📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দাওয়াত ও দা'য়ীর মাঝে সাংগঠনিক সম্পর্ক

📄 দাওয়াত ও দা'য়ীর মাঝে সাংগঠনিক সম্পর্ক


বর্তমান বিশ্বে ইসলামী দাওয়াত ও দাওয়াতী কার্যক্রমে চিন্তা ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে, কিন্তু সাংগঠনিক দিকটাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ সাংগঠনিক দিকটি দাওয়াতের মেরুদন্ডের ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ সাংগঠনিক দিকটি আমরা আকিদার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারি। আর আকিদাই হচ্ছে প্রথম, এর পরে হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক আর এদুটো মিলিয়েই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের ও আকিদার সম্পর্ক। এদুটির মাঝে যদি ভারসাম্য না থাকে, তাহলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দা'য়ীকে তার দাওয়াতের প্রাথমিক জীবনেই এ সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। দা'য়ীরা সকলে একই বৃত্তের বন্ধনে আবদ্ধ একথা সদা-সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে।

১. আনুগত্য
যে কোন আন্দোলন বা সংগঠনের ক্ষেত্রে আনুগত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন আমরা ইসলামের মূল বুনিয়াদের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য করা এবং দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করা ঈমান-আকিদারই অংশ। এজন্য কোন দায়িত্বশীল ভাইয়ের আনুগত্য করা কিন্তু প্রকারান্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা। আর তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করার শামিল। আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের দায়িত্বশীলদের।” (সূরা নিসা-৫৯)

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়টিকে এ ভাবে ব্যক্ত করেছেন- "যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। আর যে আমীরের আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল, আর যে আমীরের বিরুদ্ধাচরণ করল, সে আমারই বিরুদ্ধাচরণ করল।"

কার জন্য আনুগত্য?
একজন মুসলমান ভাইয়ের প্রতি অবশ্যই কর্তব্য হলো, নেতার বা নেতৃত্বের আনুগত্য করা, সে যে ধরণেরই ব্যক্তি হোক না কেন, আর এটাই হচ্ছে ইসলামের আনুগত্যের ব্যাপারে বিশেষ বিধান। আনুগত্য কোন ব্যক্তি কেন্দ্রীক হবে না, আনুগত্য করতে হবে আদর্শের কারণে। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "তোমরা শোন এবং আনুগত্য কর, যদিও তোমাদের উপর একজন হাবসী ক্রীতদাসকে দায়িত্বশীল বানিয়ে দেয়া হয়, যার মাথার চুলগুলো মনে হয় কিসমিসের দানার মত (জটবাঁধা)।” লক্ষ্য করুন যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) এর কাছে তাকে সেনাপতির পদ থেকে পদচ্যুতির পত্র এসে পৌঁছে এবং তাঁর স্থলে আবু ওবাইদা ইবনে জাররা (রা.) কে সেনাপতি নিয়োগ দেয়া হয় তখন তিনি বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম! যদি আমীরুল মুমিনীন আমার উপরে কোন মহিলাকে নিয়োগ দান করতেন, তাহলে অবশ্যই আমি তার কথা শুনতাম এবং তার আনুগত্য করতাম।"

কখন বিরুদ্ধাচরণ করা অত্যাবশ্যকীয় হবে?
ইসলাম যেমন একজন মুসলমানের প্রতি নেতৃত্বের আনুগত্য করাকে ওয়াজিব করেছে, তেমনি আবার নেতার বিরুদ্ধাচরণ করাকে ক্ষেত্র বিশেষে ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত করেছে। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "একজন মুসলমানের প্রতি ওয়াজিব হলো শোনা এবং আনুগত্য করা, যা তার পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয় হোক কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজে নির্দেশ দেয়া হয়, তাহলে সে তা শুনবেও না, আনুগত্যও করবে না।"

আলী (রা.) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি কমান্ডো বাহিনী প্রেরণ করেন, সেখানে একজন আনসার সাহাবীকে দায়িত্বশীল করা হয়। তিনি কোন এক ব্যাপারে সবার উপরে রেগে যান তারপর তিনি বলেন, তোমরা এক জায়গাতে লাকড়ী জমা কর, লাকড়ী জমা করা হলে তিনি বলেন, এতে আগুন ধরিয়ে দাও। এরপর তিনি বলেন, তোমাদেরকে কি রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেননি যে, তোমরা আমার কথা শুনবে এবং আমার আদেশ পালন করবে? তখন তারা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই। তিনি বললেন, তোমরা আগুনে ঝাঁপ দাও, তখন তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকলেন। এরপরে বললেন, আমরা আগুন থেকে বাঁচার জন্যই রাসূলের কাছে পালিয়ে এসেছি, আর আপনি আমাদেরকে আগুনে ঝাঁপ দিতে নির্দেশ দিচ্ছেন? এরপর নেতার রাগ কমলে আগুন নিভিয়ে ফেলতে বললেন। অতঃপর তারা রাসূলের কাছে ফিরে এসে বিষয়টির উল্লেখ করলে তিনি বললেন, "যদি তারা আগুনে প্রবেশ করতো, তাহলে কখনই তা থেকে বের হতে পারত না। তিনি আরও বললেন, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য হলো ভালো নেকীর কাজে।"

নিজেদেরকে আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করুন
একজন মুসলমানকে অবশ্যই আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হবে। নেতৃত্বের আদেশ মান্য করতে হবে। শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে হবে, এ কাজটি বড় কঠিন। মানুষের মন আনুগত্য করতে সহজে রাজি হয় না। আত্ম-অহংকার এবং শয়তানের কু-মন্ত্রণা মানুষকে অবাধ্য, অহংকারী করে তুলে।

ইতিহাসে দেখা যায় যে, দাম্ভিক জাবালা ইবনে আইহাম আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে। ফলে সে ইসলাম পরিত্যাগ করে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে। হেদায়েত পরিত্যাগ করে গোমরাহীকে প্রাধান্য দেয়। আবু উমর সাইদানী বলেন, “যখন জাবালা ইবনে আইহাম আল গাসসানী ইসলাম গ্রহণ করে তখন সে ছিল জাফনা গোত্রের বাদশা। সে হযরত উমর (রা.) এর সাথে দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেন। সে নিজ বংশের পাঁচশত লোক নিয়ে উমরের (রা.) সাথে দেখা করার জন্য বের হয়। হযরত ওমর খুশি হয়ে লোকজনকে নির্দেশ দেন, তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসার জন্য। সে উমরের কাছে আসলে তিনি তাকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে কাছে টেনে নেন। এরপর হযরত উমর হজ্বের জন্য বের হয়ে পড়েন তার সাথে জাবালাও সঙ্গী হয়। মক্কায় কা’বা ঘর তওয়াফ করার সময় বনু ফাজারা গোত্রের একজন লোক ভুলক্রমে জাবালার চাদরে পা চাপা দেয়। এতে জাবালা ক্ষিপ্ত হয়ে ফাজারা গোত্রের লোকটির নাকে এক প্রচন্ড ঘুষি মারে। বিষয়টি উমর (রা.) এর গোচরে আনা হলে জাবালাকে তিনি বলেন, এটা কি? সে বললো, হ্যাঁ হে আমীরুল মুমিনীন সে ইচ্ছে করেই আমার চাদরে পা দিয়েছিল, আমাকে বিবস্ত্র করার লক্ষ্যে। কা'বা ঘরের চত্বর না হলে তরবারীর আঘাতে তাকে শেষ করে দিতাম। হযরত উমর (রা.) বললেন হয় আপনি লোকটিকে সন্তুষ্ট করবেন, নতুবা আপনাকে শাস্তি দেয়া হবে। জাবালা বললো, আপনি কি করবেন? ওমর বললেন, লোকটিকে আমি আদেশ দিবো সে যেন আপনার নাকের উপরে সজোরে ঘুষি মারে। জাবালা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! সে হলো একজন নগণ্য প্রজা, আর আমি হলাম বাদশা? উমর বললেন, ইসলাম আপনাকে আর তাকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এখানে একমাত্র প্রাধান্য হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। জাবালা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি তো মনে করেছিলাম ইসলামে প্রবেশ করে আমার মান-মর্যাদা জাহেলিয়াতের চেয়ে আরও বৃদ্ধি পাবে। উমর বললেন, আপনি এসব কথা বাদ দিন, না হলে আমি এখনি এর বদলার ব্যবস্থা করছি। জাবালা বললো, তাহলে আমি খৃষ্টান হয়ে যাবো। উমর বললেন, আপনি যদি খৃষ্টান হয়ে যান, তাহলে আপনার গর্দান উড়িয়ে দিবো, কারণ ইসলাম গ্রহণ করার পরে যদি আপনি মুর্তাদ হয়ে যান, তাহলে শরীয়তের বিধানে আপনার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। জাবালা যখন হযরত উমরের দৃঢ়তা লক্ষ্য করলো তখন সে বললো, আমাকে এক রাতের সময় দিন, আমি একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। রাত্রে যখন সব লোকজন শুয়ে পড়ে, তখন জাবালা তার ঘোড়া ও সামান-পত্র নিয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। এরপর সে কনস্টান্টিণেপল চলে যায় এবং সেখানে গিয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে।

২. দায়িত্বানুভূতি/দায়িত্বশীলতা
দা'য়ী নিজেকে ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈমানী মজবুতী, ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণ এবং ইসলামের ব্যাপারে যে কর্ম সম্পাদন করা দরকার সে ব্যাপারে নিজেকে সদা-সর্বদা দায়িত্বশীল মনে করবে। ইসলামের জন্য কাজ করাকে নিজের স্বতসিদ্ধ অভ্যাস বা স্বভাবে পরিণত করবে। এজন্য সে যে কোন ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তৈরী থাকবে। এটা তার উপরে দায়িত্ব দেওয়া হোক আর না হোক সে নিজ দায়িত্বে ইসলামের জন্য কাজ করবে এবং ইসলামের একজন একনিষ্ঠ সৈনিক হিসাবে কাজের আঞ্জাম দিয়ে যাবে। রাত-দিন সে নিরলস ভাবে ইসলামের জন্য কাজ করে যাবে। তার চিন্তা-চেতনায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সুখে-দুখে, চিন্তা-চেতনায় তাদের এই অনুভূতিই ছিল। যাইদ ইবনে সাবেত বলেন: আমাকে রাসূল (সা.) ওহুদের দিন সা'দ ইবনে রাবী (রা.)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। তিনি আমাকে বললেন, তুমি তার দেখা পেলে আমার সালাম পৌছাবে আর তাকে বলবে? রাসূলুল্লাহ তোমাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, তুমি কেমন আছ? তিনি বলেন আমি শহীদদের লাশগুলোর ভিতরে তাঁকে খুঁজতে ছিলাম। যখন আমি তাঁর নিকটে গিয়ে পৌছলাম, তখন তার ছিল অন্তিম অবস্থা। কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস জারি আছে। তাঁর সারা শরীর তীর, তরবারী ও বর্শার আঘাতে জর্জরিত। সত্তরটিরও অধিক আঘাত বিদ্যমান। আমি তখন বললাম, হে সা'দ রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, আপনি কেমন আছেন? সা'দ বললেন, রাসূলকে আমার সালাম জানাবেন এবং বলবেন, হে রাসূল! আমি জান্নাতের খুশবো পাচ্ছি, আর আপনি আমার আনসার ভাইদের বলবেন, তাদের একজনও বেঁচে থাকতে যদি কোনো শত্রু রসূলুল্লাহর নিকট যেতে পারে তবে তাদের কোন ওযর দেয়ার সুযোগ থাকবে না। তারা চোখের পলক ফেলার সময় পর্যন্তও যেন তাঁর খেদমত করে যান... এ কথা বলা মাত্রই তাঁর প্রাণ বের হয়ে যায়।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 আন্দোলনমুখী কার্যক্রম

📄 আন্দোলনমুখী কার্যক্রম


যদি আমরা স্বতস্ফূর্ত দায়িত্ব অনুভূতির বিষয়টি অতিক্রম করে সাংগঠনিক দায়িত্বের দিকে অগ্রসর হই, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে যে, নিজের মধ্যে যদি স্বতস্ফূর্ত ভাবে কারো দায়িত্ব অনুভূতি না আসে তাহলে তার পক্ষে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না। একজন দা'য়ীকে সদা-সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে তার উপর যে দায়িত্বই আসুক না কেন, সে তা যথাযথ ভাবে পালন করবে। এ ব্যাপারে সামান্যতম গাফলতি দেখাবে না।

আমরা এখানে রাসূলের যুগের একটি ঘটনা উল্লেখ করবো, যা তাদের মধ্যে সাংগঠনিক দায়িত্ব অনুভূতি ও দায়িত্ব পালনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ফুটিয়ে তুলে:

যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রা.) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে 'জাতুর-রিকা' অভিযানে বের হলাম। আমরা এক জায়গায় অবতরণ করলাম তখন রাসূল (সা.) বললেন: কে আছো আজকে সারা রাত আমাদেরকে পাহারা দেবে? তখন একজন মুহাজির ব্যক্তি দাড়ালো আর একজন আনসার। তারা হলেন আম্মার ইবনে ইয়াসীর ও ওব্বাদ ইবনে বিশর (রা.)। তারা যখন উপত্যকার মুখে ডিউটি করছিল, তখন আনসার সাহাবী মুহাজিরকে বললো, প্রথম রাত্রি আপনি ডিউটি করবেন না আমি ডিউটি করবো? মুহাজির বললো, প্রথমদিকে আপনি করুন, এরপর মুহাজির ব্যক্তি ঘুমিয়ে যায়। আর আনসার সাহাবী নফল নামাজ পড়তে থাকে। একজন মুশরিক শত্রু এসে দেখলো একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে তখন সে তাকে দূর থেকে তীর নিক্ষেপ করে। এ অবস্থায় আম্মার ইবনে বিশর তীরটাকে জোরে টেনে বের করে দিয়ে নামাজ পড়তেই থাকে। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তীরও এভাবে টেনে বের করে নামাজরত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর তিনি যখন রুকু এবং সিজদাতে যান, মুহাজির ব্যক্তি জেগে ওঠেন। যখন মুশরিক দেখলো যে, ওরা দুজন ব্যাপারটি জেনে গেছে মুশরিক দৌড়ে পালিয়ে যায়। মুহাজির আনসারীর রক্ত ঝরতে দেখে বলেন, সুবহানাল্লাহ! আপনি প্রথম আঘাত পাওয়ার পরেই আমাকে জানাননি কেন? আনসারী বলেন, আমি একটা সূরা পড়ছিলাম, আমি চাইনি যে তা পড়া ছিন্ন করি। এরপর তীর লাগলে আপনি জেগে যান, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল যে আমাকে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন, নিজের জীবন চলে গেলেও তা রক্ষা করতে পিছপা হ'ব না।

একজন দা'য়ীকে সর্বাবস্থায় দায়িত্ব অনুভূতির পরিচয় দিতে হবে। কোনক্রমেই পিছপা হলে চলবে না বা এমন অবস্থায় তার যেন মৃত্যু না হয় যে, সে তার দায়িত্বে গাফলতি করেছে। কারণ দা'য়ী সর্বদা সীমান্ত পাহারা দেয়ার সৈনিকদের মতো সংগ্রামে লিপ্ত এবং সে একজন মুজাহিদের সওয়াব পাবে। ইরবাজ ইবনে সারীয়া (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন: প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু আসলে তার আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, একমাত্র আল্লাহর পথে পাহারাদার ব্যতীত। তার আমলকে বৃদ্ধি করা হবে, তার সওয়াব সে পেতেই থাকবে এবং তাকে কিয়ামত পর্যন্ত রিযিক প্রদান করা হবে। (আল-হাদীস)

আন্দোলনী মনোভাব
অধিকাংশ দা'য়ীর মাঝে আন্দোলনী মনোভাবের দুর্বলতার কারণে দাওয়াতের বর্তমান ও ভবিষ্যতের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আন্দোলনী মনোভাবের সংকটের কারণে দাওয়াত তার কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। কারণ, ইসলামী দাওয়াতই হলো এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের নাম। ইসলামের প্রাথমিক চিন্তা-ধারা ও নির্দেশনা যদি কেউ সঠিকভাবে ধারণ করতে পারে তাহলে সে অবশ্যই আন্দোলিত এবং আন্দোলনমুখী হয়ে উঠবে। যে সমাজে আমরা বাস করছি, সেখানেও যদি জনগণকে ইসলামের মূল স্প্রিট বোঝাতে সক্ষম হই তাহলে তারাও ইসলামের জন্য এগিয়ে আসতে পিছপা হবে না। তারা গাইড লাইনের অভাবে মূলতঃ আজ নিশ্চুপ হয়ে আছে। এ কথা সত্য যে, বর্তমান সময়ে ইসলামী কর্মকান্ড চতুর্দিকে শত্রুর ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দ্বারা পরিবেষ্টিত। কিন্তু এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, দা'য়ী দৃঢ় সংকল্প হলে এসব বাধা বিদূরিত হতে সময় লাগবে না। যখন মক্কার কুরাইশরা ওহুদের যুদ্ধে সাময়িক জয় লাভের পর মদীনা থেকে মক্কার দিকে রওয়ানা হয়, এরপর তারা পরের দিন আবার মদীনার দিকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হয় তখন রাসূল (সা.) নিজে ও সাহাবীরা আহত হওয়া সত্ত্বেও মদীনার বাইরে কাফেরদের পিছু ধাওয়া করতে থাকেন। সাহাবীদেরকে মুনাফিকরা ভয় দেখাতে গুজব ছড়ায়। তারা বলে, ওরাতো অনেক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে মদীনার দিকে ধেয়ে আসছে। কিন্তু মুমিনরা এতে কর্ণপাত করেনি। মহান আল্লাহ বিষয়টিকে এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেনঃ "যাদেরকে লোকেরা বলে যে, অনেক লোক তোমাদের বিরুদ্ধে জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তাদেরকে তোমরা ভয় কর। এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা বলে আল্লাহ আমাদের. জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম ভরসা-স্থল। আল্লাহর অনুগ্রহে ও সাহায্যে তারা ফিরে এল এবং তাদেরকে কোন অকল্যাণই স্পর্শ করতে পারেনি। মূলতঃ তারা আল্লাহর সন্তোষ অনুসরণ করছিল এবং মহান আল্লাহ অতীব করুণাময়।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৭৩-১৭৪)

এখানে আমি জুলুম অত্যাচারের মোকাবেলা করলে মনের মধ্যে যে দৃঢ়তার উন্মেষ ঘটে সে ব্যাপারে ইঙ্গিত করতে চাই... আসলে মানুষ যদি বিপদ-আপদে কষ্ট-দুঃখে দৃঢ় থাকে তাহলে শত বিপদে তাদের হতাশা বা পশ্চাদপদতা সৃষ্টি হয় না। হযরত নূহ (আ.) এর দাওয়াতের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা, সাড়ে নয়শ বছর পর্যন্ত অব্যাহত দাওয়াত এবং এসময়ে তিনি যে জুলুম ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন তাতে কিন্তু তিনি বিচলিত হননি বরং তিনি মানুষকে বিশেষ করে তার অনুসারীদেরকে উৎসাহিত করতেন। "যখন রাসূলরা নিরাশ হলো এবং ধারণা করলো যে, আমরাতো মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়ে গেলাম তখনই তাদের উপর আমাদের সাহায্য আসলো, আমরা যাকে ইচ্ছা নিস্কৃতি দিলাম। গুনাহগার জাতির উপর থেকে আমার আযাব কেউ প্রতিহত করতে পারে না। নিশ্চয় এদের ঘটনাবলীতে জ্ঞানীদের জন্য উত্তম শিক্ষা রয়েছে।" (সূরা ইউসুফ : ১১০-১১১)

আজকে আমরা যে যুদ্ধের মোকাবেলা করছি, এর জন্য এমন ধরনের লোকের প্রয়োজন যারা বেঁচে থাকবে ইসলাম নিয়ে এবং ইসলামের জন্যে। এখন আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, আমরা কি করছি? আমরা ইসলামের জন্য ন্যায়ের জন্য, দ্বীনের জন্য কতটুকু কাজ করছি? অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যায় বাতিলেরা তাদের ভ্রান্ত মতবাদকে প্রচার ও প্রসার করার জন্য জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা তাদের ভ্রান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সব কিছু কুরবানী দিচ্ছেঃ "তারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করছে আর আল্লাহ আহ্বান করছেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। তিনি মানুষের জন্য তাঁর নিদর্শন সমূহ সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করছেন, যেন তারা সৎ উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।" (সূরা বাকারা : ২২১)

ইসলামের জন্য যাদের রক্ত গরম হয় না, মন-প্রাণ, অনুভূতি জাগ্রত হয় না তাদের আশা-আকাংখা এবং পরিকল্পনা কখনও পূরণ হবে না, কোন দিনই তাদের হাতে ইসলামের বিজয় আসতে পারে না। আমরা এখানে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি দিকে আলোকপাত করছি।

অন্তঃকরণই আশা-আকাংখার কেন্দ্রবিন্দু
আমার ধারনা অন্তঃকরণই হচ্ছে মানুষের চিন্তা-চেতনার মূল কেন্দ্র। আর একজন দা'য়ীকে তার আশা-আকাংখা সংকল্প সবকিছুই পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে করতে হবে। মস্তিষ্ককে সদা-সর্বদা কাজে লাগিয়ে রাখতে হবে, পারিপার্শ্বিকতার সবকিছু থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "তারা কি জমিনে পরিভ্রমণ করে না? তাদের কি অন্তঃকরণ নেই যার দ্বারা তারা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে, আর তাদের কর্ণ নেই যা দিয়ে সৎ উপদেশ শুনে থাকে? প্রকৃত ব্যাপার হলো তাদের চক্ষু অন্ধ নয়, কিন্তু তাদের অন্তরের চক্ষুই হলো অন্ধ।" (সূরা হজ্জ: ৪৬)

ঈমান হলো সু-ধারণারই ফসল, আর মানুষকে আন্দোলিত করার ও তার থেকে ফল লাভ করার উপকরণ। যদি সু-ধারণার পথে কেউ অগ্রসর না হয়, তাহলে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জড়তা ও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা ও বন্ধাত্ব আসতে বাধ্য।

এসব কারণেই অন্তরকে সদা-সর্বদা আলোকিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্তর যেন ইসলামের জন্য নির্মল থাকে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নবী করীম (সা.) যথার্থই বলেছেন: অন্তঃকরণে মরিচা পড়ে যায়, একে পরিচ্ছন্ন করার উপায় হলো, সর্বদা ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।

ইসলামের দা'য়ীকে এব্যাপারে সদা-সর্বদা তৎপর থাকতে হবে। তার কলবকে আলোকিত রাখার জন্য এবং শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাযত করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মানুষের চোখ হলো পথ প্রদর্শক, কান হলো গর্ত, তার জিহ্বা হলো মুখপাত্র, তার হাত দুটি হলো ডানা স্বরূপ আর পা দুটি হলো বাহক আর অন্তঃকরণ এসবের অধিকারী এবং রাজা। যদি রাজা ভালো থাকে তাহলে তার সৈন্যরাও ভালো থাকবে।

এজন্য অন্তঃকরণকে শয়তানের কু-মন্ত্রণা থেকে হেফাযত করতে হবে, কেননা শয়তান মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করতে সক্ষম। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য দিনে-রাতে আল্লাহর নিদর্শনাবলী নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে সকাল বেলায়, কেননা সকালের কুরআন তিলাওয়াত মানুষের জন্য সাক্ষ্য স্বরূপ। মসজিদে নির্জনে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে হবে। সদা-সর্বদা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "শয়তান যদি মানুষের অন্তরে চক্কর দিতে সক্ষম না হতো তাহলে আদম সন্তান আকাশের গোপন রহস্য ও নিদর্শনাবলী স্বচক্ষে দেখতে পেতো।”

অন্তর নম্র ও কাঠিন্যের আবর্তে ঘূর্ণায়মান। আল্লাহর আনুগত্য একে নরম করে আর গুনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতা অন্তরে কাঠিন্য সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেনঃ "তাদের আশা-আকাংখা প্রলম্বিত হয়েছিল যার ফলে তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল। সেটি ছিল পাথরের মত শক্ত বা এর চেয়েও কঠিন।" বরং তাদের অন্তঃকরণের উপর মরিচিকা পড়ে গিয়েছিল তাদের অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে।" ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন: আমি দেখেছি গুনাহ মানুষের অন্তঃকরণকে মেরে ফেলে, আর অপমান লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গুনাহ ত্যাগ করা হলো অন্তরকে জীবন্ত করারই নামান্তর। তোমার জন্য কল্যাণকর হবে, তোমার প্রবৃত্তির বিরোধীতা করা।

একজন দা'য়ীকে সদা-সর্বদা নিজের মনের উপর খেয়াল রাখতে হবে যে, সেকি আল্লাহর পথে চলেছে নাকি অন্যদিকে, সেকি গুনাহকে তুচ্ছ মনে করছে নাকি গুনাহর ব্যাপারে ভীত? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ "সাবধান! তোমরা ছোট গুনাহ গুলিকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না, কেননা এসব জমা হতে হতে একজন মানুষকে ধ্বংস করে ফেলবে।” কবি এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন:

"বিন্দু বিন্দু বালুকনা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জল গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল"

অপর এক কবি বলেন:

"ক্ষুদ্রকে ক্ষুদ্র বলে তাচ্ছিল্য করনা ক্ষুদ্র ইঁদুরই শক্তিশালী সিংহকে প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল।"

এজন্য একজন দা'য়ীর অন্তঃকরণ যেন আয়নার মত পরিচ্ছন্ন থাকে, যাতে ইসলামের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। এর দ্বারা সে উৎফুল্ল হয়, গোটা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন এর দ্বারায় চালিত হয়। একজন দা'য়ীকে চিন্তা করতে হবে যে, সমাজের লোকজন তার চলা-ফেরা, উঠা-বসা এমনকি তার দৃষ্টির চাহনি পর্যন্ত লক্ষ্য করে থাকে। একজন দা'য়ী যতক্ষণ না ইসলামের পুরো অনুসরণ করবে, ততক্ষণ সে সঠিক ইসলামের স্বাদে-আস্বাদিত হতে পারবে না।

অন্তঃকরণই হলো নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু
যদি ব্যক্তির মন-মানসিকতা, চিন্তাধারা সঠিক ও স্বচ্ছ হয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের পরিপক্কতা সংস্কৃতির প্রশস্ততা থাকে তাহলেই সে অন্যকে এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম। কেননা, নিঃস্ব লোক কাউকে কোন কিছুই দিতে পারে না। দেখা যায়, দুর্বল সংস্কৃতির অধিকারী অনেক সত্যপন্থী শিক্ষিত সংস্কৃতিবান বাতিল পন্থীর কাছে লজ্জিত হয়ে মাথা নত করে থাকেন।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ কিভাবে ঘটবে

📄 দা'য়ীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ কিভাবে ঘটবে


একজন দা'য়ীকে তার চিন্তার জগতকে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে- জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক, সমাজনীতি, রাজনীতি দিয়ে জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধি করতে হবে, যেন যে কোন সমস্যা বা প্রশ্নের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিতে পারে। একজন দা'য়ীকে কুরআন-হাদীস, নবীর জীবন আদর্শ ও তাঁর জীবন চরিত ভালো ভাবে জানতে হবে, যেন যে কোন ঘটনা প্রবাহে রাসূলের জীবন চরিত থেকে এর সমাধান পেতে পারে।

ইসলামের দা'য়ীরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে
আমি বলছি না যে, দা'য়ীরা তাদের শত্রুদের কোপানলে তাদের ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ। এ বিপদতো কিছুই না, যদিও এর ক্ষতি ও কাঠিন্য অনেক বেশী। দা'য়ীর জন্য সবচেয়ে বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হলো তার নফস বা কু-প্রবৃত্তি। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন : "তোমরা গুনাহের ব্যাপারে শত্রু সৈন্যর চেয়ে বেশী সতর্ক হও, কেননা শত্রু সৈন্য তোমাদের কাছে কোন ধর্তব্যের বিষয়ই নয়। মুসলমানেরা তো শত্রু সৈন্যদের গুনাহের কারণেই বিজয় লাভ করে থাকে। তোমরা জেনে রাখো তোমাদের চলার পথে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্ক পাহারা রয়েছে। সাবধান! তোমরা আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী কোন কিছু করবে না। কেননা, তোমরা আল্লাহর পথেই চলেছ।"

আমি এখানে একই কথা বলতে চাই যে, বর্তমান যুগে দা'য়ীদেরকে বিভিন্নভাবে ফেতনার দিকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। তাদেরকে একবিংশ শতাব্দীর জাহেলিয়াতের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়ার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। এরা সদা-সর্বদা কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করছে, তাদের অন্তঃকরণ মরে গেছে। আল্লাহ বলেন : "এদের উদাহরণ হলো কুকুরের মত, ওকে তাড়া দিলে ঘেউ ঘেউ করে, আর ছেড়ে দিলেও ঘেউ ঘেউ করে। সেই লোকদের উদাহরণ যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।"

পাপ-পঙ্কিলতা লোভ-লালসার সয়লাব থেকে একজন দা'য়ীকে মজবুত ঈমান ও বলিষ্ঠ নৈতিক চরিত্র দিয়ে নিজেকে হেফাযত করতে হবে।

প্রতিরোধের স্থানগুলো সংরক্ষণ করুন
আজকে দা'য়ীদেরকে সবচেয়ে সর্তক থাকতে হবে, বাস্তব অবস্থার দিকে, সর্ব ক্ষেত্রে ইনসাফ ভিত্তিক ইসলামী সমাধান গ্রহণ করতে হবে। ধীরে চলা বা না দেখার নীতি পরিহার করতে হবে। সদা-সর্বদা দায়িত্ব অনুভূতির সাথে কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। শত্রু প্রতিরোধের জন্য সদা-তৎপর থাকতে হবে। তাদের কোন কাজই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া যাবে না।

ইসলামী ব্যক্তিত্ব
ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এর আগে অন্য কোন কর্মসূচী নেয়া যাবে না। ইসলামী ব্যক্তিত্বই হলো ইসলামী আন্দোলনের মূল ভিত্তি। ইসলামী আন্দোলন যেমন মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দিতে পারে না দা'য়ী ও কর্মী ব্যতিরেকে, তেমনি এসব দা'য়ীরা তাদের এ বিপদজনক দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যতক্ষণ না, তাদের মাঝে ইসলামী ব্যক্তিত্ব-চরিত্র পূর্ণতা লাভ করবে। আসুন আমরা ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদান ও উপকরণ নিয়ে আলোচনা করি-

১. ইসলামী জ্ঞান
ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনে একটি উপাদান হলো ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী হওয়া। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে সেই দা'য়ীর ইসলামী চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন তার কর্ম-কান্ডে ঘটতে পারে না। ইসলামী জ্ঞান হলো মূল, যার দ্বারা সে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে, প্রতিটি কর্ম-কান্ডের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ফয়সালা গ্রহণ করতে পারে। ইসলামী জ্ঞান আহরণের জন্য কতিপয় পদক্ষেপ নেয়া দরকারঃ
প্রথমত: কুরআন হাদীস সম্পর্কে সঠিক বুঝ বা জ্ঞান থাকতে হবে। দা'য়ীর অন্তকরণে কুরআন হাদীস সঠিকভাবেই ধারণ হবে।
দ্বিতীয়ত: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল থাকতে হবে। দুনিয়া ও পরকালের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে হবে।
তৃতীয়ত: ইসলামের সর্ববিষয়ে ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়, কারণ মানুষের জ্ঞান স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যতই একে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও তথ্য দিয়ে ভরপুর করা হবে। আর যদি জ্ঞান ভান্ডারকে এসব সংস্কৃতি গবেষণা থেকে লেখা- পড়া থেকে দূরে রাখা হয় তাহলে কখনই প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যাবে না।

ড. সাবরি আল কাব্বানী তার লেখা "আপনার ডাক্তার আপনার সাথেই" নামক গ্রন্থে বলেন: মানুষের মস্তিষ্ক বিভিন্ন রকমের জ্ঞান-গবেষনা পুঞ্জিভূত করতে এবং গ্রহণ করতে সক্ষম। যদি পরিকল্পিতভাবে ব্রেনের মধ্যে বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা, কলা- কৌশল এবং তথ্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তাহলে অবশ্যই মস্তিস্ক এগুলোকে গ্রহণ করে নিজের চিন্তার জগতে পরিপক্কতা আনতে সক্ষম। ইসলামী জ্ঞান তখনই পরিপূর্ণতা লাভ করবে, যখন ব্যক্তি দুনিয়ার অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করবে।

২. ইসলামী মন-মানসিকতা
মানুষের মন-মানসিকতা যদি ভাল না হয়, তাহলে তার কাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একজন দা'য়ীকে স্বচ্ছ মন-মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। তার মাঝে কোন রকমের বৈপরিত্য বা মুনাফেকী যেন স্থান না পায়। তার চিন্তা-চেতনা, কথা-বার্তা ও কাজ-কর্মের মধ্যে কোন ফারাক বা বৈপরিত্য দেখা না যায়। ইসলামে এ বিষয়টিকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদানগণ! তোমরা কেন সে কথা বল, যা তোমরা নিজেরা করনা। এটি আল্লাহর নিকট চরম গর্হিত কাজ।" (সূরা সফ: ২)

বাড়া-বাড়ি বা শৈথিল্য কোনটিই কাম্য নয়
ইসলাম প্রথম দিন থেকেই মানুষের স্বভাবজাত ও মন-মানসিকতার সাথে সামঞ্জস্যশীল বিধান উপস্থাপন করেছে। কোন একটি বিষয়কে নিয়ে স্বভাবজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধে বাড়া-বাড়ি করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। যেমন, কেউ হয়তো তার শরীরের ব্যাপারে যথাযথ খেয়াল যত্ন করে না। এরা ইসলামী জীবন চরিতের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হতে বাধ্য। বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে আসের বাড়ী দেখতে গেলেন, তাঁর স্ত্রীকে দেখলেন যে, সে বেশ- ভূষায় অগোছালো। তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন আছো? মহিলা বললেন, কেমন থাকবো? আব্দুল্লাহ ইবনে আমরতো দুনিয়া ত্যাগী হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, কিভাবে? মহিলা বললেন, সে ঘুমায় না, সারাদিন রোজা রাখে, গোশত খায়না, পরিবারের হক আদায় করে না। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায়? তিনি বললেন, বাহিরে গেছে এখনি আসতে পারেন। তিনি বললেন, সে আসলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবে। রাসূল চলে আসার সময় আব্দুল্লাহ এসে হাজির। রাসূল বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর! আমি একি শুনলাম, তুমি নাকি ঘুমাও না? সে বললো, আমি এর দ্বারা কিয়ামতের ভীতিকর অবস্থা থেকে নিরাপত্তা চাই। তিনি তাকে বললেন, তুমি নাকি সারাদিন রোজা রাখো? সে উত্তরে বললো, আমি এর দ্বারা জান্নাতে উত্তম প্রতিদান চাই। তিনি বললেন, আমি শুনলাম তুমি নাকি পরিবারের হক আদায় কর না? সে বললো, আমি এর দ্বারা পরকালে এদের চেয়ে উত্তম পরিবার কামনা করছি। তখন রাসূল (সা.) বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর তোমার জন্য রাসূলুল্লাহর জীবনে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আল্লাহর রাসূল নফল রোজাও রাখেন আবার অনেক সময়ে নফল রোজা রাখেন না, তিনি গোশত-মাংস খান, পরিবার পরিজনের হক আদায় করেন। হে আব্দুল্লাহ! তোমার উপরে আল্লাহর হক রয়েছে। তোমার শরীরের উপরে তোমার হক রয়েছে। তোমার উপরে তোমার পরিবারের হক রয়েছে। সুতরাং একজন দা'য়ীকে সর্বক্ষেত্রে সুষম জীবন যাপনে প্রত্যয়ী হতে হবে। কোন এক বিষয়ে বাড়া-বাড়ি আবার অন্য বিষয়ে গাফলতি করা যাবে না। সদা-সর্বদা আত্ম সমালোচনা করতে হবে। তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণীর উপরে আমল করতে হবে- "প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে থাকে আর বেকুব ও নির্বোধ সেই লোক যে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে আর আল্লাহর রহমতের আশা রাখে।"

হযরত উমর (রা.) এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: হিসাব দেয়ার পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব কর। ওজন দেয়ার পূর্বেই নিজেদের নেকী-গুনাহর ওজন কর আর কিয়ামতের মহা সংকটের দিনের ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণ কর। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে, দুনিয়ার হালাল উপকরণ খানা-পিনা, পোশাক-আশাক ইত্যাদির ব্যাপারে কার্পণ্য করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন: বলুন! কে তোমাদের জন্য আল্লাহর সৌন্দর্যমন্ডিত জিনিসকে হারাম করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্য পবিত্রতম রিযিক হিসাবে দান করেছেন।" (সূরা আ'রাফঃ ৩২) তিনি অন্যত্র বলেনঃ "বলুন! আমার প্রভু তো হারাম করেছেন শুধু প্রকাশ্য অন্যায় অশ্লীলতা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ আর অন্যায়ভাবে সীমালংঘন করাকে।" (সূরা আ'রাফ: ৩৩) একথা ঠিক যে, মানুষের কু-প্রবৃত্তি তাকে খারাপ পথে পরিচালিত করার জন্য প্ররোচিত উৎসাহিত করে। তবে এক্ষেত্রে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেন কু-প্রবৃত্তি আমাদের উপর বিজয়ী না হয়। মানুষকে তো তার সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ কারো সাধ্যাতিত ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। "আল্লাহ কোন মানুষকে তার সাধ্যের চেয়ে বেশী কোন কিছু চাপিয়ে দেন না। সে তো শুধু তার কৃত ভাল কাজের সুফল ও মন্দ কাজের কুফলই পাবে।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

শহীদ সাইয়েদ কুতুব তার প্রখ্যাত তাফসীর ফী যিলালিল কুরআনে বলেন, এই হচ্ছে সেই আকীদা যা মানুষ জানে কোন জীব-জন্তু, ফেরেস্তা বা শয়তান নয়। জানে এর মধ্যে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে আর কোথায় শক্তি। মানুষের ভিতরে যে জ্ঞান প্রজ্ঞা এবং চিন্তা-চেতনা রয়েছে তার দ্বারা সে সুষম জীবন-যাপন করতে পারে আর মূলতঃ এর উপরেই মানুষের হিসাব-নিকাশ হবে। সাধ্যর বাইরে কারো হিসাব বা বিচার ইসলাম করবে না। কারোই সাধ্যের বাইরে কোন কিছু মহান আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবে না।

নবী করীম (সা.) সবধরনের বাড়াবাড়ি বা অবহেলা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) একদিন আয়েশার ঘরে প্রবেশ করলেন, সেখানে একজন মহিলা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন উনি কে? (আয়েশা রা.) বলেন, তিনি অমুক মহিলা যার বেশী বেশী নামায পড়ার কথা বলা হয়ে থাকে। তিনি বললেন, থামো! তোমরা সাধ্যাতীত কিছু করো না। আল্লাহর শপথ! তোমরাই শেষে বিরক্ত হয়ে পড়বে তখন আল্লাহ তাআলাও বিরক্ত হবেন। অর্থাৎ বেশী বেশী আমল করতে করতে তোমরা যখন অপারগ হয়ে পড়বে তখন আল্লাহও বিরক্ত হবেন, কেন তোমরা অহেতুক বাড়াবাড়ি করতে গেছো।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন নিশ্চয় দীন হল সহজ। যে ব্যক্তি দীনের ব্যাপারে কঠোরতা করবে সে পরাজিত হবে সুতরাং সহজভাবে গ্রহণ কর, নিকটতর হও এবং লোকজনকে দীনের ব্যাপারে সুসংবাদ দাও সকাল বিকাল ও দুপুরে দীনের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান কর। ইমাম নববী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা হয়েছে যার অর্থ হল, তোমরা মহান আল্লহর অনুগত্যের ব্যাপারে তোমাদের কর্মক্ষম অবস্থায় আমল কর যখন তোমাদের মন মুক্ত থাকবে যেন ইবাদতের স্বাদ বা মজা অনুভব কর! তোমরা এমন ভাবে ইবাদত করিওনা যে ক্লান্তও বিমর্ষ হয়ে পড়। যেমন বুদ্ধিমান মুসাফির তার বাহন নিয়ে এমন সময় চলে যখন কোন কোলাহল থাকেনা, প্রকৃতি থাকে শান্ত। আর কোলাহল ও প্রচন্ড তাপের সময় তার বাহনকে আরাম দিয়ে থাকে।

এজন্যে ইবাদত সহ সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি এবং অবহেলা পরিত্যাগ করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

একনিষ্ঠতার মর্ম
দায়ীর ইসলামী স্বভাব ও বৈশিষ্ট ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারবেনা যতক্ষণ না একমাত্র আল্লাহর জন্য নিজেকে সোপর্দ করবে, তাকে সবধরনের শৃংখলা থেকে মুক্ত হতে হবে, নিজেকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুর আনুগত্য থেকে মুক্ত রাখবে। যদি সেটা ধনসম্পদ হয় তাহলে তা থেকে পরহেজ করবে আর যদি তা প্রভাব প্রতিপত্তি হয় তাহলে তা থেকে মুক্ত হবে। নিজের মনকে ধনী মনে করবে টাকাপয়সাকে নয়। তাকওয়াকে সম্মান মর্যাদা মনে করবে আল্লাহর সমীপে, প্রভাব প্রতিপত্তিকে নয়।

📘 দায়ীর আত্ম পর্যালোচনা > 📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি

📄 দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি


উত্তম পদ্ধতি দা'য়ী ও দাওয়াতের পদ্ধতি
কতিপয় কর্মকারণ রয়েছে যা দায়ীর দাওয়াতকে সফল হতে এবং কাংখিত ফললাভে অনেকাংশে সহায়তা করে তাহল উত্তম পদ্ধতি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কার্যকরণ যার মাধ্যমে দায়ী অল্পসময়ে, স্বল্প খরচে দাওয়াতের ও তাবলীগের উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম তা বক্তব্য, আলোচনা, লিখিত রচনা যাই হোক উত্তম পদ্ধতিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। দায়ীকে হতে হবে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মত যিনি বুঝেন চিকিৎসা কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কিভাবে শুরু করতে হবে অতঃপর তিনি প্রয়োজনীয় উপাদান না পাওয়ার পূর্বে শুরু করবেন না যেন তার কাজকর্ম ব্যর্থ না হয়ে যায়।

সমাজে আজ বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন বিদ্যমান এমন বক্তব্য রাখবেন যেন লোকজন আগ্রহের সাথে শুনেন এমন ভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা উপলব্ধি করতে পারেন তাদের অন্তঃকরনকে নাড়া দেয়, তাদের রোগের উপর প্রতিক্রিয়া ঘটায় তাদের সমস্যার কথা উঠে আসে। স্থান কাল পাত্র ভেদে আলোচনা উপস্থাপন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন আমাকে নির্দেশ করা হয়েছে যেন আমি লোকজনকে তাদের জ্ঞান সম্মান মোতাবেক বক্তব্য রাখি। বর্তমান সময়ে ইসলামের পক্ষে কাজ করার জন্য এমন দায়ীর বিশেষ প্রয়োজন যারা সুন্দর ভাবে চিন্তাধারা উপস্থাপন করবেন, এমন পদ্ধতিতে যাতে ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্টত্ব ফুঠে উঠে এবং লোকজন তা শুনতে, বুঝতে ও জানতে আগ্রহী হয়। আজ অনেকেই ইসলামের কথা বলে ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে তারা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশী করেছেন। এজন্য দাওয়াতের কাজ উত্তমভাবে উপস্থাপন উত্তম পদ্ধতিতে দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে।

কাঠিন্য ও কোমলতার মাঝে
মানুষের নফসে প্রকৃতিগত ভাবেই ভাল জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা রয়েছে? কেউ তার সাথে ভাল আচরণ করলে সে তাকে ভালবাসে আবার কেউ তার সাথে কর্কশ ও রুঢ় আচরণ করলে তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হয় তার ব্যাপারে ক্রোধ ও ঘৃনা জন্মে। এজন্য নরম ও মোসাহেবী করা বা তেল মালিশী করা নয় যা মুনাফিকীর নামান্তর। দায়ীকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নম্র ভদ্র ভাষা ব্যবহার করতে হবে বিশেষভাবে যদি দাওয়াত দেয়া হয় মুসলমানদেরকে। এজন্য রুঢ় কথা ও কর্কশ ভাষা কিংবা আক্রমনাত্মক কথা দাওয়াতের ক্ষেত্রে মোটেই কাম্য নয়। লক্ষ করুন মুসা ও হারুন (আ.) এর প্রতি মহান প্রভুর দাওয়াতের ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা। তৎকালীন স্বৈরাচারী ফেরাউনের নিকট দাওয়াতের সময় তাদের নরম ভাষা ও ভদ্র আচরণ করার নির্দেশ দেন। "তোমরা দুজনে যাও ফেরাউনের নিকট সে চরম অবাধ্য আচরণ করেছে। অতপর তাকে নরম কথা বলো হয়তোবা সে নসিহত গ্রহণ করবে কিংবা আল্লাহকে ভয় করবে।" (সূরা ত্বহা.....)

নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে এই নীতি গ্রহণ করার জন্য কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কঠোরতা পরিহার করে নম্রতা গ্রহণ এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের পন্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ "আপনার রবের পথে আহবান করুন হিকমত ও উত্তম বাক্যের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়। নিশ্চয় আপনার রব জানেন কে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তিনি হেদায়েত প্রাপ্তদের সর্ম্পকে অধিক অবগত"। (সূরা নাহলঃ১২৫) ইবনে কাসীর এর ব্যাখ্যায় বলেন, যদি বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তাহলে হাসি মুখে যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে হবে নম্র ভদ্র ভাষায়। সূরা আলে ইমরানে নম্রতার উপকারিতা ও সহযোগী সমর্থক অর্জনে এর ভূমিকা এবং দাওয়াতের গতি সঞ্চারনে এর কার্যকারিতা কথা উল্লেখ করে নবী করীম (সা.) এর প্রতি ওহী নাজিল হয়।

"আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রুঢ় ও কঠিন হতেন তাহলে তারা আপনার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত”। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৫৯) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুণাবলীর উল্লেখ পেয়েছি। তিনি কঠোর নন। রুঢ় আচরণকারী নহেন। খামাখা হাটবাজারে ঘুরে বেড়াবেন না এবং খারাপের প্রতিদান খারাপ দিয়ে দিবেন না। বরং ক্ষমা করবেন এবং ভাল ব্যবহার করবেন। নবীর জীবন চরিত্রে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যাতে দেখা যায় তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে নম্র-ভদ্রভাবে এমন সুন্দরভাবে দাওয়াত উপস্থাপন করেছেন যা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করেছে।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এক যুবক এসে রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি আমাকে যিনা (ব্যভিচার) করার অনুমতি দিবেন? একথা শুনে লোকজন চিৎকার করে উঠে। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি আমার নিকটে এসো। যুবকটি তার নিকটে এসে সামনে বসে পড়ল। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি কি এ কাজটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন মানুষেরাও তাদের মায়ের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ কর? সে বলল, না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, লোকজনও তাদের মেয়েদের জন্য এটা পছন্দ করেনা। তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পছন্দ কর? ইবনে আউফ (রা.) বলেন, তিনি ফুফু ও খালার কথাও যোগ করেন। সে প্রত্যেক বারই জবাব দেয়: না, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। অতপর নবী করীম (সা.) তাঁর হাত যুবকটির বুকের ওপর রেখে বলেন হে আল্লাহ! আপনি এর বক্ষকে পবিত্র করুন। এর লজ্জাস্থানকে হেফাযাত করুন। এরপর থেকে যুবকটির নিকট এর চেয়ে অর্থাৎ যিনার চেয়ে অন্য আর কিছু এত ঘৃনিত ছিলনা। দায়ীর দাওয়াতের পদ্ধতি সদাসর্বদা উত্তম, সুন্দর ও যুগোপযুগী হতে হবে যেন বৈধ উপকরণের মাধ্যমে অতি সহজভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করা যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হিকমত হল মুমিনের জন্য হারানো মানিকের ন্যায় সে যেখানেই তা পাবে সেখান থেকেই তা আহরণ করবে। তিনি আরো বলেন, তোমরা হিকমত গ্রহণ কর তা যেখান থেকেই আসুক না কেন? আমরা কি চাই?

উত্তম পদ্ধতি তখনই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে যখন দায়ীর গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি ভংগি বিরাজ করে সে কি চাই তার উপর। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে সার্বিক ও কাংক্ষিত ফল লাভ সম্ভব হবে। কি চাই? এটা নির্ধারিত থাকলে সময় প্রচেষ্টা ও উপকরণ ঠিক মত কাজে লাগানো সম্ভব। নতুবা প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হবে। এ বিষয়টির প্রতি আল্লাহ ইঙ্গিত করে বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে"। (সূরা আহযাবঃ৭০-৭১) দায়ীকে অবশ্যই সর্তক দৃষ্টি রাখতে হবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে তা দাওয়াতের ক্ষেত্রেই হোক বা রাজনীতির ক্ষেত্রে কিংবা ছাত্র আন্দোলন অথবা শ্রমিক সংগঠনের ক্ষেত্রে যে সে এক্ষেত্রে কি অর্জন করতে চায়? হাসান বসরী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কাজ করে কোন ধরনের জ্ঞান ছাড়াই সে হল রাস্তা না চিনেই চলা পথিকের মতন। আর উদ্দেশ্যহীন ভাবে কর্মসম্পদনকারী ব্যক্তি ভালর চেয়ে ক্ষতিই করে বেশী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00