📄 দা'য়ীর জীবনে বড় বড় বাঁক বা মোড়
জীবন যুদ্ধে ঘাত-প্রতিঘাত রয়েছে, রয়েছে বড় বড় বাঁক বা মোড়। আল্লাহর পথে দায়ীদেরকেও এসব বাঁধা বা বাঁক মাড়িয়ে এগুতে হবে। ইসলামের পথে কর্মরত ভাইয়েরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের জীবনেও সুখ-স্বাচ্ছন্দ, লাভ-লোকসান হিসাব মিলাতে গিয়ে আসে নানা বাঁক বা বাঁধা।
বাস্তবে অনেক দা'য়ী ব্যক্তিগত লোভ লালসার জন্য জীবন সঙ্গিনী চয়নে এমন একজন সাথী বাছাই করে, যে দাওয়াতের ক্ষেত্রে সহায়ক হয় না। এটা সুখের চেয়ে দুঃখই বেশি বয়ে আনে। কর্ম জীবনে প্রবেশ করে সে বিরাট হোঁচট খায়। তারা শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে দূরে সরে যায়। জীবন প্রবাহের গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেয়।
দা'য়ীর সমাজ যেহেতু জাহেলিয়াতের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়, এজন্য অনেক সময় দা'য়ী সমাজের প্রচলিত ভাবধারার সাথে তার প্রভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে না। সে কলুষিত হয়ে পড়ে। এ বিষয়টিকে একটু ব্যাখ্যা করে বলতে চাই-
১ম বাঁক-স্ত্রী
স্ত্রী দা'য়ীর জীবনে, সমস্ত মানুষের জীবনে এক বিরাট ভূমিকা রাখে। সে যেমন নেয়ামতের উৎস হতে পারে, তেমনি আবার হতে পারে দুর্ভাগ্যের উৎস। দা'য়ীর • দাওয়াতের ক্ষেত্রেও এই দুই ধরণেরই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। অনেক দা'য়ীর বিবাহত্তোর জীবনে আরো সুন্দরভাবে ইসলাম প্রভাব ফেলেছে। তারা ইসলামের সঠিক পথে অগ্রসর হয়েছে। তাদের ইসলামের খেদমত আরো বেগবান হয়েছে। আবার অনেকেরই বিবাহত্তোর জীবনে চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে। ইসলামের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা কমেছে। এমনকি অনেকে দাওয়াতের পথ থেকে সরে গেছেন।
নিঃসন্দেহে বলা যায় এই ফলাফলের পিছনেও কার্যকারণ রয়েছে, যারা দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন, তারা বিবাহের ক্ষেত্রে ইসলামী শর্ত শরায়েত এবং বিধি- বিধানের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন নাই। যার ফলে যা হবার তাই হয়েছে..। তারা পরবর্তীতে আফসোস করেছেন কিন্তু যা হওয়ার তা তো ঘটেই গেছে।
ইসলাম 'দাম্পত্য জীবনকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার কতিপয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। আমরা সেগুলো এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
সঠিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ
ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং বিবাহকে দ্বীনের পূর্ণতা হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূল (স.) বলেছেন- যে ব্যক্তিকে আল্লাহ সৎ স্ত্রী দান করলেন, তাকে অবশ্যই দ্বীনের অর্ধেক রক্ষা করায় সহায়তা করলেন। সুতরাং সে যেনো বাকী অর্ধেককে রক্ষা করার জন্য আল্লাহকে ভয় করে চলে।
বায়হাকীর অপর বর্ণনায় রাসূল (স.) বলেছেন, যখন বান্দা বিবাহ করে তখন তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণতা পায়, সুতরাং সে যেন বাকী অর্ধেক পূরণ করার জন্য আল্লাহকে ভয় করে চলে।
ইসলাম বিবাহ ব্যবস্থাকে নফসকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য এবং একে আল্লাহর আনুগত্যের পথে চরিত্র নিস্কলুষ রাখার জন্য এক বিশেষ কার্যকারণ হিসেবে গণ্য করেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন- হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যাদের সামর্থ রয়েছে, তারা যেন বিয়ে করে। আর বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে রোযা রাখে। কেননা এটাই তার জন্য ঢাল স্বরূপ.।
বিশিষ্ট দার্শনিক প্লেটো বলেন- মানুষ সর্বদা ভীতি, অতৃপ্তিতে ভুগে থাকে, যেনো তার মাঝে একটি অংশ নেই। যখন তার বিবাহ দেওয়া হয় তখন সে তার হারানো অংশটিকে ফিরে পায় এবং তার মধ্যে পূর্ণতা, তৃপ্তি এবং স্থিরতা ফিরে আসে।
রাসূল (স.) বলেছেন- তিন প্রকার লোককে সাহায্য করা আল্লাহর উপর আবশ্যকীয় হয়ে যায়। আল্লাহর পথে যুদ্ধরত যোদ্ধা, চুক্তিবদ্ধ গোলাম, যে স্বাধীন হতে চায় এবং যে ব্যক্তি চরিত্র নিস্কলুষ রাখার জন্য বিবাহ করতে চায়।
ইসলামে বিবাহের একটি বিশেষ লক্ষ্য হল- নিরাপদ পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলা, আর এ ক্ষেত্রে প্রথম ভিত্তি হচ্ছে, বিবাহ। এই ভিত্তি যদি সঠিক হয় তাহলে এর ভবনও সঠিক হবে বলে আশা করা যায়। এ বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য করে মুমিনদের মনের আকুতি মিনতিকে কুরআন মাজীদে এভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যারা বলে হে আমাদের প্রভু, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন- যারা আমাদের চক্ষু জুড়াবে আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। (সূরা আল ফুরকান : ৭৪)
কিন্তু বিবাহের উদ্দেশ্য যদি শুধু মাত্র যৌন চাহিদা মিটানোই হয় তাহলে তাদের কাছে যৌনতা ছাড়া দয়া, মায়া, মহব্বত, ভালবাসা ও স্নেহের কিছুই আশা করা যায় না।
সঠিক সাথী নির্বাচন
ইসলাম সঠিক সাথী নির্বাচনের জন্য বিশেষভাবে তাগাদা দিয়েছে। যদি মহিলার মধ্যে পাওয়া যায়- ভালো মন ও মানসিকতা, তাহলে সেতো সবচেয়ে ভালো মহিলা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী মোতাবেক "মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে সেই মহিলা, যার দিকে তার স্বামী দৃষ্টি দিলে সে আনন্দিত হবে আর যদি তাকে কোন কাজের আদেশ দেয়, তাহলে সে তার আনুগত্য করবে এবং যখন সে তার থেকে অনুপস্থিত থাকবে তখন সে তার ধন-সম্পদ, নিজের নফস এবং টাকা-পয়সার হেফাযত করবে।
সুতরাং আমার ভাইদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে, ইসলাম কিভাবে শয়তান থেকে বাঁচার ব্যাপারে আমাদেরকে পথের নির্দেশনা দিয়েছে। টাকার-পয়সার পূর্বে স্বভাব-চরিত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং মহান আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের অবিবাহিতদেরকে এবং তোমাদের সৎ দাস-দাসীদেরকে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। যদি তারা দরিদ্রও হয়, আল্লাহ তাদেরকে তার করুণা দিয়ে সম্পদশালী করে দিবেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণীকেও সামনে রাখতে হবে, তিনি বলেছেন- কেউ যদি কোন মহিলাকে সম্মান প্রতিপত্তি লাভের জন্য বিয়ে করে, তাহলে আল্লাহ তার অপমান বাড়িয়ে দিবেন আর কোন মহিলাকে যদি টাকা পয়সার লোভে বিয়ে কওে, তাহলে আল্লাহ তাকে অধিকতর দরিদ্র করে দিবেন এবং কেউ যদি আভিজাত্য লাভের জন্য বিয়ে করে কোন মহিলাকে তাহলে সে আরো বেশি লাঞ্ছিত হবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি নিজের চক্ষুকে সংযত করতে, লজ্জাস্থান হেফাযত করতে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে তাহলে আল্লাহ তাদের উভয়ের মধ্যে কল্যাণ ও বরকত দান করবেন।
বাড়াবাড়ি বা শৈথল্য কোনটাই নয়
ইসলাম মানুষকে তার যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য বিভিন্ন ভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছে। সে যেন তার যৌন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিবেক-বুদ্ধি না হারিয়ে ফেলে। সে যেন প্রবৃত্তির দাসে পরিণত না হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহিলারা হলো শয়তানের ফাঁদ। যদি কামনা-বাসনা মহিলাদের প্রতি না থাকতো তাহলে তারা পুরুষদের উপর ছড়ি-ঘুরাতে পারতো না।
ইব্রাহীম ইবনে আদহাম (র.) সত্যি বলেছেন, যারা নারীদের দুই রানের মধ্যে নিজেদেরকে সপে দিয়েছেন, সেতো আর 'বেঁচে নাই। অর্থাৎ তার দ্বারাতে ভালো কিছু আশা করা যায় না। স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অবশ্যই সময় ও স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোন ভাবেই যেন মধ্যম পন্থার অতিক্রম না হয়। ড. জি মাইলাং বলেন, যৌন মিলনের সময় কখনও কখনও হৃদকম্পন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। রক্তের চাপও সে সময় বেড়ে যায়। এজন্য অবশ্যই নিজেকে নিজের উপর কন্ট্রোল রাখতে হবে। একজন মানুষের জীবনে কোন ক্রমেই যেন যৌনতা প্রাধান্য না পায়। আর ইসলাম এই কারণেই সর্বক্ষেত্রে এমনকি হালাল কাজেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে
স্বামীর ব্যক্তিত্বই হলো মূল ভিত্তি
ইসলাম পুরুষকে নারীর সাথে আচরণ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার জন্য দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ইমাম গাজ্জালী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইয়াহিয়া উলুমে' বলেন, মেয়েদের মন তোমার মনের মতই, যদি তাকে লাগাম ছাড়া করে দাও তাহলে সে মুক্ত বিহঙ্গের মত ছুটে বেড়াবে। আর যদি তাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে দাও তাহলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর যদি তাকে তুমি কোন কোন ক্ষেত্রে সুযোগ দাও, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তার উপরে কঠোর হও তাহলে সত্যিকার অর্থে তার উপরে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে। পুরুষের ব্যক্তিত্ব দাম্পত্য জীবনে অবশ্যই বিরাট ভূমিকা রাখে। সে যদি আদর্শবান হয়, সুখ-দুখে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়, নিজেদের সমস্যা-সমাধানে অগ্রনী ভূমিকা রাখে তাহলে সুখের সংসার গড়তে পারবে। পক্ষান্তরে যদি ভয় ভীতি, জবর-দস্তি কিংবা লাগামহীন হয় তাহলে সংসারে অশান্তি নেমে আসে। পুরুষকে খেয়াল রাখতে হবে সে যেন স্ত্রীর আজ্ঞাবহ না হয়ে যায়। সে যদি এরকম হয়ে যায় তাহলে সে তার দাম্পত্য জীবনকেই প্রকারান্তরে স্ত্রীর খেয়াল-খুশীর উপর ছেড়ে দিলো। হাসান ইবনে আলী বলেন, যে ব্যক্তি ভালোমন্দ বাছবিচার না করে স্ত্রীর কথামতো সর্বদা চলবে আল্লাহ তার মুখ মন্ডলকে আগুন দিয়ে ঝলসে দিবেন। হযরত ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মহিলাদের মতের বিরোধীতা করিও, কারণ তাদের বিরোধীতাতেই কল্যাণ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্ত্রীর গোলাম ধ্বংস হউক।
মোদ্দাকথা হলো, স্বামীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাঁধা হলো বিশেষ করে একজন দা'য়ীর জীবনে স্ত্রী। এই স্ত্রী তাকে যেমন দাওয়াতের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে আবার স্ত্রী তাকে দ্বীনের দাওয়াত থেকে ইসলামের পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রকৃত কথা হলো, দায়ীর দাম্পত্য জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান সমস্যাবলীকে চিহ্নিত করে তার সমাধান না করার কারণে। অনেকেই যৌবনের তাড়নায় বা দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকে এ বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেন না, চিন্তাও করেন না, যার ফলে পরবর্তীতে তিনি আর সঠিক পথে ফিরে যেতে পারেন না। এজন্য বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।
২য় বাঁক- দুনিয়া
পূর্বেই আমি আলোচনা করেছি যে, একজন দা'য়ীর জীবনে বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা আসবেই যদি না তিনি এ ব্যাপারে প্রতিষেধক বা বাঁচার পথ গ্রহণ না করেন। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে তিনি কি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজেকে গণ্য করবেন নাকি সমস্যা সমাধান করে দা'য়ীর ভূমিকা পালন করবেন?
দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গি
ইসলাম দুনিয়াকে পরীক্ষাগার এবং অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মনে করে। এজন্যই একে আবাদ করা এ থেকে কল্যাণ পাওয়া এবং এর ফল চয়ন করতে ইসলাম আহ্বান করেছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। দুনিয়াকেই জীবনের একেবারে মূল লক্ষ্য যেমন করা যাবে না। তেমনি দুনিয়া বিমুখও হওয়া যাবে না। এজন্য কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে এভাবে, এ দুনিয়া'তো ভোগের বস্তু আর পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাসস্থল। অন্যত্র বলা হয়েছে, এ দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকা ও প্রতারণায় না ফেলে।
বিপর্যয়ের কারণসমূহ
একজন দা'য়ীর জীবনে মূলত দুটি প্রধান কারণে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় (১) সঠিক ইসলামী পরিবেশের অভাব যা তাকে সমাজের বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা ও কলুষতা থেকে রক্ষা করবে। (২) দায়ীদের বাস্তবমুখী চিন্তাধারা বা সমাজ গবেষণাকে গুরুত্ব না দেয়া। এজন্য অনেক দা'য়ীকে দেখা যায়, নিজের জীবনে লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই গতানুগতিক ভাবেই দুনিয়ার জীবনে নিজেকে চালিয়ে নিচ্ছে। এজন্য কবিতায় বলা হয়েছে-
হে মানুষকে উপদেশ দানকারী, তুমিতো তাদেরকে অভিযোগ করো এমন বিষয়ে যে কাজে তুমি নিজেই লিপ্ত আছো। তুমিতো উপদেশ দাও অনেক বিপদ সম্পর্কে অথচ তুমি সেসব বিপদেই পতিত।
তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করছো, অথচ তুমিই দুনিয়া নিয়ে মাতোয়ারা।
আমরা অনেক একনিষ্ঠ মুখলেস দায়ীকে দেখেছি যারা দুনিয়ার জীবনকে পরিত্যাগ করে খাঁটি ইসলামী দাওয়াত দিতে গিয়ে অনেক বড় দায়ীর ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দুনিয়া নিয়ে এমন ভাবে মেতেছেন যে, একেবারেই দাওয়াত থেকে ছিটকে পড়েছেন। দুনিয়ার জীবন নিয়ে মত্ত হয়ে পরকালকে ভুলে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন- যে বিরুদ্ধাচরণ করলো এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিল তার শেষ ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে, তাঁর রবের অবস্থান কে ভয় করলো এবং নিজের জীবনকে কু-প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখলো তার ঠিকানা হবে জান্নাতে।
ইসলামে গঠনপ্রক্রিয়া
মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য দুটি পথ খোলা রয়েছে, যেন সে মানবতার পূর্ণতায় পৌঁছতে পারে। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুধাবন করে নিজেকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
প্রথমতঃ তার সামনে আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থানকে বর্ণনা করা হয়েছে, তুলে ধরা হয়েছে আল্লাহর কাছে পরকালের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থান এবং এর মাঝে যোজন যোজন পার্থক্যের কথা এবং দুনিয়ার ফিৎনার কথা। “বলুন, দুনিয়ার উপকরণ পরকালের তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প আর পরকাল হচ্ছে উত্তম মুত্তাকীদের জন্য।” এব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য যেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাহলো, তিনি একদিন তার সাহাবীদেরকে নিয়ে পথ চলছিলেন, দেখলেন একটা মরা ছাগল পড়ে আছে। তিনি বললেন, তোমরা কি লক্ষ্য করেছো এটি তার মালিকের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তারা বললেন, আর এজন্যই তাকে রাস্তার ধারে ফেলে দিয়েছে। তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে এই দুনিয়া এই মরা ছাগলের চাইতেও মূল্যহীন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) একদিন তাকে বলেন, আবু হুরায়রা তোমাকে কি আমি এই দুনিয়ার আল্লাহর নিকট কত মর্যাদা তাকি দেখিয়ে দিবনা? আমি বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল (সা.) তার হাত ধরে তাকে মদিনার উপকণ্ঠে এক ময়লা ফেলার আবর্জনার কাছে নিয়ে গেলেন, সেখানে দেখা গেল বিভিন্ন হাড়-গোড়, ছেড়া কাপড়-চোপড়, ময়লা আবর্জনা পড়ে আছে। অতপর তিনি বললেন, এই হাড়-গোড় আজকে এখানে পড়ে আছে এর কোন মূল্য নাই। যারা দুনিয়ার পিছনে ছুটেছে সেই দুনিয়ার মূল্য এই সব নোংরা আবর্জনার মতই। কেউ যদি দুনিয়া নিয়ে কাঁদতে চাও, তাহলে কাঁদো। এ কথা শুনে জোরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম।
দ্বিতীয়তঃ ইসলাম দুনিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে নিষেধ করেছে। দুনিয়া যেন মানুষের কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত না হয় তার জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রকে ভয় পাইনা, কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে তোমাদের জন্য দুনিয়াকে খুলে দেয়া হবে, তোমরা দুনিয়া নিয়ে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির মতো দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। তাদেরকে যেমন দুনিয়া প্রীতি ধ্বংস করেছিল তেমনি তোমাদেরকেও ধ্বংস করে দিবে। কারণ দুনিয়া প্রীতি লোভ-লালসা ও আত্ম-প্রীতি সৃষ্টি করে। তিনি বলেছেন, দুনিয়া পাওয়াই যার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে, আল্লাহ তাঁর অন্তরে চারটি বিষয় অপরিহার্য করে দিবেন। এ থেকে সে মুক্ত হতে পারবে না। তার আশা- আকাংখার কোন শেষ হবে না। সে সব সময় কাজে লেগে থাকবে সামান্যতম ফুরসত পাবে না। আর তার মনে সব সময় চাওয়া-পাওয়ার আকাংখা থাকবে সে কখনও পরিতৃপ্ত হবে না। আর তাঁর টাকা-পয়সার অভাব অনটন মনে হয় কোন সময় দূর হবে না।
তৃতীয়তঃ ইসলাম সতর্ক করেছে দুনিয়া প্রীতি আমাদের অন্তরে চেপে না বসে যা তাকে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে বাধাগ্রস্ত করবে। এ জন্য দুনিয়া থেকে পরহেজ করে চলতে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং নফসকে এর কাছে বন্দী না করতে বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলন, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবাসবে এবং তাকে নিয়ে খুশী থাকবে তার অন্তঃকরণ থেকে পরকালের ভয় বিদূরিত হয়ে যাবে।”।
দুনিয়ার পরহেজগারীর ব্যাপারে ইসলামের দর্শন হল- তা যেন মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় এবং দুনিয়ার প্রতিষ্ঠা পরিত্যাগ না করায় যেমনটি কিছু কিছু মানুষ মনে করে থাকে। বরং উদ্দেশ্য হল নফসকে দুনিয়া পূজা থেকে হেফাজত করা। নবী করীম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল প্রকৃত পরহেজগারী সম্পর্কে। তিনি বলেন, সেটি হালালকে হারাম করা নয় এবং ধন-সম্পদকে বিনষ্ট করাও নয়। বরং দুনিয়ার পরহেজগারী হল তোমার নিকট আল্লাহর দেয়া জিনিস নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট থাকবে।" ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হয়, একজন মানুষ পরহজেগার হবে আর তার নিকট এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাও থাকবে এটি কি হতে পারে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল- পরহেজগারীর নিদর্শন কি? তিনি বললেন, এর আলামত হল- যদি সম্পদ প্রয়োজনের চেয়ে বেশী হয়, তাহলেও প্রফুল্য হবে না। আর এ চেয়ে কমে গেলে সে চিন্তিত হবে না....। আজকে দা'য়ীরা এক বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। তাদেরকে দুনিয়া আস্তে আস্তে নীচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কামনা-বাসনার পিছনে ছুটতে গিয়ে প্রথমে সগীরায় লিপ্ত হচ্ছে এরপর কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়ছে। এই দুনিয়া তার চাকচিক্য দিয়ে সবাইকে বিভান্ত করছে এজন্য এব্যাপারে কোনরকম শৈথিল্য দেখানো যাবে না। যে ব্যক্তি শৈথল্য দেখাবে তার ঈমান বিনষ্ট হয়ে যাবে, ঈমান কলুষিত হয়ে যাবে। নবী মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (সা.) অতিসত্যকথা এভাবে বলেছেন- "আমার পরে তোমাদের নিকট দুনিয়া এমনভাবে আসবে যে তোমাদের ঈমানকে খেয়ে ফেলবে যেমন আগুন লাকড়িকে খেয়ে ফেলে।"
সুতরাং দা'য়ীকে আকাশের আযাবের চাবুক থেকে বাঁচতে হলে, তাকে জীবনের বাঁকগুলো সতর্কতার সাথে পেরুতে হবে। "যারা দুনিয়ার জীবনকে পরকালের বিনিময়ে ক্রয় করে নেয় তাদের জন্য পরকালের আযাব সামান্যতম হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে কোনরকম সাহায্যও করা হবে না।" (সূরা বাকারা: ৮৭)
চতুর্থতঃ ইসলাম উৎসাহিত করেছে যেন দুনিয়া আবাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয় এতে কাজ করা, এর গুপ্তধন আবিস্কার করা, এর সম্পদ আহরণ করা, এর কল্যাণ থেকে উপকৃত হওয়া, এতে ইনসাফ কায়েম করা, সত্যের অনুসরণ করা। ইসলামের দৃষ্টিতে তার কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই যে এই মাপকাঠির বাইরে চলেছে সে যত জ্ঞানীই হোক না কেন। কারণ, তা অবশ্য এই দুনিয়া ধ্বংস করার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কুরআন মজীদে এ বিষয়টিকে অতি চমৎকার ভাবে বিবৃত করা হয়েছে-
"যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনের চাকচিক্যকে ভালবাসবে তাকে তার কাজ পুরাপুরিই দেয়া হবে, এতে সামান্যতম ঘাটতি করা হবে না। এরা হল সেসব লোক যাদের পরকালে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নাই। তারা যা করেছে তা সবই বাতিল এবং তাদের সব কর্মই বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (সূরা হুদ: ১৫)
ইসলামে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ
ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তি গঠনের থিউরী দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং বাস্তবে এর রূপরেখা প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক কর্মনীতি ও বাস্তব প্রয়োগ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। যদি কেউ রাসূলের যুগে ব্যক্তি গঠনের বাস্তব নমুনার দিকে নজর দেয় তাহলে সে দেখতে পাবে এব্যাপারে তারবিয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি। রাসূল (সা.) মক্কায় দারুল আরকামে শুধুমাত্র তাঁর অনুসারীদেরকে ইসলামী দীন ও দাওয়াতের শিক্ষাই দেননি বরং তাদেরকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিলেন যেন জাহেলী সমাজের সাথে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের কৃষ্টিকালচার থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার বিভিন্ন অঙ্গনে প্রচলিত জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আর এর আগাগোড়া উদ্দেশ্যই হল আল্লাহর জীনের তাঁর ইবাদত কায়েম করা এবং তাঁর বিধানের নিকট মাথা নত করা, তাঁর নির্দেশের বাস্তবায়ন করা। তাঁদের চোখে দুনিয়া একেবারেই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। দুনিয়ার কোন কিছুই তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি এর ফিতনা-ফাসাদ। তাঁদের শত্রুরা পর্যন্ত তাদেরকে এভাবে চিত্রিত করে, "এরা মৃত্যুপাগল জাতি, এদের নিকট দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মৃত্যু শ্রেয়। এরা দুনিয়াবিমুখ। এরা মাটির উপরে বসে আর সওয়ারীর ওপর বসেই খাওয়া-দাওয়া সারে।"
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন ধনীর দুলাল, মায়ের একমাত্র সন্তান। মক্কার প্রত্যেকটি মেয়েই তাকে জীবন সাথী হিসেবে কামনা করত। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তার মা তাকে হুমকি দেন যে তাকে তিনি ধন-সম্পদ থেকে বঞ্চিত করবেন। তিনি এতে কোন ভ্রুক্ষেপই করেন নি। এরপর তার মা কসম করেন যে, সে ইসলাম ত্যাগ না করলে কোন খানাপিনা স্পর্শ করবেন না। এতে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, "আল্লাহর শপথ, হে আমার 'সাম্মা'! যদি আপনার শরীরে একশটি প্রাণ থাকত আর একটি করে তা বের হয়ে যায় তবুও আমি মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করব না।” যারা তাকে চিনত তারা দেখল যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি মক্কার অলি-গলিতে যখন হাঁটতেন তখন তার গায়ে থাকত পুরাতন জরাজীর্ণ কাপড়।
হিজরত ছিল মুসলমানদের ব্যক্তি গঠনে বাস্তবিক এক কর্মপন্থা। এতে তাদের সহায়-সম্পত্তি সবকিছু ত্যাগ করে, নিজ দেশ ছেড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে, আত্মীয়-স্বজন পরিত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান বিদেশ- বিভুয়ে। তারা হিজরতে সাড়া দিয়ে আল্লাহর পথে সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে, সবস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন।
বর্ণিত আছে- যখন সুহাইব আর-রুমী (রা.) হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন তখন মক্কার কুরাইশরা তার পথ রোধ করে দাঁড়ায় এবং বলে, তুমিতো এখানে এসেছিলে খালি হাতে, আজ তুমি আমাদের বদৌলতে অনেক টাকাপয়সার মালিক হয়েছ, এখন তুমি টাকাপয়সা নিয়ে ও তোমার প্রাণ নিয়ে আমাদের এখান থেকে যাবে তা হতে দিব না। তখন সুহাইব আর-রুমী বলেন, যদি আমি আমার টাকা পয়সা তোমাদের হাতে তুলে দেই তাহলে কি তোমরা আমার পথ ছেড়ে দিবে? তারা বলল, হ্যা। তিনি বলেন, আমি আমার টাকা পয়সা সব তোমাদের হাতে ছেড়ে দিলাম। একথা যখন রাসূল (সা.) জানতে পারলেন তখন তিনি বললেন, "সুহাইব লাভবান হয়েছে, সুহাইব লাভবান হয়েছে।"
এভাবেই দা'য়ীদের জীবনে ইসলাম গেড়ে বসেছে, তাদের দৈনিন্দন জীবনে, তাদের উঠাবসা ও চলাফেরায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। আর এসবই তাদেরকে তাদের জীবনের বাঁকগুলো অতিক্রম করতে সহায়তা করেছে, বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গাতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
আজকে ইসলামী দাওয়াত ও অন্দোলনের দা'য়ীদের বাস্তব কর্মনীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। তারা যেন তাদের জীবনের দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলেন, তারা নিজেদেরকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মুকাবিলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখেন প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগান..... "যারা আমাদের জন্য প্রাণপন সংগ্রাম করবে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের দিশা দিব এবং নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সাথে রয়েছেন।" (সূরা আনকাবুত : ৬৯)
📄 দাওয়াতী কার্যক্রম বুঝা ও বাস্তবায়ন করা
... আমার মতে নিজের উপর একজন দা'য়ীর দায়িত্ব অনেক বেশী, সমাজের ওপর তার যে দায়িত্ব রয়েছে তার চেয়েও অনেক অনেক বেশী ....। দা'য়ীর নিজের ব্যাপারে শৈথিল্য দেখানো খুবই বিপজ্জনক, এই বিপজ্জনকতা তার জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখানোর চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশী। দা'য়ীকে অবশ্যই সমাজে কুদওয়া বা অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে যেখানে সে বসবাস করছে ... সে নিজের জীবনেই বাস্তবায়ন করবে রেসালাতের বৈশিষ্ট্য যার দিকে সে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছে।.. তার প্রতিটি পদক্ষেপে সে তার আদর্শের প্রতিফলন ঘটাবে... এরফলে তার আশে-পাশে ববাসরত লোকজন তার চালচলনের মাঝে দেখতে পাবে দীনকে, তার প্রতিটি অঙ্গ পরিচালনায় ফুটে উঠবে দীনের বৈশিষ্ট, তার মাঝে যেন কোন বৈপরিত্য পরিলক্ষিত না হয়। কুরআনুল কারীম সেসব লোককে তিরস্কৃত করেছে যারা মানুষকে উপদেশ দেয় অথচ সে নিজে তা গ্রহণ করে না, লোকজনকে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলে অথচ সে নিজে বিরত থাকে না। "তোমরা কি মানুষকে নেক কাজের আদেশ দাও আর নিজেদেরকে এব্যাপারে ভুলে যাও? তোমরাতো কিতাব পাঠ কর, তোমরা কি বিষয়টি বুঝ না?” (সূরা বাকারা : ৪৪)
"হে ঈমানদারগণ! কেন তোমরা বল সেসব কথা যা তোমরা কর না। আল্লাহর নিকট জঘন্যতম গুনাহের কাজ হল যা তোমরা বল, অথচ তা কর না।" (সূরা সফ : ২) এজন্য দা'য়ীর প্রথম কাজ হল প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করা....। সঠিক ধারণা ... ইসলামকে সঠিকভাবে, গভীরভাবে জানতে হবে তার মূল উৎস থেকে... কুরআনে কারীম, সহীহ হাদীস এবং নবীর পবিত্র সীরাত থেকে ... এরপর বর্তমান ইসলামী সাহিত্যের বই-পুস্তকের ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে যেন তার নিকট ইসলামের সঠিক চিত্র ফুটে উঠে, এর বিধি-বিধান, বৈশিষ্ট্য, আকিদা-ইবাদত সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করে, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সক্ষম হয়। .... দা'য়ীকে নবী-রাসূলদের জীবনী সম্পর্কে, তাদের জীবনের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে অবহিত হতে হবে, তাদের ধৈর্য এবং বলিষ্ঠতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। তাদের জিহাদ, মুয়ামালাত, চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।
কুরআনের প্রতি তার বিশেষ গুরুত্ব থাকবে এভাবেঃ সেটি হবে তার অন্তরের বসন্ত কাল, তার দৃষ্টিশক্তির জন্য নূর এবং জীবনচলার কর্মসূচি... কুরআনের আয়াত পাঠকালে তার মনে হবে যেন এখনই তার ওপর ওহী নাযিল হচ্ছে এবং তাকে উদ্দেশ্য করেই ... তাকেই সম্বোধন করা হচ্ছে.... এভাবেই এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে এর গভীরে পৌঁছা সম্ভব হবে, এর দ্বারা প্রকৃত ফায়েদা হাসিল হবে।
একজন দা'য়ীর অন্তঃকরণ ততটুকুই সঠিক হবে এবং তারমধ্যে দৃঢ়তা আসবে, তার জীবনচলা সঠিক হবে যে পরিমাণ সে কুরআন অধ্যয়ন করবে এর গভীরতায় পৌছবে, দীনের প্রজ্ঞা তার মাঝে আসবে। নবী করীম (সা.) একথাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর বাণীতেঃ "আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের সঠিক সমঝ দান করেন।" তিনি আরো বলেন, "মানুষ হল খনির মত, জাহেলিয়াতে যারা উত্তম, ইসলামেও তারা উত্তম যদি সঠিকভাবে (ইসলাম) বুঝে থাকে।" ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ হল বৃষ্টি ভেজা মাটির মত .... এরমধ্যে কিছু এমন আছে যা না কোন উপকারে আসে আর না কোন উপকারে লাগে।
রাসূল (সা.) এর একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন এভাবে- "আমাকে আল্লাহ যে হেদায়েত ও জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হল- মুষলধারে বৃষ্টির মত যা জমিনে বর্ষিত হয়। এরমধ্যে আছে সরস জমি যা পানি গ্রহণ করে, যা থেকে প্রচুর ঘাস-পালা ও ফসল উৎপন্ন হয়।... আর কিছু হল ডোবা যা পানি ধারণ করে, আল্লাহ তা থেকে মানুষকে উপকৃত করেন, এর পানি পান করে, পানি দিয়ে ফসল ফলায়, আর কিছু আছে শুষ্কভূমি যা পানিও ধারণ করে না আর তাতে কোন কিছু উৎপন্নও হয় না। এ হল তার উদাহরণ যে আল্লাহর দীনের সমঝ পেল, আমি যা নিয়ে এসেছি তা থেকে নিজে উপকৃত হল, নিজে শিখল অন্যকে শিখালো ... আর কতক এমনও আছে যে, মাথা তুলে চাইল না, আল্লাহর হেদায়েত যা আমি নিয়ে এসেছি গ্রহণ করল না।"
দা'য়ীকে সচেষ্ট হতে হবে যেন সে অল্প বয়স থেকেই ইসলাম শিক্ষার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে, বিভিন্ন ব্যস্ততার সাথে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই জ্ঞান আহরনে লিপ্ত হয়। মুলাহ্হাব এর প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হোন, যিনি তার সন্তানদেরকে উপদেশ দেন এই বলে, "তোমরা সমাজের নেতৃত্ব দেয়ার পূর্বেই জ্ঞানার্জন করে নাও। নেতৃত্ব যেন তোমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।”
জ্ঞানার্জন ও তার বাস্তব প্রয়োগ
একজন দা'য়ীর যেমন সঠিক জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, তাকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে হবে, তেমনিভাবে তাকে এর বাস্তব প্রয়োগ ও প্র্যাকটিস করতে হবে, নিজের কাজকর্মে, চরিত্রে-চিন্তায়, সে যেন বাস্তবে ইসলামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলে...।
দা'য়ী যেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে ইসলামকে ফুটিয়ে তুলে... জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, কথায়, কাজে, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সর্বত্র। বাড়ীতে স্বামী বা পিতা বা ভাই হিসেবে, সমাজে কর্মচারী বা মালিক কিংবা অফিসার হিসেবে। এ বিষয়টির প্রতি জোর দিয়ে আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বলেন, "যে ব্যক্তি নিজেকে নেতার আসনে বসিয়েছে সে যেন অন্যকে শিক্ষা দেয়ার পূর্বে নিজে শিক্ষা নেয়, নিজের চাল-চলনকে পরিশুদ্ধ করে নিজের জিহ্বাকে পরিশুদ্ধ করার পূর্বেই। অন্যকে পরিশুদ্ধ করা ও শিক্ষাদানের বেলায় অবশ্যই নিজেকে সার্বগ্রে পরিশুদ্ধ করতে হবে।"
যারা নিজেরা উপদেশ গ্রহণ করে না অথচ অন্যকে উপদেশ দেয়, নিজেরা সঠিক পথে চলেনা কিন্তু অন্যকে ওয়াজ করে, এরাতো মানুষের নিকট হাসি-ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত হয় আর মহান আল্লাহর ক্রোধ ও গযবে নিপতিত হয়। আর এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ও মহা ক্ষতি। শা'আবী থেকে বর্ণিতঃ "কিয়ামতের দিন একদল জান্নাতী :কদল জাহান্নামীর দিকে চেয়ে বলবে, তোমাদেরকে কি জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে? আমরাতো তোমাদের দেয়া শিক্ষা ও আদব- কায়দার সুবাদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পেরেছি! তখন তারা বলবে, আমরা তোমাদেরকে ভালর নির্দেশ দিতাম কিন্তু আমরা নিজেরা তা করতাম না। আর তোমাদেরকে মন্দ কাজের নিষেধ করতাম আর আমরা সেটা নিজেরা করতাম।”
এজন্য একজন দা'য়ীকে নিজের ব্যাপারে কঠিন হিসাব-নিকাশ করতে হবে। নিজেদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন মহান আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে পারে। বর্ণিত আছে যে, মহান আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে বলেন, "হে মরিয়ম তনয়! তুমি নিজের নফসকে উপদেশ দাও, তুমি সর্বাগ্রে নিজে উপদেশ গ্রহণ কর, এরপর তুমি মানুষকে উপদেশ দিও, নতুবা তুমি আমার নিকট লজ্জিত হবে।"
প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার মাঝে
দা'য়ীকে অবশ্যই সদা তৎপর থাকতে হবে নিজের গোপনীয় বিষয়গুলিকে সঠিক রাখার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিষয়কে সঠিক রাখার চেয়েও। তার অবিরত চেষ্টা থাকবে গোপনীয় বিষয়কে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য। আর সবচেয়ে ভাল হয় যদি এ দু'টি বিষয়ই পরিচ্ছন্ন থাকে। দা'য়ী নিজের ব্যাপারে সদা তৎপর থাকে। সে যেন নিজেকে ধোকা না দেয়, মানুষকে ধোঁকা না দেয়। সে যেন তাদের সাথে মুনাফেকীর আচরণ না করে, রিয়া না করে। প্রত্যেক দা'য়ী যেন এব্যাপারে শুনে নেয় প্রখ্যাত দা'য়ী ইবনে সাম্মাকের বাণী। তিনি বলেন, "অনেক লোক রয়েছে যারা মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় অথচ নিজেরা আল্লাহকে ভুলে থাকে, আল্লাহর নিকট থেকে দূরে রয়েছে। আর এমন অনেক লোক রয়েছে যে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকে অথচ সে আল্লাহ থেকে পলায়নপর, আর এমন অনেক লোক রয়েছে যে, কুরআন তিলাওয়াত করে অথচ কুরআনের আয়াত থেকে, তার নির্দেশাবলী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।"
অতএব দা'য়ীকে একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করতে হবে, মানুষকে নয়, তাঁরই উদ্দেশ্যে নিজের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়কে সঠিক ও সুন্দর করতে হবে। তার বাহিরটা যেন ফেরেশতা আর ভিতর বা অপ্রকাশ্যটা যেন শয়তান না হয়। সে যেন সতর্ক থাকে সেসব লোক থেকে যাদেরকে আল্লাহ তিরস্কৃত করেছেন তাঁর এ বাণীতেঃ "তারা মানুষের কাছ থেকে নিজেদেরকে গোপন করতে চায়, আর আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে লুকাতে চায়না, অথচ তিনি তাদের সাথেই রয়েছেন।” (সূরা নিসা : ১০৮) তাকে স্মরণ রাখতে হবে, আল্লাহ তার অতি নিকটে, তিনি তার সবকিছুই দেখছেন এবং তার শলাপরামর্শ, কানাকানিও জানেন। "তারা তিনজনে কানাকানি করলে আল্লাহ রয়েছেন চতুর্থ হিসাবে, আর চারজন হলে আল্লাহ হচ্ছেন পঞ্চম এবং পাঁচজন হলে আল্লাহ হচ্ছেন ষষ্ঠ, এর চেয়েও কম বা বেশী হলেও তিনি তাদের সাথেই আছেন। অতপর তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন সংবাদ দিবেন যা তারা করেছিল। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবহিত।” (সূরা মুজাদালাহঃ ৭)
রাবেয়া বসরীর প্রতি আল্লাহ রহম করুন, তিনি বার বার একথা আওড়াতেন- যদি আমাকে আমার রব বলেন- তোমার লজ্জা করেনি আমার অবাধ্য হতে তুমি আমার বান্দাদের থেকে গুনাহকে লুকাতে চেষ্টা করতে অথচ করতে আমার বিরুদ্ধাচরণ তখন আমি কি জবাব দিব যখন আমার হিসাব নেওয়া হবে, আমার বিচার করা হবে?
মোদ্দাকথা হল, দা'য়ীর প্রতি তার সামাজিক দায়-দায়িত্ব যেন তাকে তার নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন না করে দেয়, লোকজনকে সঠিক ও ভাল করতে গিয়ে নিজের এবং যাদের সঠিক করা নিজের ওপর ওয়াজিব সেগুলো যেন ভুলে না যায়, সে ব্যাপারে যেন উদাসীন না হয়ে পড়ে।
📄 দিক নির্দেশনা ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব
আমার মনে হয় বর্তমানে ইসলামী সংগঠনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সাংগঠনিক সমস্যা। আমি এ কথা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, দা'য়ী, বক্তা কিংবা আলোচক নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয় সাংগঠনিক দিকে। এতে অল্পসংখ্যক দা'য়ী ব্যতীত অনেকেই পড়েন বিপাকে। এমনকি কেন্দ্রীয়ভাবে দা'য়ী নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রেও জ্ঞানগত দিকের চেয়ে সাংগঠনিক দিকটাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এরফলে অনেকেই নিজেকে সর্বক্ষেত্রে যোগ্য মনে করেন, জ্ঞানী-গুণীজনকে তারা তেমন গুরুত্ব দেন না। অন্যকে তেমন সমীহের দৃষ্টিতে না দেখার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছেন। এধরনের অনেক ঘটনা ঘটলেও এর প্রতিকারের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
নেতৃত্বের গুরুত্ব
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কোন আন্দোলন সফল হবার জন্য সংগঠনের গুরুত্ব অনেক বেশী। অনেক রাজনৈতিক ও দলীয় আন্দোলন সফল হয়েছে সঠিক নেতৃত্ব ও সূক্ষ পরিকল্পনার কারণে। আবার অনেক ভাল ভাল সংগঠন ও আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে অনিয়মতান্ত্রিকতা ও বিশৃংখলার কারণে।
ইসলাম প্রকৃতিগতভাবেই অনিয়ম ও বিশৃংখলাকে বরদাশত করে না। পৃথিবীর বুকে ইসলাম ব্যতীত এমন কোন জীবন বিধান নেই যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যাপারে এত সূক্ষ নিয়ম-নীতি ও বিধি-বিধানের ব্যবস্থা দিয়েছে।
বর্তমানে ইসলামী আন্দোলনরত দলগুলি বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক সংকটে রয়েছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সময় নষ্ট হচ্ছে কাংখিত ফললাভ হচ্ছে না। আর এসব কারণেই সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহের গুরুত্ব অত্যধিক বেশী হয়ে দেখা দিয়েছে।
নেতৃত্ব কি?
নেতৃত্ব হল মানুষকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পরিচালিত ও প্রভাবিত করার লক্ষ্যে তার প্রকৃতির সাথে আচরণ ও তার চরিত্রের ওপর প্রভাব সৃষ্টি ও দিক নির্দেশনার কলাকৌশলের নাম যেন তার নিকট থেকে আনুগত্য, সম্মান ও আস্থা লাভ করে। নেতৃত্ব সফল হবার জন্য নির্দিষ্ট কিছু গুণাবলী তার মধ্যে থাকতে হবে বা অর্জন করতে হবে। নেতৃত্বদানকারীর বিশেষ ব্যক্তিচরিত্র, সাংগঠনিক যোগ্যতা, শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা থাকতে হবে।
যে কোন আন্দোলন বা সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হল স্পর্শকাতর স্থান। যদি কেন্দ্রে নেতৃত্বের পর্যাপ্ত গুণাবলী না পাওয়া যায় তাহলে দেখা দিবে টালমাটাল অবস্থা চিন্তা বা চালিকা শক্তির ক্ষেত্রে। কেননা আন্দোলনের কথা বলা বা আলোচনা করা আর সংগঠন পরিচালনা করা এক কথা নয়।
দাওয়াতও এমন একটি পরিপূর্ণ যন্ত্র যার সঠিক পরিচালনা, দিক নির্দেশনা ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা সাংগঠনিক ও পরিকল্পনা মাফিক না হলে সম্ভব হবে না।
পরিচ্ছন্ন মনমানসিকতা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি
নেতাকে অবশ্যই উদার মনের অধিকারী হতে হবে। তাকে ব্যক্তি স্বার্থ থেকে শুরু করে সবকিছুর উর্ধে উঠে একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজের কোন ব্যক্তি স্বার্থ যেন তার দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। সব কিছুই নিঃস্বার্থ ভাবে করতে হবে। অন্যের কাজকর্মকেও খোলা মনে নিতে হবে। কারণ, আল্লাহ পাক নিষ্ঠা ও আন্তরকিতা বিবর্জিত কোন কাজ গ্রহণ করেন না। মহান আল্লাহ বলেন, "তাদের কর্মকে যা তারা করেছিল ধূলিকনার মত নিক্ষেপ করে দিয়েছি।” নিষ্ঠাবিহীন কাজ আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হবে না। এজন্য সর্বদা আল্লাহকে হাযির নাযির জেনে পরকালের কথা, জান্নাত জাহান্নামের কথা কবর হাশরের কথা চিন্তা করতে হবে। রাতের অন্ধকারে মেকায়মনে বাক্যে আল্লাহর নিকট ধরনা দিতে হবে। "নিশ্চয় রাতের জাগরণ খুবই শক্তিবর্ধক ও স্থায়ীকর্ম সহায়ক।”
শারীরিক সুস্থতা ও শক্তিসামর্থ থাকা
নেতাকে শারীরিকভাবে সুস্থ ও শক্তসামর্থবান হতে হবে। কেননা একজন শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট একজন দুর্বল মুমিন হতে বেশী পছন্দনীয়। দাওয়াতের বোঝা ও দায়িত্ব একজন দুর্বল প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যগতভাবে দুর্বল ব্যক্তি বহন করতে সক্ষম হবে না।
নেতৃত্বের কেন্দ্র হল সর্বদা চিন্তাভাবনা ও অব্যাহত কর্মসম্পাদন এবং অবিরাম সংগ্রাম পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এর বিভিন্ন শাখা প্রশাখা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মত। যদি শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সুস্থসবল ও কর্মক্ষম এবং কর্মচঞ্চল না থাকে তাহলে মানুষ যেমন সঠিকভাবে তার দায়িত্ব ও কর্মসম্পাদনে সক্ষম হয় না তেমনি ভাবে সংগঠন বা দাওয়াতী কার্যক্রমও আঞ্জাম দেয়া সম্ভবপর হবে না।
চিন্তার খোরাক এবং মানসিক শক্তির প্রয়োজন
মানুষের যেমন খাদ্যের প্রয়োজন রয়েছে তেমনি চিন্তার খোরাকেরও দরকার আছে যা তার চিন্তা শক্তিকে শানিত করবে এবং পরিপক্কতা এনে দিবে। নেতাকে অবশ্যই বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। কেউ যেন একথা না বলে যে, আমরা শুধুমাত্র ইসলামী সাংস্কৃতির ওপরই নির্ভর করব অন্য কোন সংস্কৃতি জানার প্রয়োজন নেই। একথা অতীতে মেনে নেয়া গেলেও বর্তমানে এটা কোনক্রমেই গ্রহণীয় হতে পারে না। আজ চিন্তার বিভিন্নতা, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকালচারের ব্যাপকতা ও প্রসার ঘটেছে। যদি নেতা বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত না থাকেন তাহলে তিনি বর্তমান দৈনন্দিন ঘটনাবলীর ব্যাপারে সঠিক মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হবেন। ফলশ্রুতিতে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সঠিক নির্দেশনা প্রদানে অপারগ হবেন যা দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিরুপ ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নেতৃত্বের অপরিহার্য গুণাবলী
এক. দাওয়াতের সঠিক জ্ঞান
নেতাকে তার নিজের দাওয়াত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকতে হবে, সঠিক ধ্যানধারনা রাখতে হবে। চিন্তার জগতে তার থাকবে সদাসর্বদা দাওয়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, এর সাংগঠনিক ও কর্মতৎপরতা কোথায় কি অবস্থায় চলছে, কি নির্দেশনা কোথায় দিতে হবে ইত্যাদি।
নেতৃত্ব ও এর পরিচালনা তখনই সার্থক হবে যখন নেতা ও কর্মী, দাওয়াত ও দা'য়ী একই চিন্তার ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করবেন। সাধারণ একজন কর্মীর সাথে যেমন থাকবে যোগাযোগ তেমনি দায়িত্বশীলদের সাথেও সবাসর্বদা যোগাযোগ রাখতে হবে। একই চেইন অব কমান্ডে সকলকে নিয়ে আসতে হবে।
দুই. নিজেকে জানতে হবে
নেতাকে অবশ্যই তার নিজের শক্তির উৎস ও দুর্বলতার স্থান সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। দায়িত্বশীল যদি নিজের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল না থাকেন তাহলে হয়ত দেখা যাবে তিনি লাভের পরিবর্তে ক্ষতি বা বিপর্যয়ই ডেকে আনবেন।
এজন্য অবশ্য করণীয় হল:
ক. দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে তা সঠিক ও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
খ. শক্তির উৎসগুলো খুঁজে বের করে তা আরো বৃদ্ধি ও কার্যকর করে তোলা।
গ. সাধারণ শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা এবং বিভিন্ন বিষয় ও মতের ওপর রাজনৈতিক বিভিন্ন মতাদর্শের সম্পর্কে, অর্থনৈতিক বিষয়াবলী সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে।
ঘ. ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে ব্যাপক স্টাডি করা এবং বিভিন্ন মতাদর্শের নেতৃত্বের ব্যাপারে সঠিক ধারণা রাখা। তাদের কর্মপন্থা সম্পর্কে এবং তাদের কার্যক্রম কেন সফলতা লাভ করছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
তিন. নিরলস তত্ত্বাবধান
নেতাকে তার অধীনস্থ লোকদের সাথে আন্তরিকতার সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে, তাদের ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে অবগত থাকতে হবে তাদেরকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করতে হবে। এরফলে তাদের সাথে গভীর সম্পর্ক যেমন গড়ে উঠবে তেমনি তাদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করা সম্ভব হবে।
চার. অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব অর্জন
জনগণ সর্বদা তার নেতাকে দেখে থাকে উত্তম অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তাঁর কাজকর্ম, চাল-চলন, আচার-আচরণের অনুকরণ করে থাকে। নেতার চরিত্রের প্রভাব পড়বে সংগঠনের ওপর, এর কর্মীদের ওপর। নবী করীম (সা.) ছিলেন অনুকরণে ক্ষেত্রে এক উত্তম আদর্শ। "অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাবঃ ২২) নবীর সাহাবীরা ছিলেন একেক জন হেদায়েতের আলোকবর্তীকা। তাঁদেরকে মহানবী (সা.) এভাবে চিত্রিত করেছেন, "আমার সাহাবীরা নক্ষত্রের ন্যায়, তোমরা তাঁদের যারই অনুসরণ করবে, সঠিক পথের দিশা পাবে।”
পাঁচ. দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া
নেতৃত্বকে গভীর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে যেন সে যে কোন সমস্যা বা ঘটনাবলী কিংবা ব্যক্তি সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। যদি নেতৃত্ব সমস্যা বিশ্লেষণে দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দাওয়াতের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন, ধৈর্যশীল অটল, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিকে যখন তার সামনে সন্দেহপ্রবন বিষয় এসে উপস্থিত হয় এবং যখন তার সামনে লোভ লালসা হাতছানি দেয়।
ছয়. শক্তিশালী প্রশাসন/দক্ষপরিচালনা শক্তি
নেতার মধ্যে যদি এই গুণ পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই বিনা খরচে তিনি বিভিন্ন শ্রেণীর পেশাজীবী থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায়ের লোকজনকে কাছে টানতে পারবেন এবং তাদের উপরে নেতৃত্ব পরিচালনা করতে পারবেন।
সাত. আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব
নেতাকে অবশ্যই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। তিনি যেন তাঁর ব্যক্তিত্ব দ্বারা অন্যকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে পারেন। তিনি যেন অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হন।
আট. সু-ধারণা বা শুভফল আশা করা
নেতৃত্বের জন্য যে কোন ব্যাপারে শুভ ফল আশা করা বিশেষ এক গুণ সে যেন যে কোন কাজের ব্যাপারে শুভ ফল লাভের আশা রাখে, তাকে যেন কোন হতাশা গ্রাস করতে না পারে। হতাশা এমনই এক বিধ্বংসী উপকরণ যা ব্যক্তি বা দলকে বিপর্যয়ে ফেলে দেয়।
নেতৃত্ব হলো কাফেলার মূল। সে যদি শুভ ধারণা করে তাহলে অন্যরাও প্রত্যাশী হয়ে উঠে আর তার মাঝে যদি হতাশা বিরাজ করে তাহলে পুরো দলই হতাশায় নিমজ্জিত হয়, এই জন্য সর্বক্ষেত্রে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে জিহাদের ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ বলেন, "তোমরা অব্যাহত জিহাদ সংগ্রাম করতে থাক, যেন কোন ফেৎনা না থাকে এবং সর্বত্র আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয়।” অতীতের ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই বাতিলের বিরুদ্ধে অব্যাহত জিহাদ ও সংগ্রাম, নবী-রসূলদের বলিষ্ঠ ও অটল ভূমিকা... নবী করীম (সা.) তাঁর দাওয়াত পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন জুলুম নির্যাতন এবং কূট ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এগিয়ে গেছেন। কোন হতাশাই তাঁর ধারে কাছে ঘেষতে পারেনি। মুনাফেকদের কুটিল ষড়যন্ত্র কাফেরদের অব্যাহত আক্রমণ তাঁকে এতোটুকুও বিচলিত করতে পারেনি। আহযাবের যুদ্ধে এক কঠিনতম চিত্রের বর্ণনা আমরা পবিত্র কুরআনে দেখতে পাই। "যখন মুমিনেরা সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো তখন তারা বলেছিল- এতো হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সেই ওয়াদা, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমানই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁরা বিষয়টিকে মাথা পেতে নিয়েছেন। মুমিনদের মধ্যে কতিপয় এমন পুরুষ রয়েছেন, যারা তাদের আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদাকে পরিপূর্ণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউবা জীবন দান করেছেন, আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ এর জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা নিজেদের অঙ্গীকার পরিবর্তন করেন নি।" (সূরা আহযাবঃ ২২-২৩)
ইসলাম আজও কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে চলছে... কমিউনিজমের চ্যালেঞ্জ, জাতীয়তাবাদীর চ্যালেঞ্জ, সামাজিক ন্যায় বিচারের নামে বিধর্মীদের চ্যালেঞ্জ... এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই দৃঢ় পদে সামনে এগুতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ "সাহায্য আসবে একমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই।" (আল-কুরআন)
📄 দাওয়াত ও দা'য়ীর মাঝে সাংগঠনিক সম্পর্ক
বর্তমান বিশ্বে ইসলামী দাওয়াত ও দাওয়াতী কার্যক্রমে চিন্তা ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে, কিন্তু সাংগঠনিক দিকটাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ সাংগঠনিক দিকটি দাওয়াতের মেরুদন্ডের ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ সাংগঠনিক দিকটি আমরা আকিদার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারি। আর আকিদাই হচ্ছে প্রথম, এর পরে হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক আর এদুটো মিলিয়েই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের ও আকিদার সম্পর্ক। এদুটির মাঝে যদি ভারসাম্য না থাকে, তাহলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দা'য়ীকে তার দাওয়াতের প্রাথমিক জীবনেই এ সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। দা'য়ীরা সকলে একই বৃত্তের বন্ধনে আবদ্ধ একথা সদা-সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে।
১. আনুগত্য
যে কোন আন্দোলন বা সংগঠনের ক্ষেত্রে আনুগত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন আমরা ইসলামের মূল বুনিয়াদের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য করা এবং দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করা ঈমান-আকিদারই অংশ। এজন্য কোন দায়িত্বশীল ভাইয়ের আনুগত্য করা কিন্তু প্রকারান্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা। আর তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করার শামিল। আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের দায়িত্বশীলদের।” (সূরা নিসা-৫৯)
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়টিকে এ ভাবে ব্যক্ত করেছেন- "যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। আর যে আমীরের আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল, আর যে আমীরের বিরুদ্ধাচরণ করল, সে আমারই বিরুদ্ধাচরণ করল।"
কার জন্য আনুগত্য?
একজন মুসলমান ভাইয়ের প্রতি অবশ্যই কর্তব্য হলো, নেতার বা নেতৃত্বের আনুগত্য করা, সে যে ধরণেরই ব্যক্তি হোক না কেন, আর এটাই হচ্ছে ইসলামের আনুগত্যের ব্যাপারে বিশেষ বিধান। আনুগত্য কোন ব্যক্তি কেন্দ্রীক হবে না, আনুগত্য করতে হবে আদর্শের কারণে। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "তোমরা শোন এবং আনুগত্য কর, যদিও তোমাদের উপর একজন হাবসী ক্রীতদাসকে দায়িত্বশীল বানিয়ে দেয়া হয়, যার মাথার চুলগুলো মনে হয় কিসমিসের দানার মত (জটবাঁধা)।” লক্ষ্য করুন যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) এর কাছে তাকে সেনাপতির পদ থেকে পদচ্যুতির পত্র এসে পৌঁছে এবং তাঁর স্থলে আবু ওবাইদা ইবনে জাররা (রা.) কে সেনাপতি নিয়োগ দেয়া হয় তখন তিনি বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম! যদি আমীরুল মুমিনীন আমার উপরে কোন মহিলাকে নিয়োগ দান করতেন, তাহলে অবশ্যই আমি তার কথা শুনতাম এবং তার আনুগত্য করতাম।"
কখন বিরুদ্ধাচরণ করা অত্যাবশ্যকীয় হবে?
ইসলাম যেমন একজন মুসলমানের প্রতি নেতৃত্বের আনুগত্য করাকে ওয়াজিব করেছে, তেমনি আবার নেতার বিরুদ্ধাচরণ করাকে ক্ষেত্র বিশেষে ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত করেছে। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "একজন মুসলমানের প্রতি ওয়াজিব হলো শোনা এবং আনুগত্য করা, যা তার পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয় হোক কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজে নির্দেশ দেয়া হয়, তাহলে সে তা শুনবেও না, আনুগত্যও করবে না।"
আলী (রা.) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি কমান্ডো বাহিনী প্রেরণ করেন, সেখানে একজন আনসার সাহাবীকে দায়িত্বশীল করা হয়। তিনি কোন এক ব্যাপারে সবার উপরে রেগে যান তারপর তিনি বলেন, তোমরা এক জায়গাতে লাকড়ী জমা কর, লাকড়ী জমা করা হলে তিনি বলেন, এতে আগুন ধরিয়ে দাও। এরপর তিনি বলেন, তোমাদেরকে কি রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেননি যে, তোমরা আমার কথা শুনবে এবং আমার আদেশ পালন করবে? তখন তারা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই। তিনি বললেন, তোমরা আগুনে ঝাঁপ দাও, তখন তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকলেন। এরপরে বললেন, আমরা আগুন থেকে বাঁচার জন্যই রাসূলের কাছে পালিয়ে এসেছি, আর আপনি আমাদেরকে আগুনে ঝাঁপ দিতে নির্দেশ দিচ্ছেন? এরপর নেতার রাগ কমলে আগুন নিভিয়ে ফেলতে বললেন। অতঃপর তারা রাসূলের কাছে ফিরে এসে বিষয়টির উল্লেখ করলে তিনি বললেন, "যদি তারা আগুনে প্রবেশ করতো, তাহলে কখনই তা থেকে বের হতে পারত না। তিনি আরও বললেন, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য হলো ভালো নেকীর কাজে।"
নিজেদেরকে আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করুন
একজন মুসলমানকে অবশ্যই আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হবে। নেতৃত্বের আদেশ মান্য করতে হবে। শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে হবে, এ কাজটি বড় কঠিন। মানুষের মন আনুগত্য করতে সহজে রাজি হয় না। আত্ম-অহংকার এবং শয়তানের কু-মন্ত্রণা মানুষকে অবাধ্য, অহংকারী করে তুলে।
ইতিহাসে দেখা যায় যে, দাম্ভিক জাবালা ইবনে আইহাম আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে। ফলে সে ইসলাম পরিত্যাগ করে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে। হেদায়েত পরিত্যাগ করে গোমরাহীকে প্রাধান্য দেয়। আবু উমর সাইদানী বলেন, “যখন জাবালা ইবনে আইহাম আল গাসসানী ইসলাম গ্রহণ করে তখন সে ছিল জাফনা গোত্রের বাদশা। সে হযরত উমর (রা.) এর সাথে দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেন। সে নিজ বংশের পাঁচশত লোক নিয়ে উমরের (রা.) সাথে দেখা করার জন্য বের হয়। হযরত ওমর খুশি হয়ে লোকজনকে নির্দেশ দেন, তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসার জন্য। সে উমরের কাছে আসলে তিনি তাকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে কাছে টেনে নেন। এরপর হযরত উমর হজ্বের জন্য বের হয়ে পড়েন তার সাথে জাবালাও সঙ্গী হয়। মক্কায় কা’বা ঘর তওয়াফ করার সময় বনু ফাজারা গোত্রের একজন লোক ভুলক্রমে জাবালার চাদরে পা চাপা দেয়। এতে জাবালা ক্ষিপ্ত হয়ে ফাজারা গোত্রের লোকটির নাকে এক প্রচন্ড ঘুষি মারে। বিষয়টি উমর (রা.) এর গোচরে আনা হলে জাবালাকে তিনি বলেন, এটা কি? সে বললো, হ্যাঁ হে আমীরুল মুমিনীন সে ইচ্ছে করেই আমার চাদরে পা দিয়েছিল, আমাকে বিবস্ত্র করার লক্ষ্যে। কা'বা ঘরের চত্বর না হলে তরবারীর আঘাতে তাকে শেষ করে দিতাম। হযরত উমর (রা.) বললেন হয় আপনি লোকটিকে সন্তুষ্ট করবেন, নতুবা আপনাকে শাস্তি দেয়া হবে। জাবালা বললো, আপনি কি করবেন? ওমর বললেন, লোকটিকে আমি আদেশ দিবো সে যেন আপনার নাকের উপরে সজোরে ঘুষি মারে। জাবালা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! সে হলো একজন নগণ্য প্রজা, আর আমি হলাম বাদশা? উমর বললেন, ইসলাম আপনাকে আর তাকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এখানে একমাত্র প্রাধান্য হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। জাবালা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি তো মনে করেছিলাম ইসলামে প্রবেশ করে আমার মান-মর্যাদা জাহেলিয়াতের চেয়ে আরও বৃদ্ধি পাবে। উমর বললেন, আপনি এসব কথা বাদ দিন, না হলে আমি এখনি এর বদলার ব্যবস্থা করছি। জাবালা বললো, তাহলে আমি খৃষ্টান হয়ে যাবো। উমর বললেন, আপনি যদি খৃষ্টান হয়ে যান, তাহলে আপনার গর্দান উড়িয়ে দিবো, কারণ ইসলাম গ্রহণ করার পরে যদি আপনি মুর্তাদ হয়ে যান, তাহলে শরীয়তের বিধানে আপনার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। জাবালা যখন হযরত উমরের দৃঢ়তা লক্ষ্য করলো তখন সে বললো, আমাকে এক রাতের সময় দিন, আমি একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। রাত্রে যখন সব লোকজন শুয়ে পড়ে, তখন জাবালা তার ঘোড়া ও সামান-পত্র নিয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। এরপর সে কনস্টান্টিণেপল চলে যায় এবং সেখানে গিয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে।
২. দায়িত্বানুভূতি/দায়িত্বশীলতা
দা'য়ী নিজেকে ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈমানী মজবুতী, ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণ এবং ইসলামের ব্যাপারে যে কর্ম সম্পাদন করা দরকার সে ব্যাপারে নিজেকে সদা-সর্বদা দায়িত্বশীল মনে করবে। ইসলামের জন্য কাজ করাকে নিজের স্বতসিদ্ধ অভ্যাস বা স্বভাবে পরিণত করবে। এজন্য সে যে কোন ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তৈরী থাকবে। এটা তার উপরে দায়িত্ব দেওয়া হোক আর না হোক সে নিজ দায়িত্বে ইসলামের জন্য কাজ করবে এবং ইসলামের একজন একনিষ্ঠ সৈনিক হিসাবে কাজের আঞ্জাম দিয়ে যাবে। রাত-দিন সে নিরলস ভাবে ইসলামের জন্য কাজ করে যাবে। তার চিন্তা-চেতনায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সুখে-দুখে, চিন্তা-চেতনায় তাদের এই অনুভূতিই ছিল। যাইদ ইবনে সাবেত বলেন: আমাকে রাসূল (সা.) ওহুদের দিন সা'দ ইবনে রাবী (রা.)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। তিনি আমাকে বললেন, তুমি তার দেখা পেলে আমার সালাম পৌছাবে আর তাকে বলবে? রাসূলুল্লাহ তোমাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, তুমি কেমন আছ? তিনি বলেন আমি শহীদদের লাশগুলোর ভিতরে তাঁকে খুঁজতে ছিলাম। যখন আমি তাঁর নিকটে গিয়ে পৌছলাম, তখন তার ছিল অন্তিম অবস্থা। কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস জারি আছে। তাঁর সারা শরীর তীর, তরবারী ও বর্শার আঘাতে জর্জরিত। সত্তরটিরও অধিক আঘাত বিদ্যমান। আমি তখন বললাম, হে সা'দ রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, আপনি কেমন আছেন? সা'দ বললেন, রাসূলকে আমার সালাম জানাবেন এবং বলবেন, হে রাসূল! আমি জান্নাতের খুশবো পাচ্ছি, আর আপনি আমার আনসার ভাইদের বলবেন, তাদের একজনও বেঁচে থাকতে যদি কোনো শত্রু রসূলুল্লাহর নিকট যেতে পারে তবে তাদের কোন ওযর দেয়ার সুযোগ থাকবে না। তারা চোখের পলক ফেলার সময় পর্যন্তও যেন তাঁর খেদমত করে যান... এ কথা বলা মাত্রই তাঁর প্রাণ বের হয়ে যায়।