনার চেয়ে অন্য আর কিছু এত ঘৃনিত ছিলনা। দায়ীর দাওয়াতের পদ্ধতি সদাসর্বদা উত্তম, সুন্দর ও যুগোপযুগী হতে হবে যেন বৈধ উপকরণের মাধ্যমে অতি সহজভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করা যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হিকমত হল মুমিনের জন্য হারানো মানিকের ন্যায় সে যেখানেই তা পাবে সেখান থেকেই তা আহরণ করবে। তিনি আরো বলেন, তোমরা হিকমত গ্রহণ কর তা যেখান থেকেই আসুক না কেন? আমরা কি চাই?

উত্তম পদ্ধতি তখনই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে যখন দায়ীর গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি ভংগি বিরাজ করে সে কি চাই তার উপর। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে সার্বিক ও কাংক্ষিত ফল লাভ সম্ভব হবে। কি চাই? এটা নির্ধারিত থাকলে সময় প্রচেষ্টা ও উপকরণ ঠিক মত কাজে লাগানো সম্ভব। নতুবা প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হবে। এ বিষয়টির প্রতি আল্লাহ ইঙ্গিত করে বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে"। (সূরা আহযাবঃ৭০-৭১) দায়ীকে অবশ্যই সর্তক দৃষ্টি রাখতে হবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে তা দাওয়াতের ক্ষেত্রেই হোক বা রাজনীতির ক্ষেত্রে কিংবা ছাত্র আন্দোলন অথবা শ্রমিক সংগঠনের ক্ষেত্রে যে সে এক্ষেত্রে কি অর্জন করতে চায়? হাসান বসরী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কাজ করে কোন ধরনের জ্ঞান ছাড়াই সে হল রাস্তা না চিনেই চলা পথিকের মতন। আর উদ্দেশ্যহীন ভাবে কর্মসম্পদনকারী ব্যক্তি ভালর চেয়ে ক্ষতিই করে বেশী।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 ইসলামের দায়ী ও তার গ্রহণযোগ্যতা

📄 ইসলামের দায়ী ও তার গ্রহণযোগ্যতা


ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রস্তুতি ও গ্রহণযোগতার ক্ষেত্রে তারতম্য রয়েছে যা লক্ষনীয়। এই পার্থক্য ও তারতম্য সাধারণ ও বিশেষ সবশ্রেণীর মধ্যে রয়েছে। এটি আবার প্রভাব ফেলে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং তাদের সামাজিক কর্মকান্ডে এবং তা সফল হবার ক্ষেত্রে। আমরা এই পার্থক্য ও তার ধরণকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।

প্রথম প্রকার: এই মানের ভাইদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে, যেমন জ্ঞান, মজবুত ঈমান, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং নিষ্ঠা খুব ভালোভাবেই রয়েছে। তাদের গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। এধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন ভাইয়েরাই দাওয়াতের চালিকা শক্তি। যে কোন আন্দোলনে এ মানের জনশক্তির সমাবেশ ঘটলে তার স্থিতি, সাফল্য কাংখিত মানের হবে নিঃসন্দেহে।

দ্বিতীয় প্রকার: এই ধরনের ভাইদের মাঝে কিছু প্রস্তুতি যেমন আছে যোগ্যতাও আছে আবার দুর্বলতা এবং পিছুটানও রয়েছে। এদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা যেমন আছে তেমনি আবার এদের ব্যাপারে কিছু কথাও রয়েছে। এধরনের লোকদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠিয়ে আন্দোলনমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি এদের দুর্বলতাকে কাটাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।

তৃতীয় প্রকার: এদের না আছে গ্রহণযোগ্যতা, না আছে কোন প্রস্তুতি, এরা চিন্তার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতায় রয়েছে। এরা আন্দোলনকে তেমন কিছু দিতে পারবে না শুধু মাত্র সমর্থন ছাড়া। এরা নিজেদের গন্ডির মধ্যে থেকে বের হতে চায় না। এদেরকে উন্নত করার চিন্তা বা প্রচেষ্টা করে খুব একটা লাভ হবে না।

এই পার্থক্যের কার্যকারণ: শ্রেণী বিন্যাসের অনেক কারণ রয়েছে যা গণনা করা সম্ভব নয়। কিছু কারণ হলো স্বভাবগত আবার কিছু হলো বংশগত আর কিছু হলো উপার্জনগত। স্বভাবগত এবং বংশগত বিষয়টি বাদ দিয়ে যদি উপার্জনগত দিকে নজর দেই তাহলে দেখতে পাই যে,

১ম কারণ
আমাদের ভাইদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান খুবই সীমিত। তার কাছে ইসলামের বুঝ বা সমঝ পরিস্কার নয়। এক্ষেত্রে ইসলামের সঠিক ধারণা দিতে হবে। নবী করীম (সা.) বলেন- আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে তিনি দ্বীনের সঠিক সমঝ দান করেন। (মুসলিম)

২য় কারণ
বাস্তব জীবনের সাথে ইসলামের সম্পর্কের ওপর, এ কারণ নির্ভরশীল। হয়তো সে ইসলামকে বুঝে কিন্তু বাস্তবে কর্মে পরিণত করে না। ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকে, বাস্তব জীবনে তার উল্টোটি করে। আর এই কারণে তার দ্বারা কল্যাণমূলক কাজ হওয়া খুবই কষ্টকর। সে সর্বদা দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও ভয়ভীতির মধ্যে থাকে। যা থেকে সে বের হয়ে আসতে পারে না। এ ধরনের লোকদেরকে কুরআন শরীফে তিরস্কার করা হয়েছে। বলা হয়েছে "তোমরা কি মানুষকে নেকীর দিকে আহ্বান কর আর নিজেদেরকে সে ব্যাপারে ভুলে যাও অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করছো। আর তোমরা এ ব্যাপারে অজ্ঞ”। (সূরা বাকারা-৪৪)

অন্যত্র বলা হয়েছে, "হে ঈমানদারগণ তোমরা কেন তা বলো যা তোমরা নিজে কর না। এটি আল্লাহর নিকটে অত্যন্ত গর্হিত কাজ যে তোমরা যা বলবে তা নিজেরা করবে না"। (সূরা সফ-২)

৩য় কারণ
এ কারণটি আল্লাহর সাথে এবং দা'য়ীর সাথে সম্পর্কিত। দায়ীর ব্যক্তিত্ব এবং তার পদক্ষেপ ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হবে না, যতক্ষণ না সে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে সোপর্দ করে। আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য সবার সাথে রুহানী সম্পর্ক ছিন্ন করে। এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সচেষ্ট হয়।

৪র্থ কারণ
আমাদের দায়ী ভাইকে নিজের লোভ-লালসা আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া পাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার উপর নির্ভর করতে হবে। সে যেন শয়তানের প্ররোচনা থেকে সদাসর্বদা নিজেকে সুরক্ষিত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু" সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গণ্য কর। তাকে নবী করীম (সা.) এর বাণীও স্মরণ করতে হবে যে 'নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলাচল করে"।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ

📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ


বাস্তবতা হলো আমরা ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে আমাদের সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদক্ষেপ বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য দলগত সংগঠনের থেকে অবশ্যই আলাদা বৈশিষ্ট্যে ধারণ করতে হবে।

দলগত ও মানবিক দিক
আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই গতানুগতিক আন্দোলনের কলুষতায় কলুষিত। অনেক ক্ষেত্রেই সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলামী কর্মকান্ডকে ব্যাপকতার ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে বা পরিচালিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইসলাম কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী নয়। ইসলাম সবার জন্য এবং সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। সে মুসলিম অমুসলিম কালো সাদা কারোর মধ্যে পার্থক্য করে না। কল্যাণ ও ভালোর জন্য সবাইকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে কিন্তু গতানুগতিক দলগুলি তাদের সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টি থেকে বের হয়ে আসতে পারে না।

মুসলিম দায়ীকে সবার জন্য কাজ করতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের সুমহান আদর্শ সবার নিকট পৌঁছে দিবে। সে ক্ষেত্রে শুধু লক্ষ্য রাখবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। যেমনটি নবী করীম (সা.) বলেছেনঃ "হে আল্লাহ আপনি যদি আমার উপর ক্রোধান্বিত না হন। তাহলে আমি কোন কিছুতেই পরওয়ানা করি না"। এটি তখন বলেছিলেন যখন কাফেররা তাদের উপর বিভিন্নভাবে চড়াও হচ্ছিল। আর একথাটি মহান আল্লাহ তার বাণীতে এভাবে চিত্রিত করেছেন। "আর আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসাবে উপস্থাপন করেছি। যেন তোমরা মানুষের উপর সাক্ষ্য হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত কর। আর রাসূল তোমাদের উপরে সাক্ষী হন"।

ইসলামী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ইসলামের দু'টি বিষয়ের বৈশিষ্ট্য
১. দায়ীর দৃষ্টি ও উদ্দেশ্য লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যার কারণে সে কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয় না। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি রাসূলের নিকটে এসে বললেন হে আল্লাহর রসূল আমার অবস্থান হলো, আমি একদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। আবার এর দ্বারা আমি সমাজে আমার অবস্থান তৈরী করে নিতে চাই। রাসূল তার কোন জওয়াব দিলেন না। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ নাযিল করলেন "সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে সে যেন নেক আমল এবং তার রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহাফ: ১১০)
২. বাস্তবায়নের মাধ্যম সঠিক ও বৈধ হওয়া। যা ইসলামে দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম এমন কোন কর্ম মাধ্যমকে সমর্থন করে না, যা অবৈধ। কিন্তু অন্যান্য সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দলীয় ফোরামগুলো উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্য যে কোন অনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরওয়ানা করে না, তাদের সূত্র হলো উদ্দেশ্য হাসিলে সবকিছুই বৈধ। কিন্তু ইসলাম এটিকে সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম মানবতার ধর্ম নৈতিকতার ধর্ম। এখানে অমানবিক অনৈতিক কোন কিছুর স্থান নেই।

আকীদাগত ও ব্যক্তিগত দিক
ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আকীদার বিষয়টি বিশেষ প্রণীধানযোগ্য ব্যক্তির চাইতে আকীদাহ বড়। এ জন্য ব্যক্তিত্ত্বের জীবাণু যেন ইসলামী আন্দোলনে আক্রান্ত না হয়। এ জন্য ইসলাম তার অনুসারীদের মাঝে আকীদার শক্ত ভিত্তি রচনা করেছে। যে কোন কাজে আকীদার বিষয়টিকে ব্যক্তির উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা ও ভাই বোনদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিও না যদি তারা ঈমানের উপরে কুফরীকে প্রাধান্য দেয়। যে তাদেরকে তোমাদের মধ্যে থেকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে, তারাই হবে জালেম।” (সূরা তওবা: ২৩)

এ জন্য ইসলামে আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। লক্ষ্য করুন রাসূলের স্ত্রী উম্মে হাবীবা তিনি তার মুশরিক পিতাকে রাসূলের বিছানায় বসতে দেননি। তিনি তাকে ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, এটা আল্লাহর রসূলের বিছানা আর আপনি মুশরিক অপবিত্র, আপনি আমার পিতা হলেও আপনাকে এখানে বসতে দিতে পারি না রসূলের অনুমতি ছাড়া। আবার দেখুন মুসআব ইবনে উমাইর তিনি তার অমুসলিম মাকে বললেন, যিনি তার ছেলে মোহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ না করলে না খেয়ে মারা যাবেন বলে কসম খেয়েছে। তাকে বললেন, আল্লাহর শপথ হে আম্মা আপনার যদি একশতটা জীবন থাকত আর আপনি একটি একটি করে জীবন হারাতে থাকতেন। তবুও আমি মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করবো না। এর ফলে তার মা হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি, এই আকীদাগত দৃষ্টিভঙ্গি তার অনুসারীদের দাওয়াত ও কর্মক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলে। এখানে তারা আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না। বদরের যুদ্ধে পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে, লড়াই করেছে এই আকীদাগত বিশ্বাসের কারণে। আবু বকর ছিলেন মুসলমানদের আর তার ছেলে আব্দুর রহমান মুশরিকদের দলে। উদবা ইবনে রাবিয়া সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদরে প্রথম মল্ল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আর তার ছেলে ছিল আবু হুযাইফা একজন মদ্দে মুজাহিদ। যখন তার পিতার লাশকে বদরে একটি গর্তে ফেলা হচ্ছিল। তখন তার দু'চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। রাসূল বললেন, আবু হুযাইফা তোমার চোখে পানি কেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি আমার পিতার পরিণতির জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আমার পিতার মতো একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের বিপক্ষে ব্যবহার করার ফলে কি করুণ পরিণতির সম্মুখীন হল। অথচ সে তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের পথে ব্যয় করতে পারতো, কল্যাণের পথে নিজেকে ধন্য করতে পারতো।

ব্যক্তি স্বার্থ ও সমতা
ইসলামের আকীদাগত বিশ্বাস হল, সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করবে। প্রকাশ্যে ও গোপনে, সুখে ও দুঃখে, সর্বাবস্থায় একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরওয়াস্তে কাজ করবে। সে আজকে ইবাদত কালকে গাফিলত, আজকে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল কালকে সমাজের জন্য কাজ, এই দর্শনে বিশ্বাস করে না। মহান আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল আপনি বলে দিন। হে কাফেরগণ তোমরা যার ইবাদত কর। আমি তার ইবাদত করি না। আর আমি যার ইবাদত করি তোমরা তার ইবাদত করতে প্রস্তুত নও। আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন। আর তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম"। একবার উতবা ইবনে রাবিয়া রাসূলের নিকটে এসে টাকা-পয়সা, নারী, রাজত্ব ইত্যাদির লোভ দেখায় যেন রাসূল তার দ্বীনের দাওয়াত থেকে ফিরে আসেন। রাসূল দৃঢ়তার সাথে জওয়াব দেন, "আমি তো তোমাদের টাকা পয়সা সহায় সম্পদ মান সম্মানের জন্য আসি নাই। আল্লাহ আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমাকে দিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি তোমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেই। এবং জাহান্নাম থেকে সতর্ক করি। যদি তোমরা এটিকে কবুল কর। তাহলে ইহকালে পরকালে মঙ্গল পাবে। আর যদি এটাকে প্রত্যাখ্যান কর। তাহলে আমি ধৈর্য ধারণ করে থাকবো। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের মাঝে ফায়সালা করেন"। ইসলামের এই আকীদা বিশ্বাসের প্রভাব মুসলমানদের উপরে সুদূরপ্রসারী তারা সবকিছুতেই বিজয়ে, বিপদে, দুঃখে, কষ্টে, আল্লাহর রহমত ও করুণা পরীক্ষা ও মুসিবত বলেই দৃঢ় বিশ্বাস করে। তাদেরকে শয়তান কোন ক্ষেত্রেই ধোঁকা বা নিরাশায় ফেলতে পারে না। “নিশ্চয়ই আপনার প্রভূ মানুষের উপরে অতীব করুণাময় কিন্তু তাদের অধিকাংশই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না"।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 ইসলামী আন্দোলন পূর্ণতা ও ভঙ্গুরতার মাঝে

📄 ইসলামী আন্দোলন পূর্ণতা ও ভঙ্গুরতার মাঝে


বিগত অর্ধশতাব্দীর ইসলামী কর্মকান্ডের দিকে নজর দিলে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে এক ভয়াবহ চিত্র। আন্দোলনের যে প্রচেষ্টা হয়েছে তা সব কিছুর পূর্ণতা লাভের পূর্বে অর্থাৎ ইসলামী সমাজ গঠনের পূর্বেই থেমে গেছে। পূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়নি। ইসলামী সমাজ গঠন ও নতুন করে ইসলামী জীবন যাপন করতে পারার সুযোগ ও সুস্পষ্ট আশা জাগার পরও কোন একটি দেশেও এই আন্দোলন পূর্ণতা বা সফলতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি বা বলা যায় তাকে পূর্ণতা লাভের সুযোগ না দিয়ে, আন্দোলন তথা ইসলামী কর্মকান্ডকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। অনেক দেশেই ইসলামী আন্দোলন ভয়ানকভাবে পিছিয়ে গেছে অন্যান্য জড়বাদী আন্দোলনের দাপটের কাছে। জড়বাদী চিন্তা ধারার এসব আন্দোলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে সাধারণভাবে যুদ্ধ শুরু করে ইসলামের বিরুদ্ধে এবং বিশেষভাবে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে। তাদের প্রধান কাজ ইসলামের কাজকে বাধাগ্রস্ত করা। এ অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ গুলোতে সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যণীয়। এসব দেশে আন্দোলনকে খতম করতে জাহেলী মতাদর্শের লোকেরা খড়গহস্ত।

কারণ অনুসন্ধান
ইসলামী কর্মকান্ডে জড়িত লোকজন এই পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেউ কেউ মনে করেন, এটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কেননা ভাল কাজের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং খারাপ কাজের ব্যাপকতা বেড়েছে বিশেষ করে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হয় ইসলাম আখেরী জামানায় অপরিচিত হতে চলেছে। এব্যাপারে তারা রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে উদ্ধৃতি দেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন, এমন এক সময় আসবে যখন দ্বীনের ব্যাপারে ধৈর্য্যধারণকারীর অবস্থা হবে তপ্ত অঙ্গারকে হাতের তালুতে ধরে রাখার মত। আরো বর্ণিত হয়েছে, সর্বোত্তম যুগ হল আমার যুগ, এরপর যারা এর পরে আসছে অতঃপর যারা এর পরে আসছে আর শেষেরগুলো হবে নিকৃষ্ট। কেউ কেউ কারণ হিসেবে মনে করেন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটা শুরু হয়েছে ইসলামী খেলাফতের পতনের কারণে। মুসলিম বিশ্ব আজ আন্তর্জাতিক যায়নবাদ ও পরাশক্তির চক্রান্তে পর্যুদস্ত। এরা নৈতিকতা ধ্বংস করতে এবং ইসলামী কর্মকান্ডকে সর্বাত্মকভাবে বাধাদানে তৎপর। এছাড়াও জাতীয়তাবাদ আঞ্চলিকতাবাদের বিষবাষ্প ছড়ানোতে তৎপর। আর কেউ কেউ মনে করেন বর্তমান ইসলামী কর্মকান্ড ও আন্দোলন যে প্রযুক্তি ও কর্মপদ্ধতি ব্যবহার করছে তা বর্তমান জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় খুবই অপ্রতুল ও কাংখিত ফলভাবের জন্য যথেষ্ট নয়।

পর্যালোচনা
বর্তমান ইসলামী দাওয়াত পূর্ণতা লাভ ও ক্ষয়িষ্ণুতার কারণ অনুসন্ধান করতে যেসব অভিমত পাওয়া গেছে সেগুলো অবশ্যই কারণ। তবে তা শেষ নয়, আরো কারণ রয়েছে আর সেসব কারণও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করছি। যারা মনে করেন যে, বর্তমান অবস্থাটা অতি স্বাভাবিক কেননা আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে খোদাদ্রোহী শক্তি ও শয়তানেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যদিও নবী রাসূলদের যুগে এসব শক্তি ছিল, কিন্তু তারা বর্তমানে যে শক্তির দাপট দেখাচ্ছে তা আগের চেয়ে অনেক বেশী। আর এর ফলে সত্যপন্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, একবার সত্যকে একদিন বলা হয়েছিল, "বাতিলের আক্রমনের সময় কোথায় ছিলেন আপনি? সত্য বলেছিলো আমি বাতিলের মূলোৎপাটন করছিলাম। এটি বাস্তব সত্য যে, বাতিল তখনই জয়যুক্ত হয় যখন সত্যপন্থীরা বিভিন্ন গাফিলতিতে নিমজ্জিত থাকে। তাদের দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং সংগ্রামের ময়দান থেকে দূরে থাকে।

এ মতের প্রবক্তারা বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। যদি তারা মনে করেন যে, অবস্থা পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। তাহলে আমাদের মতে তারা ময়দান শত্রুর জন্য ছেড়ে দিচ্ছেন। তাদের মধ্য থেকে উৎসাহ উদ্দীপনা বিদায় নিতে বাধ্য। তারাতো সদাসর্বদা নিরাশাতেই থাকবেন। আর এ কারণে তাদের দ্বারা বা এ মতের প্রবক্তারা কোনদিন ইসলামের বিজয় নিয়ে আসতে পারবে না। কারণ বিজয়ী হতে হলে অব্যাহত সংগ্রাম করতে হবে। জানপ্রাণ দিয়ে বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে তাহলেই শান্তি আসবে। এ অর্থে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে তারা আল্লাহর পথে মরবে এবং মারবে"। (সূরা তওবা-১১১)

কেউ কেউ মনে করেন যে, আমাদের বর্তমান অবস্থা পরিস্থিতির স্বীকার। কারণ বর্তমান দিনকাল ভাল নয়। আমি এ মতের সাথেও ঐক্যমত পোষণ করতে পারছি না। কারণ সময় পরিস্থিতি এসবই আমাদের কর্মকাণ্ড দূরদর্শিতা পরাজয় ব্যর্থতার উপর নির্ভরশীল। যদি আমাদের লক্ষ্য স্থির থাকে, পথ চলা অব্যাহত থাকে, তাহলে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ বা কোরবাণী দিলে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে পারি। রাসূল (সা.) বলেছেনঃ আল্লাহর পণ্য অত্যন্ত দামী আর আল্লাহর পণ্য হচ্ছে জান্নাত। যারা বাতিলের তুফান দেখে মনে করেন যে ইসলামী আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে, তাদের এ ধারণা ভুল। বরং এক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। দাওয়াতকে সর্বত্র পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছি। এবং বাতিল যেভাবে দ্রুত তার কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত করতে পেরেছে, আমরা তা পারিনি।

তাহলে উপায় কি?
উপায় হচ্ছে আমাদের নিজেদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের নেতা ও কর্মীদের মাঝে চিন্তার পার্থক্য রয়েছে। আমাদের মধ্যে আনুগত্যের অভাব রয়েছে। কর্মী ও কর্মী বাহিনীর মধ্যে দায়িত্বানুভূতির অভাব রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর করতে হবে। নিজেদের মধ্যে সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য ও মজবুতী গড়ে তুলতে হবে। এই সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সুচিকিৎসার পাশাপাশি সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে।

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে- মুসলিম ব্যক্তিত্ব গঠন করা হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের নিমিত্তে যদি সুনাগরিক গড়ে না উঠে তাহলে ভালো রাষ্ট্র বা দেশ কিভাবে গঠন হবে? জাহেলিয়াতের সয়লাবকে দলিত মথিত করে এমন মর্দে মুজাহিদ গঠন করতে হবে যারা দুনিয়ার কোন শক্তির কাছে, লোভ-লালসার কাছে, বর্তমানে জাহেলিয়াতের কাছে মাথা নত করবে না। ইসলামী ব্যক্তিত্বের বিশেষ গুণাবলী হলোঃ
১। জাহেলিয়াতের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম ইত্যাদি থেকে মুক্ত হতে হবে।
২। ইসলাম ও তার বিধি বিধানকে আঁকড়ে ধরতে হবে। জীবনের লক্ষ্যই হবে ইসলাম। তার চলাফেরা উঠাবসা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে ইসলাম।
৩। তার মূল উদ্দেশ্য হবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম বা জিহাদ।

তার জীবন দর্শন হবে ইসলামের জন্য সবকিছু কোরবানী দেওয়া। নিজে ঈমানী জজবা নিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় অকুতোভয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।
৪। প্রশিক্ষণের দাবীঃ প্রশিক্ষণকে ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার জন্য এর কিছু আনুষঙ্গিক দাবী বা আকাঙ্ক্ষা প্রয়োজন। একজন মুসলিম মর্দে মুজাহিদ তৈরী করতে গেলে যেসব জিনিস দরকার তাহলোঃ

প্রথমত: নির্ভুল কর্মসূচি
মুসলিম ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সঠিক কর্মসূচি প্রণয়ন করা অতীব জরুরী। সঠিক কর্মসূচি না পেলে কর্মীদের সামনে অগ্রসর করা সুকঠিন হয়ে পড়বে। হযরত উমরের সময় মুসলিম বাহিনী মিসর দখল করতে গিয়ে দীর্ঘদিন বাঁধার মুখে পড়ে। বিজয় আসতে বিলম্ব হয়। তখন হযরত উমর মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনে আসের কাছে একটি পত্র লিখেন তাতে উল্লেখ করেন, অতঃপর আমি আশ্চর্য হচ্ছি মিসর বিজয়ে বিলম্ব হওয়ায়। আপনারাতো অনেকদিন ধরে যুদ্ধ করছেন। আমার মনে হয় আপনাদের শত্রুরা যেমন দুনিয়াকে ভালবাসছে, আপনারাও সেরকম দুনিয়ার ভালবাসায় মগ্ন। আল্লাহ তা'আলা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতিকে সাহায্য দিবেন না, যতক্ষণ না তাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ হয়। হযরত উমর পারস্যে নিযুক্ত মুসলিম সেনাপতি সা'দ ইবনে মুয়াজের কাছে পত্রে লিখেন, আমি আপনাকে এবং আপনার সাথে যেসব মুসলিম সৈন্য রয়েছে তাদেরকে প্রতিটি অবস্থায়, খোদাভীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা খোদাভীতি হলো মুসলমানদের এক অব্যর্থ অস্ত্র। খোদাভীতির দ্বারা শত্রুর উপর বিজয়ী হওয়া যাবে। আপনারা সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত থাকবেন। কারণ কেউ পাপিষ্ঠ হলে আল্লাহর সাহায্য শত্রুর দিকে চলে যায়। আমরা যদি তাদের মতো পাপ করি। তাহলে তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়? তখন তো জনবল ও অস্ত্রবলে অধিকতর শক্তিশালী শত্রুরাই জয়ী হবে। আমরা অস্ত্র বলে বিজয়ী হইনা। বিজয়ী হই ঈমানের বলে।

দ্বিতীয়ত: অনুকরণীয় আদর্শ
এটি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে সফল করার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষককে শুধু জ্ঞানী গুণী ও ভাল বক্তা হলেই চলবে না। এসবের উপরে দরকার তাকে হতে হবে ইলম অনুযায়ী আলমকারী মুত্তাকী আলেম। যদি তার আমল ইলমের বিপরীত হয়, তাহলে হেদায়াত বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। তার প্রশিক্ষণের কোন প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপর পড়বে না। মালিক ইবনে দিনার বলেন যদি আলেম তার ইলম মতো আমল না করে। তাহলে তার এই ইলেম বা ওয়াজ অন্তঃ করণের উপর পড়বে না। যেমন-পাথরের ভিতরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে না।

তৃতীয়ত: নেক পরিবেশ
ইসলামী প্রশিক্ষণ সফল হওয়ার ক্ষেত্রে নেক পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। ইসলামের কথা আমরা যতই শিক্ষা দেই পাশে যদি অনৈসলামিক পরিবেশ থাকে তাহলে এই শিক্ষা শিক্ষার্থীদের উপর ভাল প্রভাব ফেলতে পারে না। শিক্ষা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নেক পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। কারণ জাহেলিয়াত তার প্রভাব বিস্তারের জন্য সর্বত্র তার থাবাকে বিস্তার করে রেখেছে। এক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষা বা প্রশিক্ষণকে যদি তার থাবা থেকে মুক্ত না রাখতে পারি, তাহলে সব প্রশিক্ষণ বিফলে যাবে। আমাদের নিম্নোক্ত কিছু বিষয়কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে যে, এসব কারণেই আমাদের অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলনের বিপর্যয় ঘটে।

এগুলো আমাদের অনেকের নিকটই সুস্পষ্ট নয়। যেমনঃ
১। আমাদের সঠিক পথের ব্যাপারটি অনেকের কাছে পরিষ্কার নয় যে, কিভাবে ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।
২। সুচিন্তিত পদক্ষেপের অভাব যে যেভাবে পারে সেভাবেই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইসলামপন্থীদের মাঝে চিন্তার অনৈক্য অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।
৩। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিশেষ অভাবের কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়া। দেখা যায় কোন ক্ষেত্রে যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা দরকার সেখানেই সিদ্ধান্ত আসে সবার পরে।
৪। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় মূল দাওয়াতের কাজকে এড়িয়ে চলা। মনে রাখতে হবে, আমরা যতই রাজনীতি করি আমাদের মূল কাজ হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলীগ।
৫। ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন বা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রণয়ন না করা।
৬। আন্দোলন পরিচালনার জন্য কার্যকর সংগঠনের বিশেষ অভাব আর যে কারণে কিছু প্রশ্ন আসে। যেমন- নেতৃত্ব কি যৌথভাবে না একক? শূরা কি বাধ্যতামূলক না বাধ্যতামূলক নয়? আমাদের কর্মকান্ড গোপনে চলবে না প্রকাশ্যে ইত্যাদি।
৭। সহিংস আক্রমন প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় উদাসীনতা।

এসব প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট হওয়া দরকার। এসবের ভিতরে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলে আমাদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ থেকে যাবে। ইসলামী আন্দোলকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সর্বশক্তি নিয়োগ করে সামনে অগ্রসর হতে হবে।

সকল মানুষকে পুনরায় আল্লাহর দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে
সব মানুষকে আল্লাহর বান্দা হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত সকল ভাইদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আমরা সকল মানুষকে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আবদ্ধ করবো। আর এ কাজটি করা ততক্ষণ পর্যন্ত করা সম্ভব হবে না যতক্ষণ না ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো যাবে। কারণ মুখের কথায় কোন নিয়ম-নীতি বা দুনিয়া চলে না। সরকারের একটি নির্দেশ সবকিছুকে ওলটপালট করে দিতে পারে। যেমন- ধরুন কোন দেশ স্বাধীন করার সময় দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ স্বাধীন করলো এদের অধিকাংশ মুসলমান কিন্তু যেহেতু তারা ইসলামকে সামনে রাখে না, তাই ইসলাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পৌঁছতে পারেনা। সেখানে আসে জনগণের শাসন বা প্রজাতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদী বিধিবিধান।

প্রকৃত সংগ্রামী দার্শনিক নয়
এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার যে, ইসলামী আন্দোলন হলো একটি ঘাঁটি বা ক্যান্টনমেন্টের মতো যেখানে মুসলিম যোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে তার সাংস্কৃতিক হউক বা সামাজিক সর্বত্র ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেখানে তারা বাতিলের মোকাবিলায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করবে। এর জন্য তাদের যা-ই উৎসর্গ করা প্রয়োজন পড়ে করবে। যদি তাদের মধ্যে যোগ্যতা এবং পূর্ণ প্রস্তুতি থাকে তাহলে অবশ্যই বাতিলকে পরাভূত করতে পারবে। সমাজে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে তা দার্শনিকের মতো বসে বসে দেখবেনা বা বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত থাকবে না। বরং ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মর্দে মুজাহিদের মতো এগিয়ে আসবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00