📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ কিভাবে ঘটবে

📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ কিভাবে ঘটবে


একজন দা'য়ীকে তার চিন্তার জগতকে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে- জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক, সমাজনীতি, রাজনীতি দিয়ে জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধি করতে হবে, যেন যে কোন সমস্যা বা প্রশ্নের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিতে পারে। একজন দা'য়ীকে কুরআন-হাদীস, নবীর জীবন আদর্শ ও তাঁর জীবন চরিত ভালো ভাবে জানতে হবে, যেন যে কোন ঘটনা প্রবাহে রাসূলের জীবন চরিত থেকে এর সমাধান পেতে পারে।

ইসলামের দা'য়ীরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে
আমি বলছি না যে, দা'য়ীরা তাদের শত্রুদের কোপানলে তাদের ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ। এ বিপদতো কিছুই না, যদিও এর ক্ষতি ও কাঠিন্য অনেক বেশী। দা'য়ীর জন্য সবচেয়ে বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হলো তার নফস বা কু-প্রবৃত্তি। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন : "তোমরা গুনাহের ব্যাপারে শত্রু সৈন্যর চেয়ে বেশী সতর্ক হও, কেননা শত্রু সৈন্য তোমাদের কাছে কোন ধর্তব্যের বিষয়ই নয়। মুসলমানেরা তো শত্রু সৈন্যদের গুনাহের কারণেই বিজয় লাভ করে থাকে। তোমরা জেনে রাখো তোমাদের চলার পথে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্ক পাহারা রয়েছে। সাবধান! তোমরা আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী কোন কিছু করবে না। কেননা, তোমরা আল্লাহর পথেই চলেছ।"

আমি এখানে একই কথা বলতে চাই যে, বর্তমান যুগে দা'য়ীদেরকে বিভিন্নভাবে ফেতনার দিকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। তাদেরকে একবিংশ শতাব্দীর জাহেলিয়াতের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়ার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। এরা সদা-সর্বদা কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করছে, তাদের অন্তঃকরণ মরে গেছে। আল্লাহ বলেন : "এদের উদাহরণ হলো কুকুরের মত, ওকে তাড়া দিলে ঘেউ ঘেউ করে, আর ছেড়ে দিলেও ঘেউ ঘেউ করে। সেই লোকদের উদাহরণ যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।"

পাপ-পঙ্কিলতা লোভ-লালসার সয়লাব থেকে একজন দা'য়ীকে মজবুত ঈমান ও বলিষ্ঠ নৈতিক চরিত্র দিয়ে নিজেকে হেফাযত করতে হবে।

প্রতিরোধের স্থানগুলো সংরক্ষণ করুন
আজকে দা'য়ীদেরকে সবচেয়ে সর্তক থাকতে হবে, বাস্তব অবস্থার দিকে, সর্ব ক্ষেত্রে ইনসাফ ভিত্তিক ইসলামী সমাধান গ্রহণ করতে হবে। ধীরে চলা বা না দেখার নীতি পরিহার করতে হবে। সদা-সর্বদা দায়িত্ব অনুভূতির সাথে কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। শত্রু প্রতিরোধের জন্য সদা-তৎপর থাকতে হবে। তাদের কোন কাজই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া যাবে না।

ইসলামী ব্যক্তিত্ব
ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এর আগে অন্য কোন কর্মসূচী নেয়া যাবে না। ইসলামী ব্যক্তিত্বই হলো ইসলামী আন্দোলনের মূল ভিত্তি। ইসলামী আন্দোলন যেমন মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দিতে পারে না দা'য়ী ও কর্মী ব্যতিরেকে, তেমনি এসব দা'য়ীরা তাদের এ বিপদজনক দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যতক্ষণ না, তাদের মাঝে ইসলামী ব্যক্তিত্ব-চরিত্র পূর্ণতা লাভ করবে। আসুন আমরা ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদান ও উপকরণ নিয়ে আলোচনা করি-

১. ইসলামী জ্ঞান
ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনে একটি উপাদান হলো ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী হওয়া। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে সেই দা'য়ীর ইসলামী চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন তার কর্ম-কান্ডে ঘটতে পারে না। ইসলামী জ্ঞান হলো মূল, যার দ্বারা সে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে, প্রতিটি কর্ম-কান্ডের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ফয়সালা গ্রহণ করতে পারে। ইসলামী জ্ঞান আহরণের জন্য কতিপয় পদক্ষেপ নেয়া দরকারঃ
প্রথমত: কুরআন হাদীস সম্পর্কে সঠিক বুঝ বা জ্ঞান থাকতে হবে। দা'য়ীর অন্তকরণে কুরআন হাদীস সঠিকভাবেই ধারণ হবে।
দ্বিতীয়ত: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল থাকতে হবে। দুনিয়া ও পরকালের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে হবে।
তৃতীয়ত: ইসলামের সর্ববিষয়ে ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়, কারণ মানুষের জ্ঞান স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যতই একে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও তথ্য দিয়ে ভরপুর করা হবে। আর যদি জ্ঞান ভান্ডারকে এসব সংস্কৃতি গবেষণা থেকে লেখা- পড়া থেকে দূরে রাখা হয় তাহলে কখনই প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যাবে না।

ড. সাবরি আল কাব্বানী তার লেখা "আপনার ডাক্তার আপনার সাথেই" নামক গ্রন্থে বলেন: মানুষের মস্তিষ্ক বিভিন্ন রকমের জ্ঞান-গবেষনা পুঞ্জিভূত করতে এবং গ্রহণ করতে সক্ষম। যদি পরিকল্পিতভাবে ব্রেনের মধ্যে বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা, কলা- কৌশল এবং তথ্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তাহলে অবশ্যই মস্তিস্ক এগুলোকে গ্রহণ করে নিজের চিন্তার জগতে পরিপক্কতা আনতে সক্ষম। ইসলামী জ্ঞান তখনই পরিপূর্ণতা লাভ করবে, যখন ব্যক্তি দুনিয়ার অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করবে।

২. ইসলামী মন-মানসিকতা
মানুষের মন-মানসিকতা যদি ভাল না হয়, তাহলে তার কাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একজন দা'য়ীকে স্বচ্ছ মন-মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। তার মাঝে কোন রকমের বৈপরিত্য বা মুনাফেকী যেন স্থান না পায়। তার চিন্তা-চেতনা, কথা-বার্তা ও কাজ-কর্মের মধ্যে কোন ফারাক বা বৈপরিত্য দেখা না যায়। ইসলামে এ বিষয়টিকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদানগণ! তোমরা কেন সে কথা বল, যা তোমরা নিজেরা করনা। এটি আল্লাহর নিকট চরম গর্হিত কাজ।" (সূরা সফ: ২)

বাড়া-বাড়ি বা শৈথিল্য কোনটিই কাম্য নয়
ইসলাম প্রথম দিন থেকেই মানুষের স্বভাবজাত ও মন-মানসিকতার সাথে সামঞ্জস্যশীল বিধান উপস্থাপন করেছে। কোন একটি বিষয়কে নিয়ে স্বভাবজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধে বাড়া-বাড়ি করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। যেমন, কেউ হয়তো তার শরীরের ব্যাপারে যথাযথ খেয়াল যত্ন করে না। এরা ইসলামী জীবন চরিতের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হতে বাধ্য। বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে আসের বাড়ী দেখতে গেলেন, তাঁর স্ত্রীকে দেখলেন যে, সে বেশ- ভূষায় অগোছালো। তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন আছো? মহিলা বললেন, কেমন থাকবো? আব্দুল্লাহ ইবনে আমরতো দুনিয়া ত্যাগী হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, কিভাবে? মহিলা বললেন, সে ঘুমায় না, সারাদিন রোজা রাখে, গোশত খায়না, পরিবারের হক আদায় করে না। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায়? তিনি বললেন, বাহিরে গেছে এখনি আসতে পারেন। তিনি বললেন, সে আসলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবে। রাসূল চলে আসার সময় আব্দুল্লাহ এসে হাজির। রাসূল বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর! আমি একি শুনলাম, তুমি নাকি ঘুমাও না? সে বললো, আমি এর দ্বারা কিয়ামতের ভীতিকর অবস্থা থেকে নিরাপত্তা চাই। তিনি তাকে বললেন, তুমি নাকি সারাদিন রোজা রাখো? সে উত্তরে বললো, আমি এর দ্বারা জান্নাতে উত্তম প্রতিদান চাই। তিনি বললেন, আমি শুনলাম তুমি নাকি পরিবারের হক আদায় কর না? সে বললো, আমি এর দ্বারা পরকালে এদের চেয়ে উত্তম পরিবার কামনা করছি। তখন রাসূল (সা.) বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর তোমার জন্য রাসূলুল্লাহর জীবনে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আল্লাহর রাসূল নফল রোজাও রাখেন আবার অনেক সময়ে নফল রোজা রাখেন না, তিনি গোশত-মাংস খান, পরিবার পরিজনের হক আদায় করেন। হে আব্দুল্লাহ! তোমার উপরে আল্লাহর হক রয়েছে। তোমার শরীরের উপরে তোমার হক রয়েছে। তোমার উপরে তোমার পরিবারের হক রয়েছে। সুতরাং একজন দা'য়ীকে সর্বক্ষেত্রে সুষম জীবন যাপনে প্রত্যয়ী হতে হবে। কোন এক বিষয়ে বাড়া-বাড়ি আবার অন্য বিষয়ে গাফলতি করা যাবে না। সদা-সর্বদা আত্ম সমালোচনা করতে হবে। তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণীর উপরে আমল করতে হবে- "প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে থাকে আর বেকুব ও নির্বোধ সেই লোক যে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে আর আল্লাহর রহমতের আশা রাখে।"

হযরত উমর (রা.) এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: হিসাব দেয়ার পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব কর। ওজন দেয়ার পূর্বেই নিজেদের নেকী-গুনাহর ওজন কর আর কিয়ামতের মহা সংকটের দিনের ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণ কর। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে, দুনিয়ার হালাল উপকরণ খানা-পিনা, পোশাক-আশাক ইত্যাদির ব্যাপারে কার্পণ্য করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন: বলুন! কে তোমাদের জন্য আল্লাহর সৌন্দর্যমন্ডিত জিনিসকে হারাম করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্য পবিত্রতম রিযিক হিসাবে দান করেছেন।" (সূরা আ'রাফঃ ৩২) তিনি অন্যত্র বলেনঃ "বলুন! আমার প্রভু তো হারাম করেছেন শুধু প্রকাশ্য অন্যায় অশ্লীলতা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ আর অন্যায়ভাবে সীমালংঘন করাকে।" (সূরা আ'রাফ: ৩৩) একথা ঠিক যে, মানুষের কু-প্রবৃত্তি তাকে খারাপ পথে পরিচালিত করার জন্য প্ররোচিত উৎসাহিত করে। তবে এক্ষেত্রে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেন কু-প্রবৃত্তি আমাদের উপর বিজয়ী না হয়। মানুষকে তো তার সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ কারো সাধ্যাতিত ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। "আল্লাহ কোন মানুষকে তার সাধ্যের চেয়ে বেশী কোন কিছু চাপিয়ে দেন না। সে তো শুধু তার কৃত ভাল কাজের সুফল ও মন্দ কাজের কুফলই পাবে।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

শহীদ সাইয়েদ কুতুব তার প্রখ্যাত তাফসীর ফী যিলালিল কুরআনে বলেন, এই হচ্ছে সেই আকীদা যা মানুষ জানে কোন জীব-জন্তু, ফেরেস্তা বা শয়তান নয়। জানে এর মধ্যে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে আর কোথায় শক্তি। মানুষের ভিতরে যে জ্ঞান প্রজ্ঞা এবং চিন্তা-চেতনা রয়েছে তার দ্বারা সে সুষম জীবন-যাপন করতে পারে আর মূলতঃ এর উপরেই মানুষের হিসাব-নিকাশ হবে। সাধ্যর বাইরে কারো হিসাব বা বিচার ইসলাম করবে না। কারোই সাধ্যের বাইরে কোন কিছু মহান আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবে না।

নবী করীম (সা.) সবধরনের বাড়াবাড়ি বা অবহেলা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) একদিন আয়েশার ঘরে প্রবেশ করলেন, সেখানে একজন মহিলা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন উনি কে? (আয়েশা রা.) বলেন, তিনি অমুক মহিলা যার বেশী বেশী নামায পড়ার কথা বলা হয়ে থাকে। তিনি বললেন, থামো! তোমরা সাধ্যাতীত কিছু করো না। আল্লাহর শপথ! তোমরাই শেষে বিরক্ত হয়ে পড়বে তখন আল্লাহ তাআলাও বিরক্ত হবেন। অর্থাৎ বেশী বেশী আমল করতে করতে তোমরা যখন অপারগ হয়ে পড়বে তখন আল্লাহও বিরক্ত হবেন, কেন তোমরা অহেতুক বাড়াবাড়ি করতে গেছো।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন নিশ্চয় দীন হল সহজ। যে ব্যক্তি দীনের ব্যাপারে কঠোরতা করবে সে পরাজিত হবে সুতরাং সহজভাবে গ্রহণ কর, নিকটতর হও এবং লোকজনকে দীনের ব্যাপারে সুসংবাদ দাও সকাল বিকাল ও দুপুরে দীনের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান কর। ইমাম নববী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা হয়েছে যার অর্থ হল, তোমরা মহান আল্লহর অনুগত্যের ব্যাপারে তোমাদের কর্মক্ষম অবস্থায় আমল কর যখন তোমাদের মন মুক্ত থাকবে যেন ইবাদতের স্বাদ বা মজা অনুভব কর! তোমরা এমন ভাবে ইবাদত করিওনা যে ক্লান্তও বিমর্ষ হয়ে পড়। যেমন বুদ্ধিমান মুসাফির তার বাহন নিয়ে এমন সময় চলে যখন কোন কোলাহল থাকেনা, প্রকৃতি থাকে শান্ত। আর কোলাহল ও প্রচন্ড তাপের সময় তার বাহনকে আরাম দিয়ে থাকে।

এজন্যে ইবাদত সহ সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি এবং অবহেলা পরিত্যাগ করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

একনিষ্ঠতার মর্ম
দায়ীর ইসলামী স্বভাব ও বৈশিষ্ট ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারবেনা যতক্ষণ না একমাত্র আল্লাহর জন্য নিজেকে সোপর্দ করবে, তাকে সবধরনের শৃংখলা থেকে মুক্ত হতে হবে, নিজেকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুর আনুগত্য থেকে মুক্ত রাখবে। যদি সেটা ধনসম্পদ হয় তাহলে তা থেকে পরহেজ করবে আর যদি তা প্রভাব প্রতিপত্তি হয় তাহলে তা থেকে মুক্ত হবে। নিজের মনকে ধনী মনে করবে টাকাপয়সাকে নয়। তাকওয়াকে সম্মান মর্যাদা মনে করবে আল্লাহর সমীপে, প্রভাব প্রতিপত্তিকে নয়।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি

📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি


উত্তম পদ্ধতি দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি
কতিপয় কর্মকারণ রয়েছে যা দায়ীর দাওয়াতকে সফল হতে এবং কাংখিত ফললাভে অনেকাংশে সহায়তা করে তাহল উত্তম পদ্ধতি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কার্যকরণ যার মাধ্যমে দায়ী অল্পসময়ে, স্বল্প খরচে দাওয়াতের ও তাবলীগের উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম তা বক্তব্য, আলোচনা, লিখিত রচনা যাই হোক উত্তম পদ্ধতিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। দায়ীকে হতে হবে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মত যিনি বুঝেন চিকিৎসা কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কিভাবে শুরু করতে হবে অতঃপর তিনি প্রয়োজনীয় উপাদান না পাওয়ার পূর্বে শুরু করবেন না যেন তার কাজকর্ম ব্যর্থ না হয়ে যায়।

সমাজে আজ বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন বিদ্যমান এমন বক্তব্য রাখবেন যেন লোকজন আগ্রহের সাথে শুনেন এমন ভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা উপলব্ধি করতে পারেন তাদের অন্তঃকরনকে নাড়া দেয়, তাদের রোগের উপর প্রতিক্রিয়া ঘটায় তাদের সমস্যার কথা উঠে আসে। স্থান কাল পাত্র ভেদে আলোচনা উপস্থাপন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন আমাকে নির্দেশ করা হয়েছে যেন আমি লোকজনকে তাদের জ্ঞান সম্মান মোতাবেক বক্তব্য রাখি। বর্তমান সময়ে ইসলামের পক্ষে কাজ করার জন্য এমন দায়ীর বিশেষ প্রয়োজন যারা সুন্দর ভাবে চিন্তাধারা উপস্থাপন করবেন, এমন পদ্ধতিতে যাতে ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্টত্ব ফুঠে উঠে এবং লোকজন তা শুনতে, বুঝতে ও জানতে আগ্রহী হয়। আজ অনেকেই ইসলামের কথা বলে ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে তারা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশী করেছেন। এজন্য দাওয়াতের কাজ উত্তমভাবে উপস্থাপন উত্তম পদ্ধতিতে দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে।

কাঠিন্য ও কোমলতার মাঝে
মানুষের নফসে প্রকৃতিগত ভাবেই ভাল জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা রয়েছে? কেউ তার সাথে ভাল আচরণ করলে সে তাকে ভালবাসে আবার কেউ তার সাথে কর্কশ ও রুঢ় আচরণ করলে তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হয় তার ব্যাপারে ক্রোধ ও ঘৃনা জন্মে। এজন্য নরম ও মোসাহেবী করা বা তেল মালিশী করা নয় যা মুনাফিকীর নামান্তর। দায়ীকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নম্র ভদ্র ভাষা ব্যবহার করতে হবে বিশেষভাবে যদি দাওয়াত দেয়া হয় মুসলমানদেরকে। এজন্য রুঢ় কথা ও কর্কশ ভাষা কিংবা আক্রমনাত্মক কথা দাওয়াতের ক্ষেত্রে মোটেই কাম্য নয়। লক্ষ করুন মুসা ও হারুন (আ.) এর প্রতি মহান প্রভুর দাওয়াতের ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা। তৎকালীন স্বৈরাচারী ফেরাউনের নিকট দাওয়াতের সময় তাদের নরম ভাষা ও ভদ্র আচরণ করার নির্দেশ দেন। "তোমরা দুজনে যাও ফেরাউনের নিকট সে চরম অবাধ্য আচরণ করেছে। অতপর তাকে নরম কথা বলো হয়তোবা সে নসিহত গ্রহণ করবে কিংবা আল্লাহকে ভয় করবে।" (সূরা ত্বহা.....)

নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে এই নীতি গ্রহণ করার জন্য কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কঠোরতা পরিহার করে নম্রতা গ্রহণ এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের পন্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "আপনার রবের পথে আহবান করুন হিকমত ও উত্তম বাক্যের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়। নিশ্চয় আপনার রব জানেন কে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তিনি হেদায়েত প্রাপ্তদের সর্ম্পকে অধিক অবগত"। (সূরা নাহলঃ১২৫) ইবনে কাসীর এর ব্যাখ্যায় বলেন, যদি বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তাহলে হাসি মুখে যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে হবে নম্র ভদ্র ভাষায়। সূরা আলে ইমরানে নম্রতার উপকারিতা ও সহযোগী সমর্থক অর্জনে এর ভূমিকা এবং দাওয়াতের গতি সঞ্চারনে এর কার্যকারিতা কথা উল্লেখ করে নবী করীম (সা.) এর প্রতি ওহী নাজিল হয়।

"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুঢ় ও কঠিন হতেন তাহলে তারা আপনার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত”। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৯) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুণাবলীর উল্লেখ পেয়েছি। তিনি কঠোর নন। রুঢ় আচরণকারী নহেন। খামাখা হাটবাজারে ঘুরে বেড়াবেন না এবং খারাপের প্রতিদান খারাপ দিয়ে দিবেন না। বরং ক্ষমা করবেন এবং ভাল ব্যবহার করবেন। নবীর জীবন চরিত্রে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যাতে দেখা যায় তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে নম্র-ভদ্রভাবে এমন সুন্দরভাবে দাওয়াত উপস্থাপন করেছেন যা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করেছে।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এক যুবক এসে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি আমাকে যিনা (ব্যভিচার) করার অনুমতি দিবেন? একথা শুনে লোকজন চিৎকার করে উঠে। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি আমার নিকটে এসো। যুবকটি তার নিকটে এসে সামনে বসে পড়ল। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি কি এ কাজটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন মানুষেরাও তাদের মায়ের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল, না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, লোকজনও তাদের মেয়েদের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পছন্দ কর? ইবনে আউফ (রা.) বলেন, তিনি ফুফু ও খালার কথাও যোগ করেন। সে প্রত্যেক বারই জবাব দেয়: না, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। অতপর নবী করীম (সা.) তাঁর হাত যুবকটির বুকের ওপর রেখে বলেন হে আল্লাহ! আপনি এর বক্ষকে পবিত্র করুন। এর লজ্জাস্থানকে হেফাযাত করুন। এরপর থেকে যুবকটির নিকট এর চেয়ে অর্থাৎ যিনার চেয়ে অন্য আর কিছু এত ঘৃনিত ছিলনা। দায়ীর দাওয়াতের পদ্ধতি সদাসর্বদা উত্তম, সুন্দর ও যুগোপযুগী হতে হবে যেন বৈধ উপকরণের মাধ্যমে অতি সহজভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করা যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হিকমত হল মুমিনের জন্য হারানো মানিকের ন্যায় সে যেখানেই তা পাবে সেখান থেকেই তা আহরণ করবে। তিনি আরো বলেন, তোমরা হিকমত গ্রহণ কর তা যেখান থেকেই আসুক না কেন? আমরা কি চাই?

উত্তম পদ্ধতি তখনই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে যখন দায়ীর গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি ভংগি বিরাজ করে সে কি চাই তার উপর। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে সার্বিক ও কাংক্ষিত ফল লাভ সম্ভব হবে। কি চাই? এটা নির্ধারিত থাকলে সময় প্রচেষ্টা ও উপকরণ ঠিক মত কাজে লাগানো সম্ভব। নতুবা প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হবে। এ বিষয়টির প্রতি আল্লাহ ইঙ্গিত করে বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে"। (সূরা আহযাবঃ৭০-৭১) দায়ীকে অবশ্যই সর্তক দৃষ্টি রাখতে হবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে তা দাওয়াতের ক্ষেত্রেই হোক বা রাজনীতির ক্ষেত্রে কিংবা ছাত্র আন্দোলন অথবা শ্রমিক সংগঠনের ক্ষেত্রে যে সে এক্ষেত্রে কি অর্জন করতে চায়? হাসান বসরী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কাজ করে কোন ধরনের জ্ঞান ছাড়াই সে হল রাস্তা না চিনেই চলা পথিকের মতন। আর উদ্দেশ্যহীন ভাবে কর্মসম্পদনকারী ব্যক্তি ভালর চেয়ে ক্ষতিই করে বেশী।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 ইসলামের দায়ী ও তার গ্রহণযোগ্যতা

📄 ইসলামের দায়ী ও তার গ্রহণযোগ্যতা


ইসলামী কর্মকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রস্তুতি ও গ্রহণযোগতার ক্ষেত্রে তারতম্য রয়েছে যা লক্ষনীয়। এই পার্থক্য ও তারতম্য সাধারণ ও বিশেষ সবশ্রেণীর মধ্যে রয়েছে। এটি আবার প্রভাব ফেলে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং তাদের সামাজিক কর্মকান্ডে এবং তা সফল হবার ক্ষেত্রে। আমরা এই পার্থক্য ও তার ধরণকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।

প্রথম প্রকার: এই মানের ভাইদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে, যেমন জ্ঞান, মজবুত ঈমান, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং নিষ্ঠা খুব ভালোভাবেই রয়েছে। তাদের গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। এধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন ভাইয়েরাই দাওয়াতের চালিকা শক্তি। যে কোন আন্দোলনে এ মানের জনশক্তির সমাবেশ ঘটলে তার স্থিতি, সাফল্য কাংখিত মানের হবে নিঃসন্দেহে।

দ্বিতীয় প্রকার: এই ধরনের ভাইদের মাঝে কিছু প্রস্তুতি যেমন আছে যোগ্যতাও আছে আবার দুর্বলতা এবং পিছুটানও রয়েছে। এদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা যেমন আছে তেমনি আবার এদের ব্যাপারে কিছু কথাও রয়েছে। এধরনের লোকদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠিয়ে আন্দোলনমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি এদের দুর্বলতাকে কাটাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।

তৃতীয় প্রকার: এদের না আছে গ্রহণযোগ্যতা, না আছে কোন প্রস্তুতি, এরা চিন্তার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতায় রয়েছে। এরা আন্দোলনকে তেমন কিছু দিতে পারবে না শুধু মাত্র সমর্থন ছাড়া। এরা নিজেদের গন্ডির মধ্যে থেকে বের হতে চায় না। এদেরকে উন্নত করার চিন্তা বা প্রচেষ্টা করে খুব একটা লাভ হবে না।

এই পার্থক্যের কার্যকারণ: শ্রেণী বিন্যাসের অনেক কারণ রয়েছে যা গণনা করা সম্ভব নয়। কিছু কারণ হলো স্বভাবগত আবার কিছু হলো বংশগত আর কিছু হলো উপার্জনগত। স্বভাবগত এবং বংশগত বিষয়টি বাদ দিয়ে যদি উপার্জনগত দিকে নজর দেই তাহলে দেখতে পাই যে,

১ম কারণ
আমাদের ভাইদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান খুবই সীমিত। তার কাছে ইসলামের বুঝ বা সমঝ পরিস্কার নয়। এক্ষেত্রে ইসলামের সঠিক ধারণা দিতে হবে। নবী করীম (সা.) বলেন- আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে তিনি দ্বীনের সঠিক সমঝ দান করেন। (মুসলিম)

২য় কারণ
বাস্তব জীবনের সাথে ইসলামের সম্পর্কের ওপর, এ কারণ নির্ভরশীল। হয়তো সে ইসলামকে বুঝে কিন্তু বাস্তবে কর্মে পরিণত করে না। ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকে, বাস্তব জীবনে তার উল্টোটি করে। আর এই কারণে তার দ্বারা কল্যাণমূলক কাজ হওয়া খুবই কষ্টকর। সে সর্বদা দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও ভয়ভীতির মধ্যে থাকে। যা থেকে সে বের হয়ে আসতে পারে না। এ ধরনের লোকদেরকে কুরআন শরীফে তিরস্কার করা হয়েছে। বলা হয়েছে "তোমরা কি মানুষকে নেকীর দিকে আহ্বান কর আর নিজেদেরকে সে ব্যাপারে ভুলে যাও অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করছো। আর তোমরা এ ব্যাপারে অজ্ঞ”। (সূরা বাকারা-৪৪)

অন্যত্র বলা হয়েছে, "হে ঈমানদারগণ তোমরা কেন তা বলো যা তোমরা নিজে কর না। এটি আল্লাহর নিকটে অত্যন্ত গর্হিত কাজ যে তোমরা যা বলবে তা নিজেরা করবে না"। (সূরা সফ-২)

৩য় কারণ
এ কারণটি আল্লাহর সাথে এবং দা'য়ীর সাথে সম্পর্কিত। দায়ীর ব্যক্তিত্ব এবং তার পদক্ষেপ ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হবে না, যতক্ষণ না সে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে সোপর্দ করে। আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য সবার সাথে রুহানী সম্পর্ক ছিন্ন করে। এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সচেষ্ট হয়।

৪র্থ কারণ
আমাদের দায়ী ভাইকে নিজের লোভ-লালসা আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া পাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার উপর নির্ভর করতে হবে। সে যেন শয়তানের প্ররোচনা থেকে সদাসর্বদা নিজেকে সুরক্ষিত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু" সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গণ্য কর। তাকে নবী করীম (সা.) এর বাণীও স্মরণ করতে হবে যে 'নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলাচল করে"।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ

📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ


বাস্তবতা হলো আমরা ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে আমাদের সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদক্ষেপ বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য দলগত সংগঠনের থেকে অবশ্যই আলাদা বৈশিষ্ট্যে ধারণ করতে হবে।

দলগত ও মানবিক দিক
আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই গতানুগতিক আন্দোলনের কলুষতায় কলুষিত। অনেক ক্ষেত্রেই সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলামী কর্মকান্ডকে ব্যাপকতার ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে বা পরিচালিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইসলাম কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী নয়। ইসলাম সবার জন্য এবং সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। সে মুসলিম অমুসলিম কালো সাদা কারোর মধ্যে পার্থক্য করে না। কল্যাণ ও ভালোর জন্য সবাইকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে কিন্তু গতানুগতিক দলগুলি তাদের সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টি থেকে বের হয়ে আসতে পারে না।

মুসলিম দায়ীকে সবার জন্য কাজ করতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের সুমহান আদর্শ সবার নিকট পৌঁছে দিবে। সে ক্ষেত্রে শুধু লক্ষ্য রাখবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। যেমনটি নবী করীম (সা.) বলেছেনঃ "হে আল্লাহ আপনি যদি আমার উপর ক্রোধান্বিত না হন। তাহলে আমি কোন কিছুতেই পরওয়ানা করি না"। এটি তখন বলেছিলেন যখন কাফেররা তাদের উপর বিভিন্নভাবে চড়াও হচ্ছিল। আর একথাটি মহান আল্লাহ তার বাণীতে এভাবে চিত্রিত করেছেন। "আর আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসাবে উপস্থাপন করেছি। যেন তোমরা মানুষের উপর সাক্ষ্য হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত কর। আর রাসূল তোমাদের উপরে সাক্ষী হন"।

ইসলামী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ইসলামের দু'টি বিষয়ের বৈশিষ্ট্য
১. দায়ীর দৃষ্টি ও উদ্দেশ্য লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যার কারণে সে কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয় না। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি রাসূলের নিকটে এসে বললেন হে আল্লাহর রসূল আমার অবস্থান হলো, আমি একদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। আবার এর দ্বারা আমি সমাজে আমার অবস্থান তৈরী করে নিতে চাই। রাসূল তার কোন জওয়াব দিলেন না। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ নাযিল করলেন "সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে সে যেন নেক আমল এবং তার রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহাফ: ১১০)
২. বাস্তবায়নের মাধ্যম সঠিক ও বৈধ হওয়া। যা ইসলামে দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম এমন কোন কর্ম মাধ্যমকে সমর্থন করে না, যা অবৈধ। কিন্তু অন্যান্য সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দলীয় ফোরামগুলো উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্য যে কোন অনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরওয়ানা করে না, তাদের সূত্র হলো উদ্দেশ্য হাসিলে সবকিছুই বৈধ। কিন্তু ইসলাম এটিকে সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম মানবতার ধর্ম নৈতিকতার ধর্ম। এখানে অমানবিক অনৈতিক কোন কিছুর স্থান নেই।

আকীদাগত ও ব্যক্তিগত দিক
ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আকীদার বিষয়টি বিশেষ প্রণীধানযোগ্য ব্যক্তির চাইতে আকীদাহ বড়। এ জন্য ব্যক্তিত্ত্বের জীবাণু যেন ইসলামী আন্দোলনে আক্রান্ত না হয়। এ জন্য ইসলাম তার অনুসারীদের মাঝে আকীদার শক্ত ভিত্তি রচনা করেছে। যে কোন কাজে আকীদার বিষয়টিকে ব্যক্তির উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা ও ভাই বোনদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করিও না যদি তারা ঈমানের উপরে কুফরীকে প্রাধান্য দেয়। যে তাদেরকে তোমাদের মধ্যে থেকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে, তারাই হবে জালেম।” (সূরা তওবা: ২৩)

এ জন্য ইসলামে আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। লক্ষ্য করুন রাসূলের স্ত্রী উম্মে হাবীবা তিনি তার মুশরিক পিতাকে রাসূলের বিছানায় বসতে দেননি। তিনি তাকে ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, এটা আল্লাহর রসূলের বিছানা আর আপনি মুশরিক অপবিত্র, আপনি আমার পিতা হলেও আপনাকে এখানে বসতে দিতে পারি না রসূলের অনুমতি ছাড়া। আবার দেখুন মুসআব ইবনে উমাইর তিনি তার অমুসলিম মাকে বললেন, যিনি তার ছেলে মোহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ না করলে না খেয়ে মারা যাবেন বলে কসম খেয়েছে। তাকে বললেন, আল্লাহর শপথ হে আম্মা আপনার যদি একশতটা জীবন থাকত আর আপনি একটি একটি করে জীবন হারাতে থাকতেন। তবুও আমি মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করবো না। এর ফলে তার মা হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি, এই আকীদাগত দৃষ্টিভঙ্গি তার অনুসারীদের দাওয়াত ও কর্মক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলে। এখানে তারা আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না। বদরের যুদ্ধে পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে, লড়াই করেছে এই আকীদাগত বিশ্বাসের কারণে। আবু বকর ছিলেন মুসলমানদের আর তার ছেলে আব্দুর রহমান মুশরিকদের দলে। উদবা ইবনে রাবিয়া সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদরে প্রথম মল্ল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আর তার ছেলে ছিল আবু হুযাইফা একজন মদ্দে মুজাহিদ। যখন তার পিতার লাশকে বদরে একটি গর্তে ফেলা হচ্ছিল। তখন তার দু'চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। রাসূল বললেন, আবু হুযাইফা তোমার চোখে পানি কেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি আমার পিতার পরিণতির জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আমার পিতার মতো একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের বিপক্ষে ব্যবহার করার ফলে কি করুণ পরিণতির সম্মুখীন হল। অথচ সে তার জ্ঞান বুদ্ধিকে ইসলামের পথে ব্যয় করতে পারতো, কল্যাণের পথে নিজেকে ধন্য করতে পারতো।

ব্যক্তি স্বার্থ ও সমতা
ইসলামের আকীদাগত বিশ্বাস হল, সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করবে। প্রকাশ্যে ও গোপনে, সুখে ও দুঃখে, সর্বাবস্থায় একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরওয়াস্তে কাজ করবে। সে আজকে ইবাদত কালকে গাফিলত, আজকে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল কালকে সমাজের জন্য কাজ, এই দর্শনে বিশ্বাস করে না। মহান আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল আপনি বলে দিন। হে কাফেরগণ তোমরা যার ইবাদত কর। আমি তার ইবাদত করি না। আর আমি যার ইবাদত করি তোমরা তার ইবাদত করতে প্রস্তুত নও। আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন। আর তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম"। একবার উতবা ইবনে রাবিয়া রাসূলের নিকটে এসে টাকা-পয়সা, নারী, রাজত্ব ইত্যাদির লোভ দেখায় যেন রাসূল তার দ্বীনের দাওয়াত থেকে ফিরে আসেন। রাসূল দৃঢ়তার সাথে জওয়াব দেন, "আমি তো তোমাদের টাকা পয়সা সহায় সম্পদ মান সম্মানের জন্য আসি নাই। আল্লাহ আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমাকে দিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি তোমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেই। এবং জাহান্নাম থেকে সতর্ক করি। যদি তোমরা এটিকে কবুল কর। তাহলে ইহকালে পরকালে মঙ্গল পাবে। আর যদি এটাকে প্রত্যাখ্যান কর। তাহলে আমি ধৈর্য ধারণ করে থাকবো। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের মাঝে ফায়সালা করেন"। ইসলামের এই আকীদা বিশ্বাসের প্রভাব মুসলমানদের উপরে সুদূরপ্রসারী তারা সবকিছুতেই বিজয়ে, বিপদে, দুঃখে, কষ্টে, আল্লাহর রহমত ও করুণা পরীক্ষা ও মুসিবত বলেই দৃঢ় বিশ্বাস করে। তাদেরকে শয়তান কোন ক্ষেত্রেই ধোঁকা বা নিরাশায় ফেলতে পারে না। “নিশ্চয়ই আপনার প্রভূ মানুষের উপরে অতীব করুণাময় কিন্তু তাদের অধিকাংশই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00